Posts

রৈবতক উৎসব ও সুভদ্রা হরণ

Image
  রৈবতক উৎসব ও সুভদ্রা হরণ সে এক এলাহি কাণ্ড! রৈবতক পাহাড়জুড়ে তখন উৎসবের মহড়া। বৃষ্ণি, ভোজ আর অন্ধক বংশের মানুষেরা মেতে উঠেছেন আনন্দ-উৎসবে। যদু বংশের তরুণরা—অক্রুর, সারণ, গদ, বভ্রু, নিষঠ, উদ্ধব—সবাই সেজেগুজে স্ত্রী-পরিজন নিয়ে শামিল হয়েছেন সেই মহোৎসবে। চারদিকে গান, নাচ আর হাসির হিল্লোল। দান-ধ্যানেরও কমতি নেই; ব্রাহ্মণদের ঝুলি উপচে পড়ছে বহুমূল্য রত্ন আর অলঙ্কারে। সেই ভিড়ের মধ্যেই ছিলেন কৃষ্ণ আর তাঁর সখা অর্জুন। ঠিক তখনই অর্জুনের নজরে পড়লেন কৃষ্ণের সহোদরা সুভদ্রা। সুভদ্রার সেই রূপ দেখে অর্জুন যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলেন। তাঁর চোখের পলক পড়ছে না। অর্জুনের মনের অন্দরে কী ঝড় বইছে, তা অন্তর্যামী কৃষ্ণের বুঝতে বাকি রইল না। কৃষ্ণ স্মিত হেসে বললেন, "সখা, ক্ষত্রিয়ের ধর্মে স্বয়ংবর সভার রীতি আছে বটে, কিন্তু সেখানে মেয়েটি তোমাকে বেছে নেবেই—এমন নিশ্চয়তা কোথায়? প্রত্যেকের তো নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ থাকে। তার চেয়ে ক্ষত্রিয়ের বীরধর্ম পালন করো। বলপূর্বক হরণ করে বিবাহ করাটাও তো আমাদের শাস্ত্রসম্মত। আমার মনে হয়, তোমার জন্য সেটাই শ্রেয় হবে।" অর্জুন আর কৃষ্ণ পরামর্শ করে যুধিষ্ঠিরের কাছে দূত পাঠাল...

মহাপ্রস্থানের পথে অর্জুন: এক প্রতিশ্রুতির আখ্যান

Image
  মহাপ্রস্থানের পথে অর্জুন: এক প্রতিশ্রুতির আখ্যান নারদের পরামর্শে পাণ্ডবরা এক কঠিন নিয়মে নিজেদের বেঁধেছিলেন। দ্রৌপদীর সঙ্গে নিভৃতবাসের সময় যদি কোনো ভ্রাতা অন্য ভ্রাতার কক্ষে প্রবেশ করেন, তবে তাকে বারো বছরের ব্রহ্মচর্য ও বনবাস গ্রহণ করতে হবে। ইন্দ্রপ্রস্থের রাজপ্রাসাদে দিনগুলো বেশ সুশৃঙ্খলভাবেই কাটছিল। কিন্তু নিয়তি যার নাম, সে তো অতর্কিতেই হানা দেয়। একদিন এক আর্ত ব্রাহ্মণ এসে উপস্থিত হলেন অর্জুনের দ্বারে। দস্যুরা তাঁর গোধন হরণ করে নিয়ে গেছে। ক্ষত্রিয়ের পরম ধর্ম আর্তের ত্রাণ করা, অথচ অর্জুনের গাণ্ডীব তখন যুধিষ্ঠির ও দ্রৌপদীর শয়নকক্ষে। অর্জুন দ্বিধায় পড়লেন—একদিকে কুলধর্মের নিয়মভঙ্গ, অন্যদিকে শরণাগতের রক্ষা। মুহূর্তকাল ভেবে তিনি স্থির করলেন, একজন ব্রাহ্মণের চোখের জলের চেয়ে নিজের বারো বছরের নির্বাসন অনেক তুচ্ছ। নিঃশব্দে কক্ষে প্রবেশ করে অস্ত্র তুলে নিলেন তিনি। ঝড়ের গতিতে দস্যুদের অনুসরণ করে উদ্ধার করে আনলেন হরণ করা গরু। ফিরে এসে যুধিষ্ঠিরের চরণে প্রণাম করে অর্জুন অবিচল কণ্ঠে বললেন, "অগ্রজ, আমি নিয়ম ভঙ্গ করেছি। আমাকে দণ্ড গ্রহণ করতে দিন।" যুধিষ্ঠির বহু অনুনয় করলেন, বললেন আপৎকালে...

