Posts

ময়া-দানবের সভা এবং মহর্ষির বার্তা

Image
  ময়া-দানবের সভা এবং মহর্ষির বার্তা ইন্দ্রপ্রস্থের সেই রাজসভা যেন কোনো মর্ত্যের সৃষ্টি নয়, বরং স্বর্গ থেকে নেমে আসা এক মায়া। মহাস্থপতি ময়া-দানব যখন এটি নির্মাণ করেছিলেন, তিনি বোধহয় তাঁর সমস্ত জাদুকরী প্রতিভা ঢেলে দিয়েছিলেন এই প্রাসাদে। স্ফটিকের মেঝেগুলো এতই স্বচ্ছ যে মনে হয় শান্ত সরোবর; আবার আসল জলাধারগুলো এমন পালিশ করা মার্বেলের মতো দেখায় যে ভ্রম হয়। মণিমুক্তো খচিত স্তম্ভগুলোর উজ্জ্বলতায় প্রদীপের আলো ছাড়াই গোটা কক্ষটি সর্বদা উদ্ভাসিত হয়ে থাকত। রাজা, ঋষি কিংবা দূরদেশ থেকে আসা বীর যোদ্ধারা যখন সেই সভায় প্রবেশ করতেন, বিস্ময়ে তাঁদের বাক্য সরে যেত না। এমনই এক শান্ত ও দীপ্তিময় দুপুরে সেখানে পদার্পণ করলেন দেবর্ষি নারদ। পাঁচ পাণ্ডব তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে পরম শ্রদ্ধায় অভ্যর্থনা জানালেন। যুধিষ্ঠির নিজে ঋষির চরণ প্রক্ষালন করে তাঁকে উপযুক্ত আসনে বসালেন। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর, বিনয়ে অবনত হয়ে যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করলেন— "হে বরেণ্য মহর্ষি, আপনি ত্রিলোকচারী। দেবলোক থেকে শুরু করে ঋষি ও রাজাদের সমস্ত সভা আপনার দেখা। সত্যি করে বলুন তো প্রভু, আমাদের এই সভার মতো ঐশ্বর্য আর কোথাও কি আছে? আপনার চোখ...

মায়া-দানবের মায়াসভা: ইন্দ্রপ্রস্থের সেই অপার্থিব ঐশ্বর্য ও নারদের রাজধর্ম

Image
  মায়া-দানবের মায়াসভা: ইন্দ্রপ্রস্থের সেই অপার্থিব ঐশ্বর্য ও নারদের রাজধর্ম ইন্দ্রপ্রস্থে দিনগুলো বেশ কাটছিল, কিন্তু সময়ের অমোঘ নিয়মে বিদায়ের সুর বাজল। শ্রীকৃষ্ণ স্থির করলেন এবার তাঁকে দ্বারকায় ফিরতে হবে। অর্জুনের মনটা বড় বিষণ্ণ হয়ে উঠল। কৃষ্ণের সান্নিধ্য মানেই তো এক বুক আত্মবিশ্বাস আর অনাবিল আনন্দ। যাওয়ার বেলায় কৃষ্ণ হাসিমুখে আশ্বস্ত করলেন, "পার্থ, যখনই আমায় স্মরণ করবে, আমি তোমার পাশেই থাকব।" পরম মমতায় সবাইকে বিদায় জানিয়ে তিনি দ্বারকার পথে রওয়ানা হলেন। কৃষ্ণ চলে যাওয়ার কিছুকাল পরেই অর্জুনের সামনে এসে দাঁড়ালেন ময় দানব। খাণ্ডবদাহনের সেই ভয়ঙ্কর অগ্নিকাণ্ড থেকে অর্জুনই তাঁর প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন, সেই কৃতজ্ঞতা ময় ভোলেননি। তিনি চাইলেন পান্ডবদের জন্য বিশেষ কিছু করতে। ময় বিনম্র স্বরে বললেন, "হে মহাবীর, আমি মৈনাক পর্বতের দিকে যাত্রা করতে চাই। সেখানে বিন্দুসর হ্রদের কাছে এককালে দানবরাজ বৃষপর্বার রত্নভাণ্ডার লুকিয়ে রেখেছিলাম। যদি সেগুলো আজও অবিকৃত থাকে, তবে আমি তা আপনার জন্য নিয়ে আসব। সেখানে ভীমের জন্য এক অজেয় গদা আর আপনার জন্য 'দেবদত্ত' নামক এক দিব্য শঙ্খও রক্ষিত আছে।"...

