Posts

জতুরগৃহ: ছদ্মবেশী আতিথেয়তার আড়ালে

Image
  জতুরগৃহ: ছদ্মবেশী আতিথেয়তার আড়ালে এক ধরণের নিষ্ঠুরতা আছে যার গায়ে মাখা থাকে আতিথেয়তার চন্দন। সে হাসিমুখে দরজা খুলে দেয়, বিনীত হয়ে শোবার ঘরটা দেখিয়ে দেয়। তারপর যখন প্রদীপ নিভে আসে, চারদিক নিঝুম হয়ে যায়—তখন সে অন্ধকারের আড়ালে ওত পেতে বসে থাকে। হস্তিনাপুর থেকে পাণ্ডবদের বারণাবত নির্বাসনের সিদ্ধান্ত যখন পাকা হয়ে গেল, তখন দুর্যোধনের চোখে-মুখে ফুটে উঠল এক নিষ্ঠুর সঙ্কল্পের আভা। তিনি আর ধৈর্য ধরতে রাজি নন। দীর্ঘদিনের লালিত পরিকল্পনা এবার বাস্তবায়নের সময় এসেছে। আর দুর্যোধন কোনোদিন ভাগ্যের ওপর ভরসা করার লোক ছিলেন না; তিনি চেয়েছিলেন এমন এক চূড়ান্ত পরিণতি, যার পর আর কোনো প্রশ্ন অবশিষ্ট থাকে না। সেই নিভৃত কক্ষে ডাক পড়ল পুরোচনের। পুরোচন দুর্যোধনের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এক মন্ত্রী। তবে এই বিশ্বাস প্রজ্ঞা বা সততার জন্য নয়, বরং এক ধারালো অস্ত্রের ওপর মানুষের যেমন বিশ্বাস থাকে—তেমন। পুরোচন ছিল আজ্ঞাবহ, যান্ত্রিক এবং বিবেকহীন। দুর্যোধনের কাছে এই নির্লিপ্ততাই ছিল পুরোচনের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। পুরোচন যখন সামনে এসে দাঁড়াল, দুর্যোধন তাকে রাজকীয় গাম্ভীর্যে নয়, বরং এক অদ্ভুত অন্তরঙ্গতায় বরণ করে নিলেন। যেন এক...

নীল চোখের বিষ: বারণাবতের পথে পাণ্ডবগণ

Image
  নীল চোখের বিষ: বারণাবতের পথে পাণ্ডবগণ ঈর্ষা এক নিঃশব্দ বিষের মতো। সে কোনো ঘোষণা দিয়ে আসে না। বুকের অতল গভীরে সে থিতু হয়ে বসে থাকে, দিন দিন ভারী হতে থাকে, যতক্ষণ না সেই ভার মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। ধৃতরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র দুর্যোধনের বুকে সেই বিষ জমেছিল অনেক আগে থেকেই। শুরুটা হয়েছিল প্রশংসা থেকে—বা বলা ভালো, প্রশংসার সেই তিক্ত রেশটুকু থেকে। মল্লভূমিতে ভীমের সেই রুদ্রমূর্তি তিনি দেখেছেন; যখন ভীম প্রকৃতির এক অমোঘ শক্তির মতো প্রতিপক্ষকে ধুলোয় লুটিয়ে দিচ্ছে আর গ্যালারি ফেটে পড়ছে উল্লাসে। তিনি দেখেছেন অর্জুনকে; যাঁর ধনু থেকে শর নিক্ষেপের সেই অলৌকিক সাবলীলতা দেখে আচার্যদেরও বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে যেতে। হস্তিনাপুরের মানুষও দেখেছিল। আর তারা ভালোবেসে ফেলেছিল কুন্তীর পুত্রদের। দুর্যোধন ঠিক এইটুকুই সহ্য করতে পারছিলেন না। পাণ্ডবরা প্রতিভাবান—তাতে দুর্যোধনের কোনো সংশয় ছিল না। তিনি নিজে এবং তাঁর ভাইয়েরাও বীর। কিন্তু দুর্যোধনকে যা কুরে কুরে খেত, যা রাতের অন্ধকারে তাঁর ঘুম কেড়ে নিত, তা হলো হস্তিনাপুরের সাধারণ মানুষের এই অকুণ্ঠ ভালোবাসা। রাজপ্রাসাদের অলিন্দে অলিন্দে তিনি ফিসফাস শুনতেন—বিদ্...

