Posts

ইন্দ্রপ্রস্থের বিদায়বেলা রাজসূয় যজ্ঞ শেষ হয়েছে।

Image
  ইন্দ্রপ্রস্থের বিদায়বেলা রাজসূয় যজ্ঞ শেষ হয়েছে। যজ্ঞশেষে অবভৃথ স্নান সেরে যুধিষ্ঠির যখন উঠে দাঁড়ালেন, তখন তাঁর অবয়বে এক অলৌকিক প্রশান্তি। রাজসিক আড়ম্বর নয়, বরং এক গভীর শুদ্ধতা তাঁকে ঘিরে রেখেছে। এই মুহূর্ত থেকে তিনি কেবল পাণ্ডবজ্যেষ্ঠ নন, তিনি আর্যাবর্তের অধীশ্বর, ধর্মরাজ। ভারতবর্ষের প্রান্ত থেকে প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা রাজন্যবর্গ একে একে বিদায় নিতে এলেন। গত কদিন তাঁরা ইন্দ্রপ্রস্থের যে আতিথেয়তা পেয়েছেন, যে মায়া আর সম্মানে জারিত হয়েছেন, তা আগে কখনো ঘটেনি। তাঁদের রথ প্রস্তুত, অশ্বেরা অধীর, অনুচরেরা যাত্রার অপেক্ষায়। যুধিষ্ঠিরের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা একস্বরে বললেন, “হে ধর্মরাজ, আপনার এই মহাযজ্ঞে উপস্থিত থাকতে পেরে আমরা ধন্য। অজমীঢ় বংশের গৌরব আপনি অমলিন করলেন। আপনার ভ্রাতাদের সেবা আর বিনয় আমাদের মুগ্ধ করেছে। আতিথেয়তায় তিলমাত্র ত্রুটি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। এবার আমাদের নিজ নিজ রাজ্যে ফেরার অনুমতি দিন।” যুধিষ্ঠির শান্ত চোখে তাঁদের কথা শুনলেন। প্রতিটি শব্দের ওজন অনুভব করলেন তিনি। তারপর ভীম, অর্জুন, নকুল আর সহদেবকে ডেকে বললেন, “ভাইসব, অতিথিদের যোগ্য সম্মানে সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে এসো। ইন্দ...

শিশুপাল বধ,রাজসূয় যজ্ঞে কৃষ্ণের অর্ঘ্য ও চেদিরাজের অহংকারের করুণ পরিণতি

Image
  শিশুপাল বধ,রাজসূয় যজ্ঞে কৃষ্ণের অর্ঘ্য ও চেদিরাজের অহংকারের করুণ পরিণতি রাজা যুধিষ্ঠিরের মহান রাজসূয় যজ্ঞ তখন তার গৌরবময় সমাপ্তির দিকে এগিয়ে চলেছে। অনেক দিন ধরে অবিরাম চলেছে পবিত্র আচার-অনুষ্ঠান। ভারতবর্ষের প্রতিটি প্রান্ত থেকে এসেছেন মহর্ষিরা, পরাক্রমশালী রাজারা, বিদ্বান ব্রাহ্মণেরা, বীর যোদ্ধারা এবং অভিজাত অতিথিরা। ইন্দ্রপ্রস্থের বিশাল সভাগৃহে যেন এক অপূর্ব সমাবেশ বসেছে। যজ্ঞের আগুন জ্বলছে উজ্জ্বল হয়ে। বেদমন্ত্রের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। চন্দন, ধূপ ও পবিত্র হব্যের সুবাসে ভরে উঠেছে বাতাস। সর্বত্র আনন্দ, সম্মান আর ঐশ্বর্যের ছোঁয়া। যারা একদিন পাণ্ডবদের বিরোধিতা করেছিলেন, সেই রাজারাও আজ শান্তভাবে পাশাপাশি বসেছেন। ব্রাহ্মণেরা উপযুক্ত দক্ষিণা ও আতিথ্যে তুষ্ট। ইন্দ্রপ্রস্থের প্রজারা এই অভূতপূর্ব অনুষ্ঠান দেখে আনন্দে উৎফুল্ল। সকলেই স্বীকার করছেন, পৃথিবীতে এমন গৌরবময় রাজসূয় যজ্ঞ আর কখনো হয়নি। অবশেষে যখন শেষ আচার সম্পন্ন হল, তখন বৃদ্ধেরা ও পুরোহিতেরা রাজসভায় সমবেত হলেন। সেই সময় কুরুকুলের প্রবীণতম পিতামহ ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধন করে বললেন, “বৎস, তোমার রাজসূয় যজ্ঞ সুসম্পন্ন হয়েছে। অন...

