Posts

লক্ষ্যভেদের পথে: এক অজ্ঞাতবাসের উপাখ্যান

Image
লক্ষ্যভেদের পথে: এক অজ্ঞাতবাসের উপাখ্যান একচক্রা ছেড়ে পাঞ্চালের পথে যখন যাত্রা শুরু হলো, আকাশ তখন ধূসর। কুন্তী আর পাঁচ ভাই পা বাড়ালেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। সঙ্গে তাঁদের কুলপুরোহিত ধৌম্য। পরনে সাধারণ ব্রাহ্মণের সাজ, কাঁধে মৃগচর্ম, হাতে কমণ্ডলু—কে বলবে এঁরাই একসময় হস্তিনাপুরের রাজৈশ্বর্যে বড় হয়েছেন? তাঁদের হাঁটাচলায় একটা শান্ত দৃঢ়তা ছিল, যেন কোনো গূঢ় সংকল্প বুকের ভেতরে পাথর হয়ে বসে আছে। পথের ধারে দেখা হলো একদল ভ্রাম্যমাণ ব্রাহ্মণের সঙ্গে। তাঁদের চোখেমুখে কৌতূহল। যুধিষ্ঠিরকে দেখে তাঁরা থমকে দাঁড়ালেন। "কোত্থেকে আসা হচ্ছে আপনাদের? লক্ষ্য কি সেই পাঞ্চাল?" যুধিষ্ঠির শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন, "আমরা একচক্রা থেকে আসছি। পাঞ্চাল রাজকন্যা দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরের কথা শুনলাম, তাই কৌতূহলবশত সেদিকেই পা বাড়ানো।" ব্রাহ্মণরা হেসেই অস্থির। "তবে তো বেশ হলো! আমরাও সেদিকেই যাচ্ছি। এমন এলাহি কাণ্ড কি আর রোজ রোজ দেখা যায়? চলুন, পথটা একসাথেই কাটা যাক।" পাণ্ডবরা মিশে গেলেন সেই ভিড়ে। ভিড়ের মাঝে থেকেও তাঁরা ছিলেন নির্লিপ্ত, ঠিক যেমন করে গভীর জল বয়ে যায় তলায় তলায়। কয়েক দিন হাঁটার পর...

অরণ্যের আলো ও নবযাত্রার সংকল্প: পাণ্ডবদের কুলপুরোহিত বরণ

Image
  অরণ্যের আলো ও নবযাত্রার সংকল্প: পাণ্ডবদের কুলপুরোহিত বরণ গঙ্গার তীরে রাত তখন গভীর। জ্যোৎস্নার আলোয় জলরাশি রুপোলি সাপের মতো ঝিলমিল করছে, বাতাসে বুনো ফুলের এক মায়াবী সুবাস। চারপাশ নিঝুম, শুধু মাঝেমধ্যে জলের মৃদু কলতান শোনা যাচ্ছে। সেই নির্জনতায় পাণ্ডবরা গোল হয়ে বসে আছেন গন্ধর্বরাজ চিত্ররথের চারপাশে। চিত্ররথ শোনাচ্ছেন প্রাচীন ঋষিদের গল্প—সেইসব মুনি-ঋষি, যাঁদের জ্ঞান সমুদ্রের মতো গভীর, আবার ক্রোধ আগুনের মতো ভয়ংকর। সেইসব কাহিনীর ভিড়ে মহর্ষি বশিষ্ঠের কথা শুনে অর্জুনের মনে এক অদ্ভুত আলোড়ন তৈরি হলো। চিত্ররথ থামতেই অর্জুন একটু ঝুঁকে বসে বিনীত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “গন্ধর্বরাজ, একটা কথা জানতে বড় ইচ্ছে হয়। এই পৃথিবীতে পবিত্র পুরুষদের মধ্যে কে আমাদের পথপ্রদর্শক হওয়ার যোগ্য? আমরা পুরোহিতহীন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, আমাদের কোনো আধ্যাত্মিক অভিভাবক নেই। এমন কেউ কি আছেন, যাঁকে আমরা কুলপুরোহিত হিসেবে বরণ করতে পারি? যিনি আমাদের ধর্মের পথে চালিত করবেন?” চিত্ররথ যেন এই প্রশ্নটির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তাঁর শান্ত চোখে একপলক দৃষ্টি বুলিয়ে বললেন, “নিশ্চয়ই আছেন। উৎকচাক নামে এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্রে ধৌম্য নামে এ...

