Posts

চরম মুহূর্ত: বিদুরের হস্তিনাপুর ত্যাগ

Image
 চতুর্থ ভাগ: বন পর্ব চরম মুহূর্ত: বিদুরের হস্তিনাপুর ত্যাগ কাম্যক বনের গহন অন্ধকারে তখন শান্ত হয়ে আসছে দিন। পাণ্ডবরা নির্বাসনের এক রুক্ষ, অপরিচিত জীবনের সাথে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। মাথার ওপর মহীরুহদের ডালপালা জড়িয়ে তৈরি হয়েছে এক নিচ্ছিদ্র ছাদ; রাজপ্রাসাদের সেই ঐশ্বর্য, কোলাহল, রাজকীয় সমারোহ এখন কেবলই ধূসর স্মৃতি। বর্তমান বলতে এখন শুধু গাছের মূল, বাকলের তৈরি বসন আর সূর্যদেবের দেওয়া সেই অলৌকিক তাম্রপাত্র। হারিয়ে যাওয়া সবকিছু ছাড়াই কীভাবে বেঁচে থাকা যায়, তারই এক কঠিন, মন্থর পাঠ নিচ্ছিলেন তাঁরা। পাণ্ডবরা যখন বনের আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন, হস্তিনাপুরের অন্দরমহলে তখন অন্য এক ঝড় ঘনীভূত হচ্ছিল। ধৃতরাষ্ট্র ভালো ছিলেন না। যেদিন পাণ্ডবরা তাঁর নগরী ছেড়ে চলে গেল, সেদিন থেকেই এক অদ্ভুত অস্থিরতা গ্রাস করেছে অন্ধ রাজাকে। নির্জন কক্ষে একা বসে তিনি বারবার ফিরে যাচ্ছিলেন সেই অভিশপ্ত দিনগুলোর স্মৃতিতে—সেই পাশা খেলা, প্রকাশ্য রাজসভা, দ্রৌপদীর আলুলায়িত কেশ, ভীমের ভয়ানক প্রতিজ্ঞা আর পাঁচ রাজপুত্রের বল্কল পরে হেঁটে যাওয়ার সময় গোটা নগরীর সেই বুকফাটা কান্না। তিনি নিজে এই সবকিছুর অনুমতি দিয়েছিলেন। ...

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি

Image
  মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি (Index of Brief Mahabharata) মহাভারতের আদি পর্বের  সংক্ষিপ্ত অংশ বিশেষ প্রথম ভাগ- দেবব্রতর মহান ত্যাগ ও ভীষ্মের জন্ম  দ্বিতীয় ভাগ- ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা এবং  কুরুবংশের উত্তরাধিকার তৃতীয় ভাগ- বিদুরের জন্ম  মহাভারতের আদিপর্বের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কাহিনী হলো মহাত্মা বিদুরের জন্মবৃত্তান্ত চতুর্থ ভাগ- কুরুবংশের নবজন্ম ও গান্ধারীর মহত্যাগ পঞ্চম ভাগ-কুন্তিভোজের রাজ্য, কুন্তীর কথা এবং পাণ্ডুর দিগ্বিজয় ষষ্ঠ ভাগ-সত্যবতী ও ব্যাসদেব সপ্তম ভাগ -পরাশর: মহাভারতের সেই নেপথ্য কারিগর অষ্টম ভাগ- কুরুবংশের সেই অভিশপ্ত জন্মলগ্ন প্রথমে কুরু বংশের জটিল রহস্যটা ছোট করে বুঝে নেওয়া যাক নবম ভাগ-রাজসুখ থেকে তপোবন রাজসুখ থেকে তপোবন: পাণ্ডুর নির্বাসন ও একটি অভিশপ্ত মুহূর্ত দশম ভাগ- পাণ্ডব-কথা: এক অলৌকিক জন্ম ও এক বসন্তের দীর্ঘশ্বাস -ব্যাসদেব যাকে কৌরব বংশের অন্য এক শাখা বলেছেন, সেই পাণ্ডবদের জন্মের ইতিহাসটা অদ্ভুত একাদশ ভাগ- কুন্তীর হস্তিনাপুর প্রর্তাপন -শতশৃঙ্গ পর্বতের নির্জন অরণ্যে তখন এক গভীর বিষণ্ণতা। রাজা পাণ্ডু আর নেই, নেই রূপসী মাদ্রীও।  দ্বাদশ ...