রাজসূয় যজ্ঞ: যেদিন ইন্দ্রপ্রস্থ হয়ে উঠেছিল স্বর্গের অমরাবতী

Image
রাজসূয় যজ্ঞ: যেদিন ইন্দ্রপ্রস্থ হয়ে উঠেছিল স্বর্গের অমরাবতী রাজসূয় যজ্ঞ দ্বিগ্বিজয় করতে বেরোলেন  পাণ্ডবরা। ভীম গেছেন পূর্বে, অর্জুন উত্তরে, নকুল পশ্চিমে, সহদেব দক্ষিণে — পৃথিবীর চার প্রান্ত থেকে পরাজিত রাজারা মাথা নত করেছেন যুধিষ্ঠিরের সামনে। ভারতবর্ষের বুকে এমন দিন আগে আসেনি। দূরদূরান্তের রাজারা যাঁরা কখনও কারও অধীনতা স্বীকার করেননি, তাঁরাও ইন্দ্রপ্রস্থের মহারাজের প্রতি আনুগত্য জানিয়েছেন। শান্তি নেমে এসেছে সমগ্র ভূখণ্ডে — গভীর, স্থির, নিশ্চিন্ত শান্তি। এই সময়ে ইন্দ্রপ্রস্থকে দেখলে মনে হত যেন স্বর্গের অমরাবতী মাটিতে নেমে এসেছে। যুধিষ্ঠিরের রাজত্বে কেউ কাউকে ঠকাত না। পথে পথে চোরডাকাতের ভয় ছিল না। দুর্বলকে কেউ পীড়ন করত না। বর্ষা আসত ঠিক সময়ে, ফসল উঠত মাঠে মাঠে, নদীরা বয়ে যেত নিজের গতিতে। বণিকরা দূরদেশে যাতায়াত করতেন নিশ্চিন্তে। প্রজারা কর দিতেন ভয়ে নয়, ভালোবাসায় — যেভাবে সন্তান বাবার হাতে কিছু তুলে দেয়। এই সুখের দিনগুলোতেই একদিন খবর এল — দ্বারকা থেকে কৃষ্ণ আসছেন। ব্যস, আর পায় কে। সারা শহর যেন জেগে উঠল এক মুহূর্তে। রাস্তায় সুগন্ধি জল ছিটানো হল, ফুল দিয়ে সাজানো হল প...

রাজসূয়ের আহ্বানে চার দিক জয়— পাণ্ডবদের দিগ্বিজয়ের মহাকাব্য

Image
রাজসূয়ের আহ্বানে চার দিক জয়— পাণ্ডবদের দিগ্বিজয়ের মহাকাব্য ময়দানব নির্মিত অপূর্ব সভায় তখন প্রতিদিন রাজা-মহারাজা, ঋষি-মুনি, দূরদেশের দূতদের আসা-যাওয়া। ইন্দ্রপ্রস্থ যেন ধীরে ধীরে পৃথিবীর মধ্যমণি হয়ে উঠছে। রাজা যুধিষ্ঠিরের শাসনে প্রজারা সুখী, পথেঘাটে চুরি নেই, কৃষকের গোলা ভরা ধান, ব্যবসায়ীদের নৌকা সোনা-রুপো বোঝাই করে নদীপথে চলেছে। কিন্তু রাজসূয় যজ্ঞের আগে একটি বড় কর্তব্য বাকি ছিল। পৃথিবীর রাজারা যদি যুধিষ্ঠিরকে সম্রাট বলে স্বীকার না করেন, তবে সেই যজ্ঞ পূর্ণ মর্যাদা পাবে না। একদিন সকালে সভা শেষ হলে অর্জুন ধীরে ধীরে যুধিষ্ঠিরের কাছে এসে দাঁড়াল। তার চোখে সেই অদম্য দীপ্তি, যা যুদ্ধের আগুন জ্বালায়। অর্জুন বলল, — “ভ্রাতা, যদি আপনি অনুমতি দেন, তবে আমরা দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে পড়ি। পৃথিবীর রাজাদের জয় করে, তাঁদের কাছ থেকে কর সংগ্রহ করে আমরা ফিরে আসব। তখন সমগ্র ভূখণ্ড আপনাকে সম্রাট বলে মেনে নেবে।” যুধিষ্ঠির কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তিনি ভাইদের মুখের দিকে তাকালেন। ভীমের চোখে উচ্ছ্বাস, নকুল-সহদেব স্থির, আর অর্জুন যেন প্রস্তুত বজ্রের মতো। তারপর যুধিষ্ঠির মৃদু হেসে বললেন, — “আমি জানি, তোমরা চার...

