Posts

৫৭তম বনপর্ব-কাম্যক বনে জয়দ্রথের স্পর্ধা ও এক চরম লাঞ্ছনার ইতিহাস-

Image
৫৭তম বনপর্ব-কাম্যক বনে জয়দ্রথের স্পর্ধা ও এক চরম লাঞ্ছনার ইতিহাস- সেদিন কাম্যক বনের নির্জনতা ছিল অন্যরকম। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর পাতার মর্মর শব্দের আড়ালে যে এমন একটা ঝড় লুকিয়ে ছিল, তা কে জানত! ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির তখন পুরোহিত ধৌম্যের নির্দেশে যজ্ঞ ও আশ্রমে আগত ব্রাহ্মণদের আহারের ব্যবস্থা করতে ভাইদের নিয়ে বনের গভীরে গিয়েছেন। কুটিরে যাজ্ঞসেনী দ্রৌপদী একেলা, সম্পূর্ণ অরক্ষিত। মহাকাব্যের এই সাময়িক নির্জনতাই যেন ডেকে আনল এক অমোঘ নিয়তি। ঠিক সেই সময়েই বনের বুক চিরে ধুলো উড়িয়ে এগিয়ে আসছিল এক বিশাল রাজকীয় বহর। সিন্ধু ও সৌবীর দেশের রাজা, বৃদ্ধক্ষত্রের পুত্র জয়দ্রথ চলেছেন শাল্বদেশের দিকে—উদ্দেশ্য আরেকটি বিবাহ। বহুমূল্য রাজসিক পোশাকে সজ্জিত অহংকারী জয়দ্রথ, সঙ্গে অগণিত রাজন্যবর্গ, হস্তী, অশ্ব আর চতুরঙ্গ সেনা। ঠিক এই পথ দিয়েই যাওয়ার সময়ে হঠাতই তাঁর রথ থমকে গেল আশ্রমের আঙিনায়। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন দ্রৌপদী। কদম্ব বৃক্ষের ডালটি ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কৃষ্ণাঙ্গী রূপসীর শরীর থেকে যেন এক দিব্য তেজ ঠিকরে পড়ছিল, বনের অন্ধকার কোণগুলোও যেন তাঁর দেহকান্তিতে আলোড়িত। জয়দ্রথের সঙ্গীরা সেই অলৌকিক রূপ দেখে চোখ ফেরাতে পা...

৫৬তম বনপর্ব-অক্ষয় পাত্রের মহিমা এবং দুর্বাসা ঋষির দর্পচূর্ণ-

Image
৫৬তম বনপর্ব-অক্ষয় পাত্রের মহিমা এবং দুর্বাসা ঋষির দর্পচূর্ণ- অরণ্যের আলো-ছায়ার খেলা তখন অন্যরকম। রাজপ্রাসাদের বিলাসিতা নেই ঠিকই, কিন্তু পাণ্ডবদের এই বনবাসকাল যেন এক তপোবনের শান্তি বয়ে এনেছিল। সুখে-দুঃখে, ভাইয়ে-ভাইয়ে নিবিড় বাঁধনে দ্রৌপদীকে নিয়ে তাঁরা এমন এক নিরাসক্ত আনন্দে দিন কাটাচ্ছিলেন, যা নগরের ঐশ্বর্যকেও হার মানায়। কিন্তু হস্তিনাপুরের প্রাসাদে বসে এই শান্তির খবর ধৃতরাষ্ট্র-নন্দন দুর্যোধনের বুকে শেলের মতো বিঁধছিল। পাণ্ডবরা বনে গিয়েও সুখে আছে? এই ঈর্ষা তাঁকে ঘুমোতে দেয় না। ছলনায় ও চাতুরীতে বিজ্ঞ কর্ণ আর দুঃশাসনকে পাশে বসিয়ে দুর্যোধন গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে লাগলেন। কীভাবে পাণ্ডবদের এই মানসিক শান্তি চূর্ণ-বিচূর্ণ করা যায়, সেটাই হয়ে উঠল তাঁদের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। দুর্যোধনের কুটকৌশল ও ঋষির বরদান ঠিক এমন সময় হস্তিনাপুরে পদার্পণ করলেন ত্রিলোকবিখ্যাত, পরম ক্রোধী মহর্ষি দুর্বাসা। দুর্যোধন চতুর, তিনি জানতেন এই ঋষির ক্রোধ যেমন প্রলয়ঙ্কর, তেমনি তাঁর তুষ্টি পরম ফলদায়ী। বিন্দুমাত্র আলস্য না করে, ভাইদের নিয়ে দুর্যোধন ঋষির পায়ের কাছে গিয়ে নত হলেন। দাসের মতো জোড়হাতে দিন-রাত...