মায়াসভা ও মাধবের প্রত্যাবর্তন: এক অলৌকিক সৃষ্টির সূচনা ও বিরহী বিদায়গীতি

Image
  মহাভারতের সভা পর্বের শুরু  সনাতন ধর্মে কোনো পবিত্র শাস্ত্র (যেমন মহাভারত বা শ্রীমদ্ভাগবত) পাঠ করার আগে নিচের এই মঙ্গলচরণটি পাঠ করা হয় যাতে পাঠ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় এবং জ্ঞান লাভ করা যায়। শ্লোক: নারায়ণং নমস্কৃত্য নরং চৈব নরোত্তমম্ । দেবীং সরস্বতীং ব্যাসং ততো জয়মুদীরয়েৎ ॥ বঙ্গানুবাদ: নারায়ণ, নরোত্তম নর (অর্জুন বা ঋষি নর), দেবী সরস্বতী এবং মহর্ষি ব্যাসদেবকে নমস্কার জানিয়ে তারপর 'জয়' (মহাভারত বা শাস্ত্র পাঠ) উচ্চারণ করা উচিত। শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা  নারায়ণং নমস্কৃত্য: ভগবান শ্রীনারায়ণকে প্রণাম জানিয়ে।  নরং চৈব নরোত্তমম্: মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যিনি অর্থাৎ 'নর' (ভগবানের অবতার বিশেষ বা অর্জুন)।  দেবীং সরস্বতীং: বিদ্যার দেবী মা সরস্বতীকে।  ব্যাসং: এই শাস্ত্রের রচয়িতা মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেবকে।  ততো জয়মুদীরয়েৎ: তারপর 'জয়' নামক গ্রন্থ (মহাভারত, পুরাণ বা ভাগবত) পাঠ শুরু করা কর্তব্য। মায়াসভা ও মাধবের প্রত্যাবর্তন: এক অলৌকিক সৃষ্টির সূচনা ও বিরহী বিদায়গীতি খাণ্ডবদহনের সেই লেলিহান শিখা তখন স্তিমিত হয়ে এসেছে। অরণ্যের দাহনশেষে চারপাশ এক গভীর নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্...

খাণ্ডব দহন: এক বিধ্বংসী নবনির্মাণ

Image
  খাণ্ডব দহন: এক বিধ্বংসী নবনির্মাণ পাণ্ডবরা ফিরে আসায় ইন্দ্রপ্রস্থের সাধারণ মানুষের মনে যেন উৎসবের রঙ লেগেছে। চারদিকে এক স্বস্তির নিঃশ্বাস। কিন্তু অর্জুন আর শ্রীকৃষ্ণের মন তখন অন্য কোথাও। একদিন যুধিষ্ঠিরের অনুমতি নিয়ে তাঁরা দুজনে মিলে যমুনার তীরে গেলেন একটু নিভৃত সময়ের খোঁজে। বহমান নদীর শীতল হাওয়ায় দুজনে গল্পে মগ্ন, ঠিক তখনই সেখানে এক অদ্ভুত তেজস্বী ব্রাহ্মণের আবির্ভাব হলো। সেই ব্রাহ্মণের গায়ের রঙ যেন তপ্ত কাঞ্চন, মাথায় জটা আর মুখভর্তি দাড়ি। এক আশ্চর্য দীপ্তি ঠিকরে বেরোচ্ছে তাঁর শরীর থেকে। তিনি সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং মেঘমন্দ্র স্বরে বললেন, "তোমরা মহাবীর। আমি সর্বভুক, আজ তোমাদের কাছে এসেছি আমার ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে। ওই খাণ্ডব বনই আমার আহার।" শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন বিস্ময় গোপন করে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি কে? কী আহার আপনার কাম্য? আদেশ করুন, আমরা তা পূর্ণ করব।" ব্রাহ্মণ তখন তাঁর আসল রূপ প্রকাশ করলেন। তিনি অগ্নিদেব। তিনি বললেন, "আমি সাধারণ অন্ন চাই না। আমি এই খাণ্ডব বন দহন করতে চাই। এর আগে বহুবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেখানে সপরিবারে তক্ষক নাগ বাস করে। আ...

