Posts

Showing posts from August, 2026

৩৩তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব অভিমানী দুর্যোধনের অন্ধ আঁধার ও এক অমোঘ পরিণতি

Image
৩৩তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব অভিমানী দুর্যোধনের অন্ধ আঁধার ও এক অমোঘ পরিণতি রাজসভার বাতাস তখন চরম উত্তেজনায় ভারাক্রান্ত। হস্তিনাপুরের রাজসভায় একে একে উপস্থিত হয়েছেন জ্ঞানবৃদ্ধ ও বয়োজ্যেষ্ঠগণ। কিন্তু সভা জুড়ে যে বিষণ্ণ স্তব্ধতা, তাকে সহজে কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছিল না। মহামতি বেদব্যাস, সর্বমান্য পিতামহ ভীষ্ম এবং স্বয়ং দেবর্ষি নারদ—সবাই চেষ্টা করেছেন। নারদের কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়েছিল গভীর জীবনসত্য। তিনি বলেছিলেন, "জগতে সহৃদয় শ্রোতা আর সুহৃদ পাওয়া বড় দুর্লভ হে কুরুনন্দন! যখন ঘোর সংকট আসে, আপনজনরাও মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন শুধু একজন খাঁটি বন্ধুই পাশে থাকে। হঠকারিতার ফল কোনোদিন শুভ হয় না, তার পরিণাম কেবলই হাহাকার।" কিন্তু যে চোখ অন্ধকারের প্রেমে পড়েছে, আলো তাকে স্পর্শ করবে কীভাবে? অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অক্ষম পিতা হিসেবে নিজের দুর্বলতাটুকু তিনি ঢাকতে পারলেন না। তিনি শ্রীকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, "কেশব! তোমার প্রতিটা কথা ধর্মের কথা, সুচিন্তিত এবং ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু আমি যে পরাধীন! এই মন্দমতি দুর্যোধন আমার কোনো কথা শোনে না, শাস্ত্র মানে না, কোনো গুরু...

৩২তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-দম্ভের বিষবৃক্ষ ও দুই সনাতন তপস্বী

Image
৩২তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-দম্ভের বিষবৃক্ষ ও দুই সনাতন তপস্বী কৃষ্ণ যখন কৌরবদের রাজসভায় দাঁড়িয়ে তাঁর গভীর, অমোঘ বাণী উচ্চারণ করলেন, তখন গোটা সভাগৃহ এক অলৌকিক নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। যেন কোনো এক বিপুল ঝড়ের পূর্বাভাসে থমকে গেছে চরাচর। ধৃতরাষ্ট্র, ভীষ্ম, দ্রোণ থেকে শুরু করে উপস্থিত রাজন্যবর্গ—কারো মুখেই কোনো শব্দ নেই। তাঁদের গা ছমছম করে উঠল, শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল রোমাঞ্চে। এক আশ্চর্য ও জটিল দোলাচলে দুলতে লাগল তাঁদের মন, কিন্তু প্রকাশ্যে সে কথা উচ্চারণ করার সাহসিকতা কারও ছিল না। সভায় তখন শ্মশানের নীরবতা। সেই অচল নীরবতা চূর্ণ করে উঠে দাঁড়ালেন মহর্ষি পরশুরাম । দুর্যোধনের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে, এক দৃঢ় ও শান্ত স্বরে তিনি বলতে শুরু করলেন, "শোনো রাজন, আজ তোমাকে এক বহু প্রাচীন সত্য শোনাই। তোমার যদি বিন্দুমাত্র হিতবোধ অবশিষ্ট থাকে, তবে এই কথা শোনো এবং সেই অনুযায়ী পথ চলো।"   পরশুরামের কন্ঠে ভেসে এলো এক প্রাচীন উপাখ্যান—"পুরাকালে দম্ভোদ্ভব নামে এক সার্বভৌম রাজা ছিলেন। বিপুল শক্তি আর পরাক্রমের অহংকারে তাঁর মেদিনী কাঁপত। প্রাতঃকালে উঠে তিনি ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয়দের সামনে ...