কণিকের নীতি ও ধূর্ত শৃগালের উপাখ্যান: ক্ষমতার অন্ধকার খেলা

Image
  কণিকের নীতি ও ধূর্ত শৃগালের উপাখ্যান: ক্ষমতার অন্ধকার খেলা দ্রুপদ দমনের ঠিক এক বছর পরের কথা। হস্তিনাপুরের সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে যখন চাপা গুঞ্জন চারদিকে, ঠিক তখনই ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে যুবরাজ হিসেবে অভিষিক্ত করলেন। যুধিষ্ঠির—যার চরিত্রে ছিল অদ্ভুত এক স্থৈর্য। তিনি বিনীত, বুদ্ধিদীপ্ত এবং অজাতশত্রু। প্রজারা তাকে ভালোবেসে ফেলল নিজের পিতার চেয়েও বেশি। কিন্তু এই ভালোবাসাই যেন ধৃতরাষ্ট্রের মনে বিষাদ আর ঈর্ষার কালো মেঘ হয়ে ঘনিয়ে এল। পাণ্ডবরা তখন একেকজন অপরাজেয় বীর। ভীম বলরামের কাছে গদাযুদ্ধ আর রথচালনা শিখে ফিরেছেন মদমত্ত হাতির তেজ নিয়ে। অর্জুন হয়ে উঠেছেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ধনুর্ধর। একদিন দ্রোণাচার্য অর্জুনকে ডেকে বললেন, "বৎস, আমি ঋষি অগস্ত্যের শিষ্য অগ্নিবেশের কাছ থেকে ব্রহ্মশির অস্ত্র লাভ করেছিলাম। তা তোমাকে দিয়ে দিয়েছি । তবে মনে রেখো, গুরুর দক্ষিণাস্বরূপ আজ তোমাকে কথা দিতে হবে—প্রয়োজনে আমার বিরুদ্ধেও অস্ত্র ধরতে দ্বিধা করবে না।" অর্জুন বিনত মস্তকে গুরুর চরণ স্পর্শ করলেন। সহদেব বৃহস্পতির কাছে শিখলেন নীতিশাস্ত্র, আর নকুল হয়ে উঠলেন ক্ষিপ্র এক যোদ্ধা। এমনকি রাজা পাণ্ডুও যাকে পরাজ...

দ্রোণের প্রতিশোধ: পাঞ্চালরাজের দর্পচূর্ণ

Image
  দ্রোণের প্রতিশোধ: পাঞ্চালরাজের দর্পচূর্ণ শিক্ষাশেষ।  গুরুদক্ষিণা দেওয়ার লগ্ন সমাগত। পাণ্ডব ও কৌরব রাজপুত্ররা যখন করজোড়ে গুরুর সামনে দাঁড়ালেন, দ্রোণাচার্যের দুচোখে তখন বহু বছরের পুরনো এক অপমানের আগুন ধিকধিক করে জ্বলছে। তিনি কোনো সোনা-দানা বা মণিমাণিক্য চাইলেন না। খুব শান্ত গলায় শিষ্যদের বললেন, "আমার দক্ষিণার জন্য তোমাদের পাঞ্চাল আক্রমণ করতে হবে। পাঞ্চালরাজ দ্রুপদকে যুদ্ধে পরাজিত করে আমার পায়ের কাছে বন্দি করে নিয়ে এসো। সেটাই হবে আমার শ্রেষ্ঠ পাওনা।" দ্রোণাচার্যের এই আদেশ শোনামাত্র কৌরবরা উল্লাসে ফেটে পড়ল। দুর্যোধন, কর্ণ আর দুঃশাসনরা বুক চিতিয়ে আস্ফালন করতে লাগলেন যে, দ্রুপদকে বন্দি করা তাঁদের কাছে সামান্য খেলা মাত্র। পাণ্ডবরা কিন্তু চুপচাপ, তাঁদের চোখেমুখে কেবল যুদ্ধের প্রস্তুতির গাম্ভীর্য। এক বিশাল বাহিনী নিয়ে কৌরবরা পাঞ্চালের দিকে অগ্রসর হলো। রথের ঘর্ঘর আর হাতির বৃংহণে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল। পাঞ্চালের সীমানায় পৌঁছে অর্জুন তাঁর ভাইদের নিয়ে একটু দূরে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন। কৌরবদের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, "আপনারাই আগে যুদ্ধ শুরু করুন। আপনাদের শৌর্য দেখার অপেক্ষায় রইলাম।"...

