Posts

৩৩তম বন পর্ব- গন্ধমাদনের পদ্ম আর ভীমসেনের দর্প

Image
  ৩৩তম বন পর্ব- গন্ধমাদনের পদ্ম আর ভীমসেনের দর্প হনুমান বিদায় নেওয়ার পর, তাঁর দেখানো পথ ধরে মহাবলী ভীমসেন গন্ধমাদন পর্বতের চড়াই ভাঙতে শুরু করলেন। পথ চলতে চলতে তাঁর মনে বারেবারে ভেসে উঠছিল পবনপুত্রের সেই পর্বতপ্রমাণ রূপ, অলৌকিক শৃঙ্গমালা আর শ্রীরামচন্দ্রের মহিমার কথা। সুগন্ধী বনের খোঁজে এগিয়ে যেতে যেতে ভীমের চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল রূপসী প্রকৃতির শোভায়—কোথাও ফুটে রয়েছে নাম না জানা ফুলের মেলা, কোথাও টলটলে জলের হ্রদ আর কলতানরত পাহাড়ি নদী। হাঁটতে হাঁটতে একসময় ভীম এসে পৌঁছলেন কৈলাস পর্বতের পাদদেশে, ধনাধিপতি কুবেরের প্রাসাদের ঠিক কাছেই এক দিব্য সরোবরের তীরে। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি দূর করতে তিনি মন ভরে পান করলেন সেই স্ফটিকস্বচ্ছ জল। এই সরোবরটি ছিল কুবেরের পরম প্রিয় জলবিহারের স্থান; দেব-গন্ধর্ব, অপ্সরা আর ঋষিমুনিদের আনাগোনায় যা সর্বদা মুখরিত থাকত। বনের এমন শান্ত রূপ দেখে ভীম যখন মনে মনে প্রীত হচ্ছেন, তখনই তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল কুবেরের অনুচর হাজার হাজার ক্রোধোন্মত্ত রাক্ষস। তারা পথ আগলে গর্জে উঠে জানতে চাইল ভীমের পরিচয় আর এই দুর্গম স্থানে আসার কারণ। ভীম দৃপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন, "আমি পাণ্ডুপুত্র ...

কিষ্কিন্ধ্যার রাজপ্রাসাদে রক্তের টান ও প্রতিশোধের রাজনীতি: বালী-সুগ্রীবের আদিম দ্বন্দ্ব

Image
কিষ্কিন্ধ্যার রাজপ্রাসাদে রক্তের টান ও প্রতিশোধের রাজনীতি: বালী-সুগ্রীবের আদিম দ্বন্দ্ব মহাকাব্যের পাতায় কত রকমের ট্র্যাজেডি থাকে, কিন্তু দুই ভাইয়ের এমন নির্মম দূরত্বের গল্প বোধহয় আর দ্বিতীয়টি নেই। কিষ্কিন্ধ্যার বনাঞ্চলে যে কেবল বানর সেনা বাস করত তা তো নয়, সেখানে বাস করত মানুষের মতোই লোভ, হিংসা, ভুল বোঝাবুঝি আর ক্ষমতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।  রক্তের টান ও এক ভয়ানক ভুল বালী ছিলেন কিষ্কিন্ধ্যার জ্যেষ্ঠ রাজপুত্র—পরাক্রমশালী, অপরাজেয় এবং জন্মগত শাসক। আর ছোট ভাই সুগ্রীব ছিলেন তাঁর অনুগত ছায়া। দুজনের মধ্যে স্নেহ ছিল গভীর। কিন্তু নিয়তি অন্য এক খেলা খেলল। একবার মায়াবী নামের এক রাক্ষস বালীকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করে এক অন্ধকার গুহার ভেতর ঢুকে পড়ে। বালীও তার পিছু পিছু গুহায় প্রবেশ করেন এবং সুগ্রীবকে বাইরে পাহারা দিতে বলেন। দিন যায়, মাস যায়, বালী ফিরে আসেন না। এক বছর পার হওয়ার পর, গুহার মুখ থেকে রক্তের স্রোত ভেসে আসতে দেখে সুগ্রীব ধরে নিলেন তাঁর প্রিয় দাদা আর বেঁচে নেই। রাক্ষসটি যেন বাইরে এসে কিষ্কিন্ধ্যা ধ্বংস না করতে পারে, তাই ভারী পাথর দিয়ে গুহার মুখ বন্ধ করে চোখের জল মুছতে মুছতে সুগ্রীব রাজ্যে...