৫৫তম বনপর্ব-অকিঞ্চন মুদগল ঋষির মোক্ষলাভ-

Image
  ৫৫তম বনপর্ব-অকিঞ্চন মুদগল ঋষির মোক্ষলাভ- এগারো বছর কেটে গেছে। এগারোটা বছর, যেন এগারোটা যুগ। বনের গহন স্তব্ধতার ভেতর দিয়ে সময় বয়ে যায় এক আশ্চর্য মন্থরতায়—গাছের পাতা ঝরে, আবার নতুন কুঁড়ি গজায়, কিন্তু পাণ্ডবদের ভেতরের সেই একটানা, প্রচ্ছন্ন কষ্টের অনুভূতিটা কিছুতেই মুছে যায় না। যাঁরা একদিন রাজপ্রাসাদের সুবর্ণছায়ায় সুখভোগের যোগ্য ছিলেন, আজ বনের ফলমূল আর বন্য লতাপাতা খেয়ে তাঁদের দিন কাটাতে হচ্ছে। তবু তাঁরা কেউ ভেঙে পড়েননি। মহাপুরুষদের এই এক লক্ষণ, তাঁরা জানতেন—এ কষ্টের একটা অদৃশ্য সময়সীমা আছে, এবং চরম ধৈর্য ধরে এই কালবেলা পার হয়ে যেতে হবে। যুধিষ্ঠিরের মনে অবশ্য একটা সূক্ষ্ম কাঁটা সবসময় বিঁধে থাকত। রাতে গভীর জঙ্গল যখন নিশুতি হয়ে যেত, ঘুম আসত না তাঁর। বিষণ্ণ মনে ভাবতেন—আমার জন্যই তো ভাইদের এই দুর্দশা। আমার সেই আত্মঘাতী পাশা খেলার অপরাধেই আজ ওরা বনে বনে ঘুরছে। এই অপরাধবোধ কিছুতেই তাঁকে শান্ত হতে দিত না। কিন্তু ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব, কিংবা দ্রৌপদী—কেউই যুধিষ্ঠিরের সামনে সেই দুঃখের ছায়া মুখে ফুটতে দিতেন না। ভেতরে ভেতরে রক্তক্ষরণ হলেও, বাইরে তাঁরা ছিলেন হ্রদের মতো স্থির, শ...

৫৪তম বনপর্ব-অপমানের ছাই থেকে রাজসূয়ের দর্প: কর্ণের দিগ্বিজয় ও বৈষ্ণব যজ্ঞের আখ্যান

