Posts

চিত্ররথ চূর্ণ: গঙ্গার ঘাটে বীরের পরীক্ষা

Image
চিত্ররথ চূর্ণ: গঙ্গার ঘাটে বীরের পরীক্ষা একচক্রার সেই নির্জন ব্রাহ্মণগৃহের দিনগুলো ফুরিয়ে এলো। মহর্ষি ব্যাসদেব এসে যখন গন্তব্য স্থির করে দিয়ে গেলেন, তখন কুন্তী আর তাঁর পাঁচ পুত্র বুঝলেন, এবার শিকড় উপড়ানোর সময় হয়েছে। পাণ্ডবদের এই যাযাবর জীবন যেন এক অন্তহীন মহাকাব্য। ধুলোমাখা পথ, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, আর বুকে একরাশ অভিমান নিয়ে তাঁরা পা বাড়ালেন পাঞ্চাল দেশের দিকে। লক্ষ্য—রাজা দ্রুপদের কন্যার স্বয়ংবর সভা। দিনের আলোয় পথ চলা, আর রাত নামলে কোনো মহীরুহের ছায়ায় আশ্রয়। ক্লান্ত শরীর, কিন্তু মনে দ্রৌপদীর রূপকথার হাতছানি। একদিন গোধূলির ম্লান আলোয় তাঁরা এসে পৌঁছলেন পুণ্যতোয়া গঙ্গার তীরে। চারপাশ নিঝুম, কেবল জলের কলতান। কিন্তু হঠাৎ সেই নির্জনতা ভেঙে ভেসে এল খিলখিল হাসি আর নুপুরের নিক্বণ। দেখা গেল, অলকানন্দার স্বচ্ছ সলিলে জলক্রীড়ায় মত্ত এক উদ্ধত পুরুষ—গন্ধর্বরাজ চিত্ররথ, যাঁর আর এক নাম অঙ্গারপর্ণ। তাঁর রথখানি যেন আকাশের বিদ্যুতকে বন্দি করে রেখেছে। পাণ্ডবদের দেখা মাত্র চিত্ররথের ভ্রু কুঁচকে উঠল। আভিজাত্যের অহঙ্কারে অন্ধ হয়ে তিনি হাঁক ছাড়লেন, "থামুন হে মর্ত্যের তুচ্ছ মানবগণ! দেখছ না, এখানে আমি আমার ম...

দ্রৌপদীর নিয়তি সংবাদটা বাতাসের আগে ছোটে।

Image
  দ্রৌপদীর নিয়তি সংবাদটা বাতাসের আগে ছোটে।  একচক্রা গ্রামের সেই ছিমছাম কুঁড়েঘরে যখন খবরটা পৌঁছল, তখন পাণ্ডবরা ছদ্মবেশে দিন কাটাচ্ছেন। ব্রাহ্মণ সেজে থাকা পাঁচ ভাইয়ের কানে এল পাঞ্চাল রাজ্যে এক বিশাল স্বয়ংবরের আয়োজন হয়েছে। রাজা দ্রুপদের কন্যা দ্রৌপদী নিজে বেছে নেবেন তাঁর জীবনসঙ্গীকে। ভারতবর্ষের তাবড় তাবড় রাজপুত্র আর বীরেরা সেখানে ভিড় জমাচ্ছেন। কুন্তী লক্ষ্য করলেন তাঁর ছেলেদের। কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন ছিল না। তিনি দেখলেন অর্জুন-ভীমদের চোখে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা, এক অস্থিরতা। কতদিন পর এই চাউনি ফিরল! বনবাস, লাঞ্ছনা আর মৃত্যুর সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে ওরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। নিজেদের বীরত্বকে লুকিয়ে রেখে ব্রাহ্মণের মতন শান্ত জীবন যাপন করতে করতে মনের ভেতর যে ক্ষোভ জমা হয়েছিল, দ্রৌপদীর স্বয়ংবরের সংবাদে যেন তাতে একটা স্ফুলিঙ্গ পড়ল। কুন্তী বুঝলেন, কুঁড়েঘরের চার দেওয়ালে আর এদের আটকে রাখা যাবে না। তিনি শান্ত গলায় সিদ্ধান্ত নিলেন, "অনেক দিন তো এখানে থাকা হলো। একচক্রার মানুষরা আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, ভালোবাসা দিয়েছে। কিন্তু এবার যাওয়ার সময় হয়েছে। চলো, আমরা পাঞ্চালের দিকেই রওনা হই।" ভাইরা এক...