নির্বাসন শেষে অধিকার: খাণ্ডবপ্রস্থের রুক্ষ মাটি থেকে ইন্দ্রপ্রস্থের উত্থান

Image
  নির্বাসন শেষে অধিকার: খাণ্ডবপ্রস্থের রুক্ষ মাটি থেকে ইন্দ্রপ্রস্থের উত্থান ফিরে আসা এবং এক নতুন আরম্ভ।পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের রাজসভায় যখন বিদুর পদার্পণ করলেন, তখন চারদিকে এক থমথমে অথচ রাজকীয় গাম্ভীর্য। পাণ্ডবদের বেঁচে থাকার খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে হস্তিনাপুরে। বিদুর এসেছেন ধৃতরাষ্ট্রের দূত হয়ে। সৌজন্য আর উপঢৌকনের আড়ালে আসল উদ্দেশ্যটি কিন্তু কারোরই অজানা ছিল না। বিদুর শান্ত গলায় বললেন, "মহারাজ দ্রুপদ, কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র এই বৈবাহিক সন্ধিতে পরম প্রীত। তিনি চান পাণ্ডবরা এখন তাঁদের কুলবধূ দ্রৌপদী এবং মাতা কুন্তীকে নিয়ে আপন আলয়ে প্রত্যাবর্তন করুক।" দ্রুপদ কোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিলেন না। তিনি তাকালেন পাণ্ডবদের দিকে। যুধিষ্ঠির হাত জোড় করে বিনয়ের সঙ্গে বললেন, "মহারাজ, আমরা এখন আপনার আশ্রিত। আপনার নির্দেশই আমাদের শিরোধার্য।" সেই ভরা সভায় কৃষ্ণের উপস্থিতি ছিল এক অলৌকিক জ্যোতির মতো। তাঁর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই রহস্যময় স্মিত হাসি। কৃষ্ণ ধীরস্বরে বললেন, "পাণ্ডবদের এখন হস্তিনাপুরে ফেরাই বিধেয়। সময় এসেছে নিজের অধিকার বুঝে নেওয়ার।" কৃষ্ণের কথার ওপর কথা বলার সাধ্য ক...

সুন্দ-উপসুন্দ ও তিলোত্তমার ছায়া ও ভ্রাতৃত্বের শপথ

Image
  সুন্দ-উপসুন্দ ও তিলোত্তমার ছায়া ও ভ্রাতৃত্বের শপথ মায়া ও নিয়ম: এক কঠিন অঙ্গীকারের উপাখ্যান খাণ্ডবপ্রস্থ এখন আর সেই পরিত্যক্ত মরুভূমি নেই, অর্জুনের গাণ্ডীব আর ময়দানবের জাদুকরী ছোঁয়ায় তা এখন ঝলমলে ইন্দ্রপ্রস্থ। পাণ্ডবরা সেখানে সুখে আছে ঠিকই, কিন্তু এক অলক্ষ্য আশঙ্কার মেঘ যুধিষ্ঠিরের মনের কোণে মাঝেমধ্যেই উঁকি দেয়। পাঁচ ভাই, অথচ জীবনসঙ্গিনী কেবল একজন—দ্রৌপদী। এই অদ্ভুত সম্পর্কের বুনন যেমন নিবিড়, তেমনই আলগা হয়ে যাওয়ার ভয়ও তো কম নয়। ঠিক এমন সময়ই একদিন ইন্দ্রপ্রস্থের রাজসভায় পদার্পণ করলেন দেবর্ষি নারদ। চিরচেনা সেই বীণা আর মুখে ‘নারায়ণ’ নাম। যুধিষ্ঠির সসম্ভ্রমে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন। যাজ্ঞসেনী দ্রৌপদীও এলেন, নতজানু হয়ে প্রণাম করলেন দেবর্ষিকে। নারদ তাঁর শান্ত দৃষ্টিতে দ্রৌপদীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, "মা, তুমি এবার ভেতরে যাও।" দ্রৌপদী নিঃশব্দে প্রস্থান করলে নারদ মুখ ফেরালেন পাণ্ডবদের দিকে। নারদ জানতেন, আবেগ দিয়ে সংসার চলে না, তার জন্য লাগে কঠিন নিয়ম। তিনি পাণ্ডবদের কাছে এক প্রাচীন আখ্যানের অবতারণা করলেন। সুন্দ আর উপসুন্দ—দুই প্রবল পরাক্রমী অসুর ভাই। তাদের মধ্যে এমন ভালোবাসা ...

