Posts

দশম ভাগ বিরাট পর্ব- পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসের সমাপ্তি

Image
 দশম ভাগ বিরাট পর্ব- পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসের সমাপ্তি যুদ্ধ থেমে গেলে একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে রণক্ষেত্রে— যেন এতক্ষণ যে ঝড় বয়ে গেল, তার রেশ কাটতে আরেকটু সময় লাগে সবারই। কৌরবরা তখন পালিয়ে গেছেন, আর সেই এলোমেলো ভিড়ের মধ্যে থেকে যারা এদিক-ওদিক লুকিয়ে ছিল, সেই সব সাধারণ সৈনিক, তারা একে একে ভয়ে ভয়ে বেরিয়ে এল অর্জুনের সামনে। ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, পিপাসার্ত, পরের দেশে এসে যুদ্ধ করার সেই অসহায়তা তাদের চোখেমুখে স্পষ্ট। তারা মাথা নত করে বলল— কুন্তীনন্দন, আমরা আপনার আদেশ মেনে চলব। অর্জুন তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন— তোমাদের মঙ্গল হোক। ভয় পেয়ো না, নিজেদের দেশে ফিরে যাও। যারা বিপদে পড়ে, আমি তাদের মারি না। বিশ্বাস রাখো। এই কথায় কী যে স্বস্তি নেমে এল তাদের মধ্যে! তারা আয়ু, কীর্তি, যশ কামনা করে আশীর্বাদ জানাল অর্জুনকে, তারপর ফিরে গেল যে যার পথে। তারপর অর্জুন উত্তরকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন— পুত্র, তুমি এখন জেনে গেছ, তোমার বাবার কাছেই আমরা এতদিন লুকিয়ে ছিলাম। কিন্তু নগরে ঢুকে এই কথা প্রকাশ কোরো না, তাহলে তোমার বাবা ভয়েই হয়তো প্রাণ হারাবেন। উত্তর তখনও পুরোপুরি ...

নবমভাগ বিরাটপর্ব বিজয়ী অর্জুন এবং এক বিষণ্ণ অপরাহ্ন

Image
  নবমভাগ বিরাটপর্ব বিজয়ী অর্জুন এবং এক বিষণ্ণ অপরাহ্ন অর্জুনের একক বিজয় এরপর অশ্বত্থামা এসে আক্রমণ করলেন অর্জুনকে। মেঘ যেমন অঝোরে জল ঢালে, তেমনি তাঁর ধনুক থেকে বাণ ঝরতে লাগল। বাণের বেগ ছিল ঝড়ের মতো, তবু অর্জুন সেগুলো ঠেকিয়ে দিয়ে অশ্বত্থামার ঘোড়াগুলোকে আহত করলেন। অশ্বত্থামাও কম যান না, একটুখানি সুযোগ পেয়েই বাণ দিয়ে অর্জুনের ধনুকের ছিলা কেটে দিলেন। এই কাজ দেখে দেবতারা পর্যন্ত প্রশংসা করলেন, ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, কৃপাচার্য সবাই তারিফ করলেন অশ্বত্থামার। তারপর আবার তিনি অর্জুনকে লক্ষ্য করে বাণ ছুঁড়লেন, আর দুজনের মধ্যে জমে উঠল রোমাঞ্চকর লড়াই। দুজনেই মহাবীর, দুজনেই একে অপরের ওপর ক্রমাগত বাণ ছুঁড়ে চললেন। অর্জুনের কাছে ছিল দিব্য তূণীর— তাতে বাণ কখনো ফুরাত না, তাই তিনি লড়ছিলেন পাহাড়ের মতো অটল হয়ে। কিন্তু অশ্বত্থামার বাণ ফুরিয়ে এল একসময়, তাই লড়াইয়ে অর্জুন এগিয়ে গেলেন। বি:দ্র: অশ্বথামার জন্ম কাহিনি ঝালিয়ে নিতে এখানে ক্লিক করুন  ঠিক তখনই কর্ণ তাঁর ধনুকে টঙ্কার দিলেন। সেই শব্দ শুনে অর্জুন ফিরে তাকালেন, আর কর্ণকে দেখামাত্র তাঁর চোখে জ্বলে উঠল পুরনো রাগ। অশ্বত্থামাকে ছেড়ে ত...