রণাঙ্গনে রাজপুত্র ও এক অবজ্ঞাত বীর

Image
  রণাঙ্গনে রাজপুত্র ও এক অবজ্ঞাত বীর সূর্য তখন পূর্বাকাশে উদিয়মান। হস্তিনাপুরের বিশাল এক  রণপ্রাঙ্গণ আজ উৎসবের সাজে সেজেছে। চারিদিকে রঙিন পতপত করে উড়ছে ধ্বজা, মাচায় বসেছেন কুরুবংশের ছোট-বড় সবাই। অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের পাশে বসে বিদুর একে একে বর্ণনা করে চলেছেন মাঠের প্রতিটি দৃশ্য—কেমন করে রাজপুত্ররা কৃপাচার্য আর দ্রোণাচার্যের কাছে শিক্ষা শেষ করে আজ তাদের শৌর্য দেখাতে নেমেছে। কুন্তী আর গান্ধারী পাশাপাশি বসেছেন; কুন্তী নীচু স্বরে  চোখবাঁধা গান্ধারীকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন তাঁর সন্তানদের কৃতিত্ব। হস্তিনাপুরের সেই বিশাল প্রাঙ্গণ তখন এক মায়াবী রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দুপুরের রোদে ঝকমক করছে অস্ত্রশস্ত্র। চারিদিকে গ্যালারিভর্তি মানুষ, তাদের চোখের পলক পড়ছে না। ইতিহাস যেখানে রক্ত আর ঘামের গন্ধে কথা বলে, সেদিন হস্তিনাপুর ঠিক তেমনি এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিল। দ্রোণাচার্যের সঙ্কেত পেতেই একে একে রাজপুত্ররা প্রবেশ করলেন ময়দানে। প্রথমে ছোটখাটো নিপুণতা—ঘোড়সওয়ারি, লক্ষ্যভেদ, তারপর শুরু হলো তলোয়ারের ঝনঝনানি। নকুল আর সহদেব যখন তাঁদের বিদ্যুতের মতো দ্রুত তলোয়ার চালাতে শুরু করলেন, মনে হচ্ছিল যেন বাতাস...

অর্জুনের লক্ষ্যভেদ ও একলব্যের নিষ্ঠা: মহাভারতের এক অনন্য গুরু-শিষ্য আখ্যান

Image
 অর্জুনের লক্ষ্যভেদ ও একলব্যের নিষ্ঠা: মহাভারতের এক অনন্য গুরু-শিষ্য আখ্যান ভীষ্মের নির্দেশে যখন দ্রোণাচার্য হস্তিনাপুরে এসে পা রাখলেন, তখন কুরুকুলের ভাগ্যাকাশে এক নতুন সূর্যের উদয় হলো। রাজপুত্রদের অস্ত্রশিক্ষার গুরু হিসেবে তাঁর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে ভীষ্ম কোনো কার্পণ্য করেননি। আভিজাত্য আর শাস্ত্রীয় গাম্ভীর্যে দ্রোণের দিন কাটছিল শিষ্যদের মাঝখানে। একদিন আচার্য দ্রোণ তাঁর শিষ্যদের সামনে এক অদ্ভুত প্রস্তাব রাখলেন। তাঁর চোখেমুখে তখন গভীর কোনো গোপন সংকল্পের ছাপ। তিনি বললেন, "তোমাদের কাছে আমার একটা ব্যক্তিগত প্রার্থনা আছে। ভবিষ্যতে তোমাদের মধ্যে কেউ কি পারবে আমার সেই ইচ্ছা পূরণ করতে?" সভাকক্ষ নিস্তব্ধ। রাজপুত্ররা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। কিন্তু সেই স্তব্ধতা ভেঙে এগিয়ে এল কিশোর অর্জুন। কোনো দ্বিধা নেই, কোনো সংকোচ নেই। সে মাথা নিচু করে বলল, "আচার্য, আমি কথা দিচ্ছি। আপনার যেকোনো আদেশ আমি পালন করব।" দ্রোণ আবেগে আপ্লুত হলেন, পরম স্নেহে অর্জুনকে বুকে টেনে নিলেন। সেই মুহূর্তেই বোধহয় স্থির হয়ে গিয়েছিল যে, এই অর্জুনই হবে তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। এরপর শুরু হলো অলৌকিক দিব্যাস্ত্...

কৃপাচার্য, দ্রোণাচার্য, অশ্বথামার জন্ম এবং দ্রোণাচার্যের অন্তহীন অপমান :

Image
কৃপাচার্য,  দ্রোণাচার্য,  অশ্বথামার জন্ম এবং দ্রোণাচার্যের অন্তহীন অপমান :  মহর্ষি গৌতমের পুত্র শরদ্বান ছিলেন আর পাঁচটা ঋষিপুত্রের চেয়ে আলাদা। যখন অন্য বালকরা আশ্রমে প্রদীপের আলোয় ঝুকে পড়ে বেদপাঠ করত, শরদ্বান তখন বনের নির্জন অন্ধকারে ধনুর গুণ টানতেন। শাস্ত্রের মন্ত্রের চেয়ে তীরের শাঁ শাঁ শব্দই তাঁর কানে বেশি মধুর লাগত। যজ্ঞের আগুনের চেয়ে তাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল লক্ষ্যভেদ। কঠোর সাধনায় তিনি এমন সব মারণাস্ত্র আয়ত্ত করলেন যে স্বর্গের অধিপতি ইন্দ্রের সিংহাসন টলমল করে উঠল। ইন্দ্রের পুরনো অভ্যাস—কারও সাধনা বাড়লেই তাতে বিঘ্ন ঘটানো। আর সেই বিঘ্নের চিরকালীন নাম হলো নারী। ইন্দ্র পাঠালেন অপ্সরা জানপদীকে। শরদ্বান তখন গভীর ধ্যানে। হঠাৎ চোখের পাতা খুলতেই দেখলেন, অরণ্যের সবুজ ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে এক মায়াবী রূপসী। তাঁর আলুলায়িত কেশ আর কামুক দৃষ্টি শরদ্বানের আজীবনের সংযমের বাঁধে ফাটল ধরাল। শরদ্বান ঋষিপুত্র হলেও মানুষ তো বটেন! তাঁর শরীরের রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠল। তিনি লড়াই করেছিলেন নিজের মনের সঙ্গে, কিন্তু প্রকৃতির আদিম টানকে অস্বীকার করার সাধ্য কার? নিজের অজান্তেই তাঁর রেতস্খলন হলো। লজ্জা আর আত্মগ্ল...

কালকূট ও কুণ্ডক রস: ভীমের নবজন্ম এবং দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র

Image
কালকূট ও কুণ্ডক রস: ভীমের নবজন্ম এবং দুর্যোধনের  ষড়যন্ত্র হস্তিনাপুরের সেই বিশাল প্রাসাদের অলিন্দে যখন কুরু-পাণ্ডব ভাইরা একসঙ্গে বড় হচ্ছিল, বাইরে থেকে মনে হতো সবটাই বুঝি নিস্তরঙ্গ জলচ্ছবি। কিন্তু সেই আপাতশান্ত জলের নিচেই পাক খাচ্ছিল এক কালান্তক ঈর্ষার স্রোত। —মানুষের মনের গহিন কোণে যখন বিষ জন্মে, তখন তার নীল ছায়া এসে পড়ে চোখের মণি আর ঠোঁটের হাসিতেও। দুর্যোধনের চোখে সেই বিষ ছিল প্রথম থেকেই। ভীমকে সে সহ্য করতে পারত না। ভীম যেন এক অতিকায় মহীরুহ, যার ছায়ায় দুর্যোধন নিজেকে বড় বেশি বামন মনে করত। ভীমের অট্টহাসি, তার সীমাহীন ভোজনবিলাস, আর তার ওই অবলীলায় হাতিকে উপড়ে ফেলার মতো গায়ের জোর—দুর্যোধনের বুকের ভেতরটা খকখক করে জ্বলত। একদিন এই হিংসে রূপ নিল এক কুটিল ষড়যন্ত্রের। উদক-ক্রীড়ন ও বিষের পাত্র দুর্যোধন একদিন খুব বিনয়ী সেজে বড় ভাইয়ের মতো প্রস্তাব দিল, "চলো, গঙ্গার তীরে উদক-ক্রীড়নে যাই।" প্রমাণ করার চেষ্টা করল, সে বড় স্নেহশীল। গঙ্গার তীরে উদক-ক্রীড়ন বা জলক্রীড়ার আয়োজন হলো। তাঁবু পড়ল, এলাহি ভোজের ব্যবস্থা হলো। কিন্তু দুর্যোধন খুব চতুরভাবে কোনো মন্ত্রী বা বিদুরকে সেই উৎসবে ডাকল না। বড়দের ...

কুন্তী ও পাণ্ডবদের প্রত্যাবর্তন এবং সত্যবতীর মহাপ্রস্থান

Image
  কুন্তী ও পাণ্ডবদের প্রত্যাবর্তন এবং সত্যবতীর মহাপ্রস্থান হস্তিনাপুরের আকাশটা আজ বড় বেশি ফ্যাকাসে। মেঘ নেই, কিন্তু রোদের তেজও যেন কোনো এক বিষণ্ণ চাদরে ঢাকা। প্রাসাদের চত্বরে রথের চাকার ঘড়ঘড় শব্দটা যখন থামল, তখন বাতাস ভারী হয়ে এল এক আর্তনাদে। কুন্তী ফিরেছেন, কিন্তু তাঁর সেই চিরপরিচিত দৃপ্ত পদচারণা আজ পাথরচাপা কান্নায় স্তব্ধ। সঙ্গে পাঁচটি শিশু—পিতৃহীন পাঁচ পাণ্ডব। ধুলোমাখা মুখে তারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছে এই বিশাল পাথরের প্রাসাদকে, যা তাদের অধিকারের, অথচ আজ বড় অচেনা। অম্বালিকা বাতায়নের ধারে বসে ছিলেন। সংবাদটা যখন এল যে পাণ্ডু নেই, আর তাঁর প্রিয়তমা পত্নী মাদ্রীও আগুনের শিখায় নিজেকে সঁপে দিয়েছেন, তখন মুহূর্তের জন্য তাঁর হৃৎস্পন্দন থমকে গেল। শরীরটা তাঁর জন্ম থেকেই পাণ্ডুর ছিল, আজ যেন তা স্বচ্ছ পাথরের মতো সাদা হয়ে গেল। পুত্রশোকের এই দহন রাজকীয় বসনের চেয়েও অনেক বেশি ভারী, অনেক বেশি নিষ্ঠুর। পা টলছিল, তবু তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন বড় দিদি অম্বিকার কক্ষে। সেখানে ধৃতরাষ্ট্রের পাশে অম্বিকা এক মূর্তিমতী উদ্বেগের মতো বসে ছিলেন। অম্বালিকার দীর্ঘশ্বাসের শব্দে অম্বিকা চমকে উঠলেন। "অম্বা? পাণ্ডু ...

পান্ডবদের জন্ম এবং পান্ডুর পরলোক যাত্রা

Image
  পান্ডবদের জন্ম এবং পান্ডুর পরলোক যাত্রা শতশৃঙ্গের সেই বিষণ্ণ বসন্ত সেদিন আকাশ জুড়ে ছিল ঘন অমাবস্যার ছায়া। শতশৃঙ্গ পর্বতের নির্জনতায় বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। পাণ্ডু দেখলেন, একদল মুনি-ঋষি গন্তব্যহীন এক যাত্রার জন্য তৈরি হচ্ছেন। পাণ্ডু কৌতূহলী হয়ে হাত জোড় করে শুধোলেন, "আপনাদের এই যাত্রা কোথায়?" এক ঋষি স্মিত হাসলেন, তাতে জাগতিক কোনো চপলতা ছিল না। বললেন, "আমরা ব্রহ্মলোকের পথে চলেছি, মহারাজ।" পাণ্ডুর মনে হলো, তাঁরও তো মুক্তি দরকার। রাজপ্রাসাদের ঐশ্বর্য ত্যাগ করে তিনি অরণ্যবাসী হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতরটা যে এখনো খাঁ খাঁ করছে। তিনি দুই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ঋষিদের পিছু নিলেন। কিন্তু পথ বড় কঠিন। ঋষিরা থামিয়ে দিলেন তাঁকে। তাঁদের কণ্ঠে ছিল রুক্ষ সত্যের সুর, "এ পথ বড় দুর্গম রাজন্‌! কোথাও জমাট বরফের মরুভূমি, কোথাও অপ্সরাদের চপলতা। রানীদের কোমল শরীরে এই পথ সইবে না। ফিরে যান।" পাণ্ডুর বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। তিনি ম্লান স্বরে বললেন, "ঋষিবর, নিঃসন্তান মানুষের কাছে কি কোনো লোকই অবারিত নয়? পিতৃঋণ, দেবঋণ তো মিটিয়েছি, কিন্তু ব...

পাণ্ডুর রাজসুখ থেকে তপোবন: পাণ্ডুর নির্বাসন ও একটি অভিশপ্ত মুহূর্ত

Image
পাণ্ডুর রাজসুখ থেকে তপোবন: পাণ্ডুর নির্বাসন ও একটি অভিশপ্ত মুহূর্ত সে এক আশ্চর্য ধূসর দিন। বনের গভীরে তখন ছায়ার আলপনা। হস্তিনাপুরের অধিপতি পাণ্ডু তখন মৃগয়ার নেশায় মত্ত, রক্তের ভেতর ছুটছে আদিম উত্তেজনা। তিনি জানতেন না, নিয়তি তাঁর অলক্ষ্যে এক অমোঘ জাল বুনে রেখেছে। পাশে দুই ছায়াসঙ্গিনী—কুন্তী আর মাদ্রী। হঠাৎ ঝোপের আড়ালে নজরে এল এক জোড়া হরিণ-হরিণী। জাগতিক সব ভুলে তারা তখন মিলনের শিখরে। ঠিক সেই কামাতুর মুহূর্তে পাণ্ডুর ধনুক থেকে পাঁচটি তীক্ষ্ণ সায়ক তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে বিঁধল তাদের শরীরে। রক্তাক্ত হরিণটি যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে হঠাৎ মানুষের গলায় আর্তনাদ করে উঠল। সে কণ্ঠস্বর কোনো পশুর নয়, বরং এক ক্রুদ্ধ ঋষির। "মহারাজ, আপনি কি মানুষ? চরম মূর্খ বা নৃশংস ব্যাধও তো এমন কাজ করে না!" পাণ্ডু স্তম্ভিত। হরিণরূপী ঋষি কিংদম বলে চললেন, "মানুষের বেশে মিলনে লজ্জিত বোধ করেছিলাম বলেই এই মৃগরূপ ধারণ। আপনি অজ্ঞাতসারে আমায় শরবিদ্ধ করেছেন ঠিকই, কিন্তু মিলনের এই সুতীব্র ব্যাঘাতের অপরাধ ক্ষমা করা যায় না। আজ থেকে আপনিও যখনই কোনো স্ত্রীর সান্নিধ্যে যাবেন, সেই মিলনের মুহূর্তই হবে আপনার অন্তিম মুহূর্ত...

এ যুগের একটি অবক্ষয়ের আখ্যান- রক্তের ঋণ ও একটি নীল তৃষ্ণা-বাস্তব ঘটনার ছায়ায় রচিত

Image
এ যুগের একটি অবক্ষয়ের আখ্যান- রক্তের ঋণ ও একটি নীল তৃষ্ণা-বাস্তব ঘটনার ছায়ায় রচিত সুমন মানুষটা ছিলেন খটখটে শুকনো কাঠের মতো। পুলিশের হেড কনস্টেবল, খাকি উর্দির ভেতরে একটা পুরনো আমলের নীতিবোধকে সবসময় ইস্ত্রি করে রাখতেন। কিন্তু সেই উর্দির তলায় যে একটা নরম পিতা লুকিয়ে ছিল, সেটা তিনি বুঝতে পারেননি। মেয়ে শিউলি যখন কমলের প্রেমে পড়ল, সুমনবাবু সেটাকে স্রেফ একটা অবাধ্যতা হিসেবে দেখেননি, দেখেছিলেন তাঁর এতদিনের গড়ে তোলা সংসারের শৃঙ্খলায় একটা বড়সড় ফাটল হিসেবে। আজকালকার মেয়েদের মন বোঝা বড় দায়। তাদের কাছে আবেগ আর অধিকারের সীমানাটা বড় দ্রুত বদলে যায়। শিউলির  চোখে তখন কমল মানেই মুক্তি, আর বাবা মানে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। সেই দেয়াল টপকানোর চেয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়াটাই তার কাছে সহজ মনে হয়েছিল। বিষের নীল নকশা মদতদাতা হিসেবে শিউলি বেছে নিল নিজেরই ভাই চেতনকে। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা—একটা মানুষের জীবনের দাম কি আজকের দিনে এতটাই সস্তা? সেই টাকায় কেনা হলো বিষ। শিউলির  হাত কাঁপেনি। যে হাতে ছোটবেলায় বাবার আঙুল ধরে মেলায় যেত, সেই হাতেই সে তৈরি করল এক গ্লাস মিল্কশেক। উপরে ঘন ফেনা, ভেতরে মৃত্যু। "বাবা, ডিউটিতে যাওয়ার...

দুর্যোধনের জন্ম -হস্তিনাপুরের সেই কালবেলা

Image
দুর্যোধনের জন্ম -হস্তিনাপুরের সেই কালবেলা হস্তিনাপুরের প্রাসাদে সেদিন এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেব এসেছেন। গান্ধারীর সেবা আর নিষ্ঠায় ঋষি প্রসন্ন, আর ঋষিরা যখন তুষ্ট হন, তাঁদের দাক্ষিণ্য তখন বাঁধ মানে না। ব্যাসদেব দু-হাত উজাড় করে বর দিতে চাইলেন। কিন্তু গান্ধারীর মনের গভীরে তখন এক চোরা স্রোত বইছে। খবর এসেছে, কুন্তী সন্তানসম্ভবা।   গান্ধারী জানতেন, কুন্তীর সন্তান আগে ভূমিষ্ঠ হওয়া মানেই হস্তিনাপুরের রাজমুকুট তার মাথায় ওঠা। উত্তরাধিকারের এই লড়াইয়ে নিজের অনাগত সন্তান কি তবে ব্রাত্য হয়ে থাকবে? ঈর্ষা আর আশঙ্কার এক জটিল বুনোটে গান্ধারী চাইলেন এক অদ্ভুত বর— ধৃতরাষ্ট্রের মতোই একশোটি বলবান পুত্র। ব্যাসদেব স্মিত হেসে বললেন, ‘তথাস্তু’। যেন অমোঘ নিয়তির এক নীল নকশা আঁকা হয়ে গেল সেদিনই। লোহার পিণ্ড ও ১০১টি ঘৃতকুম্ভ দিন যায়, মাস যায়, কিন্তু গান্ধারীর প্রতীক্ষা আর ফুরোয় না। দীর্ঘ দুই বছর অতিক্রান্ত, অথচ গর্ভস্থ সন্তান পৃথিবীর আলো দেখল না। ওদিকে সংবাদ এল, কুন্তীর কোলে এসেছে যুধিষ্ঠির। হতাশায়, যন্ত্রণায় আর নিজের ওপর তীব্র অভিমানে গান্ধারী সজোরে আঘাত করলেন নিজের উদরে। ভূমিষ্ঠ হলো ন...