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া

Image
  হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া বারাণাবতের জতুগৃহের লেলিহান শিখা পাণ্ডবদের গ্রাস করতে পারেনি—এই সংবাদ যখন দাবানলের মতো হস্তিনাপুরের প্রাসাদে আছড়ে পড়ল, তখন এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গিয়েছিল। পাণ্ডবরা জীবিত! শুধু জীবিতই নয়, অর্জুন লক্ষ্যভেদ করে দ্রুপদ-কন্যা দ্রৌপদীকে জয় করেছেন এবং পাঞ্চালরাজ এখন তাঁদের পরম মিত্র। ধৃতরাষ্ট্রের সভার গাম্ভীর্যের তলায় তখন এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের পূর্বাভাস। দুর্যোধন তখন নিজের কক্ষের আসবাবপত্র চুরমার করছেন। তাঁর ক্রোধ পাণ্ডবদের বেঁচে থাকার সংবাদে যত না, তার চেয়ে বেশি তাঁদের উত্তরোত্তর বৃদ্ধিতে। পাঞ্চালের সঙ্গে এই মৈত্রী মানেই কৌরবদের সিংহাসনের দাবি এক প্রবল সংকটের মুখে। কক্ষের ভেতরে গুমোট অন্ধকার, আর বাইরে উত্তপ্ত দ্বিপ্রহর। সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তে দুর্যোধন সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্রের সামনে। পাশে ছায়ার মতো দুঃশাসন আর চিরকালের সূর্যসম তেজে উদ্ভাসিত কর্ণ। দুর্যোধন আর্তনাদ করে উঠলেন, "পিতা, আমাদের সমস্ত পরিশ্রম, সমস্ত কৌশল কি তবে ধুলোয় মিশে যাবে? আপনি কি বুঝতে পারছেন না, কুন্তিপুত্ররা এখন আর কেবল আমাদের আত্মীয় নয়, তারা প্রবল প্রতিদ্বন্দ্ব...

নিয়তির লিখন: পাঞ্চালীর পরিণয় ও এক নতুন অধ্যা

Image
  নিয়তির লিখন: পাঞ্চালীর পরিণয় ও এক নতুন অধ্যায়"  পাঞ্চালীর পরিণয়: এক অলৌকিক নিয়তি সিদ্ধান্তটা আপাতদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক ঠেকলেও তার ভেতরে কোনো চপলতা ছিল না। বারণাবতের জতুগৃহ থেকে ফেরার পর পাণ্ডবদের জীবনে এই মুহূর্তটি ছিল সবচেয়ে জটিল। জ্ঞানবৃদ্ধরা দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে রায় দিলেন—দ্রৌপদীর এই পঞ্চভর্তৃক বিবাহ ধর্মবিরুদ্ধ নয়। বরং এর গভীরে লুকিয়ে আছে দেবাদিদেব শিবের অমোঘ বর। নিয়তি অনেক আগেই এই চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল, দ্রুপদ-কন্যা কেবল তার বাস্তবায়ন করছেন মাত্র। এমন এক সন্ধিক্ষণে স্বয়ং মহর্ষি ব্যাসদেব এসে উপস্থিত হলেন রাজা দ্রুপদের রাজসভায়। তাঁর চোখেমুখে অতীন্দ্রিয় প্রশান্তি। যুধিষ্ঠিরের দিকে চেয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে তিনি বললেন, "বৎস যুধিষ্ঠির, আজকের দিনটি অত্যন্ত শুভ। চন্দ্রে এখন পুষ্য়া নক্ষত্রের অবস্থান। লগ্ন বয়ে যাওয়ার আগে আজই বিবাহ সুসম্পন্ন হওয়া উচিত।" ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির মস্তক অবনত করে সেই আদেশ শিরোধার্য করলেন। মুহূর্তের মধ্যে পাঞ্চাল রাজপ্রাসাদে যেন এক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়ে গেল। রাজা দ্রুপদ আর ধৃষ্টদ্যুম্ন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব তদারকি করতে লাগলেন। সুগন্ধি ধূপ আর রাজকীয় আয়োজ...