অক্ষয়পাত্রের উপাখ্যান -বনের প্রথম সকাল

Image
 ৩য় ভাগ- মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বন পর্ব: অক্ষয়পাত্রের উপাখ্যান -বনের প্রথম সকাল শৌনকের কথা শেষ হওয়ার পর বনের বাতাসে কিছুক্ষণ একটা নিটোল নিস্তব্ধতা জমে রইল। বনের পাতা চুইয়ে যে সকালের আলো নেমে আসছিল, তার দিকে তাকিয়ে যুধিষ্ঠির চুপ করে বসে রইলেন। কথাগুলো ভালো, গভীর। মানুষের চরম বিপদে মনের ভারসাম্য কীভাবে ধরে রাখতে হয়, শৌনক যেন তারই একটা সহজ পাঠ দিলেন। কিন্তু দর্শন দিয়ে তো আর রক্তমাংসের পেটের খিদে মেটানো যায় না! এই মুহূর্তে যুধিষ্ঠিরের সামনে যে সমস্যাটা পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে, তা অত্যন্ত বাস্তব, রুক্ষ। তাকে শুধু তত্ত্বকথা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যুধিষ্ঠির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন ধৌম্যর সন্ধানে। ধৌম্য পাণ্ডবদের কুলপুরোহিত। শুধু শাস্ত্রজ্ঞ নন, তাঁর চরিত্রের মধ্যে একটা আশ্চর্য স্থিরতা আছে। কোনো রাজকীয় জাঁকজমক নয়, তাঁর ভেতরের খাঁটি জ্ঞানই তাঁকে একটা নিজস্ব মর্যাদা দিয়েছে। যুধিষ্ঠির তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কোনো ভূমিকা করলেন না, কোনো রাজকীয় ভণিতার আশ্রয় নিলেন না। একেবারে সোজাসুজি, মনের ভেতরকার ক্ষতটা মেলে ধরলেন। "আচার্য," যুধিষ্ঠির বললেন, ...

অরণ্যবাস ও ব্রাহ্মণকূল: যুধিষ্ঠিরের প্রথম পরীক্ষা

Image
 ২য় ভাগ-  সংক্ষেপে মহাভারতের বনপর্বের অরণ্যবাস ও ব্রাহ্মণকূল: যুধিষ্ঠিরের প্রথম পরীক্ষা প্রমাণ নামের সেই বিশাল বটবৃক্ষের নিচে প্রথম রাতটা কেটে গেল অন্য সব অচেনা জায়গার প্রথম রাতের মতোই—মন্থর, বিনিদ্র এবং অরণ্যের নানাবিধ অদ্ভুত শব্দে আকুল। চারপাশের সেই গভীর জঙ্গল যেন এক নতুন ভাষায় কথা বলছিল, যা পান্ডবদের কেউই তখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। সকাল হতেই পাণ্ডবেরা শয্যাত্যাগ করলেন। স্নান, আহ্নিক, নিত্যপূজা—সবকিছুই সম্পন্ন করলেন চিরকালের সেই শান্ত শৃঙ্খলার সঙ্গে। পরিস্থিতি যতই বিপর্যস্ত হোক না কেন, মানুষের জীবনচর্যা তো এক দিনে বদলে যায় না। একজন মানুষ রাতারাতি তার রাজ্য হারাতে পারে, কিন্তু সে যদি যুধিষ্ঠির হয়, তবে তার সকালের প্রার্থনা কখনো বাদ পড়ে না। তারা যখন অরণ্যের আরো গভীরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখনই যুধিষ্ঠির পিছন ফিরে তাকালেন। দেখলেন, গত রাতের অন্ধকারে তাদের চারপাশ ঘিরে জড়ো হয়েছেন অসংখ্য ব্রাহ্মণ। বেদজ্ঞ পণ্ডিত, পুরোহিত ও তত্ত্বজ্ঞানী ঋষিকুল—যাঁরা সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় এসেছেন এবং তাঁদের চলে যাওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। যুধিষ্ঠির ক্ষণকাল তাঁদের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর,...

নির্বাসনের পথ: হস্তিনাপুর ত্যাগ

Image
নির্বাসনের পথ: হস্তিনাপুর ত্যাগ উত্তরমুখী পথ ধরে তাঁরা এগিয়ে চললেন। শকুনি অক্ষক্রীড়ার ছক কষেছিল, আর দুর্যোধন মেতেছিল সিংহাসনের অন্ধ কামনায়। সেই কপট পাশার দানে সর্বস্ব হারিয়ে—রাজ্য, ঐশ্বর্য, এমনকী নিজের আত্মমর্যাদাটুকুও খুইয়ে—পাঁচ পাণ্ডব ভাই আজ হস্তিনাপুরের রাজপথ দিয়ে হেঁটে বাইরে বেরিয়ে এলেন। পাশে দ্রৌপদী। সামনে আদিগন্ত বিস্তৃত এক অনিশ্চিত পথ। তাঁদের সঙ্গে কোনো রাজছত্র নেই, রাজকোষ নেই, নেই কোনো চতুরঙ্গ সেনা। আছে শুধু তাঁদের নিজেদের শরীর আর অন্তরের দহন। প্রাসাদ থেকে পা বাড়াতেই তাঁদের পিছনে এসে দাঁড়ালেন ইন্দ্রসেন—পাণ্ডবদের আজীবনের বিশ্বস্ত প্রধান অনুচর। সঙ্গে চব্বিশজন ভৃত্য, প্রত্যেকের সাথে তাঁদের স্ত্রীরা। এঁদের কাউকে ডেকে নিতে হয়নি, কোনো আদেশ বা অনুরোধের অপেক্ষা তাঁরা করেননি। রাজপরিবারের এই চরম বিপর্যয়ের দিনে তাঁরা নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছিলেন পলকের মধ্যে। যে পাণ্ডবেরা তাঁদের এতদিন আগলে রেখেছেন, তাঁদের এমন একাকী এই গভীর অরণ্যের দিকে চলে যেতে দিতে অন্তরে সায় দেয়নি এই সামান্য মানুষদের। এদিকে হস্তিনাপুরের অন্দরমহলে তখন এক থমথমে অন্ধকার। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আর বিষাদ মিলেমিশে বাতাস ভারী হয়ে উ...

