দ্বিতীয়ভাগ উদ্যোগপর্ব ছলনার মিষ্টি ফাঁদ: শল্যকে যেভাবে হারালেন যুধিষ্ঠির


দ্বিতীয়ভাগ উদ্যোগপর্ব ছলনার মিষ্টি ফাঁদ: শল্যকে যেভাবে হারালেন যুধিষ্ঠির

দূত মারফত পাণ্ডবদের আহ্বান পেয়ে রাজা শল্য দেরি করলেন না। বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে, নিজের মহারথী ছেলেকে সঙ্গে করে তিনি রওনা হলেন পাণ্ডবদের সাহায্যে। তাঁর সৈন্যের এমনই আয়তন যে শিবির পড়ত দুই ক্রোশ জুড়ে—এক অক্ষৌহিণী সেনার অধিপতি তিনি, হাজার হাজার ক্ষত্রিয় সেনাপতি তাঁর অধীনে। এত বড় বাহিনী নিয়ে তাড়াহুড়ো করার তো প্রশ্নই নেই, তাই তিনি বিশ্রাম নিতে নিতে, ধীরে-সুস্থে এগোতে লাগলেন।

খবরটা দুর্যোধনের কানেও পৌঁছাল—শল্য আসছেন, তবে পাণ্ডবদের পক্ষে। এ খবরে দুর্যোধন মোটেই হতাশ হলেন না, বরং উল্টো একটা বুদ্ধি খেলে গেল মাথায়। তিনি নিজে গিয়ে দাঁড়ালেন শল্যের অভ্যর্থনার আয়োজনে। পথের ধারে ধারে তৈরি হলো রত্নখচিত, চোখধাঁধানো সব সভাভবন, ভেতরে হাজারো বিনোদনের ব্যবস্থা। শল্য যেখানেই থামলেন, সেখানেই যেন স্বর্গের আপ্যায়ন—মন্ত্রীরা তাঁকে সম্মান জানাল দেবতার মতো করে।

একের পর এক জায়গায় এমন আয়োজন দেখে শল্য তো মুগ্ধ। খুশি হয়ে একদিন এক সেবককে জিজ্ঞেস করে বসলেন—"বলো তো, যুধিষ্ঠিরের কোন শিল্পীরা এমন চমৎকার সভাগৃহ বানিয়েছে? তাদের আমার কাছে নিয়ে এসো, আমি নিজে তাদের পুরস্কার দেব। যুধিষ্ঠিরকেও বলব যেন তারা আরও সম্মান পায়।"

সেবকরা তো সব জানত আসল সত্যিটা। তারা ছুটে গিয়ে দুর্যোধনকে জানাল। দুর্যোধন বুঝলেন, শল্য এখন এতটাই প্রসন্ন যে চাইলে নিজের প্রাণও দিয়ে দিতে পারেন। ঠিক এই মুহূর্তটার অপেক্ষাতেই তো ছিলেন তিনি। নিজে গিয়ে দাঁড়ালেন শল্যের সামনে।

শল্য যখন জানলেন এই সব আয়োজনের পেছনে আসলে দুর্যোধন, তিনি আনন্দে জড়িয়ে ধরলেন তাঁকে। বললেন, "চাও যা খুশি, আমার কাছে চেয়ে নাও।" দুর্যোধন আর দেরি করলেন না। বললেন, "মহারাজ, আপনার কথা সত্যি হোক। আমার একটাই ইচ্ছা—আপনি আমার সমস্ত সেনাবাহিনীর প্রধান হন।" শল্য সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, "মেনে নিলাম। আর কী চাই বলো।" দুর্যোধন হেসে বললেন, "আপনি তো আমার আসল কাজটাই করে দিলেন।"

তারপর শল্য বললেন, "দুর্যোধন, তুমি এবার রাজধানীতে ফিরে যাও। আমি এখন যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে দেখা করতে যাব, তাঁকে জানিয়ে তবেই ফিরব তোমার কাছে।" দুর্যোধন বললেন, "রাজন, দ্রুত ফিরে আসবেন। আমি এখন আপনারই অধীন, বরটা মনে রাখবেন।" দুজনে আলিঙ্গন করলেন, আর দুর্যোধন ফিরে গেলেন নিজের নগরে।

শল্য তখন রওনা দিলেন যুধিষ্ঠিরের দিকে, বিরাটনগরের উপপ্লব্য প্রদেশে, পাণ্ডবদের শিবিরে। সেখানে পৌঁছাতেই সবার সঙ্গে দেখা হলো, পাণ্ডবরা পাদ্য-অর্ঘ্য দিয়ে তাঁকে বরণ করলেন। শল্য কুশল জিজ্ঞেস করে যুধিষ্ঠিরকে জড়িয়ে ধরলেন, ভীম-অর্জুনকে, নিজের ভাগ্নে নকুল-সহদেবকেও বুকে টেনে নিলেন।