অগ্নিসম্ভবা দ্রৌপদী: অপমানের দহন থেকে কুরুক্ষেত্রের বীজবপন

Image
  অগ্নিসম্ভবা দ্রৌপদী: অপমানের দহন থেকে কুরুক্ষেত্রের বীজবপন বকাসুর বধের পর একচক্রা নগরীর সেই দিনগুলো ছিল শান্ত, যেন ঝড়ের আগের স্তব্ধতা। পাণ্ডবরা এখন ছদ্মবেশে, ব্রাহ্মণের সাজে। কুন্তী আর তাঁর পাঁচ পুত্র সেখানে বাস করছেন এক ব্রাহ্মণের আশ্রয়ে। তাঁদের দিন কাটে শাস্ত্রচর্চায় আর অরণ্যের নিভৃত শান্তিতে। কিন্তু নিয়তি যাঁদের জন্য কুরুক্ষেত্রের রণক্ষেত্র সাজিয়ে রেখেছে, তাঁদের কি আর নিস্তরঙ্গ জীবন মানায়? একদিন তাঁদের কুটিরে এলেন এক পরিব্রাজক ব্রাহ্মণ। আতিথেয়তায় কোনো ত্রুটি রাখলেন না কুন্তী। সামান্য অন্নেই তুষ্ট হলেন সেই অতিথি। সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে প্রদীপের ম্লান আলোয় বসে তিনি শোনাতে লাগলেন দেশ-বিদেশের বিচিত্র সব কাহিনী। কথা বলতে বলতে এক সময় প্রসঙ্গ এল পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কথা। উঠে এল যজ্ঞসেনী দ্রৌপদীর জন্মবৃত্তান্ত। ব্রাহ্মণ বলতে লাগলেন, "রাজা দ্রুপদ অপমানের এক তীব্র দহন বুকে নিয়ে বেঁচে ছিলেন। দ্রোণাচার্যের কাছে পরাজয় তিনি ভুলতে পারেননি। একদা সখা ছিলেন তাঁরা, কিন্তু ক্ষমতার দম্ভ তাঁদের শত্রু করে দিয়েছিল। দ্রুপদ চাইছিলেন এমন এক পুত্র, যে দ্রোণকে বধ করবে।" দ্রুপদ খুঁজে বেরিয়েছিলেন এমন...

একচক্রা ও বকাসুর দহন

Image
 একচক্রা ও বকাসুর দহন অন্ধকার অরণ্য আর অনিশ্চয়তার পথ পেরিয়ে কুন্তী ও তাঁর পাঁচ পুত্র এসে আশ্রয় নিয়েছেন একচক্রা নামের এক শান্ত জনপদে। পরিচয় গোপন রাখার দায় বড় দায়। তাই রাজকীয় তেজ লুকিয়ে পাণ্ডবরা এখন ছদ্মবেশী ব্রাহ্মণ। পরনে সাধারণ বাস, হাতে ভিক্ষাপাত্র।  একচক্রার কোনো এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের কুটিরে দিন কাটে তাঁদের। দিনের শেষে যা সামান্য ভিক্ষা জোটে, মা কুন্তীর হাতের ছোঁয়ায় তাই অমৃত হয়ে ওঠে পাঁচ ভাইয়ের পাতে। কিন্তু সেদিনের শান্ত দুপুরটা হঠাৎই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল এক বুকফাটা কান্নায়। সেদিন অর্জুন, যুধিষ্ঠিররা ঘরে ছিলেন না। দাওয়ায় একা বসে ছিলেন ভীম আর কুন্তী। হঠাৎ কুটিরের ভেতর থেকে ভেসে এল এক আর্তনাদ—সে কেবল সাধারণ দুঃখের বিলাপ নয়, এ যেন আসন্ন মৃত্যুর পদধ্বনি। গৃহস্বামী ব্রাহ্মণের ঘর থেকে উঠে আসছে এক হাহাকার। ভীম উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর বিশাল শরীরের পেশিগুলো একবার কেঁপে উঠল। মা-র দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন, “মা, এই বিপন্ন মানুষগুলোর আশ্রয়ে আমরা পরম নিশ্চিন্তে আছি। আজ যখন এঁদের ঘরে শোকের আগুন জ্বলছে, তখন আমাদের চুপ করে থাকাটা কি ধর্ম? তুমি একবার ভেতরে যাও না, দেখো তো কী হয়েছে।” কুন্তী ভেতর...