জরাসন্ধ বধ ও রাজসূয় যজ্ঞের সংকল্প: পাণ্ডবদের জয়যাত্রায় নতুন অধ্যায়

Image
জরাসন্ধ বধ ও রাজসূয় যজ্ঞের সংকল্প: পাণ্ডবদের জয়যাত্রায় নতুন অধ্যায় ইন্দ্রপ্রস্থের রাজসভায় তখন এক মায়াবী স্তব্ধতা। দেবর্ষি নারদ বিদায় নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া কথাগুলো যুধিষ্ঠিরের মনের গভীরে এক অস্থির আলোড়ন তৈরি করে দিয়ে গেছে। নারদ বলে গেছেন রাজসূয় যজ্ঞের কথা—যে যজ্ঞ কেবল ক্ষমতার আস্ফালন নয়, বরং আর্যাবর্তে ধর্ম ও শান্তি স্থাপনের এক সুকঠিন ব্রত। যুধিষ্ঠির স্বভাবতই ধীরস্থির, হঠকারিতা তাঁর রক্তে নেই। তাই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি ডাকলেন এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক। সেখানে উপস্থিত চার অনুজ—ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব—আর সঙ্গে কয়েকজন বিশ্বস্ত মন্ত্রী ও পুরোহিত। যুধিষ্ঠির মৃদুম্বরে বললেন, "দেবর্ষি নারদের প্রস্তাবটি তোমরা শুনেছ। কিন্তু রাজসূয় তো সাধারণ কোনো উৎসব নয়। এর জন্য প্রয়োজন অসীম শক্তি, বিপুল অর্থ আর সমস্ত রাজন্যবর্গের অকুণ্ঠ সমর্থন। তোমাদের মন কী বলে?" মন্ত্রীরা একবাক্যে সমর্থন জানালেন। প্রজারা সুখী, রাজকোষ পূর্ণ, আর যুধিষ্ঠিরের ন্যায়বিচারে রাজ্য ধন্য—এই যজ্ঞ করার যোগ্যতা তাঁর চেয়ে বেশি আর কার আছে? ভীম নিজের বিশাল বাহুতে একবার চাপড় মেরে গর্জে উঠলেন, "দাদা, দ্বিধ...