আসন গ্রহণ করে শল্য বললেন—"কুরুশ্রেষ্ঠ, তোমার সব ভালো তো? বনবাসের কালটা শেষ হয়েছে জেনে ভারী আনন্দ হলো। দ্রৌপদী আর ভাইদের নিয়ে বনে যে কষ্ট তুমি সহ্য করেছ, তার চেয়েও কঠিন ছিল অজ্ঞাতবাস—সেটাও তোমরা ভালোভাবে পার করেছ। রাজ্য হারিয়ে দুঃখ ছাড়া আর কী-ই বা থাকতে পারে বলো? কিন্তু ক্ষমা, সংযম, সত্য, অহিংসা—এসব তো তোমার মধ্যে জন্মগতভাবেই আছে। তুমি নরম স্বভাবের, উদার, ব্রাহ্মণের সেবক, দানশীল, ধর্মপরায়ণ। তোমরা এই দুঃখ থেকে মুক্তি পেয়েছ দেখে আমি সত্যিই খুশি।"

এরপর শল্য নিজেই খুলে বললেন দুর্যোধনের সঙ্গে যা যা হয়েছিল—কীভাবে দুর্যোধন তাঁর সেবাযত্ন করেছেন, আর তার বিনিময়ে তিনি কী বর দিয়ে ফেলেছেন। যুধিষ্ঠির সব শুনলেন, তারপর হাসিমুখে বললেন, "মহারাজ, আপনি খুশি হয়ে দুর্যোধনকে কথা দিয়েছেন, খুব ভালো করেছেন। তবে আমারও একটা অনুরোধ আছে আপনার কাছে। আপনি তো যুদ্ধে স্বয়ং কৃষ্ণের মতোই পরাক্রমী। কর্ণ আর অর্জুনের যখন রথে মুখোমুখি লড়াই হবে, তখন কর্ণের সারথি তো আপনিই হবেন, এতে সন্দেহ কী! আপনি যদি সত্যিই আমাদের মঙ্গল চান, তাহলে সেই মুহূর্তে অর্জুনকে রক্ষা করবেন, আর কর্ণের উৎসাহটা যেন একটু একটু করে ভেঙে দেন।"

শল্য মৃদু হেসে বললেন, "যুধিষ্ঠির, তোমার মঙ্গল হোক। আমি নিশ্চয়ই কর্ণের সারথি হব, কারণ সে আমাকে কৃষ্ণের সমতুল্যই মনে করে। ঠিক সেই সময়টাতেই আমি তাকে এমন কিছু তিক্ত কথা বলব, যাতে তার অহংকার আর তেজ ভেঙে যায়—তখন তাকে বধ করা সহজ হয়ে উঠবে। আর তুমি শোনো, দ্রৌপদীও পাশা খেলার দিন কম দুঃখ পায়নি, কর্ণ তোমাকেও কত কটু কথা বলেছিল। কিন্তু সেসব নিয়ে মনে ক্ষোভ রেখো না। বড় বড় মানুষকেও দুঃখ পেতে হয়—মনে রেখো, স্বয়ং ইন্দ্রকেও তাঁর স্ত্রীসহ কত দুর্দশা সইতে হয়েছিল।"

বি:দ্র: ইন্দ্র তাঁর স্ত্রীর দুর্দশা জানতে এখানে ক্লিক করুন

এই এক প্রতিশ্রুতি—যুদ্ধের দিন কর্ণের রথের লাগাম যাঁর হাতে থাকবে, তিনিই ভেতর থেকে ভেঙে দেবেন কর্ণের মনোবল। শল্য যখন মদ্ররাজ্যের রাজা হয়েও দুর্যোধনের বাহিনীতে যোগ দিলেন, তখন কেউ বুঝতেই পারল না যে সেই সেনাপতির মনের ভেতরটা আসলে অন্য এক পক্ষের হয়ে কথা বলছে। যুধিষ্ঠিরের এই কূটনীতি বলে দেয়—যুদ্ধ শুধু বাণ আর তলোয়ারে জেতা যায় না, কখনো কখনো শত্রুর শিবিরের ভেতরেই বসিয়ে দিতে হয় নিজের মানুষ।

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে, বনপর্ব ৬৫তম ভাগে এবং বিরাট পর্ব ১১ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের উদ্যোগপর্বের  দ্বিতীয়ভাগের    আলোচনা। এখন  উদ্যোগপর্ব চলবে। 

উদ্যোগপর্বের প্রথম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)