দ্রৌপদীর পঞ্চপতি: নিয়তির লিখন না কি জননী কুন্তীর আজ্ঞা?

Image
দ্রৌপদীর পঞ্চপতি: নিয়তির লিখন না কি জননী কুন্তীর আজ্ঞা? পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের রাজসভা। চারদিকে এক থমথমে নিস্তব্ধতা, অথচ বাতাসের মদিরতায় কোথাও যেন এক চাপা আনন্দের রেশ। সিংহাসনে আসীন দ্রুপদ, মনে তাঁর প্রশ্নের পাহাড়, চোখে এক আশ্চর্য প্রত্যাশা। ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে যুধিষ্ঠির—শান্ত, অবিচল, হিমালয়ের মতো স্থির। মৃদু অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে যুধিষ্ঠির বললেন, "মহারাজ, আপনার দীর্ঘদিনের বাসনা পূর্ণ হয়েছে। বীর অর্জুনই আপনার জামাতা।" শুনে দ্রুপদের মুখে খেলে গেল এক অদ্ভুত তৃপ্তি। বুকের ভেতর যে সংশয়ের কাঁটাটা বিঁধে ছিল, তা এক নিমেষে উধাও। মনে মনে তো তিনি এটাই জানতেন, অর্জুন ছাড়া ওই লক্ষ্যভেদের সাধ্য আর কার! যুধিষ্ঠির এরপর একে একে শোনালেন তাঁদের জীবনের সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দিনলিপি। জতুগৃহের সেই লেলিহান শিখা থেকে তাঁদের অলৌকিক মুক্তি, ছদ্মবেশে বনে বনে ঘুরে বেড়ানো, গন্ধর্বরাজ চিত্ররথের সঙ্গে সাক্ষাৎ আর হস্তিনাপুর ছেড়ে আসার পর সেই অমানুষিক কৃচ্ছ্রসাধন। দ্রুপদ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন। পাণ্ডুপুত্রদের প্রতি এই ঘোর অন্যায়ের কথা শুনে তাঁর দুচোখ রাগে জ্বলে উঠল। কৌরবদের প্রতি তাঁর কোনোকালেই প্রীতি ছিল না, দুর্যো...