মগধ-মদমর্দন: রাজসূয় যজ্ঞের অন্তরায় ও জরাসন্ধ-বধের সংকল্প

Image
  মগধ-মদমর্দন: রাজসূয় যজ্ঞের অন্তরায় ও জরাসন্ধ-বধের সংকল্প ইন্দ্রপ্রস্থের সেই মায়াসভায় তখন শরতের শান্ত বিকেল নেমে এসেছে। পাণ্ডবদের প্রতাপ এখন দিগ্বিদিক প্রসারিত, কিন্তু ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের মনে এক গভীর সংশয়। সেই সংশয় নিরসনের জন্যই যদুকুলতিলক শ্রীকৃষ্ণের আগমন। মথুরা থেকে দূত পাঠিয়ে তাঁকে আনিয়েছেন যুধিষ্ঠির। কৃষ্ণের রথ যখন ইন্দ্রপ্রস্থের সিংহদুয়ারে পৌঁছাল, তখন শঙ্খধ্বনি আর তূর্যনিনাদে আকাশ-বাতাস মুখরিত। সাধারণ মানুষ তাদের প্রিয় ‘মাধব’কে দু’চোখ ভরে দেখার জন্য পথে ভেঙে পড়ল। কৃষ্ণকে পেয়ে পাণ্ডবদের আনন্দ আর ধরে না। যুধিষ্ঠির পরম শ্রদ্ধায় তাঁর পা ধুইয়ে দিলেন, ভাইরা তাঁকে আলিঙ্গন করলেন নিবিড় প্রেমে। কয়েকটা দিন যেন উৎসবের আমেজে কেটে গেল রাজপ্রাসাদে। একদিন রাজকার্য শেষে যখন সভাঘর নির্জন হয়েছে, যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের পাশে এসে বসলেন। তাঁর চোখেমুখে গভীর চিন্তার ছাপ। ধীর স্বরে তিনি বললেন, "মাধব, তোমার কৃপায় আজ আমাদের এই ঐশ্বর্য। মহর্ষি নারদ আমাকে রাজসূয় যজ্ঞ করার পরামর্শ দিয়েছেন। আমার ভাইরা উন্মুখ, প্রজারাও খুশি। কিন্তু তোমার সম্মতি ছাড়া আমি এক পা-ও এগোতে চাই না। তুমি বলো, এই যজ্ঞ করা কি আমার পক্ষে ...

রাজসূয় যজ্ঞের সংকল্প ও কৃষ্ণের আগমন

Image
রাজসূয় যজ্ঞের সংকল্প ও কৃষ্ণের আগমন নারদ বিদায় নিয়েছেন অনেকক্ষণ, কিন্তু তাঁর কথাগুলো তখনও যুধিষ্ঠিরের কানে গুঞ্জরিত হচ্ছিল। রাজসূয় যজ্ঞ। এক বিশাল আয়োজন, এক কঠিন সংকল্প। যুধিষ্ঠির একা বসে ভাবছিলেন। এই যজ্ঞ কেবল ক্ষমতার আস্ফালন নয়, এ হলো ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু তিনি কি সত্যিই এর যোগ্য? যে যজ্ঞের শেষে একজন রাজা সমগ্র আর্যাবর্তের অধীশ্বর হিসেবে স্বীকৃত হন, তার ভার বহন করার শক্তি কি তাঁর আছে? ইন্দ্রপ্রস্থ তখন যৌবনের দীপ্তিতে ভাস্বর। সেখানে অন্যায় নেই, হাহাকার নেই। প্রজারা রাজাকে ভালোবেসে কর দেয়, ভয়ে নয়। প্রকৃতিও যেন যুধিষ্ঠিরের ন্যায়ের শাসনে তুষ্ট। ঠিক সময়ে বৃষ্টি নামে, মাঠ ভরে ওঠে সোনার ফসলে, আর গোয়ালে বাড়ে গাভীর সংখ্যা। দারিদ্র্য শব্দটা ইন্দ্রপ্রস্থের অভিধান থেকে মুছে গেছে বললেই চলে। পাঁচ ভাই যেন এক হাতের পাঁচটি আঙুল। ভীম রাজ্যের সীমানা আগলে রেখেছেন যমের মতো, কার সাধ্য সেই গণ্ডি পেরোয়? অর্জুন নতুন নতুন দিব্যাস্ত্র আর বীরত্বে ইন্দ্রপ্রস্থের যশকে নিয়ে গেছেন দিগন্তের ওপারে। সহদেব সুক্ষ্ম বিচারবুদ্ধি দিয়ে আগলে রাখেন রাজ্যের ধর্ম আর নিয়ম-কানুন, আর নকুলের বিনয় আর অমায়িক ব্যবহারে মু...