বশিষ্ঠ ও কল্মাষপাদ: এক আশ্চর্য ক্ষমা

Image
  বশিষ্ঠ ও কল্মাষপাদ: এক আশ্চর্য ক্ষমা বনবাসের সেই নিস্তব্ধ রাত। আগুনের শিখাগুলো কাঁপছে আর গন্ধর্বরাজ চিত্ররথ অর্জুনের দিকে তাকিয়ে একটু স্মিত হাসলেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়ছে এক গভীর অভিজ্ঞতার সুর। তিনি বলতে শুরু করলেন, "শোনো পার্থ, বশিষ্ঠের সেই গল্প শুধু কামধেনুর নয়, সে গল্পের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক পাহাড়প্রমাণ ক্ষমার ইতিহাস। সে ইতিহাস ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা কল্মাষপাদের।" রাজা কল্মাষপাদ ছিলেন বীর্যবান, কিন্তু ক্ষমতার দম্ভ মানুষের মস্তিস্কে যে বিষ ঢেলে দেয়, তাঁর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। একদিন গভীর অরণ্যে শিকারের নেশায় মত্ত রাজা এক সংকীর্ণ পথে এসে দাঁড়ালেন। উল্টো দিক থেকে আসছিলেন বশিষ্ঠের জ্যেষ্ঠ পুত্র শক্তি। রাজা চাইলেন ঋষিপুত্র তাঁকে পথ ছেড়ে দিন, কিন্তু শক্তি অটল। ক্ষিপ্ত রাজা হাতের চাবুক সপাটে বসিয়ে দিলেন ঋষিপুত্রের গায়ে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই জ্বলে উঠল শক্তির ক্রোধ—তিনি অভিশাপ দিলেন, "অহংকারে তুমি আমায় আঘাত করলে? যাও, আজ থেকে তুমি নরখাদক রাক্ষস হয়ে বনে বনে ঘুরে বেড়াবে!" বিশমিমিত্র এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি এক রাক্ষসকে পাঠালেন রাজার শরীরে ভর করার জন্য। হিতাহিত জ্ঞা...

ক্ষত্রিয় দম্ভের পরাজয় ও এক ব্রহ্মর্ষির উদয়: বশিষ্ঠ-বিশ্বামিত্রের সেই চিরকালীন সংঘাত

Image
ক্ষত্রিয় দম্ভের পরাজয় ও এক ব্রহ্মর্ষির উদয়: বশিষ্ঠ-বিশ্বামিত্রের সেই চিরকালীন সংঘাত গঙ্গার কূল ঘেঁষে রাতটা তখন মন্থর হয়ে এসেছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর জলের ছলছল শব্দে মিশে যাচ্ছিল গন্ধর্বরাজ চিত্ররথের উদাত্ত কণ্ঠস্বর। অর্জুন চুপচাপ শুনছিলেন, কিন্তু তাঁর বুকের ভেতর এক অস্থির কৌতূহল তোলপাড় করছিল। মহর্ষি বশিষ্ঠের নাম তিনি আগেও শুনেছেন, কিন্তু তাঁর শক্তির উৎস আর ব্যক্তিত্বের গাম্ভীর্য আজ যেন এক নতুন রহস্য হয়ে অর্জুনের সামনে উন্মোচিত হচ্ছিল। অর্জুন সামান্য ঝুঁকে বসলেন। তাঁর কণ্ঠে এক ধরণের ব্যাকুলতা, “চিত্ররথ, তোমার বর্ণনায় বশিষ্ঠের যে রূপ ফুটে উঠছে, তা আমাকে স্তম্ভিত করছে। কে এই মহান ঋষি? যাঁর সামনে দেবরাজ থেকে শুরু করে পরাক্রমশালী রাজারাও বিনম্র হয়ে থাকেন? এই ব্রহ্মর্ষির তেজ আর প্রভাবের উৎসটা ঠিক কোথায়? বিশ্বামিত্রের মতো দিগ্বিজয়ী সম্রাটের সাথে তাঁর সংঘাতেরই বা শুরু কীভাবে?” চিত্ররথ মৃদু হাসলেন। তাঁর চোখেমুখে এক প্রাচীন প্রজ্ঞার ছাপ। তিনি বললেন, “শোনো পার্থ, বশিষ্ঠের কাহিনী ত্রিলোকের এক পবিত্র আখ্যান। মন দিয়ে শোনো সেই ইতিহাস।” কন্যাকুব্জের প্রতাপশালী রাজা গাধি, যাঁর বীরত্বে কম্পমান ছিল আর্...

