Posts

৩৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-শান্তির শেষ সুযোগ ও ধ্বংসের আবাহন: কৌরব সভার রূপরেখা

Image
৩৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-শান্তির শেষ সুযোগ ও ধ্বংসের আবাহন: কৌরব সভার রূপরেখা উপপ্লব্যের থমথমে শিবিরে যখন শ্রীকৃষ্ণ পদার্পণ করলেন, তখন সন্ধ্যার ধূসর আলো নেমে এসেছে। হস্তিনাপুরের ধূলিমলিন দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন কেবল এক রাজনৈতিক দূতের ফেরা নয়—যেন রক্তক্ষয়ী এক মহাযুদ্ধের বার্তা বহন করে আনা। পাণ্ডব শিবিরে তখন স্তব্ধতা। যুধিষ্ঠির ব্যাকুল চোখে কৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কৃষ্ণ এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "ধর্মরাজ, আমি কৌরব সভায় গিয়ে পরম সত্য, ন্যায় এবং উভয় কুলের মঙ্গলপ্রদ কথা স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছিলাম। কিন্তু অহংকারে অন্ধ দুর্যোধন কোনো কল্যাণকর উপদেশই গ্রহণ করতে চাইল না।" যুধিষ্ঠিরের কণ্ঠস্বর সামান্য কেঁপে উঠল। তিনি কৃষ্ণের হাত দুটি চেপে ধরে বললেন, "হে জনার্দন, দুর্যোধন যখন কুপথ ছাড়তে রাজি হলো না, তখন বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম তাঁকে কী বললেন? আচার্য দ্রোণ, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, মাতা গান্ধারী, ধর্মজ্ঞ বিদুর এবং সভায় উপস্থিত কুরুবৃদ্ধরা কীভাবে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন? আমাকে বিস্তারিত বলো।" কৃষ্ণ তখন কৌরব রাজসভার সেই নাটকীয় ও উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্য একে একে ত...

৩৮তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-গঙ্গাতীরের গোপন রক্তঋণ ও এক ট্র্যাজিক সত্য

Image
৩৮তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-গঙ্গাতীরের গোপন রক্তঋণ ও এক ট্র্যাজিক সত্য যুদ্ধ তখন আর কোনো দূরের সম্ভাবনা নয়, দরজায় এসে থাপ্পড় মারছে। শ্রীকৃষ্ণ কৌরবদের সভা থেকে খালি হাতে ফিরে যাওয়ার পর থেকেই হস্তিনাপুরের বাতাসে বারুদের গন্ধ। যে কোনো মুহূর্তে কুরুক্ষেত্র জ্বলে উঠবে। বিদুর সেদিন রাতে ঘুমোতে পারেননি। বিষণ্ণ পায়ে তিনি এসেছিলেন রাজমাতা কুন্তীর কক্ষে। কোনো ভূমিকা না করেই বলেছিলেন, "দেবী, আমি তো যুদ্ধ চাইনি। দুর্যোধন অন্ধ, সে কথা শেনেনি। এমনকি কৃষ্ণও পারলেন না সন্ধি করাতে। এবার সব শেষ হবে। কৌরবদের এই অন্ধ অহংকারের আগুনে রাজপরিবারের রক্ত বইবে।" কথাগুলো কুন্তীর বুকে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি একা বসে রইলেন। সম্পদ, রাজ্য, ক্ষমতা—এই সব কিছুর মূল্য কি স্বজনদের রক্ত? ভীষ্ম বা দ্রোণাচার্য হয়তো অনিচ্ছাসত্ত্বেও দুর্যোধনের পক্ষে লড়বেন। কিন্তু কুন্তীর আসল ভয় অন্য জায়গায়। তিনি জানেন, কর্ণ নামের ওই তীব্র তেজস্বী বীরটি যার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে হারানো অসম্ভব। কর্ণ ভালোবাসে না কৌরবদের, কিন্তু সে অনুগত। তার ভেতরের জমে থাকা ঘৃণা আর জেদ পাণ্ডবদের ছাই করে দেওয়ার জন্য তৈরি। ...

৩৭তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কর্ণের ভাগ্যলিপি ও কুরুক্ষেত্রের পূর্বাভাস

