Posts

গরুড় ও অমৃতের সন্ধান: এক শক্তিশালী বীরের আখ্যান

Image
  গরুড় ও অমৃতের সন্ধান: এক শক্তিশালী বীরের আখ্যান- বিনতানন্দন গরুড়ের বুকের ভেতর তখন এক প্রকাণ্ড আগুন জ্বলছে। সে আগুন ক্ষুধার নয়, অপমানের। এক তুচ্ছ বাজি হেরে তাঁর মা বিনতা এখন কদ্রুর দাসী। দাসত্ব মোচনের একটাই পথ— সর্প সন্তানদের জন্য স্বর্গ থেকে নিয়ে আসতে হবে অমৃত। যাত্রার আগে মা বিনতা ছেলেকে সাবধান করেছিলেন, "সমুদ্রের মাঝখানে ওই সর্পকুলকে তুই আহার হিসেবে গ্রহণ করিস, কিন্তু খবরদার, কোনো ব্রাহ্মণকে যেন আঘাত করিস না।" একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল- আকাশপথে উড়তে উড়তে গরুড়ের জঠরে তখন তীব্র ক্ষুধার জ্বালা। হঠাৎ ক্ষুধার ঝোঁকে তিনি এমন একজনকে মুখে পুরে নিলেন, যার সংস্পর্শে তাঁর তালু আগুনের মতো জ্বলতে শুরু করল। গরুড় বুঝলেন, ভুল হয়েছে। নিজের অজান্তেই তিনি এক ব্রাহ্মণকে মুখে তুলে নিয়েছেন। তৎক্ষণাৎ তাঁকে মুক্ত করে দিয়ে গরুড় এগিয়ে চললেন। কিছুদূর এগোতেই দেখা হলো মহর্ষি কশ্যপের সঙ্গে। কশ্যপ কুশল জানতে চাইলেন। গরুড় লুকোলেন না কিছুই— মায়ের দাসত্ব, কদ্রুর চক্রান্ত আর অমৃত আহরণের কঠিন লক্ষ্যের কথা খুলে বললেন। শেষে ঈষৎ বিরক্তির সঙ্গেই জানালেন, তাঁর পেটের ক্ষুধা এখনো মেটেনি। দুই ভাইয়ের প্রতিহিংসা- কশ্যপ স্...

গরুড়ের জন্ম: বন্ধন, অসহিষ্ণুতা আর আকাশ কাঁপানো মহাবীর

Image
গরুড়ের জন্ম: বন্ধন, অসহিষ্ণুতা আর আকাশ কাঁপানো মহাবীর আদ্যিকালের কথা। সত্যযুগ। তখন পৃথিবী ছিল সত্যের শাসনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা, ধর্মের চাকা তখনো টাল খায়নি। সেই সময়ে বাস করতেন প্রজাপতির দুই কন্যা— কদ্রু আর বিনতা। সম্পর্কে তাঁরা বোন, আবার মহর্ষি কশ্যপের ঘরনিও বটে। কশ্যপ তাঁদের দুজনেই খুব ভালোবাসতেন। একদিন পরম তৃপ্তিতে ঋষি বললেন, "চাও, যা চাইবার চেয়ে নাও।" কদ্রু দেরি করলেন না। তিনি চাইলেন সহস্র শক্তিশালী পুত্র, যারা হবে এক-একজন দুর্দান্ত সর্প। বিনতা একটু ভাবলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল অন্য। তিনি চাইলেন মাত্র দুই পুত্র— কিন্তু সেই দুই পুত্র যেন শক্তিতে কদ্রুর হাজার পুত্রকে হেলায় হারিয়ে দিতে পারে। কশ্যপ তথাস্তু বলে গর্ভধারণের উপদেশ দিয়ে গভীর অরণ্যে ধ্যানে মগ্ন হলেন। কালক্রমে কদ্রু এক হাজার ডিম পাড়লেন আর বিনতা দুটি। ধাত্রীরা সেই ডিমগুলোকে অতি সযত্নে উষ্ণ পাত্রে রেখে দিলেন। কেটে গেল দীর্ঘ পাঁচশো বছর। কদ্রুর এক হাজার ডিম ফুটে বের হলো এক হাজার দীপ্তকান্তি সর্পপুত্র। কিন্তু বিনতার সেই দুই ডিম? যেন পাথরের মতো নিথর, প্রাণস্পন্দনের নামগন্ধ নেই। বিনতা অপেক্ষা করলেন, আরও অপেক্ষা করলেন। কিন্তু ধৈর্য...

