Posts

রাজা পরীক্ষিতের অন্তিম যাত্রা

Image
রাজা পরীক্ষিতের অন্তিম যাত্রা সব দিক থেকেই পরীক্ষিত ছিলেন এক আদর্শ রাজা। অর্জুনের পৌত্র, অভিমন্যুর পুত্র—সেই মহাবীর অভিমন্যু, যিনি কুরুক্ষেত্রের চক্রব্যূহে প্রাণ দিয়েছিলেন নিজের অনাগত সন্তানকে দেখার আগেই। পরীক্ষিত তাঁর পিতাকে দেখেননি। তাঁর জন্ম হয়েছিল এক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে, যখন যুদ্ধের দামামা থিতিয়ে এসেছে, আর চারিদিকে কেবল শ্মশানের নিস্তব্ধতা। কিন্তু তিনি বড় হয়েছিলেন এক দীপ্ত মহিমায়। বীরত্ব, ন্যায়পরায়ণতা আর প্রজাবাৎসল্য ছিল তাঁর স্বভাবজাত। পাণ্ডবরা যখন মহাপ্রস্থানের পথে পা বাড়ালেন, হস্তিনাপুরের শেষ প্রদীপ হিসেবে জ্বলে রইলেন পরীক্ষিত। মানুষ তাঁকে ভালোবেসেছিল নিঃশর্তভাবে। কিন্তু মানুষের ভাগ্য তো সুতোর ওপর ঝুলে থাকে। এক সাধারণ দুপুরে শিকারে বেরোলেন রাজা। আর সেখান থেকেই শুরু হলো এক অমোঘ ট্র্যাজেডির। শিকার রাজধর্মের অংশ হতে পারে, কিন্তু সেদিন অরণ্যের গভীরে যেন এক মায়া হরিণ তাঁকে পথ ভুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তৃষ্ণার্ত, ক্লান্ত এবং কিছুটা বিরক্ত রাজা এসে পৌঁছলেন ঋষি শমীকের আশ্রমে। ঋষি তখন গভীর ধ্যানে মগ্ন। বাহ্যজ্ঞানহীন সেই স্তব্ধতার সামনে দাঁড়িয়ে পরীক্ষিত জল চাইলেন, শিকারের ...

কদ্রুর অভিশাপ: তক্ষক ও আস্তিকের সেই সন্ধিক্ষণ

Image
কদ্রুর অভিশাপ: তক্ষক ও আস্তিকের সেই সন্ধিক্ষণ আকাশের রঙ তখন ফিকে হয়ে আসছে। মহর্ষি কশ্যপের ঘরনি কদ্রু যখন দাঁড়ালেন, তাঁর চোখের মনিতে এক বিচিত্র কাঠিন্য। মাতৃত্বের সেই চিরচেনা স্নিগ্ধতা সেখানে নেই, আছে ক্ষমতার এক তীব্র দহন। কদ্রুর অজস্র   নাগের দল যখন বিনতাকে ছলনা করতে অস্বীকার করল—যে ছলনা ছিল নীচতার চরম পর্যায়—তখন কদ্রু ঘর সামলানো মা থেকে হয়ে উঠলেন এক প্রতিহিংসাপরায়ণ চণ্ডী। তিনি তাঁর সন্তানদের অভয় দিলেন না, শাসনও করলেন না। পবিত্র অগ্নিকুণ্ডের সামনে দাঁড়িয়ে হাড়হিম করা গলায় দিলেন এক অভিশাপ— 'জনমেজয়ের সর্পসত্রে তোমরা সবাই পুড়ে খাক হয়ে যাবে।' অগ্নির শিখা সেদিন যেন ভয়ে একটু কেঁপে উঠেছিল। ব্রহ্মা শুনলেন, দেবতারাও নীরব থাকলেন। পৃথিবী থেকে বিষধর কালকূটদের বিনাশ হয়তো নিয়তিরই লিখন ছিল। নাগলোকে তখন এক অবর্ণনীয় আতঙ্ক। বাসুকি, তক্ষক, ঐরাবত—যাঁরা যুগ যুগ ধরে কালকে শাসন করেছেন, তাঁদের বুকও আজ মায়ের অভিশাপে দুরুদুরু। মিটিং বসল নাগরাজ্যে। কেউ বলল যুদ্ধ করবেন, কেউ বললেন পালাবেন। আবার কেউ বললেন যজ্ঞ যে সব ব্রাহ্মণ করবেন তাদের হত্যা করবে। তক্ষকের উদ্ধত ফণা অব্দি আজ নুয়ে পড়েছে। কিন্তু বাসুকি জানতে...