রৈবতক উৎসব ও সুভদ্রা হরণ

Image
  রৈবতক উৎসব ও সুভদ্রা হরণ সে এক এলাহি কাণ্ড! রৈবতক পাহাড়জুড়ে তখন উৎসবের মহড়া। বৃষ্ণি, ভোজ আর অন্ধক বংশের মানুষেরা মেতে উঠেছেন আনন্দ-উৎসবে। যদু বংশের তরুণরা—অক্রুর, সারণ, গদ, বভ্রু, নিষঠ, উদ্ধব—সবাই সেজেগুজে স্ত্রী-পরিজন নিয়ে শামিল হয়েছেন সেই মহোৎসবে। চারদিকে গান, নাচ আর হাসির হিল্লোল। দান-ধ্যানেরও কমতি নেই; ব্রাহ্মণদের ঝুলি উপচে পড়ছে বহুমূল্য রত্ন আর অলঙ্কারে। সেই ভিড়ের মধ্যেই ছিলেন কৃষ্ণ আর তাঁর সখা অর্জুন। ঠিক তখনই অর্জুনের নজরে পড়লেন কৃষ্ণের সহোদরা সুভদ্রা। সুভদ্রার সেই রূপ দেখে অর্জুন যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলেন। তাঁর চোখের পলক পড়ছে না। অর্জুনের মনের অন্দরে কী ঝড় বইছে, তা অন্তর্যামী কৃষ্ণের বুঝতে বাকি রইল না। কৃষ্ণ স্মিত হেসে বললেন, "সখা, ক্ষত্রিয়ের ধর্মে স্বয়ংবর সভার রীতি আছে বটে, কিন্তু সেখানে মেয়েটি তোমাকে বেছে নেবেই—এমন নিশ্চয়তা কোথায়? প্রত্যেকের তো নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ থাকে। তার চেয়ে ক্ষত্রিয়ের বীরধর্ম পালন করো। বলপূর্বক হরণ করে বিবাহ করাটাও তো আমাদের শাস্ত্রসম্মত। আমার মনে হয়, তোমার জন্য সেটাই শ্রেয় হবে।" অর্জুন আর কৃষ্ণ পরামর্শ করে যুধিষ্ঠিরের কাছে দূত পাঠাল...

মহাপ্রস্থানের পথে অর্জুন: এক প্রতিশ্রুতির আখ্যান

Image
  মহাপ্রস্থানের পথে অর্জুন: এক প্রতিশ্রুতির আখ্যান নারদের পরামর্শে পাণ্ডবরা এক কঠিন নিয়মে নিজেদের বেঁধেছিলেন। দ্রৌপদীর সঙ্গে নিভৃতবাসের সময় যদি কোনো ভ্রাতা অন্য ভ্রাতার কক্ষে প্রবেশ করেন, তবে তাকে বারো বছরের ব্রহ্মচর্য ও বনবাস গ্রহণ করতে হবে। ইন্দ্রপ্রস্থের রাজপ্রাসাদে দিনগুলো বেশ সুশৃঙ্খলভাবেই কাটছিল। কিন্তু নিয়তি যার নাম, সে তো অতর্কিতেই হানা দেয়। একদিন এক আর্ত ব্রাহ্মণ এসে উপস্থিত হলেন অর্জুনের দ্বারে। দস্যুরা তাঁর গোধন হরণ করে নিয়ে গেছে। ক্ষত্রিয়ের পরম ধর্ম আর্তের ত্রাণ করা, অথচ অর্জুনের গাণ্ডীব তখন যুধিষ্ঠির ও দ্রৌপদীর শয়নকক্ষে। অর্জুন দ্বিধায় পড়লেন—একদিকে কুলধর্মের নিয়মভঙ্গ, অন্যদিকে শরণাগতের রক্ষা। মুহূর্তকাল ভেবে তিনি স্থির করলেন, একজন ব্রাহ্মণের চোখের জলের চেয়ে নিজের বারো বছরের নির্বাসন অনেক তুচ্ছ। নিঃশব্দে কক্ষে প্রবেশ করে অস্ত্র তুলে নিলেন তিনি। ঝড়ের গতিতে দস্যুদের অনুসরণ করে উদ্ধার করে আনলেন হরণ করা গরু। ফিরে এসে যুধিষ্ঠিরের চরণে প্রণাম করে অর্জুন অবিচল কণ্ঠে বললেন, "অগ্রজ, আমি নিয়ম ভঙ্গ করেছি। আমাকে দণ্ড গ্রহণ করতে দিন।" যুধিষ্ঠির বহু অনুনয় করলেন, বললেন আপৎকালে...