৩২তম বন পর্ব, গন্ধমাদনে দুই ভায়ের মিলন: ভীম যেদিন হনুমানের লেজ নাড়াতে পারেননি

Image
৩২তম বন পর্ব, গন্ধমাদনে দুই ভায়ের মিলন: ভীম যেদিন হনুমানের লেজ নাড়াতে পারেননি নর-নারায়ণের সেই আশ্রমে অর্জুনের প্রতীক্ষায় ছয়টি রাত কেটে গেল পাণ্ডবদের। বনবাসের দিনগুলো এমনই—অপেক্ষা যেন এক নিরন্তর তপস্যা, প্রতিটি প্রহর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। সেদিন হঠাৎই ঈশানকোণ থেকে বাতাসে ভেসে এলো একটি সহস্রদল পদ্ম। দিব্য তার আভা, সূর্যের মতো উজ্জ্বল, আর তার গন্ধ এমন যে মনে হয় স্বর্গের কোনো উদ্যান থেকেই যেন খসে পড়েছে। ফুলটি এসে পড়ল মাটিতে, আর ঠিক তখনই দ্রৌপদীর চোখ আটকে গেল তার ওপর। কৌতূহলী পায়ে এগিয়ে গিয়ে তিনি ফুলটি তুলে নিলেন, তারপর প্রসন্ন মুখে ভীমের দিকে তাকিয়ে বললেন—"আর্যপুত্র, এই কমলটি আমি ধর্মরাজকে উপহার দেব। আপনার যদি আমার প্রতি একটুও স্নেহ থাকে, তাহলে এমন আরও কিছু ফুল এনে দিন। আমি কাম্যকবনের আশ্রমে এগুলো নিয়ে যেতে চাই।" এই বলে দ্রৌপদী ফুলটি নিয়ে চলে গেলেন যুধিষ্ঠিরের কাছে। আর ভীম—মহাবলী ভীমসেন, যাঁর হৃদয়ে দ্রৌপদীর সামান্যতম ইচ্ছাও পাহাড়ের মতো ভারী হয়ে বাজে—তিনি সেই মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিলেন, যেদিক থেকে ফুলটি এসেছিল, সেদিকেই যাত্রা করবেন। সোনার কারুকাজ করা ধনুক-বাণ কাঁধে ...

বেদব্যাসের ক্যানভাসে বাল্মীকি: যুধিষ্ঠিরের ভাঙা মন জোড়া লাগাতে যেভাবে এল ‘রামোপাখ্যান’