৩১তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-রাজসভায় মধুসূদন: কুরুক্ষেত্রের আগে শেষ চেষ্টা

Image
৩১তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-রাজসভায় মধুসূদন: কুরুক্ষেত্রের আগে শেষ চেষ্টা প্রাতঃকালের স্নান, জপ আর অগ্নিহোত্র শেষ করে শ্রীকৃষ্ণ যখন সূর্যদেবকে প্রণাম জানাচ্ছেন, তখনও চারপাশ শান্ত। শরীর ঢেকে নিলেন উজ্জ্বল পীতবস্ত্র ও আভরণে। ঠিক তখনই ঘরে এলেন দুর্যোধন, সঙ্গে মামা শকুনি। দুর্যোধনের গলায় একধরনের কৃত্রিম ব্যস্ততা, "মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, পিতামহ ভীষ্ম—কৌরবদের বড় বড় সব মাথারাই এখন রাজসভায় আপনার পথ চেয়ে বসে আছেন।" কৃষ্ণ শুধু মৃদু হাসলেন। তাঁর সেই অমলিন, মধুর অভ্যর্থনায় কোনো উত্তাপ ছিল না, ছিল না কোনো গোপন হিংসার আঁচ। বাইরে রথ প্রস্তুত। সারথি প্রণাম করে দাঁড়াল, চারটে শুভ্র ঘোড়া অধৈর্য হয়ে পা ঠুকছে। রথে উঠলেন শ্রীযদুনাথ, সঙ্গে উঠলেন ধর্মজ্ঞ বিদুর। অন্য একটা রথে পেছন পেছন চললেন দুর্যোধন আর শকুনি। রাজসভার দরজায় যখন রথ থামল, কৃষ্ণ পা রাখলেন মাটিতে। তাঁর পাশে বিদুর আর সাত্যকি। কৃষ্ণ যখন সভার ভেতর ঢুকছেন, তাঁর গায়ের সেই অদ্ভুত নীলচে জ্যোতি আর মহিমার সামনে মুহূর্তের জন্য কৌরবদের সব জাঁকজমক ম্লান হয়ে গেল। সভার ভেতরে সবার সামনে দুর্যোধন আর কর্ণ, পেছনে কৃতবর্মা আর অন্য যদুবংশীয়রা। কৃষ্ণকে দেখেই ...

৩০তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-হস্তিনাপুরে এক রাত্রি: রাজধর্ম ও অন্ন

Image
৩০তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-হস্তিনাপুরে এক রাত্রি: রাজধর্ম ও অন্ন হস্তিনাপুরের রাজসভায় তখন থমথমে উত্তেজনা। কৌরবদের দম্ভ আর অহংকারের আবহ পার হয়ে স্বয়ং কৃষ্ণ যখন সেখানে গিয়ে দাঁড়ালেন, মুহূর্তের জন্য পুরো সভাগৃহ থমকে গেল। তবে রাজকীয় শিষ্টাচারের খাতিরে দুর্যোধন তড়িঘড়ি তাঁর মন্ত্রীদের নিয়ে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। কৃষ্ণ স্বভাবসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে উপস্থিত রাজাদের যথাবিহিত সম্মান জানিয়ে বসে পড়লেন একটা ঝকমকে সোনার পালঙ্কে। অভ্যর্থনা পর্ব শেষ হতেই দুর্যোধন বেশ হাসিমুখে কৃষ্ণকে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। কিন্তু কৃষ্ণ অত্যন্ত স্পষ্ট, ধীর অথচ কড়া গলায় সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন। দুর্যোধনের মুখের হাসিটা অমনি মিলালো। তিনি প্রথমে বেশ মিষ্টি গলায়, তারপর ধীরে ধীরে কিছুটা ছদ্ম কপটতা মিশিয়ে বললেন, "জনার্দন, আপনার জন্য এত ভালো খাবার, পানীয় আর আরামের ব্যবস্থা করলুম, আর আপনি তা এক কথায় ফিরিয়ে দিচ্ছেন? আপনি তো দু-পক্ষের জন্যই ভাবেন, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের অত্যন্ত প্রিয়। কোনটা ধর্ম আর কোনটা অধর্ম—তা তো আপনার চেয়ে ভালো কেউ বোঝে না। তবে এত জেনেও আমার আতিথেয়তা ফিরিয়ে দেওয়ার কারণটা কী, বলবেন?" কৃষ্ণ এবার তাঁর...

২৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কৃষ্ণ পদার্পণ: হস্তিনাপুরের এক অগ্নিগর্ভ প্রভাত

Image
২৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কৃষ্ণ পদার্পণ: হস্তিনাপুরের এক অগ্নিগর্ভ প্রভাত প্রাতঃকালের স্নান-আহ্নিক সাঙ্গ করে বৃকস্থল থেকে যখন তিনি রথে উঠলেন, সকালের সোনাঝরা রোদে তাঁর তামাটে ত্বক চকচক করছিল। রথের চাকার ধূলো উড়িয়ে হস্তিনাপুরের দিকে যাত্রা শুরু হতেই গ্রামবাসীরা কিছু দূর সঙ্গে এল বটে, কিন্তু তাঁর মৃদু হাসির ইশারায় আবার ফিরেও গেল। হস্তিনাপুরের ঠিক সীমান্তে তখন এক রাজকীয় অভ্যর্থনার তোড়জোড়। দুর্যোধন ছাড়া ধৃতরাষ্ট্রের বাকী সব পুত্র, আর তাঁদের সঙ্গে ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপের মতো মহাধ্যানীরা দাঁড়িয়ে আছেন রাজকীয় পোশাকে। কৌতূহলী নগরবাসীর ভিড়—কেউ হেঁটে, কেউ গরুর গাড়িতে, কেউ বা ঘোড়ায় চড়ে এসেছে এই এক অলৌকিক মানুষকে চোখের দেখা দেখতে। পথজুড়ে রঙিন পতাকায় সাজানো নগরী, রাস্তায় রাস্তায় সুগন্ধি জল ছিটানো।    জনতার নতমস্তক অভিবাদন আর করতালির মধ্য দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ধীরে ধীরে এসে পৌঁছালেন ধৃতরাষ্ট্রের রাজপ্রাসাদে। তিন-তিনটি ভারী ফটক পেরিয়ে তিনি যখন প্রধান সভায় প্রবেশ করলেন, অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ ভীষ্ম—সকলেই সসম্ভ্রমে দাঁড়িয়ে উঠলেন। কৃষ্ণ হাসলেন। সেই হাসিতে এক অদ্ভুত স্থৈর্য ছিল। রাজপু...

২৮তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কৌরবসভায় অন্ধের রাজনীতি ও এক উন্মত্ত ষড়যন্ত্র

Image
২৮তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কৌরবসভায় অন্ধের রাজনীতি ও এক উন্মত্ত ষড়যন্ত্র হস্তিনাপুরের কৌরবসভায় তখন এক থমথমে উত্তেজনা। পাণ্ডবদের শান্তিপ্রস্তাব নিয়ে স্বয়ং কৃষ্ণ আসছেন—এই এক খবরি রাজপ্রাসাদের বাতাসকে যেন ভারী করে তুলেছে। ​সংবাদটা শোনামাত্রই বৃদ্ধ ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধ দুই চোখের কোণে এক অদ্ভুত আনন্দের চমক খেলে গেল। তাঁর সারা শরীরে একটা বিদ্যুতের মতো শিহরণ বয়ে গেল। তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। পাশে বসে থাকা ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর আর পুত্র দুর্যোধনকে ডেকে বেশ রোমাঞ্চিত গলায় বললেন, "শুনছ? আমাদের সৌভাগ্য! পাণ্ডবদের কাজ নিয়ে স্বয়ং কৃষ্ণ আসছেন এখানে। তিনি সাধারণ মানুষ নন, এই নিখিল বিশ্বের বিধাতা। তিনি প্রজ্ঞা আর বীর্যের আধার। কৃষ্ণ সন্তুষ্ট হওয়া মানে আমাদের সমস্ত সংকট কেটে যাওয়া। দুর্যোধন, এখনই লোক পাঠাও! পথের মোড়ে মোড়ে পান্থশালা বানাও, সুগন্ধি জল ছড়িয়ে কৃষ্ণের স্বাগত অভ্যর্থনার আয়োজন করো। এমন কিছু করো যাতে কৃষ্ণ তোমার ওপর প্রসন্ন হন। পিতামহ, আমি কি ভুল কিছু বলছি?" ​সভায় উপস্থিত সকলেই ধৃতরাষ্ট্রের এই শুভবুদ্ধির প্রশংসা করলেন। দুর্যোধনের হুকুমে পথের ধারে গড়ে উঠতে লাগল ইন্দ্রপুরীর মতো রাজ...