লক্ষ্যভেদ ও ললাটলিখন: ছদ্মবেশের আড়ালে পাঞ্চালরাজের স্বপ্নপূরণ

Image
লক্ষ্যভেদ ও ললাটলিখন: ছদ্মবেশের আড়ালে পাঞ্চালরাজের স্বপ্নপূরণ স্বয়ংবর সভার সেই তুমুল শোরগোল, অস্ত্রঝনঝনা আর রাজন্যবর্গের বিস্ময়মাখা চোখের পলক তখনও পুরোপুরি থিতিয়ে যায়নি। তার আগেই জনসমুদ্রের সেই উত্তাল ঢেউ কাটিয়ে তিনটে ছায়া নিঃশব্দে সরে এল বাইরে—অর্জুন, ভীম আর সদ্যপরিণীতা দ্রৌপদী। হারের গ্লানিতে জ্বলতে থাকা রাজাদের হতবাক করে দিয়ে তাঁরা পা বাড়ালেন কুমোরপাড়ার সেই নিভৃত কুটিরের দিকে, যেখানে ছদ্মবেশে দিন কাটছে তাঁদের পরিবারের। রাজপ্রাসাদে বসে তখন গভীর চিন্তায় মগ্ন রাজা দ্রুপদ। তাঁর মন বারবার বলছে, ওই লক্ষ্যভেদ অর্জুন ছাড়া আর কারও কর্ম নয়। দ্রৌপদীও তো সেই ব্রাহ্মণ যুবকের গলাতেই মালা দিয়েছেন। কিন্তু খটকাটা তবুও যাচ্ছে না—সত্যিই কি সে অর্জুন? পাঞ্চালরাজের মনের কোণে এক অব্যক্ত সংশয় দানা বেঁধে রইল। সত্যের সন্ধান করতে তিনি পাঠালেন পুত্র ধৃষ্টদ্যুম্নকে। ধৃষ্টদ্যুম্ন সভার শেষ থেকেই গোপনে অনুসরণ করেছিলেন ওই তিনজনকে। প্রাসাদে ফিরে পিতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন, “পিতা, বোন দ্রৌপদী কোনো সাধারণ ব্রাহ্মণের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়নি। যে যুবকটি লক্ষ্যভেদ করেছে, তার তেজ আর শৌর...

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

Image
  লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা স্বয়ম্বর সভার সেই চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা আর রাজকীয় উন্মাদনা পেছনে ফেলে অর্জুন ও ভীম যখন দ্রৌপদীকে নিয়ে ফিরলেন, তখন চারদিকে সন্ধ্যার ম্লান আলো। পাণ্ডবেরা তখন ছদ্মবেশে এক কুমোরের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। ধুলোমাখা পথ, সাধারণ ব্রাহ্মণের বেশ, কিন্তু অর্জুনের চোখে তখন এক অদ্ভুত জয়ের দীপ্তি। ঘরের দরজায় পৌঁছেই অর্জুন কৌতুকভরে মা কুন্তীকে ডেকে বললেন, "মা, দেখো আজ আমরা ভিক্ষায় কী এনেছি!" কুন্তী তখন ঘরের ভেতর, অন্যমনস্ক। সন্তানদের ফেরার প্রতীক্ষায় থাকা জননী না দেখেই উত্তর দিলেন, "যা এনেছিস, তোরা পাঁচ ভাই সমান ভাগে ভাগ করে নে।" কিন্তু বাইরে বেরিয়ে আসতেই কুন্তীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। অর্জুনের পাশে দাঁড়িয়ে এক অনিন্দ্যসুন্দরী নারী—দীপ্তিময়ী, যেন মর্ত্যে নেমে আসা কোনো দেবী। কুন্তী শিউরে উঠলেন। একি করলেন তিনি? তাঁর মুখনিসৃত বাক্য কি তবে মিথ্যে হয়ে যাবে? আর্যপুত্রদের জননী হিসেবে তাঁর কথা তো অলঙ্ঘ্য বিধান। বিষণ্ণ মনে তিনি যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বললেন, "পুত্র, আমি না জেনেই এক ঘোরতর অন্যায় করে ফেলেছি। এখন উপায় কী? আমার কথা ...

