Posts

১৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব

Image
১৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-গাণ্ডীবের গর্জন ও অর্জুনের হুঙ্কার: থমথমে কৌরবসভায় সঞ্জয়ের দুঃসংবাদ দুর্যোধনের রাজসভায় সেদিন কেমন একটা থমথমে ভাব। ধৃতরাষ্ট্র সারারাত সনৎসুজাত আর বিদুরের সঙ্গে গভীর তত্ত্বকথা বলে কাটিয়েছেন — চোখে দেখতে পান না ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতর একটা অজানা ভয় তাঁকে অস্থির করে রেখেছে। সকাল হতেই সভায় একে একে এসে বসলেন ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ, শল্য, কৃতবর্মা, জয়দ্রথ, অশ্বত্থামা, সোমদত্ত, বিদুর, যুযুৎসু — বড় বড় যোদ্ধা আর রাজারা। অন্যদিকে দুর্যোধন, দুঃশাসন, শকুনি, কর্ণ, দুর্মুখ আর বাকি কৌরব ভাইয়েরা নিজেদের দম্ভ নিয়ে বসে আছেন। সবাই তাকিয়ে আছেন দরজার দিকে — পাণ্ডবদের কাছ থেকে বার্তা নিয়ে সঞ্জয় ফিরছেন। সঞ্জয় রথ থেকে নেমে সভায় ঢুকে প্রণাম করে বললেন, "আমি পাণ্ডবদের শিবির থেকে আসছি। তাঁরা আপনাদের সবাইকে যথাযথ সম্মান জানিয়েছেন।" ধৃতরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "সঞ্জয়, বলো তো, অর্জুন ঠিক কী বলেছে?" সঞ্জয় তখন দুর্যোধনের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন — "রাজা, শ্রীকৃষ্ণের সামনে আর যুধিষ্ঠিরের অনুমতি নিয়ে অর্জুন যা বলেছেন, সেটা মন দিয়ে শুনুন...

১৮তমভাগ উদ্যোগপর্ব-)(সনৎসুজাতীয়- ষষ্ঠ অধ্যায়) পরমাত্মার স্বরূপ আর যোগীদের তাঁকে উপলব্ধি করা

Image
১৮তমভাগ উদ্যোগপর্ব-)(সনৎসুজাতীয়- ষষ্ঠ  অধ্যায়) পরমাত্মার স্বরূপ আর যোগীদের তাঁকে উপলব্ধি করা সনৎসুজাত বললেন — ব্রহ্ম হলেন শুদ্ধ, মহান, আলোয় ভরা, উজ্জ্বল, আর অসীম মহিমার অধিকারী। সব দেবতাই তাঁর আরাধনা করেন। তাঁরই আলোয় সূর্য আলোকিত হন। এই চিরন্তন ভগবানকেই যোগীরা উপলব্ধি করতে পারেন। শুদ্ধ, চেতনাময়, আনন্দময় সেই পরব্রহ্ম থেকেই হিরণ্যগর্ভের জন্ম, আর সেখান থেকেই সবকিছুর বিকাশ। সেই শুদ্ধ, আলোকময় ব্রহ্মই সূর্যসহ জগতের সব আলোর মধ্যে থেকে নিজেকে প্রকাশ করছেন। তিনি অন্য কারো আলোয় প্রকাশিত হন না, বরং নিজেই সবকিছুর আলোর উৎস। এই চিরন্তন ভগবানকেই যোগীরা উপলব্ধি করেন। পরমাত্মা থেকেই প্রকৃতির জন্ম, প্রকৃতি থেকে মহতত্ত্বের প্রকাশ, আর তার মধ্যেই আকাশে সূর্য আর চন্দ্র—এই দুই দেবতা অবস্থান করেন। জগৎ সৃষ্টিকারী ব্রহ্মের যে স্বপ্রকাশ রূপ, তা সর্বদা সজাগ থেকে এই দুই দেবতা, পৃথিবী আর আকাশকে ধরে রাখে। এই চিরন্তন ভগবানকেই যোগীরা উপলব্ধি করেন। এই দুই দেবতা, পৃথিবী, আকাশ, সব দিক আর সমস্ত বিশ্বকেই সেই শুদ্ধ ব্রহ্ম ধরে রাখেন। তাঁর থেকেই দিকগুলোর উৎপত্তি, তাঁর থেকেই নদী বয়ে চলে, তাঁর থেকেই বিশাল সমুদ্রের জ...