Image
৫৪তম বনপর্ব-অপমানের ছাই থেকে রাজসূয়ের দর্প: কর্ণের দিগ্বিজয় ও বৈষ্ণব যজ্ঞের আখ্যান দ্বৈতবনের সেই চরম অপমানের গ্লানি তখনও কুরুরাজের কপালে স্বেদবিন্দুর মতো জমে আছে। গন্ধর্বদের হাতে বন্দী হয়ে শেষে কি না চিরশত্রু পাণ্ডবদের দয়ায় মুক্তি পেতে হলো! হস্তিনাপুরে যখন দুর্যোধন ফিরলেন, তাঁর মেরুদণ্ড সোজা ছিল না, চোখের কোণে ছিল তীব্র দাহ। এই চরম লজ্জার মুহূর্তে বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম তাঁকে ডেকে পাঠালেন। কুরুপ্রবীণের বিশাল কক্ষে সেদিন আলো ছিল কম, কিন্তু তাঁর কণ্ঠে মিশে ছিল এক মহাসমুদ্রের মতো ক্ষোভ আর করুণা। ভীষ্ম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "বৎস দুর্যোধন, তোমরা যখন দ্বৈতবনে যাওয়ার জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলে, আমি তখনই বারণ করেছিলাম। আমার মন সায় দেয়নি। কিন্তু তুমি তখন অন্ধ, আমার কথায় কর্ণপাত করোনি। তার ফল কী হলো? শত্রুর হাতে খড়কুটোর মতো বন্দী হতে হলো তোমাকে, আর সেই পরম ধার্মিক পাণ্ডবরাই দয়া করে তোমাকে মুক্ত করল! কুলের পক্ষে এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কী হতে পারে? সেদিন তো তোমার মহাপরাক্রমশালী সৈন্যদল, এমনকি তোমার ওই পরম সখা সূতপুত্র কর্ণও রণক্ষেত্র ছেড়ে কাপুরুষের মতো পালিয়ে গিয়েছিল। মহাত্মা পাণ্ডবদের প্রকৃত...

৫৩তম বনপর্ব-লজ্জার চোরাবালিতে দুর্যোধন: প্রায়োপবেশন থেকে মহাযুদ্ধের মন্ত্র

Image
৫৩তম বনপর্ব-লজ্জার চোরাবালিতে দুর্যোধন: প্রায়োপবেশন থেকে মহাযুদ্ধের মন্ত্র দ্বৈতবনের সেই ধূসর প্রান্তর থেকে যখন পাণ্ডবজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠির বিদায় নিলেন, দুর্যোধনের ওষ্ঠাধর তখন থরথর করে কাঁপছে। একটি বাক্যও সরল না তাঁর মুখ থেকে। লজ্জা? না, লজ্জার চেয়েও এক ভয়ংকর আত্মগ্লানি এবং অপমানের কালো চাদর যেন জড়িয়ে ধরেছে তাঁর কুরুবংশের শ্রেষ্ঠ অহংকারকে। হস্তিনাপুরের দিকে যখন তাঁর চতুরঙ্গ সেনা যাত্রা শুরু করল, তখন মনে হচ্ছিল কোনো বিজয়ী সম্রাট নন, এক জীবন্ত শবদেহ নিজের ছায়ার পিছু পিছু হেঁটে চলেছে। পথের পাশে এক নিভৃত, শ্যামল সরোবর। ক্লান্ত সৈন্যদল সেখানে বিশ্রামের জন্য থামল। বাতাসের দোলায় সরোবরের জল কাঁপছিল। সেই চঞ্চল জলের দিকে তাকিয়ে দুর্যোধন যেন নিজের ভেতরের খণ্ড-বিখণ্ড, অস্থির আত্মাটাকেই দেখতে পাচ্ছিলেন।ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়ালেন অঙ্গরাজ কর্ণ। তাঁর মুখে সান্ত্বনার, কিছুটা স্বস্তির হাসি। “রাজন! সৌভাগ্য যে আপনি অক্ষত শরীরে ফিরে এসেছেন। গন্ধর্বদের ওই মায়াযুদ্ধের চক্রে আমি এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছিলাম, সৈন্যদের সামলানো অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। বাধ্য হয়েই পিছু হটতে হয়েছিল। কিন্তু আপনি যে সপরিবারে এই বিপদ থেকে মুক্ত...