Image
৩৭তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কর্ণের ভাগ্যলিপি ও কুরুক্ষেত্রের পূর্বাভাস হস্তিনাপুরের রাজসভায় তখন এক ভারী, আচ্ছন্ন নীরবতা। কুন্তীর মুখ থেকে শ্রীকৃষ্ণের বয়ে আনা বার্তা শোনার পর পিতামহ ভীষ্ম আর আচার্য দ্রোণ স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন, ঝড়ের আর বেশি দেরি নেই। রাজকুমার দুর্যোধনের দিকে চেয়ে ভীষ্মের কণ্ঠস্বরে ফুটে বেরোল গভীর হতাশা, “রাজন! কৃষ্ণ মারফৎ কুন্তী যে বার্তা পাঠিয়েছেন, তা শুধু ধর্মসংগত নয়, অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। তুমি কি তা অনুধাবন করেছ? পাণ্ডবরা এবার কৃষ্ণের পরামর্শেই চলবে। নিজেদের ন্যায্য অধিকার না নিয়ে তারা ছাড়বে না। সন্ধি করবে না কি যুদ্ধ—এই সিদ্ধান্ত এখন পুরোপুরি তোমার হাতে।” দুর্যোধন কোনো উত্তর দিলেন না। অপমানে ও বিষাদে তাঁর মুখ অবনত হলো, কপালে ফুটে উঠল কঠিন কুঞ্চন। ভীষ্ম তখন দ্রোণের দিকে ফিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “যে যুধিষ্ঠির কোনোদিন কারো প্রতি ঈর্ষা রাখেনি, সর্বদা গুরুজনদের সেবা করেছে, আজ তার বিরুদ্ধেই আমাদের অস্ত্র ধরতে হবে! এর চেয়ে বড় অভিশাপ আর কী হতে পারে?” দ্রোণাচার্যও যেন ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি যোগ করলেন, “আমার নিজের পুত্র অশ্বত্থামার চেয়েও অর্জুন আমার প্রিয়। আজ তাকেই ...

৩৬তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অগ্নিগর্ভা কুন্তী ও কুরুক্ষেত্রের রণভেরী

Image
৩৬তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অগ্নিগর্ভা কুন্তী ও কুরুক্ষেত্রের রণভেরী উপপ্লব্যের আকাশে তখন বিকেলের কনে-দেখা আলোটুকু ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। কৌরব রাজসভার উত্তপ্ত জলহাওয়া পেছনে ফেলে কুন্তীর জীর্ণ কুটিরে যখন কৃষ্ণ প্রবেশ করলেন, তখন তাঁর মুখে এক গভীর প্রশান্তির আস্তরণ। কিন্তু সেই প্রশান্তির ভেতরে লুকিয়ে ছিল আগামী এক মহাযুদ্ধের স্পষ্ট পূর্বাভাস। ধীর পায়ে কৃষ্ণের আগমন দেখে কুন্তী তাঁর দিকে ফিরে তাকালেন। কৃষ্ণের চোখের ভাষাই বলে দিচ্ছিল, হস্তিনাপুরের রাজসভায় কী ঘটেছে। কৃষ্ণের মাথা নত করে কৃষ্ণের দুটি হাত কুন্তীর চরণে স্পর্শ করল। এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে কৃষ্ণ বললেন, "পিসিমা, আমি আর রাজসভার প্রবীণ ঋষিগণ অনেক চেষ্টা করেছি। যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে দুর্যোধনকে বোঝাতে চেয়েছি, শান্তির পথই যে কল্যাণের পথ—তা সুস্পষ্ট করে দিয়েছি। কিন্তু অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র অন্ধতর অহংকারে মত্ত। সে কোনো কথা শোনেনি, একবিন্দু জমিও ছাড়তে রাজি নয়। আমি এখন আপনার কাছ থেকে বিদায় নিতে এসেছি পিসিমা, আমাকে শীঘ্রই উপপ্লব্যে পাণ্ডবদের কাছে পৌঁছাতে হবে। বলুন, পাঁচ ভাইয়ের জন্য আপনার কী বার্তা নিয়ে যাব?" কুন্তীর চোখে তখন কোন...

৩৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-ঈশ্বরের চোখে জ্বলন্ত ধূপ: কৌরব সভার সেই অগ্নিঝড়

Image
৩৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-ঈশ্বরের চোখে জ্বলন্ত ধূপ: কৌরব সভার সেই অগ্নিঝড় কর্ণের কুন্ডল ও বর্মের সেই পুরনো তেজ যেন ছড়িয়ে পড়েছিল কৃষ্ণের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তাঁর কান থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছিল ভয়াল আগুনের রক্তিম শিখা, আর শরীরের প্রতিটি রোমকূপ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল হাজারটা মধ্যাহ্নসূর্যের এক অচিন আলো। হস্তিনাপুরের কৌরব সভা তখন এক থমথমে অন্ধকারের গর্ভে। দূর থেকে নেমে আসা এক অলৌকিক দাপটে থরথর করে কাঁপছিল সভাতল। সাধারণ রাজারা সেই তেজ সহ্য করতে না পেরে আতঙ্কে চোখ বুজলেন। একটা গোটা রাজসভা যেন হঠাৎ আলোহীন, নিথর। শুধু কজন মানুষ চোখের পাতা মোছার সাহসটুকু পেলেন—ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর, সঞ্জয় আর সভাসীন তপস্বী ঋষিগণ। জনার্দন কৃষ্ণ নিজেই যে তাঁদের বুনে দিয়েছিলেন এক অন্য দেখার চোখ—এক দিব্যদৃষ্টি! স্তব্ধ সভাঘরের মাথার ওপরের নীল আকাশ থেকে তখন অলক্ষ্যে নেমে এল দেবতাদের দুন্দুভির বাজনা, ঝরে পড়ল অগুনতি পারিজাত। সেই ঘোর অন্ধকারের ভেতর থেকে কাতর গলায় কেঁদে উঠলেন এক বৃদ্ধ অন্ধ পিতা। ধৃতরাষ্ট্র ব্যাকুল হয়ে দু-হাত বাড়ালেন, "কমলনয়ন! তুমিই তো বিশ্বজগতের কল্যাণময় রূপ। আজ আমার ওপর একটু করুণা করো। আমাকে শুধু একটিবার স...

