Posts

কালীয়দমন: কালিন্দীর বুকে এক মায়াবী নর্তক

Image
  কালীয়দমন: কালিন্দীর বুকে এক মায়াবী নর্তক বিষ কেবল প্রাণ হরণ করে না, বিষের এক নিজস্ব অহংকার আছে। সে চারপাশের বাতাস, জল আর মাটিকে নিজের মতো করে কলুষিত করতে চায়। যমুনার সেই গভীর দহটি বহু বছর ধরে সেই রকমই এক অহংকারী বিষের নীল চাদরে ঢাকা পড়েছিল। বৃন্দাবনের মানুষ নদীর দিকে যাওয়া ভুলেই গিয়েছিল। গাভীগুলো জল ছুঁত না, ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া পাখি আচমকা ডানা ঝটপট করে মরে ভেসে উঠত কালো জলের বুকে। তীরের কদম্ব গাছটি হয়ে গিয়েছিল অবশ, কুচকুচে কালো। যমুনার যে জল হওয়া উচিত ছিল কাচের মতো স্বচ্ছ আর শীতল, তা এক উগ্র, তপ্ত বিষের কামড়ে সারাক্ষণ ফুটত, বুদবুদ তুলত। সেই দহের অতল অন্ধকারে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে ছিল কালীয়। তিন ভুবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, সবচেয়ে অহংকারী নাগরাজ। সে ভাবত, এই নদী, এই জল—সব তার নিজস্ব সাম্রাজ্য। চারপাশের এই মৃত্যু আর ধ্বংসকে সে তার রাজকীয় অধিকার বলেই ধরে নিয়েছিল। কিন্তু নাগরাজ ভুল ভেবেছিল। আর সেই ভুলটা ভেঙে দেওয়ার জন্য যমুনার ঘাটে এসে দাঁড়াল এক নীল রঙের বালক। রামনক দ্বীপ থেকে বৃন্দাবন: এক পলাতকের ইতিহাস কালীয় চিরকাল যমুনার বাসিন্দা ছিল না। তার আসল ঘর ছিল মহাসমুদ্রের বুকে এক নির্জন ভূখণ্ড—রা...

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি

Image
  মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি (Index of Brief Mahabharata) মহাভারতের আদি পর্বের  সংক্ষিপ্ত অংশ বিশেষ পুরু বংশের বর্ণনা -মহাভারতের আদিপর্বে বর্ণিত চন্দ্রবংশের অন্যতম গৌরবময় শাখা হলো পুরু রাজবংশ বা পৌরব রাজবংশ ।  উর্বশী- ঊরুসম্ভবা: স্বর্গের দর্পচূর্ণ ও এক চিরন্তন রূপকথা কালীয়দমন: কালিন্দীর বুকে এক মায়াবী নর্তক দেবতাদের অজেয় শত্রু: নিবাতকবচদের বিরুদ্ধে অর্জুনের মহাযুদ্ধ কামনার স্বর্গ ও মাতৃত্বের পুণ্য: উর্বশী-অর্জুনের সেই অনির্বাণ উপাখ্যান রাজা দুষ্যন্ত ও শকুন্তলার.গন্ধর্ব প্রথায়  বিবাহ শকুন্তলার পুত্র ভরতের জন্ম এবং রাজা দুষ্যন্ত কর্তৃক তাকে নিজের পুত্র হিসেবে গ্রহণ। দেবতা আর অসুরের লড়াই আর কচ ও দেবযানীর প্রেম।দেবতা আর অসুরের লড়াই তখন তুঙ্গে দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: দম্ভ এবং প্রতিশোধের উপাখ্যান।সব বড় অনর্থের মূলে থাকে খুব তুচ্ছ কোনো ঘটনা। যযাতি, দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: এক রাজার দুই নারী ও এক পুত্রের ত্যাগ। শুক্ৰাচার্যের আশ্রমের চারদিকের বনটা বড় ঘন, বড় রহস্যময়।  যযাতির হাজার বছর: অন্তহীন তৃষ্ণা ও শেষ মুহূর্তের স্তব্ধতা,যা চেয়েছিলেন, তাই পেলেন মহাভারতের সেই আদিপর্বের কথা...

দেবতাদের অজেয় শত্রু: নিবাতকবচদের বিরুদ্ধে অর্জুনের মহাযুদ্ধ

Image
দেবতাদের অজেয় শত্রু: নিবাতকবচদের বিরুদ্ধে অর্জুনের মহাযুদ্ধ স্বর্গের রাজা ইন্দ্রের বুকে এমন এক দুঃশ্চিন্তা বহু যুগ ধরে পাথরের মতো চেপে ছিল, যার সমাধান তিনি নিজেও করতে পারছিলেন না। শত্রু যদি সাধারণ শত্রু হয়, তবে বজ্রধারী ইন্দ্রের পক্ষে তাকে পরাজিত করা অসম্ভব নয়। কিন্তু যদি সেই শত্রুকে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা এমন আশীর্বাদ দিয়ে থাকেন, যা তাকে দেবতাদের কাছেও অজেয় করে তোলে, তবে? অর্জুনের জন্মের বহু আগে, হস্তিনাপুরে পাশা খেলার বহু আগে, পাণ্ডবদের বনবাসেরও বহু আগে, স্বর্গলোকের আকাশে এই এক নামই আতঙ্কের ছায়া হয়ে ভাসত— নিবাতকবচ। কিন্তু ভাগ্যের অদ্ভুত নিয়ম। যে সমস্যার সমাধান যুগ যুগ ধরে দেবতারা খুঁজে পাননি, তার উত্তর একদিন এসে দাঁড়াল এক মানবযোদ্ধার হাতে— যার হাঁটুর উপর বিশ্রাম নিচ্ছিল গাণ্ডীব ধনুক, আর যার রথ ছুটছিল স্বর্গের পথে। নিবাতকবচদের জন্ম ও তপস্যা অতি প্রাচীন কালে, যখন দেবতা ও অসুরদের সংঘর্ষ ছিল জগতের নিয়মের মতো স্বাভাবিক, তখন মহর্ষি কশ্যপ ও তাঁর পত্নী দিতির গর্ভে জন্ম নেয় এক শক্তিশালী অসুরগোষ্ঠী। এদের নাম ছিল নিবাতকবচ। দেবতাদের মতোই তারা কশ্যপের সন্তান। অর্থাৎ, দেবতা ও অসুর আ...

কামনার স্বর্গ ও মাতৃত্বের পুণ্য: উর্বশী-অর্জুনের সেই অনির্বাণ উপাখ্যান

Image
কামনার স্বর্গ ও মাতৃত্বের পুণ্য: উর্বশী-অর্জুনের সেই অনির্বাণ উপাখ্যান মর্ত্যের ধুলোবালি আর রক্তের তৃষ্ণা থেকে অনেক দূরে, অমরাবতীর স্ফটিক-স্বচ্ছ আলোয় সেদিন এক অদ্ভুত নাটক তৈরি হচ্ছিল। দেবরাজ ইন্দ্রের আমন্ত্রণে অর্জুন তখন স্বর্গলোকে। উদ্দেশ্য—দিব্য অস্ত্র লাভ এবং গন্ধর্বরাজ চিত্রসেনের কাছে নৃত্য-গীতের শিক্ষা নেওয়া। অর্জুনের সেই ক্লান্তিহীন, পেশীবহুল শরীর, চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক মহাসমুদ্রের গাম্ভীর্য আর বীরত্ব দেখে স্বর্গের শ্রেষ্ঠ অপ্সরা উর্বশীর রক্তে দোলা লাগল। যে উর্বশীর এক একটি পলকপাতে ত্রিলোকের মুনি-ঋষিদের ধ্যান ভেঙে যায়, সে আজ মর্ত্যের এক ধনুর্বাজির সামনে ব্যাকুল, কামনার আগুনে দগ্ধ। দেবরাজ ইন্দ্র নিজেই উর্বশীকে পাঠালেন অর্জুনের কক্ষে। বসন্তের মায়াবী বাতাসে উর্বশী যখন অর্জুনের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন, তখন তাঁর পরনে সূক্ষ্ম মেঘের মতো বসন, চোখে মদিরার আহ্বান, আর ঠোঁটে এক আদিম আদিখ্যেতা। স্বর্গের নিয়ম আলাদা; সেখানে সম্পর্ক মানে শুধুই মুহূর্তের আনন্দ, সেখানে কোনো মর্ত্যের বন্ধন নেই। কিন্তু অর্জুন? তিনি তো শুধু এক জন মহান যোদ্ধা নন, তিনি কুরুবংশের শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতির ধারক। উর্বশীর সেই উত...

উর্বশী- ঊরুসম্ভবা: স্বর্গের দর্পচূর্ণ ও এক চিরন্তন রূপকথা

Image
  উর্বশী- ঊরুসম্ভবা: স্বর্গের দর্পচূর্ণ ও এক চিরন্তন রূপকথা নারায়ণের ধ্যানগম্ভীর অবয়বের দিকে তাকিয়ে দেবরাজ ইন্দ্রের সিংহাসন তখন কাঁপছে। হিমালয়ের প্রত্যন্ত বদরিকাশ্রমে যুগল ঋষি— নর আর নারায়ণ। তাঁদের তপস্যার যে তীব্র উত্তাপ, যাকে শাস্ত্রে বলে তপোঅগ্নি, তা মর্ত্যের সীমানা পেরিয়ে সরাসরি গিয়ে আঘাত করছে স্বর্গের অমরাবতীতে। ইন্দ্রের চিরকালের এক রোগ, ক্ষমতার মোহ। যে যেখানেই একটু গভীর সাধনায় বসে, দেবরাজ ভাবেন— এই বুঝি গেল তাঁর তখত-তাউস! তিনি তড়িঘড়ি ডেকে পাঠালেন তাঁর প্রধান সেনাপতিদের। তবে এরা রক্তপাতের সৈন্য নয়, এরা কাম ও মোহের বাহিনী। মদনদেব, তাঁর পত্নী রতি, ঋতুরাজ বসন্ত আর স্বর্গের শ্রেষ্ঠ অপ্সরা মেনকা-রম্ভারা রওনা দিলেন হিমালয়ের দিকে। ঋষিদের ধ্যান ভাঙতে হবে, এই হলো হুকুম। বদরিকাশ্রমে নিমেষের মধ্যে ঋতুপরিবর্তন হয়ে গেল। অসময়ে ফুটল ফুল, মলয় বাতাস বইল, মেনকা-রম্ভার নূপুরনিক্কণে কেঁপে উঠল পাহাড়ের নিস্তব্ধতা। মদনদেব তাঁর পুষ্পশরাসন তাক করলেন ঋষিদের বুক লক্ষ্য করে। কিন্তু আশ্চর্য! নর বা নারায়ণ— কারও ভ্রূযুগল কাঁপল না। তাঁরা যেন অচল মহীধর, ঝোড়ো হাওয়া যাঁদের স্পর্শ করে কিন্তু টলাতে পারে না। কামে...

অর্জুনের পরীক্ষা: মহাভারতের সেই অমোঘ মুহূর্ত: যখন ব্যাধের বেশে দেখা দিলেন মহাদেব ও পাশুপাত অস্ত্র লাভ

Image
 অর্জুনের পরীক্ষা: মহাভারতের সেই অমোঘ মুহূর্ত: যখন ব্যাধের বেশে দেখা দিলেন মহাদেব ও পাশুপাত অস্ত্র লাভ হিমালয়ের তুষারধবল শৃঙ্গগুলো পেরিয়ে অর্জুন যখন আরও গভীরে প্রবেশ করলেন, তখন চারপাশের প্রকৃতি এক অন্য রূপ ধারণ করল। সামনেই এক আদিম, নিবিড় অরণ্য। চারপাশটা কাঁটাঝোপে ভরা, অথচ কেমন যেন একটা অদ্ভুত, গা ছমছমে সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে তার বুকে। এই জনহীন, বুনো পরিবেশেও অর্জুনের অশান্ত, চঞ্চল মনটা এক নিমেষে শান্ত হয়ে গেল। তাঁর মনে হলো, এই অরণ্য যেন বহু যুগ ধরে শুধু তাঁর জন্যই অপেক্ষা করছিল। কোনো এক না-বলা মায়ায় তিনি জড়িয়ে পড়লেন এই নির্জনতার সঙ্গে। তপস্যার প্রস্তুতি নিতে তাঁর দেরি হলো না। কুশ ঘাস সংগ্রহ করে নিজেই বুনে নিলেন বসার আসন। পরনে হরিণের চামড়া, হাতে দণ্ড আর কমণ্ডলু নিয়ে অর্জুন মগ্ন হলেন কঠোর তপস্যায়। প্রথম মাসে তাঁর আহার বলতে কেবল শুকনো পাতা, তাও তিন দিনে মাত্র একবার। দ্বিতীয় মাসে সেই কৃচ্ছ্রসাধন আরও বাড়ল—এবার ছয় দিনে একবার মাত্র আহার। তৃতীয় মাস আসতে আসতে পাক্ষিক ব্রত নিলেন, অর্থাৎ পনেরো দিনে একবার মাত্র কিছু মুখে দিতেন। আর চতুর্থ মাসে এসে অর্জুন সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেলেন। পায়ের আঙুলের ওপর...

তিমির হননের গান: অর্জুনের মহানিষ্ক্রমণ ও একাকী সেই মহাশ্বেত পথ

Image
তিমির হননের গান: অর্জুনের মহানিষ্ক্রমণ ও একাকী সেই মহাশ্বেত পথ। অরণ্য এখন ওদের চেনা হয়ে গেছে। চেনা হয়ে গেছে বনের নিজস্ব ভাষা, তার নৈঃশব্দ্য, আর দিনের নানা প্রহরের ওঠানামা। রাজপ্রাসাদের জটিল কূটনীতি বোঝার জন্য যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির প্রয়োজন হতো, পাণ্ডবেরা এখন তা দিয়েই অরণ্যের গতিপ্রকৃতি পাঠ করতে শিখেছে। কোন পথটি নিরাপদ, কোন ঝরনার জল কাচের মতো স্বচ্ছ, আর আচমকা বৃষ্টি নামলে কোন গাছের আড়াল সবচেয়ে বিশ্বস্ত— সব এখন ওদের নখদর্পণে। বারো বছর কম সময় নয়। দীর্ঘ এই প্রবাস জীবন পাণ্ডবদের সহ্যশক্তির পরীক্ষা নিতে নিতে তাদের ভেতরের অহংকারটুকু শুষে নিয়ে সেখানে এক গভীর, ধূসর স্থৈর্য এনে দিয়েছে। ঠিক এই রকমই এক যাযাবর দিনে, বনের প্রাচীন গাছপালার ছায়া ফুঁড়ে আবির্ভূত হলেন এক দীর্ঘদেহী পুরুষ। তিনি আসার আগেই চারপাশের বাতাসে এক অলৌকিক স্তব্ধতা নেমে এলো। এক অমোঘ আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য যেন চাদরের মতো ঢেকে দিল গোটা বনভূমিকে। তিনি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস। পাণ্ডবেরা কোনো দ্বিধা বা আনুষ্ঠানিকতার সময় নষ্ট না করে তৎক্ষণাৎ এগিয়ে গেলেন। এক পরম শ্রদ্ধাবোধে তাদের শরীর ও মন আপনিই নুয়ে পড়ল। ব্যাসদেব তো কেবল একজন জটাজুটধারী তপোবন...