Posts

২৬তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কুরুসভায় কৃষ্ণ: রাজনীতির ফাঁসে বাঁধা শান্তির শেষ দান

Image
২৬তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কুরুসভায় কৃষ্ণ: রাজনীতির ফাঁসে বাঁধা শান্তির শেষ দান উপপ্লব্য নগরে তখন দ্বিধার কুয়াশা। কৌরবদের সাথে তেরো বছরের নির্বাসন ও অজ্ঞাতবাস পর্ব শেষ হয়েছে, কিন্তু পাণ্ডবশিবিরে যুদ্ধ আর শান্তির দোলাচল মেটেনি। রাজসূয় যজ্ঞের দীপ্তি আর দ্যূতসভার অপমান—দুই স্মৃতির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে অর্জুন, ভীম, নকুল, সহদেবরা। সবার নজর এক পুরুষের ওপর—কৃষ্ণ। তিনি হস্তিনাপুরে যাচ্ছেন কৌরবদের সভায় শেষ প্রস্তাব নিয়ে। ভীম, যাঁর নাম শুনলেই এককালে রথ-গজা-পদাতিক কাঁপত, তিনি আজ যেন এক অভাবনীয় নম্রতায় স্থির। কৃষ্ণকে কাছে ডেকে বললেন, "মধুসূদন, কৌরবদের কাছে মৃদুভাষে কথা বোলো। দুর্যোধন পরম অধৈর্য, অদূরদর্শী আর হিংসুটে। ওর ক্রোধ এক দাবানল, যা আঠারো রাজার মতো গোটা ভরতবংশকে ভস্ম করে দেবে। অনর্থক রক্তের প্রয়োজন নেই। আমরা ওর বশ্যতা মেনে নিয়ে হলেও বংশরক্ষা করতে রাজি।" কৃষ্ণের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চতুর, রহস্যময় হাসি। ভীমের এই রূপ তিনি আগে দেখেননি। ভীমকে তাতাতে মৃদু হেসে বললেন, "বৃকোদর! তোমার মুখে এমন কাপুরুষের মতো বাণী? যুদ্ধক্ষেত্রে গদা উঁচিয়ে দুর্যোধনকে বধের যে শপথ তুলেছিলে...

২৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-শান্তির শেষ প্রস্তাব ও আসন্ন মহাযুদ্ধের বার্তা

Image
২৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-শান্তির শেষ প্রস্তাব ও আসন্ন মহাযুদ্ধের বার্তা উপস্থিত রাজাদের সভার গোলমাল তখন স্তব্ধ হয়ে এসেছে। নিষ্ক্রান্ত হওয়ার পর ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে চেয়ে রইলেন যাদবশ্রেষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণের দিকে। বড় ক্লান্ত তাঁর কণ্ঠস্বর, কিন্তু সেখানে এক অদ্ভুত নির্ভরতা। তিনি বললেন, "মিত্রবৎসল শ্রীকৃষ্ণ! এই ঘোর সংকটসময়ে তুমি ছাড়া এমন আর কে আছে, যে আমাদের রক্ষা করতে পারে? তোমার উপস্থিতিতেই আমি নির্ভীক, তাই তো আজও দুর্যোধনের কাছে নিজের ন্যায্য অধিকার দাবি করার সাহস পাই।"   বাসুদেব হাসলেন। সে হাসিতে যেমন গভীর প্রজ্ঞা, তেমনই অগাধ স্নেহ। বললেন, "রাজন, আমি তো সর্বদা আপনার সেবায় প্রস্তুত। কী বলতে চান, নির্দ্বিধায় বলুন। আপনার ইচ্ছা পূরণ করাই আমার ধর্ম।" যুধিষ্ঠির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "ধৃতরাষ্ট্র আর তাঁর পুত্রদের মনোভাব তো সঞ্জয়ের মুখে শুনলেই। দূত কেবল প্রভুর বার্তা বহন করে, তার নিজের তো কোনো স্বর নেই। জনার্দন, বৃদ্ধ রাজার লোভ অপরিসীম। তিনি কৌরব আর পাণ্ডবদের সমচোখে দেখতে পারলেন না। বারো বছর বনবাস আর এক বছরের অজ্ঞাতবাসের চরম কায়িক ও মানসিক কষ্ট আমরা তো এই...

২৪তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অন্ধকারের শেষ সীমানায়: কৌরব সভার রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত

Image
২৪তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অন্ধকারের শেষ সীমানায়: কৌরব সভার রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত ধৃতরাষ্ট্রের আকুল প্রশ্নের মুখে সঞ্জয় আর কোনো আড়াল রাখলেন না। সভাঘরের থমথমে বাতাসে অর্জুনের শেষ বার্তাটা যেন ছারখার করে দিল সব অনিশ্চয়তা। সোজা হিসাব—যুধিষ্ঠির তাঁর ন্যায্য অধিকারটুকু চান। তা না পেলে, রক্তস্রোতে ভেসে যাবে হস্তিনাপুরের ঘোড়া, হাতি, আর ধৃতরাষ্ট্রের আত্মম্ভরী ছেলেরা। কিন্তু দুর্যোধন? তাঁর মুখে তখনও সেই এক চিলতে ঔদ্ধত্যের হাসি। কোনো কথায় পাত্তাই দিলেন না। চারপাশটা যেন হঠাৎ বরফের মতো জমে গেল। ধৃতরাষ্ট্রের ভেতরে তখন মারাত্মক অস্থিরতা। ক্ষমতার দড়ি টানাটানিতে কে ভারী, সঞ্জয়ের কাছে তা জানতে চাইলেন। সঞ্জয় চালাক লোক, কোনো গোপন কথা একলা রাজাকে বলে বিপদে পড়তে চাননি। ডাক পড়ল ব্যাসদেব, গান্ধারী আর বিদুরের। ব্যাসদেবের সংকেত পেয়ে সঞ্জয় খোলস ছেড়ে বের করে আনলেন আসল সত্যটা। কৃষ্ণ কেবল পাণ্ডবদের পক্ষে থাকা কোনো কূটনীতিবিদ বা চতুর সারথি নন; তিনি স্বয়ং কালপুরুষ। নরকাসুর, কংস কিংবা শিশুপাল—যাঁদের নাম শুনে তামাম ভারতবর্ষ কাঁপত, কৃষ্ণ তাঁদের খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়েছেন। যদি এক পাল্লায় পুরো বিশ্বব্র...

২৩তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অহংকারের রাজসভা ও আসন্ন বিনাশের ছায়া

Image
২৩তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অহংকারের রাজসভা ও আসন্ন বিনাশের ছায়া কৌরব রাজসভায় উত্তেজনার পারদ তখন চরম শিখরে। যুদ্ধের দামামা বাজছে, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই রাজসভায় শুরু হলো অহংকার, অপমান আর দূরদর্শিতার এক তীব্র সংঘাত। দুর্যোধনের মনে জয়ের উন্মাদনা জাগিয়ে তুলতে কর্ণ দম্ভভরে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, "রাজা, গুরু পরশুরামের দেওয়া ব্রহ্মাস্ত্র এখনো আমার কাছে অক্ষত। অর্জুনকে পরাস্ত করা আমার বাঁ হাতের খেল। শুধু অর্জুন নয়, পাঞ্চাল, করুষ, মৎস্যরাজ আর পাণ্ডবদের বংশকে একাই শেষ করব আমি। পিতামহ ভীষ্ম কিংবা দ্রোণাচার্যের যুদ্ধে নামারই দরকার নেই। আমার বাহিনী নিয়েই আমি পাণ্ডবদের ধূলিসাৎ করে দেব!" কথাগুলো শুনে বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্মের মুখে ফুটে উঠল তিতা হাসি। তিনি রুক্ষ কণ্ঠে বললেন, "কর্ণ, তোমার বুদ্ধিতে বোধহয় কাল সাপের মতো ছোবল মেরেছে! তুমি কৌরবদের আগেই মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়বে, নিজের চামড়া বাঁচানোর চিন্তা করো আগে! খাণ্ডবদাহনের কথা ভুলে গেলে? শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের যে শক্তি বাণাসুর আর ভৌমাসুরকে ধ্বংস করেছিল, সেই শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে তোমার মতো বীরেরা তাসের ঘরের মতো উড়ে যাবে।" প্রবীণ ...

২২তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অহঙ্কারের অন্ধকার ও রক্তচক্ষু: কুরুক্ষেত্রের প্রাক্কালে দুর্যোধনের হুঙ্কার

Image
২২তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অহঙ্কারের অন্ধকার ও রক্তচক্ষু: কুরুক্ষেত্রের প্রাক্কালে দুর্যোধনের হুঙ্কার ​ধৃতরাষ্ট্রের ঘরের আবহাওয়া ভারী হয়ে উঠেছিল এক অজানা আশঙ্কায়। অন্ধ রাজার চোখ দুটি নিষ্ফল হলেও তাঁর বুকের ভেতরটা থরথর করে কাঁপছিল। কুরুকুলের ভবিতব্য কোন গভীর গিরিখাতে তলিয়ে যেতে বসেছে, তা অনুমিত হলেও তা অস্বীকার করার আকুল চেষ্টা করছিলেন তিনি। ঠিক তখনই ঘরের নীরবতা খানখান করে ভেতরে প্রবেশ করলেন যুবরাজ দুর্যোধন। চোখে তাঁর দ্বিধাহীন ক্রোধ, মুখে অহঙ্কারের এক উদ্ধত হাসি। ​পিতার বিহ্বলতা দেখে দর্পভরে হেসে উঠলেন দুর্যোধন— "মহারাজ! ভয় পাবেন না। মিথ্যে চিন্তা করে নিজেকে কেন ক্ষয় করছেন? আমাদের জন্য একটুও ভাববেন না। আমরা দুর্বল নই, শত্রুকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তি আমাদের রক্তে এখনও বইছে।" ​দুর্যোধন ঘরময় পায়চারি করতে করতে বলতে লাগলেন, "ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে যখন পাণ্ডবরা বনে গেল, আর সেখানে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বিশাল বাহিনী নিয়ে হাজির হলেন— কেকয়রাজ, ধৃষ্টকেতু, ধৃষ্টদ্যুম্ন সব মহারথীরা একজোট হয়ে আপনাকে আর কৌরবদের অশেষ নিন্দা-গালাগাল দিলেন। আত্মীয়দের ধ্বংস করে রাজ্য ফ...