হিড়িম্বার গর্ভে ভীমের এক অদ্ভুত দর্শন পুত্রের জন্ম হলো— ঘটোত্কচ।

Image
  হিড়িম্বার গর্ভে ভীমের এক অদ্ভুত দর্শন পুত্রের জন্ম হলো— ঘটোত্কচ।  অরণ্যের সেই আদিম অন্ধকার আর বুনো তেজ যেন মিশে ছিল তার রক্তে, কিন্তু তার ধমনীতে বইছিল পাণ্ডব আভিজাত্যও। কিছুকাল পরে হিড়িম্বা বুঝলেন, পাণ্ডবদের যাত্রাপথ আর তার জীবন এক নয়। তিনি ভীমকে অরণ্যের মায়ায় বেঁধে রাখতে চাইলেন না, আবার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে নিজেও সঙ্গী হলেন না। শান্ত অথচ এক অবিচল মর্যাদার সাথে তিনি শিশুপুত্র ঘটোত্কচকে নিয়ে বনের গহীনে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। যাওয়ার আগে শুধু বলে গেলেন, "বিপদের মেঘ ঘনিয়ে এলে ডাক দিও, মা আর ছেলে দুজনেই তোমাদের পাশে এসে দাঁড়াব।" কিশোর ঘটোত্কচও মাথা নিচু করে সেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেল। তারপর শুরু হলো পাণ্ডবদের এক অন্যরকম পথচলা। রাজকীয় ঐশ্বর্য এখন এক ম্লান স্মৃতি। পাঁচ ভাই আর কুন্তীর পরনে এখন বল্কল আর মৃগচর্ম, মাথায় জটাজুট। গভীর অরণ্যের ফলমূল আর কন্দই তাঁদের আহার। কেউ দেখে বুঝবে না এঁরা হস্তিনাপুরের রাজকুমার। ছদ্মবেশে, বিনীত সন্ন্যাসীর মতো তাঁরা এক বন থেকে অন্য বনে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। এমনই একদিন পথে তাঁদের দেখা হলো মহর্ষি ব্যাসদেবের সঙ্গে। তাঁর শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ...

আগুন ও অরণ্য: পাণ্ডবদের পুনর্জন্ম

Image
  আগুন ও অরণ্য: পাণ্ডবদের পুনর্জন্ম পৃথিবী তখন জেনে গেছে তারা নেই। বারণাবতের জতুরগৃহের লেলিহান শিখা যখন শান্ত হয়ে এল, তখন সেই ভস্মস্তূপের আড়ালে জন্ম নিল এক অদ্ভুত স্বাধীনতা। মৃত মানুষের কোনো পিছুটান থাকে না, পাণ্ডবদেরও রইল না। ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগে, অরণ্যের বুক চিরে যখন পাঁচ ভাই আর কুন্তী নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের পরিচয় একটাই—তারা 'অফিসিয়ালি' মৃত। পেছনে পড়ে রইল ষড়যন্ত্রের ধোঁয়া, আর হস্তিনাপুরে বসে কেউ একজন হয়তো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল এই ভেবে যে, কণ্টক অবশেষে উপুড় হয়েছে। New s কিন্তু মৃতেরা হাঁটছিল। এবং তাদের হাঁটার গতি ছিল তীব্র। শোকের অভিনয় ও অন্তরের উল্লাস হস্তিনাপুরে খবরটা যখন পৌঁছাল, যেন স্থির জলে কেউ ভারী পাথর ছুঁড়ে দিল। রাজপ্রাসাদ থেকে নগরীর অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে পড়ল সেই হাহাকার। বারণাবতের সেই ধ্বংসস্তূপে পাওয়া গেছে ছয়টি দেহ—এক নারী ও পাঁচ পুরুষের। কৌরব শিবিরের কাছে অঙ্কটা জলের মতো পরিষ্কার। কুন্তী আর তার পাঁচ পুত্র আগুনে পুড়ে খাক হয়ে গেছেন। দুর্যোধন যখন খবরটা শুনলেন, তার চোখেমুখে তখন শোকের নিখুঁত মেকআপ। জনসমক্ষে তিনি বিলাপ করলেন, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। একজন দক্ষ অভ...

