১১তম বিরাট পর্ব- বিরাটসভায় পাণ্ডবদের মহাপরিচয় ও উত্তরা–অভিমন্যুর শুভবিবাহ
১১তম বিরাট পর্ব- বিরাটসভায় পাণ্ডবদের মহাপরিচয় ও উত্তরা–অভিমন্যুর শুভবিবাহ
ত্রয়োদশ বর্ষের দীর্ঘ অজ্ঞাতবাস শেষ হয়েছে। যেন বহুদিনের মেঘ সরে গিয়ে আবার সূর্যের মুখ দেখা দিয়েছে। সেদিন ভোরে স্নান সেরে পাঁচ পাণ্ডব শ্বেতবস্ত্র পরলেন, অলংকারে সজ্জিত হলেন। আর কোনো ছদ্মবেশ নয়—আজ তাঁরা নিজেদের প্রকৃত পরিচয়ে ফিরে এসেছেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে সামনে রেখে তাঁরা ধীর পায়ে প্রবেশ করলেন মৎস্যরাজ বিরাটের সভাভবনে এবং রাজার আসনেই গিয়ে বসলেন।
কিছুক্ষণ পর রাজা বিরাট সভায় এলেন। চোখের সামনে এই দৃশ্য দেখে তিনি বিস্মিত, তারপর ক্রুদ্ধ। যে কঙ্ককে তিনি পাশা খেলার সঙ্গী হিসেবে রেখেছিলেন, সে আজ রাজসিংহাসনে! ঠোঁটে হালকা বিদ্রূপের হাসি এনে তিনি বললেন,
—কঙ্ক, তোমাকে তো আমি পাশা খেলার জন্য রেখেছিলাম। আজ এত রাজসিক সাজে সিংহাসনে বসে আছ কেন?
রাজা তখনও জানতেন না, তাঁর সামনে বসে আছেন হস্তিনাপুরের প্রকৃত অধিকারী।
রাজা বিরাটের কথা শেষ হতে না হতেই অর্জুন মৃদু হেসে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল না কোনো অহংকার, ছিল সত্যের দীপ্তি।
—মহারাজ, আপনার এই সিংহাসন তো দূরের কথা, ইন্দ্রের অর্ধেক সিংহাসনেও বসার যোগ্যতা রয়েছে এই মহাপুরুষের। তিনি ধর্মের মূর্ত প্রতীক, ব্রাহ্মণদের রক্ষক, যজ্ঞকারী, সত্যনিষ্ঠ, তপস্বী, অপরাজেয় বীর। দেবতা, অসুর, মানুষ, রাক্ষস—যে অস্ত্রের রহস্য জানে না, তাও তাঁর অজানা নয়। তাঁর রাজ্যে মানুষ ধর্মপরায়ণ, সত্যবাদী ও সংযমী। তিনি বৃদ্ধ, অনাথ ও অসহায়দের আপন সন্তানের মতো রক্ষা করেন। ইনি আর কেউ নন—ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির, কৌরববংশের শ্রেষ্ঠ পুরুষ।
অর্জুনের প্রতিটি শব্দ যেন সভার স্তব্ধ বাতাসে বজ্রধ্বনির মতো প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
বিরাট বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
—যদি ইনি সত্যিই যুধিষ্ঠির হন, তবে ভীম কোথায়? অর্জুন কোথায়? নকুল, সহদেব আর দ্রৌপদী কোথায়?
অর্জুন এবার একে একে সকলের পরিচয় প্রকাশ করলেন।
—আপনার রাজরন্ধনে যে বল্লব নামে পাচক কাজ করেছে, সেই-ই মহাবলী ভীম, কীচকের বিনাশকারী। আপনার অশ্বশালার তত্ত্বাবধায়ক নকুল, আর গোধনের রক্ষক সহদেব। সৈরন্ধ্রী রূপে যিনি রানি সুদেষ্ণার সেবা করেছেন, তিনিই পাঞ্চালী দ্রৌপদী। আর আমি—আমি অর্জুন।
বি:দ্র: মৃত্যু যখন সৈরন্ধ্রীর ছদ্মবেশে দাঁড়িয়ে ছিল — কীচক-বধের কাহিনি জানতে এখানে ক্লিক করুন।
সভার নিস্তব্ধতা আরও গভীর হয়ে উঠল।
এবার রাজপুত্র উত্তর এগিয়ে এলেন। তাঁর চোখে বিস্ময়, গর্ব আর ভক্তি।
—পিতা, যিনি আমাকে রক্ষা করেছিলেন, যিনি কৌরব সেনাকে পরাজিত করে গোধন ফিরিয়ে এনেছিলেন, তিনিই এই অর্জুন। তাঁর শঙ্খধ্বনিতে যুদ্ধক্ষেত্রে আমি প্রায় বধির হয়ে গিয়েছিলাম।
সব শুনে রাজা বিরাটের অহংকার মুহূর্তে গলে গেল। তিনি সিংহাসন থেকে নেমে এসে যুধিষ্ঠিরের সামনে হাত জোড় করলেন।
—ধর্মরাজ, আপনাদের চিনতে না পেরে আমি অপরাধ করেছি। আমাকে ক্ষমা করুন।
যুধিষ্ঠিরের মুখে ছিল সেই চিরচেনা প্রশান্তি। তাঁর নীরব ক্ষমাই যেন বিরাটকে মুক্তি দিল।
কৃতজ্ঞতায় অভিভূত রাজা বিরাট নিজের রাজ্য, ধনভাণ্ডার—সবকিছু যুধিষ্ঠিরের হাতে সমর্পণ করতে চাইলেন। তারপর বললেন,
—আমার একটিই ইচ্ছা। আমার কন্যা উত্তরার সঙ্গে অর্জুনের বিবাহ হোক।
যুধিষ্ঠির নীরবে অর্জুনের দিকে তাকালেন।
অর্জুন বিনীত কণ্ঠে উত্তর দিলেন,
—মহারাজ, এক বছর আমি উত্তরাকে কন্যার স্নেহে নৃত্য ও সংগীত শিক্ষা দিয়েছি। সে আমাকে পিতার মতো শ্রদ্ধা করেছে। আজ যদি তাকে পত্নীরূপে গ্রহণ করি, তবে সেই বিশ্বাস কলঙ্কিত হবে। আমি চাই, সে আমার পুত্রবধূ হোক।
বিরাট বিস্মিত হলেন।
—তবে কার সঙ্গে?