নির্বাসন শেষে অধিকার: খাণ্ডবপ্রস্থের রুক্ষ মাটি থেকে ইন্দ্রপ্রস্থের উত্থান

Image
  নির্বাসন শেষে অধিকার: খাণ্ডবপ্রস্থের রুক্ষ মাটি থেকে ইন্দ্রপ্রস্থের উত্থান ফিরে আসা এবং এক নতুন আরম্ভ।পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের রাজসভায় যখন বিদুর পদার্পণ করলেন, তখন চারদিকে এক থমথমে অথচ রাজকীয় গাম্ভীর্য। পাণ্ডবদের বেঁচে থাকার খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে হস্তিনাপুরে। বিদুর এসেছেন ধৃতরাষ্ট্রের দূত হয়ে। সৌজন্য আর উপঢৌকনের আড়ালে আসল উদ্দেশ্যটি কিন্তু কারোরই অজানা ছিল না। বিদুর শান্ত গলায় বললেন, "মহারাজ দ্রুপদ, কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র এই বৈবাহিক সন্ধিতে পরম প্রীত। তিনি চান পাণ্ডবরা এখন তাঁদের কুলবধূ দ্রৌপদী এবং মাতা কুন্তীকে নিয়ে আপন আলয়ে প্রত্যাবর্তন করুক।" দ্রুপদ কোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিলেন না। তিনি তাকালেন পাণ্ডবদের দিকে। যুধিষ্ঠির হাত জোড় করে বিনয়ের সঙ্গে বললেন, "মহারাজ, আমরা এখন আপনার আশ্রিত। আপনার নির্দেশই আমাদের শিরোধার্য।" সেই ভরা সভায় কৃষ্ণের উপস্থিতি ছিল এক অলৌকিক জ্যোতির মতো। তাঁর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই রহস্যময় স্মিত হাসি। কৃষ্ণ ধীরস্বরে বললেন, "পাণ্ডবদের এখন হস্তিনাপুরে ফেরাই বিধেয়। সময় এসেছে নিজের অধিকার বুঝে নেওয়ার।" কৃষ্ণের কথার ওপর কথা বলার সাধ্য ক...