জতুরগৃহ: ছদ্মবেশী আতিথেয়তার আড়ালে

Image
  জতুরগৃহ: ছদ্মবেশী আতিথেয়তার আড়ালে এক ধরণের নিষ্ঠুরতা আছে যার গায়ে মাখা থাকে আতিথেয়তার চন্দন। সে হাসিমুখে দরজা খুলে দেয়, বিনীত হয়ে শোবার ঘরটা দেখিয়ে দেয়। তারপর যখন প্রদীপ নিভে আসে, চারদিক নিঝুম হয়ে যায়—তখন সে অন্ধকারের আড়ালে ওত পেতে বসে থাকে। হস্তিনাপুর থেকে পাণ্ডবদের বারণাবত নির্বাসনের সিদ্ধান্ত যখন পাকা হয়ে গেল, তখন দুর্যোধনের চোখে-মুখে ফুটে উঠল এক নিষ্ঠুর সঙ্কল্পের আভা। তিনি আর ধৈর্য ধরতে রাজি নন। দীর্ঘদিনের লালিত পরিকল্পনা এবার বাস্তবায়নের সময় এসেছে। আর দুর্যোধন কোনোদিন ভাগ্যের ওপর ভরসা করার লোক ছিলেন না; তিনি চেয়েছিলেন এমন এক চূড়ান্ত পরিণতি, যার পর আর কোনো প্রশ্ন অবশিষ্ট থাকে না। সেই নিভৃত কক্ষে ডাক পড়ল পুরোচনের। পুরোচন দুর্যোধনের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এক মন্ত্রী। তবে এই বিশ্বাস প্রজ্ঞা বা সততার জন্য নয়, বরং এক ধারালো অস্ত্রের ওপর মানুষের যেমন বিশ্বাস থাকে—তেমন। পুরোচন ছিল আজ্ঞাবহ, যান্ত্রিক এবং বিবেকহীন। দুর্যোধনের কাছে এই নির্লিপ্ততাই ছিল পুরোচনের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। পুরোচন যখন সামনে এসে দাঁড়াল, দুর্যোধন তাকে রাজকীয় গাম্ভীর্যে নয়, বরং এক অদ্ভুত অন্তরঙ্গতায় বরণ করে নিলেন। যেন এক...