ময়া-দানবের সভা এবং মহর্ষির বার্তা

Image
  ময়া-দানবের সভা এবং মহর্ষির বার্তা ইন্দ্রপ্রস্থের সেই রাজসভা যেন কোনো মর্ত্যের সৃষ্টি নয়, বরং স্বর্গ থেকে নেমে আসা এক মায়া। মহাস্থপতি ময়া-দানব যখন এটি নির্মাণ করেছিলেন, তিনি বোধহয় তাঁর সমস্ত জাদুকরী প্রতিভা ঢেলে দিয়েছিলেন এই প্রাসাদে। স্ফটিকের মেঝেগুলো এতই স্বচ্ছ যে মনে হয় শান্ত সরোবর; আবার আসল জলাধারগুলো এমন পালিশ করা মার্বেলের মতো দেখায় যে ভ্রম হয়। মণিমুক্তো খচিত স্তম্ভগুলোর উজ্জ্বলতায় প্রদীপের আলো ছাড়াই গোটা কক্ষটি সর্বদা উদ্ভাসিত হয়ে থাকত। রাজা, ঋষি কিংবা দূরদেশ থেকে আসা বীর যোদ্ধারা যখন সেই সভায় প্রবেশ করতেন, বিস্ময়ে তাঁদের বাক্য সরে যেত না। এমনই এক শান্ত ও দীপ্তিময় দুপুরে সেখানে পদার্পণ করলেন দেবর্ষি নারদ। পাঁচ পাণ্ডব তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে পরম শ্রদ্ধায় অভ্যর্থনা জানালেন। যুধিষ্ঠির নিজে ঋষির চরণ প্রক্ষালন করে তাঁকে উপযুক্ত আসনে বসালেন। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর, বিনয়ে অবনত হয়ে যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করলেন— "হে বরেণ্য মহর্ষি, আপনি ত্রিলোকচারী। দেবলোক থেকে শুরু করে ঋষি ও রাজাদের সমস্ত সভা আপনার দেখা। সত্যি করে বলুন তো প্রভু, আমাদের এই সভার মতো ঐশ্বর্য আর কোথাও কি আছে? আপনার চোখ...

মায়া-দানবের মায়াসভা: ইন্দ্রপ্রস্থের সেই অপার্থিব ঐশ্বর্য ও নারদের রাজধর্ম

Image
  মায়া-দানবের মায়াসভা: ইন্দ্রপ্রস্থের সেই অপার্থিব ঐশ্বর্য ও নারদের রাজধর্ম ইন্দ্রপ্রস্থে দিনগুলো বেশ কাটছিল, কিন্তু সময়ের অমোঘ নিয়মে বিদায়ের সুর বাজল। শ্রীকৃষ্ণ স্থির করলেন এবার তাঁকে দ্বারকায় ফিরতে হবে। অর্জুনের মনটা বড় বিষণ্ণ হয়ে উঠল। কৃষ্ণের সান্নিধ্য মানেই তো এক বুক আত্মবিশ্বাস আর অনাবিল আনন্দ। যাওয়ার বেলায় কৃষ্ণ হাসিমুখে আশ্বস্ত করলেন, "পার্থ, যখনই আমায় স্মরণ করবে, আমি তোমার পাশেই থাকব।" পরম মমতায় সবাইকে বিদায় জানিয়ে তিনি দ্বারকার পথে রওয়ানা হলেন। কৃষ্ণ চলে যাওয়ার কিছুকাল পরেই অর্জুনের সামনে এসে দাঁড়ালেন ময় দানব। খাণ্ডবদাহনের সেই ভয়ঙ্কর অগ্নিকাণ্ড থেকে অর্জুনই তাঁর প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন, সেই কৃতজ্ঞতা ময় ভোলেননি। তিনি চাইলেন পান্ডবদের জন্য বিশেষ কিছু করতে। ময় বিনম্র স্বরে বললেন, "হে মহাবীর, আমি মৈনাক পর্বতের দিকে যাত্রা করতে চাই। সেখানে বিন্দুসর হ্রদের কাছে এককালে দানবরাজ বৃষপর্বার রত্নভাণ্ডার লুকিয়ে রেখেছিলাম। যদি সেগুলো আজও অবিকৃত থাকে, তবে আমি তা আপনার জন্য নিয়ে আসব। সেখানে ভীমের জন্য এক অজেয় গদা আর আপনার জন্য 'দেবদত্ত' নামক এক দিব্য শঙ্খও রক্ষিত আছে।"...

