৪৭তম বন পর্ব -বালুকারাশি, প্রলয়াগ্নি এবং এক অপরাজিত ধুন্ধুমারের বিস্মৃত উপাখ্যান
৪৭তম বন পর্ব -বালুকারাশি, প্রলয়াগ্নি এবং এক অপরাজিত ধুন্ধুমারের বিস্মৃত উপাখ্যান
মার্কণ্ডেয় মুনি একটু থামলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি বহুদূরে প্রসারিত, যেন হাজার হাজার বছরের কুয়াশাচ্ছন্ন ইতিহাস ভেদ করে তিনি দেখতে পাচ্ছেন এক আশ্চর্য সত্য। স্মৃতির জীর্ণ পাতাগুলো একে একে খুলে যাচ্ছিল তাঁর মনের গভীরে। সূর্যবংশের সেই অতিপ্রাচীন গৌরবগাথা তাঁর কণ্ঠে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করল।
তিনি বলতে শুরু করলেন, "শোনো যুধিষ্ঠির, মহাপ্রতাপশালী সূর্যবংশের রাজা ইক্ষাকু যখন পরলোকগমন করলেন, তখন অযোধ্যার রাজসিংহাসনে বসলেন তাঁর যোগ্য পুত্র শশাদ। তারপর কালচক্র আবর্তিত হতে লাগল। শশাদের পর ককুৎস্থ, তাঁর পর অনেনা, একে একে এলেন পৃথু, বিশ্বগশ্ব, অদ্রি এবং যুবনাশ্ব। যুবনাশ্বের ঔরসে জন্ম নিলেন শ্রাব। এই শ্রাবই পরম যত্নে গড়ে তুলেছিলেন এক স্বপ্নের নগরী—শ্রাবন্তী। শ্রাবন্তের পুত্র বৃহদশ্ব, আর তাঁর ঘরেই আলো করে এলেন কুবলাশ্ব। কুবলাশ্ব কেবল বীর ছিলেন না, গুণের দিক থেকে তিনি পিতাকেও ছাপিয়ে গিয়েছিলেন। যখন কুবলাশ্ব পূর্ণ যৌবনে পদার্পণ করলেন, বৃহদশ্ব ভাবলেন, এবার সংসারধর্ম ও রাজপাটের মায়া ত্যাগ করার সময় এসেছে। তিনি পুত্রকে সিংহাসনে বসিয়ে নিজে চলে যেতে চাইলেন গভীর বনে, তপস্যার সন্ধানে।"
কিন্তু নিয়তি অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। ঠিক সেই সময় অযোধ্যার রাজপ্রাসাদে ঝড়ের বেগে এসে উপস্থিত হলেন মহর্ষি উত্তঙ্ক। তাঁর চোখে-মুখে এক চরম বিপর্যয় আর আতঙ্কের ছাপ।
রাজা বৃহদশ্বকে থামিয়ে মহর্ষি আর্তনাদ করে উঠলেন, "রাজন, আপনি এ কী করছেন? আমরা তো আপনারই সন্তানসম প্রজা। এই মুহূর্তে প্রজাপালন ও ধরিত্রীকে রক্ষা করাই আপনার পরম ধর্ম। অরণ্যের নিভৃত কোণে একা একা যে পুণ্য অর্জন করা যায়, তার চেয়ে ঢের বেশি পুণ্য লুকিয়ে আছে প্রজার চোখের জল মোছানোয়। আপনি যদি আমাদের ছেড়ে চলে যান, তবে বনের হিংস্র পশুর চেয়েও ভয়ঙ্কর এক দানব আমাদের গ্রাস করবে। আমরা শান্তিতে একটু ঈশ্বরচিন্তাও করতে পারব না।"
বৃহদশ্ব সবিস্ময়ে জানতে চাইলেন, "কীসের এত ভয়, ঋষিবর?"
