৫৯তম বনপর্ব-স্বর্ণমৃগের ফাঁদ, বিষাদের ছায়া ও অরণ্যের শূন্যতা


৫৯তম বনপর্ব-স্বর্ণমৃগের ফাঁদ, বিষাদের ছায়া ও অরণ্যের শূন্যতা

দণ্ডকারণ্যের বাতাস তখন ভারী হয়ে উঠেছে এক অশুভ আশঙ্কায়। রাবণ যখন মারীচের নির্জন আশ্রমে এসে দাঁড়ালেন, তখন মারীচ সন্ন্যাসীর শান্ত বেশে বসে থাকলেও তাঁর মন গভীর এক দোলাচলে দুলছিল। মারীচ ছিলেন অভিজ্ঞ; শ্রীরামের বাণের সেই প্রচণ্ড তেজ তিনি নিজের দেহে টের পেয়েছিলেন আগে। রাক্ষসরাজের চোখে প্রতিশোধের অন্ধ আগুন আর মুখের কোণে পরাজিত গ্লানি দেখে মারীচ বুঝলেন—আঘাত সুগভীর। শূর্পণখার অপমান, জনস্থানের ধ্বংস আর খরের মৃত্যুর বিলাপ শুনে মারীচ শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

তিনি হাত জোর করে বললেন, "রাক্ষসরাজ, রাম কোনো সাধারণ মানব নন। তাঁর সঙ্গে শত্রুতা মানে নিজের হাতে নিজের মৃত্যুদণ্ড লেখা। কোন কুবুদ্ধি আপনাকে এই মরণকূপে ঝাঁপ দিতে বলছে?"

কিন্তু অন্ধ কাম আর অপমানের আগুনে জ্বলেপুড়ে খাক হওয়া রাবণের কানে হিতোপদেশ ঢোকার স্থান ছিল না। তিনি গর্জে উঠলেন, "মারীচ! আমার আদেশ পালন করো, নয়তো এই মুহূর্তেই আমার হাতে মরো!"

মারীচ মনে মনে শেষ হিসাবটা কষে ফেললেন। রাবণের মতো অধার্মিকের হাতে কুকুরের মতো মরার চেয়ে রামের পবিত্র বাণে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া অনেক বেশি গৌরবের। অন্তত মৃত্যুর পর মুক্ত হওয়া যাবে। তিনি স্থির কণ্ঠে বললেন, "বলুন, কী করতে হবে আমাকে?"

রাবণ বুনে চললেন এক বিষাক্ত ছক—"তুমি এক মায়াবী স্বর্ণমৃগ রূপ ধারণ করো। মণিমুক্তো খচিত যার গায়ের রোম আর শিং সীতার মন ভুলিয়ে দেবে। সীতা যখন সেই মৃগ পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হবেন, তখন রাম ছুটবেন তোমার পিছু। আর লক্ষ্মণকে ছাড়া রাম যখন দূরে চলে যাবেন, আমি সীতাকে হরণ করে নিয়ে যাব লঙ্কায়। প্রিয়া-বিয়োগের যন্ত্রণায় রাম নিজেই প্রাণ বিসর্জন দেবে।"

অগত্যা মারীচ সঙ্গী হলেন রাবণের। পঞ্চবটীর কাছে এসে মারীচ ধারণ করলেন এক অপরূপ রত্নখচিত সোনার হরিণের রূপ। সে রূপ যেন বনের সব সৌন্দর্যকে হার মানায়! বিধির বিধান বড়ই অদ্ভুত—সেই মোহময় রূপে মুগ্ধ হলেন স্বয়ং সাধ্বী জানকী। তিনি আকুল হয়ে রামকে অনুরোধ করলেন হরিণটি ধরে এনে দিতে। রাম লক্ষ্মণকে সীতার পাহারায় মোতায়েন করে, হাতে ধনুর্বাণ নিয়ে ছুটলেন মৃগের পিছু পিছু।

মৃগবেশী মারীচ কখনো চোখে পড়ে, কখনো আড়ালে গিয়ে রামকে কুটিরের থেকে বহুদূরে গভীর অরণ্যে টেনে নিয়ে গেল। রামের আর বুঝতে বাকি রইল না—এ এক ছলনা, এক মায়াজাল। তিনি তক্ষণি লক্ষ্যভেদী বাণ ছুড়লেন। বাণ বুক চিরে যেতেই মারীচ শেষ চালটি চালল—রামের হুবহু কণ্ঠস্বর নকল করে আর্তনাদ করে উঠল, "হায় সীতা! হায় লক্ষ্মণ!"

বাতাসে ভেসে আসা সেই করুণ চিৎকার সীতার বুকে তীরের মতো বিঁধল। তিনি আশঙ্কায় শিউরে উঠে লক্ষ্মণকে বললেন এখনই রামের খোঁজে যেতে। লক্ষ্মণ শান্ত স্বরে বোঝাতে চাইলেন, "মা, স্থির হোন। ত্রিলোকের কারো সাধ্য নেই ভগবান রামের ক্ষতি করার। এ রাক্ষসদের ছলনা।" কিন্তু প্রিয়া-চিন্তায় আচ্ছন্ন সীতার বোধবুদ্ধি তখন চরম উদ্বেগে আচ্ছন্ন। তিনি লক্ষ্মণকে কঠোর, নির্মম ভাষায় ভর্ৎসনা করলেন, এমনকি তাঁর চরিত্রের ওপরও সন্দেহ প্রকাশ করলেন। রামের অনুগত ও পরম সদাচারী লক্ষ্মণ সেই বাক্যাঘাতে চরম আঘাত পেলেন। দু’কানে হাত চাপা দিয়ে, অশ্রুসজল চোখে তিনি দণ্ডকারণ্যের গভীরে রামের পদচিহ্ন ধরে হাঁটতে লাগলেন।