মায়াসভা ও মাধবের প্রত্যাবর্তন: এক অলৌকিক সৃষ্টির সূচনা ও বিরহী বিদায়গীতি

Image
  মহাভারতের সভা পর্বের শুরু  সনাতন ধর্মে কোনো পবিত্র শাস্ত্র (যেমন মহাভারত বা শ্রীমদ্ভাগবত) পাঠ করার আগে নিচের এই মঙ্গলচরণটি পাঠ করা হয় যাতে পাঠ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় এবং জ্ঞান লাভ করা যায়। শ্লোক: নারায়ণং নমস্কৃত্য নরং চৈব নরোত্তমম্ । দেবীং সরস্বতীং ব্যাসং ততো জয়মুদীরয়েৎ ॥ বঙ্গানুবাদ: নারায়ণ, নরোত্তম নর (অর্জুন বা ঋষি নর), দেবী সরস্বতী এবং মহর্ষি ব্যাসদেবকে নমস্কার জানিয়ে তারপর 'জয়' (মহাভারত বা শাস্ত্র পাঠ) উচ্চারণ করা উচিত। শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা  নারায়ণং নমস্কৃত্য: ভগবান শ্রীনারায়ণকে প্রণাম জানিয়ে।  নরং চৈব নরোত্তমম্: মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যিনি অর্থাৎ 'নর' (ভগবানের অবতার বিশেষ বা অর্জুন)।  দেবীং সরস্বতীং: বিদ্যার দেবী মা সরস্বতীকে।  ব্যাসং: এই শাস্ত্রের রচয়িতা মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেবকে।  ততো জয়মুদীরয়েৎ: তারপর 'জয়' নামক গ্রন্থ (মহাভারত, পুরাণ বা ভাগবত) পাঠ শুরু করা কর্তব্য। মায়াসভা ও মাধবের প্রত্যাবর্তন: এক অলৌকিক সৃষ্টির সূচনা ও বিরহী বিদায়গীতি খাণ্ডবদহনের সেই লেলিহান শিখা তখন স্তিমিত হয়ে এসেছে। অরণ্যের দাহনশেষে চারপাশ এক গভীর নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্...

খাণ্ডব দহন: এক বিধ্বংসী নবনির্মাণ

Image
  খাণ্ডব দহন: এক বিধ্বংসী নবনির্মাণ পাণ্ডবরা ফিরে আসায় ইন্দ্রপ্রস্থের সাধারণ মানুষের মনে যেন উৎসবের রঙ লেগেছে। চারদিকে এক স্বস্তির নিঃশ্বাস। কিন্তু অর্জুন আর শ্রীকৃষ্ণের মন তখন অন্য কোথাও। একদিন যুধিষ্ঠিরের অনুমতি নিয়ে তাঁরা দুজনে মিলে যমুনার তীরে গেলেন একটু নিভৃত সময়ের খোঁজে। বহমান নদীর শীতল হাওয়ায় দুজনে গল্পে মগ্ন, ঠিক তখনই সেখানে এক অদ্ভুত তেজস্বী ব্রাহ্মণের আবির্ভাব হলো। সেই ব্রাহ্মণের গায়ের রঙ যেন তপ্ত কাঞ্চন, মাথায় জটা আর মুখভর্তি দাড়ি। এক আশ্চর্য দীপ্তি ঠিকরে বেরোচ্ছে তাঁর শরীর থেকে। তিনি সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং মেঘমন্দ্র স্বরে বললেন, "তোমরা মহাবীর। আমি সর্বভুক, আজ তোমাদের কাছে এসেছি আমার ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে। ওই খাণ্ডব বনই আমার আহার।" শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন বিস্ময় গোপন করে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি কে? কী আহার আপনার কাম্য? আদেশ করুন, আমরা তা পূর্ণ করব।" ব্রাহ্মণ তখন তাঁর আসল রূপ প্রকাশ করলেন। তিনি অগ্নিদেব। তিনি বললেন, "আমি সাধারণ অন্ন চাই না। আমি এই খাণ্ডব বন দহন করতে চাই। এর আগে বহুবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেখানে সপরিবারে তক্ষক নাগ বাস করে। আ...