ব্রাহ্মণবেশে অর্জুনের লক্ষ্যভেদ: পাঞ্চালীর স্বয়ংবর ও এক অমোঘ পরিণতির উপাখ্যান

Image
  ব্রাহ্মণবেশে অর্জুনের লক্ষ্যভেদ: পাঞ্চালীর স্বয়ংবর ও এক অমোঘ পরিণতির উপাখ্যান পাঁচালের সেই বিশাল রাজসভা তখন থমথমে। উত্তেজনার পারদ চড়ছে, কিন্তু তার সঙ্গে মিশে আছে একরাশ হতাশা। একের পর এক দিগ্বিজয়ী বীর, দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজা আর উদ্ধত ক্ষত্রিয় যোদ্ধারা মাথা নিচু করে ফিরে গেছেন। লক্ষ্যভেদ দূরে থাক, সেই অতিভারী ধনুকটিতে গুণ পরাতেই নাভিশ্বাস উঠেছে তাঁদের। দ্রৌপদীর পাণিপ্রার্থনা যেন ক্রমশ এক দুঃসাধ্য প্রহেলিকায় পরিণত হচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ভিড়ের মধ্য থেকে উঠে দাঁড়ালেন এক দীর্ঘদেহী যুবক। পরনে মলিন পোশাক, ললাটে ব্রাহ্মণের তেজ, কিন্তু চলনে এক অদ্ভুত রাজকীয় ছন্দ। সভায় গুঞ্জন উঠল। কেউ অবজ্ঞায় হাসল, কেউ বা বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলল। রাজন্যবর্গের মধ্যে ফিসফাস শুরু হলো— "ক্ষত্রিয়রা যা পারল না, তা কি এক ভিখারি ব্রাহ্মণ পারবে?" কিন্তু প্রবীণ ব্রাহ্মণদের চোখে তখন অন্য প্রত্যাশা। তাঁদের মনে পড়ে যাচ্ছিল পরশুরামের দাপট কিংবা অগস্ত্যের সাগর শোষণের কথা। তপস্যার তেজে যে সব অসম্ভব সম্ভব হয়! সেই ছদ্মবেশী ব্রাহ্মণ আর কেউ নন, স্বয়ং অর্জুন। তিনি ধনুকটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো আ...

লক্ষ্যভেদের পথে: এক অজ্ঞাতবাসের উপাখ্যান

Image
লক্ষ্যভেদের পথে: এক অজ্ঞাতবাসের উপাখ্যান একচক্রা ছেড়ে পাঞ্চালের পথে যখন যাত্রা শুরু হলো, আকাশ তখন ধূসর। কুন্তী আর পাঁচ ভাই পা বাড়ালেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। সঙ্গে তাঁদের কুলপুরোহিত ধৌম্য। পরনে সাধারণ ব্রাহ্মণের সাজ, কাঁধে মৃগচর্ম, হাতে কমণ্ডলু—কে বলবে এঁরাই একসময় হস্তিনাপুরের রাজৈশ্বর্যে বড় হয়েছেন? তাঁদের হাঁটাচলায় একটা শান্ত দৃঢ়তা ছিল, যেন কোনো গূঢ় সংকল্প বুকের ভেতরে পাথর হয়ে বসে আছে। পথের ধারে দেখা হলো একদল ভ্রাম্যমাণ ব্রাহ্মণের সঙ্গে। তাঁদের চোখেমুখে কৌতূহল। যুধিষ্ঠিরকে দেখে তাঁরা থমকে দাঁড়ালেন। "কোত্থেকে আসা হচ্ছে আপনাদের? লক্ষ্য কি সেই পাঞ্চাল?" যুধিষ্ঠির শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন, "আমরা একচক্রা থেকে আসছি। পাঞ্চাল রাজকন্যা দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরের কথা শুনলাম, তাই কৌতূহলবশত সেদিকেই পা বাড়ানো।" ব্রাহ্মণরা হেসেই অস্থির। "তবে তো বেশ হলো! আমরাও সেদিকেই যাচ্ছি। এমন এলাহি কাণ্ড কি আর রোজ রোজ দেখা যায়? চলুন, পথটা একসাথেই কাটা যাক।" পাণ্ডবরা মিশে গেলেন সেই ভিড়ে। ভিড়ের মাঝে থেকেও তাঁরা ছিলেন নির্লিপ্ত, ঠিক যেমন করে গভীর জল বয়ে যায় তলায় তলায়। কয়েক দিন হাঁটার পর...