২৭তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-যে চুলে আগুন জ্বলে: কৃষ্ণের হস্তিনাপুর যাত্রা

Image
২৭তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-যে চুলে আগুন জ্বলে: কৃষ্ণের হস্তিনাপুর যাত্রা- ​পাঞ্চালীর চোখে জল ছিল না, ছিল আগ্নেয়গিরির উত্তাপ। ​যুধিষ্ঠির আর ভীমের নরম সুর শুনে দ্রৌপদীর বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল। কৃষ্ণকে সামনে দেখে তাঁর চোখ থেকে যেন ঠিকরে বেরোচ্ছিল তেরো বছরের জমাট বাঁধা অপমান। বাঁ হাতে নিজের সেই দীর্ঘ, অগোছালো, রুক্ষ চুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরে দ্রৌপদী এসে দাঁড়ালেন মধুসূদনের সামনে। ​বললেন, "মধুসূদন, তুমি তো সবই জানো। কৌরবদের সেই পৈশাচিক ক্রুরতা, ধৃতরাষ্ট্রের গোপন অভিসন্ধি—কিছুই তো তোমার অজানা নয়। আজ কোন যুক্তিতে তবে সন্ধির কথা উঠছে? অবধ্যকে বধ করলে যেমন পাপ, বধ্য শত্রু পার পেয়ে গেলেও তো সেই একই পাপ হয়! আমাকে সভাতলে দাসীর মতো টেনে আনা হয়েছিল, আর আমার স্বামীরা বেঁচে থেকেও নপুংসকের মতো চেয়ে চেয়ে দেখেছিলেন। অর্জুনের ধনুর্ধারিতা আর ভীমের বাহুবলকে ধিক্কার! যদি সন্ধি করতেই হয়, তবে মনে রেখো দুঃশাসনের হাতে টানা আমার এই অভিশপ্ত চুলগুলোর কথা। পুরুষেরা না পারলে আমার বৃদ্ধ পিতা দ্রুপদ আর অভিমন্যুকে নিয়ে আমার ছেলেরা প্রতিশোধ নেবে। শত্রুর রক্তে এই চুল না ভিজলে কৃষ্ণা শান্ত হবে না!...

২৬তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কুরুসভায় কৃষ্ণ: রাজনীতির ফাঁসে বাঁধা শান্তির শেষ দান