নীল চোখের বিষ: বারণাবতের পথে পাণ্ডবগণ

Image
  নীল চোখের বিষ: বারণাবতের পথে পাণ্ডবগণ ঈর্ষা এক নিঃশব্দ বিষের মতো। সে কোনো ঘোষণা দিয়ে আসে না। বুকের অতল গভীরে সে থিতু হয়ে বসে থাকে, দিন দিন ভারী হতে থাকে, যতক্ষণ না সেই ভার মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। ধৃতরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র দুর্যোধনের বুকে সেই বিষ জমেছিল অনেক আগে থেকেই। শুরুটা হয়েছিল প্রশংসা থেকে—বা বলা ভালো, প্রশংসার সেই তিক্ত রেশটুকু থেকে। মল্লভূমিতে ভীমের সেই রুদ্রমূর্তি তিনি দেখেছেন; যখন ভীম প্রকৃতির এক অমোঘ শক্তির মতো প্রতিপক্ষকে ধুলোয় লুটিয়ে দিচ্ছে আর গ্যালারি ফেটে পড়ছে উল্লাসে। তিনি দেখেছেন অর্জুনকে; যাঁর ধনু থেকে শর নিক্ষেপের সেই অলৌকিক সাবলীলতা দেখে আচার্যদেরও বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে যেতে। হস্তিনাপুরের মানুষও দেখেছিল। আর তারা ভালোবেসে ফেলেছিল কুন্তীর পুত্রদের। দুর্যোধন ঠিক এইটুকুই সহ্য করতে পারছিলেন না। পাণ্ডবরা প্রতিভাবান—তাতে দুর্যোধনের কোনো সংশয় ছিল না। তিনি নিজে এবং তাঁর ভাইয়েরাও বীর। কিন্তু দুর্যোধনকে যা কুরে কুরে খেত, যা রাতের অন্ধকারে তাঁর ঘুম কেড়ে নিত, তা হলো হস্তিনাপুরের সাধারণ মানুষের এই অকুণ্ঠ ভালোবাসা। রাজপ্রাসাদের অলিন্দে অলিন্দে তিনি ফিসফাস শুনতেন—বিদ্...

কণিকের নীতি ও ধূর্ত শৃগালের উপাখ্যান: ক্ষমতার অন্ধকার খেলা

Image
  কণিকের নীতি ও ধূর্ত শৃগালের উপাখ্যান: ক্ষমতার অন্ধকার খেলা দ্রুপদ দমনের ঠিক এক বছর পরের কথা। হস্তিনাপুরের সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে যখন চাপা গুঞ্জন চারদিকে, ঠিক তখনই ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে যুবরাজ হিসেবে অভিষিক্ত করলেন। যুধিষ্ঠির—যার চরিত্রে ছিল অদ্ভুত এক স্থৈর্য। তিনি বিনীত, বুদ্ধিদীপ্ত এবং অজাতশত্রু। প্রজারা তাকে ভালোবেসে ফেলল নিজের পিতার চেয়েও বেশি। কিন্তু এই ভালোবাসাই যেন ধৃতরাষ্ট্রের মনে বিষাদ আর ঈর্ষার কালো মেঘ হয়ে ঘনিয়ে এল। পাণ্ডবরা তখন একেকজন অপরাজেয় বীর। ভীম বলরামের কাছে গদাযুদ্ধ আর রথচালনা শিখে ফিরেছেন মদমত্ত হাতির তেজ নিয়ে। অর্জুন হয়ে উঠেছেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ধনুর্ধর। একদিন দ্রোণাচার্য অর্জুনকে ডেকে বললেন, "বৎস, আমি ঋষি অগস্ত্যের শিষ্য অগ্নিবেশের কাছ থেকে ব্রহ্মশির অস্ত্র লাভ করেছিলাম। তা তোমাকে দিয়ে দিয়েছি । তবে মনে রেখো, গুরুর দক্ষিণাস্বরূপ আজ তোমাকে কথা দিতে হবে—প্রয়োজনে আমার বিরুদ্ধেও অস্ত্র ধরতে দ্বিধা করবে না।" অর্জুন বিনত মস্তকে গুরুর চরণ স্পর্শ করলেন। সহদেব বৃহস্পতির কাছে শিখলেন নীতিশাস্ত্র, আর নকুল হয়ে উঠলেন ক্ষিপ্র এক যোদ্ধা। এমনকি রাজা পাণ্ডুও যাকে পরাজ...

