Posts

পান্ডুর বিবাহ এবং দিগ্বিজয়

Image
  সূর্যালোকে ঝকঝক করছে চম্বল নদীর রুপোলি জল। তীরের সেই উর্বর পলিমাটিতে পা রেখে দাঁড়ালে আজ আর বোঝা যায় না, এই ধুলিকণায় মিশে আছে কত ইতিহাস। মানচিত্রের এক কোণে পড়ে থাকা কুন্তিভোজের এই ছোট্ট রাজ্যটি হয়তো একদিন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেত, যদি না সেখানে জন্মাতো একটি মেয়ে—যার গর্ভজাত পাঁচ পুত্র একদিন থরথর করে কাঁপিয়ে দিয়েছিল অখণ্ড ভারতবর্ষের বুক। কুন্তিভোজ ছিলেন যদুবংশীয় শূরসেনের পরম মিত্র ও ভাই। শূরসেনের ঘরে প্রথম যখন এক কন্যাসন্তান এল, নাম রাখা হলো পৃথা। রূপ যেন ফেটে পড়ছে। কিন্তু শূরসেনের একটি পুরনো অঙ্গীকার ছিল—প্রথম সন্তান তিনি দেবেন নিঃসন্তান কুন্তিভোজকে। কথা রাখতে পিছপা হলেন না শূরসেন। নিজের বুকের টুকরো পৃথাকে তুলে দিলেন ভাইয়ের হাতে। সেদিন থেকে পৃথা হয়ে গেল ‘কুন্তী’। প্রাসাদের বিলাসিতায় কুন্তী গা ভাসাননি। তাঁর চোখের মনিতে ছিল এক আশ্চর্য স্থিরতা আর সেবাপরায়ণতা। একদিন প্রাসাদে এলেন মহর্ষি দুর্বাসা। ঋষির মেজাজ মানেই জ্বলন্ত অঙ্গার; একটু ত্রুটি হলেই অভিশাপের দাবানল। কিন্তু কুন্তী ভয় পেলেন না। সেই যে প্রদীপ হাতে ভোরের আলো ফোটার আগে ঋষির দুয়ারে গিয়ে দাঁড়াতেন, সারাদিন তাঁর খুঁটিনাটি প্রয়োজন...

কুরুবংশের নবজন্ম ও গান্ধারীর মহত্যাগ

Image
  কুরুবংশের নবজন্ম ও গান্ধারীর মহত্যাগ সে এক আশ্চর্য সময়। কুরুরাজ্যে তখন কেবলই বসন্তের দীর্ঘশ্বাস। হস্তিনাপুরের প্রতিটি অলিতে-গলিতে যেন উৎসবের রোশনাই লেগে আছে। মহারাজ বিচিত্রবীর্যের অকাল মৃত্যুর পর রাজপ্রাসাদের অলিন্দে যে শূন্যতা হাহাকার করত, তাকে পূর্ণ করতেই যেন মর্ত্যে এলেন তিন ভাই—ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু আর বিদুর। প্রজারা সুখে আছে, ঘরে ঘরে অন্নের অভাব নেই, এমনকি রাজধানীর রাজপথে কোনো চোর-ছ্যাঁচোড়ের উপদ্রব পর্যন্ত নেই। এক কথায়, কুরুরাজ্য তখন এক পুষ্পিত উদ্যান। ভীষ্মের কড়া শাসন আর স্নেহের ছায়ায় বেড়ে উঠছে তিন ভাই। অথচ তিনজনেরই তিন রূপ। ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ হলেও তাঁর পেশীবহুল শরীরে যেন সহস্র হস্তীর বল। আক্রোশে একটা আস্ত লৌহদণ্ড অবলীলায় দুমড়ে দিতে পারেন তিনি। অন্যদিকে পাণ্ডু ধনুর্ধর হিসেবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, তীরের ফলায় তিনি আকাশ ছুঁতে চান। আর বিদুর? তাঁর মধ্যে যেন স্বয়ং ধর্ম সশরীরে বাস করছেন। শান্ত, ধীর আর অসীম প্রজ্ঞার অধিকারী এক মানুষ। কিন্তু নিয়তির লিখন বড় অদ্ভুত, বড় নিষ্ঠুর। বিদুর পরম জ্ঞানী হলেও তিনি দাসীপুত্র, তাই সিংহাসনের উত্তরাধিকার তাঁর নেই। বড় ভাই ধৃতরাষ্ট্রের কপালেই রাজমুকুট ওঠার...

ধর্মরাজের মর্ত্যবাস: অণিমাণ্ডব্যের ক্রোধ ও বিদুরের জন্ম

Image
  ধর্মরাজের মর্ত্যবাস: অণিমাণ্ডব্যের ক্রোধ ও বিদুরের জন্ম ইতিহাসের চাকা ঘোরে আপন নিয়মে, কিন্তু তার নেপথ্যে থাকে ছোট ছোট কিছু মুহূর্তের অভিঘাত। মহাভারতের সেই বিশাল ক্যানভাসে বিদুর এক আশ্চর্য চরিত্র। তিনি দাসীপুত্র, অথচ তাঁর ধমনীতে বইছিল ধর্মের বিশুদ্ধতম স্রোত। কেন এক পরম জ্ঞানীকে শূদ্রাণীর গর্ভে আসতে হলো, তার উত্তর লুকিয়ে আছে মহর্ষি মাণ্ডব্যের অপমানে। ঋষির মৌনব্রত ও নিয়তির নিষ্ঠুর খেলা বহু কাল আগের কথা। মহর্ষি মাণ্ডব্য ছিলেন এক অসাধারণ মানুষ—ধৈর্য যাঁর ভূষণ আর সত্য যাঁর আশ্রয়। নিজের আশ্রমের বাইরে এক বিশাল বৃক্ষের তলে তিনি দু’হাত তুলে ঊর্ধ্ববাহু হয়ে মৌনব্রত পালন করছিলেন। ধ্যানের এমন এক শিখরে তিনি পৌঁছেছিলেন যে, চারপাশের জগৎ তাঁর কাছে তখন ধূসর কুয়াশামাত্র। ঠিক সেই সময়, একদল দস্যু রাজকোষ লুঠ করে পালাচ্ছিল। পেছনে ধেয়ে আসছে ক্রুদ্ধ রাজসৈন্য। প্রাণভয়ে দস্যুরা ঋষির আশ্রমে ঢুকে লুণ্ঠিত সামগ্রীসহ লুকিয়ে পড়ল। সেনারা এসে ঋষিকে প্রশ্ন করল চোরদের হদিস নিয়ে। কিন্তু মাণ্ডব্য তখন অন্য জগতে, তাঁর মুখে কুলুপ আঁটা। সৈন্যরা তল্লাশি চালিয়ে দস্যুদের ধরল, আর ভাবল এই নিশ্চুপ সাধুই বোধহয় চোরদের সর্দার। রাজদ...

মেদহীন এক সাম্রাজ্য এবং নিয়তির খেলা-ধৃতরাষ্ট্র,পাণ্ডু ও বিদুরের জন্ম-

Image
মেদহীন এক সাম্রাজ্য এবং নিয়তির খেলা-ধৃতরাষ্ট্র,পাণ্ডু ও বিদুরের জন্ম- বিচিত্রবীর্যের অকালমৃত্যু কেবল একটি জীবনের অবসান ছিল না, তা ছিল কুরু বংশের ভবিষ্যতের ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। হাস্তিনাপুরের সিংহাসন শূন্য, আর সত্যবতীর বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে। যে সাম্রাজ্যকে তিনি তিল তিল করে আগলে রেখেছিলেন, তা আজ উত্তরাধিকারহীন। বিচিত্রবীর্যের দুই রাণী অম্বিকা আর অম্বালিকা তখন ভরা যৌবনে বিধবা। সত্যবতীর মনে হলো, তাঁর আজন্মের স্বপ্ন বুঝি এক নিমেষে ধূলিসাৎ হতে চলেছে। ভীষ্মের অটল প্রতিজ্ঞা তিনি দ্বারস্থ হলেন ভীষ্মের। সোজাসুজি বললেন, "বৎস, কুরুবংশ আজ বিলুপ্তির পথে। তুমি এই দায়ভার গ্রহণ করো। অম্বিকা আর অম্বালিকার গর্ভে সন্তান উৎপাদন করে তুমিই রক্ষা করো এই বংশ।" ভীষ্মের মুখচ্ছবিতে কোনো বিকার দেখা দিল না। সেই শান্ত, সমাহিত কণ্ঠস্বর। তিনি মনে করিয়ে দিলেন গঙ্গার তীরে নেওয়া সেই ভয়ানক প্রতিজ্ঞার কথা। যে প্রতিজ্ঞার বিনিময়ে একদিন সত্যবতী শান্তনুর মহিষী হতে পেরেছিলেন। ভীষ্ম বললেন, "মা, পৃথিবী তার গন্ধ ত্যাগ করতে পারে, আকাশ শব্দহীন হতে পারে, এমনকি চাঁদও তার শীতলতা হারানো সম্ভব—কিন্তু আমার দেওয়া কথা...

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

Image
সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ শান্তনু ও সত্যবতীর মিলনের পর সময় বয়ে গেল আপন গতিতে। যমুনার সেই মায়াবী সুগন্ধ এখন হস্তিনাপুরের অন্দরমহলে। সত্যবতী জন্ম দিলেন দুই পুত্র—চিত্রাঙ্গদ আর বিচিত্রবীর্য। বড় হচ্ছে দুই রাজপুত্র, কিন্তু তাঁদের ছায়া হয়ে আগলে রেখেছেন বড় ভাই ভীষ্ম। শান্তনুর মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসলেন চিত্রাঙ্গদ। এক অকালমৃত্যুর উপাখ্যান চিত্রাঙ্গদ ছিলেন তেজী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী আর দক্ষ শাসক। দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে তিনি একের পর এক রাজ্য জয় করতে লাগলেন। কিন্তু নিয়তির খেলা বোঝা বড় দায়। গন্ধর্বরাজার নামও ছিল চিত্রাঙ্গদ। মানুষের ঘরে তাঁরই নামের এক রাজা রাজত্ব করবে, এই অহংকার গন্ধর্বরাজ সইতে পারলেন না। শুরু হলো এক অসম যুদ্ধ। যমুনার তীরে তিন বছর ধরে চলল সেই সংগ্রাম। শেষ পর্যন্ত গন্ধর্বরাজের হাতে অকালে প্রাণ হারালেন হস্তিনাপুরের রাজা চিত্রাঙ্গদ। একরাশ সম্ভাবনা অকালেই ঝরে গেল। ভীষ্মের অভিভাবকত্ব ও কাশীর রাজসভা চিত্রাঙ্গদের মৃত্যুর পর বিচিত্রবীর্য তখন নেহাতই বালক। সিংহাসনে বসার মতো বয়স বা অভিজ্ঞতা কোনোটাই তাঁর নেই। ভীষ্ম আবার ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন। বিচিত্রবীর্যকে সিংহাসনে বসিয়ে ...

দেবব্রতর মহান ত্যাগ ও ভীষ্মের জন্ম মহারাজ শান্তনুর সাথে সত্যবতীর বিবাহ

Image
দেবব্রতর মহান ত্যাগ ও ভীষ্মের জন্ম মহারাজ শান্তনুর সাথে  সত্যবতীর  বিবাহ  হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে তখন উৎসবের আমেজ। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর পুত্র দেবব্রতকে ফিরে পেয়েছেন মহারাজ শান্তনু। গঙ্গার কোল থেকে ফিরে আসা এই তরুণ শুধু রূপবান নয়, অসামান্য বীর এবং প্রজ্ঞাবান। শান্তনু নিশ্চিন্ত মনে তাঁকে যুবরাজ ঘোষণা করলেন। প্রজারাও খুশি, কারণ দেবব্রতর দুচোখে আগামীর এক উজ্জ্বল ন্যায়পরায়ণ রাজার স্বপ্ন দেখা যায়। কিন্তু নিয়তি বোধহয় অলক্ষ্যে হাসছিল। শান্তনুর জীবনে প্রশান্তি দীর্ঘস্থায়ী হলো না। যমুনাতীরের সেই মায়াবী সুগন্ধ একদিন মৃগয়ায় গিয়ে শান্তনু যমুনার তীরে এক অলৌকিক সুগন্ধ পেলেন। ফুলের নয়, চন্দনের নয়—এ এক অচেনা মাদকতাময় ঘ্রাণ। সেই সুগন্ধ অনুসরণ করে এগোতেই তিনি দেখলেন এক পরমাসুন্দরী কন্যাকে। নাম তার সত্যবতী। মাছের পেট থেকে জন্ম নেওয়া এই কন্যার রূপ যেন বনভূমিকে আলো করে রেখেছে। ধীবররাজ দাসরাজার পালিতা কন্যা সে। শান্তনু প্রথম দর্শনেই তাঁর প্রেমে পড়লেন। স্থির করলেন, এই সত্যবতীকেই তিনি মহিষী করে প্রাসাদে নিয়ে যাবেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালেন সত্যবতীর পিতা। দাসরাজ বিনীতভাবে কিন্তু অত্যন্ত কঠিন এক শর...

এক ধর্মনিষ্ঠ রাজার নির্জনতা

Image
  এক ধর্মনিষ্ঠ রাজার নির্জনতা শান্তনু আর পাঁচটা রাজার মতো ছিলেন না। তাঁর রাজ্যে হস্তিনাপুরের আকাশ ছিল মেঘমুক্ত, প্রজাদের মনে ছিল না কোনো সংশয়। কিন্তু রাজার নিজের মনের গহীনে ছিল এক অদ্ভুত নির্জনতা। দীর্ঘ ছত্রিশ বছর তিনি ব্রহ্মচর্য পালন করেছেন। সিংহাসনে বসেও তিনি ছিলেন অরণ্যচারী ঋষির মতো সংযমী। সত্য আর ধর্মের প্রতি তাঁর যে অবিচল নিষ্ঠা, তা সেকালের আর কোনো বীরের মধ্যে দেখা যেত না। কিন্তু নিয়তি তো শান্ত বসে থাকে না, সে নিঃশব্দে জাল বোনে। থমকে যাওয়া জাহ্নবী সেদিন গঙ্গার তীরে একা হাঁটছিলেন শান্তনু। গঙ্গা তাঁর বহুদিনের সখী, তাঁর স্মৃতির চিরন্তন স্পন্দন। কিন্তু সেদিন ঘাটে গিয়ে রাজা থমকে দাঁড়ালেন। গঙ্গার চঞ্চল জলধারা আজ যেন কোনো মায়ায় স্থবির হয়ে গেছে। যে নদী উদ্দাম বেগে পাহাড় থেকে সমতলে নেমে আসে, সে আজ ক্লান্ত, দ্বিধাগ্রস্ত। স্রোত নেই, কেবল এক অদ্ভুত নীরবতা চারদিকে। কৌতূহলী শান্তনু নদীর পাড় ধরে উজানে হাঁটতে লাগলেন। দেখতে চাইলেন, কিসের দাপটে মহাপ্রাণ গঙ্গা এমন অচল হয়ে পড়ল। বাণের বাঁধ ও এক দিব্য বালক কিছুদূর এগোতেই রাজা দেখলেন এক অভাবনীয় দৃশ্য। এক দীর্ঘকায় কিশোর দাঁড়িয়ে আছে তীরের ঠিক মাঝখানে...

মহাভারতের সেই আদিপর্বের কথা। কুরুক্ষেত্রের রণহুঙ্কার তখনো অনেক দূরে, পাণ্ডব বা কৌরবদের জন্মও হয়নি

Image
  মহাভারতের সেই আদিপর্বের কথা। কুরুক্ষেত্রের রণহুঙ্কার তখনো অনেক দূরে, পাণ্ডব বা কৌরবদের জন্মও হয়নি—ভারতবর্ষের আকাশ তখন এক আদিম ও স্তব্ধ অপেক্ষায় থমথমে। ঠিক সেই মুহূর্তে নদীর কিনারে এক রাজার সাথে দেখা হলো এক মায়াবিনী রূপসীর। এই গল্প শান্তনুর। সেই বংশধারা: যযাতি থেকে হস্তী যযাতি অরণ্যে চলে যাওয়ার পর তাঁর পুত্র পুরুর বংশলতিকা ডালপালা মেলতে শুরু করল। সেই বংশেই এলেন দুষ্মন্ত আর শকুন্তলার পুত্র ভরত। যাঁর নামে এই দেশের নাম হলো ভারতবর্ষ। ভরত থেকে ভূমন্যু, তারপর সুহোত্র আর হস্তী। এই হস্তী রাজাই গঙ্গার তীরে পত্তন করলেন সেই বিখ্যাত নগরী—হস্তিনাপুর। বহুকাল পর সেই কূলে জন্ম নিলেন তিন ভাই: দেবাপি, শান্তনু আর বাহ্লীক। জ্যেষ্ঠ দেবাপি রাজ্য ছেড়ে সন্ন্যাস নিলেন, ফলে মুকুট উঠল শান্তনুর মাথায়। শান্তনুর এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল। তাঁর স্পর্শে জরাগ্রস্ত বৃদ্ধও সতেজ হয়ে উঠত, অশান্ত মনে নামত পরম শান্তি। এই 'শান্তি' বিলানোর ক্ষমতা থেকেই তাঁর নাম হয়েছিল শান্তনু। ব্রহ্মার অভিশাপ ও এক মরণশীল মুহূর্ত কিন্তু শান্তনু হওয়ার আগে, অন্য এক জন্মে তিনি ছিলেন ইক্ষ্বাকু বংশের প্রতাপশালী রাজা মহভিষ। পুণ্যবলে তিনি লাভ ...

রাজা যযাতির পতন ও মুক্তি

Image
রাজা যযাতির পতন ও মুক্তি মর্ত্যের নশ্বর শরীর ত্যাগ করার পর রাজা যযাতি স্বর্গে আরোহণ করলেন। সেখানে সহস্র বছর দেবরাজ ইন্দ্র, সাধ্য, মরুৎ আর বসুদের গভীর শ্রদ্ধায় কাটল তাঁর সময়। দেবলোকেও যযাতি ছিলেন অত্যন্ত আদৃত। একদিন ইন্দ্র সহাস্যে যযাতিকে জিজ্ঞেস করলেন, "আচ্ছা যযাতি, তুমি যখন তোমার জরা ব্যাধি ফিরিয়ে নিয়ে পুত্র পুরুকে যৌবন দান করলে আর তাকে সিংহাসনে বসিয়ে এলে, তখন শেষবার তাকে কী উপদেশ দিয়েছিলে?" যযাতি ধীর স্বরে উত্তর দিলেন, "আমি তাকে বলেছিলাম—গঙ্গা আর যমুনার মধ্যবর্তী ভূখণ্ড তোমার হোক, আর প্রান্তিক ভূমিগুলি হোক তোমার ভ্রাতাদের। তবে মনে রেখো পুরু, ক্রোধের চেয়ে ক্ষমা মহৎ, অসহিষ্ণুতার চেয়ে সহিষ্ণুতাই বড় শক্তি। মানুষের পরিচয় তার মস্তব্যে নয়, তার মনুষ্যত্বে। যারা কটু কথা বলে, তারা নিজের জীবনে অমঙ্গলকেই নিমন্ত্রণ করে। তিরস্কার সয়ে যাওয়া তীরন্দাজের তূণ থেকে নিক্ষিপ্ত তীরের চেয়েও কষ্টকর হতে পারে, কিন্তু বীরের ধর্ম হলো শান্ত থাকা। কিছু প্রত্যাশা না করে মানুষের সেবা করাই এই ত্রিভুবনের শ্রেষ্ঠ ধর্ম।" অহংকার ও পতন যযাতির কথা শুনে ইন্দ্র মুগ্ধ হলেন ঠিকই, কিন্তু হঠাৎই এক কূট প্রশ্ন...

যযাতির হাজার বছর: অন্তহীন তৃষ্ণা ও শেষ মুহূর্তের স্তব্ধতা

Image
যযাতির হাজার বছর: অন্তহীন তৃষ্ণা ও শেষ মুহূর্তের স্তব্ধতা যা চেয়েছিলেন, তাই পেলেন পৃথিবীতে এক ধরণের অদ্ভুত স্বাধীনতা আছে, যা কেবল তখনই আসে যখন মানুষ যা চায় ঠিক তাই পায়। কিন্তু পাওয়ার পর সেই প্রাপ্তি তাকে তৃপ্ত করল কি না, সেটা সম্পূর্ণ আলাদা এক তর্কের বিষয়। রাজা যযাতি তাঁর হারিয়ে যাওয়া যৌবন ফিরে পেতে চেয়েছিলেন। পেয়েওছিলেন। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র পুরু কোনো শর্ত ছাড়াই, হাসিমুখে নিজের যৌবন দান করেছিল পিতাকে। শুক্রাচার্যের সেই অদ্ভুত বরদানে যযাতির সামনে তখন হাজার বছরের এক দীর্ঘ, উজ্জ্বল পথ। রাজা আবারও এক টগবগে তরুণের শরীর নিয়ে ফিরে এলেন সংসারে। শুরু হলো এক দীর্ঘ যাত্রা। এক আদর্শ (?) রাজা যযাতির চরিত্রে অনেক দুর্বলতা ছিল ঠিকই, কিন্তু তিনি অকৃতজ্ঞ বা নিষ্ঠুর ছিলেন না। এই হাজার বছর তিনি কেবল ভোগবিলাসে কাটিয়ে দেননি। তিনি ছিলেন এক প্রজাবৎসল শাসক। তাঁর রাজ্যে কেউ অভুক্ত থাকত না। অপরাধীর শাস্তি আর যোগ্যর সম্মান—এই দুইয়ের ভারসাম্য তিনি বজায় রেখেছিলেন নিখুঁতভাবে। যজ্ঞ করেছেন নিয়ম মেনে, অতিথিসেবা করেছেন পরম শ্রদ্ধায়। প্রজারা সুখে ছিল, রাজ্য ছিল সমৃদ্ধ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, যযাতির মতো সার্থক জীবন আর ...

যযাতি, দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: এক রাজার দুই নারী ও এক পুত্রের ত্যাগ

Image
যযাতি, দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: এক রাজার দুই নারী ও এক পুত্রের ত্যাগ শুক্ৰাচার্যের আশ্রমের চারদিকের বনটা বড় ঘন, বড় রহস্যময়। সেই বনের গভীরে ঢুকে পড়লে সময় যেন থমকে দাঁড়ায়। একদিন মৃগয়ায় বেরিয়ে রাজা যযাতি ঠিক এইরকম এক গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেলেন। শিকারে মত্ত হয়ে তিনি যখন একটা নির্জন প্রান্তরে এসে পৌঁছলেন, দেখলেন এক অদ্ভুত দৃশ্য। সেখানে দুই নারী দাঁড়িয়ে। একজনের চোখেমুখে আভিজাত্যের প্রখর তেজ, অন্যজন শান্ত কিন্তু ভেতরে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। যযাতি জানতে চাইলেন তাঁদের পরিচয়। প্রথমজন সরাসরি উত্তর দিলেন। তিনি দেবযানী, অসুরগুরু শুক্রাচার্যর কন্যা। অন্যজন শর্মিষ্ঠা—অসুররাজ বৃষপর্বার মেয়ে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, রাজকন্যা শর্মিষ্ঠা সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন দেবযানীর পরিচারিকা হিসেবে। যযাতি তখনও জানতেন না এর পেছনের জটিল ইতিহাস। কিন্তু দেবযানী যখন রাজার দিকে তাকালেন, তাঁর চোখে ফুটে উঠল চেনা মানুষের উষ্ণতা। তিনি রাজাকে চিনতেন। সেই কুয়োর গভীর থেকে বাড়ানো হাত দেবযানী মনে করিয়ে দিলেন পুরনো এক স্মৃতি। একদিন অরণ্যে ঘুরতে ঘুরতে দেবযানী এক পরিত্যক্ত কুয়োর গভীরে পড়ে গিয়েছিলেন। কেউ ছিল না উদ্ধারের। সেই সময় এক শিকারি এসে নিজের...

দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: দম্ভ এবং প্রতিশোধের উপাখ্যান

Image
  দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: দম্ভ এবং প্রতিশোধের উপাখ্যান সব বড় অনর্থের মূলে থাকে খুব তুচ্ছ কোনো ঘটনা। দেবগুরু বৃহস্পতির ছেলে কচ তখন সঞ্জীবনী বিদ্যা শিখে স্বর্গলোকে ফিরে গেছেন, দেবতাদের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। অসুররাজ বৃষপর্বার রাজ্যে তখন এক শান্ত দুপুর। সেই রাজ্যের এক সরোবরে জলকেলিতে মেতেছিলেন একদল রূপসী নারী। তাঁদের মধ্যে দুজন ছিলেন বিশেষ—একজন স্বয়ং অসুরগুরুর কন্যা দেবযানী, আর অন্যজন অসুররাজের মেয়ে শর্মিষ্ঠা। সম্পর্কে তাঁরা সখী, কিন্তু সেই সখ্যের তলায় চোরাস্রোতের মতো বইছিল আভিজাত্যের লড়াই। ঠিক সেই সময় দেবরাজ ইন্দ্রের এক কৌতুক জাগল। তিনি বাতাসের বেশে এসে পাড়ে রাখা বসনগুলো এলোমেলো করে দিলেন। জল থেকে উঠে তাড়াহুড়ো করে পোশাক পরতে গিয়ে অদলবদল হয়ে গেল। দেবযানী আর শর্মিষ্ঠা একে অপরের পোশাক পরে ফেললেন। খুব সামান্য ভুল, কিন্তু দেবযানীর কাছে তা অপমানের মতো ঠেকল। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, "এ কী স্পর্ধা তোমার শর্মিষ্ঠা! তুমি আমার পোশাক পরেছ? মনে রেখো, আমার বাবা তোমার বাবার গুরু। আমার বাবা পূজ্য, আর তোমার বাবা তাঁর শিষ্য।" শর্মিষ্ঠা সাধারণ মেয়ে নন, তিনি রাজকন্যা। তাঁর ধমনীতে যোদ্ধার রক্ত। তিনি পাল্ট...

মরীচিকার দুই পিঠ: সামাজিক খাঁচা ও আমাদের না-বলা দীর্ঘশ্বাস

Image
এই গল্পটি কেবল দুই নারীর না, বরং আমাদের সমাজের সেই অদৃশ্য দেওয়ালগুলোর গল্প যা সাফল্যের সংজ্ঞা আর সম্পর্কের সমীকরণ নির্ধারণ করে দেয়।  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দেওয়ালে আমরা সবাই নিখুঁত। পাঁচ মিনিট স্ক্রল করলেই চোখে পড়ে সুখী দম্পতি, দামি ছুটি আর চকচকে ক্যারিয়ারের কোলাজ। আমরা ভাবি, সবাই জিতে গেছে, শুধু আমিই বুঝি পিছিয়ে রইলাম। কিন্তু পর্দার আড়ালের গল্পটা সামাজিক সংস্কার আর গ্লানির চাদরে ঢাকা। ১. সানার ‘অসম্পূর্ণ’ সাফল্য সানার বয়স চৌত্রিশ। পেশাগত জীবনে সে সাফল্যের শিখরে। সানা সেই আধুনিক নারী যাকে নিয়ে সমাজ গর্ব করে, কিন্তু আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কারণ? সে একা। তার বিশাল বেতন আর কাঁচঘেরা অফিস সমাজের চোখে তখনি সার্থক হতো, যদি তার হাতে শাঁখা-পলা বা কপালে সিঁদুর থাকত। কয়েক বছর আগে সানার জীবন এমন ছিল না। ছাব্বিশ বছর বয়সে সে এক অন্য জাতের ছেলের প্রেমে পড়েছিল। কিন্তু আমাদের সমাজ আজও ‘জাত-পাত’ আর ‘রক্তের শুদ্ধতা’ নিয়ে এতটাই আচ্ছন্ন যে, তার পরিবার তাকে বেছে নিতে বাধ্য করেছিল— হয় পরিবার ও আভিজাত্য, না হয় প্রেম। সানা নিজেকে বেছে নিয়েছিল। সে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু পাড়া-প্রতিবেশীর বাঁকা চাহ...

দেবতা আর অসুরের লড়াই আর কচ ও দেবযানীর প্রেম

Image
দেবতা আর অসুরের লড়াই আর কচ ও দেবযানীর প্রেম দেবতা আর অসুরের লড়াই তখন তুঙ্গে। স্বর্গে ইন্দ্রের দুশ্চিন্তার শেষ নেই, কারণ মর্ত্যের সমতলে দানবগুরু শুক্রাচার্য যেন সাক্ষাৎ যমরাজকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন। তাঁর হাতে আছে 'মৃতসঞ্জীবনী'। অসুরের দল মরছে আর শুক্রাচার্য কেবল একবার বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ছেন, অমনি তারা তুড়ি মেরে বেঁচে উঠছে। অথচ দেবগুরু বৃহস্পতি এ বিদ্যায় আনাড়ি। দেবতারা তো প্রমাদ গুনলেন। অবশেষে শরণ নিলেন বৃহস্পতিরই পুত্র কচ-এর। ছিপছিপে যুবক, চোখে তার তেজোদ্দীপ্ত অঙ্গীকার। দেবতারা বললেন, "বৎস কচ, ছদ্মবেশে যাও শুক্রাচার্যের আশ্রমে। যেমন করে হোক, আদায় করো সেই গোপন মন্ত্র।" কচ গেল। তবে লুকোছাপা সে করল না। ঋজু ভঙ্গিতে শুক্রাচার্যের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, "আমি বৃহস্পতির পুত্র। আপনার শিষ্য হতে চাই।" শুক্রাচার্য খুশি হলেন। কেন হবেন না? শত্রুর ছেলে যদি শ্রদ্ধায় মাথা নোয়ায়, তবে গুরুর অহংকার তাতে তৃপ্ত হয় বইকি। শুক্রাচার্য তাকে সাদরে বরণ করলেন। শর্ত হলো—হাজার বছরের ব্রহ্মচর্য। আশ্রমে কচের দিন কাটে ফুল তুলে, গোরু চরিয়ে আর সমিধ সংগ্রহ করে। কিন্তু এই কঠিন তপশ্চর্যার ফাঁকেই কখন ...

শকুন্তলা ও ভরত-কথা

Image
  শকুন্তলা ও ভরত-কথা তপোবনের নিভৃত ছায়ায় গান্ধর্ব মতে মিলন হয়েছিল দুষ্মন্ত আর শকুন্তলার। কোনো সাক্ষী ছিল না, ছিল শুধু বনের মর্মর আর দু’জোড়া তৃষ্ণার্ত চোখ। বিদায়বেলায় রাজা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—খুব শীঘ্রই রাজকীয় পালকি আসবে শকুন্তলাকে নিতে। কিন্তু রাজা চলে যাওয়ার পর তপোবনের নির্জনতা যেন আরও ঘনীভূত হলো। মহর্ষি কণ্ব আশ্রমে ফিরলে শকুন্তলা কুণ্ঠিত হলেন, পিতৃতুল্য ঋষির অনুমতি না নিয়ে এই পরিণয় তাঁর মনে অপরাধবোধ জাগাচ্ছিল। কিন্তু কণ্ব তো সাধারণ মানুষ নন, তাঁর দৃষ্টি অতীত-ভবিষ্যত চুইয়ে হৃদয়ে প্রবেশ করে। শকুন্তলার কপালে হাত রেখে তিনি শান্ত স্বরে বললেন, "ভয় নেই মা। ক্ষত্রিয় আর কন্যার এই মিলন শাস্ত্রসম্মত, এমনকি শুভ। দুষ্মন্ত ধার্মিক রাজা, তিনি তোর অমর্যাদা করবেন না।" শকুন্তলার অনুরোধে মহর্ষি রাজাকে আশীর্বাদও পাঠালেন। কালক্রমে শকুন্তলার কোলে এক দেবশিশু এলো। উজ্জ্বল ললাট, চওড়া কাঁধ, আর দু’হাতের তেলোয় চক্রের চিহ্ন—ঠিক যেন কোনো স্বর্গের রাজপুত্র মর্ত্যে নেমে এসেছে। বালকের বয়স যখন মাত্র ছয়, তখনই তার সাহসের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। বনের বাঘ, সিংহ আর বুনো হাতিকে সে দড়ি দিয়ে ব...