অষ্টমভাগ-বিরাটপর্ব- গাণ্ডীবের টঙ্কার আর সেই প্রথম কুরুক্ষেত্রের আগে প্রথম যুদ্ধ

Image
অষ্টমভাগ-বিরাটপর্ব- গাণ্ডীবের টঙ্কার আর সেই প্রথম কুরুক্ষেত্রের আগে প্রথম যুদ্ধ কৌরব সেনার ব্যূহ সবে তৈরি শেষ হয়েছে, অমনি দিগন্ত চিরে ধেয়ে এল এক উথালপাথাল ঘর্ঘর শব্দ— অর্জুনের রথ আসছে! সবার আগে চমকে উঠলেন আচার্য দ্রোণ। দূর-দিগন্তে ওই রথের কপিধ্বজা আর আকাশ কাঁপানো হনুমানের গর্জন চিনে নিতে তাঁর এক মুহূর্তও দেরি হয়নি। গাঢ় স্বরে দ্রোণ বলে উঠলেন, “চোখ মেলে দেখো বীরগণ, অর্জুন আসছে! শুনছ গাণ্ডীবের ওই টঙ্কার? ঠিক যেন বাজ পড়ছে!” কথা শেষ হতে না হতেই দু'টি বাণ এসে বসল দ্রোণের চরণে, আর দু'টি ছিটকে গেল তাঁর কানের পাশ দিয়ে। কতকালের বনবাস আর নির্বাসন সয়ে এসে প্রিয় শিষ্য আজ এইভাবেই গুরুকে প্রণাম জানাল, কুশল শুধাল। গুরুর বুকে তখন স্নেহ আর গর্বের এক তোলপাড় ঝাপটা— মুহূর্তের জন্য যেন যুদ্ধের নিষ্ঠুরতাই থমকে গেল। কিন্তু অর্জুনের দৃষ্টি তখন জ্বলছে অন্য আগুনে। রথ একটু এগিয়ে নিতে বলে তিনি খুঁজলেন দুর্যোধনকে। না, কুরুকুলের সেই অধম কোথাও নেই! অর্জুন বুঝলেন, প্রাণের ভয়ে গোধন নিয়ে সে দক্ষিণ দিকে চম্পট দিয়েছে। উত্তরকে রথের মুখ ঘোরাতে বলেই শুরু হলো অর্জুনের প্রলয়নাচন। গাণ্ডীবের গুণ থেকে ঠিকরে বেরোতে লাগল...

সপ্তমভাগ বিরাটপর্ব -বিরাট রাজার রাজপুত্র উত্তর আর বৃহন্নলা অর্জুন: এক আত্মআবিষ্কারের গল্প