দ্রোণের প্রতিশোধ: পাঞ্চালরাজের দর্পচূর্ণ

Image
  দ্রোণের প্রতিশোধ: পাঞ্চালরাজের দর্পচূর্ণ শিক্ষাশেষ।  গুরুদক্ষিণা দেওয়ার লগ্ন সমাগত। পাণ্ডব ও কৌরব রাজপুত্ররা যখন করজোড়ে গুরুর সামনে দাঁড়ালেন, দ্রোণাচার্যের দুচোখে তখন বহু বছরের পুরনো এক অপমানের আগুন ধিকধিক করে জ্বলছে। তিনি কোনো সোনা-দানা বা মণিমাণিক্য চাইলেন না। খুব শান্ত গলায় শিষ্যদের বললেন, "আমার দক্ষিণার জন্য তোমাদের পাঞ্চাল আক্রমণ করতে হবে। পাঞ্চালরাজ দ্রুপদকে যুদ্ধে পরাজিত করে আমার পায়ের কাছে বন্দি করে নিয়ে এসো। সেটাই হবে আমার শ্রেষ্ঠ পাওনা।" দ্রোণাচার্যের এই আদেশ শোনামাত্র কৌরবরা উল্লাসে ফেটে পড়ল। দুর্যোধন, কর্ণ আর দুঃশাসনরা বুক চিতিয়ে আস্ফালন করতে লাগলেন যে, দ্রুপদকে বন্দি করা তাঁদের কাছে সামান্য খেলা মাত্র। পাণ্ডবরা কিন্তু চুপচাপ, তাঁদের চোখেমুখে কেবল যুদ্ধের প্রস্তুতির গাম্ভীর্য। এক বিশাল বাহিনী নিয়ে কৌরবরা পাঞ্চালের দিকে অগ্রসর হলো। রথের ঘর্ঘর আর হাতির বৃংহণে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল। পাঞ্চালের সীমানায় পৌঁছে অর্জুন তাঁর ভাইদের নিয়ে একটু দূরে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন। কৌরবদের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, "আপনারাই আগে যুদ্ধ শুরু করুন। আপনাদের শৌর্য দেখার অপেক্ষায় রইলাম।"...

রণাঙ্গনে রাজপুত্র ও এক অবজ্ঞাত বীর

Image
  রণাঙ্গনে রাজপুত্র ও এক অবজ্ঞাত বীর সূর্য তখন পূর্বাকাশে উদিয়মান। হস্তিনাপুরের বিশাল এক  রণপ্রাঙ্গণ আজ উৎসবের সাজে সেজেছে। চারিদিকে রঙিন পতপত করে উড়ছে ধ্বজা, মাচায় বসেছেন কুরুবংশের ছোট-বড় সবাই। অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের পাশে বসে বিদুর একে একে বর্ণনা করে চলেছেন মাঠের প্রতিটি দৃশ্য—কেমন করে রাজপুত্ররা কৃপাচার্য আর দ্রোণাচার্যের কাছে শিক্ষা শেষ করে আজ তাদের শৌর্য দেখাতে নেমেছে। কুন্তী আর গান্ধারী পাশাপাশি বসেছেন; কুন্তী নীচু স্বরে  চোখবাঁধা গান্ধারীকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন তাঁর সন্তানদের কৃতিত্ব। হস্তিনাপুরের সেই বিশাল প্রাঙ্গণ তখন এক মায়াবী রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দুপুরের রোদে ঝকমক করছে অস্ত্রশস্ত্র। চারিদিকে গ্যালারিভর্তি মানুষ, তাদের চোখের পলক পড়ছে না। ইতিহাস যেখানে রক্ত আর ঘামের গন্ধে কথা বলে, সেদিন হস্তিনাপুর ঠিক তেমনি এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিল। দ্রোণাচার্যের সঙ্কেত পেতেই একে একে রাজপুত্ররা প্রবেশ করলেন ময়দানে। প্রথমে ছোটখাটো নিপুণতা—ঘোড়সওয়ারি, লক্ষ্যভেদ, তারপর শুরু হলো তলোয়ারের ঝনঝনানি। নকুল আর সহদেব যখন তাঁদের বিদ্যুতের মতো দ্রুত তলোয়ার চালাতে শুরু করলেন, মনে হচ্ছিল যেন বাতাস...