১৭তমভাগ উদ্যোগপর্ব-(সনৎসুজাতীয়- পঞ্চম অধ্যায়) অহংকার থেকে অমরত্ব: সনৎ সুজাতের সান্নিধ্যে জীবনের আসল সাধনা

Image
১৭তমভাগ উদ্যোগপর্ব-(সনৎসুজাতীয়- পঞ্চম  অধ্যায়) অহংকার থেকে অমরত্ব: সনৎ সুজাতের সান্নিধ্যে জীবনের আসল সাধনা সনৎ সুজাত বললেন, “রাজন, মানুষের জীবনে এমন কিছু দোষ আছে, যা ধীরে ধীরে তার পতন ডেকে আনে। শোক, ক্রোধ, লোভ, মোহ, কামনা, অহংকার, অতিরিক্ত ঘুম, ঈর্ষা, অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা, কাপুরুষতা, ভালো মানুষের মধ্যেও দোষ খোঁজা এবং অন্যের নিন্দা করা—এই বারোটি বড় দোষ মানুষের জীবনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। মানুষ যখন একের পর এক এসব দোষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, তখন তার বিচারবুদ্ধি নষ্ট হয় এবং সে অন্যায় কাজে জড়িয়ে পড়ে। যারা অতিরিক্ত লোভী, নিষ্ঠুর, কঠিন ভাষায় কথা বলে, কৃপণ, রাগী এবং সবসময় নিজের প্রশংসা করে—তারা সাধারণত নিষ্ঠুর কাজের দিকে ঝোঁকে। আবার যারা শুধু নিজের ভোগের কথা ভাবে, মানুষের সঙ্গে অন্যায় বা পক্ষপাতমূলক আচরণ করে, অতিরিক্ত অহংকারী, সামান্য দান করে তার অনেক প্রচার করে, কৃপণতা করে, নিজের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি শক্তি দেখায় এবং নারীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে—তাদেরও পাপী ও নিষ্ঠুর বলা হয়েছে। অন্যদিকে ধর্ম, সত্য, তপস্যা, ইন্দ্রিয় সংযম, ঈর্ষাহীনতা, লজ্জা, সহনশীলতা, অন্যের দোষ না দেখা, দান, শাস্ত্রজ্...

১৬তমভাগ উদ্যোগপর্ব -সনৎসুজাতীয়- চতুর্থ অধ্যায় ব্রহ্মচর্যের পথে অমরত্বের সন্ধান: সনৎসুজাত-ধৃতরাষ্ট্র সংবাদ,