সুন্দ-উপসুন্দ ও তিলোত্তমার ছায়া ও ভ্রাতৃত্বের শপথ

Image
  সুন্দ-উপসুন্দ ও তিলোত্তমার ছায়া ও ভ্রাতৃত্বের শপথ মায়া ও নিয়ম: এক কঠিন অঙ্গীকারের উপাখ্যান খাণ্ডবপ্রস্থ এখন আর সেই পরিত্যক্ত মরুভূমি নেই, অর্জুনের গাণ্ডীব আর ময়দানবের জাদুকরী ছোঁয়ায় তা এখন ঝলমলে ইন্দ্রপ্রস্থ। পাণ্ডবরা সেখানে সুখে আছে ঠিকই, কিন্তু এক অলক্ষ্য আশঙ্কার মেঘ যুধিষ্ঠিরের মনের কোণে মাঝেমধ্যেই উঁকি দেয়। পাঁচ ভাই, অথচ জীবনসঙ্গিনী কেবল একজন—দ্রৌপদী। এই অদ্ভুত সম্পর্কের বুনন যেমন নিবিড়, তেমনই আলগা হয়ে যাওয়ার ভয়ও তো কম নয়। ঠিক এমন সময়ই একদিন ইন্দ্রপ্রস্থের রাজসভায় পদার্পণ করলেন দেবর্ষি নারদ। চিরচেনা সেই বীণা আর মুখে ‘নারায়ণ’ নাম। যুধিষ্ঠির সসম্ভ্রমে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন। যাজ্ঞসেনী দ্রৌপদীও এলেন, নতজানু হয়ে প্রণাম করলেন দেবর্ষিকে। নারদ তাঁর শান্ত দৃষ্টিতে দ্রৌপদীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, "মা, তুমি এবার ভেতরে যাও।" দ্রৌপদী নিঃশব্দে প্রস্থান করলে নারদ মুখ ফেরালেন পাণ্ডবদের দিকে। নারদ জানতেন, আবেগ দিয়ে সংসার চলে না, তার জন্য লাগে কঠিন নিয়ম। তিনি পাণ্ডবদের কাছে এক প্রাচীন আখ্যানের অবতারণা করলেন। সুন্দ আর উপসুন্দ—দুই প্রবল পরাক্রমী অসুর ভাই। তাদের মধ্যে এমন ভালোবাসা ...

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া

Image
  হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া বারাণাবতের জতুগৃহের লেলিহান শিখা পাণ্ডবদের গ্রাস করতে পারেনি—এই সংবাদ যখন দাবানলের মতো হস্তিনাপুরের প্রাসাদে আছড়ে পড়ল, তখন এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গিয়েছিল। পাণ্ডবরা জীবিত! শুধু জীবিতই নয়, অর্জুন লক্ষ্যভেদ করে দ্রুপদ-কন্যা দ্রৌপদীকে জয় করেছেন এবং পাঞ্চালরাজ এখন তাঁদের পরম মিত্র। ধৃতরাষ্ট্রের সভার গাম্ভীর্যের তলায় তখন এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের পূর্বাভাস। দুর্যোধন তখন নিজের কক্ষের আসবাবপত্র চুরমার করছেন। তাঁর ক্রোধ পাণ্ডবদের বেঁচে থাকার সংবাদে যত না, তার চেয়ে বেশি তাঁদের উত্তরোত্তর বৃদ্ধিতে। পাঞ্চালের সঙ্গে এই মৈত্রী মানেই কৌরবদের সিংহাসনের দাবি এক প্রবল সংকটের মুখে। কক্ষের ভেতরে গুমোট অন্ধকার, আর বাইরে উত্তপ্ত দ্বিপ্রহর। সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তে দুর্যোধন সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্রের সামনে। পাশে ছায়ার মতো দুঃশাসন আর চিরকালের সূর্যসম তেজে উদ্ভাসিত কর্ণ। দুর্যোধন আর্তনাদ করে উঠলেন, "পিতা, আমাদের সমস্ত পরিশ্রম, সমস্ত কৌশল কি তবে ধুলোয় মিশে যাবে? আপনি কি বুঝতে পারছেন না, কুন্তিপুত্ররা এখন আর কেবল আমাদের আত্মীয় নয়, তারা প্রবল প্রতিদ্বন্দ্ব...