২১তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কুরুক্ষেত্রের ছায়া ও অন্ধ রাজার হাহাকার

Image
২১তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কুরুক্ষেত্রের ছায়া ও অন্ধ রাজার হাহাকার ​ধৃতরাষ্ট্রের দুই চোখের অন্ধকার যেন আজ আরও ঘন হয়ে এসেছে। সঞ্জয়ের মুখে পাণ্ডবশিবিরের প্রস্তুতির বিবরণ শুনতে শুনতে বৃদ্ধ রাজার বুক কেঁপে ওঠে এক অজানা আশঙ্কায়। ​সঞ্জয়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে ভগ্নকণ্ঠে ধৃতরাষ্ট্র বললেন— "সঞ্জয়, তুমি যাদের কথা বললে, তারা প্রত্যেকেই এক-একজন দিগ্বিজয়ী বীর। কিন্তু সেই বিশাল তালিকার একপাশে সবাইকে রাখো, আর অন্যপাশে একক ভীমকে বসাও। বনের হিংস্র জীবেরা যেমন সিংহকে দেখে ভয়ে থরথর করে কাঁপে, রাতভর এই ভীমের কথা ভেবে আমারও চোখের পাতা এক হয় না। কৌরবদের প্রতি তার ঘৃণা অপরসীম, প্রতিশোধের আগুন তার চোখে জ্বলছে। সে মহা শক্তিশালী, একরোখা আর উন্মত্ত। যুদ্ধক্ষেত্রে নামলে সে যে আমার দুর্বল পুত্রদের কচুকাটা করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ছেলেবেলায় যখন ও আমার ছেলেদের সঙ্গে সাধারণ খেলাধুলো করত, তখনই ওদের হাতির মতো পিষে মারত। আর আজ যখন ও হাতে গদা তুলে নিয়ে রণক্ষেত্রে তাণ্ডব নাচ নাচবে, তখন রথ, হাতি, ঘোড়া আর মানুষের মাংসখণ্ড বাতাসে উড়বে। মগধের রাজচক্রবর্তী জরাসন্ধকে মনে আছে তো? কৃষ্ণকে সঙ্গে নিয়ে তার রাজপ্রাসাদে ঢুকে ভীম ...

২০তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-মহাভারতের মহাআখ্যান: কৌরব সভায় ভীষ্মের হুঙ্কার ও সঞ্জয়ের যুদ্ধবার্তা!

Image
২০তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-মহাভারতের মহাআখ্যান: কৌরব সভায় ভীষ্মের হুঙ্কার ও সঞ্জয়ের যুদ্ধবার্তা! কৌরব সভায় তখন থমথমে নিস্তব্ধতা। সঞ্জয়ের দীর্ঘ বিবরণ শেষ হতেই শান্তনুনন্দন ভীষ্ম সোজা দুর্যোধনের দিকে স্থির দৃষ্টি পাত করে উঠে দাঁড়ালেন। কঠোর কণ্ঠে বললেন— "দুর্যোধন, একটি অতি প্রাচীন সত্যের কথা শোনো। বহুকাল আগে দেবগুরু বৃহস্পতি, শুক্রাচার্য এবং দেবরাজ ইন্দ্রকে পরিবৃত্ত করে ব্রহ্মা যখন আসীন ছিলেন, ঠিক সেই সময় দুজন পরম তেজস্বী ঋষি নিজেদের অলৌকিক প্রভাবে সকলের চিত্ত ও জ্যোতি হরণ করে সেখান থেকে চলে যান। স্তব্ধ বৃহস্পতির প্রশ্নের উত্তরে ব্রহ্মা বলেছিলেন, এঁরা সাধারণ কোনো তাপস নন—স্বয়ং সনাতন নর ও নারায়ণ। জগতের কল্যাণ সাধনে এবং অসুর বিনাশে তাঁরা একই পরম সত্তার দুটি ভিন্ন রূপ ধরে অবতীর্ণ হয়েছেন। আজ সেই প্রাচীন নরই অর্জুন, আর নারায়ণ হলেন শ্রীকৃষ্ণ। যেদিন শঙ্খ-চক্র-গদা ধারণকারী কৃষ্ণের পাশে গাণ্ডীব হাতে অর্জুনকে একই রথে দেখতে পাবে, সেদিন আমার এই সতর্কবাণী তোমার মনে পড়বে। তুমি আজ সূতপুত্র কর্ণের দম্ভ, শকুনির কুটিল চক্রান্ত আর দুঃশাসনের মূঢ়তার ওপর ভরসা করে কৌরব বংশকে ঘোর বিনাশের মুখে ঠেলে দিচ্...