Image
১৬তমভাগ উদ্যোগপর্ব -সনৎসুজাতীয়- চতুর্থ অধ্যায়  ব্রহ্মচর্যের পথে অমরত্বের সন্ধান: সনৎসুজাত-ধৃতরাষ্ট্র সংবাদ,  ধৃতরাষ্ট্র অধৈর্য হয়ে বলে উঠলেন, "হে মহামতি, ঈশ্বর আর এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের পরম সত্য নিয়ে আপনি যেসব গভীর কথা শোনালেন, সেখানে তো পার্থিব আনন্দ বা বিষয়বাসনার কোনো জায়গাই নেই! তবু আমার মনটা এখনো শান্ত হচ্ছে না। দয়া করে এই দুর্লভ তত্ত্বটা আরেকবার বুঝিয়ে বলুন আমাকে।" একটু হেসে জবাব দিলেন সনৎসুজাত, "রাজা, তুমি যখন আমাকে এই প্রশ্নগুলো করছ, তোমার ভেতরে একটা চাপা উত্তেজনা, একটা ব্যাকুলতা কাজ করছে বুঝতে পারি। মন যদি এমন চঞ্চল, উদ্বেলিত থাকে, তাহলে পরম সত্যের বা ব্রহ্মের অনুভূতি পাওয়া যায় না। বুদ্ধি দিয়ে যখন মনের সব চঞ্চলতাকে শান্ত করা যায়, মন যখন একদম নিশ্চল হয়ে যায়, তখনই আসল ব্রহ্মজ্ঞান জন্ম নেয়। আর সেখানে পৌঁছানোর একমাত্র পথ ব্রহ্মচর্য পালন করা।" হাত জোড় করে ধৃতরাষ্ট্র বললেন, "কিন্তু যা কোনো বস্তুগত কর্মের মধ্য দিয়ে শুরু হয় না, কর্মের শেষ ফল হিসেবেও যাকে ধরা যায় না—সেই সনাতন সত্য, যা কেবল আত্মার ভেতরে চিরকাল থেকে যায়—বলুন তো, সাধারণ মানুষ কি...

১৫তমভাগ উদ্যোগপর্ব-সনৎসুজাতীয়- তৃতীয় অধ্যায়মৌনের গভীরে যে পরমাত্মা: সনৎসুজাত-ধৃতরাষ্ট্র সংবাদ

Image
১৫তমভাগ উদ্যোগপর্ব-সনৎসুজাতীয়- তৃতীয় অধ্যায়-মৌনের গভীরে যে পরমাত্মা: সনৎসুজাত-ধৃতরাষ্ট্র সংবাদ ধৃতরাষ্ট্র প্রশ্ন করলেন, "হে বিদ্বান, মৌন বলতে ঠিক কী বোঝায় বলুন তো? শুধু চুপ করে থাকা, নাকি পরমাত্মার নিজস্ব রূপই আসল মৌন? এই মৌনভাবের গভীরে কী লুকিয়ে আছে, খুলে বলুন আমাকে। মানুষ কি মৌন ব্রত পালন করে সেই পরম মৌনস্বরূপকে ছুঁতে পারে? জগতে মানুষ এর চর্চা করে কীভাবে?" হেসে জবাব দিলেন সনৎসুজাত, "মহারাজ, মন আর বেদবাক্য যেখানে পৌঁছাতে পারে না, সেই অতল স্তব্ধতাই পরমাত্মা। তিনিই আসল মৌন। বৈদিক আর লৌকিক—সব শব্দই যাঁর থেকে জন্ম নেয়, সেই পরমেশ্বরে তন্ময় হয়ে ধ্যান করলেই তিনি অন্তরে জেগে ওঠেন।" মনে সংশয় জাগল ধৃতরাষ্ট্রের, "কিন্তু যে মানুষ ঋক, যজু বা সাম—সব বেদই জানে, তবু পাপে ডুবে থাকে, বেদ কি তাকে সেই পাপ থেকে মুক্ত করতে পারে না?" সনৎসুজাত বললেন, "বানিয়ে কিছু বলছি না, রাজা। বেদ কোনো পাপাচারী অজ্ঞকে তার নিজের কুকর্ম থেকে বাঁচাতে পারে না। যে মানুষ ধর্মের পোশাক পরে ভেতরে ছদ্মবেশ পুষে রাখে, তাকে বেদ উদ্ধার করে না। ডানায় শক্তি এলে পাখি যেমন অনায়াসে পুরনো বাসা ছেড়...