নিয়তির লিখন: পাঞ্চালীর পরিণয় ও এক নতুন অধ্যা

Image
  নিয়তির লিখন: পাঞ্চালীর পরিণয় ও এক নতুন অধ্যায়"  পাঞ্চালীর পরিণয়: এক অলৌকিক নিয়তি সিদ্ধান্তটা আপাতদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক ঠেকলেও তার ভেতরে কোনো চপলতা ছিল না। বারণাবতের জতুগৃহ থেকে ফেরার পর পাণ্ডবদের জীবনে এই মুহূর্তটি ছিল সবচেয়ে জটিল। জ্ঞানবৃদ্ধরা দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে রায় দিলেন—দ্রৌপদীর এই পঞ্চভর্তৃক বিবাহ ধর্মবিরুদ্ধ নয়। বরং এর গভীরে লুকিয়ে আছে দেবাদিদেব শিবের অমোঘ বর। নিয়তি অনেক আগেই এই চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল, দ্রুপদ-কন্যা কেবল তার বাস্তবায়ন করছেন মাত্র। এমন এক সন্ধিক্ষণে স্বয়ং মহর্ষি ব্যাসদেব এসে উপস্থিত হলেন রাজা দ্রুপদের রাজসভায়। তাঁর চোখেমুখে অতীন্দ্রিয় প্রশান্তি। যুধিষ্ঠিরের দিকে চেয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে তিনি বললেন, "বৎস যুধিষ্ঠির, আজকের দিনটি অত্যন্ত শুভ। চন্দ্রে এখন পুষ্য়া নক্ষত্রের অবস্থান। লগ্ন বয়ে যাওয়ার আগে আজই বিবাহ সুসম্পন্ন হওয়া উচিত।" ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির মস্তক অবনত করে সেই আদেশ শিরোধার্য করলেন। মুহূর্তের মধ্যে পাঞ্চাল রাজপ্রাসাদে যেন এক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়ে গেল। রাজা দ্রুপদ আর ধৃষ্টদ্যুম্ন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব তদারকি করতে লাগলেন। সুগন্ধি ধূপ আর রাজকীয় আয়োজ...

দ্রৌপদীর পঞ্চপতি: নিয়তির লিখন না কি জননী কুন্তীর আজ্ঞা?

Image
দ্রৌপদীর পঞ্চপতি: নিয়তির লিখন না কি জননী কুন্তীর আজ্ঞা? পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের রাজসভা। চারদিকে এক থমথমে নিস্তব্ধতা, অথচ বাতাসের মদিরতায় কোথাও যেন এক চাপা আনন্দের রেশ। সিংহাসনে আসীন দ্রুপদ, মনে তাঁর প্রশ্নের পাহাড়, চোখে এক আশ্চর্য প্রত্যাশা। ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে যুধিষ্ঠির—শান্ত, অবিচল, হিমালয়ের মতো স্থির। মৃদু অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে যুধিষ্ঠির বললেন, "মহারাজ, আপনার দীর্ঘদিনের বাসনা পূর্ণ হয়েছে। বীর অর্জুনই আপনার জামাতা।" শুনে দ্রুপদের মুখে খেলে গেল এক অদ্ভুত তৃপ্তি। বুকের ভেতর যে সংশয়ের কাঁটাটা বিঁধে ছিল, তা এক নিমেষে উধাও। মনে মনে তো তিনি এটাই জানতেন, অর্জুন ছাড়া ওই লক্ষ্যভেদের সাধ্য আর কার! যুধিষ্ঠির এরপর একে একে শোনালেন তাঁদের জীবনের সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দিনলিপি। জতুগৃহের সেই লেলিহান শিখা থেকে তাঁদের অলৌকিক মুক্তি, ছদ্মবেশে বনে বনে ঘুরে বেড়ানো, গন্ধর্বরাজ চিত্ররথের সঙ্গে সাক্ষাৎ আর হস্তিনাপুর ছেড়ে আসার পর সেই অমানুষিক কৃচ্ছ্রসাধন। দ্রুপদ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন। পাণ্ডুপুত্রদের প্রতি এই ঘোর অন্যায়ের কথা শুনে তাঁর দুচোখ রাগে জ্বলে উঠল। কৌরবদের প্রতি তাঁর কোনোকালেই প্রীতি ছিল না, দুর্যো...