Image
বেদব্যাসের ক্যানভাসে বাল্মীকি: যুধিষ্ঠিরের ভাঙা মন জোড়া লাগাতে যেভাবে এল ‘রামোপাখ্যান’ ব্যাসের কলমে বাল্মীকি: মহাভারতের অন্তরালে যখন জেগে উঠল রাম-কথা মহাকাব্যের ভেতরে আরেক মহাকাব্যের প্রবেশ—ব্যাপারটা ঠিক কেমন? এ যেন এক নদীর বুকে আরেক নদীর এসে মেশা। মহাভারতের মতো এক বিশাল, জটিল এবং রক্ত-মাংসের বাস্তবতায় মোড়া আখ্যানে রামায়ণের গল্পটি কিন্তু হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়েনি। এর পেছনে ছিল এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সান্ত্বনার প্রেক্ষাপট। কাম্যক বন: দ্রৌপদীর অশ্রু ও যুধিষ্ঠিরের সংশয় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের অনেক আগে, যখন পাণ্ডবেরা বারো বছরের বনবাস কাটছে, তখন কাম্যক বনে ঘটে এক বিপর্যয়। জয়দ্রথ এসে দ্রৌপদীকে হরণ করার চেষ্টা করে। ভীম আর অর্জুন দ্রৌপদীকে উদ্ধার তো করলেন, কিন্তু যুধিষ্ঠিরের মন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির গভীর হতাশায় ডুবে গেলেন। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল—“আমি এমন কী পাপ করেছি যে আমার চোখের সামনে আমার স্ত্রীকে এভাবে অপমানিত হতে হলো? আমার মতো হতভাগ্য আর কেউ কি এই পৃথিবীতে জন্মেছে?” ঠিক সেই মুহূর্তে কাম্যক বনে এসে উপস্থিত হলেন মহর্ষি মার্কণ্ডেয়। তিনি যুধিষ্ঠিরের এই চরম মানসিক ভাঙন আর আত্মগ্...

রামের ধনুর্বাণ, সুগ্রীবের সেনা: সীতা উদ্ধারের নেপথ্যে এক ঐতিহাসিক চুক্তি

Image
রামের ধনুর্বাণ, সুগ্রীবের সেনা: সীতা উদ্ধারের নেপথ্যে এক ঐতিহাসিক চুক্তি ১. ঋষ্যমূক পর্বত: দুই নিঃসঙ্গ মানুষের মিলন সীতাহরণের পর রামের বুকে তখন এক গভীর ক্ষত, একটা তীব্র শূন্যতা। লক্ষণকে সঙ্গে নিয়ে তিনি যখন দণ্ডকারণ্য পেরিয়ে ঋষ্যমূক পর্বতের পাদদেশে এসে পৌঁছলেন, তখন তাঁর পরিচয় শুধুই এক রাজ্যহারা, পত্নীহারা পরিব্রাজকের। ঠিক সেই সময়, পর্বতের চূড়ায় বসে ভয় আর সংশয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন সুগ্রীব। নিজের আপন ভাই, কিষ্কিন্ধ্যার পরাক্রমশালী রাজা বালী তাঁকে ভুল বুঝে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, কেড়ে নিয়েছে তাঁর স্ত্রী রুমাকেও। রামের হাতে ধনুর্বাণ দেখে সুগ্রীব প্রথমে ভেবেছিলেন, বালী বুঝি তাঁকে হত্যা করার জন্য কোনো ঘাতক পাঠিয়েছে। কিন্তু হনুমানের বিচক্ষণতায় ভুল ভাঙল। রাম আর সুগ্রীব—দুজনেই তখন ভাগ্যাহত, দুজনেই প্রিয়জন-বিচ্যুত। সুনীলবাবুর ভাষায় বলতে গেলে, “এ যেন দুই ভাঙা বুকের মিলন।” অগ্নির সামনে হাত রেখে দুজনে বন্ধুত্বের শপথ নিলেন। সুগ্রীব কথা দিলেন সীতা উদ্ধারে সর্বশক্তি দিয়ে সাহায্য করবেন, আর রাম প্রতিজ্ঞা করলেন সুগ্রীবকে তাঁর সম্মান ও রাজ্য ফিরিয়ে দেবেন। ২. বালীবধ: এক নৈতিক সংকট রামের আ...