১৪তমভাগ উদ্যোগপর্ব-সনৎসুজাতীয়- দ্বিতীয় অধ্যায়-

Image
১৪তমভাগ উদ্যোগপর্ব-সনৎসুজাতীয়- দ্বিতীয় অধ্যায়-প্রমাদই মৃত্যু: অন্ধ নৃপতির সংশয় ও সনৎসুজাতের প্রজ্ঞা অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের মনটা তখন যেন একটা অস্থির নদী — কোথাও শান্তি নেই, কোথাও তল খুঁজে পাচ্ছেন না। বিদুর অনেক কথা বলে গেছেন, প্রজ্ঞার কথা, নীতির কথা, কিন্তু তারপরও রাজার বুকের ভেতর একটা তীব্র আকুলতা জেগে রইল — সেই চরম সত্যকে, সেই পরমাত্মাকে একবার নিজের চোখে দেখার আকুলতা। মনটাকে যতটা সম্ভব একমুখী করে, নিভৃতে বসে তিনি ডেকে পাঠালেন ঋষি সনৎসুজাতকে। বিনীত গলায় প্রশ্ন করলেন তাঁকে। "প্রভু সনৎসুজাত," ধৃতরাষ্ট্র বললেন, "একটা কথা শুনেছি আপনার মুখ থেকে — মৃত্যু বলে নাকি সত্যিই কিছু নেই। আবার এমনও শুনি যে দেবতা আর অসুরেরা মৃত্যুকে এড়াবার জন্যেই কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করেছিলেন। এই দুটো কথা তো একসঙ্গে মেলে না। কোনটা আসল সত্যি, আমাকে একটু বুঝিয়ে বলুন তো।" সনৎসুজাত শান্ত স্বরে বললেন, "রাজা, তোমার প্রশ্নের দুটো দিকই আসলে সত্যি। যারা অজ্ঞ, তারা মোহে পড়ে ভাবে মৃত্যুর একটা বাস্তব চেহারা আছে, আর সেই মৃত্যুকে কর্ম দিয়ে ঠেকানো যায়। আবার অন্যদিকে কেউ কেউ বলে, মৃত্যু বলে আদৌ কিছু নেই। আস...

১৩তমভাগ উদ্যোগপর্ব-সনৎসুজাতীয়-প্রথম অধ্যায়

Image
১৩তমভাগ উদ্যোগপর্ব-সনৎসুজাতীয়-প্রথম অধ্যায়-সনৎসুজাত ঋষির আগমন ধৃতরাষ্ট্র বললেন — বিদুর, তোমার বলার আর কিছু বাকি থাকলে বলো। শুনতে ইচ্ছে করছে খুব। তোমার বলার ধরনটাই যে অন্যরকম। বিদুর বললেন — ভরতবংশীয় মহারাজ, 'সনৎসুজাত' নামে সুবিখ্যাত এক ব্রহ্মাপুত্র আছেন, প্রাচীন সেই ঋষি। তিনি একবার বলেছিলেন, মৃত্যু বলে আসলে কিছু নেই। সব বুদ্ধিমানের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনার মনে যা কিছু প্রশ্ন উঠছে, প্রকাশ্যে হোক বা গোপনে — সবকিছুরই উত্তর দিতে পারবেন তিনি। ধৃতরাষ্ট্র বললেন — বিদুর, যে তত্ত্বকথা এখন এই সনাতন ঋষির মুখে শোনাতে চাইছ আমাকে, সেটা কি তুমি নিজে জানো না? তোমার নিজের বুদ্ধিতেই যদি কুলোয়, তুমিই বরং বলো আমাকে। বিদুর বললেন — মহারাজ, আমি জন্মেছি শূদ্রা নারীর গর্ভে, তাই এর বেশি উপদেশ দেওয়ার অধিকার আমার নেই। তবে কুমার সনৎসুজাতের বুদ্ধি সনাতন ব্রহ্মতত্ত্ব স্পর্শ করে, এটুকু আমি জানি। ব্রাহ্মণ বংশে যাঁদের জন্ম, তাঁরা এই গোপন তত্ত্ব প্রকাশ করলেও নিন্দার পাত্র হন না। তাই আপনাকে সনৎসুজাতের নামই বললাম। ধৃতরাষ্ট্র বললেন — বিদুর, সেই প্রাচীন সনাতন ঋষি এখন কোথায়, জানাও আমাকে। এখানে আসবেনই ব...