লক্ষ্যভেদ ও ললাটলিখন: ছদ্মবেশের আড়ালে পাঞ্চালরাজের স্বপ্নপূরণ

Image
লক্ষ্যভেদ ও ললাটলিখন: ছদ্মবেশের আড়ালে পাঞ্চালরাজের স্বপ্নপূরণ স্বয়ংবর সভার সেই তুমুল শোরগোল, অস্ত্রঝনঝনা আর রাজন্যবর্গের বিস্ময়মাখা চোখের পলক তখনও পুরোপুরি থিতিয়ে যায়নি। তার আগেই জনসমুদ্রের সেই উত্তাল ঢেউ কাটিয়ে তিনটে ছায়া নিঃশব্দে সরে এল বাইরে—অর্জুন, ভীম আর সদ্যপরিণীতা দ্রৌপদী। হারের গ্লানিতে জ্বলতে থাকা রাজাদের হতবাক করে দিয়ে তাঁরা পা বাড়ালেন কুমোরপাড়ার সেই নিভৃত কুটিরের দিকে, যেখানে ছদ্মবেশে দিন কাটছে তাঁদের পরিবারের। রাজপ্রাসাদে বসে তখন গভীর চিন্তায় মগ্ন রাজা দ্রুপদ। তাঁর মন বারবার বলছে, ওই লক্ষ্যভেদ অর্জুন ছাড়া আর কারও কর্ম নয়। দ্রৌপদীও তো সেই ব্রাহ্মণ যুবকের গলাতেই মালা দিয়েছেন। কিন্তু খটকাটা তবুও যাচ্ছে না—সত্যিই কি সে অর্জুন? পাঞ্চালরাজের মনের কোণে এক অব্যক্ত সংশয় দানা বেঁধে রইল। সত্যের সন্ধান করতে তিনি পাঠালেন পুত্র ধৃষ্টদ্যুম্নকে। ধৃষ্টদ্যুম্ন সভার শেষ থেকেই গোপনে অনুসরণ করেছিলেন ওই তিনজনকে। প্রাসাদে ফিরে পিতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন, “পিতা, বোন দ্রৌপদী কোনো সাধারণ ব্রাহ্মণের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়নি। যে যুবকটি লক্ষ্যভেদ করেছে, তার তেজ আর শৌর...

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

Image
  লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা স্বয়ম্বর সভার সেই চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা আর রাজকীয় উন্মাদনা পেছনে ফেলে অর্জুন ও ভীম যখন দ্রৌপদীকে নিয়ে ফিরলেন, তখন চারদিকে সন্ধ্যার ম্লান আলো। পাণ্ডবেরা তখন ছদ্মবেশে এক কুমোরের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। ধুলোমাখা পথ, সাধারণ ব্রাহ্মণের বেশ, কিন্তু অর্জুনের চোখে তখন এক অদ্ভুত জয়ের দীপ্তি। ঘরের দরজায় পৌঁছেই অর্জুন কৌতুকভরে মা কুন্তীকে ডেকে বললেন, "মা, দেখো আজ আমরা ভিক্ষায় কী এনেছি!" কুন্তী তখন ঘরের ভেতর, অন্যমনস্ক। সন্তানদের ফেরার প্রতীক্ষায় থাকা জননী না দেখেই উত্তর দিলেন, "যা এনেছিস, তোরা পাঁচ ভাই সমান ভাগে ভাগ করে নে।" কিন্তু বাইরে বেরিয়ে আসতেই কুন্তীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। অর্জুনের পাশে দাঁড়িয়ে এক অনিন্দ্যসুন্দরী নারী—দীপ্তিময়ী, যেন মর্ত্যে নেমে আসা কোনো দেবী। কুন্তী শিউরে উঠলেন। একি করলেন তিনি? তাঁর মুখনিসৃত বাক্য কি তবে মিথ্যে হয়ে যাবে? আর্যপুত্রদের জননী হিসেবে তাঁর কথা তো অলঙ্ঘ্য বিধান। বিষণ্ণ মনে তিনি যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বললেন, "পুত্র, আমি না জেনেই এক ঘোরতর অন্যায় করে ফেলেছি। এখন উপায় কী? আমার কথা ...