অনন্তের প্রতীক্ষা: শেষনাগ

Image
  অনন্তের প্রতীক্ষা: শেষনাগ  কশ্যপ মুনির দুই স্ত্রী, অথচ রেষারেষিটা ছিল একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে। উচ্চৈঃশ্রবা ঘোড়ার লেজ কালো না সাদা—এই নিয়ে বাজি ধরলেন কদ্রু। জেতার জন্য নিজের হাজার ছেলেকে হুকুম দিলেন ঘোড়ার লেজে গিয়ে সেঁটে থাকতে, যাতে সাদা লেজ কালো দেখায়। ছলনা। কিন্তু সব ছেলে সেই অন্যায়ে সায় দিল না। কদ্রু রেগে আগুন হয়ে নিজের গর্ভজাত সন্তানদেরই অভিশাপ দিলেন— "তোরা জনমেজয়ের সর্পসত্রে ভস্ম হয়ে যাবি।" সেই হাজার সর্পসন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন শেষ। কিন্তু এই শেষের মনের গঠন ছিল অন্যরকম। তাঁর ভাইরা ছিল কুটিল, ক্রূর। বিনতা আর গরুড়ের ওপর তারা যে অকথ্য অত্যাচার চালাত, তা শেষের সহ্য হতো না। তিনি দেখলেন, তাঁর ভাইরা অন্যের যন্ত্রণায় উল্লাস পায়। একই রক্ত, একই হাজার ফণা— অথচ শেষের ভেতরে বিষের বদলে দানা বাঁধছিল এক গভীর বিতৃষ্ণা। একদিন তিনি কারোর সাথে কোনো ঝগড়া করলেন না, কোনো দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন না। শুধু নিঃশব্দে ঘর ছাড়লেন। কঠোর তপস্যা ও ব্রহ্মার আগমন গন্তব্য ছিল নির্জনতা। গন্ধমাদন, বদরিকাশ্রম, গোকর্ণ— যেখানে বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কোনো কোলাহল নেই। শেষনাগ সেখানে গিয়ে একাগ্র মনে ধ্যানে বসলেন। খাওয়া...