Image
২৬তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কুরুসভায় কৃষ্ণ: রাজনীতির ফাঁসে বাঁধা শান্তির শেষ দান উপপ্লব্য নগরে তখন দ্বিধার কুয়াশা। কৌরবদের সাথে তেরো বছরের নির্বাসন ও অজ্ঞাতবাস পর্ব শেষ হয়েছে, কিন্তু পাণ্ডবশিবিরে যুদ্ধ আর শান্তির দোলাচল মেটেনি। রাজসূয় যজ্ঞের দীপ্তি আর দ্যূতসভার অপমান—দুই স্মৃতির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে অর্জুন, ভীম, নকুল, সহদেবরা। সবার নজর এক পুরুষের ওপর—কৃষ্ণ। তিনি হস্তিনাপুরে যাচ্ছেন কৌরবদের সভায় শেষ প্রস্তাব নিয়ে। ভীম, যাঁর নাম শুনলেই এককালে রথ-গজা-পদাতিক কাঁপত, তিনি আজ যেন এক অভাবনীয় নম্রতায় স্থির। কৃষ্ণকে কাছে ডেকে বললেন, "মধুসূদন, কৌরবদের কাছে মৃদুভাষে কথা বোলো। দুর্যোধন পরম অধৈর্য, অদূরদর্শী আর হিংসুটে। ওর ক্রোধ এক দাবানল, যা আঠারো রাজার মতো গোটা ভরতবংশকে ভস্ম করে দেবে। অনর্থক রক্তের প্রয়োজন নেই। আমরা ওর বশ্যতা মেনে নিয়ে হলেও বংশরক্ষা করতে রাজি।" কৃষ্ণের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চতুর, রহস্যময় হাসি। ভীমের এই রূপ তিনি আগে দেখেননি। ভীমকে তাতাতে মৃদু হেসে বললেন, "বৃকোদর! তোমার মুখে এমন কাপুরুষের মতো বাণী? যুদ্ধক্ষেত্রে গদা উঁচিয়ে দুর্যোধনকে বধের যে শপথ তুলেছিলে...

২৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-শান্তির শেষ প্রস্তাব ও আসন্ন মহাযুদ্ধের বার্তা

Image
২৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-শান্তির শেষ প্রস্তাব ও আসন্ন মহাযুদ্ধের বার্তা উপস্থিত রাজাদের সভার গোলমাল তখন স্তব্ধ হয়ে এসেছে। নিষ্ক্রান্ত হওয়ার পর ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে চেয়ে রইলেন যাদবশ্রেষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণের দিকে। বড় ক্লান্ত তাঁর কণ্ঠস্বর, কিন্তু সেখানে এক অদ্ভুত নির্ভরতা। তিনি বললেন, "মিত্রবৎসল শ্রীকৃষ্ণ! এই ঘোর সংকটসময়ে তুমি ছাড়া এমন আর কে আছে, যে আমাদের রক্ষা করতে পারে? তোমার উপস্থিতিতেই আমি নির্ভীক, তাই তো আজও দুর্যোধনের কাছে নিজের ন্যায্য অধিকার দাবি করার সাহস পাই।"   বাসুদেব হাসলেন। সে হাসিতে যেমন গভীর প্রজ্ঞা, তেমনই অগাধ স্নেহ। বললেন, "রাজন, আমি তো সর্বদা আপনার সেবায় প্রস্তুত। কী বলতে চান, নির্দ্বিধায় বলুন। আপনার ইচ্ছা পূরণ করাই আমার ধর্ম।" যুধিষ্ঠির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "ধৃতরাষ্ট্র আর তাঁর পুত্রদের মনোভাব তো সঞ্জয়ের মুখে শুনলেই। দূত কেবল প্রভুর বার্তা বহন করে, তার নিজের তো কোনো স্বর নেই। জনার্দন, বৃদ্ধ রাজার লোভ অপরিসীম। তিনি কৌরব আর পাণ্ডবদের সমচোখে দেখতে পারলেন না। বারো বছর বনবাস আর এক বছরের অজ্ঞাতবাসের চরম কায়িক ও মানসিক কষ্ট আমরা তো এই...

২৪তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অন্ধকারের শেষ সীমানায়: কৌরব সভার রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত

Image
২৪তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অন্ধকারের শেষ সীমানায়: কৌরব সভার রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত ধৃতরাষ্ট্রের আকুল প্রশ্নের মুখে সঞ্জয় আর কোনো আড়াল রাখলেন না। সভাঘরের থমথমে বাতাসে অর্জুনের শেষ বার্তাটা যেন ছারখার করে দিল সব অনিশ্চয়তা। সোজা হিসাব—যুধিষ্ঠির তাঁর ন্যায্য অধিকারটুকু চান। তা না পেলে, রক্তস্রোতে ভেসে যাবে হস্তিনাপুরের ঘোড়া, হাতি, আর ধৃতরাষ্ট্রের আত্মম্ভরী ছেলেরা। কিন্তু দুর্যোধন? তাঁর মুখে তখনও সেই এক চিলতে ঔদ্ধত্যের হাসি। কোনো কথায় পাত্তাই দিলেন না। চারপাশটা যেন হঠাৎ বরফের মতো জমে গেল। ধৃতরাষ্ট্রের ভেতরে তখন মারাত্মক অস্থিরতা। ক্ষমতার দড়ি টানাটানিতে কে ভারী, সঞ্জয়ের কাছে তা জানতে চাইলেন। সঞ্জয় চালাক লোক, কোনো গোপন কথা একলা রাজাকে বলে বিপদে পড়তে চাননি। ডাক পড়ল ব্যাসদেব, গান্ধারী আর বিদুরের। ব্যাসদেবের সংকেত পেয়ে সঞ্জয় খোলস ছেড়ে বের করে আনলেন আসল সত্যটা। কৃষ্ণ কেবল পাণ্ডবদের পক্ষে থাকা কোনো কূটনীতিবিদ বা চতুর সারথি নন; তিনি স্বয়ং কালপুরুষ। নরকাসুর, কংস কিংবা শিশুপাল—যাঁদের নাম শুনে তামাম ভারতবর্ষ কাঁপত, কৃষ্ণ তাঁদের খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়েছেন। যদি এক পাল্লায় পুরো বিশ্বব্র...

২৩তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অহংকারের রাজসভা ও আসন্ন বিনাশের ছায়া

Image
২৩তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অহংকারের রাজসভা ও আসন্ন বিনাশের ছায়া কৌরব রাজসভায় উত্তেজনার পারদ তখন চরম শিখরে। যুদ্ধের দামামা বাজছে, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই রাজসভায় শুরু হলো অহংকার, অপমান আর দূরদর্শিতার এক তীব্র সংঘাত। দুর্যোধনের মনে জয়ের উন্মাদনা জাগিয়ে তুলতে কর্ণ দম্ভভরে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, "রাজা, গুরু পরশুরামের দেওয়া ব্রহ্মাস্ত্র এখনো আমার কাছে অক্ষত। অর্জুনকে পরাস্ত করা আমার বাঁ হাতের খেল। শুধু অর্জুন নয়, পাঞ্চাল, করুষ, মৎস্যরাজ আর পাণ্ডবদের বংশকে একাই শেষ করব আমি। পিতামহ ভীষ্ম কিংবা দ্রোণাচার্যের যুদ্ধে নামারই দরকার নেই। আমার বাহিনী নিয়েই আমি পাণ্ডবদের ধূলিসাৎ করে দেব!" কথাগুলো শুনে বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্মের মুখে ফুটে উঠল তিতা হাসি। তিনি রুক্ষ কণ্ঠে বললেন, "কর্ণ, তোমার বুদ্ধিতে বোধহয় কাল সাপের মতো ছোবল মেরেছে! তুমি কৌরবদের আগেই মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়বে, নিজের চামড়া বাঁচানোর চিন্তা করো আগে! খাণ্ডবদাহনের কথা ভুলে গেলে? শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের যে শক্তি বাণাসুর আর ভৌমাসুরকে ধ্বংস করেছিল, সেই শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে তোমার মতো বীরেরা তাসের ঘরের মতো উড়ে যাবে।" প্রবীণ ...

২২তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অহঙ্কারের অন্ধকার ও রক্তচক্ষু: কুরুক্ষেত্রের প্রাক্কালে দুর্যোধনের হুঙ্কার