তপতীনন্দন: কুরুবংশের রক্তে বহমান সূর্যের সেই আদিম অগ্নিশিখা

Image
তপতীনন্দন: কুরুবংশের রক্তে বহমান সূর্যের সেই আদিম অগ্নিশিখা গঙ্গা বয়ে চলেছে আপন ছন্দে। কলকল ধ্বনি আর শান্ত নির্জনতা মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করেছে নদীর তীরে। গন্ধর্বরাজ চিত্ররথের সঙ্গে পাণ্ডবদের যুদ্ধ মিটেছে সামান্য আগে, কিন্তু তার রেশটুকু রয়ে গেছে বাতাসে। সেই হারানো উত্তাপ ছাপিয়ে এখন বইছে বন্ধুত্বের শীতল হাওয়া। অর্জুনের সঙ্গে চিত্ররথের আলাপ জমে উঠতে সময় লাগল না। বীরের সঙ্গে বীরের মোলাকয়াত তো এমনই হয়—চোখে চোখ পড়লেই যেন বহু জন্মের চেনা। আলাপের এক ফাঁকে চিত্ররথ বেশ সহজ স্বরেই পাণ্ডবদের সম্বোধন করলেন— ‘তপতীনন্দন’। অর্জুন থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর কপালে সূক্ষ্ম বলিরেখা। নামটা অচেনা নয়, কিন্তু এর গভীরতা তাঁর কাছে স্পষ্ট নয়। তিনি ফিরে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, "আমাদের কেন তপতীনন্দন বললে? আমরা কুন্তীর পুত্র, এ তো সারা বিশ্ব জানে। তপতী নামটা তো আমাদের কুলের পরিচয়ে সেভাবে কখনও শুনিনি।" চিত্ররথ হাসলেন। সে হাসিতে বিদ্রূপ নেই, বরং আছে এমন একজনের আত্মতৃপ্তি যার ঝুলিতে এক অজানা রহস্যের চাবিকাঠি লুকানো আছে। তিনি ইঙ্গিত করলেন বসবার জন্য। বললেন, "একটু বসো। তোমাদের বংশের শেকড়ে এমন এক নারী আ...

