Posts

৫০তম বনপর্ব-কার্তিকের জন্ম এবং তাঁর দেবসেনাপতিত্ব গ্রহণের উপাখ্যান

Image
৫০তম বনপর্ব-কার্তিকের জন্ম এবং তাঁর দেবসেনাপতিত্ব গ্রহণের উপাখ্যান যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলেন-ভার্গবশ্রেষ্ঠ। স্বামী কার্তিকের জন্ম কীভাবে হয়েছিল এবং তিনি কেমন করে অগ্নিপুত্র হলেন, সেইসব কথা আমাকে যথাবৎ কৃপা করে বলুন। ঋষি মার্কণ্ডেয় বললেন-কুরুনন্দন। আমি তোমাকে স্বামী কার্তিকের জন্ম বৃত্তান্ত শোনাচ্ছি। পূর্বকালে দেবতা এবং অসুর নিজেদের মধ্যে প্রায়ই সংগ্রামে রত থাকতেন। ভয়ংকর রূপধারণকারী অসুররা দেবতাদের সর্বদাই পরাজিত করত। ইন্দ্র যখন বারবার তাঁর সেনাদের নাশ হতে দেখলেন, তখন তিনি মানস পর্বতে গিয়ে এক শ্রেষ্ঠ সেনাপতি কী করে লাভ করা যায় তার জন্য চিন্তা করতে লাগলেন। সেইসময় তিনি এক নারীর করুণ আর্তনাদ শুনতে পেলেন। সে বারংবার চেঁচিয়ে বলছিল- 'কোনো পুরুষ আছ, আমাকে রক্ষা করো!' ইন্দ্র তার আর্তনাদ শুনে বললেন- 'ভয় পেয়ো না, এখানে তোমার ভয় পাবার কিছু নেই।' এই বলে সেখানে পৌঁছে দেখলেন হাতে গদা নিয়ে কেশী দৈতা সেই নারীটির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ইন্দ্র সেই নারীর হাত ধরে বললেন- 'ওরে নীচ কুকর্মকারী! তুই কী করে এই নারীটিকে হরণ করতে চাস? মনে বাখিস, আমি বজ্রধারী ইন্দ্র। তুই এখনই একে ছেড়ে দে।' তখন...

৪৯তম বনপর্ব ব্রাহ্মণ কৌশিক ও ধর্মব্যাধের পরমাত্মার সংলাপ —

Image
  ৪৯তম বনপর্ব ব্রাহ্মণ কৌশিক ও ধর্মব্যাধের  পরমাত্মার সংলাপ —  মহর্ষি মার্কণ্ডেয়ের কণ্ঠস্বর গঙ্গার মৃদু তরঙ্গের মতো ধীর অথচ গম্ভীর। চারধারে অরণ্যের নিস্তব্ধতা। পাণ্ডবদের কুটিরের সামনে বসে থাকা যুধিষ্ঠির গভীর তৃষ্ণা নিয়ে শুনছিলেন সেই পুণ্য কথা। মহর্ষি বলতে লাগলেন— হে কুন্তীপুত্র, সত্যের অন্বেষণ বড় বিচিত্র পথ ধরে চলে। কখনও তা হিমালয়ের তুষারশুভ্র শিখরে নিয়ে যায়, আবার কখনও তা এনে দাঁড় করায় মিথিলার এক সংকীর্ণ, কোলাহলপূর্ণ কসাইখানায়। অহংকারী ব্রাহ্মণ কৌশিকের অহংকার চূর্ণ হয়েছিল এক ব্যাধের সামান্য পর্ণকুটিরে এসে। ধর্মের আসল রূপ জানতে কৌশিক যখন সেই মাংস বিক্রেতার সামনে করজোড়ে দাঁড়াল, তখনই শুরু হলো মহাভারতের এক পরম অনুপম অধ্যায়। ১. শিষ্টাচারের অন্বেষণ: কৌশিকের প্রথম জিজ্ঞাসা কৌশিকের মনের সব ঔদ্ধত্য ততক্ষণে গলে জল হয়ে গেছে। এক পতিব্রতা রমণীর অলৌকিক তপোবলের উৎস খুঁজতে এসে সে এসে পৌঁছেছে এক শূদ্র ব্যাধের দ্বারে, যে জীবিকার তাগিদে পশুমাংস বিক্রয় করে। কিন্তু ব্যাধের চোখের সেই অচঞ্চল, শান্ত দীপ্তি দেখে কৌশিক বুঝতে পেরেছিল, এই মানুষটির ভেতরে এমন এক আলোর উৎস রয়েছে যা কোনো শুষ্ক বেদপ...