গরুড়ের মুক্তি: মায়ের বন্ধনমোচন, অমৃত ও পক্ষিরাজের গৌরব

Image
  গরুড়ের মুক্তি: মায়ের বন্ধনমোচন, অমৃত ও পক্ষিরাজের গৌরব সূর্যের আলোয় ঝলমল করছিল স্বর্গের আকাশ। দেবতাদের পরাজিত করে, অমৃতের কলস হাতে তুলে নিয়ে গরুড় উড়ে চলেছিলেন। তাঁর বিশাল ডানায় বাতাস কাঁপছিল, যেন পৃথিবীটা ছোট হয়ে গেছে। কিন্তু তিনি অমৃত নিয়ে যাচ্ছিলেন না লোভে, না অমরত্বের লালসায়। শুধুমাত্র একটা কথা রাখার জন্য—মা বিনতার মুক্তির জন্য। সেই নাগদের ক্রূর বন্ধন থেকে মাকে ছিনিয়ে আনার জন্য। আকাশের উচ্চতায়, যেখানে মেঘেরাও থমকে দাঁড়ায়, সেখানে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল ভগবান বিষ্ণুর সঙ্গে। বিষ্ণু চেয়ে দেখলেন সেই বিশাল পাখিকে। চোখে কোনো লোভ নেই, হৃদয়ে কোনো ক্ষুধা নেই—শুধু একটা অটল উদ্দেশ্য। এমন নিষ্কাম পুরুষ দেখে বিষ্ণুর মন গলে গেল। “বর চাও, গরুড়। যা চাও, তাই দেব।” গরুড়ের উত্তর এল শান্ত, গভীর গলায়—যেন আকাশেরই কথা বলছেন তিনি।   “আমাকে আপনার ধ্বজায় স্থান দিন। আর অমৃত ছাড়াই, শুধু আপনার কৃপায় আমাকে অমরত্ব দিন।” বিষ্ণু হাসলেন। সঙ্গে সঙ্গে বর দিয়ে দিলেন।   তখন গরুড় ফিরিয়ে বললেন, “এবার আমিও আপনাকে একটা বর দিতে চাই। যা চান, বলুন।” বিষ্ণু মৃদু হেসে বললেন, “তবে তুমি আমার বাহন হও। সকল লোকের...

গরুড় ও অমৃতের সন্ধান: এক শক্তিশালী বীরের আখ্যান

Image
  গরুড় ও অমৃতের সন্ধান: এক শক্তিশালী বীরের আখ্যান- বিনতানন্দন গরুড়ের বুকের ভেতর তখন এক প্রকাণ্ড আগুন জ্বলছে। সে আগুন ক্ষুধার নয়, অপমানের। এক তুচ্ছ বাজি হেরে তাঁর মা বিনতা এখন কদ্রুর দাসী। দাসত্ব মোচনের একটাই পথ— সর্প সন্তানদের জন্য স্বর্গ থেকে নিয়ে আসতে হবে অমৃত। যাত্রার আগে মা বিনতা ছেলেকে সাবধান করেছিলেন, "সমুদ্রের মাঝখানে ওই সর্পকুলকে তুই আহার হিসেবে গ্রহণ করিস, কিন্তু খবরদার, কোনো ব্রাহ্মণকে যেন আঘাত করিস না।" একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল- আকাশপথে উড়তে উড়তে গরুড়ের জঠরে তখন তীব্র ক্ষুধার জ্বালা। হঠাৎ ক্ষুধার ঝোঁকে তিনি এমন একজনকে মুখে পুরে নিলেন, যার সংস্পর্শে তাঁর তালু আগুনের মতো জ্বলতে শুরু করল। গরুড় বুঝলেন, ভুল হয়েছে। নিজের অজান্তেই তিনি এক ব্রাহ্মণকে মুখে তুলে নিয়েছেন। তৎক্ষণাৎ তাঁকে মুক্ত করে দিয়ে গরুড় এগিয়ে চললেন। কিছুদূর এগোতেই দেখা হলো মহর্ষি কশ্যপের সঙ্গে। কশ্যপ কুশল জানতে চাইলেন। গরুড় লুকোলেন না কিছুই— মায়ের দাসত্ব, কদ্রুর চক্রান্ত আর অমৃত আহরণের কঠিন লক্ষ্যের কথা খুলে বললেন। শেষে ঈষৎ বিরক্তির সঙ্গেই জানালেন, তাঁর পেটের ক্ষুধা এখনো মেটেনি। দুই ভাইয়ের প্রতিহিংসা- কশ্যপ স্...