অরণ্যের আলো ও নবযাত্রার সংকল্প: পাণ্ডবদের কুলপুরোহিত বরণ

Image
  অরণ্যের আলো ও নবযাত্রার সংকল্প: পাণ্ডবদের কুলপুরোহিত বরণ গঙ্গার তীরে রাত তখন গভীর। জ্যোৎস্নার আলোয় জলরাশি রুপোলি সাপের মতো ঝিলমিল করছে, বাতাসে বুনো ফুলের এক মায়াবী সুবাস। চারপাশ নিঝুম, শুধু মাঝেমধ্যে জলের মৃদু কলতান শোনা যাচ্ছে। সেই নির্জনতায় পাণ্ডবরা গোল হয়ে বসে আছেন গন্ধর্বরাজ চিত্ররথের চারপাশে। চিত্ররথ শোনাচ্ছেন প্রাচীন ঋষিদের গল্প—সেইসব মুনি-ঋষি, যাঁদের জ্ঞান সমুদ্রের মতো গভীর, আবার ক্রোধ আগুনের মতো ভয়ংকর। সেইসব কাহিনীর ভিড়ে মহর্ষি বশিষ্ঠের কথা শুনে অর্জুনের মনে এক অদ্ভুত আলোড়ন তৈরি হলো। চিত্ররথ থামতেই অর্জুন একটু ঝুঁকে বসে বিনীত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “গন্ধর্বরাজ, একটা কথা জানতে বড় ইচ্ছে হয়। এই পৃথিবীতে পবিত্র পুরুষদের মধ্যে কে আমাদের পথপ্রদর্শক হওয়ার যোগ্য? আমরা পুরোহিতহীন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, আমাদের কোনো আধ্যাত্মিক অভিভাবক নেই। এমন কেউ কি আছেন, যাঁকে আমরা কুলপুরোহিত হিসেবে বরণ করতে পারি? যিনি আমাদের ধর্মের পথে চালিত করবেন?” চিত্ররথ যেন এই প্রশ্নটির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তাঁর শান্ত চোখে একপলক দৃষ্টি বুলিয়ে বললেন, “নিশ্চয়ই আছেন। উৎকচাক নামে এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্রে ধৌম্য নামে এ...

বশিষ্ঠ ও কল্মাষপাদ: এক আশ্চর্য ক্ষমা

Image
  বশিষ্ঠ ও কল্মাষপাদ: এক আশ্চর্য ক্ষমা বনবাসের সেই নিস্তব্ধ রাত। আগুনের শিখাগুলো কাঁপছে আর গন্ধর্বরাজ চিত্ররথ অর্জুনের দিকে তাকিয়ে একটু স্মিত হাসলেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়ছে এক গভীর অভিজ্ঞতার সুর। তিনি বলতে শুরু করলেন, "শোনো পার্থ, বশিষ্ঠের সেই গল্প শুধু কামধেনুর নয়, সে গল্পের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক পাহাড়প্রমাণ ক্ষমার ইতিহাস। সে ইতিহাস ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা কল্মাষপাদের।" রাজা কল্মাষপাদ ছিলেন বীর্যবান, কিন্তু ক্ষমতার দম্ভ মানুষের মস্তিস্কে যে বিষ ঢেলে দেয়, তাঁর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। একদিন গভীর অরণ্যে শিকারের নেশায় মত্ত রাজা এক সংকীর্ণ পথে এসে দাঁড়ালেন। উল্টো দিক থেকে আসছিলেন বশিষ্ঠের জ্যেষ্ঠ পুত্র শক্তি। রাজা চাইলেন ঋষিপুত্র তাঁকে পথ ছেড়ে দিন, কিন্তু শক্তি অটল। ক্ষিপ্ত রাজা হাতের চাবুক সপাটে বসিয়ে দিলেন ঋষিপুত্রের গায়ে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই জ্বলে উঠল শক্তির ক্রোধ—তিনি অভিশাপ দিলেন, "অহংকারে তুমি আমায় আঘাত করলে? যাও, আজ থেকে তুমি নরখাদক রাক্ষস হয়ে বনে বনে ঘুরে বেড়াবে!" বিশমিমিত্র এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি এক রাক্ষসকে পাঠালেন রাজার শরীরে ভর করার জন্য। হিতাহিত জ্ঞা...