রৈবতক উৎসব ও সুভদ্রা হরণ

Image
  রৈবতক উৎসব ও সুভদ্রা হরণ সে এক এলাহি কাণ্ড! রৈবতক পাহাড়জুড়ে তখন উৎসবের মহড়া। বৃষ্ণি, ভোজ আর অন্ধক বংশের মানুষেরা মেতে উঠেছেন আনন্দ-উৎসবে। যদু বংশের তরুণরা—অক্রুর, সারণ, গদ, বভ্রু, নিষঠ, উদ্ধব—সবাই সেজেগুজে স্ত্রী-পরিজন নিয়ে শামিল হয়েছেন সেই মহোৎসবে। চারদিকে গান, নাচ আর হাসির হিল্লোল। দান-ধ্যানেরও কমতি নেই; ব্রাহ্মণদের ঝুলি উপচে পড়ছে বহুমূল্য রত্ন আর অলঙ্কারে। সেই ভিড়ের মধ্যেই ছিলেন কৃষ্ণ আর তাঁর সখা অর্জুন। ঠিক তখনই অর্জুনের নজরে পড়লেন কৃষ্ণের সহোদরা সুভদ্রা। সুভদ্রার সেই রূপ দেখে অর্জুন যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলেন। তাঁর চোখের পলক পড়ছে না। অর্জুনের মনের অন্দরে কী ঝড় বইছে, তা অন্তর্যামী কৃষ্ণের বুঝতে বাকি রইল না। কৃষ্ণ স্মিত হেসে বললেন, "সখা, ক্ষত্রিয়ের ধর্মে স্বয়ংবর সভার রীতি আছে বটে, কিন্তু সেখানে মেয়েটি তোমাকে বেছে নেবেই—এমন নিশ্চয়তা কোথায়? প্রত্যেকের তো নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ থাকে। তার চেয়ে ক্ষত্রিয়ের বীরধর্ম পালন করো। বলপূর্বক হরণ করে বিবাহ করাটাও তো আমাদের শাস্ত্রসম্মত। আমার মনে হয়, তোমার জন্য সেটাই শ্রেয় হবে।" অর্জুন আর কৃষ্ণ পরামর্শ করে যুধিষ্ঠিরের কাছে দূত পাঠাল...

মহাপ্রস্থানের পথে অর্জুন: এক প্রতিশ্রুতির আখ্যান

Image
  মহাপ্রস্থানের পথে অর্জুন: এক প্রতিশ্রুতির আখ্যান নারদের পরামর্শে পাণ্ডবরা এক কঠিন নিয়মে নিজেদের বেঁধেছিলেন। দ্রৌপদীর সঙ্গে নিভৃতবাসের সময় যদি কোনো ভ্রাতা অন্য ভ্রাতার কক্ষে প্রবেশ করেন, তবে তাকে বারো বছরের ব্রহ্মচর্য ও বনবাস গ্রহণ করতে হবে। ইন্দ্রপ্রস্থের রাজপ্রাসাদে দিনগুলো বেশ সুশৃঙ্খলভাবেই কাটছিল। কিন্তু নিয়তি যার নাম, সে তো অতর্কিতেই হানা দেয়। একদিন এক আর্ত ব্রাহ্মণ এসে উপস্থিত হলেন অর্জুনের দ্বারে। দস্যুরা তাঁর গোধন হরণ করে নিয়ে গেছে। ক্ষত্রিয়ের পরম ধর্ম আর্তের ত্রাণ করা, অথচ অর্জুনের গাণ্ডীব তখন যুধিষ্ঠির ও দ্রৌপদীর শয়নকক্ষে। অর্জুন দ্বিধায় পড়লেন—একদিকে কুলধর্মের নিয়মভঙ্গ, অন্যদিকে শরণাগতের রক্ষা। মুহূর্তকাল ভেবে তিনি স্থির করলেন, একজন ব্রাহ্মণের চোখের জলের চেয়ে নিজের বারো বছরের নির্বাসন অনেক তুচ্ছ। নিঃশব্দে কক্ষে প্রবেশ করে অস্ত্র তুলে নিলেন তিনি। ঝড়ের গতিতে দস্যুদের অনুসরণ করে উদ্ধার করে আনলেন হরণ করা গরু। ফিরে এসে যুধিষ্ঠিরের চরণে প্রণাম করে অর্জুন অবিচল কণ্ঠে বললেন, "অগ্রজ, আমি নিয়ম ভঙ্গ করেছি। আমাকে দণ্ড গ্রহণ করতে দিন।" যুধিষ্ঠির বহু অনুনয় করলেন, বললেন আপৎকালে...