Image
সপ্তমভাগ বিরাটপর্ব -বিরাট রাজার রাজপুত্র উত্তর আর বৃহন্নলা অর্জুন: এক আত্মআবিষ্কারের গল্প বিরাট রাজার নগরে তখন শ্মশানের নিস্তব্ধতা। ত্রিগর্ত সেনার পিছু নিয়ে রাজা স্বয়ংশে সৈন্যদলের একটা বড় অংশ নিয়ে বেরিয়েছেন গোধন উদ্ধার করতে। আর ঠিক সেই অরক্ষিত মুহূর্তটারই তো অপেক্ষায় ছিলেন হস্তিনাপুরের দুর্যোধন। এমন সুযোগ বারবার আসে না— রাজা নগরের বাইরে, রাজধানীর প্রতিরক্ষা দুর্বল, আর সামনে পড়ে আছে হাজার হাজার অরক্ষিত গবাদিপশু। দুর্যোধন তাই আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করলেন না। মন্ত্রী ও প্রধান প্রধান বীরদের সঙ্গে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বিরাটনগরের ওপর। ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা, শকুনি, দুঃশাসন, বিকর্ণ, চিত্রসেন— কে নেই সেই তালিকায়! প্রায় ষাট হাজার গোধন রথের বেড়া দিয়ে ঘিরে তাঁরা তাড়িয়ে নিয়ে চললেন হস্তিনাপুরের দিকে। গোপালগণ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল বটে, কিন্তু ঐ কালান্তক মহারথীদের সামনে তাদের সেই প্রচেষ্টা ছিল নিতান্তই করুণ ও নিরুপায়। কৌরব সেনাদের হাতে মার খেয়ে, রক্তাক্ত হয়ে তারা আর্তনাদ করতে করতে ছুটল। তাদের সর্দার কোনোমতে একটা রথ জোগাড় করে ফিরে এল নগরে। সোজা গিয়ে ঢুকল রা...

ষষ্ঠভাগ-বিরাটপর্ব গোধূলির আলোয় রক্তের দাগ: সুশর্মার দম্ভ চূর্ণ

Image
ষষ্ঠভাগ-বিরাটপর্ব গোধূলির আলোয় রক্তের দাগ: সুশর্মার দম্ভ চূর্ণ কৃষ্ণপক্ষের সপ্তমীর আকাশটা সেদিন যেন একটু বেশিই থমথমে হয়ে উঠেছিল। বাতাসের গায়ে কেমন এক অনিশ্চয়তার গন্ধ। ত্রিগর্তের রাজা সুশর্মা বহুদিনের জমানো পুরনো রাগের খাঁজগুলো ঘষে মেজে শাণ দিচ্ছিলেন বহু সময় ধরে। আজ সেই হিসেব চুকোনোর দিন। অগ্নিকোণ থেকে তিনি আছড়ে পড়লেন বিরাট রাজার গোধনের ওপর। প্রথম দিনেই লুঠ হয়ে গেল হাজার হাজার গোরু, আর ঠিক তার পরের দিন, যেন কোনো গোপন সংকেতে, কৌরবদের পুরো বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল অন্য দিক থেকে। কিন্তু সুশর্মা জানতেন না, সময় আর নিয়তি কীভাবে একই রেখায় এসে দাঁড়ায়। পাণ্ডবদের বারো বছরের বনবাস আর এক বছরের ছদ্মবেশের মেয়াদ ঠিক ওই দিনটিতেই নিঃশব্দে শেষ হয়েছিল। গোরুর ধুলো উড়িয়ে ত্রিগর্তের সেনাদল যখন বহুদূরে চলে যাচ্ছে, রাজপ্রাসাদে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এল প্রধান রাখাল। হাঁটু মুড়ে বসে আর্জি জানাল, "মহারাজ! ত্রিগর্তরাজ এক লাখ গোরু ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। এখনই না থামাল সব শেষ হয়ে যাবে!" মৎস্যরাজ বিরাট মুহূর্তও দ্বিধা করলেন না। মুহূর্তে চারদিকে রণশিঙা বেজে উঠল। রথ, হাতি, ঘোড়া, পদাতিক—সমস্ত বাহিনীকে সাজিয়ে ত...

পঞ্চমভাগ বিরাটপর্ব -বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ ও কৌরব সভায় নিঃশব্দ ষড়যন্ত্র-