৪৮তম বনপর্ব- রক্তচক্ষু দ্বিজ ও ধর্মের গূঢ় লিপি: এক পতিব্রতার আখ্যান

Image
৪৮তম বনপর্ব- রক্তচক্ষু দ্বিজ ও ধর্মের গূঢ় লিপি: এক পতিব্রতার আখ্যান ধুন্ধুমারের সেই রক্তক্ষয়ী, প্রলয়ঙ্কর বীরত্বগাথা যখন শেষ হলো, সভাস্থলের পরিমণ্ডলে তখন এক গভীর স্তব্ধতা। পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরের মনের গভীরে জেগে উঠেছে এক নতুন সংশয়, এক আশ্চর্য কৌতূহল। তিনি মহর্ষি মার্কণ্ডেয়ের দিকে ফিরে তাকালেন। তাঁর চোখ দুটিতে তখন প্রজ্ঞার আলো। মৃদু, গম্ভীর স্বরে তিনি বললেন, "মহর্ষিবর, ক্ষত্রিয়ের শৌর্যগাথা তো শুনলাম। কিন্তু এবার আমি জানতে চাই সেই অতি সূক্ষ্ম ধর্মের কথা, যা অতি সন্তর্পণে সমাজকে ধরে রাখে। পতিব্রতা নারীদের সেই অলৌকিক মাহাত্ম্যের কথা আমাকে বলুন।" যুধিষ্ঠির একটু থামলেন, তাঁর কণ্ঠে এক গভীর আর্তি, "মাতা-পিতা ও গুরুজনদের সেবায় যে সন্তান নিজেকে উৎসর্গ করে, কিংবা যে নারী স্বামীকে দেবতাজ্ঞানে সেবা করে—এঁরা তো সর্বজনপূজ্য। কিন্তু এই সদাচার পালন করা তো মোটেও সহজ কাজ নয়। অল্পবয়সে পিতা-মাতার আর বিবাহের পর স্বামীর চরণে শ্রদ্ধা ও ভক্তি নিবেদন করার চেয়ে কঠিন ধর্ম বোধহয় এই সংসারে আর দুটি নেই। হে মুনিবর, আপনি আমাকে সেই পাতিব্রত্যের নিগূঢ় রহস্য শোনান।" মহর্ষি মার্কণ্ডেয় ক...

৪৭তম বন পর্ব -বালুকারাশি, প্রলয়াগ্নি এবং এক অপরাজিত ধুন্ধুমারের বিস্মৃত উপাখ্যান