গরুড়ের জন্ম: বন্ধন, অসহিষ্ণুতা আর আকাশ কাঁপানো মহাবীর

Image
গরুড়ের জন্ম: বন্ধন, অসহিষ্ণুতা আর আকাশ কাঁপানো মহাবীর আদ্যিকালের কথা। সত্যযুগ। তখন পৃথিবী ছিল সত্যের শাসনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা, ধর্মের চাকা তখনো টাল খায়নি। সেই সময়ে বাস করতেন প্রজাপতির দুই কন্যা— কদ্রু আর বিনতা। সম্পর্কে তাঁরা বোন, আবার মহর্ষি কশ্যপের ঘরনিও বটে। কশ্যপ তাঁদের দুজনেই খুব ভালোবাসতেন। একদিন পরম তৃপ্তিতে ঋষি বললেন, "চাও, যা চাইবার চেয়ে নাও।" কদ্রু দেরি করলেন না। তিনি চাইলেন সহস্র শক্তিশালী পুত্র, যারা হবে এক-একজন দুর্দান্ত সর্প। বিনতা একটু ভাবলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল অন্য। তিনি চাইলেন মাত্র দুই পুত্র— কিন্তু সেই দুই পুত্র যেন শক্তিতে কদ্রুর হাজার পুত্রকে হেলায় হারিয়ে দিতে পারে। কশ্যপ তথাস্তু বলে গর্ভধারণের উপদেশ দিয়ে গভীর অরণ্যে ধ্যানে মগ্ন হলেন। কালক্রমে কদ্রু এক হাজার ডিম পাড়লেন আর বিনতা দুটি। ধাত্রীরা সেই ডিমগুলোকে অতি সযত্নে উষ্ণ পাত্রে রেখে দিলেন। কেটে গেল দীর্ঘ পাঁচশো বছর। কদ্রুর এক হাজার ডিম ফুটে বের হলো এক হাজার দীপ্তকান্তি সর্পপুত্র। কিন্তু বিনতার সেই দুই ডিম? যেন পাথরের মতো নিথর, প্রাণস্পন্দনের নামগন্ধ নেই। বিনতা অপেক্ষা করলেন, আরও অপেক্ষা করলেন। কিন্তু ধৈর্য...

সমুদ্রমন্থন: অমৃতের অধিকার ও এক চিরস্থায়ী প্রতিশোধ

Image
  সমুদ্রমন্থন: অমৃতের অধিকার ও এক চিরস্থায়ী প্রতিশোধ দেবতারা তখন শ্রীহীন, তেজহীন। মহর্ষি দুর্বাশার অভিশাপে তাঁদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। স্বর্গ তখন এক ধূসর রাজ্য, যেখানে শক্তির বদলে হাহাকার ঘুরে বেড়ায়। এই হীনবল অবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়—অমৃত। সেই অমৃত যা লুকিয়ে আছে আদিম সমুদ্রের অতল গর্ভে। কিন্তু মহাসমুদ্রের জলরাশি মন্থন করা তো একা দেবতাদের সাধ্য নয়। অগত্যা চিরশত্রু দানবদের সঙ্গে সন্ধি করতে হলো। লোভ বড় বালাই, অমৃতের ভাগ পাওয়ার আশায় অসুররা রাজি হয়ে গেল সেই অসম্ভব শ্রমে। উপাখ্যানে বলা হয়, মন্দার পর্বত হলো মন্থনদণ্ড আর নাগরাজ বাসুকি হলেন রশি। একপাশে দেবতারা, অন্যপাশে অসুররা—শুরু হলো এক মহাকাব্যিক টানাপোড়েন। সমুদ্রের নীল জল ফুঁসতে লাগল, ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ল আকাশের গায়ে। শ্রমের ঘাম আর সমুদ্রের নোনা জল একাকার হয়ে গেল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন দিব্য বৈদ্য ধন্বন্তরি অমৃতের কলস নিয়ে উঠে এলেন, তখন মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে গেল দৃশ্যপট। প্রতিজ্ঞা আর চুক্তির কথা ভুলে গিয়ে অসুররা এক হ্যাঁচকা টানে ছিনিয়ে নিল সেই কলস। শুরু হলো অধিকারের লড়াই। বিষ্ণু জানতেন, গায়ের জোরে অসুরদের হারানো কঠিন। তাই...

কর্ণ- কবচধারী সেই কিশোর-

Image
কর্ণ- কবচধারী সেই কিশোর- মহাভারতের এই গল্পটা কোনো রাজসূয় যজ্ঞ বা কুরুক্ষেত্রের রণহুঙ্কার দিয়ে শুরু হয় না। এ গল্পের মূলে রয়েছে এক কিশোরীর কৌতূহল, তার হৃদয়ের এক গোপন দীর্ঘশ্বাস, যা সে আমৃত্যু বয়ে বেড়িয়েছে একা। যদুবংশের শূরসেন ছিলেন অত্যন্ত প্রতাপশালী এক জনপদ প্রধান। তাঁরই পুত্র বসুদেব, যিনি পরবর্তীতে কৃষ্ণের পিতা হবেন। কিন্তু কৃষ্ণের জন্মের অনেক আগে শূরসেন এক অদ্ভুত প্রতিজ্ঞা করে বসেছিলেন। তাঁর এক পিসতুতো ভাই ছিলেন—কুন্তীভোজের রাজা। সেই রাজা ছিলেন নিঃসন্তান। শূরসেন পবিত্র অগ্নির সামনে দাঁড়িয়ে কথা দিয়েছিলেন, তাঁর প্রথম সন্তানকে তিনি তুলে দেবেন এই নিঃসন্তান ভাইয়ের হাতে। যখন প্রথা জন্মালো, শূরসেন নিজের কথা রাখলেন। জন্মমুহূর্তেই শিশুটিকে কুন্তীভোজের হাতে সঁপে দেওয়া হলো। প্রিথা হয়ে গেল ‘কুন্তী’। একটি রাজ্যের নাম মিশে গেল একটি মেয়ের পরিচয়ে। কুন্তীভোজের প্রাসাদে কুন্তী বড় হয়ে উঠছিলেন এক স্নিগ্ধ আবহে। তিনি আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো ছিলেন না। তাঁর মধ্যে ছিল সেবার এক আশ্চর্য নিষ্ঠা। প্রাসাদে কোনো অতিথি এলে বা কোনো ঋষি পদার্পণ করলে কুন্তীর হাত দিয়েই চলত তাঁদের সেবা। এই সেবা করতে গিয়েই তাঁর জীবনে ...

এক মানসী, যে হয়তো কোনোদিন ছিলই না—অথচ যাকে মুছে ফেলার সাধ্য নেই কারো।

Image
এক মানসী, যে হয়তো কোনোদিন ছিলই না—অথচ যাকে মুছে ফেলার সাধ্য নেই কারো। ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে অনেক সময় এমন কিছু নাম উঠে আসে, যাদের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় থাকলেও বাঙালির বা ভারতবাসীর আবেগে তাদের স্থান প্রশ্নাতীত। আনারকলি তেমনই এক নাম। কোনো সম্রাট বা দিগ্বিজয়ীর নাম নয়, এ এক এমন কিশোরীর গল্প, যার অপরাধ ছিল শুধু ভালোবাসা। অন্ধকার গলি আর ডালিমের ফুল তার আসল নাম কী ছিল, কেউ জানে না। কিন্তু ইতিহাসে সে পরিচিত ‘আনারকলি’ নামে—যার অর্থ ডালিম ফুল। সে ছিল তরুণী, লাবণ্যময়ী আর বুদ্ধিমতী। মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল আগ্রার প্রাসাদে সে হেঁটে বেড়াত এক সহজাত আভিজাত্যে। আকবরের দরবার মানেই তখন একদিকে অঢেল সম্পদ, অন্যদিকে পদে পদে বিপদ। কবি, শিল্পী আর গুপ্তচরের ভিড়ে সেখানে প্রতিটা চাহনির আড়ালে লুকিয়ে থাকত এক একটা সমীকরণ। আনারকলি এসবই জানত, যতদিন না সে অসতর্ক হয়ে পড়ল। আর সেই অসতর্কতার নাম—শেহজাদা সেলিম। আকবরের পুত্র সেলিম ছিলেন ঠিক যেমনটা একজন মুঘল রাজপুত্রের হওয়া উচিত—উদ্দাম, চঞ্চল এবং জীবনের প্রতি এক তীব্র তৃষ্ণায় ভরপুর। একদিন সেলিমের চোখ গিয়ে পড়ল আনারকলির ওপর। সেই যে দৃষ্টি বিনিময় হলো, তা আর সরলো না। রাজপুত্রের...

শরদ্বান ঋষি ও পথের ধারে কুড়িয়ে পাওয়া রাজপুত্তুর

Image
  শরদ্বান ঋষি ও পথের ধারে কুড়িয়ে পাওয়া রাজপুত্তুর মহাভারতের চরিত্ররা যেন এক-একজন রহস্যের খনি। সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষের মতো তাদের জন্ম নয়, তাদের বেড়ে ওঠাও যেন কোনো এক অলৌকিক চিত্রনাট্যের অংশ। দ্রোণাচার্যের পত্নী কৃপীর কথাই ধরা যাক। কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধের নেপথ্যে এই শান্ত অথচ তেজস্বিনী নারীর অবদান কম নয়। কিন্তু কৃপীর জন্মের ইতিহাস খুঁড়তে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় তাঁর পিতা শরদ্বানের কাছে, যাঁর জন্ম হয়েছিল এক অদ্ভুত উপায়ে—তির বা শর থেকে। গৌতম মুনির পুত্র শরদ্বান। কিন্তু শাস্ত্রপাঠ বা যজ্ঞের আগুন তাঁকে কোনোদিন টানেনি। ঋষিপুত্র হলে কী হবে, তাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল ধনুুর্বিদ্যা। যখন অন্য ব্রাহ্মণ বালকরা প্রদীপের আলোয় বেদপাঠে মগ্ন, শরদ্বান তখন বনের অন্ধকারে লক্ষ্যভেদ অভ্যাস করছেন। শাস্ত্রের চেয়ে অস্ত্রের ঝঙ্কারই ছিল তাঁর কাছে অধিক পবিত্র। কঠোর তপস্যা আর নিরলস সাধনায় তিনি এমন সব দিব্যাস্ত্র আয়ত্ত করলেন, যা সাধারণ কোনো যোদ্ধার পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব। তাঁর এই ক্রমবর্ধমান শক্তি দেখে স্বর্গের রাজা ইন্দ্র প্রমাদ গুনলেন। মর্ত্যের এক ব্রাহ্মণ যদি দেবতাতুল্য শক্তিশালী হয়ে ওঠেন, তবে স্ব...

পাত্রে জন্মানো এক যোদ্ধা:এক ব্রাহ্মণের অপমান কীভাবে তৈরি করল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধরকে-

Image
পাত্রে জন্মানো এক যোদ্ধা:এক ব্রাহ্মণের অপমান কীভাবে তৈরি করল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধরকে- কিছু গল্পের শুরু হয় অলৌকিকতায়, আর শেষ হয় এমন এক ক্ষতে যা কোনোদিন শুকোয় না। দ্রোণের গল্পটাও ঠিক তেমনই। গল্পের শুরু গঙ্গার তীরে। মহর্ষি ভরদ্বাজ সেদিন সকালে স্নান করতে নেমেছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল অপ্সরা ঘৃতাচী—অপরূপা, জ্যোতির্ময়ী, যার দিক থেকে চোখ ফেরানো দায়। ঋষির সংযম টলল। তাঁর তেজ স্খলিত হয়ে পড়ল কাছেই রাখা এক মৃন্ময় পাত্র বা দ্রোণ-এ। সেই মাটির পাত্র থেকেই জন্ম নিল এক ফুটফুটে শিশু। নাম রাখা হলো দ্রোণ। প্রথম নিশ্বাস থেকেই বোঝা গিয়েছিল, এই বালক সাধারণ হতে আসেনি। পিতার আশ্রমে বেড়ে ওঠা দ্রোণ যখন সমবয়সীদের সঙ্গে বেদ পাঠ শুরু করলেন, দেখা গেল তাঁর মেধা প্রখর। কিন্তু শুধু শাস্ত্রের শ্লোক আওড়ে তো জীবন চলে না। দ্রোণের দু-চোখে তখন অন্য স্বপ্ন—অস্ত্রবিদ্যার স্বপ্ন। ধনুর্বিদ্যা, তলোয়ারের কৌশল, আর সেই সব অলৌকিক অস্ত্র যা আকাশ থেকে আগুন আর বজ্র নামিয়ে আনতে পারে। পিতার শিষ্য অগ্নিবেশ্যের কাছে তিনি পাঠ শুরু করলেন। দ্রোণ ছিলেন এক ভয়ংকর ছাত্র—ক্ষিপ্র, নিখুঁত এবং অদম্য। অল্পদিনেই তিনি ছাড়িয়ে গে...

বিষাদ ও অমৃত: এক সমুদ্রমন্থনের আখ্যান

Image
বিষাদ ও অমৃত: এক সমুদ্রমন্থনের আখ্যান নীল নির্জনতার ভেতরেও একটা দাহ থাকে। দেবরাজ ইন্দ্রের সেদিন শরীরী দাহ ছিল না, ছিল আভিজাত্যের দম্ভ। আর সেই দম্ভের আগুনেই ছাই হয়ে গেল স্বর্গপুরীর সব ঐশ্বর্য। গল্পটা শুরু হয়েছিল একটা সামান্য ফুলের মালা দিয়ে, কিন্তু তার শেষটা লেখা হলো মহাকালের নীল বিষে। এক ঋষির ক্রোধ ও ধুলোয় মেশা দম্ভ দুর্বাসা ঋষি— যাঁর মেজাজটা আগুনের শিখার মতো সব সময় কাঁপত। একদিন দেবরাজকে এক দিব্য মালা উপহার দিলেন তিনি। কিন্তু ক্ষমতার মদমত্ততায় ইন্দ্র ভুলে গেলেন সৌজন্য। মালাটা নিজের গলায় না পরে ছুড়ে দিলেন বাহন ঐরাবতের শুঁড়ে। হাতিটা আপন খেয়ালে সেই মালা ধুলোয় আছাড় মারল। ব্যাস, এটুকুই যথেষ্ট ছিল। দুর্বাসার চোখ থেকে যেন বিদ্যুৎ ঠিকরে বেরোল। তিনি অভিশাপ দিলেন, "যে ঐশ্বর্যের গরমে তুমি অন্ধ, সেই লক্ষ্মী তোমাকে ত্যাগ করবেন। দেবকুল আজ থেকে শ্রীহীন হবে।" দেখতে দেখতে দেবতাদের গায়ের দ্যুতি মিলিয়ে গেল। বলিরেখা দেখা দিল তাঁদের শরীরে। আর সেই সুযোগে অসুররা কেড়ে নিল স্বর্গ। হেরে যাওয়া দেবতারা যখন দিশেহারা, তখন ভগবান বিষ্ণু তাঁদের এক বিচিত্র পথের হদিশ দিলেন— সমুদ্রমন্থন। শত্রু যখন সহযোগী বিষ্...

কালান্তরের পদধ্বনি: এক মহানিষ্ক্রমণ- সত্যবতির বনবাস যাত্রা

Image
কালান্তরের পদধ্বনি: এক মহানিষ্ক্রমণ- সত্যবতির বনবাস যাত্রা হস্তিনাপুরের আকাশটা আজ বড় বেশি ফ্যাকাসে। মেঘ নেই, কিন্তু রোদের তেজও যেন কোনো এক বিষণ্ণ চাদরে ঢাকা। প্রাসাদের চত্বরে রথের চাকার ঘড়ঘড় শব্দটা যখন থামল, তখন বাতাস ভারী হয়ে এল এক আর্তনাদে। কুন্তী ফিরেছেন, কিন্তু তাঁর সেই দৃপ্ত পদচারণা আজ পাথরচাপা কান্নায় স্তব্ধ। সঙ্গে পাঁচটি শিশু—পিতৃহীন পাঁচ পাণ্ডব।   অম্বালিকা বাতায়নের ধারে বসে ছিলেন। সংবাদটা যখন এল যে পাণ্ডু নেই, আর তাঁর প্রিয়তমা পত্নী মাদ্রীও আগুনের শিখায় নিজেকে সঁপে দিয়েছেন, তখন মুহূর্তের জন্য তাঁর হৃৎস্পন্দন থমকে গেল। শরীরটা তাঁর এমনিতেই পাণ্ডুর ছিল, আজ যেন তা স্বচ্ছ পাথরের মতো সাদা হয়ে গেল। পুত্রশোকের এই দহন রাজকীয় বসনের চেয়েও অনেক বেশি ভারি, অনেক বেশি নিষ্ঠুর। পা টলছিল, তবু তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন বড় দিদি অম্বিকার কক্ষে। সেখানে ধৃতরাষ্ট্রের পাশে অম্বিকা এক মূর্তিমতী উদ্বেগের মতো বসে ছিলেন। অম্বালিকার দীর্ঘশ্বাসের শব্দে  অম্বিকা চমকে উঠলেন। "অম্বা? পাণ্ডু এসেছে? পাণ্ডু কোথায়?" অম্বিকার গলায় এক অবর্ণনীয় শঙ্কা। অম...

কুন্তীর হস্তিনাপুর প্রর্তাপন

Image
শতশৃঙ্গ পর্বতের নির্জন অরণ্যে তখন এক গভীর বিষণ্ণতা। রাজা পাণ্ডু আর নেই, নেই রূপসী মাদ্রীও। তাঁদের অন্ত্যেষ্টির পর অরণ্যচারী দেবর্ষি ও মুনিরা এক সভায় মিলিত হলেন। তাঁদের চোখেমুখে এক কঠিন কর্তব্যের ছাপ। একজন ঋষি ধীর গলায় বললেন, "পাণ্ডু তাঁর রাজ্য-ঐশ্বর্য ত্যাগ করে আমাদের আশ্রয়ে এসে কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন হয়েছিলেন। আজ তিনি স্বর্গবাসী, কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর শোকাতুর পত্নী কুন্তী আর পাঁচজন কিশোর রাজপুত্রকে। আমাদের এখন দৈব কর্তব্য—পাণ্ডু ও মাদ্রীর অস্থিভস্ম এবং এই অসহায় পরিবারটিকে কুরুবংশের রাজধানী হস্তিনাপুরে পৌঁছে দেওয়া।" হস্তিনাপুর—সেই প্রাচীন নগরী, যা আজকের উত্তরপ্রদেশের মিরাট জেলা ছাড়িয়ে গঙ্গার এক পুরোনো খাত ধরে জেগে থাকা টিলার মতো। মুনিরা পরামর্শ শেষ করে যাত্রা শুরু করলেন। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যখন তাঁরা হস্তিনাপুরের সিংহদারে উপস্থিত হলেন, তখন সারা নগরে শোরগোল পড়ে গেল। সাধারণ মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল অরণ্যচারী ঋষিদের দর্শনে। রাজপ্রাসাদের অলিন্দে খবর পৌঁছাতেই বেরিয়ে এলেন কুরুবৃদ্ধ ভীষ্ম। তাঁর সঙ্গে ধৃতরাষ্ট্র, বিদুর এবং সেই বিচিত্র চরিত্রের বাহ্লীক।  বাহ্লীক সম্পর্কে ভীষ্মের জ্যাঠামশা...