Image
পঞ্চমভাগ বিরাটপর্ব -বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ ও কৌরব সভায় নিঃশব্দ ষড়যন্ত্র- সংবাদটা প্রথমে এল বাতাসের মতো, কেউ জানে না ঠিক কোথা থেকে তার উৎপত্তি। তারপর একজন ফিসফিস করে বলল, তারপর আরেকজন, আর দেখতে দেখতে সমস্ত হস্তিনাপুর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল একটাই অবরুদ্ধ গুঞ্জন— কীচক আর নেই। মহাবলী কীচক, যাঁর প্রতাপের নাম শুনলে ত্রিগর্তের অভিজ্ঞ সৈন্যরাও দু-পা পিছিয়ে যেত, তাঁকে তাঁর ভাইদের সমেত কারা যেন এক রাতে নিস্তব্ধে মুছে দিয়েছে পৃথিবীর বুক থেকে। বিরাট রাজার রাজসভায় যে মানুষটা এতদিন বাঘের মতো দর্পভরে হেঁটে বেড়াত, সে আজ নিথর, নিঃশ্বাসহীন। খবরটা প্রথমটা কারও বিশ্বাসই হতে চায়নি। তারপর ধীরে ধীরে, এক হিমশীতল সত্যের মতো, তা গ্রহণ করে নিতে হলো সকলকে। কৌরবদের রাজসভায় এ নিয়ে গুজবের শেষ রইল না। কেউ কেউ চোখ কপালে তুলে আশ্চর্য হয়ে বলল, "কীচকের মতো বীরকে হত্যা করা কি সাধারণ মানুষের কাজ!" আবার কেউ বা মৃদু হেসে আড়ালে কুটিল মন্তব্য করল, "না না, এতে আশ্চর্যের কী আছে? কীচক লোকটা যত বড় বীর ছিল, ততটাই ছিল নীচ আর কামাতুর। পরের স্ত্রীর দিকে তার অনায়াস লোভ ছিল অসংযত, আচরণ ছিল পঙ্কিল। এমন মানুষকে তো একদিন না একদিন ...

চতুর্থ ভাগ -বিরাট পর্ব-কীচকের দ্রৌপদীর প্রতি আসক্তি এবং দ্রৌপদীকে অপমান

Image
  চতুর্থ ভাগ -বিরাট পর্ব-কীচকের দ্রৌপদীর প্রতি আসক্তি এবং দ্রৌপদীকে অপমান পাণ্ডবদের মৎস্যনরেশের রাজধানীতে দশমাস কেটে গেল। যজ্ঞসেনী দ্রৌপদী, যিনি স্বয়ং রানির মতো সেবা পাবার যোগ্য, তিনি রানি সুদেষ্ণার সেবা করে বড় কষ্টে দিন যাপন করছিলেন। একদিন রাজা বিরাটের সেনাপতি কীচকের দৃষ্টি দ্রৌপদীর ওপর পড়ল, যিনি রাজমহলে দেবকন্যার ন্যায় প্রতীত হচ্ছিলেন। কীচক ছিলেন মৎস্যনরেশের শ্যালক। তিনি সৈরন্ধ্রীকে দেখেই কামমোহিত হলেন। তিনি তাঁর ভগ্নী রানি সুদেষ্ণার কাছে গিয়ে হেসে বললেন- 'সুদেষ্ণা।  (বি:দ্র: কিচক ছিলেন কেকয় রাজ্যের রাজপুত্র। তাঁর পিতা ছিলেন কেকয় রাজ এবং মাতা ম্যালবী। কিচকেরা বংশানুক্রমে 'সূত' কুলজাত ছিলেন। প্রাচীন ভারতে সূতদের রাজসভায় কবি, সারথি বা দূত হিসেবে দেখা গেলেও, কেকয় বংশের এই সূত শাখাটি ছিল অত্যন্ত বীরভোগ্যা এবং রাজক্ষমতাসম্পন্ন। এবং রাজা বিরাটের মহিষী সুদেষ্ণা ছিলেন এই কেকয়রাজের কন্যা এবং কিচকের জ্যেষ্ঠা ভগিনী। বোনের বিবাহের সুবাদেই কিচক মৎস্যদেশে আসেন এবং নিজের অসীম রণকৌশল ও বাহুবলে মৎস্যরাজ্যের প্রধান সেনাপতির পদ অলঙ্কৃত করেন। বস্তুত, বিরাটরাজ সিংহাসনে বসে থাকলেও মৎস্যদ...