৫২তম বনপর্ব-গন্ধর্বের মার: দ্বৈতবনে দুর্যোধনের দর্পচূর্ণ

Image
  ৫২তম বনপর্ব-গন্ধর্বের মার: দ্বৈতবনে দুর্যোধনের দর্পচূর্ণ সে এক আশ্চর্য বিষণ্ণ দুপুর। দ্বৈতবনের শান্ত সরোবরের তীরে কুটির বেঁধে দিন কাটছিল পাণ্ডবদের। রোদ, ঝড়, বৃষ্টির ঝাপটায় শরীরগুলো শীর্ণ, কিন্তু ভেতরের তেজ নেভেনি। এমন সময় হস্তিনাপুর থেকে খবর এল—পাণ্ডবদের এই বনবাসের কষ্ট চাক্ষুষ করে নিজেদের চোখ জুড়োতে আসছে কৌরব বাহিনী। উদ্দেশ্য একটাই, গোধন গণনার ছল করে পাণ্ডবদের দীনতা দেখে বুক ফুলিয়ে হাসা, আর বল্কলধারিণী দ্রৌপদীকে রত্নালঙ্কারে সেজে ব্যঙ্গ করা। বৃদ্ধ ধৃতরাষ্ট্র বারণ করেছিলেন, কিন্তু কর্ণের উস্কানি আর শকুনির কুটিল হাসির কাছে হার মেনেছিল তাঁর পিতৃস্নেহ। হস্তিনাপুর থেকে বেরোল অক্ষৌহিণী সেনা। আট হাজার রথ, ত্রিশ হাজার হাতি, আর হাজার হাজার পদাতিকের দাপটে কেঁপে উঠল বনের মাটি। অহংকারের পারদ তখন সপ্তমে। দ্বৈতবনে পৌঁছেই দুর্যোধন আদেশ দিলেন সরোবরের তীরে এক বিলাসবহুল প্রমোদকানন বা ক্রীড়াভবন তৈরি করতে। কিন্তু নিয়তির খেলা অন্যরকম ছিল। কৌরব সেনারা জানত না, সেই সরোবরে তখন স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রের নির্দেশে জলবিহার করছিলেন গন্ধর্বরাজ চিত্রসেন। দুর্যোধনের উদ্ধত অনুচরেরা গন্ধর্বদের এলাকা খালি করার হুক...

৫১তম বনপর্ব-অরণ্যের দুই নারী: মন্ত্র নয়, সেবারই এক গোপন উপাখ্যান

Image
৫১তম বনপর্ব-অরণ্যের দুই নারী: মন্ত্র নয়, সেবারই এক গোপন উপাখ্যান বনের ছায়া তখন দীর্ঘ হয়ে আসছিল। ঠিক যেমন করে অপস্রিয়মাণ বিকেলের আলো কোনো প্রাচীন লিপির ওপর এসে পড়ে। আশ্রমের সামনের রুক্ষ, ধূসর চত্বরটায় পাণ্ডবেরা বসেছিলেন ব্রাহ্মণদের মুখোমুখি। কারও আঙুলে কুশের ঘ্রাণ, কারও ওষ্ঠে প্রচ্ছন্ন বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ। কিন্তু সেই স্তব্ধ, নিভৃত সন্ধ্যার আলোয় একটু দূরে সরে বসেছিলেন দুই নারী—দ্রৌপদী আর সত্যভামা। বহু কাল পর দেখা। কুরুকুল আর যদুকুলের ভাঙা-গড়ার কত যে গল্প, কত অলিখিত আত্মীয়তার সুতো, একে একে সব জোড়া লাগছিল স্মৃতির সরণি বেয়ে। হঠাৎই সত্যভামা একটু ঝুঁকে এলেন। গলাটা নামিয়ে আনলেন ফিসফিসে স্বরে, যেমন করে গোপন কৌতুহলে বান্ধবীরা পরস্পরের চোখের দিকে তাকায়। “ভগ্নী কৃষ্ণা, একটা কথা বলবে? তোমার স্বামীরা প্রত্যেকে লোকপালের মতো তেজস্বী, অথচ কখনো তোমার প্রতি তাঁদের রুষ্ট হতে দেখি না। কী আশ্চর্য এক জাদু তোমার! কোনো ব্রত, কোনো গোপন ওষধি বা বশীকরণ মন্ত্র জানা আছে কি, যা দিয়ে পুরুষের এই উদ্ধত মনকে এমন দাস বানিয়ে রাখা যায়? আমাকেও শিখিয়ে দাও না বোন, যাতে আমার শ্যামসুন্দরও চিরকাল আমারই অনুগত থাকেন।” দ্রৌপদীর ...