৩৪তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-রাজসভার বিষ ও বাসুদেবের ক্রোধ

Image
৩৪তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-রাজসভার বিষ ও বাসুদেবের ক্রোধ কৌরব রাজসভায় যুদ্ধের ঘনঘটা। কৃষ্ণের অনুনয়-বিনয়, পৈতৃক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার শেষ প্রস্তাব—সবকিছু উড়িয়ে দিয়ে দুর্যোধনের কণ্ঠ তখন দম্ভে কাঁপছে। একবিন্দু নতিস্বীকার নয়, কোনো আপস নয়। দুর্যোধন সোজা তাকালেন কৃষ্ণের দিকে। চোখ দুটো রাগে ধকধক করে জ্বলছে। বললেন, “কেশব! মেপে কথা বলবেন। পাণ্ডবদের পিরিতি দেখাতে গিয়ে আমাকে অপরাধী সাজাচ্ছেন কেন? আমি তো নিজের মধ্যে কোনো অন্যায় দেখতে পাই না। ওরা শখ করে পাশা খেলতে এসেছিল, আমার মামা শকুনির বুদ্ধির কাছে হেরে বনবাসে গেছে। এতে আমার দোষ কোথায়? আর শুনুন, আমরা ইন্দ্রের সামনেও মাথা নোয়ানোর পাত্র নই। ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ আর কর্ণের মতো বীর যাদের পাশে, তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে কে হারাবে? আমরা লড়ব। সূচগ্র মেদিনীও পাণ্ডবদের আমি বিনা যুদ্ধে দেব না!” ঘরের নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। কৃষ্ণ হাসলেন না, তাঁর চোখের কোণে শুধুই কুঞ্চিত ক্রোধের রেখা। এক অদ্ভুত শান্ত কিন্তু বজ্রকঠিন স্বরে উত্তর দিলেন, “বীরশয্যাই যদি তোমার শেষ ইচ্ছে হয় দুর্যোধন, তবে তা-ই হবে। কিন্তু আত্মছলনা কোরো না। দ্রৌপদীকে সভায় টেনে এনে যে...

৩৩তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব অভিমানী দুর্যোধনের অন্ধ আঁধার ও এক অমোঘ পরিণতি

Image
৩৩তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব অভিমানী দুর্যোধনের অন্ধ আঁধার ও এক অমোঘ পরিণতি রাজসভার বাতাস তখন চরম উত্তেজনায় ভারাক্রান্ত। হস্তিনাপুরের রাজসভায় একে একে উপস্থিত হয়েছেন জ্ঞানবৃদ্ধ ও বয়োজ্যেষ্ঠগণ। কিন্তু সভা জুড়ে যে বিষণ্ণ স্তব্ধতা, তাকে সহজে কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছিল না। মহামতি বেদব্যাস, সর্বমান্য পিতামহ ভীষ্ম এবং স্বয়ং দেবর্ষি নারদ—সবাই চেষ্টা করেছেন। নারদের কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়েছিল গভীর জীবনসত্য। তিনি বলেছিলেন, "জগতে সহৃদয় শ্রোতা আর সুহৃদ পাওয়া বড় দুর্লভ হে কুরুনন্দন! যখন ঘোর সংকট আসে, আপনজনরাও মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন শুধু একজন খাঁটি বন্ধুই পাশে থাকে। হঠকারিতার ফল কোনোদিন শুভ হয় না, তার পরিণাম কেবলই হাহাকার।" কিন্তু যে চোখ অন্ধকারের প্রেমে পড়েছে, আলো তাকে স্পর্শ করবে কীভাবে? অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অক্ষম পিতা হিসেবে নিজের দুর্বলতাটুকু তিনি ঢাকতে পারলেন না। তিনি শ্রীকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, "কেশব! তোমার প্রতিটা কথা ধর্মের কথা, সুচিন্তিত এবং ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু আমি যে পরাধীন! এই মন্দমতি দুর্যোধন আমার কোনো কথা শোনে না, শাস্ত্র মানে না, কোনো গুরু...