সমুদ্রমন্থন: অমৃতের অধিকার ও এক চিরস্থায়ী প্রতিশোধ

Image
  সমুদ্রমন্থন: অমৃতের অধিকার ও এক চিরস্থায়ী প্রতিশোধ দেবতারা তখন শ্রীহীন, তেজহীন। মহর্ষি দুর্বাশার অভিশাপে তাঁদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। স্বর্গ তখন এক ধূসর রাজ্য, যেখানে শক্তির বদলে হাহাকার ঘুরে বেড়ায়। এই হীনবল অবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়—অমৃত। সেই অমৃত যা লুকিয়ে আছে আদিম সমুদ্রের অতল গর্ভে। কিন্তু মহাসমুদ্রের জলরাশি মন্থন করা তো একা দেবতাদের সাধ্য নয়। অগত্যা চিরশত্রু দানবদের সঙ্গে সন্ধি করতে হলো। লোভ বড় বালাই, অমৃতের ভাগ পাওয়ার আশায় অসুররা রাজি হয়ে গেল সেই অসম্ভব শ্রমে। উপাখ্যানে বলা হয়, মন্দার পর্বত হলো মন্থনদণ্ড আর নাগরাজ বাসুকি হলেন রশি। একপাশে দেবতারা, অন্যপাশে অসুররা—শুরু হলো এক মহাকাব্যিক টানাপোড়েন। সমুদ্রের নীল জল ফুঁসতে লাগল, ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ল আকাশের গায়ে। শ্রমের ঘাম আর সমুদ্রের নোনা জল একাকার হয়ে গেল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন দিব্য বৈদ্য ধন্বন্তরি অমৃতের কলস নিয়ে উঠে এলেন, তখন মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে গেল দৃশ্যপট। প্রতিজ্ঞা আর চুক্তির কথা ভুলে গিয়ে অসুররা এক হ্যাঁচকা টানে ছিনিয়ে নিল সেই কলস। শুরু হলো অধিকারের লড়াই। বিষ্ণু জানতেন, গায়ের জোরে অসুরদের হারানো কঠিন। তাই...

কর্ণ- কবচধারী সেই কিশোর-

Image
কর্ণ- কবচধারী সেই কিশোর- মহাভারতের এই গল্পটা কোনো রাজসূয় যজ্ঞ বা কুরুক্ষেত্রের রণহুঙ্কার দিয়ে শুরু হয় না। এ গল্পের মূলে রয়েছে এক কিশোরীর কৌতূহল, তার হৃদয়ের এক গোপন দীর্ঘশ্বাস, যা সে আমৃত্যু বয়ে বেড়িয়েছে একা। যদুবংশের শূরসেন ছিলেন অত্যন্ত প্রতাপশালী এক জনপদ প্রধান। তাঁরই পুত্র বসুদেব, যিনি পরবর্তীতে কৃষ্ণের পিতা হবেন। কিন্তু কৃষ্ণের জন্মের অনেক আগে শূরসেন এক অদ্ভুত প্রতিজ্ঞা করে বসেছিলেন। তাঁর এক পিসতুতো ভাই ছিলেন—কুন্তীভোজের রাজা। সেই রাজা ছিলেন নিঃসন্তান। শূরসেন পবিত্র অগ্নির সামনে দাঁড়িয়ে কথা দিয়েছিলেন, তাঁর প্রথম সন্তানকে তিনি তুলে দেবেন এই নিঃসন্তান ভাইয়ের হাতে। যখন প্রথা জন্মালো, শূরসেন নিজের কথা রাখলেন। জন্মমুহূর্তেই শিশুটিকে কুন্তীভোজের হাতে সঁপে দেওয়া হলো। প্রিথা হয়ে গেল ‘কুন্তী’। একটি রাজ্যের নাম মিশে গেল একটি মেয়ের পরিচয়ে। কুন্তীভোজের প্রাসাদে কুন্তী বড় হয়ে উঠছিলেন এক স্নিগ্ধ আবহে। তিনি আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো ছিলেন না। তাঁর মধ্যে ছিল সেবার এক আশ্চর্য নিষ্ঠা। প্রাসাদে কোনো অতিথি এলে বা কোনো ঋষি পদার্পণ করলে কুন্তীর হাত দিয়েই চলত তাঁদের সেবা। এই সেবা করতে গিয়েই তাঁর জীবনে ...

এক মানসী, যে হয়তো কোনোদিন ছিলই না—অথচ যাকে মুছে ফেলার সাধ্য নেই কারো।

Image
এক মানসী, যে হয়তো কোনোদিন ছিলই না—অথচ যাকে মুছে ফেলার সাধ্য নেই কারো। ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে অনেক সময় এমন কিছু নাম উঠে আসে, যাদের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় থাকলেও বাঙালির বা ভারতবাসীর আবেগে তাদের স্থান প্রশ্নাতীত। আনারকলি তেমনই এক নাম। কোনো সম্রাট বা দিগ্বিজয়ীর নাম নয়, এ এক এমন কিশোরীর গল্প, যার অপরাধ ছিল শুধু ভালোবাসা। অন্ধকার গলি আর ডালিমের ফুল তার আসল নাম কী ছিল, কেউ জানে না। কিন্তু ইতিহাসে সে পরিচিত ‘আনারকলি’ নামে—যার অর্থ ডালিম ফুল। সে ছিল তরুণী, লাবণ্যময়ী আর বুদ্ধিমতী। মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল আগ্রার প্রাসাদে সে হেঁটে বেড়াত এক সহজাত আভিজাত্যে। আকবরের দরবার মানেই তখন একদিকে অঢেল সম্পদ, অন্যদিকে পদে পদে বিপদ। কবি, শিল্পী আর গুপ্তচরের ভিড়ে সেখানে প্রতিটা চাহনির আড়ালে লুকিয়ে থাকত এক একটা সমীকরণ। আনারকলি এসবই জানত, যতদিন না সে অসতর্ক হয়ে পড়ল। আর সেই অসতর্কতার নাম—শেহজাদা সেলিম। আকবরের পুত্র সেলিম ছিলেন ঠিক যেমনটা একজন মুঘল রাজপুত্রের হওয়া উচিত—উদ্দাম, চঞ্চল এবং জীবনের প্রতি এক তীব্র তৃষ্ণায় ভরপুর। একদিন সেলিমের চোখ গিয়ে পড়ল আনারকলির ওপর। সেই যে দৃষ্টি বিনিময় হলো, তা আর সরলো না। রাজপুত্রের...

শরদ্বান ঋষি ও পথের ধারে কুড়িয়ে পাওয়া রাজপুত্তুর

Image
  শরদ্বান ঋষি ও পথের ধারে কুড়িয়ে পাওয়া রাজপুত্তুর মহাভারতের চরিত্ররা যেন এক-একজন রহস্যের খনি। সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষের মতো তাদের জন্ম নয়, তাদের বেড়ে ওঠাও যেন কোনো এক অলৌকিক চিত্রনাট্যের অংশ। দ্রোণাচার্যের পত্নী কৃপীর কথাই ধরা যাক। কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধের নেপথ্যে এই শান্ত অথচ তেজস্বিনী নারীর অবদান কম নয়। কিন্তু কৃপীর জন্মের ইতিহাস খুঁড়তে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় তাঁর পিতা শরদ্বানের কাছে, যাঁর জন্ম হয়েছিল এক অদ্ভুত উপায়ে—তির বা শর থেকে। গৌতম মুনির পুত্র শরদ্বান। কিন্তু শাস্ত্রপাঠ বা যজ্ঞের আগুন তাঁকে কোনোদিন টানেনি। ঋষিপুত্র হলে কী হবে, তাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল ধনুুর্বিদ্যা। যখন অন্য ব্রাহ্মণ বালকরা প্রদীপের আলোয় বেদপাঠে মগ্ন, শরদ্বান তখন বনের অন্ধকারে লক্ষ্যভেদ অভ্যাস করছেন। শাস্ত্রের চেয়ে অস্ত্রের ঝঙ্কারই ছিল তাঁর কাছে অধিক পবিত্র। কঠোর তপস্যা আর নিরলস সাধনায় তিনি এমন সব দিব্যাস্ত্র আয়ত্ত করলেন, যা সাধারণ কোনো যোদ্ধার পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব। তাঁর এই ক্রমবর্ধমান শক্তি দেখে স্বর্গের রাজা ইন্দ্র প্রমাদ গুনলেন। মর্ত্যের এক ব্রাহ্মণ যদি দেবতাতুল্য শক্তিশালী হয়ে ওঠেন, তবে স্ব...

পাত্রে জন্মানো এক যোদ্ধা:এক ব্রাহ্মণের অপমান কীভাবে তৈরি করল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধরকে-

Image
পাত্রে জন্মানো এক যোদ্ধা:এক ব্রাহ্মণের অপমান কীভাবে তৈরি করল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধরকে- কিছু গল্পের শুরু হয় অলৌকিকতায়, আর শেষ হয় এমন এক ক্ষতে যা কোনোদিন শুকোয় না। দ্রোণের গল্পটাও ঠিক তেমনই। গল্পের শুরু গঙ্গার তীরে। মহর্ষি ভরদ্বাজ সেদিন সকালে স্নান করতে নেমেছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল অপ্সরা ঘৃতাচী—অপরূপা, জ্যোতির্ময়ী, যার দিক থেকে চোখ ফেরানো দায়। ঋষির সংযম টলল। তাঁর তেজ স্খলিত হয়ে পড়ল কাছেই রাখা এক মৃন্ময় পাত্র বা দ্রোণ-এ। সেই মাটির পাত্র থেকেই জন্ম নিল এক ফুটফুটে শিশু। নাম রাখা হলো দ্রোণ। প্রথম নিশ্বাস থেকেই বোঝা গিয়েছিল, এই বালক সাধারণ হতে আসেনি। পিতার আশ্রমে বেড়ে ওঠা দ্রোণ যখন সমবয়সীদের সঙ্গে বেদ পাঠ শুরু করলেন, দেখা গেল তাঁর মেধা প্রখর। কিন্তু শুধু শাস্ত্রের শ্লোক আওড়ে তো জীবন চলে না। দ্রোণের দু-চোখে তখন অন্য স্বপ্ন—অস্ত্রবিদ্যার স্বপ্ন। ধনুর্বিদ্যা, তলোয়ারের কৌশল, আর সেই সব অলৌকিক অস্ত্র যা আকাশ থেকে আগুন আর বজ্র নামিয়ে আনতে পারে। পিতার শিষ্য অগ্নিবেশ্যের কাছে তিনি পাঠ শুরু করলেন। দ্রোণ ছিলেন এক ভয়ংকর ছাত্র—ক্ষিপ্র, নিখুঁত এবং অদম্য। অল্পদিনেই তিনি ছাড়িয়ে গে...

বিষাদ ও অমৃত: এক সমুদ্রমন্থনের আখ্যান

Image
বিষাদ ও অমৃত: এক সমুদ্রমন্থনের আখ্যান নীল নির্জনতার ভেতরেও একটা দাহ থাকে। দেবরাজ ইন্দ্রের সেদিন শরীরী দাহ ছিল না, ছিল আভিজাত্যের দম্ভ। আর সেই দম্ভের আগুনেই ছাই হয়ে গেল স্বর্গপুরীর সব ঐশ্বর্য। গল্পটা শুরু হয়েছিল একটা সামান্য ফুলের মালা দিয়ে, কিন্তু তার শেষটা লেখা হলো মহাকালের নীল বিষে। এক ঋষির ক্রোধ ও ধুলোয় মেশা দম্ভ দুর্বাসা ঋষি— যাঁর মেজাজটা আগুনের শিখার মতো সব সময় কাঁপত। একদিন দেবরাজকে এক দিব্য মালা উপহার দিলেন তিনি। কিন্তু ক্ষমতার মদমত্ততায় ইন্দ্র ভুলে গেলেন সৌজন্য। মালাটা নিজের গলায় না পরে ছুড়ে দিলেন বাহন ঐরাবতের শুঁড়ে। হাতিটা আপন খেয়ালে সেই মালা ধুলোয় আছাড় মারল। ব্যাস, এটুকুই যথেষ্ট ছিল। দুর্বাসার চোখ থেকে যেন বিদ্যুৎ ঠিকরে বেরোল। তিনি অভিশাপ দিলেন, "যে ঐশ্বর্যের গরমে তুমি অন্ধ, সেই লক্ষ্মী তোমাকে ত্যাগ করবেন। দেবকুল আজ থেকে শ্রীহীন হবে।" দেখতে দেখতে দেবতাদের গায়ের দ্যুতি মিলিয়ে গেল। বলিরেখা দেখা দিল তাঁদের শরীরে। আর সেই সুযোগে অসুররা কেড়ে নিল স্বর্গ। হেরে যাওয়া দেবতারা যখন দিশেহারা, তখন ভগবান বিষ্ণু তাঁদের এক বিচিত্র পথের হদিশ দিলেন— সমুদ্রমন্থন। শত্রু যখন সহযোগী বিষ্...

কালান্তরের পদধ্বনি: এক মহানিষ্ক্রমণ- সত্যবতির বনবাস যাত্রা

Image
কালান্তরের পদধ্বনি: এক মহানিষ্ক্রমণ- সত্যবতির বনবাস যাত্রা হস্তিনাপুরের আকাশটা আজ বড় বেশি ফ্যাকাসে। মেঘ নেই, কিন্তু রোদের তেজও যেন কোনো এক বিষণ্ণ চাদরে ঢাকা। প্রাসাদের চত্বরে রথের চাকার ঘড়ঘড় শব্দটা যখন থামল, তখন বাতাস ভারী হয়ে এল এক আর্তনাদে। কুন্তী ফিরেছেন, কিন্তু তাঁর সেই দৃপ্ত পদচারণা আজ পাথরচাপা কান্নায় স্তব্ধ। সঙ্গে পাঁচটি শিশু—পিতৃহীন পাঁচ পাণ্ডব।   অম্বালিকা বাতায়নের ধারে বসে ছিলেন। সংবাদটা যখন এল যে পাণ্ডু নেই, আর তাঁর প্রিয়তমা পত্নী মাদ্রীও আগুনের শিখায় নিজেকে সঁপে দিয়েছেন, তখন মুহূর্তের জন্য তাঁর হৃৎস্পন্দন থমকে গেল। শরীরটা তাঁর এমনিতেই পাণ্ডুর ছিল, আজ যেন তা স্বচ্ছ পাথরের মতো সাদা হয়ে গেল। পুত্রশোকের এই দহন রাজকীয় বসনের চেয়েও অনেক বেশি ভারি, অনেক বেশি নিষ্ঠুর। পা টলছিল, তবু তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন বড় দিদি অম্বিকার কক্ষে। সেখানে ধৃতরাষ্ট্রের পাশে অম্বিকা এক মূর্তিমতী উদ্বেগের মতো বসে ছিলেন। অম্বালিকার দীর্ঘশ্বাসের শব্দে  অম্বিকা চমকে উঠলেন। "অম্বা? পাণ্ডু এসেছে? পাণ্ডু কোথায়?" অম্বিকার গলায় এক অবর্ণনীয় শঙ্কা। অম...

কুন্তীর হস্তিনাপুর প্রর্তাপন

Image
শতশৃঙ্গ পর্বতের নির্জন অরণ্যে তখন এক গভীর বিষণ্ণতা। রাজা পাণ্ডু আর নেই, নেই রূপসী মাদ্রীও। তাঁদের অন্ত্যেষ্টির পর অরণ্যচারী দেবর্ষি ও মুনিরা এক সভায় মিলিত হলেন। তাঁদের চোখেমুখে এক কঠিন কর্তব্যের ছাপ। একজন ঋষি ধীর গলায় বললেন, "পাণ্ডু তাঁর রাজ্য-ঐশ্বর্য ত্যাগ করে আমাদের আশ্রয়ে এসে কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন হয়েছিলেন। আজ তিনি স্বর্গবাসী, কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর শোকাতুর পত্নী কুন্তী আর পাঁচজন কিশোর রাজপুত্রকে। আমাদের এখন দৈব কর্তব্য—পাণ্ডু ও মাদ্রীর অস্থিভস্ম এবং এই অসহায় পরিবারটিকে কুরুবংশের রাজধানী হস্তিনাপুরে পৌঁছে দেওয়া।" হস্তিনাপুর—সেই প্রাচীন নগরী, যা আজকের উত্তরপ্রদেশের মিরাট জেলা ছাড়িয়ে গঙ্গার এক পুরোনো খাত ধরে জেগে থাকা টিলার মতো। মুনিরা পরামর্শ শেষ করে যাত্রা শুরু করলেন। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যখন তাঁরা হস্তিনাপুরের সিংহদারে উপস্থিত হলেন, তখন সারা নগরে শোরগোল পড়ে গেল। সাধারণ মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল অরণ্যচারী ঋষিদের দর্শনে। রাজপ্রাসাদের অলিন্দে খবর পৌঁছাতেই বেরিয়ে এলেন কুরুবৃদ্ধ ভীষ্ম। তাঁর সঙ্গে ধৃতরাষ্ট্র, বিদুর এবং সেই বিচিত্র চরিত্রের বাহ্লীক।  বাহ্লীক সম্পর্কে ভীষ্মের জ্যাঠামশা...

পাণ্ডব-কথা: এক অলৌকিক জন্ম ও এক বসন্তের দীর্ঘশ্বাস

Image
  পাণ্ডব-কথা: এক অলৌকিক জন্ম ও এক বসন্তের দীর্ঘশ্বাস ব্যাসদেব যাকে কৌরব বংশের অন্য এক শাখা বলেছেন, সেই পাণ্ডবদের জন্মের ইতিহাসটা অদ্ভুত। সেদিন ছিল অমাবস্যা। শতশৃঙ্গ পর্বতের নির্জনতায় মুনি-ঋষিরা সব একত্রিত হয়ে চলছেন ব্রহ্মলোকের দিকে। পাণ্ডু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনারা কোথায় চলেছেন?" ঋষিরা থামলেন। শান্ত স্বরে বললেন, "মহারাজ, আমরা ব্রহ্মার কাছে যাচ্ছি।" পাণ্ডু আর স্থির থাকতে পারলেন না। দুই স্ত্রীকে নিয়ে পিছু নিলেন তাঁদের। কিন্তু ঋষিরা বাধা দিয়ে বললেন, "এ বড় দুর্গম পথ রাজন্‌! কোথাও খাড়া পাহাড়, কোথাও গভীর উপত্যকা। কোথাও অপ্সরাদের ক্রীড়াভূমি তো কোথাও জনমানবহীন বরফের মরুভূমি। সেখানে পশু নেই, পাখি নেই—আছে শুধু বাতাস আর আমাদের তপস্যার তেজ। রানীদের নিয়ে আপনার পক্ষে এই পথ অতিক্রম করা অসম্ভব। ফিরে যান।" পাণ্ডুর বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। তিনি ম্লান হেসে বললেন, "আমি জানি, নিঃসন্তান মানুষের জন্য স্বর্গের দ্বার রুদ্ধ। মানুষের চারটে ঋণ থাকে—পিতৃঋণ, দেবঋণ, ঋষিঋণ আর মনুষ্যঋণ। যজ্ঞ দিয়ে দেবঋণ শোধ হয়, তপস্যায় ঋষিঋণ আর শ্রাদ্ধে পিতৃঋণ। আমি সব ঋণ চুকিয়েছি, ক...