ক্ষত্রিয় দম্ভের পরাজয় ও এক ব্রহ্মর্ষির উদয়: বশিষ্ঠ-বিশ্বামিত্রের সেই চিরকালীন সংঘাত

Image
ক্ষত্রিয় দম্ভের পরাজয় ও এক ব্রহ্মর্ষির উদয়: বশিষ্ঠ-বিশ্বামিত্রের সেই চিরকালীন সংঘাত গঙ্গার কূল ঘেঁষে রাতটা তখন মন্থর হয়ে এসেছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর জলের ছলছল শব্দে মিশে যাচ্ছিল গন্ধর্বরাজ চিত্ররথের উদাত্ত কণ্ঠস্বর। অর্জুন চুপচাপ শুনছিলেন, কিন্তু তাঁর বুকের ভেতর এক অস্থির কৌতূহল তোলপাড় করছিল। মহর্ষি বশিষ্ঠের নাম তিনি আগেও শুনেছেন, কিন্তু তাঁর শক্তির উৎস আর ব্যক্তিত্বের গাম্ভীর্য আজ যেন এক নতুন রহস্য হয়ে অর্জুনের সামনে উন্মোচিত হচ্ছিল। অর্জুন সামান্য ঝুঁকে বসলেন। তাঁর কণ্ঠে এক ধরণের ব্যাকুলতা, “চিত্ররথ, তোমার বর্ণনায় বশিষ্ঠের যে রূপ ফুটে উঠছে, তা আমাকে স্তম্ভিত করছে। কে এই মহান ঋষি? যাঁর সামনে দেবরাজ থেকে শুরু করে পরাক্রমশালী রাজারাও বিনম্র হয়ে থাকেন? এই ব্রহ্মর্ষির তেজ আর প্রভাবের উৎসটা ঠিক কোথায়? বিশ্বামিত্রের মতো দিগ্বিজয়ী সম্রাটের সাথে তাঁর সংঘাতেরই বা শুরু কীভাবে?” চিত্ররথ মৃদু হাসলেন। তাঁর চোখেমুখে এক প্রাচীন প্রজ্ঞার ছাপ। তিনি বললেন, “শোনো পার্থ, বশিষ্ঠের কাহিনী ত্রিলোকের এক পবিত্র আখ্যান। মন দিয়ে শোনো সেই ইতিহাস।” কন্যাকুব্জের প্রতাপশালী রাজা গাধি, যাঁর বীরত্বে কম্পমান ছিল আর্...

তপতীনন্দন: কুরুবংশের রক্তে বহমান সূর্যের সেই আদিম অগ্নিশিখা

Image
তপতীনন্দন: কুরুবংশের রক্তে বহমান সূর্যের সেই আদিম অগ্নিশিখা গঙ্গা বয়ে চলেছে আপন ছন্দে। কলকল ধ্বনি আর শান্ত নির্জনতা মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করেছে নদীর তীরে। গন্ধর্বরাজ চিত্ররথের সঙ্গে পাণ্ডবদের যুদ্ধ মিটেছে সামান্য আগে, কিন্তু তার রেশটুকু রয়ে গেছে বাতাসে। সেই হারানো উত্তাপ ছাপিয়ে এখন বইছে বন্ধুত্বের শীতল হাওয়া। অর্জুনের সঙ্গে চিত্ররথের আলাপ জমে উঠতে সময় লাগল না। বীরের সঙ্গে বীরের মোলাকয়াত তো এমনই হয়—চোখে চোখ পড়লেই যেন বহু জন্মের চেনা। আলাপের এক ফাঁকে চিত্ররথ বেশ সহজ স্বরেই পাণ্ডবদের সম্বোধন করলেন— ‘তপতীনন্দন’। অর্জুন থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর কপালে সূক্ষ্ম বলিরেখা। নামটা অচেনা নয়, কিন্তু এর গভীরতা তাঁর কাছে স্পষ্ট নয়। তিনি ফিরে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, "আমাদের কেন তপতীনন্দন বললে? আমরা কুন্তীর পুত্র, এ তো সারা বিশ্ব জানে। তপতী নামটা তো আমাদের কুলের পরিচয়ে সেভাবে কখনও শুনিনি।" চিত্ররথ হাসলেন। সে হাসিতে বিদ্রূপ নেই, বরং আছে এমন একজনের আত্মতৃপ্তি যার ঝুলিতে এক অজানা রহস্যের চাবিকাঠি লুকানো আছে। তিনি ইঙ্গিত করলেন বসবার জন্য। বললেন, "একটু বসো। তোমাদের বংশের শেকড়ে এমন এক নারী আ...