উত্তঙ্ক বললেন, "মরুদেশের একপ্রান্তে, আমার আশ্রমের অনতিদূরে এক সুবিস্তীর্ণ বালির সমুদ্র আছে—লোকে তাকে বলে উজ্জালক সাগর। যোজন যোজন ব্যাপী সেই উত্তপ্ত বালুকারাশির গভীরে লুকিয়ে আছে এক আদিম অন্ধকার। সেখানে বাস করে এক ভয়ঙ্কর পরাক্রান্ত দানব, নাম তার ধুন্ধু। সে মহাবলশালী মধুকৈটভের পুত্র। সারা বছরে সে মাত্র একবারই নিঃশ্বাস ছাড়ে। কিন্তু যখন সে সেই দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে, তখন মনে হয় প্রলয় উপস্থিত হয়েছে। গোটা পৃথিবী কেঁপে ওঠে, অরণ্য-পর্বত থরথর করে কাঁদে। তার নিঃশ্বাসের ঝড়ে মরুভূমির বালি এত উঁচুতে ওড়ে যে সাতদিনের জন্য সূর্য ঢাকা পড়ে যায়। চারদিক ডুবে যায় এক অমাবস্যার অন্ধকারে। সেই বিষাক্ত আগুনের হলকায় আমাদের আশ্রমে থাকা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। রাজন, মানবজাতির কল্যাণের জন্য, পৃথিবীর বুক থেকে এই অভিশাপ দূর করার জন্য আপনি সেই দৈত্যকে বধ করুন।"
দানবের অভিশাপ ও দৈবশক্তির জাগরণ
বৃহদশ্ব দুই হাত জোড় করে অত্যন্ত বিনীত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন, "মহর্ষি, আপনার এই আগমন নিষ্ফল হবে না। কিন্তু আমি অস্ত্র ত্যাগ করেছি, আমার শরীর এখন ক্লান্ত। তবে আমার পুত্র কুবলাশ্ব এই পৃথিবীতে এক অদ্বিতীয় বীর। তার সাহস, ধৈর্য আর ক্ষিপ্রতা অতুলনীয়। তার সঙ্গে থাকবে তার একুশ হাজার তেজস্বী পুত্র। আপনার অভীষ্ট কাজ আমার পুত্রই সম্পন্ন করবে। আপনি আমাকে অনুমতি দিন।" মহর্ষি উত্তঙ্ক কুবলাশ্বের বীরত্বের ওপর আস্থা রেখে সম্মতি দিলেন, আর বৃহদশ্ব নিশ্চিন্ত মনে তপোবনের পথ ধরলেন।
মার্কণ্ডেয় মুনির মুখে এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর কাহিনি শুনে যুধিষ্ঠির আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "হে মুনিবর, এমন অদ্ভুত এবং ভয়ঙ্কর দৈত্যের কথা তো আমি আগে কখনও শুনিনি! কে এই ধুন্ধু? তার শক্তির উৎস কী?"
মার্কণ্ডেয় মৃদু হাসলেন, সে হাসিতে মিশে ছিল প্রাচীন কালের রহস্য। তিনি বললেন, "যুধিষ্ঠির, ধুন্ধু সাধারণ কোনো দানব ছিল না। একসময় সে এক পায়ে দাঁড়িয়ে বছরের পর বছর এমন কঠোর তপস্যা করেছিল যে সৃষ্টিধাতা ব্রহ্মা স্বয়ং বাধ্য হয়েছিলেন তার সামনে আবির্ভূত হতে। ধুন্ধু ব্রহ্মার কাছে বর চাইল—দেবতা, দানব, গন্ধর্ব, যক্ষ, রাক্ষস কিংবা নাগ, কেউ যেন তাকে বধ করতে না পারে। ব্রহ্মা তথাস্তু বলে অন্তর্হিত হলেন। এই অজেয়তার অহঙ্কার নিয়েই সে উজ্জালক সাগরের বালির নিচে লুকিয়ে থেকে সমস্ত সৃষ্টিকে উত্যক্ত করছিল।"
কুবলাশ্ব যখন তাঁর বিশাল বাহিনী আর একুশ হাজার পুত্রকে নিয়ে মরুভূমির দিকে রওনা হলেন, তখন স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু বিশ্বকল্যাণের স্বার্থে নিজের অনন্ত তেজ কুবলাশ্বের শরীরে সঞ্চারিত করে দিলেন। শূন্যে বেজে উঠল দেবদুন্দুভি, আকাশ থেকে ঝরে পড়ল পুষ্পবৃষ্টি। দেবতারা অভয়বাণী দিলেন—"এই বীরই ধুন্ধুকে বধ করে ইতিহাসে 'ধুন্ধুমার' নামে অমর হয়ে থাকবেন।"