চিত্ররথ চূর্ণ: গঙ্গার ঘাটে বীরের পরীক্ষা

Image
চিত্ররথ চূর্ণ: গঙ্গার ঘাটে বীরের পরীক্ষা একচক্রার সেই নির্জন ব্রাহ্মণগৃহের দিনগুলো ফুরিয়ে এলো। মহর্ষি ব্যাসদেব এসে যখন গন্তব্য স্থির করে দিয়ে গেলেন, তখন কুন্তী আর তাঁর পাঁচ পুত্র বুঝলেন, এবার শিকড় উপড়ানোর সময় হয়েছে। পাণ্ডবদের এই যাযাবর জীবন যেন এক অন্তহীন মহাকাব্য। ধুলোমাখা পথ, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, আর বুকে একরাশ অভিমান নিয়ে তাঁরা পা বাড়ালেন পাঞ্চাল দেশের দিকে। লক্ষ্য—রাজা দ্রুপদের কন্যার স্বয়ংবর সভা। দিনের আলোয় পথ চলা, আর রাত নামলে কোনো মহীরুহের ছায়ায় আশ্রয়। ক্লান্ত শরীর, কিন্তু মনে দ্রৌপদীর রূপকথার হাতছানি। একদিন গোধূলির ম্লান আলোয় তাঁরা এসে পৌঁছলেন পুণ্যতোয়া গঙ্গার তীরে। চারপাশ নিঝুম, কেবল জলের কলতান। কিন্তু হঠাৎ সেই নির্জনতা ভেঙে ভেসে এল খিলখিল হাসি আর নুপুরের নিক্বণ। দেখা গেল, অলকানন্দার স্বচ্ছ সলিলে জলক্রীড়ায় মত্ত এক উদ্ধত পুরুষ—গন্ধর্বরাজ চিত্ররথ, যাঁর আর এক নাম অঙ্গারপর্ণ। তাঁর রথখানি যেন আকাশের বিদ্যুতকে বন্দি করে রেখেছে। পাণ্ডবদের দেখা মাত্র চিত্ররথের ভ্রু কুঁচকে উঠল। আভিজাত্যের অহঙ্কারে অন্ধ হয়ে তিনি হাঁক ছাড়লেন, "থামুন হে মর্ত্যের তুচ্ছ মানবগণ! দেখছ না, এখানে আমি আমার ম...

দ্রৌপদীর নিয়তি সংবাদটা বাতাসের আগে ছোটে।

Image
  দ্রৌপদীর নিয়তি সংবাদটা বাতাসের আগে ছোটে।  একচক্রা গ্রামের সেই ছিমছাম কুঁড়েঘরে যখন খবরটা পৌঁছল, তখন পাণ্ডবরা ছদ্মবেশে দিন কাটাচ্ছেন। ব্রাহ্মণ সেজে থাকা পাঁচ ভাইয়ের কানে এল পাঞ্চাল রাজ্যে এক বিশাল স্বয়ংবরের আয়োজন হয়েছে। রাজা দ্রুপদের কন্যা দ্রৌপদী নিজে বেছে নেবেন তাঁর জীবনসঙ্গীকে। ভারতবর্ষের তাবড় তাবড় রাজপুত্র আর বীরেরা সেখানে ভিড় জমাচ্ছেন। কুন্তী লক্ষ্য করলেন তাঁর ছেলেদের। কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন ছিল না। তিনি দেখলেন অর্জুন-ভীমদের চোখে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা, এক অস্থিরতা। কতদিন পর এই চাউনি ফিরল! বনবাস, লাঞ্ছনা আর মৃত্যুর সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে ওরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। নিজেদের বীরত্বকে লুকিয়ে রেখে ব্রাহ্মণের মতন শান্ত জীবন যাপন করতে করতে মনের ভেতর যে ক্ষোভ জমা হয়েছিল, দ্রৌপদীর স্বয়ংবরের সংবাদে যেন তাতে একটা স্ফুলিঙ্গ পড়ল। কুন্তী বুঝলেন, কুঁড়েঘরের চার দেওয়ালে আর এদের আটকে রাখা যাবে না। তিনি শান্ত গলায় সিদ্ধান্ত নিলেন, "অনেক দিন তো এখানে থাকা হলো। একচক্রার মানুষরা আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, ভালোবাসা দিয়েছে। কিন্তু এবার যাওয়ার সময় হয়েছে। চলো, আমরা পাঞ্চালের দিকেই রওনা হই।" ভাইরা এক...