অর্জুনের লক্ষ্যভেদ ও একলব্যের নিষ্ঠা: মহাভারতের এক অনন্য গুরু-শিষ্য আখ্যান

Image
 অর্জুনের লক্ষ্যভেদ ও একলব্যের নিষ্ঠা: মহাভারতের এক অনন্য গুরু-শিষ্য আখ্যান ভীষ্মের নির্দেশে যখন দ্রোণাচার্য হস্তিনাপুরে এসে পা রাখলেন, তখন কুরুকুলের ভাগ্যাকাশে এক নতুন সূর্যের উদয় হলো। রাজপুত্রদের অস্ত্রশিক্ষার গুরু হিসেবে তাঁর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে ভীষ্ম কোনো কার্পণ্য করেননি। আভিজাত্য আর শাস্ত্রীয় গাম্ভীর্যে দ্রোণের দিন কাটছিল শিষ্যদের মাঝখানে। একদিন আচার্য দ্রোণ তাঁর শিষ্যদের সামনে এক অদ্ভুত প্রস্তাব রাখলেন। তাঁর চোখেমুখে তখন গভীর কোনো গোপন সংকল্পের ছাপ। তিনি বললেন, "তোমাদের কাছে আমার একটা ব্যক্তিগত প্রার্থনা আছে। ভবিষ্যতে তোমাদের মধ্যে কেউ কি পারবে আমার সেই ইচ্ছা পূরণ করতে?" সভাকক্ষ নিস্তব্ধ। রাজপুত্ররা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। কিন্তু সেই স্তব্ধতা ভেঙে এগিয়ে এল কিশোর অর্জুন। কোনো দ্বিধা নেই, কোনো সংকোচ নেই। সে মাথা নিচু করে বলল, "আচার্য, আমি কথা দিচ্ছি। আপনার যেকোনো আদেশ আমি পালন করব।" দ্রোণ আবেগে আপ্লুত হলেন, পরম স্নেহে অর্জুনকে বুকে টেনে নিলেন। সেই মুহূর্তেই বোধহয় স্থির হয়ে গিয়েছিল যে, এই অর্জুনই হবে তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। এরপর শুরু হলো অলৌকিক দিব্যাস্ত্...

কৃপাচার্য, দ্রোণাচার্য, অশ্বথামার জন্ম এবং দ্রোণাচার্যের অন্তহীন অপমান :

Image
কৃপাচার্য,  দ্রোণাচার্য,  অশ্বথামার জন্ম এবং দ্রোণাচার্যের অন্তহীন অপমান :  মহর্ষি গৌতমের পুত্র শরদ্বান ছিলেন আর পাঁচটা ঋষিপুত্রের চেয়ে আলাদা। যখন অন্য বালকরা আশ্রমে প্রদীপের আলোয় ঝুকে পড়ে বেদপাঠ করত, শরদ্বান তখন বনের নির্জন অন্ধকারে ধনুর গুণ টানতেন। শাস্ত্রের মন্ত্রের চেয়ে তীরের শাঁ শাঁ শব্দই তাঁর কানে বেশি মধুর লাগত। যজ্ঞের আগুনের চেয়ে তাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল লক্ষ্যভেদ। কঠোর সাধনায় তিনি এমন সব মারণাস্ত্র আয়ত্ত করলেন যে স্বর্গের অধিপতি ইন্দ্রের সিংহাসন টলমল করে উঠল। ইন্দ্রের পুরনো অভ্যাস—কারও সাধনা বাড়লেই তাতে বিঘ্ন ঘটানো। আর সেই বিঘ্নের চিরকালীন নাম হলো নারী। ইন্দ্র পাঠালেন অপ্সরা জানপদীকে। শরদ্বান তখন গভীর ধ্যানে। হঠাৎ চোখের পাতা খুলতেই দেখলেন, অরণ্যের সবুজ ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে এক মায়াবী রূপসী। তাঁর আলুলায়িত কেশ আর কামুক দৃষ্টি শরদ্বানের আজীবনের সংযমের বাঁধে ফাটল ধরাল। শরদ্বান ঋষিপুত্র হলেও মানুষ তো বটেন! তাঁর শরীরের রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠল। তিনি লড়াই করেছিলেন নিজের মনের সঙ্গে, কিন্তু প্রকৃতির আদিম টানকে অস্বীকার করার সাধ্য কার? নিজের অজান্তেই তাঁর রেতস্খলন হলো। লজ্জা আর আত্মগ্ল...