Image
২২তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অহঙ্কারের অন্ধকার ও রক্তচক্ষু: কুরুক্ষেত্রের প্রাক্কালে দুর্যোধনের হুঙ্কার ​ধৃতরাষ্ট্রের ঘরের আবহাওয়া ভারী হয়ে উঠেছিল এক অজানা আশঙ্কায়। অন্ধ রাজার চোখ দুটি নিষ্ফল হলেও তাঁর বুকের ভেতরটা থরথর করে কাঁপছিল। কুরুকুলের ভবিতব্য কোন গভীর গিরিখাতে তলিয়ে যেতে বসেছে, তা অনুমিত হলেও তা অস্বীকার করার আকুল চেষ্টা করছিলেন তিনি। ঠিক তখনই ঘরের নীরবতা খানখান করে ভেতরে প্রবেশ করলেন যুবরাজ দুর্যোধন। চোখে তাঁর দ্বিধাহীন ক্রোধ, মুখে অহঙ্কারের এক উদ্ধত হাসি। ​পিতার বিহ্বলতা দেখে দর্পভরে হেসে উঠলেন দুর্যোধন— "মহারাজ! ভয় পাবেন না। মিথ্যে চিন্তা করে নিজেকে কেন ক্ষয় করছেন? আমাদের জন্য একটুও ভাববেন না। আমরা দুর্বল নই, শত্রুকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তি আমাদের রক্তে এখনও বইছে।" ​দুর্যোধন ঘরময় পায়চারি করতে করতে বলতে লাগলেন, "ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে যখন পাণ্ডবরা বনে গেল, আর সেখানে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বিশাল বাহিনী নিয়ে হাজির হলেন— কেকয়রাজ, ধৃষ্টকেতু, ধৃষ্টদ্যুম্ন সব মহারথীরা একজোট হয়ে আপনাকে আর কৌরবদের অশেষ নিন্দা-গালাগাল দিলেন। আত্মীয়দের ধ্বংস করে রাজ্য ফ...

২১তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কুরুক্ষেত্রের ছায়া ও অন্ধ রাজার হাহাকার

Image
২১তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কুরুক্ষেত্রের ছায়া ও অন্ধ রাজার হাহাকার ​ধৃতরাষ্ট্রের দুই চোখের অন্ধকার যেন আজ আরও ঘন হয়ে এসেছে। সঞ্জয়ের মুখে পাণ্ডবশিবিরের প্রস্তুতির বিবরণ শুনতে শুনতে বৃদ্ধ রাজার বুক কেঁপে ওঠে এক অজানা আশঙ্কায়। ​সঞ্জয়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে ভগ্নকণ্ঠে ধৃতরাষ্ট্র বললেন— "সঞ্জয়, তুমি যাদের কথা বললে, তারা প্রত্যেকেই এক-একজন দিগ্বিজয়ী বীর। কিন্তু সেই বিশাল তালিকার একপাশে সবাইকে রাখো, আর অন্যপাশে একক ভীমকে বসাও। বনের হিংস্র জীবেরা যেমন সিংহকে দেখে ভয়ে থরথর করে কাঁপে, রাতভর এই ভীমের কথা ভেবে আমারও চোখের পাতা এক হয় না। কৌরবদের প্রতি তার ঘৃণা অপরসীম, প্রতিশোধের আগুন তার চোখে জ্বলছে। সে মহা শক্তিশালী, একরোখা আর উন্মত্ত। যুদ্ধক্ষেত্রে নামলে সে যে আমার দুর্বল পুত্রদের কচুকাটা করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ছেলেবেলায় যখন ও আমার ছেলেদের সঙ্গে সাধারণ খেলাধুলো করত, তখনই ওদের হাতির মতো পিষে মারত। আর আজ যখন ও হাতে গদা তুলে নিয়ে রণক্ষেত্রে তাণ্ডব নাচ নাচবে, তখন রথ, হাতি, ঘোড়া আর মানুষের মাংসখণ্ড বাতাসে উড়বে। মগধের রাজচক্রবর্তী জরাসন্ধকে মনে আছে তো? কৃষ্ণকে সঙ্গে নিয়ে তার রাজপ্রাসাদে ঢুকে ভীম ...

২০তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-মহাভারতের মহাআখ্যান: কৌরব সভায় ভীষ্মের হুঙ্কার ও সঞ্জয়ের যুদ্ধবার্তা!

Image
২০তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-মহাভারতের মহাআখ্যান: কৌরব সভায় ভীষ্মের হুঙ্কার ও সঞ্জয়ের যুদ্ধবার্তা! কৌরব সভায় তখন থমথমে নিস্তব্ধতা। সঞ্জয়ের দীর্ঘ বিবরণ শেষ হতেই শান্তনুনন্দন ভীষ্ম সোজা দুর্যোধনের দিকে স্থির দৃষ্টি পাত করে উঠে দাঁড়ালেন। কঠোর কণ্ঠে বললেন— "দুর্যোধন, একটি অতি প্রাচীন সত্যের কথা শোনো। বহুকাল আগে দেবগুরু বৃহস্পতি, শুক্রাচার্য এবং দেবরাজ ইন্দ্রকে পরিবৃত্ত করে ব্রহ্মা যখন আসীন ছিলেন, ঠিক সেই সময় দুজন পরম তেজস্বী ঋষি নিজেদের অলৌকিক প্রভাবে সকলের চিত্ত ও জ্যোতি হরণ করে সেখান থেকে চলে যান। স্তব্ধ বৃহস্পতির প্রশ্নের উত্তরে ব্রহ্মা বলেছিলেন, এঁরা সাধারণ কোনো তাপস নন—স্বয়ং সনাতন নর ও নারায়ণ। জগতের কল্যাণ সাধনে এবং অসুর বিনাশে তাঁরা একই পরম সত্তার দুটি ভিন্ন রূপ ধরে অবতীর্ণ হয়েছেন। আজ সেই প্রাচীন নরই অর্জুন, আর নারায়ণ হলেন শ্রীকৃষ্ণ। যেদিন শঙ্খ-চক্র-গদা ধারণকারী কৃষ্ণের পাশে গাণ্ডীব হাতে অর্জুনকে একই রথে দেখতে পাবে, সেদিন আমার এই সতর্কবাণী তোমার মনে পড়বে। তুমি আজ সূতপুত্র কর্ণের দম্ভ, শকুনির কুটিল চক্রান্ত আর দুঃশাসনের মূঢ়তার ওপর ভরসা করে কৌরব বংশকে ঘোর বিনাশের মুখে ঠেলে দিচ্...

১৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব

Image
১৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-গাণ্ডীবের গর্জন ও অর্জুনের হুঙ্কার: থমথমে কৌরবসভায় সঞ্জয়ের দুঃসংবাদ দুর্যোধনের রাজসভায় সেদিন কেমন একটা থমথমে ভাব। ধৃতরাষ্ট্র সারারাত সনৎসুজাত আর বিদুরের সঙ্গে গভীর তত্ত্বকথা বলে কাটিয়েছেন — চোখে দেখতে পান না ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতর একটা অজানা ভয় তাঁকে অস্থির করে রেখেছে। সকাল হতেই সভায় একে একে এসে বসলেন ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ, শল্য, কৃতবর্মা, জয়দ্রথ, অশ্বত্থামা, সোমদত্ত, বিদুর, যুযুৎসু — বড় বড় যোদ্ধা আর রাজারা। অন্যদিকে দুর্যোধন, দুঃশাসন, শকুনি, কর্ণ, দুর্মুখ আর বাকি কৌরব ভাইয়েরা নিজেদের দম্ভ নিয়ে বসে আছেন। সবাই তাকিয়ে আছেন দরজার দিকে — পাণ্ডবদের কাছ থেকে বার্তা নিয়ে সঞ্জয় ফিরছেন। সঞ্জয় রথ থেকে নেমে সভায় ঢুকে প্রণাম করে বললেন, "আমি পাণ্ডবদের শিবির থেকে আসছি। তাঁরা আপনাদের সবাইকে যথাযথ সম্মান জানিয়েছেন।" ধৃতরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "সঞ্জয়, বলো তো, অর্জুন ঠিক কী বলেছে?" সঞ্জয় তখন দুর্যোধনের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন — "রাজা, শ্রীকৃষ্ণের সামনে আর যুধিষ্ঠিরের অনুমতি নিয়ে অর্জুন যা বলেছেন, সেটা মন দিয়ে শুনুন...