Posts

অর্জুনের পরীক্ষা: মহাভারতের সেই অমোঘ মুহূর্ত: যখন ব্যাধের বেশে দেখা দিলেন মহাদেব ও পাশুপাত অস্ত্র লাভ

Image
 অর্জুনের পরীক্ষা: মহাভারতের সেই অমোঘ মুহূর্ত: যখন ব্যাধের বেশে দেখা দিলেন মহাদেব ও পাশুপাত অস্ত্র লাভ হিমালয়ের তুষারধবল শৃঙ্গগুলো পেরিয়ে অর্জুন যখন আরও গভীরে প্রবেশ করলেন, তখন চারপাশের প্রকৃতি এক অন্য রূপ ধারণ করল। সামনেই এক আদিম, নিবিড় অরণ্য। চারপাশটা কাঁটাঝোপে ভরা, অথচ কেমন যেন একটা অদ্ভুত, গা ছমছমে সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে তার বুকে। এই জনহীন, বুনো পরিবেশেও অর্জুনের অশান্ত, চঞ্চল মনটা এক নিমেষে শান্ত হয়ে গেল। তাঁর মনে হলো, এই অরণ্য যেন বহু যুগ ধরে শুধু তাঁর জন্যই অপেক্ষা করছিল। কোনো এক না-বলা মায়ায় তিনি জড়িয়ে পড়লেন এই নির্জনতার সঙ্গে। তপস্যার প্রস্তুতি নিতে তাঁর দেরি হলো না। কুশ ঘাস সংগ্রহ করে নিজেই বুনে নিলেন বসার আসন। পরনে হরিণের চামড়া, হাতে দণ্ড আর কমণ্ডলু নিয়ে অর্জুন মগ্ন হলেন কঠোর তপস্যায়। প্রথম মাসে তাঁর আহার বলতে কেবল শুকনো পাতা, তাও তিন দিনে মাত্র একবার। দ্বিতীয় মাসে সেই কৃচ্ছ্রসাধন আরও বাড়ল—এবার ছয় দিনে একবার মাত্র আহার। তৃতীয় মাস আসতে আসতে পাক্ষিক ব্রত নিলেন, অর্থাৎ পনেরো দিনে একবার মাত্র কিছু মুখে দিতেন। আর চতুর্থ মাসে এসে অর্জুন সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেলেন। পায়ের আঙুলের ওপর...

তিমির হননের গান: অর্জুনের মহানিষ্ক্রমণ ও একাকী সেই মহাশ্বেত পথ

Image
তিমির হননের গান: অর্জুনের মহানিষ্ক্রমণ ও একাকী সেই মহাশ্বেত পথ। অরণ্য এখন ওদের চেনা হয়ে গেছে। চেনা হয়ে গেছে বনের নিজস্ব ভাষা, তার নৈঃশব্দ্য, আর দিনের নানা প্রহরের ওঠানামা। রাজপ্রাসাদের জটিল কূটনীতি বোঝার জন্য যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির প্রয়োজন হতো, পাণ্ডবেরা এখন তা দিয়েই অরণ্যের গতিপ্রকৃতি পাঠ করতে শিখেছে। কোন পথটি নিরাপদ, কোন ঝরনার জল কাচের মতো স্বচ্ছ, আর আচমকা বৃষ্টি নামলে কোন গাছের আড়াল সবচেয়ে বিশ্বস্ত— সব এখন ওদের নখদর্পণে। বারো বছর কম সময় নয়। দীর্ঘ এই প্রবাস জীবন পাণ্ডবদের সহ্যশক্তির পরীক্ষা নিতে নিতে তাদের ভেতরের অহংকারটুকু শুষে নিয়ে সেখানে এক গভীর, ধূসর স্থৈর্য এনে দিয়েছে। ঠিক এই রকমই এক যাযাবর দিনে, বনের প্রাচীন গাছপালার ছায়া ফুঁড়ে আবির্ভূত হলেন এক দীর্ঘদেহী পুরুষ। তিনি আসার আগেই চারপাশের বাতাসে এক অলৌকিক স্তব্ধতা নেমে এলো। এক অমোঘ আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য যেন চাদরের মতো ঢেকে দিল গোটা বনভূমিকে। তিনি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস। পাণ্ডবেরা কোনো দ্বিধা বা আনুষ্ঠানিকতার সময় নষ্ট না করে তৎক্ষণাৎ এগিয়ে গেলেন। এক পরম শ্রদ্ধাবোধে তাদের শরীর ও মন আপনিই নুয়ে পড়ল। ব্যাসদেব তো কেবল একজন জটাজুটধারী তপোবন...

বুকের ভেতর বারুদ, চোখে প্রতিশোধের আগুন: যুধিষ্ঠিরের দরবারে ভীমের হুঙ্কার"

Image
বুকের ভেতর বারুদ, চোখে প্রতিশোধের আগুন: যুধিষ্ঠিরের দরবারে ভীমের হুঙ্কার" দ্রৌপদীর সাথে যুধিষ্ঠিরের শান্ত, পরিমিত কথোপকথন যখন সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল, তখনই ভীম উঠে দাঁড়ালেন। তিনি এতক্ষণ শুনছিলেন। যুধিষ্ঠিরের ক্ষমার মাহাত্ম্য, ধৈর্যের অকাট্য যুক্তি আর ধর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ—প্রতিটি শব্দ ভীম নিঃশব্দে গিলেছেন। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের এক একটি বাক্য যত এগিয়েছে, ভীমের বুকের ভেতরের আগুনটা তত বিশাল, তত উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। একসময় তা আর চেপে রাখা গেল না। ভীম এমন মানুষ নন যিনি মনের ভাব লুকিয়ে রাখতে পারেন। তিনি একটা দীর্ঘ, গভীর শ্বাস ফেললেন—যে শ্বাস কোনো বড় ঝড়ের আগে মানুষ নেয়—তারপর সোজা এগিয়ে গিয়ে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সামনে এসে দাঁড়ালেন। যখন তিনি কথা বলতে শুরু করলেন, তাঁর কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়ল এমন এক মানুষের জেদ, যে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। "আর্য," ভীম বললেন, "এবার সময় এসেছে একজন প্রকৃত ধার্মিকের মতো আচরণ করার। ধর্ম মানে কেবল প্রার্থনা আর অনন্ত ধৈর্য নয়, ধর্ম মানে একজন বীর এবং অকপট ক্ষত্রিয়ের কর্তব্য পালন। ওটাও ধর্ম। এবং ওটাই আমাদের আসল ধর্ম।" তিনি হাত দুটো ছড়িয়ে দিলেন। চারপ...

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি

Image
  মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি (Index of Brief Mahabharata) মহাভারতের আদি পর্বের  সংক্ষিপ্ত অংশ বিশেষ পুরু বংশের বর্ণনা -মহাভারতের আদিপর্বে বর্ণিত চন্দ্রবংশের অন্যতম গৌরবময় শাখা হলো পুরু রাজবংশ বা পৌরব রাজবংশ ।  রাজা দুষ্যন্ত ও শকুন্তলার.গন্ধর্ব প্রথায়  বিবাহ শকুন্তলার পুত্র ভরতের জন্ম এবং রাজা দুষ্যন্ত কর্তৃক তাকে নিজের পুত্র হিসেবে গ্রহণ। দেবতা আর অসুরের লড়াই আর কচ ও দেবযানীর প্রেম।দেবতা আর অসুরের লড়াই তখন তুঙ্গে দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: দম্ভ এবং প্রতিশোধের উপাখ্যান।সব বড় অনর্থের মূলে থাকে খুব তুচ্ছ কোনো ঘটনা। যযাতি, দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: এক রাজার দুই নারী ও এক পুত্রের ত্যাগ। শুক্ৰাচার্যের আশ্রমের চারদিকের বনটা বড় ঘন, বড় রহস্যময়।  যযাতির হাজার বছর: অন্তহীন তৃষ্ণা ও শেষ মুহূর্তের স্তব্ধতা,যা চেয়েছিলেন, তাই পেলেন মহাভারতের সেই আদিপর্বের কথা। কুরুক্ষেত্রের রণহুঙ্কার তখনো অনেক দূরে, পাণ্ডব বা কৌরবদের জন্মও হয়নি এক ধর্মনিষ্ঠ রাজার নির্জনতা-গঙ্গা সস্নেহে বললেন, "মহারাজ, এই আপনার অষ্টম পুত্র। একে আমি নিজের হাতে বড় করেছি, আজ একে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে।" দেবব্রতর  মহা...

অরণ্যের অন্ধকার, দ্রৌপদীর আগুন এবং এক ধর্মরাজের নীরবতা

Image
অরণ্যের অন্ধকার, দ্রৌপদীর আগুন এবং এক ধর্মরাজের নীরবতা বারো বছরের বনবাস। শুনতে যতটা সহজ, যাপন করা ঠিক ততটাই নির্মম। প্রথম প্রথম যখন রাজপ্রাসাদের রাজকীয় শয্যা ছেড়ে এই বুনো ঘাসের ওপর এসে শুতে হতো, তখন গা রি রি করে উঠত অভিমানে। বুক ফেটে কান্না আসত। কিন্তু এখন আর কান্না আসে না। এখন একটা নিস্পৃহ, ভারী পাথর চেপে বসেছে পাণ্ডবদের বুকে। তারা রাজকোট ছেড়ে এখন যাযাবর। প্রতিদিনের এই ধুলোবালি, এই অনিশ্চয়তা—এ যেন এক অন্তহীন ক্ষয়।  কুরুক্ষেত্রের সেই মহাকাব্যিক দূরত্বের বাইরে, এক সন্ধ্যায় তাঁরা যখন বনের এক কোণে এসে বসলেন, তখন চারপাশের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হচ্ছে। কোনো বিশেষ কারণ ছিল না সেই সভার। কোনো অতিথি আসেননি, কোনো জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ারও ছিল না। শুধু সারাদিনের ক্লান্তির পর পাঁচ ভাই আর তাঁদের যৌথ দয়িতা দ্রৌপদী চুপচাপ বসেছিলেন। আর সেই নিস্তব্ধতা ভেঙেই বেরিয়ে এলো এতদিনের জমানো এক তীব্র হাহাকার। দ্রৌপদীর ভেতরের সেই আগুন, যা তিনি এতদিন চেপে রেখেছিলেন, তা হঠাৎ করেই ফেটে পড়ল। দ্রৌপদীর ক্রোধ: "তোমাদের গাণ্ডীব কি আজ শুধু খেলনা?" স্বামীদের দিকে তাকালেন দ্রৌপদী। এই পুরুষদের তিনি ভালোবেসেছি...

কাম্যক বনে দ্রৌপদীর বিলাপ ও কৃষ্ণের প্রতিজ্ঞা

Image
  কাম্যক বনে দ্রৌপদীর বিলাপ ও কৃষ্ণের প্রতিজ্ঞা কাম্যক বনের আদিম ছায়াচ্ছন্ন গাছপালার নিচে একটা থমথমে নীরবতা জমে ছিল। শুধু পাতার ফাঁক দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের দীর্ঘশ্বাস আর দূরের কোনো অচেনা পাখির ডাক সেই নিস্তব্ধতাকে আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। এই নির্বাসনের ধূসর দিনগুলিতে, যেখানে পাণ্ডবদের ঘরবাড়ি বলতে এখন শুধুই এই অরণ্য, সেখানেই দ্রৌপদী একদিন খুঁজে নিলেন কৃষ্ণকে। কৃষ্ণ তখন অর্জুনের সঙ্গে গভীর কোনো আলাপে মগ্ন। দ্রৌপদী যখন ধীর পায়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে এলেন, তখন বনের আলো-ছায়ার পটভূমিতে তাঁকে বড় করুণ, বড় উদাস দেখাল। এই সেই নারী, যিনি একদিন রানীর সিংহাসনে বসতেন, যাঁর অঙ্গে শোভা পেত রেশম আর সুবর্ণ অলঙ্কার—আজ তিনি এক নির্বাসিতার মলিন, রুক্ষ বসনে বনের ধূলিধূসরিত পথ দিয়ে হেঁটে আসছেন। তাঁর চোখ দুটি, যা চিরকাল এক অহংকারী ও তেজস্বী আত্মায় জ্বলজ্বল করত, আজ অশ্রুরক্তিম আর ক্লান্তিতে ভারী। কৃষ্ণের সামনে এসে তিনি দাঁড়ালেন, কিন্তু প্রথম কয়েক মুহূর্ত তাঁর ঠোঁট দুটি শুধু কাঁপল, কোনো শব্দ ফুটল না। তারপর, বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা যেন গলে শব্দের আকারে বেরিয়ে এল। "মধুসূদন," দ্রৌপদী শুরু করলেন, তাঁর ক...