মরুভূমির বুকে প্রলয় ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম-
সৈন্যসামন্ত নিয়ে রাজা যখন সেই বালির সাগরে পৌঁছলেন, তখন শুরু হলো এক অভূতপূর্ব খননকার্য। দীর্ঘ সাতদিন ধরে একুশ হাজার রাজকুমার মরুভূমির বুক চিরে বালি খুঁড়তে লাগলেন। অবশেষে, সেই গভীর অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এলো ধুন্ধুর বিকট, পর্বতপ্রমাণ শরীর। বালির তলা থেকে তার আত্মপ্রকাশ যেন এক মধ্যাহ্নের সূর্যের মতো দীপ্ত আর প্রলয়াগ্নির মতো ভয়ঙ্কর দেখাল। সে যেন পশ্চিম আকাশ জুড়ে শুয়ে থাকা এক জীবন্ত অগ্নিকুণ্ড।
কুবলাশ্বের পুত্ররা কালবিলম্ব না করে চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ধরলেন। ঝাঁকে ঝাঁকে বাণ, গদা, মুষল আর তরবারি আঘাত করতে লাগল দানবের গায়ে। কিন্তু ধুন্ধুর ক্রোধ তখন সপ্তমে। সে এক বিশাল হা করল এবং রাজকুমারদের সমস্ত অস্ত্র এক নিমেষে গ্রাস করে নিল। তারপর তার মুখ থেকে নির্গত হলো সংবর্তক নামের এক প্রলয়ঙ্কর আগুন। সেই সর্বগ্রাসী আগুনের লেলিহান শিখা এক মুহূর্তের মধ্যে কুবলাশ্বের একুশ হাজার পুত্রকে পুড়িয়ে ছাই করে দিল! ঠিক যেমন অতীতে কপিল মুনির ক্রোধে সগরপুত্রের দল ভস্ম হয়ে গিয়েছিল, মরুভূমির বুকে পড়ে রইল শুধু রাজকুমারদের চিতাভস্ম।
পুত্রশোকে মূহ্যমান না হয়ে, রাজা কুবলাশ্ব একাই এগিয়ে গেলেন সেই দানবের দিকে। তাঁর চোখে তখন বিশ্বরক্ষার সংকল্প। ধুন্ধু আবার আগুন ছাড়ল, কিন্তু কুবলাশ্ব তখন বিষ্ণুর তেজে বলীয়ান এবং এক অদ্ভুত যোগবলের অধিকারী। রাজার শরীর থেকে অবিরাম জলধারা বর্ষিত হতে লাগল, যা ধুন্ধুর মুখের প্রলয়াগ্নিকে মুহূর্তের মধ্যে ঠাণ্ডা করে দিল। আগুন যখন নিভে গেল, তখন কুবলাশ্ব তাঁর তূণীর থেকে বের করলেন পরম শক্তিশালী ব্রহ্মাস্ত্র। মন্ত্রপূত সেই অস্ত্র যখন ধুন্ধুর বুক চিরে চলে গেল, তখন এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণে সেই বিশাল দানব পুড়ে ছাই হয়ে গেল। পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে দূর হলো এক মহা আতঙ্ক।
এই অসম্ভব বীরত্বের পর রাজা কুবলাশ্বের নাম হয়ে গেল 'ধুন্ধুমার'—যিনি ধুন্ধুকে মারন বা ধ্বংস করেছিলেন। কিন্তু এই জয়ের আনন্দ ছিল বড় বিষাদময়। একুশ হাজার পুত্রের মধ্যে মাত্র তিনজন বেঁচে ফিরেছিলেন—দৃঢ়াশ্ব, কপিলাশ্ব আর চন্দ্রাশ্ব। এই তিন অবশিষ্ট প্রদীপের আলোতেই ইক্ষাকু বংশের গৌরবময় ধারা আগামী বহু শতাব্দী ধরে প্রজ্জ্বলিত ছিল।"
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৪৭তম ভাগের আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
বনপর্বের ৪৬তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment