Posts

২৯তম বনপর্ব -অষ্টাবক্রের স্পর্ধিত জয় ও এক পিতার মুক্তি

Image
২৯তম বনপর্ব - অষ্টাবক্রের স্পর্ধিত জয় ও এক পিতার মুক্তি লোমশ ঋষি যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। পথ চলতে চলতে চারপাশের অরণ্যের রূপ বদলে যাচ্ছে। ঋষি বললেন, "রাজন, ওই যে সামনে দেখছ, ওটাই উদ্দালকের পুত্র এবং মন্ত্রবিদ্যার মহাসাধক শ্বেতকেতুর আশ্রম। এই আশ্রমে ঋতুরাজ বসন্ত যেন চিরকালের জন্য বাসা বেঁধেছে। তুমি ভাইদের নিয়ে একবার ভেতরে চলো। এই সেই পুণ্যভূমি, যেখানে শ্বেতকেতু স্বয়ং দেবী সরস্বতীকে এক রক্তমাংসের নারীরূপে প্রত্যক্ষ করেছিলেন।" একটু থেমে, গাছের ছায়ায় বসে লোমশ ঋষি  সেই অদ্ভুত, অথচ চিরন্তন সত্যের গল্পটি বলতে শুরু করলেন। সে এক অন্য সময়। মহর্ষি উদ্দালকের আশ্রমে কহোড় নামে এক শিষ্য ছিলেন। গুরুর প্রতি তাঁর সেবা আর নিষ্ঠা এতই গভীর ছিল যে, উদ্দালকের স্নেহের পাত্র হতে তাঁর সময় লাগেনি। অল্প দিনেই কহোড়কে সমস্ত বেদ বুঝিয়ে দিয়ে ঋষি নিজের রূপবতী কন্যা সুজাতাকে তাঁর হাতে সম্প্রদান করলেন। কিছুদিন পর সুজাতা অন্তঃসত্ত্বা হলেন। তাঁর গর্ভের সন্তানটি যেন এক অগ্নিকুণ্ড—মায়ের পেটে বসেই সে পিতার বেদপাঠ শুনতো আর পরম জ্ঞানে ঋদ্ধ হতো। একদিন রাতে ক্লান্ত কহোড় যখন বেদমন্ত্র উচ্চারণ করছিলেন, আচমকা স...

২৮তম বনপর্ব-রক্তমাংসের দাঁড়িপাল্লা: রাজা উশীনর ও ধর্মের চরম পরীক্ষা

Image
২৮তম বনপর্ব-রক্তমাংসের দাঁড়িপাল্লা: রাজা উশীনর ও ধর্মের চরম পরীক্ষা লোমশ ঋষি পাণ্ডবদের সঙ্গে নিয়ে হেঁটে চলেছেন। চারপাশের পবিত্র ভূমি হাত দিয়ে দেখিয়ে তিনি বললেন, "হে রাজন, এই দেখো বিনাশন। এখানেই মহিমান্বিতা নদী সরস্বতী আকস্মিক অন্তর্হিত হয়েছেন। নিযাদদের স্পর্শ থেকে নিজেকে বাঁচাতে নদী এখানে পাতালপ্রবেশ করেন। আবার কিছুটা দূরে চমসোদ্ভেদ নামক স্থানে তিনি পুনরায় মর্ত্যে জেগে উঠেছেন সাগরের পানে ছুটে যাওয়ার জন্য।"এখানেই একদিন লোপামুদ্রার সঙ্গে অগস্ত্য মুনির মোলাকাত হয়েছিল, তারপর তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই পবিত্র ভূমিতেই আজও বিরাজ করছে পুণ্যতীর্থ বিষ্ণুপদ, আর পাশ দিয়েই কুলকুল রবে বয়ে চলেছে পবিত্র নদী বিপাশা। লোপামুদ্রার সঙ্গে অগস্ত্য মুনির কাহিনী ঝালিয়ে নিতে এখানেই  ক্লিক করুন। ঋষি একে একে সিন্ধুতীর, বিষ্ণুপদ আর কাশ্মীর মণ্ডলের পুণ্যতীর্থগুলির কথা বলতে বলতে এগিয়ে চললেন। যমুনার কোল ঘেঁষে বয়ে চলা বিতস্তা নদীর তীরে এসে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে তখন এক সুদূর অতীত ভেসে উঠেছে।  তিনি যুধিষ্ঠিরকে বললেন— "এই বিতস্তার তীরেই রাজা উশীনর এমন এক যজ্ঞ করেছিলেন, যার মহিমা দেব...

২৭তম বন পর্ব-পিতার তৃষ্ণা ও ইন্দ্রের অঙ্গুলি: যুবনাশ্বপুত্র মান্ধাতার উপাখ্যান

Image
  ২৭তম বন পর্ব-পিতার তৃষ্ণা ও ইন্দ্রের অঙ্গুলি: যুবনাশ্বপুত্র মান্ধাতার উপাখ্যান যুধিষ্ঠিরের চোখের তারা তখন শিশুর মতো কৌতূহলে চকচক করছে। মহর্ষি লোমশের দিকে একটু ঝুঁকে বসে তিনি বললেন, "মহর্ষি, ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা যুবনাশ্বের সেই মহাতেজস্বী পুত্র মান্ধাতার কীর্তি তো ত্রিলোকখ্যাত। তাঁর সেই অলৌকিক জন্মের কাহিনীটি আমায় একটু বিস্তারিত বলবেন? শোনার জন্য বড্ড ব্যাকুল হয়ে আছি।" লোমশ মুচকি হাসলেন। পাথরের আসনটায় আর একটু আরাম করে বসে নিলেন তিনি। এ গল্প বলতে তাঁর নিজেরও ভারী ভালো লাগে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্মৃতির সিন্দুকটা যেন খুলে ধরলেন মহর্ষি। "শোনো তবে যুধিষ্ঠির," লোমশ বলতে শুরু করলেন, "ইক্ষ্বাকু বংশের বহু রাজর্ষির গল্প তোমরা শুনেছ, কিন্তু মান্ধাতার মতো দীপ্তিময় পুরুষ আর দুটি মেলা ভার। সে এক অদ্ভুত সময়। রাজা যুবনাশ্ব ছিলেন পরম ধার্মিক ও ন্যায়পরায়ণ শাসক। প্রজারা তাঁকে দেবতার মতো মানত। কিন্তু এত সুখের মধ্যেও রাজার বুকে একটা তীব্র কাঁটা বিঁধে ছিল—তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। শূন্য প্রাসাদের অলিন্দে অলিন্দে শুধু এক হাহাকার ঘুরে বেড়াত। কোনো উত্তরাধিকারী নেই, এই ভাবনায় রাজার রাত...

২৬তম বনপর্ব-প্রভাস তীর্থে যুধিষ্ঠির এবং চ্যবনের অক্ষি-উন্মোচন

Image
২৬তম বনপর্ব-প্রভাস তীর্থে যুধিষ্ঠির এবং চ্যবনের অক্ষি-উন্মোচন মহেন্দ্র পর্বতের বুক চিরে তখন হিমেল হাওয়া বইছে। পাণ্ডবরা বনবাসের দিনগুলো এক এক করে কাটচ্ছেন, সঙ্গে দ্রৌপদী। ঠিক এই সময়েই এক চতুর্দশীর পুণ্যলগ্নে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন স্বয়ং মহাবীর ও পরশুরাম। পাণ্ডব ভ্রাতারা এবং দ্রৌপদী পরম শ্রদ্ধায় সেই তেজস্বী ঋষির চরণে প্রণত হলেন। অর্ঘ্য ও শ্রদ্ধায় তুষ্ট হয়ে পরশুরাম তাঁদের বললেন, "তোমাদের এই তীর্থযাত্রা সার্থক হোক। তোমরা এবার দক্ষিণাপথের দিকে এগিয়ে যাও।" পরশুরামের সেই নির্দেশ মাথায় নিয়ে পাণ্ডবরা সমুদ্রের তীর ধরে হাঁটতে শুরু করলেন। যেখানেই পুণ্যতোয়া নদী বা সাগরসঙ্গম দেখেন, সেখানেই থমকে দাঁড়ান, স্নান সেরে ঈশ্বরের আরাধনায় লীন হন। এইভাবেই একদিন তাঁরা পৌঁছলেন গোদাবরীর তীরে। মহর্ষি অগস্ত্যের স্মৃতিধন্য সেই পুণ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে তাঁরা শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন নারী তীর্থের চরণে। এরপর সমুদ্র পেরিয়ে পাণ্ডবরা প্রবেশ করলেন এক নিবিড়, শান্ত অরণ্যে। সেখানে যুগের পর যুগ ধরে তপস্বীরা ধ্যানমগ্ন। সেই অরণ্যের শান্ত ছায়ায় বসু, ইন্দ্র, বিষ্ণু, শিব, চন্দ্র, সূর্য, বরুণ, কুবের ও সরস্বতীর দেবালয়গুলিতে পরম ভক...

২৫তম বনপর্ব- তরঙ্গের গর্ভে ইতিহাস: মহেন্দ্র পর্বতে পরশুরামের মহাবিস্ময়

Image
২৫তম বনপর্ব- তরঙ্গের গর্ভে ইতিহাস: মহেন্দ্র পর্বতে পরশুরামের মহাবিস্ময় কৌশিকী নদীর পুণ্যসলিলে অবগাহন সেরে পাণ্ডবেরা যখন অন্য তীর্থের অভিমুখে যাত্রা করলেন, তখন তাঁদের সাথে রয়েছেন লোমশ মুনি। লোমশ মুনি তাঁদের নিয়ে চললেন যেখানে গঙ্গা সাগরের সাথে মিতালী করেছে, সেই মহাসঙ্গমে। সমুদ্রের তীরবর্তী সেই সংকীর্ণ বালুকাপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে একসময় তাঁরা এসে পৌঁছলেন কলিঙ্গ দেশে। চারিদিকে গম্ভীর সমুদ্রের গর্জন। মহর্ষি লোমশ হাত তুলে দেখালেন, "যুধিষ্ঠির, ওই দ্যাখ— ওটাই বৈতরণী নদী।" পাণ্ডবেরা এবং দ্রৌপদী সেই বৈতরণীর পবিত্র জলে দাঁড়িয়ে তাঁদের পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে পরম শ্রদ্ধায় তর্পণ করলেন। জল আর বাতাসের সেই যুগলবন্দীর পর তাঁরা এগিয়ে চললেন মহেন্দ্র পর্বতের দিকে। সেই রাতেই তাঁরা পাহাড়ের কোলে আশ্রয় নিলেন। সেখানে ভৃগু, অঙ্গিরা, বশিষ্ঠের মতো কশ্যপ বংশের প্রথিতযশা ঋষিরা তপস্যায় মগ্ন ছিলেন। লোমশ মুনি পাণ্ডবদের সাথে তাঁদের পরিচয় করিয়ে দিতেই যুধিষ্ঠির ভক্তিভরে তাঁদের চরণে প্রণাম জানালেন। ঠিক সেই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন পরশুরামের পরম শিষ্য অকৃতব্রণ। যুধিষ্ঠির কৌতূহলী হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "হে মহাত...