অন্ধকারের হাহাকার: পাণ্ডবদের বনগমন ও ধৃতরাষ্ট্রের অনুতাপ

Image
অন্ধকারের হাহাকার: পাণ্ডবদের বনগমন ও ধৃতরাষ্ট্রের অনুতাপ এক সভাঘরের গুরুভার দরজা দুটো যখন রুদ্ধ হয়ে গেল, এবং ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল পাণ্ডবদের চলে যাওয়ার শেষ পদধ্বনি, তখন হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে এমন এক নিস্তব্ধতা নেমে এল যা অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্র এর আগে কখনও অনুভব করেননি। এ নিস্তব্ধতা কোনো শান্তির বার্তা বহন করে আনে না; এ এক অপরাধী মানুষের নিজের কৃতকর্মের মুখোমুখি একা বসে থাকার চরম যন্ত্রণা। ধৃতরাষ্ট্রের অঙ্গে কোনো বিশ্রাম নেই। আহারে তাঁর রুচি চলে গেছে, চোখে ঘুম নেই, নিজের শয়নকক্ষে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসতেও পারছেন না তিনি। তাঁর অবশ মগজের অন্ধ অলিন্দে বারবার ঘুরেফিরে ভেসে উঠছে একটিই দৃশ্য—রাজকীয় বৈভব ছেড়ে গাছের বাকল পরিহিত পাঁচ রাজপুত্র নিঃশব্দে হেঁটে চলে যাচ্ছে নগর ছেড়ে, আর তাদের পেছনে আলুলায়িত চুলে রোদন করতে করতে হেঁটে যাচ্ছে এক রমণী। এই সর্বনাশের অনুমতি তিনি নিজেই দিয়েছেন। নিজের অন্ধ স্নেহের কাছে সমর্পণ করেছেন সমস্ত বিবেক। আর এখন সেই পাপের গুরুভার তাঁর বুকের ওপর কোনো পাথরের মতো চেপে বসেছে। অসহ্য যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে তিনি বিদুরকে ডেকে পাঠালেন। বিদুর এলেন। যেমন তিনি বরাবর আসেন—শান্ত, আড়ম্ব...

দ্বিতীয় দ্যূতক্রীড়া: দ্বাদশ বর্ষের বনবাস

Image
  দ্বিতীয় দ্যূতক্রীড়া: দ্বাদশ বর্ষের বনবাস ইন্দ্রপ্রস্থের পথ ধরে রথ মাত্র কিছুটা পথ এগিয়েছিল, কিন্তু নিয়তি ততক্ষণে তার পাশা উল্টে দিয়েছে। হস্তিনাপুরের রাজসভায় দূর্যোধন নিজের চোখে দেখেছিলেন, পিতা ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবদের সমস্ত কিছু ফিরিয়ে দিলেন—রাজ্য, অস্ত্র, স্বাধীনতা, আর আত্মসম্মান। তিনি দেখেছিলেন, যুধিষ্ঠির কেমন পরম শ্রদ্ধায় ধৃতরাষ্ট্রের চরণে প্রণত হলেন। ভীমের সেই চওড়া পিঠখানি যখন সভার সিংহদুয়ার পেরিয়ে মিলিয়ে গেল, দূর্যোধনের বুকের ভেতরটা তখন ঈর্ষা আর তিক্ততায় কালো হয়ে উঠেছিল। দুঃশাসনই প্রথম ছুটে এল তাঁর কাছে। কৌরবদের সেই মেজভাইটি তখনও কাঁপছিল অপমানে। প্রকাশ্য রাজসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করতে গিয়ে সে ব্যর্থ হয়েছে—একটার পর একটা শাড়ি টেনে টেনে তার দু-হাত অসাড় হয়ে গিয়েছিল, অথচ দ্রৌপদীর বসনের স্তূপ কেবলই বাড়ছিল। ধুঁকতে ধুঁকতে সে যখন দূর্যোধনের সামনে এসে দাঁড়াল, তার চোখে ছিল এক আসন্ন বিপদের আতঙ্ক। তারা কী ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে, সেটা সে এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে। "দাদা," দুঃশাসন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে দ্যাখো আমরা কী করলাম। শিকার আমাদের হাতের মুঠোয় ছিল। রা...