Posts

দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: দম্ভ এবং প্রতিশোধের উপাখ্যান

Image
  দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: দম্ভ এবং প্রতিশোধের উপাখ্যান সব বড় অনর্থের মূলে থাকে খুব তুচ্ছ কোনো ঘটনা। দেবগুরু বৃহস্পতির ছেলে কচ তখন সঞ্জীবনী বিদ্যা শিখে স্বর্গলোকে ফিরে গেছেন, দেবতাদের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। অসুররাজ বৃষপর্বার রাজ্যে তখন এক শান্ত দুপুর। সেই রাজ্যের এক সরোবরে জলকেলিতে মেতেছিলেন একদল রূপসী নারী। তাঁদের মধ্যে দুজন ছিলেন বিশেষ—একজন স্বয়ং অসুরগুরুর কন্যা দেবযানী, আর অন্যজন অসুররাজের মেয়ে শর্মিষ্ঠা। সম্পর্কে তাঁরা সখী, কিন্তু সেই সখ্যের তলায় চোরাস্রোতের মতো বইছিল আভিজাত্যের লড়াই। ঠিক সেই সময় দেবরাজ ইন্দ্রের এক কৌতুক জাগল। তিনি বাতাসের বেশে এসে পাড়ে রাখা বসনগুলো এলোমেলো করে দিলেন। জল থেকে উঠে তাড়াহুড়ো করে পোশাক পরতে গিয়ে অদলবদল হয়ে গেল। দেবযানী আর শর্মিষ্ঠা একে অপরের পোশাক পরে ফেললেন। খুব সামান্য ভুল, কিন্তু দেবযানীর কাছে তা অপমানের মতো ঠেকল। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, "এ কী স্পর্ধা তোমার শর্মিষ্ঠা! তুমি আমার পোশাক পরেছ? মনে রেখো, আমার বাবা তোমার বাবার গুরু। আমার বাবা পূজ্য, আর তোমার বাবা তাঁর শিষ্য।" শর্মিষ্ঠা সাধারণ মেয়ে নন, তিনি রাজকন্যা। তাঁর ধমনীতে যোদ্ধার রক্ত। তিনি পাল্ট...

মরীচিকার দুই পিঠ: সামাজিক খাঁচা ও আমাদের না-বলা দীর্ঘশ্বাস

Image
এই গল্পটি কেবল দুই নারীর না, বরং আমাদের সমাজের সেই অদৃশ্য দেওয়ালগুলোর গল্প যা সাফল্যের সংজ্ঞা আর সম্পর্কের সমীকরণ নির্ধারণ করে দেয়।  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দেওয়ালে আমরা সবাই নিখুঁত। পাঁচ মিনিট স্ক্রল করলেই চোখে পড়ে সুখী দম্পতি, দামি ছুটি আর চকচকে ক্যারিয়ারের কোলাজ। আমরা ভাবি, সবাই জিতে গেছে, শুধু আমিই বুঝি পিছিয়ে রইলাম। কিন্তু পর্দার আড়ালের গল্পটা সামাজিক সংস্কার আর গ্লানির চাদরে ঢাকা। ১. সানার ‘অসম্পূর্ণ’ সাফল্য সানার বয়স চৌত্রিশ। পেশাগত জীবনে সে সাফল্যের শিখরে। সানা সেই আধুনিক নারী যাকে নিয়ে সমাজ গর্ব করে, কিন্তু আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কারণ? সে একা। তার বিশাল বেতন আর কাঁচঘেরা অফিস সমাজের চোখে তখনি সার্থক হতো, যদি তার হাতে শাঁখা-পলা বা কপালে সিঁদুর থাকত। কয়েক বছর আগে সানার জীবন এমন ছিল না। ছাব্বিশ বছর বয়সে সে এক অন্য জাতের ছেলের প্রেমে পড়েছিল। কিন্তু আমাদের সমাজ আজও ‘জাত-পাত’ আর ‘রক্তের শুদ্ধতা’ নিয়ে এতটাই আচ্ছন্ন যে, তার পরিবার তাকে বেছে নিতে বাধ্য করেছিল— হয় পরিবার ও আভিজাত্য, না হয় প্রেম। সানা নিজেকে বেছে নিয়েছিল। সে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু পাড়া-প্রতিবেশীর বাঁকা চাহ...

দেবতা আর অসুরের লড়াই আর কচ ও দেবযানীর প্রেম

Image
দেবতা আর অসুরের লড়াই আর কচ ও দেবযানীর প্রেম দেবতা আর অসুরের লড়াই তখন তুঙ্গে। স্বর্গে ইন্দ্রের দুশ্চিন্তার শেষ নেই, কারণ মর্ত্যের সমতলে দানবগুরু শুক্রাচার্য যেন সাক্ষাৎ যমরাজকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন। তাঁর হাতে আছে 'মৃতসঞ্জীবনী'। অসুরের দল মরছে আর শুক্রাচার্য কেবল একবার বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ছেন, অমনি তারা তুড়ি মেরে বেঁচে উঠছে। অথচ দেবগুরু বৃহস্পতি এ বিদ্যায় আনাড়ি। দেবতারা তো প্রমাদ গুনলেন। অবশেষে শরণ নিলেন বৃহস্পতিরই পুত্র কচ-এর। ছিপছিপে যুবক, চোখে তার তেজোদ্দীপ্ত অঙ্গীকার। দেবতারা বললেন, "বৎস কচ, ছদ্মবেশে যাও শুক্রাচার্যের আশ্রমে। যেমন করে হোক, আদায় করো সেই গোপন মন্ত্র।" কচ গেল। তবে লুকোছাপা সে করল না। ঋজু ভঙ্গিতে শুক্রাচার্যের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, "আমি বৃহস্পতির পুত্র। আপনার শিষ্য হতে চাই।" শুক্রাচার্য খুশি হলেন। কেন হবেন না? শত্রুর ছেলে যদি শ্রদ্ধায় মাথা নোয়ায়, তবে গুরুর অহংকার তাতে তৃপ্ত হয় বইকি। শুক্রাচার্য তাকে সাদরে বরণ করলেন। শর্ত হলো—হাজার বছরের ব্রহ্মচর্য। আশ্রমে কচের দিন কাটে ফুল তুলে, গোরু চরিয়ে আর সমিধ সংগ্রহ করে। কিন্তু এই কঠিন তপশ্চর্যার ফাঁকেই কখন ...

শকুন্তলা ও ভরত-কথা

Image
  শকুন্তলা ও ভরত-কথা তপোবনের নিভৃত ছায়ায় গান্ধর্ব মতে মিলন হয়েছিল দুষ্মন্ত আর শকুন্তলার। কোনো সাক্ষী ছিল না, ছিল শুধু বনের মর্মর আর দু’জোড়া তৃষ্ণার্ত চোখ। বিদায়বেলায় রাজা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—খুব শীঘ্রই রাজকীয় পালকি আসবে শকুন্তলাকে নিতে। কিন্তু রাজা চলে যাওয়ার পর তপোবনের নির্জনতা যেন আরও ঘনীভূত হলো। মহর্ষি কণ্ব আশ্রমে ফিরলে শকুন্তলা কুণ্ঠিত হলেন, পিতৃতুল্য ঋষির অনুমতি না নিয়ে এই পরিণয় তাঁর মনে অপরাধবোধ জাগাচ্ছিল। কিন্তু কণ্ব তো সাধারণ মানুষ নন, তাঁর দৃষ্টি অতীত-ভবিষ্যত চুইয়ে হৃদয়ে প্রবেশ করে। শকুন্তলার কপালে হাত রেখে তিনি শান্ত স্বরে বললেন, "ভয় নেই মা। ক্ষত্রিয় আর কন্যার এই মিলন শাস্ত্রসম্মত, এমনকি শুভ। দুষ্মন্ত ধার্মিক রাজা, তিনি তোর অমর্যাদা করবেন না।" শকুন্তলার অনুরোধে মহর্ষি রাজাকে আশীর্বাদও পাঠালেন। কালক্রমে শকুন্তলার কোলে এক দেবশিশু এলো। উজ্জ্বল ললাট, চওড়া কাঁধ, আর দু’হাতের তেলোয় চক্রের চিহ্ন—ঠিক যেন কোনো স্বর্গের রাজপুত্র মর্ত্যে নেমে এসেছে। বালকের বয়স যখন মাত্র ছয়, তখনই তার সাহসের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। বনের বাঘ, সিংহ আর বুনো হাতিকে সে দড়ি দিয়ে ব...
Image
  অরণ্যে আসা সেই রাজা দুষ্মন্ত পুরুবংশের নৃপতি তখন ধর্মের কাল। পৃথিবীতে ন্যায় আর নীতি তখন কোনো পুঁথির অক্ষর নয়, মানুষের নিশ্বাসের মতো স্বাভাবিক। সেই সময়ে কুরুজাঙ্গলে রাজত্ব করতেন পুরুবংশের শ্রেষ্ঠ সন্তান দুষ্মন্ত। তাঁর সাম্রাজ্য ছিল দিগন্তবিস্তৃত—সমুদ্রের নোনা জল ছুঁয়ে থাকা তটরেখা থেকে শুরু করে ম্লেচ্ছদের অধিকৃত দুর্গম প্রান্তর—সবই ছিল তাঁর একক ছত্রছায়ায়। দুষ্মন্ত কেবল পেশিবহুল এক যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রজাপালনের এক ঋজু প্রতীক। তাঁর শাসনে প্রকৃতিও যেন অনুগত দাসের মতো আচরণ করত। সময়মতো বৃষ্টি নামত, পলি পড়া উর্বর জমিতে শস্যের ভারে নুয়ে পড়ত খেত। তাঁর রাজ্যে অভাব ছিল না, ছিল না চুরির ভয় কিংবা ক্ষুধার জ্বালা। ব্রাহ্মণরা নির্ভয়ে যজন-যাজন করতেন, আর সাধারণ মানুষ পরম শান্তিতে যাপন করত তাদের দিনরাত্রি। ব্যক্তি হিসেবে দুষ্মন্ত ছিলেন এক বিস্ময়। ধনুর্বিদ্যায় তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু গদাযুদ্ধে তাঁর পারদর্শিতা ছিল ত্রিভুবনের আলোচনার বিষয়। ঘোড়া কিংবা হাতি—যেকোনো পশুর পিঠে বসলে মনে হতো না তিনি কোনো অবাধ্য প্রাণীকে শাসন করছেন, বরং মনে হতো তিনি তাদের মনের ভাষা বুঝতে পারছেন। রণাঙ্গনে তিনি ব...

রাজা পরীক্ষিতের অন্তিম যাত্রা

Image
রাজা পরীক্ষিতের অন্তিম যাত্রা সব দিক থেকেই পরীক্ষিত ছিলেন এক আদর্শ রাজা। অর্জুনের পৌত্র, অভিমন্যুর পুত্র—সেই মহাবীর অভিমন্যু, যিনি কুরুক্ষেত্রের চক্রব্যূহে প্রাণ দিয়েছিলেন নিজের অনাগত সন্তানকে দেখার আগেই। পরীক্ষিত তাঁর পিতাকে দেখেননি। তাঁর জন্ম হয়েছিল এক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে, যখন যুদ্ধের দামামা থিতিয়ে এসেছে, আর চারিদিকে কেবল শ্মশানের নিস্তব্ধতা। কিন্তু তিনি বড় হয়েছিলেন এক দীপ্ত মহিমায়। বীরত্ব, ন্যায়পরায়ণতা আর প্রজাবাৎসল্য ছিল তাঁর স্বভাবজাত। পাণ্ডবরা যখন মহাপ্রস্থানের পথে পা বাড়ালেন, হস্তিনাপুরের শেষ প্রদীপ হিসেবে জ্বলে রইলেন পরীক্ষিত। মানুষ তাঁকে ভালোবেসেছিল নিঃশর্তভাবে। কিন্তু মানুষের ভাগ্য তো সুতোর ওপর ঝুলে থাকে। এক সাধারণ দুপুরে শিকারে বেরোলেন রাজা। আর সেখান থেকেই শুরু হলো এক অমোঘ ট্র্যাজেডির। শিকার রাজধর্মের অংশ হতে পারে, কিন্তু সেদিন অরণ্যের গভীরে যেন এক মায়া হরিণ তাঁকে পথ ভুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তৃষ্ণার্ত, ক্লান্ত এবং কিছুটা বিরক্ত রাজা এসে পৌঁছলেন ঋষি শমীকের আশ্রমে। ঋষি তখন গভীর ধ্যানে মগ্ন। বাহ্যজ্ঞানহীন সেই স্তব্ধতার সামনে দাঁড়িয়ে পরীক্ষিত জল চাইলেন, শিকারের ...

কদ্রুর অভিশাপ: তক্ষক ও আস্তিকের সেই সন্ধিক্ষণ

Image
কদ্রুর অভিশাপ: তক্ষক ও আস্তিকের সেই সন্ধিক্ষণ আকাশের রঙ তখন ফিকে হয়ে আসছে। মহর্ষি কশ্যপের ঘরনি কদ্রু যখন দাঁড়ালেন, তাঁর চোখের মনিতে এক বিচিত্র কাঠিন্য। মাতৃত্বের সেই চিরচেনা স্নিগ্ধতা সেখানে নেই, আছে ক্ষমতার এক তীব্র দহন। কদ্রুর অজস্র   নাগের দল যখন বিনতাকে ছলনা করতে অস্বীকার করল—যে ছলনা ছিল নীচতার চরম পর্যায়—তখন কদ্রু ঘর সামলানো মা থেকে হয়ে উঠলেন এক প্রতিহিংসাপরায়ণ চণ্ডী। তিনি তাঁর সন্তানদের অভয় দিলেন না, শাসনও করলেন না। পবিত্র অগ্নিকুণ্ডের সামনে দাঁড়িয়ে হাড়হিম করা গলায় দিলেন এক অভিশাপ— 'জনমেজয়ের সর্পসত্রে তোমরা সবাই পুড়ে খাক হয়ে যাবে।' অগ্নির শিখা সেদিন যেন ভয়ে একটু কেঁপে উঠেছিল। ব্রহ্মা শুনলেন, দেবতারাও নীরব থাকলেন। পৃথিবী থেকে বিষধর কালকূটদের বিনাশ হয়তো নিয়তিরই লিখন ছিল। নাগলোকে তখন এক অবর্ণনীয় আতঙ্ক। বাসুকি, তক্ষক, ঐরাবত—যাঁরা যুগ যুগ ধরে কালকে শাসন করেছেন, তাঁদের বুকও আজ মায়ের অভিশাপে দুরুদুরু। মিটিং বসল নাগরাজ্যে। কেউ বলল যুদ্ধ করবেন, কেউ বললেন পালাবেন। আবার কেউ বললেন যজ্ঞ যে সব ব্রাহ্মণ করবেন তাদের হত্যা করবে। তক্ষকের উদ্ধত ফণা অব্দি আজ নুয়ে পড়েছে। কিন্তু বাসুকি জানতে...

অনন্তের প্রতীক্ষা: শেষনাগ

Image
  অনন্তের প্রতীক্ষা: শেষনাগ  কশ্যপ মুনির দুই স্ত্রী, অথচ রেষারেষিটা ছিল একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে। উচ্চৈঃশ্রবা ঘোড়ার লেজ কালো না সাদা—এই নিয়ে বাজি ধরলেন কদ্রু। জেতার জন্য নিজের হাজার ছেলেকে হুকুম দিলেন ঘোড়ার লেজে গিয়ে সেঁটে থাকতে, যাতে সাদা লেজ কালো দেখায়। ছলনা। কিন্তু সব ছেলে সেই অন্যায়ে সায় দিল না। কদ্রু রেগে আগুন হয়ে নিজের গর্ভজাত সন্তানদেরই অভিশাপ দিলেন— "তোরা জনমেজয়ের সর্পসত্রে ভস্ম হয়ে যাবি।" সেই হাজার সর্পসন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন শেষ। কিন্তু এই শেষের মনের গঠন ছিল অন্যরকম। তাঁর ভাইরা ছিল কুটিল, ক্রূর। বিনতা আর গরুড়ের ওপর তারা যে অকথ্য অত্যাচার চালাত, তা শেষের সহ্য হতো না। তিনি দেখলেন, তাঁর ভাইরা অন্যের যন্ত্রণায় উল্লাস পায়। একই রক্ত, একই হাজার ফণা— অথচ শেষের ভেতরে বিষের বদলে দানা বাঁধছিল এক গভীর বিতৃষ্ণা। একদিন তিনি কারোর সাথে কোনো ঝগড়া করলেন না, কোনো দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন না। শুধু নিঃশব্দে ঘর ছাড়লেন। কঠোর তপস্যা ও ব্রহ্মার আগমন গন্তব্য ছিল নির্জনতা। গন্ধমাদন, বদরিকাশ্রম, গোকর্ণ— যেখানে বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কোনো কোলাহল নেই। শেষনাগ সেখানে গিয়ে একাগ্র মনে ধ্যানে বসলেন। খাওয়া...

গরুড়ের মুক্তি: মায়ের বন্ধনমোচন, অমৃত ও পক্ষিরাজের গৌরব

Image
  গরুড়ের মুক্তি: মায়ের বন্ধনমোচন, অমৃত ও পক্ষিরাজের গৌরব সূর্যের আলোয় ঝলমল করছিল স্বর্গের আকাশ। দেবতাদের পরাজিত করে, অমৃতের কলস হাতে তুলে নিয়ে গরুড় উড়ে চলেছিলেন। তাঁর বিশাল ডানায় বাতাস কাঁপছিল, যেন পৃথিবীটা ছোট হয়ে গেছে। কিন্তু তিনি অমৃত নিয়ে যাচ্ছিলেন না লোভে, না অমরত্বের লালসায়। শুধুমাত্র একটা কথা রাখার জন্য—মা বিনতার মুক্তির জন্য। সেই নাগদের ক্রূর বন্ধন থেকে মাকে ছিনিয়ে আনার জন্য। আকাশের উচ্চতায়, যেখানে মেঘেরাও থমকে দাঁড়ায়, সেখানে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল ভগবান বিষ্ণুর সঙ্গে। বিষ্ণু চেয়ে দেখলেন সেই বিশাল পাখিকে। চোখে কোনো লোভ নেই, হৃদয়ে কোনো ক্ষুধা নেই—শুধু একটা অটল উদ্দেশ্য। এমন নিষ্কাম পুরুষ দেখে বিষ্ণুর মন গলে গেল। “বর চাও, গরুড়। যা চাও, তাই দেব।” গরুড়ের উত্তর এল শান্ত, গভীর গলায়—যেন আকাশেরই কথা বলছেন তিনি।   “আমাকে আপনার ধ্বজায় স্থান দিন। আর অমৃত ছাড়াই, শুধু আপনার কৃপায় আমাকে অমরত্ব দিন।” বিষ্ণু হাসলেন। সঙ্গে সঙ্গে বর দিয়ে দিলেন।   তখন গরুড় ফিরিয়ে বললেন, “এবার আমিও আপনাকে একটা বর দিতে চাই। যা চান, বলুন।” বিষ্ণু মৃদু হেসে বললেন, “তবে তুমি আমার বাহন হও। সকল লোকের...

গরুড় ও অমৃতের সন্ধান: এক শক্তিশালী বীরের আখ্যান

Image
  গরুড় ও অমৃতের সন্ধান: এক শক্তিশালী বীরের আখ্যান- বিনতানন্দন গরুড়ের বুকের ভেতর তখন এক প্রকাণ্ড আগুন জ্বলছে। সে আগুন ক্ষুধার নয়, অপমানের। এক তুচ্ছ বাজি হেরে তাঁর মা বিনতা এখন কদ্রুর দাসী। দাসত্ব মোচনের একটাই পথ— সর্প সন্তানদের জন্য স্বর্গ থেকে নিয়ে আসতে হবে অমৃত। যাত্রার আগে মা বিনতা ছেলেকে সাবধান করেছিলেন, "সমুদ্রের মাঝখানে ওই সর্পকুলকে তুই আহার হিসেবে গ্রহণ করিস, কিন্তু খবরদার, কোনো ব্রাহ্মণকে যেন আঘাত করিস না।" একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল- আকাশপথে উড়তে উড়তে গরুড়ের জঠরে তখন তীব্র ক্ষুধার জ্বালা। হঠাৎ ক্ষুধার ঝোঁকে তিনি এমন একজনকে মুখে পুরে নিলেন, যার সংস্পর্শে তাঁর তালু আগুনের মতো জ্বলতে শুরু করল। গরুড় বুঝলেন, ভুল হয়েছে। নিজের অজান্তেই তিনি এক ব্রাহ্মণকে মুখে তুলে নিয়েছেন। তৎক্ষণাৎ তাঁকে মুক্ত করে দিয়ে গরুড় এগিয়ে চললেন। কিছুদূর এগোতেই দেখা হলো মহর্ষি কশ্যপের সঙ্গে। কশ্যপ কুশল জানতে চাইলেন। গরুড় লুকোলেন না কিছুই— মায়ের দাসত্ব, কদ্রুর চক্রান্ত আর অমৃত আহরণের কঠিন লক্ষ্যের কথা খুলে বললেন। শেষে ঈষৎ বিরক্তির সঙ্গেই জানালেন, তাঁর পেটের ক্ষুধা এখনো মেটেনি। দুই ভাইয়ের প্রতিহিংসা- কশ্যপ স্...

গরুড়ের জন্ম: বন্ধন, অসহিষ্ণুতা আর আকাশ কাঁপানো মহাবীর

Image
গরুড়ের জন্ম: বন্ধন, অসহিষ্ণুতা আর আকাশ কাঁপানো মহাবীর আদ্যিকালের কথা। সত্যযুগ। তখন পৃথিবী ছিল সত্যের শাসনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা, ধর্মের চাকা তখনো টাল খায়নি। সেই সময়ে বাস করতেন প্রজাপতির দুই কন্যা— কদ্রু আর বিনতা। সম্পর্কে তাঁরা বোন, আবার মহর্ষি কশ্যপের ঘরনিও বটে। কশ্যপ তাঁদের দুজনেই খুব ভালোবাসতেন। একদিন পরম তৃপ্তিতে ঋষি বললেন, "চাও, যা চাইবার চেয়ে নাও।" কদ্রু দেরি করলেন না। তিনি চাইলেন সহস্র শক্তিশালী পুত্র, যারা হবে এক-একজন দুর্দান্ত সর্প। বিনতা একটু ভাবলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল অন্য। তিনি চাইলেন মাত্র দুই পুত্র— কিন্তু সেই দুই পুত্র যেন শক্তিতে কদ্রুর হাজার পুত্রকে হেলায় হারিয়ে দিতে পারে। কশ্যপ তথাস্তু বলে গর্ভধারণের উপদেশ দিয়ে গভীর অরণ্যে ধ্যানে মগ্ন হলেন। কালক্রমে কদ্রু এক হাজার ডিম পাড়লেন আর বিনতা দুটি। ধাত্রীরা সেই ডিমগুলোকে অতি সযত্নে উষ্ণ পাত্রে রেখে দিলেন। কেটে গেল দীর্ঘ পাঁচশো বছর। কদ্রুর এক হাজার ডিম ফুটে বের হলো এক হাজার দীপ্তকান্তি সর্পপুত্র। কিন্তু বিনতার সেই দুই ডিম? যেন পাথরের মতো নিথর, প্রাণস্পন্দনের নামগন্ধ নেই। বিনতা অপেক্ষা করলেন, আরও অপেক্ষা করলেন। কিন্তু ধৈর্য...

সমুদ্রমন্থন: অমৃতের অধিকার ও এক চিরস্থায়ী প্রতিশোধ

Image
  সমুদ্রমন্থন: অমৃতের অধিকার ও এক চিরস্থায়ী প্রতিশোধ দেবতারা তখন শ্রীহীন, তেজহীন। মহর্ষি দুর্বাশার অভিশাপে তাঁদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। স্বর্গ তখন এক ধূসর রাজ্য, যেখানে শক্তির বদলে হাহাকার ঘুরে বেড়ায়। এই হীনবল অবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়—অমৃত। সেই অমৃত যা লুকিয়ে আছে আদিম সমুদ্রের অতল গর্ভে। কিন্তু মহাসমুদ্রের জলরাশি মন্থন করা তো একা দেবতাদের সাধ্য নয়। অগত্যা চিরশত্রু দানবদের সঙ্গে সন্ধি করতে হলো। লোভ বড় বালাই, অমৃতের ভাগ পাওয়ার আশায় অসুররা রাজি হয়ে গেল সেই অসম্ভব শ্রমে। উপাখ্যানে বলা হয়, মন্দার পর্বত হলো মন্থনদণ্ড আর নাগরাজ বাসুকি হলেন রশি। একপাশে দেবতারা, অন্যপাশে অসুররা—শুরু হলো এক মহাকাব্যিক টানাপোড়েন। সমুদ্রের নীল জল ফুঁসতে লাগল, ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ল আকাশের গায়ে। শ্রমের ঘাম আর সমুদ্রের নোনা জল একাকার হয়ে গেল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন দিব্য বৈদ্য ধন্বন্তরি অমৃতের কলস নিয়ে উঠে এলেন, তখন মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে গেল দৃশ্যপট। প্রতিজ্ঞা আর চুক্তির কথা ভুলে গিয়ে অসুররা এক হ্যাঁচকা টানে ছিনিয়ে নিল সেই কলস। শুরু হলো অধিকারের লড়াই। বিষ্ণু জানতেন, গায়ের জোরে অসুরদের হারানো কঠিন। তাই...

কর্ণ- কবচধারী সেই কিশোর-

Image
কর্ণ- কবচধারী সেই কিশোর- মহাভারতের এই গল্পটা কোনো রাজসূয় যজ্ঞ বা কুরুক্ষেত্রের রণহুঙ্কার দিয়ে শুরু হয় না। এ গল্পের মূলে রয়েছে এক কিশোরীর কৌতূহল, তার হৃদয়ের এক গোপন দীর্ঘশ্বাস, যা সে আমৃত্যু বয়ে বেড়িয়েছে একা। যদুবংশের শূরসেন ছিলেন অত্যন্ত প্রতাপশালী এক জনপদ প্রধান। তাঁরই পুত্র বসুদেব, যিনি পরবর্তীতে কৃষ্ণের পিতা হবেন। কিন্তু কৃষ্ণের জন্মের অনেক আগে শূরসেন এক অদ্ভুত প্রতিজ্ঞা করে বসেছিলেন। তাঁর এক পিসতুতো ভাই ছিলেন—কুন্তীভোজের রাজা। সেই রাজা ছিলেন নিঃসন্তান। শূরসেন পবিত্র অগ্নির সামনে দাঁড়িয়ে কথা দিয়েছিলেন, তাঁর প্রথম সন্তানকে তিনি তুলে দেবেন এই নিঃসন্তান ভাইয়ের হাতে। যখন প্রথা জন্মালো, শূরসেন নিজের কথা রাখলেন। জন্মমুহূর্তেই শিশুটিকে কুন্তীভোজের হাতে সঁপে দেওয়া হলো। প্রিথা হয়ে গেল ‘কুন্তী’। একটি রাজ্যের নাম মিশে গেল একটি মেয়ের পরিচয়ে। কুন্তীভোজের প্রাসাদে কুন্তী বড় হয়ে উঠছিলেন এক স্নিগ্ধ আবহে। তিনি আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো ছিলেন না। তাঁর মধ্যে ছিল সেবার এক আশ্চর্য নিষ্ঠা। প্রাসাদে কোনো অতিথি এলে বা কোনো ঋষি পদার্পণ করলে কুন্তীর হাত দিয়েই চলত তাঁদের সেবা। এই সেবা করতে গিয়েই তাঁর জীবনে ...

এক মানসী, যে হয়তো কোনোদিন ছিলই না—অথচ যাকে মুছে ফেলার সাধ্য নেই কারো।

Image
এক মানসী, যে হয়তো কোনোদিন ছিলই না—অথচ যাকে মুছে ফেলার সাধ্য নেই কারো। ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে অনেক সময় এমন কিছু নাম উঠে আসে, যাদের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় থাকলেও বাঙালির বা ভারতবাসীর আবেগে তাদের স্থান প্রশ্নাতীত। আনারকলি তেমনই এক নাম। কোনো সম্রাট বা দিগ্বিজয়ীর নাম নয়, এ এক এমন কিশোরীর গল্প, যার অপরাধ ছিল শুধু ভালোবাসা। অন্ধকার গলি আর ডালিমের ফুল তার আসল নাম কী ছিল, কেউ জানে না। কিন্তু ইতিহাসে সে পরিচিত ‘আনারকলি’ নামে—যার অর্থ ডালিম ফুল। সে ছিল তরুণী, লাবণ্যময়ী আর বুদ্ধিমতী। মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল আগ্রার প্রাসাদে সে হেঁটে বেড়াত এক সহজাত আভিজাত্যে। আকবরের দরবার মানেই তখন একদিকে অঢেল সম্পদ, অন্যদিকে পদে পদে বিপদ। কবি, শিল্পী আর গুপ্তচরের ভিড়ে সেখানে প্রতিটা চাহনির আড়ালে লুকিয়ে থাকত এক একটা সমীকরণ। আনারকলি এসবই জানত, যতদিন না সে অসতর্ক হয়ে পড়ল। আর সেই অসতর্কতার নাম—শেহজাদা সেলিম। আকবরের পুত্র সেলিম ছিলেন ঠিক যেমনটা একজন মুঘল রাজপুত্রের হওয়া উচিত—উদ্দাম, চঞ্চল এবং জীবনের প্রতি এক তীব্র তৃষ্ণায় ভরপুর। একদিন সেলিমের চোখ গিয়ে পড়ল আনারকলির ওপর। সেই যে দৃষ্টি বিনিময় হলো, তা আর সরলো না। রাজপুত্রের...

শরদ্বান ঋষি ও পথের ধারে কুড়িয়ে পাওয়া রাজপুত্তুর

Image
  শরদ্বান ঋষি ও পথের ধারে কুড়িয়ে পাওয়া রাজপুত্তুর মহাভারতের চরিত্ররা যেন এক-একজন রহস্যের খনি। সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষের মতো তাদের জন্ম নয়, তাদের বেড়ে ওঠাও যেন কোনো এক অলৌকিক চিত্রনাট্যের অংশ। দ্রোণাচার্যের পত্নী কৃপীর কথাই ধরা যাক। কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধের নেপথ্যে এই শান্ত অথচ তেজস্বিনী নারীর অবদান কম নয়। কিন্তু কৃপীর জন্মের ইতিহাস খুঁড়তে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় তাঁর পিতা শরদ্বানের কাছে, যাঁর জন্ম হয়েছিল এক অদ্ভুত উপায়ে—তির বা শর থেকে। গৌতম মুনির পুত্র শরদ্বান। কিন্তু শাস্ত্রপাঠ বা যজ্ঞের আগুন তাঁকে কোনোদিন টানেনি। ঋষিপুত্র হলে কী হবে, তাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল ধনুুর্বিদ্যা। যখন অন্য ব্রাহ্মণ বালকরা প্রদীপের আলোয় বেদপাঠে মগ্ন, শরদ্বান তখন বনের অন্ধকারে লক্ষ্যভেদ অভ্যাস করছেন। শাস্ত্রের চেয়ে অস্ত্রের ঝঙ্কারই ছিল তাঁর কাছে অধিক পবিত্র। কঠোর তপস্যা আর নিরলস সাধনায় তিনি এমন সব দিব্যাস্ত্র আয়ত্ত করলেন, যা সাধারণ কোনো যোদ্ধার পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব। তাঁর এই ক্রমবর্ধমান শক্তি দেখে স্বর্গের রাজা ইন্দ্র প্রমাদ গুনলেন। মর্ত্যের এক ব্রাহ্মণ যদি দেবতাতুল্য শক্তিশালী হয়ে ওঠেন, তবে স্ব...