Posts

বুকের ভেতর বারুদ, চোখে প্রতিশোধের আগুন: যুধিষ্ঠিরের দরবারে ভীমের হুঙ্কার"

Image
বুকের ভেতর বারুদ, চোখে প্রতিশোধের আগুন: যুধিষ্ঠিরের দরবারে ভীমের হুঙ্কার" দ্রৌপদীর সাথে যুধিষ্ঠিরের শান্ত, পরিমিত কথোপকথন যখন সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল, তখনই ভীম উঠে দাঁড়ালেন। তিনি এতক্ষণ শুনছিলেন। যুধিষ্ঠিরের ক্ষমার মাহাত্ম্য, ধৈর্যের অকাট্য যুক্তি আর ধর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ—প্রতিটি শব্দ ভীম নিঃশব্দে গিলেছেন। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের এক একটি বাক্য যত এগিয়েছে, ভীমের বুকের ভেতরের আগুনটা তত বিশাল, তত উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। একসময় তা আর চেপে রাখা গেল না। ভীম এমন মানুষ নন যিনি মনের ভাব লুকিয়ে রাখতে পারেন। তিনি একটা দীর্ঘ, গভীর শ্বাস ফেললেন—যে শ্বাস কোনো বড় ঝড়ের আগে মানুষ নেয়—তারপর সোজা এগিয়ে গিয়ে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সামনে এসে দাঁড়ালেন। যখন তিনি কথা বলতে শুরু করলেন, তাঁর কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়ল এমন এক মানুষের জেদ, যে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। "আর্য," ভীম বললেন, "এবার সময় এসেছে একজন প্রকৃত ধার্মিকের মতো আচরণ করার। ধর্ম মানে কেবল প্রার্থনা আর অনন্ত ধৈর্য নয়, ধর্ম মানে একজন বীর এবং অকপট ক্ষত্রিয়ের কর্তব্য পালন। ওটাও ধর্ম। এবং ওটাই আমাদের আসল ধর্ম।" তিনি হাত দুটো ছড়িয়ে দিলেন। চারপ...

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি

Image
  মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি (Index of Brief Mahabharata) মহাভারতের আদি পর্বের  সংক্ষিপ্ত অংশ বিশেষ পুরু বংশের বর্ণনা -মহাভারতের আদিপর্বে বর্ণিত চন্দ্রবংশের অন্যতম গৌরবময় শাখা হলো পুরু রাজবংশ বা পৌরব রাজবংশ ।  রাজা দুষ্যন্ত ও শকুন্তলার.গন্ধর্ব প্রথায়  বিবাহ শকুন্তলার পুত্র ভরতের জন্ম এবং রাজা দুষ্যন্ত কর্তৃক তাকে নিজের পুত্র হিসেবে গ্রহণ। দেবতা আর অসুরের লড়াই আর কচ ও দেবযানীর প্রেম।দেবতা আর অসুরের লড়াই তখন তুঙ্গে দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: দম্ভ এবং প্রতিশোধের উপাখ্যান।সব বড় অনর্থের মূলে থাকে খুব তুচ্ছ কোনো ঘটনা। যযাতি, দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: এক রাজার দুই নারী ও এক পুত্রের ত্যাগ। শুক্ৰাচার্যের আশ্রমের চারদিকের বনটা বড় ঘন, বড় রহস্যময়।  যযাতির হাজার বছর: অন্তহীন তৃষ্ণা ও শেষ মুহূর্তের স্তব্ধতা,যা চেয়েছিলেন, তাই পেলেন মহাভারতের সেই আদিপর্বের কথা। কুরুক্ষেত্রের রণহুঙ্কার তখনো অনেক দূরে, পাণ্ডব বা কৌরবদের জন্মও হয়নি এক ধর্মনিষ্ঠ রাজার নির্জনতা-গঙ্গা সস্নেহে বললেন, "মহারাজ, এই আপনার অষ্টম পুত্র। একে আমি নিজের হাতে বড় করেছি, আজ একে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে।" দেবব্রতর  মহা...

অরণ্যের অন্ধকার, দ্রৌপদীর আগুন এবং এক ধর্মরাজের নীরবতা

Image
অরণ্যের অন্ধকার, দ্রৌপদীর আগুন এবং এক ধর্মরাজের নীরবতা বারো বছরের বনবাস। শুনতে যতটা সহজ, যাপন করা ঠিক ততটাই নির্মম। প্রথম প্রথম যখন রাজপ্রাসাদের রাজকীয় শয্যা ছেড়ে এই বুনো ঘাসের ওপর এসে শুতে হতো, তখন গা রি রি করে উঠত অভিমানে। বুক ফেটে কান্না আসত। কিন্তু এখন আর কান্না আসে না। এখন একটা নিস্পৃহ, ভারী পাথর চেপে বসেছে পাণ্ডবদের বুকে। তারা রাজকোট ছেড়ে এখন যাযাবর। প্রতিদিনের এই ধুলোবালি, এই অনিশ্চয়তা—এ যেন এক অন্তহীন ক্ষয়।  কুরুক্ষেত্রের সেই মহাকাব্যিক দূরত্বের বাইরে, এক সন্ধ্যায় তাঁরা যখন বনের এক কোণে এসে বসলেন, তখন চারপাশের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হচ্ছে। কোনো বিশেষ কারণ ছিল না সেই সভার। কোনো অতিথি আসেননি, কোনো জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ারও ছিল না। শুধু সারাদিনের ক্লান্তির পর পাঁচ ভাই আর তাঁদের যৌথ দয়িতা দ্রৌপদী চুপচাপ বসেছিলেন। আর সেই নিস্তব্ধতা ভেঙেই বেরিয়ে এলো এতদিনের জমানো এক তীব্র হাহাকার। দ্রৌপদীর ভেতরের সেই আগুন, যা তিনি এতদিন চেপে রেখেছিলেন, তা হঠাৎ করেই ফেটে পড়ল। দ্রৌপদীর ক্রোধ: "তোমাদের গাণ্ডীব কি আজ শুধু খেলনা?" স্বামীদের দিকে তাকালেন দ্রৌপদী। এই পুরুষদের তিনি ভালোবেসেছি...

কাম্যক বনে দ্রৌপদীর বিলাপ ও কৃষ্ণের প্রতিজ্ঞা

Image
  কাম্যক বনে দ্রৌপদীর বিলাপ ও কৃষ্ণের প্রতিজ্ঞা কাম্যক বনের আদিম ছায়াচ্ছন্ন গাছপালার নিচে একটা থমথমে নীরবতা জমে ছিল। শুধু পাতার ফাঁক দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের দীর্ঘশ্বাস আর দূরের কোনো অচেনা পাখির ডাক সেই নিস্তব্ধতাকে আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। এই নির্বাসনের ধূসর দিনগুলিতে, যেখানে পাণ্ডবদের ঘরবাড়ি বলতে এখন শুধুই এই অরণ্য, সেখানেই দ্রৌপদী একদিন খুঁজে নিলেন কৃষ্ণকে। কৃষ্ণ তখন অর্জুনের সঙ্গে গভীর কোনো আলাপে মগ্ন। দ্রৌপদী যখন ধীর পায়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে এলেন, তখন বনের আলো-ছায়ার পটভূমিতে তাঁকে বড় করুণ, বড় উদাস দেখাল। এই সেই নারী, যিনি একদিন রানীর সিংহাসনে বসতেন, যাঁর অঙ্গে শোভা পেত রেশম আর সুবর্ণ অলঙ্কার—আজ তিনি এক নির্বাসিতার মলিন, রুক্ষ বসনে বনের ধূলিধূসরিত পথ দিয়ে হেঁটে আসছেন। তাঁর চোখ দুটি, যা চিরকাল এক অহংকারী ও তেজস্বী আত্মায় জ্বলজ্বল করত, আজ অশ্রুরক্তিম আর ক্লান্তিতে ভারী। কৃষ্ণের সামনে এসে তিনি দাঁড়ালেন, কিন্তু প্রথম কয়েক মুহূর্ত তাঁর ঠোঁট দুটি শুধু কাঁপল, কোনো শব্দ ফুটল না। তারপর, বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা যেন গলে শব্দের আকারে বেরিয়ে এল। "মধুসূদন," দ্রৌপদী শুরু করলেন, তাঁর ক...

কাম্যকে মহাসমাবেশ — কৃষ্ণ, যুধিষ্ঠির এবং অর্জুনের কথোপকথন

Image
কাম্যকে মহাসমাবেশ — কৃষ্ণ, যুধিষ্ঠির এবং অর্জুনের কথোপকথন সংবাদের অভিঘাত পতন যখন ঘটে, তখন তার প্রতিধ্বনি চারপাশের বাতাসকে চাবুক মেরে সজাগ করে তোলে। রাজন্যবর্গের উত্থান-পতনের ইতিহাস বড় নির্মম। কুরুসভার সেই কলঙ্কিত দ্যুতক্রীড়া, সর্বস্ব হরণের পাশবিক উল্লাস, আর ভরা রাজসভায় দ্রৌপদীর কেশাকর্ষণ করে টেনে আনার সেই আদিম, নৃশংস দৃশ্য— কোনো কিছুই গোপন থাকেনি। বাতাসের পিঠে চড়ে সেই অপমানের কাহিনী ছড়িয়ে পড়েছিল আর্যাবর্তের প্রতিটি প্রান্তে, প্রতিটি রাজকক্ষে। কিন্তু যখন শোনা গেল, পঞ্চপাণ্ডব এখন কাম্যক বনের অখ্যাত বৃক্ষচ্ছায়ায় মৃগচর্ম পরিধান করে, জটাবদ্ধ চুলে দিন কাটাচ্ছেন— তখন ভারতর্ষের মানুষের শোক নিমেষেই পরিণত হলো এক তীব্র, জ্বলন্ত অগ্নিগর্ভ ক্রোধে। যাদবদের বিখ্যাত বংশগুলো— বৃষ্ণি, অন্ধক আর ভোজ— তাদের বীরেরা আর স্থির থাকতে পারলেন না। দলে দলে যুবরাজ আর প্রধানেরা নিজেদের চতুরঙ্গ সেনা ও অনুচরদের নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন কাম্যকের উদ্দেশ্যে। পাঞ্চাল থেকে এলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন, দ্রৌপদীর সহোদর। যিনি যজ্ঞাগ্নি থেকে জন্ম নিয়েছিলেন কেবল এক মহৎ প্রতিশোধের ব্রত বুকে নিয়ে, আজ তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন এক অভাবনীয়, আরও তীব্র...

ভীম ও রাক্ষস কির্মীর: কাম্যক বনের সেই প্রথম কালরাত

Image
  ভীম ও রাক্ষস কির্মীর: কাম্যক বনের সেই প্রথম কালরাত মৈত্রেয় মুনির অভিশাপটা যখন কৌরভ সভার স্তম্ভগুলোতে ধাক্কা খেয়ে মিলিয়ে গেল, তখন হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদের বাতাস আচমকা ভারী হয়ে উঠেছিল। ঠিক যেন একটা কালো মেঘ মাথার ওপর থমকে দাঁড়িয়েছে, যা কাটবার কোনো লক্ষণ নেই। ধৃতরাষ্ট্র অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। মনের ভেতর থেকে একটা দৃশ্য কিছুতেই মুছছে না—দুর্যোধন নির্বিকার হাসছে, পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটি খুঁড়ছে, অহংকারে অন্ধ যুবকের চোখে অনুশোচনার লেশমাত্র নেই। আর সেই সঙ্গে ধৃতরাষ্ট্রের কানের কাছে তখনো বাজছিল মৈত্রেয়ের মুখে উচ্চারিত একটি নাম—‘কির্মীর’। মুনি যাওয়ার আগে অবহেলায় বলে গেছেন নামটা, যেন ওটা পাণ্ডবদের ক্ষমতার একটা সামান্য উদাহরণ মাত্র। ধৃতরাষ্ট্র আর স্থির থাকতে পারলেন না। হাতড়ে হাতড়ে, অন্ধ মানুষের চেনা অভ্যাসে শরীরটাকে সামান্য ঝুঁকিয়ে তিনি এসে দাঁড়ালেন বিদুরের কক্ষে। "বিদুর," ধৃতরাষ্ট্রের গলায় এক অদ্ভুত আর্তি, "আমাকে সবটা খুলে বলো। মহর্ষি মৈত্রেয় কোন রাক্ষসের কথা বলে গেলেন? কির্মীর? হস্তিনাপুর ছেড়ে বনে যাওয়ার প্রথম রাতেই নাকি ভীম তাকে বধ করেছে? আমি সবটা শুনতে চাই বিদুর, ...