অগ্নিসম্ভবা দ্রৌপদী: অপমানের দহন থেকে কুরুক্ষেত্রের বীজবপন

Image
  অগ্নিসম্ভবা দ্রৌপদী: অপমানের দহন থেকে কুরুক্ষেত্রের বীজবপন বকাসুর বধের পর একচক্রা নগরীর সেই দিনগুলো ছিল শান্ত, যেন ঝড়ের আগের স্তব্ধতা। পাণ্ডবরা এখন ছদ্মবেশে, ব্রাহ্মণের সাজে। কুন্তী আর তাঁর পাঁচ পুত্র সেখানে বাস করছেন এক ব্রাহ্মণের আশ্রয়ে। তাঁদের দিন কাটে শাস্ত্রচর্চায় আর অরণ্যের নিভৃত শান্তিতে। কিন্তু নিয়তি যাঁদের জন্য কুরুক্ষেত্রের রণক্ষেত্র সাজিয়ে রেখেছে, তাঁদের কি আর নিস্তরঙ্গ জীবন মানায়? একদিন তাঁদের কুটিরে এলেন এক পরিব্রাজক ব্রাহ্মণ। আতিথেয়তায় কোনো ত্রুটি রাখলেন না কুন্তী। সামান্য অন্নেই তুষ্ট হলেন সেই অতিথি। সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে প্রদীপের ম্লান আলোয় বসে তিনি শোনাতে লাগলেন দেশ-বিদেশের বিচিত্র সব কাহিনী। কথা বলতে বলতে এক সময় প্রসঙ্গ এল পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কথা। উঠে এল যজ্ঞসেনী দ্রৌপদীর জন্মবৃত্তান্ত। ব্রাহ্মণ বলতে লাগলেন, "রাজা দ্রুপদ অপমানের এক তীব্র দহন বুকে নিয়ে বেঁচে ছিলেন। দ্রোণাচার্যের কাছে পরাজয় তিনি ভুলতে পারেননি। একদা সখা ছিলেন তাঁরা, কিন্তু ক্ষমতার দম্ভ তাঁদের শত্রু করে দিয়েছিল। দ্রুপদ চাইছিলেন এমন এক পুত্র, যে দ্রোণকে বধ করবে।" দ্রুপদ খুঁজে বেরিয়েছিলেন এমন...

একচক্রা ও বকাসুর দহন

Image
 একচক্রা ও বকাসুর দহন অন্ধকার অরণ্য আর অনিশ্চয়তার পথ পেরিয়ে কুন্তী ও তাঁর পাঁচ পুত্র এসে আশ্রয় নিয়েছেন একচক্রা নামের এক শান্ত জনপদে। পরিচয় গোপন রাখার দায় বড় দায়। তাই রাজকীয় তেজ লুকিয়ে পাণ্ডবরা এখন ছদ্মবেশী ব্রাহ্মণ। পরনে সাধারণ বাস, হাতে ভিক্ষাপাত্র।  একচক্রার কোনো এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের কুটিরে দিন কাটে তাঁদের। দিনের শেষে যা সামান্য ভিক্ষা জোটে, মা কুন্তীর হাতের ছোঁয়ায় তাই অমৃত হয়ে ওঠে পাঁচ ভাইয়ের পাতে। কিন্তু সেদিনের শান্ত দুপুরটা হঠাৎই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল এক বুকফাটা কান্নায়। সেদিন অর্জুন, যুধিষ্ঠিররা ঘরে ছিলেন না। দাওয়ায় একা বসে ছিলেন ভীম আর কুন্তী। হঠাৎ কুটিরের ভেতর থেকে ভেসে এল এক আর্তনাদ—সে কেবল সাধারণ দুঃখের বিলাপ নয়, এ যেন আসন্ন মৃত্যুর পদধ্বনি। গৃহস্বামী ব্রাহ্মণের ঘর থেকে উঠে আসছে এক হাহাকার। ভীম উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর বিশাল শরীরের পেশিগুলো একবার কেঁপে উঠল। মা-র দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন, “মা, এই বিপন্ন মানুষগুলোর আশ্রয়ে আমরা পরম নিশ্চিন্তে আছি। আজ যখন এঁদের ঘরে শোকের আগুন জ্বলছে, তখন আমাদের চুপ করে থাকাটা কি ধর্ম? তুমি একবার ভেতরে যাও না, দেখো তো কী হয়েছে।” কুন্তী ভেতর...

হিড়িম্বার গর্ভে ভীমের এক অদ্ভুত দর্শন পুত্রের জন্ম হলো— ঘটোত্কচ।

Image
  হিড়িম্বার গর্ভে ভীমের এক অদ্ভুত দর্শন পুত্রের জন্ম হলো— ঘটোত্কচ।  অরণ্যের সেই আদিম অন্ধকার আর বুনো তেজ যেন মিশে ছিল তার রক্তে, কিন্তু তার ধমনীতে বইছিল পাণ্ডব আভিজাত্যও। কিছুকাল পরে হিড়িম্বা বুঝলেন, পাণ্ডবদের যাত্রাপথ আর তার জীবন এক নয়। তিনি ভীমকে অরণ্যের মায়ায় বেঁধে রাখতে চাইলেন না, আবার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে নিজেও সঙ্গী হলেন না। শান্ত অথচ এক অবিচল মর্যাদার সাথে তিনি শিশুপুত্র ঘটোত্কচকে নিয়ে বনের গহীনে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। যাওয়ার আগে শুধু বলে গেলেন, "বিপদের মেঘ ঘনিয়ে এলে ডাক দিও, মা আর ছেলে দুজনেই তোমাদের পাশে এসে দাঁড়াব।" কিশোর ঘটোত্কচও মাথা নিচু করে সেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেল। তারপর শুরু হলো পাণ্ডবদের এক অন্যরকম পথচলা। রাজকীয় ঐশ্বর্য এখন এক ম্লান স্মৃতি। পাঁচ ভাই আর কুন্তীর পরনে এখন বল্কল আর মৃগচর্ম, মাথায় জটাজুট। গভীর অরণ্যের ফলমূল আর কন্দই তাঁদের আহার। কেউ দেখে বুঝবে না এঁরা হস্তিনাপুরের রাজকুমার। ছদ্মবেশে, বিনীত সন্ন্যাসীর মতো তাঁরা এক বন থেকে অন্য বনে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। এমনই একদিন পথে তাঁদের দেখা হলো মহর্ষি ব্যাসদেবের সঙ্গে। তাঁর শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ...

আগুন ও অরণ্য: পাণ্ডবদের পুনর্জন্ম

Image
  আগুন ও অরণ্য: পাণ্ডবদের পুনর্জন্ম পৃথিবী তখন জেনে গেছে তারা নেই। বারণাবতের জতুরগৃহের লেলিহান শিখা যখন শান্ত হয়ে এল, তখন সেই ভস্মস্তূপের আড়ালে জন্ম নিল এক অদ্ভুত স্বাধীনতা। মৃত মানুষের কোনো পিছুটান থাকে না, পাণ্ডবদেরও রইল না। ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগে, অরণ্যের বুক চিরে যখন পাঁচ ভাই আর কুন্তী নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের পরিচয় একটাই—তারা 'অফিসিয়ালি' মৃত। পেছনে পড়ে রইল ষড়যন্ত্রের ধোঁয়া, আর হস্তিনাপুরে বসে কেউ একজন হয়তো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল এই ভেবে যে, কণ্টক অবশেষে উপুড় হয়েছে। New s কিন্তু মৃতেরা হাঁটছিল। এবং তাদের হাঁটার গতি ছিল তীব্র। শোকের অভিনয় ও অন্তরের উল্লাস হস্তিনাপুরে খবরটা যখন পৌঁছাল, যেন স্থির জলে কেউ ভারী পাথর ছুঁড়ে দিল। রাজপ্রাসাদ থেকে নগরীর অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে পড়ল সেই হাহাকার। বারণাবতের সেই ধ্বংসস্তূপে পাওয়া গেছে ছয়টি দেহ—এক নারী ও পাঁচ পুরুষের। কৌরব শিবিরের কাছে অঙ্কটা জলের মতো পরিষ্কার। কুন্তী আর তার পাঁচ পুত্র আগুনে পুড়ে খাক হয়ে গেছেন। দুর্যোধন যখন খবরটা শুনলেন, তার চোখেমুখে তখন শোকের নিখুঁত মেকআপ। জনসমক্ষে তিনি বিলাপ করলেন, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। একজন দক্ষ অভ...