রাজসুখ থেকে তপোবন: পাণ্ডুর নির্বাসন ও একটি অভিশপ্ত মুহূর্ত

Image
রাজসুখ থেকে তপোবন: পাণ্ডুর নির্বাসন ও একটি অভিশপ্ত মুহূর্ত অরণ্যবাসের সেই ধূসর দিনগুলো সে এক অদ্ভুত দিন ছিল। ঘন অরণ্যের গভীরে শিকারের নেশায় মত্ত পাণ্ডু তখন জানতেন না, নিয়তি তাঁর জন্য কী ভয়ানক এক ফাঁদ পেতে রেখেছে। সঙ্গে দুই স্ত্রী—কুন্তী আর মাদ্রী। হঠাৎ পাণ্ডুর চোখে পড়ল এক জোড়া হরিণ আর হরিণী। কামাতুর সেই যুগল যখন মিলনে মগ্ন, ঠিক তখনই পাণ্ডুর ধনুক থেকে পাঁচটি তীক্ষ্ণ শর তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে বিঁধল তাদের শরীরে। রক্তাক্ত হরিণটি যন্ত্রণায় লুটিয়ে পড়ে মানুষের গলায় বলে উঠল, "মহারাজ, আপনি কি মানুষ? কামার্ত, ক্রূর আর মূর্খও তো এমন নৃশংস কাজ করে না! আমি কোনো সাধারণ পশূ নই, আমি ঋষি কিংদম। মানুষের শরীরে মিলনে লজ্জিত বোধ করেছিলাম বলে এই মৃগরূপ ধারণ করা। আপনি আমাকে ব্রহ্মহত্যার পাপে ফেলব না ঠিকই, কারণ আপনি জানতেন না আমার পরিচয়; কিন্তু মিলনের মুহূর্তে এই যে ব্যাঘাত ঘটালেন—তার অভিশাপ আপনাকে বইতে হবে। আজ থেকে আপনিও যখনই স্ত্রীর সান্নিধ্যে যাবেন, সেই মুহূর্তেই আপনার মৃত্যু ঘটবে।" কথা কটি বলেই ঋষি কিংদম প্রাণত্যাগ করলেন। পাণ্ডুর চারপাশের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ নিঝুম হয়ে গেল। তিনি থমকে দাঁড়ালেন। নিজে...

৷কুরুবংশের সেই অভিশপ্ত জন্মলগ্ন ব্যাসদেবের বর এবং একটি গোপন ভয়

Image
প্রথমে কুরু বংশের জটিল রহস্যটা ছোট করে বুঝে নেওয়া যাক: রক্তের টান আর কুরু নামের মায়া।ইতিহাস বড় বিচিত্র। আমরা যাদের 'কৌরব' বলে জানি, সেই ধৃতরাষ্ট্র আর গান্ধারীর সন্তানদের কেন 'কুরু বংশ' বলা হয়—তার উত্তরটা লুকিয়ে আছে বংশের আদি শিকড়ে। ১. সেই আদি পুরুষ: এই বংশের নাম এসেছিল মহাপ্রতাপশালী রাজা কুরু-র নাম থেকে। তিনি ছিলেন ভরত বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা। তাঁর নামেই সেই বিখ্যাত কুরুক্ষেত্র। ধৃতরাষ্ট্র আর তাঁর একশ ছেলে যেহেতু সেই বংশের সিংহাসনে বসেছিলেন, তাই তাঁরাই হয়ে উঠলেন কুরুদের আসল প্রতিনিধি বা 'কৌরব'। ২. নামের রাজনীতি: মজার ব্যাপার হলো, পাণ্ডবরাও কিন্তু একই বংশের ছেলে। কিন্তু গল্পে দুই পক্ষকে আলাদা করার জন্য পাণ্ডুর ছেলেদের বলা হলো 'পাণ্ডব', আর ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেদের ওপর সেঁটে দেওয়া হলো আদি পুরুষের নাম—'কৌরব'। ৩. এক আশ্চর্য ধন্দ: এখানেও সেই পরাশর-সত্যবতীর গল্পের একটা অদ্ভুত মোচড় আছে। শান্তনুর বংশের আসল রক্তধারা কিন্তু মাঝপথেই থমকে গিয়েছিল। ব্যাসদেবের সেই 'নিয়োগ' প্রথার মাধ্যমেই জন্ম নিলেন ধৃতরাষ্ট্র আর পাণ্ডু। অর্থাৎ, শরীরে মুনি-ঋষির রক্ত বইলেও তাঁরা ...