অর্জুনের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
—আমার পুত্র অভিমন্যুর সঙ্গে। সে শ্রীকৃষ্ণের ভাগিনেয়, দেবকুমারের মতো বীর, সমস্ত অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী। উত্তরার জন্য তার চেয়ে যোগ্য বর আর হতে পারে না।
বি:দ্র:সুভদ্রার তেজস্বী পুত্র-অভিমন্যুর জন্ম কাহিনি জানতে এখানে ক্লিক করুন।
রাজা বিরাট গভীর আনন্দে সম্মতি দিলেন। যুধিষ্ঠিরও সেই প্রস্তাব অনুমোদন করলেন। তখনই দূত ছুটে গেলেন দ্বারকায়, পাঞ্চালে এবং মিত্ররাজ্যগুলিতে।
কয়েক দিনের মধ্যেই উপপ্লব্য নগরী যেন সমগ্র আর্যাবর্তের মিলনক্ষেত্রে পরিণত হল। এলেন শ্রীকৃষ্ণ, বলরাম, সাত্যকি, কৃতবর্মা, অক্রুর, শাম্ব, সুভদ্রা এবং তরুণ অভিমন্যু। এলেন রাজা দ্রুপদ, কাশীরাজ, শৈব্য এবং অসংখ্য মিত্ররাজা তাঁদের অক্ষৌহিণী সেনাসহ।
চারদিকে উৎসবের আবহ। শঙ্খ, ভেরী, গোমুখ আর মঙ্গলবাদ্যের ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল বিরাটের রাজপ্রাসাদ। রানি সুদেষ্ণা ও অন্তঃপুরের নারীরা স্নেহভরে উত্তরাকে নববধূর সাজে অলংকৃত করলেন।
শ্রীকৃষ্ণের উপস্থিতিতে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হল অভিমন্যু ও উত্তরার শুভবিবাহ। প্রজ্বলিত অগ্নিকে সাক্ষী রেখে দুটি রাজবংশ আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হল।
কন্যাদানে রাজা বিরাট দিলেন সাত হাজার দ্রুতগামী অশ্ব, দুই শত মদমত্ত গজ এবং অগাধ ধনসম্পদ। এমনকি তিনি ঘোষণা করলেন, তাঁর শক্তি ও সামর্থ্যও আজ থেকে পাণ্ডবদের জন্য নিবেদিত।
বিবাহের পর যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণপ্রদত্ত বিপুল উপহার থেকে ব্রাহ্মণদের দান করলেন অঢেল সম্পদ। উপপ্লব্য ও মৎস্যনগরী ফুল, পতাকা ও আলোকসজ্জায় এক স্বপ্নপুরীর রূপ নিল।
কিন্তু সেই আনন্দের আড়ালে ইতিহাস যেন নিঃশব্দে আরেকটি অধ্যায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অজ্ঞাতবাস শেষ হয়েছে, আত্মপরিচয় ফিরে এসেছে, আত্মীয়তার নতুন বন্ধনও গড়ে উঠেছে। এখন সামনে একটাই পথ—ধর্মের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কুরুক্ষেত্রের অনিবার্য মহাযুদ্ধ।
এখানেই বিরাটপর্ব সমাপ্ত এর পর শুরু হবে মহাভারতের উদ্যোগপর্ব
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে এবং বনপর্ব ৬৫তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিরাটপর্বের একাদশ ও শেষ ভাগের আলোচনা। এখানেই বিরাটপর্ব সমাপ্ত এর পর শুরু হবে মহাভারতের উদ্যোগপর্ব
বিরাটপর্বের দশম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment