Posts

২২তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অহঙ্কারের অন্ধকার ও রক্তচক্ষু: কুরুক্ষেত্রের প্রাক্কালে দুর্যোধনের হুঙ্কার

Image
২২তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অহঙ্কারের অন্ধকার ও রক্তচক্ষু: কুরুক্ষেত্রের প্রাক্কালে দুর্যোধনের হুঙ্কার ​ধৃতরাষ্ট্রের ঘরের আবহাওয়া ভারী হয়ে উঠেছিল এক অজানা আশঙ্কায়। অন্ধ রাজার চোখ দুটি নিষ্ফল হলেও তাঁর বুকের ভেতরটা থরথর করে কাঁপছিল। কুরুকুলের ভবিতব্য কোন গভীর গিরিখাতে তলিয়ে যেতে বসেছে, তা অনুমিত হলেও তা অস্বীকার করার আকুল চেষ্টা করছিলেন তিনি। ঠিক তখনই ঘরের নীরবতা খানখান করে ভেতরে প্রবেশ করলেন যুবরাজ দুর্যোধন। চোখে তাঁর দ্বিধাহীন ক্রোধ, মুখে অহঙ্কারের এক উদ্ধত হাসি। ​পিতার বিহ্বলতা দেখে দর্পভরে হেসে উঠলেন দুর্যোধন— "মহারাজ! ভয় পাবেন না। মিথ্যে চিন্তা করে নিজেকে কেন ক্ষয় করছেন? আমাদের জন্য একটুও ভাববেন না। আমরা দুর্বল নই, শত্রুকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তি আমাদের রক্তে এখনও বইছে।" ​দুর্যোধন ঘরময় পায়চারি করতে করতে বলতে লাগলেন, "ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে যখন পাণ্ডবরা বনে গেল, আর সেখানে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বিশাল বাহিনী নিয়ে হাজির হলেন— কেকয়রাজ, ধৃষ্টকেতু, ধৃষ্টদ্যুম্ন সব মহারথীরা একজোট হয়ে আপনাকে আর কৌরবদের অশেষ নিন্দা-গালাগাল দিলেন। আত্মীয়দের ধ্বংস করে রাজ্য ফ...

২১তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কুরুক্ষেত্রের ছায়া ও অন্ধ রাজার হাহাকার

Image
২১তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কুরুক্ষেত্রের ছায়া ও অন্ধ রাজার হাহাকার ​ধৃতরাষ্ট্রের দুই চোখের অন্ধকার যেন আজ আরও ঘন হয়ে এসেছে। সঞ্জয়ের মুখে পাণ্ডবশিবিরের প্রস্তুতির বিবরণ শুনতে শুনতে বৃদ্ধ রাজার বুক কেঁপে ওঠে এক অজানা আশঙ্কায়। ​সঞ্জয়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে ভগ্নকণ্ঠে ধৃতরাষ্ট্র বললেন— "সঞ্জয়, তুমি যাদের কথা বললে, তারা প্রত্যেকেই এক-একজন দিগ্বিজয়ী বীর। কিন্তু সেই বিশাল তালিকার একপাশে সবাইকে রাখো, আর অন্যপাশে একক ভীমকে বসাও। বনের হিংস্র জীবেরা যেমন সিংহকে দেখে ভয়ে থরথর করে কাঁপে, রাতভর এই ভীমের কথা ভেবে আমারও চোখের পাতা এক হয় না। কৌরবদের প্রতি তার ঘৃণা অপরসীম, প্রতিশোধের আগুন তার চোখে জ্বলছে। সে মহা শক্তিশালী, একরোখা আর উন্মত্ত। যুদ্ধক্ষেত্রে নামলে সে যে আমার দুর্বল পুত্রদের কচুকাটা করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ছেলেবেলায় যখন ও আমার ছেলেদের সঙ্গে সাধারণ খেলাধুলো করত, তখনই ওদের হাতির মতো পিষে মারত। আর আজ যখন ও হাতে গদা তুলে নিয়ে রণক্ষেত্রে তাণ্ডব নাচ নাচবে, তখন রথ, হাতি, ঘোড়া আর মানুষের মাংসখণ্ড বাতাসে উড়বে। মগধের রাজচক্রবর্তী জরাসন্ধকে মনে আছে তো? কৃষ্ণকে সঙ্গে নিয়ে তার রাজপ্রাসাদে ঢুকে ভীম ...

২০তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-মহাভারতের মহাআখ্যান: কৌরব সভায় ভীষ্মের হুঙ্কার ও সঞ্জয়ের যুদ্ধবার্তা!

Image
২০তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-মহাভারতের মহাআখ্যান: কৌরব সভায় ভীষ্মের হুঙ্কার ও সঞ্জয়ের যুদ্ধবার্তা! কৌরব সভায় তখন থমথমে নিস্তব্ধতা। সঞ্জয়ের দীর্ঘ বিবরণ শেষ হতেই শান্তনুনন্দন ভীষ্ম সোজা দুর্যোধনের দিকে স্থির দৃষ্টি পাত করে উঠে দাঁড়ালেন। কঠোর কণ্ঠে বললেন— "দুর্যোধন, একটি অতি প্রাচীন সত্যের কথা শোনো। বহুকাল আগে দেবগুরু বৃহস্পতি, শুক্রাচার্য এবং দেবরাজ ইন্দ্রকে পরিবৃত্ত করে ব্রহ্মা যখন আসীন ছিলেন, ঠিক সেই সময় দুজন পরম তেজস্বী ঋষি নিজেদের অলৌকিক প্রভাবে সকলের চিত্ত ও জ্যোতি হরণ করে সেখান থেকে চলে যান। স্তব্ধ বৃহস্পতির প্রশ্নের উত্তরে ব্রহ্মা বলেছিলেন, এঁরা সাধারণ কোনো তাপস নন—স্বয়ং সনাতন নর ও নারায়ণ। জগতের কল্যাণ সাধনে এবং অসুর বিনাশে তাঁরা একই পরম সত্তার দুটি ভিন্ন রূপ ধরে অবতীর্ণ হয়েছেন। আজ সেই প্রাচীন নরই অর্জুন, আর নারায়ণ হলেন শ্রীকৃষ্ণ। যেদিন শঙ্খ-চক্র-গদা ধারণকারী কৃষ্ণের পাশে গাণ্ডীব হাতে অর্জুনকে একই রথে দেখতে পাবে, সেদিন আমার এই সতর্কবাণী তোমার মনে পড়বে। তুমি আজ সূতপুত্র কর্ণের দম্ভ, শকুনির কুটিল চক্রান্ত আর দুঃশাসনের মূঢ়তার ওপর ভরসা করে কৌরব বংশকে ঘোর বিনাশের মুখে ঠেলে দিচ্...

১৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব

Image
১৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-গাণ্ডীবের গর্জন ও অর্জুনের হুঙ্কার: থমথমে কৌরবসভায় সঞ্জয়ের দুঃসংবাদ দুর্যোধনের রাজসভায় সেদিন কেমন একটা থমথমে ভাব। ধৃতরাষ্ট্র সারারাত সনৎসুজাত আর বিদুরের সঙ্গে গভীর তত্ত্বকথা বলে কাটিয়েছেন — চোখে দেখতে পান না ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতর একটা অজানা ভয় তাঁকে অস্থির করে রেখেছে। সকাল হতেই সভায় একে একে এসে বসলেন ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ, শল্য, কৃতবর্মা, জয়দ্রথ, অশ্বত্থামা, সোমদত্ত, বিদুর, যুযুৎসু — বড় বড় যোদ্ধা আর রাজারা। অন্যদিকে দুর্যোধন, দুঃশাসন, শকুনি, কর্ণ, দুর্মুখ আর বাকি কৌরব ভাইয়েরা নিজেদের দম্ভ নিয়ে বসে আছেন। সবাই তাকিয়ে আছেন দরজার দিকে — পাণ্ডবদের কাছ থেকে বার্তা নিয়ে সঞ্জয় ফিরছেন। সঞ্জয় রথ থেকে নেমে সভায় ঢুকে প্রণাম করে বললেন, "আমি পাণ্ডবদের শিবির থেকে আসছি। তাঁরা আপনাদের সবাইকে যথাযথ সম্মান জানিয়েছেন।" ধৃতরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "সঞ্জয়, বলো তো, অর্জুন ঠিক কী বলেছে?" সঞ্জয় তখন দুর্যোধনের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন — "রাজা, শ্রীকৃষ্ণের সামনে আর যুধিষ্ঠিরের অনুমতি নিয়ে অর্জুন যা বলেছেন, সেটা মন দিয়ে শুনুন...

১৮তমভাগ উদ্যোগপর্ব-)(সনৎসুজাতীয়- ষষ্ঠ অধ্যায়) পরমাত্মার স্বরূপ আর যোগীদের তাঁকে উপলব্ধি করা

Image
১৮তমভাগ উদ্যোগপর্ব-)(সনৎসুজাতীয়- ষষ্ঠ  অধ্যায়) পরমাত্মার স্বরূপ আর যোগীদের তাঁকে উপলব্ধি করা সনৎসুজাত বললেন — ব্রহ্ম হলেন শুদ্ধ, মহান, আলোয় ভরা, উজ্জ্বল, আর অসীম মহিমার অধিকারী। সব দেবতাই তাঁর আরাধনা করেন। তাঁরই আলোয় সূর্য আলোকিত হন। এই চিরন্তন ভগবানকেই যোগীরা উপলব্ধি করতে পারেন। শুদ্ধ, চেতনাময়, আনন্দময় সেই পরব্রহ্ম থেকেই হিরণ্যগর্ভের জন্ম, আর সেখান থেকেই সবকিছুর বিকাশ। সেই শুদ্ধ, আলোকময় ব্রহ্মই সূর্যসহ জগতের সব আলোর মধ্যে থেকে নিজেকে প্রকাশ করছেন। তিনি অন্য কারো আলোয় প্রকাশিত হন না, বরং নিজেই সবকিছুর আলোর উৎস। এই চিরন্তন ভগবানকেই যোগীরা উপলব্ধি করেন। পরমাত্মা থেকেই প্রকৃতির জন্ম, প্রকৃতি থেকে মহতত্ত্বের প্রকাশ, আর তার মধ্যেই আকাশে সূর্য আর চন্দ্র—এই দুই দেবতা অবস্থান করেন। জগৎ সৃষ্টিকারী ব্রহ্মের যে স্বপ্রকাশ রূপ, তা সর্বদা সজাগ থেকে এই দুই দেবতা, পৃথিবী আর আকাশকে ধরে রাখে। এই চিরন্তন ভগবানকেই যোগীরা উপলব্ধি করেন। এই দুই দেবতা, পৃথিবী, আকাশ, সব দিক আর সমস্ত বিশ্বকেই সেই শুদ্ধ ব্রহ্ম ধরে রাখেন। তাঁর থেকেই দিকগুলোর উৎপত্তি, তাঁর থেকেই নদী বয়ে চলে, তাঁর থেকেই বিশাল সমুদ্রের জ...

১৭তমভাগ উদ্যোগপর্ব-(সনৎসুজাতীয়- পঞ্চম অধ্যায়) অহংকার থেকে অমরত্ব: সনৎ সুজাতের সান্নিধ্যে জীবনের আসল সাধনা