আশ্রম তখন একদম অরক্ষিত। ঠিক এই সুযোগেই পরিব্রাজক সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে এসে হাজির হলেন লঙ্কাপতি রাবণ। অতিথি ভেবে ধর্মপরায়ণা সীতা যখন ফলমূল নিয়ে এগিয়ে এলেন, রাবণ তাঁর ছদ্মবেশ খুলে ফেললেন। দম্ভে ফেটে পড়ে বললেন, "সীতা, আমি লঙ্কাপতি রাবণ! এই কাঙাল রামের মায়া ছেড়ে আমার সঙ্গে চলো। সমুদ্রবেষ্টিত স্বর্ণলঙ্কায় আমার পত্নী হয়ে রাজত্ব করো।"

সীতা শিউরে উঠলেন, দুই হাতে কান চেপে তীব্র ধিক্কার দিয়ে বললেন, "এমন পাপ কথা মুখে এনো না!" কিন্তু শক্তিমান রাবণ জোরপূর্বক সীতাকে রথে তুলে মেঘের পথ ধরে লঙ্কার দিকে উড়ে চললেন।

এদিকে অরণ্যের গভীরে মৃগ বধ করে ফেরার পথে রামের দেখা হলো লক্ষ্মণের সঙ্গে। রাম ব্যাকুল হয়ে উঠলেন, "লক্ষ্মণ, ওই ভয়ংকর অরণ্যে জানকীকে একা রেখে তুমি এখানে কী করছ?" লক্ষ্মণ যখন সীতার ভর্ৎসনা আর মর্মভেদী কথার কথা জানালেন, রামের বুক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। দু’জনে ছুটে ফিরে চললেন আশ্রমের দিকে।

পথেই চোখে পড়ল এক বীভৎস দৃশ্য। পর্বতের মতো বিশাল এক জটায়ু রক্তাক্ত অবস্থায় অর্ধমৃত হয়ে পড়ে আছে, তার দুটো ডানাই কেটে ফেলা হয়েছে। জটায়ু কষ্ট করে বললেন, "আমি রাজা দশরথের বন্ধু জটায়ু। সীতাকে উদ্ধার করতে গিয়ে রাবণের তরবারিতে আমার এই দশা হয়েছে।"

রাম অধীর হয়ে শুধালেন, "রাবণ কোন দিকে গেছে?" জটায়ুর আর কথা বলার শক্তি ছিল না; তিনি শুধু দক্ষিণ দিকে নিজের মাথাটি একটু হেলিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। পরম সুহৃদ পিতৃতুল্য জটায়ুর এই আত্মত্যাগে রাম ও লক্ষ্মণের চোখ জলে ভেসে গেল। তাঁরা যথাবিধি জটায়ুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করলেন।

তারপর আশ্রমে ফিরে গিয়ে দেখলেন—সব শূন্য, নীরব। কোনো সাড়াশব্দ নেই। সীতা অপহৃত হয়েছেন—এই পরম সত্যটা রামকে ভেঙে চুরমার করে দিল। শোকে মুহ্যমান দুই ভাই জানকীর খোঁজে দক্ষিণ দিকে যাত্রা করলেন।

কিছুদূর যাওয়ার পর বনের পশুরা ভয়ে পালাতে শুরু করল। সামনে এসে দাঁড়াল মেঘের মতো কালো, বিশাল এক রাক্ষস—কবন্ধ। বিকট তার আকৃতি। হঠাৎ তার বিশাল লম্বা হাত বাড়িয়ে সে লক্ষ্মণকে চেপে ধরল। লক্ষ্মণ আর্তনাদ করে উঠতেই রাম ধৈর্য ধরে বললেন, "ভয় পেয়ো না ভাই, আমি আছি।"

এক মুহূর্তের মধ্যে রাম ও লক্ষ্মণের তীক্ষ্ণ তরবারি কবন্ধের দুই হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিল। ধড়ফড় করে মাটিতে লুটিয়ে প্রাণ ত্যাগ করল সেই রাক্ষস। আর তখনই কবন্ধের অভিশপ্ত দেহ থেকে বেরিয়ে এলেন এক সূর্যসম তেজস্বী দিব্য পুরুষ!

রাম প্রশ্ন করলেন, "কে তুমি?"

তিনি প্রণাম জানিয়ে বললেন, "ভগবান, আমি বিশ্বাবসু নামে এক গন্ধর্ব। এক ব্রাহ্মণের শাপে রাক্ষস হয়েছিলাম, আজ আপনার অস্ত্রের স্পর্শে মুক্ত হলাম।

বি:দ্র: বিশ্বাবসু আর ব্রাহ্মণের অভিশাপের গল্প জানতে এখানে ক্লিক করুন। 

 শুনুন রাম, সীতাকে লঙ্কায় নিয়ে গেছে রাবণ। আপনি এখান থেকে পম্পা সরোবরের দিকে যান, সেখানে ঋষ্যমূক পর্বতে বাস করেন বানররাজ বালীর ভাই সুগ্রীব। তাঁর শরণাপন্ন হোন। সুগ্রীবের সাহায্যে আপনি জানকীকে উদ্ধার করতে পারবেন। আমি দেখতে পাচ্ছি, আপনার সঙ্গে জানকীর মিলন নিশ্চিত।"

এই কথা বলে সেই আলোর রূপ আকাশে মিলিয়ে গেল। ঘন দণ্ডকারণ্যের চিরন্তন অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে রাম আর লক্ষ্মণ পরম এক আশার রেখা দেখতে পেলেন।

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের   ৫৯তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বনপর্বের ৫৮তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির  প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