Image
৪৭তম বন পর্ব -বালুকারাশি, প্রলয়াগ্নি এবং এক অপরাজিত ধুন্ধুমারের বিস্মৃত উপাখ্যান মার্কণ্ডেয় মুনি একটু থামলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি বহুদূরে প্রসারিত, যেন হাজার হাজার বছরের কুয়াশাচ্ছন্ন ইতিহাস ভেদ করে তিনি দেখতে পাচ্ছেন এক আশ্চর্য সত্য। স্মৃতির জীর্ণ পাতাগুলো একে একে খুলে যাচ্ছিল তাঁর মনের গভীরে। সূর্যবংশের সেই অতিপ্রাচীন গৌরবগাথা তাঁর কণ্ঠে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করল। তিনি বলতে শুরু করলেন, "শোনো যুধিষ্ঠির, মহাপ্রতাপশালী সূর্যবংশের রাজা ইক্ষাকু যখন পরলোকগমন করলেন, তখন অযোধ্যার রাজসিংহাসনে বসলেন তাঁর যোগ্য পুত্র শশাদ। তারপর কালচক্র আবর্তিত হতে লাগল। শশাদের পর ককুৎস্থ, তাঁর পর অনেনা, একে একে এলেন পৃথু, বিশ্বগশ্ব, অদ্রি এবং যুবনাশ্ব। যুবনাশ্বের ঔরসে জন্ম নিলেন শ্রাব। এই শ্রাবই পরম যত্নে গড়ে তুলেছিলেন এক স্বপ্নের নগরী—শ্রাবন্তী। শ্রাবন্তের পুত্র বৃহদশ্ব, আর তাঁর ঘরেই আলো করে এলেন কুবলাশ্ব। কুবলাশ্ব কেবল বীর ছিলেন না, গুণের দিক থেকে তিনি পিতাকেও ছাপিয়ে গিয়েছিলেন। যখন কুবলাশ্ব পূর্ণ যৌবনে পদার্পণ করলেন, বৃহদশ্ব ভাবলেন, এবার সংসারধর্ম ও রাজপাটের মায়া ত্যাগ করার সময় এসেছে। তিনি পুত্রকে সিংহাস...

৪৬ তম বনপর্ব-ছায়াহীন যমপথ ও পুণ্যময়ী নৌকা: যুধিষ্ঠির-মার্কণ্ডেয় সংবাদ

Image
৪৬ তম বনপর্ব-ছায়াহীন যমপথ ও পুণ্যময়ী নৌকা: যুধিষ্ঠির-মার্কণ্ডেয় সংবাদ দ্বৈতবনের শান্ত অপরাহ্নে গাছের পাতা চিরে আসা আলোয় বসে আছেন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির। তাঁর চোখে ক্লান্তির চেয়েও বড় এক সংশয়। পাশেই উপবিষ্ট ত্রিকালজ্ঞ মহর্ষি মার্কণ্ডেয়। তাঁর প্রশান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে যুধিষ্ঠির এক গভীর জীবন-জিজ্ঞাসা মেলে ধরলেন। "হে মুনিবর, মানুষ ঠিক কোন অবস্থায় দান করলে ইন্দ্রলোকে পরম সুখ লাভ করে? দান বা সৎকর্মের সেই অলৌকিক ফল সে কীভাবে ফিরে পায়?" মহর্ষির ঠোঁটে ফুটে উঠল মৃদু, বিষণ্ণ হাসি। তিনি বলতে শুরু করলেন যেন এক পরম সত্যের উন্মোচন ঘটছে এই মর্ত্যের মাটিতে। দানের নিষ্ফলতা ও প্রকৃত পাত্রের সন্ধান মহর্ষি বললেন, "ধর্মরাজ, আগে বোঝো কার জীবন এবং কার দান বৃথা। সংসারে চার প্রকার মানুষের জন্ম একেবারেই অর্থহীন—  ১. যে অপুত্রক,  ২. যে অধার্মিক জীবন কাটায়,  ৩. যে সদা অন্যের গৃহে অন্ন ধ্বংস করে, এবং  ৪. যে অতিথি বা দেবতাকে না দিয়ে কেবল নিজের উদরপূর্তির জন্য খাদ্য রাঁধে। আবার যারা বাণপ্রস্থ বা সন্ন্যাস থেকে পুনরায় গৃহস্থাশ্রমে ফিরে আসে, তাদের দান এবং অন্যায় উপায়ে উপার্জিত অর্থের দান—উভয়ই নিষ্ফল। পা...