২৪তম বনপর্ব অরণ্যের ঋষি, আকাশের মেঘ: ঋষ্যশৃঙ্গের উপাখ্যান

Image
২৪তম বনপর্ব অরণ্যের ঋষি, আকাশের মেঘ: ঋষ্যশৃঙ্গের উপাখ্যান লোমশ মুনি তাঁর উদাত্ত কণ্ঠে পুনরায় বলতে শুরু করলেন: "হে যুধিষ্ঠির, রাজা ভগীরথ কীভাবে তাঁর পূর্বপুরুষদের উদ্ধারের জন্য গঙ্গাকে মর্ত্যে এনেছিলেন, সেই পুণ্যকথা তো শুনলে। এবার তোমাদের নিয়ে যাব অন্য দুটি পবিত্র নদীর তীরে— নন্দা আর অপরনন্দা। এই নদী দুটির জল পাপ আর ভয়, দুই-ই নিমেষে ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়।" তপোবৃদ্ধ মুনি যুধিষ্ঠিরকে বললেন, "মহারাজ, এই নন্দা নদীতে একবার স্নান করলে মানুষ সবচেয়ে কঠিন অভিশাপ থেকেও মুক্তি পায়। তুমি তোমার অনুজদের নিয়ে এখানে স্নান সম্পন্ন করো।" পাণ্ডবেরা মুনির নির্দেশ পালন করলেন। নন্দার শীতল জলে পা রাখতেই তাঁদের চিত্ত এক অদ্ভুত লঘুতা ও শান্তিতে ভরে উঠল। সেখান থেকে তাঁরা এগিয়ে চললেন কৌশিকী নদীর অভিমুখে। নদীটি যেমন পবিত্র, তেমনই তার চারপাশের প্রকৃতি মনোরম। লোমশ হাত তুলে দেখালেন, "রাজন, চেয়ে দেখো, এই সেই পুণ্যতোয়া কৌশিকী। এর তীরেই একদা শোভা পেত বিশ্বামিত্রের তপোবন। আর কাছেই রয়েছে মহর্ষি কাশ্যপের আশ্রম, যা ‘পুণ্যাশ্রয়’ নামে খ্যাত। এখানেই কাশ্যপ-পুত্র বিভাণ্ডক তাঁর কুটির বেঁধেছি...

২৩তম বনপর্ব- স্বর্গাদপি গরীয়সী: ভগীরথের তপস্যা ও গঙ্গাবতরণের গাথা

Image
  ২৩তম বনপর্ব- স্বর্গাদপি গরীয়সী: ভগীরথের তপস্যা ও গঙ্গাবতরণের গাথা অগস্ত্যের সমুদ্র শোষণের কাহিনী শুনতে শুনতে যুধিষ্ঠিরের মনের গভীরে এক আশ্চর্য কৌতুহল দানা বেঁধেছিল। তিনি লোমশ মুনির দিকে তাকিয়ে বিনীত স্বরে শুধালেন, "হে মহর্ষি, একজন ঋষি যদি দেবতাদের হিতার্থে এক চুমুকে অতলান্ত মহাসমুদ্রকে শূন্য করে দিতে পারেন, এখন  নৃপতির উপাখ্যান শোনান , যিনি এর ঠিক বিপরীত কাজটি করেছিলেন? যিনি মৃত আর জীবিতের মধ্যবর্তী লোকে আটকে থাকা পূর্বপুরুষদের আত্মার সদগতির জন্য সেই শুষ্ক সমুদ্রে আবার জলধারা ফিরিয়ে এনেছিলেন?" লোমশ মুনি মৃদু হাসলেন। তাঁর চোখে ভেসে উঠল এক সুদূর অতীতের ছবি। তিনি বলতে শুরু করলেন ইক্ষ্বাকু বংশের সেই পরম কীর্তিমান রাজা ভগীরথের কাহিনী। এক লাউয়ের ষাট হাজার সন্তান: সগরের অদ্ভুত বংশলতিকা ভগীরথের জন্মের বহু কাল আগের কথা। সূর্যবংশে সগর নামে এক পরম ধার্মিক ও প্রতাপশালী রাজা রাজত্ব করতেন। তাঁর ঐশ্বর্যের খামতি ছিল না, কিন্তু মনের কোণে ছিল এক গভীর দীর্ঘশ্বাস—তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। বহু বছর কঠোর তপস্যার পর তিনি স্বয়ং দেবাদিদেব শংকরের বর লাভ করলেন। শিব জানালেন, সগরের এক রানীর গর্ভে জন্ম...