Posts

২২তম বনপর্ব- আকাশছোঁয়া অহংকার এবং এক ঋষির সামান্য চাতুরী: বিন্ধ্যের দর্পচূর্ণ

Image
২২তম বনপর্ব- আকাশছোঁয়া অহংকার এবং এক ঋষির সামান্য চাতুরী: বিন্ধ্যের দর্পচূর্ণ লোমশ মুনি যখন তাঁর জটাজাল নেড়ে আদিমকালের এক একটি আখ্যান শোনাচ্ছিলেন, পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠির তখন চিবুকে হাত দিয়ে গভীর মগ্নতায় শুনছিলেন সেই কথা। কিন্তু একটা প্রশ্ন অনেকদিন ধরেই তাঁর মনে কাঁটার মতো বিঁধে ছিল। তিনি শুনেছিলেন, কোনো এক সুদূর অতীতে বিন্ধ্য পর্বত নাকি এমন ভয়ঙ্কর এক অভিমানে ফেটে পড়েছিল যে, ক্রমশ নিজের শরীরটাকে বাড়িয়ে সে ছুঁয়ে ফেলেছিল আকাশ। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সূর্যের রথের চাকা, আর এক জমাট অন্ধকারের চাদরে ঢেকে গিয়েছিল সমগ্র দাক্ষিণাত্য। আলোহীন সেই দেশে মানুষ রোগে, শোকে অকালে মরতে বসেছিল। যুধিষ্ঠির আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, "হে মহামতি লোমশ, বিন্ধ্যের এই সংহারী ক্রোধের কারণ কী ছিল? আর কিসের জোরেই বা শান্ত হলো সেই পর্বত?" লোমশ মুনির ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু, রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। তিনি বলতে শুরু করলেন। তখন পৃথিবীর বয়স অনেক কম। পাহাড়-নদীর বুকেও তখন মানুষের মতোই রক্তমাংসের অভিমান খেলা করত। এই ধরিত্রীর বুকে বিন্ধ্য ছিল এক ঐশ্বর্যময়, সুবিশাল পর্বতমালা—তার অরণ্যে চন্দনের গন্ধ, গর্ভে মণিমাণিক্যের ...

২১তম বন পর্ব- সমুদ্র শোষক অগস্ত্যমুনি: এক মহাবৈপ্লবিক আখ্যান

Image
২১তম বন পর্ব- সমুদ্র শোষক অগস্ত্যমুনি: এক মহাবৈপ্লবিক আখ্যান। যুধিষ্ঠির করজোড়ে বসলেন। চারধারে বনের স্তব্ধতা। রোমশ মুনির চোখের কোণে এক অদ্ভুত দ্যুতি। তিনি বলতে শুরু করলেন, "শোনো যুধিষ্ঠির, সত্যযুগের সেই ভয়ঙ্কর কালকেয় অসুরদের কথা। দেবতারা যখন বৃত্রাসুরের অত্যাচারে স্বর্গছাড়া, তখন ব্রহ্মা তাঁদের পথ দেখালেন। বললেন, দধীচি মুনির কাছে যাও। তাঁর অস্থি ছাড়া এই অসুরবধ অসম্ভব।" দেবতারা মর্ত্যে এলেন। সরস্বতী নদীর তীরে বসে তপস্যারত দধীচি কোনো দ্বিধা না করে নিজের দেহ বিসর্জন দিলেন। এক মহান ত্যাগের কঙ্কাল থেকে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা গড়ে তুললেন এক অমোঘ অস্ত্র—ছয় দাঁতবিশিষ্ট বজ্র। ইন্দ্রের সেই বজ্রের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল বৃত্রাসুর। কিন্তু গল্পটা সেখানে শেষ হলো না। আসল সংকট শুরু হলো তারপর। অসুরদের নতুন কৌশল: ধর্মের মূলে আঘাত বৃত্রাসুরের পতনের পর অবশিষ্ট কালকেয় অসুরেরা পালালো। তারা গিয়ে আশ্রয় নিল অতল সমুদ্রের তলদেশে। তারা জানত, এই পৃথিবীর প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে ঋষিদের তপস্যায়। তাই রাত্রি নামলেই তারা সমুদ্রের বুক থেকে উঠে এসে মর্ত্যের তপোবনগুলো ধ্বংস করতে লাগল, ঋষিদের হত্যা করতে লাগল। পৃথিবী জু...

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

Image
  মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata)  মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন মহাভারতের আদি পর্বের  সংক্ষিপ্ত অংশ বিশেষ পুরু বংশের বর্ণনা -মহাভারতের আদিপর্বে বর্ণিত চন্দ্রবংশের অন্যতম গৌরবময় শাখা হলো পুরু রাজবংশ বা পৌরব রাজবংশ ।  উর্বশী- ঊরুসম্ভবা: স্বর্গের দর্পচূর্ণ ও এক চিরন্তন রূপকথা কালীয়দমন: কালিন্দীর বুকে এক মায়াবী নর্তক দেবতাদের অজেয় শত্রু: নিবাতকবচদের বিরুদ্ধে অর্জুনের মহাযুদ্ধ কামনার স্বর্গ ও মাতৃত্বের পুণ্য: উর্বশী-অর্জুনের সেই অনির্বাণ উপাখ্যান রাজা দুষ্যন্ত ও শকুন্তলার.গন্ধর্ব প্রথায়  বিবাহ শকুন্তলার পুত্র ভরতের জন্ম এবং রাজা দুষ্যন্ত কর্তৃক তাকে নিজের পুত্র হিসেবে গ্রহণ। দেবতা আর অসুরের লড়াই আর কচ ও দেবযানীর প্রেম।দেবতা আর অসুরের লড়াই তখন তুঙ্গে দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: দম্ভ এবং প্রতিশোধের উপাখ্যান।সব বড় অনর্থের মূলে থাকে খুব তুচ্ছ কোনো ঘটনা। যযাতি, দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা: এক রাজার দুই নারী ও এক পুত্রের ত্যাগ। শুক্ৰাচার্যের আশ্রমের চারদিকের বনটা বড় ঘন, বড় রহস্যময়।  যযাতির হাজার বছর: অন্তহীন ...

২০তম বনপর্ব- পরশুরামের দর্পচূর্ণ: অযোধ্যাপথে এক মহাবিস্ময়ের ইতিহাস

Image
  ২০তম বনপর্ব-পরশুরামের দর্পচূর্ণ: অযোধ্যাপথে এক মহাবিস্ময়ের ইতিহাস অগস্ত্য আশ্রমের সেই পুণ্যতোয়া জলে স্নান সমাপন করতেই এক অলৌকিক কাণ্ড ঘটল। যুধিষ্ঠিরের আজন্মদীপ্ত অবয়ব থেকে যেন ঠিকরে বেরোতে লাগল এক নতুন, প্রখর জ্যোতি। শত্রুদমনের এক অদ্ভুত সংকল্প জেগে উঠল তাঁর অন্তরে। কৌতূহল চাপতে না পেরে তিনি মহর্ষি লোমশের দিকে তাকিয়ে বিনীত স্বরে সুধালেন, "প্রভু, আমি শুনেছি মহাতেজস্বী পরশুরাম নাকি একদা সমস্ত বীর্য ও মহিমা হারিয়ে শ্রীহীন, নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিলেন? কেমন করে তা সম্ভব হয়েছিল? আর কীভাবেই বা তিনি ফিরে পেয়েছিলেন তাঁর সেই পূর্বের দিব্য রূপ? দয়া করে আমাদের সেই কাহিনী শোনান।" লোমশ মৃদু হাসলেন। তারপর পাণ্ডবদের সবাইকে কাছে ডেকে গভীর মমতায় বলতে শুরু করলেন সেই আশ্চর্য উপাখ্যান। তখন অযোধ্যায় উৎসবের আলো। মিথিলারাজ জনকের রাজসভায় হরধনু ভঙ্গ করে রূপসী সীতার পাণিগ্রহণ করেছেন অযোধ্যার জ্যেষ্ঠ রাজকুমার রামচন্দ্র। যে ধনুকে জ্যা-রোপণ করা তো দূর, ত্রিভুবনের কোনো বীর হাত দেওয়ার সাহসটুকুও পায়নি, রামচন্দ্র তা হেলায় তুলে দুই টুকরো করে দিয়েছেন। এমন অলৌকিক কীর্তির পর আনন্দ-কোলাহলে সীতাকে পাশে নিয়ে অযোধ্যার ...

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

Image
মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)  মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন (Index of Brief Mahabharata)  মহাভারতের বন পর্বের অংশ বিশেষ। ১৬তম ভাগ- বন পর্ব - কাম্যকবনের অশ্রুজল ও তীর্থরাজের মহিমা ১৭তম ভাগ-বন পর্ব-কাম্যক বনের শূন্যতা ও পুণ্যতীর্থের আহ্বান অষ্টাদশ বনপর্ব-দেবরাজের বার্তা ও এক পুণ্যযাত্রার সূচনা ১৯তম বনপর্ব -তীর্থের পুণ্য ও এক রাজকন্যার ত্যাগ: অগস্ত্য-লোপামুদ্রার উপাখ্যান ২০তম বনপর্ব- পরশুরামের দর্পচূর্ণ: অযোধ্যাপথে এক মহাবিস্ময়ের ইতিহাস ২১তম বন পর্ব- সমুদ্র শোষক অগস্ত্যমুনি: এক মহাবৈপ্লবিক আখ্যান। আরও চলবে অপেক্ষা করুন।

১৯তম বনপর্ব -তীর্থের পুণ্য ও এক রাজকন্যার ত্যাগ: অগস্ত্য-লোপামুদ্রার উপাখ্যান

Image
১৯তম বনপর্ব -তীর্থের পুণ্য ও এক রাজকন্যার ত্যাগ: অগস্ত্য-লোপামুদ্রার উপাখ্যান কাম্যক বনের শান্ত তপোবনে সেদিন এক অলৌকিক স্তব্ধতা। মহাপ্রস্থানের পূর্বে সেখানে পদার্পণ করেছেন তিন পরম তেজস্বী ঋষি—ব্যাস, নারদ এবং পর্বত। যুধিষ্ঠির পরম ভক্তিতে অবনত মস্তকে তাঁদের চরণে প্রণাম জানালেন, প্রার্থনা করলেন অন্তরের আশীর্বাদ। যাওয়ার আগে ঋষিরা পাণ্ডবদের এমন এক পরম সত্যের পাঠ দিলেন, যা তাঁদের দীর্ঘ নির্বাসনের দিনগুলিতে ধ্রুবতারার মতো পথ দেখাবে। তাঁরা বললেন, “হে কুন্তীপুত্র, তীর্থভ্রমণ মানে কেবল পবিত্র জলে অবগাহন বা পুণ্যভূমি দর্শন নয়। তীর্থের আসল উদ্দেশ্য হলো অন্তরের কলুষতা ধুয়ে ফেলা। মনে যদি হিংসা, দ্বেষ বা তিক্ততা জমে থাকে, তবে জাহ্নবীর ধারাও পাপমুক্ত করতে পারে না। অন্তরকে পবিত্র না করলে তীর্থের প্রকৃত ফল মেলে না।” দ্রৌপদী ও অন্য ভাইয়েরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলেন সেই বাণী। অগ্রহায়ণ মাসের এক শুভ পূর্ণ তিথিতে, নক্ষত্রের অনুকূল সংযোগে, আধ্যাত্মিক আলোর সন্ধানে পাণ্ডবেরা যাত্রা শুরু করলেন। তাঁদের সঙ্গে চললেন যাজ্ঞসেনী, কুলপুরোহিত ধৌম্য, পথপ্রদর্শক লোমশ এবং একদল বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ। প্রথমেই তাঁরা পৌঁছলেন নৈমিষা...

অষ্টাদশ বনপর্ব-দেবরাজের বার্তা ও এক পুণ্যযাত্রার সূচনা

Image
  অষ্টাদশ বনপর্ব-দেবরাজের বার্তা ও এক পুণ্যযাত্রার সূচনা কাম্যক বনের সেই নিভৃত কুটিরের সামনে তখন অপরাহ্ণের ম্লান আলো। পুরোহিত ধৌম্য পাণ্ডবদের সামনে বসে অতি প্রাচীন এক একটি পুণ্যতীর্থের মহিমা বর্ণনা করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে বনের পত্রপল্লব ভেদ করে সেখানে আবির্ভূত হলেন মহর্ষি লোমশ। তাঁর জটাজাল আর শান্ত চোখের দৃষ্টিতে এক অলৌকিক সমাহিত ভাব। যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুনহীন অর্জুনের যমজ অনুজদ্বয় আর কৃষ্ণবর্ণা দ্রৌপদী—সকলেই সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়ালেন। শাস্ত্রীয় বিধি মেনে, পরম শ্রদ্ধায় তাঁরা বরণ করে নিলেন এই দেবোপম অতিথিকে। যুধিষ্ঠির বিনীত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, "হে মহর্ষি, আপনার এই আকস্মিক আগমন আমাদের ধন্য করেছে। বলুন, কী অভিপ্রায়ে আজ এই গভীর বনে আপনার পদার্পণ?" লোমশ মৃদু হাসলেন। তাঁর সেই হাসিতে যেন স্বর্গীয় সুধার স্পর্শ। তিনি বললেন, "হে ধর্মরাজ, আমি তো মুক্ত পরিব্রাজক, কোনো বন্ধন আমাকে বেঁধে রাখে না। কিন্তু আজ আমি এসেছি এক বিশেষ সংবাদ নিয়ে। কিছুদিন আগেই আমি গিয়েছিলাম ইন্দ্রালয়ে। সেখানে যা দেখলাম, তা একাধারে বিস্ময়কর এবং আনন্দের। দেবরাজ ইন্দ্রের সিংহাসনের অর্ধাংশে পরম গৌরবে বসে আছেন তোমা...