ব্রাহ্মণবেশে অর্জুনের লক্ষ্যভেদ: পাঞ্চালীর স্বয়ংবর ও এক অমোঘ পরিণতির উপাখ্যান

Image
  ব্রাহ্মণবেশে অর্জুনের লক্ষ্যভেদ: পাঞ্চালীর স্বয়ংবর ও এক অমোঘ পরিণতির উপাখ্যান পাঁচালের সেই বিশাল রাজসভা তখন থমথমে। উত্তেজনার পারদ চড়ছে, কিন্তু তার সঙ্গে মিশে আছে একরাশ হতাশা। একের পর এক দিগ্বিজয়ী বীর, দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজা আর উদ্ধত ক্ষত্রিয় যোদ্ধারা মাথা নিচু করে ফিরে গেছেন। লক্ষ্যভেদ দূরে থাক, সেই অতিভারী ধনুকটিতে গুণ পরাতেই নাভিশ্বাস উঠেছে তাঁদের। দ্রৌপদীর পাণিপ্রার্থনা যেন ক্রমশ এক দুঃসাধ্য প্রহেলিকায় পরিণত হচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ভিড়ের মধ্য থেকে উঠে দাঁড়ালেন এক দীর্ঘদেহী যুবক। পরনে মলিন পোশাক, ললাটে ব্রাহ্মণের তেজ, কিন্তু চলনে এক অদ্ভুত রাজকীয় ছন্দ। সভায় গুঞ্জন উঠল। কেউ অবজ্ঞায় হাসল, কেউ বা বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলল। রাজন্যবর্গের মধ্যে ফিসফাস শুরু হলো— "ক্ষত্রিয়রা যা পারল না, তা কি এক ভিখারি ব্রাহ্মণ পারবে?" কিন্তু প্রবীণ ব্রাহ্মণদের চোখে তখন অন্য প্রত্যাশা। তাঁদের মনে পড়ে যাচ্ছিল পরশুরামের দাপট কিংবা অগস্ত্যের সাগর শোষণের কথা। তপস্যার তেজে যে সব অসম্ভব সম্ভব হয়! সেই ছদ্মবেশী ব্রাহ্মণ আর কেউ নন, স্বয়ং অর্জুন। তিনি ধনুকটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো আ...

লক্ষ্যভেদের পথে: এক অজ্ঞাতবাসের উপাখ্যান

Image
লক্ষ্যভেদের পথে: এক অজ্ঞাতবাসের উপাখ্যান একচক্রা ছেড়ে পাঞ্চালের পথে যখন যাত্রা শুরু হলো, আকাশ তখন ধূসর। কুন্তী আর পাঁচ ভাই পা বাড়ালেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। সঙ্গে তাঁদের কুলপুরোহিত ধৌম্য। পরনে সাধারণ ব্রাহ্মণের সাজ, কাঁধে মৃগচর্ম, হাতে কমণ্ডলু—কে বলবে এঁরাই একসময় হস্তিনাপুরের রাজৈশ্বর্যে বড় হয়েছেন? তাঁদের হাঁটাচলায় একটা শান্ত দৃঢ়তা ছিল, যেন কোনো গূঢ় সংকল্প বুকের ভেতরে পাথর হয়ে বসে আছে। পথের ধারে দেখা হলো একদল ভ্রাম্যমাণ ব্রাহ্মণের সঙ্গে। তাঁদের চোখেমুখে কৌতূহল। যুধিষ্ঠিরকে দেখে তাঁরা থমকে দাঁড়ালেন। "কোত্থেকে আসা হচ্ছে আপনাদের? লক্ষ্য কি সেই পাঞ্চাল?" যুধিষ্ঠির শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন, "আমরা একচক্রা থেকে আসছি। পাঞ্চাল রাজকন্যা দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরের কথা শুনলাম, তাই কৌতূহলবশত সেদিকেই পা বাড়ানো।" ব্রাহ্মণরা হেসেই অস্থির। "তবে তো বেশ হলো! আমরাও সেদিকেই যাচ্ছি। এমন এলাহি কাণ্ড কি আর রোজ রোজ দেখা যায়? চলুন, পথটা একসাথেই কাটা যাক।" পাণ্ডবরা মিশে গেলেন সেই ভিড়ে। ভিড়ের মাঝে থেকেও তাঁরা ছিলেন নির্লিপ্ত, ঠিক যেমন করে গভীর জল বয়ে যায় তলায় তলায়। কয়েক দিন হাঁটার পর...