অহংকারের পতন: বৃহস্পতির শেখা শেষ পাঠ

Image
অহংকারের পতন: বৃহস্পতির শেখা শেষ পাঠ শান্তিপর্বের সেই বিকেলটা যেন কোনোদিন ফুরোতেই চাইছিল না। কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে শরশয্যায় শুয়ে আছেন পিতামহ ভীষ্ম, তাঁর শরীর জুড়ে অসংখ্য তীরের ক্ষত, অথচ চোখ দুটিতে এখনও সেই পুরনো তেজ। যুধিষ্ঠির বসে আছেন পাশে, মাথা নিচু, মনের ভেতরে অসংখ্য প্রশ্নের ভিড়। রাজ্যপাট পেয়েও যে শান্তি নেই, সেই শূন্যতা নিয়েই তিনি এসেছেন পিতামহের কাছে—ধর্ম বলতে ঠিক কী বোঝায়, রাজধর্ম আর মোক্ষধর্মের মধ্যে সীমারেখা কোথায়, তা জানতে। ভীষ্ম তখন এক পুরনো গল্প বলতে শুরু করলেন। বললেন, এই একই প্রশ্ন একদিন স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রকেও পীড়া দিয়েছিল। স্বর্গের অধিপতি তখন ইন্দ্র। তাঁর ঐশ্বর্যের সীমা নেই, ক্ষমতার সীমা নেই। অমরাবতীর সোনার প্রাসাদে বসে থাকলে মনে হয়, জগতে তাঁর চেয়ে সুখী আর কেউ নেই। অথচ রাতের গভীরে, যখন অপ্সরাদের নৃত্যগীত থেমে যায়, ইন্দ্রের মনের কোণে একটা কাঁটা খচখচ করে বেঁধে—এই যে এত ঐশ্বর্য, এত ক্ষমতা, এর অর্থ কী? ধর্ম কাকে বলে? জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যটাই বা কোথায়? এই অস্থিরতা নিয়েই একদিন ইন্দ্র চলে এলেন দেবগুরু বৃহস্পতির আশ্রমে। বৃহস্পতি তখন সর্বশাস্ত্রে পারদর্শী, তাঁ...

৩১তম বনপর্ব-গন্ধমাদনের ঝঞ্ঝা ও এক মায়াবী ডানার আশ্রয়

Image
৩১তম বনপর্ব-গন্ধমাদনের ঝঞ্ঝা ও এক মায়াবী ডানার আশ্রয় আকাশটা হঠাৎ কেমন যেন বিগড়ে গেল। পাণ্ডবেরা তখন গন্ধমাদন পর্বতের চড়াই ভাঙছেন। প্রথমে এল এক দমকা হাওয়া, তারপরই চারপাশ ওলটপালট করে ধেয়ে এল তীব্র ঘূর্ণি। শুকনো পাতা আর ধুলোর চাদরে আকাশ এমনভাবে ঢাকা পড়ল যে দিনদুপুরেই নেমে এল নিকষ অন্ধকার।  যুধিষ্ঠির কিংবা ভীম তখন একে অপরের মুখ দেখতে পাচ্ছেন না, বাতাসে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের কণ্ঠস্বর। কিছুক্ষণ পর অবশ্য ধুলোর দাপট কমল, কিন্তু প্রকৃতি শান্ত হলো না। শুরু হলো তুমুল বর্ষণ। মেঘের ডাক আর বিদ্যুতের তরবারি যেন আকাশটাকে চিরে ফেলতে চাইল। দ্রৌপদী সেই মহাপ্রলয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছিলেন। শেষমেশ ঝড় থামল, মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিল ক্লান্ত সূর্য। কিন্তু বিপত্তি ঘটল এর পরেই। প্রায় এক মাইল পথ হাঁটার পর রাজকুমারী দ্রৌপদী আর এক পা-ও নড়তে পারলেন না। যাঁর পায়ের নিচে নরম গালিচা থাকার কথা, তিনি আজ রুক্ষ পাহাড়ি পথ ভেঙে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। একটা পাথরের ওপর বসে পড়লেন তিনি। যুধিষ্ঠির চিন্তিত মুখে ভীমের দিকে তাকিয়ে বললেন, "ভীম, সামনে তো শুধু খাড়া পাহাড় আর বরফের চাদর। আমাদের সুকুমারী দ্রৌপদী এই পথ পার হবে কী ক...