৪৫তম বন পর্ব-সময়ের নদী ও অহংকারের যুদ্ধ: তিন রাজর্ষির উপাখ্যান

Image
৪৫তম বন পর্ব-সময়ের নদী ও অহংকারের যুদ্ধ: তিন রাজর্ষির উপাখ্যান ১. এক লক্ষ বছরের ক্লান্তি এবং একটুখানি শাক-ভাত ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের মনের ভেতর তখন এক আশ্চর্য উদাসীনতা। তিনি চেয়ে রইলেন মহর্ষি মার্কণ্ডেয়ের শান্ত চোখের দিকে। বাইরে বনের পাতা ঝরার শব্দ। যুধিষ্ঠির জিজ্ঞেস করলেন, “মুনিবর, বক আর দাল্ভ্য—শুনেছি এঁরা দুজনে জরা-মৃত্যুকে জয় করে বেঁচে আছেন বহুকাল। দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গেও নাকি এঁদের বড় সখ্য। সেই মিলনের গল্পটি একটু বলবেন? এক অতি-দীর্ঘ জীবনের স্বাদ কেমন হয়, জানতে ইচ্ছে করে।” মার্কণ্ডেয় একটু হাসলেন। সে হাসিতে যেন হাজার বছরের ইতিহাস লেখা রয়েছে। তিনি বলতে শুরু করলেন: সে এক অস্থির সময় গেছে। দেবতা আর অসুরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষ হয়েছে সবে। ইন্দ্র যুদ্ধে জিতে স্বর্গের সিংহাসনে বসেছেন। চারদিকে তখন প্রাচুর্যের উৎসব—ঠিক সময়ে বৃষ্টি নামে, মাঠে সোনালী শস্যের দোলা, মানুষের শরীরে কোনো রোগ নেই, মনে নেই কোনো মলিনতা। একদিন দেবরাজ ইন্দ্র ভাবলেন, মর্ত্যের প্রজাদের একটু দেখে আসা যাক। তিনি তাঁর মহিমান্বিত ঐরাবতে চড়ে রওনা হলেন। ঘুরতে ঘুরতে তিনি এসে পৌঁছলেন পূর্ব সমুদ্রের কাছাকাছি এক নিভৃত অরণ্যে।...

৪৪তম বনপর্ব মার্কণ্ডেয় ঋষি: কলিযুগ ও আগামীর পদধ্বনি

Image
৪৪তম বনপর্ব মার্কণ্ডেয় ঋষি: কলিযুগ ও আগামীর পদধ্বনি মার্কণ্ডেয়ের কণ্ঠস্বর তখন নিভে আসা প্রদীপের শেষ শিখাটুকুর মতো কাঁপছে। সৃষ্টি আর প্রলয়ের সেই অলৌকিক, অতিপ্রাকৃতিক আখ্যান শুনে যুধিষ্ঠিরের চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গিয়েছিল। বুকের ভেতর একটা হিমশীতল বাতাস টের পাচ্ছিলেন তিনি। অর্জুন তাঁর ধনুকে হাত দিয়ে চুপ করে বসে আছেন, ভীমের বিশাল চোয়াল শক্ত। কাম্যবনের সেই শেষ বিকেলের আলোয়, যেখানে গাছের ছায়াগুলো ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে অজগরের মতো গ্রাস করছে চারপাশ, যুধিষ্ঠির আবার একটু এগিয়ে বসলেন। তাঁর গলায় কৌতূহল নয়, এক গভীর বিষণ্ণ আর্তি। তিনি বললেন, "ভার্গব, জন্ম আর মৃত্যুর এই যে মহাজাগতিক খেলা, তা তো শুনলাম। কিন্তু আমার মনকে এক তীব্র আশঙ্কা গ্রাস করছে। এই যে আমাদের চারপাশের চেনা পৃথিবী, এর পর কী? যখন কলিযুগ আসবে, যখন মানুষের মনের ভেতরের অন্ধকার বাইরে নেমে আসবে, তখন ঠিক কী ঘটবে মুনিবর? মানুষের শরীর কেমন হবে? তাদের অন্ন, তাদের বস্ত্র, তাদের আয়ুর পরিমাপ—সবটাই কি বদলে যাবে? কলির সেই চরম হাহাকারের শেষে আবার কীভাবে ফিরবে সত্যের প্রথম আলো? কৃপা করে বলুন, আপনার কথা যেন এক অনন্ত তৃষ্ণা ...