জতুরগৃহ: ছদ্মবেশী আতিথেয়তার আড়ালে

Image
  জতুরগৃহ: ছদ্মবেশী আতিথেয়তার আড়ালে এক ধরণের নিষ্ঠুরতা আছে যার গায়ে মাখা থাকে আতিথেয়তার চন্দন। সে হাসিমুখে দরজা খুলে দেয়, বিনীত হয়ে শোবার ঘরটা দেখিয়ে দেয়। তারপর যখন প্রদীপ নিভে আসে, চারদিক নিঝুম হয়ে যায়—তখন সে অন্ধকারের আড়ালে ওত পেতে বসে থাকে। হস্তিনাপুর থেকে পাণ্ডবদের বারণাবত নির্বাসনের সিদ্ধান্ত যখন পাকা হয়ে গেল, তখন দুর্যোধনের চোখে-মুখে ফুটে উঠল এক নিষ্ঠুর সঙ্কল্পের আভা। তিনি আর ধৈর্য ধরতে রাজি নন। দীর্ঘদিনের লালিত পরিকল্পনা এবার বাস্তবায়নের সময় এসেছে। আর দুর্যোধন কোনোদিন ভাগ্যের ওপর ভরসা করার লোক ছিলেন না; তিনি চেয়েছিলেন এমন এক চূড়ান্ত পরিণতি, যার পর আর কোনো প্রশ্ন অবশিষ্ট থাকে না। সেই নিভৃত কক্ষে ডাক পড়ল পুরোচনের। পুরোচন দুর্যোধনের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এক মন্ত্রী। তবে এই বিশ্বাস প্রজ্ঞা বা সততার জন্য নয়, বরং এক ধারালো অস্ত্রের ওপর মানুষের যেমন বিশ্বাস থাকে—তেমন। পুরোচন ছিল আজ্ঞাবহ, যান্ত্রিক এবং বিবেকহীন। দুর্যোধনের কাছে এই নির্লিপ্ততাই ছিল পুরোচনের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। পুরোচন যখন সামনে এসে দাঁড়াল, দুর্যোধন তাকে রাজকীয় গাম্ভীর্যে নয়, বরং এক অদ্ভুত অন্তরঙ্গতায় বরণ করে নিলেন। যেন এক...

নীল চোখের বিষ: বারণাবতের পথে পাণ্ডবগণ

Image
  নীল চোখের বিষ: বারণাবতের পথে পাণ্ডবগণ ঈর্ষা এক নিঃশব্দ বিষের মতো। সে কোনো ঘোষণা দিয়ে আসে না। বুকের অতল গভীরে সে থিতু হয়ে বসে থাকে, দিন দিন ভারী হতে থাকে, যতক্ষণ না সেই ভার মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। ধৃতরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র দুর্যোধনের বুকে সেই বিষ জমেছিল অনেক আগে থেকেই। শুরুটা হয়েছিল প্রশংসা থেকে—বা বলা ভালো, প্রশংসার সেই তিক্ত রেশটুকু থেকে। মল্লভূমিতে ভীমের সেই রুদ্রমূর্তি তিনি দেখেছেন; যখন ভীম প্রকৃতির এক অমোঘ শক্তির মতো প্রতিপক্ষকে ধুলোয় লুটিয়ে দিচ্ছে আর গ্যালারি ফেটে পড়ছে উল্লাসে। তিনি দেখেছেন অর্জুনকে; যাঁর ধনু থেকে শর নিক্ষেপের সেই অলৌকিক সাবলীলতা দেখে আচার্যদেরও বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে যেতে। হস্তিনাপুরের মানুষও দেখেছিল। আর তারা ভালোবেসে ফেলেছিল কুন্তীর পুত্রদের। দুর্যোধন ঠিক এইটুকুই সহ্য করতে পারছিলেন না। পাণ্ডবরা প্রতিভাবান—তাতে দুর্যোধনের কোনো সংশয় ছিল না। তিনি নিজে এবং তাঁর ভাইয়েরাও বীর। কিন্তু দুর্যোধনকে যা কুরে কুরে খেত, যা রাতের অন্ধকারে তাঁর ঘুম কেড়ে নিত, তা হলো হস্তিনাপুরের সাধারণ মানুষের এই অকুণ্ঠ ভালোবাসা। রাজপ্রাসাদের অলিন্দে অলিন্দে তিনি ফিসফাস শুনতেন—বিদ্...