Image
১৭তমভাগ উদ্যোগপর্ব-(সনৎসুজাতীয়- পঞ্চম  অধ্যায়) অহংকার থেকে অমরত্ব: সনৎ সুজাতের সান্নিধ্যে জীবনের আসল সাধনা সনৎ সুজাত বললেন, “রাজন, মানুষের জীবনে এমন কিছু দোষ আছে, যা ধীরে ধীরে তার পতন ডেকে আনে। শোক, ক্রোধ, লোভ, মোহ, কামনা, অহংকার, অতিরিক্ত ঘুম, ঈর্ষা, অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা, কাপুরুষতা, ভালো মানুষের মধ্যেও দোষ খোঁজা এবং অন্যের নিন্দা করা—এই বারোটি বড় দোষ মানুষের জীবনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। মানুষ যখন একের পর এক এসব দোষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, তখন তার বিচারবুদ্ধি নষ্ট হয় এবং সে অন্যায় কাজে জড়িয়ে পড়ে। যারা অতিরিক্ত লোভী, নিষ্ঠুর, কঠিন ভাষায় কথা বলে, কৃপণ, রাগী এবং সবসময় নিজের প্রশংসা করে—তারা সাধারণত নিষ্ঠুর কাজের দিকে ঝোঁকে। আবার যারা শুধু নিজের ভোগের কথা ভাবে, মানুষের সঙ্গে অন্যায় বা পক্ষপাতমূলক আচরণ করে, অতিরিক্ত অহংকারী, সামান্য দান করে তার অনেক প্রচার করে, কৃপণতা করে, নিজের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি শক্তি দেখায় এবং নারীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে—তাদেরও পাপী ও নিষ্ঠুর বলা হয়েছে। অন্যদিকে ধর্ম, সত্য, তপস্যা, ইন্দ্রিয় সংযম, ঈর্ষাহীনতা, লজ্জা, সহনশীলতা, অন্যের দোষ না দেখা, দান, শাস্ত্রজ্...

১৬তমভাগ উদ্যোগপর্ব -সনৎসুজাতীয়- চতুর্থ অধ্যায় ব্রহ্মচর্যের পথে অমরত্বের সন্ধান: সনৎসুজাত-ধৃতরাষ্ট্র সংবাদ,

Image
১৬তমভাগ উদ্যোগপর্ব -সনৎসুজাতীয়- চতুর্থ অধ্যায়  ব্রহ্মচর্যের পথে অমরত্বের সন্ধান: সনৎসুজাত-ধৃতরাষ্ট্র সংবাদ,  ধৃতরাষ্ট্র অধৈর্য হয়ে বলে উঠলেন, "হে মহামতি, ঈশ্বর আর এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের পরম সত্য নিয়ে আপনি যেসব গভীর কথা শোনালেন, সেখানে তো পার্থিব আনন্দ বা বিষয়বাসনার কোনো জায়গাই নেই! তবু আমার মনটা এখনো শান্ত হচ্ছে না। দয়া করে এই দুর্লভ তত্ত্বটা আরেকবার বুঝিয়ে বলুন আমাকে।" একটু হেসে জবাব দিলেন সনৎসুজাত, "রাজা, তুমি যখন আমাকে এই প্রশ্নগুলো করছ, তোমার ভেতরে একটা চাপা উত্তেজনা, একটা ব্যাকুলতা কাজ করছে বুঝতে পারি। মন যদি এমন চঞ্চল, উদ্বেলিত থাকে, তাহলে পরম সত্যের বা ব্রহ্মের অনুভূতি পাওয়া যায় না। বুদ্ধি দিয়ে যখন মনের সব চঞ্চলতাকে শান্ত করা যায়, মন যখন একদম নিশ্চল হয়ে যায়, তখনই আসল ব্রহ্মজ্ঞান জন্ম নেয়। আর সেখানে পৌঁছানোর একমাত্র পথ ব্রহ্মচর্য পালন করা।" হাত জোড় করে ধৃতরাষ্ট্র বললেন, "কিন্তু যা কোনো বস্তুগত কর্মের মধ্য দিয়ে শুরু হয় না, কর্মের শেষ ফল হিসেবেও যাকে ধরা যায় না—সেই সনাতন সত্য, যা কেবল আত্মার ভেতরে চিরকাল থেকে যায়—বলুন তো, সাধারণ মানুষ কি...