Posts

অর্জুনের লক্ষ্যভেদ ও একলব্যের নিষ্ঠা: মহাভারতের এক অনন্য গুরু-শিষ্য আখ্যান

Image
 অর্জুনের লক্ষ্যভেদ ও একলব্যের নিষ্ঠা: মহাভারতের এক অনন্য গুরু-শিষ্য আখ্যান ভীষ্মের নির্দেশে যখন দ্রোণাচার্য হস্তিনাপুরে এসে পা রাখলেন, তখন কুরুকুলের ভাগ্যাকাশে এক নতুন সূর্যের উদয় হলো। রাজপুত্রদের অস্ত্রশিক্ষার গুরু হিসেবে তাঁর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে ভীষ্ম কোনো কার্পণ্য করেননি। আভিজাত্য আর শাস্ত্রীয় গাম্ভীর্যে দ্রোণের দিন কাটছিল শিষ্যদের মাঝখানে। একদিন আচার্য দ্রোণ তাঁর শিষ্যদের সামনে এক অদ্ভুত প্রস্তাব রাখলেন। তাঁর চোখেমুখে তখন গভীর কোনো গোপন সংকল্পের ছাপ। তিনি বললেন, "তোমাদের কাছে আমার একটা ব্যক্তিগত প্রার্থনা আছে। ভবিষ্যতে তোমাদের মধ্যে কেউ কি পারবে আমার সেই ইচ্ছা পূরণ করতে?" সভাকক্ষ নিস্তব্ধ। রাজপুত্ররা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। কিন্তু সেই স্তব্ধতা ভেঙে এগিয়ে এল কিশোর অর্জুন। কোনো দ্বিধা নেই, কোনো সংকোচ নেই। সে মাথা নিচু করে বলল, "আচার্য, আমি কথা দিচ্ছি। আপনার যেকোনো আদেশ আমি পালন করব।" দ্রোণ আবেগে আপ্লুত হলেন, পরম স্নেহে অর্জুনকে বুকে টেনে নিলেন। সেই মুহূর্তেই বোধহয় স্থির হয়ে গিয়েছিল যে, এই অর্জুনই হবে তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। এরপর শুরু হলো অলৌকিক দিব্যাস্ত্...

কৃপাচার্য, দ্রোণাচার্য, অশ্বথামার জন্ম এবং দ্রোণাচার্যের অন্তহীন অপমান :

Image
কৃপাচার্য,  দ্রোণাচার্য,  অশ্বথামার জন্ম এবং দ্রোণাচার্যের অন্তহীন অপমান :  মহর্ষি গৌতমের পুত্র শরদ্বান ছিলেন আর পাঁচটা ঋষিপুত্রের চেয়ে আলাদা। যখন অন্য বালকরা আশ্রমে প্রদীপের আলোয় ঝুকে পড়ে বেদপাঠ করত, শরদ্বান তখন বনের নির্জন অন্ধকারে ধনুর গুণ টানতেন। শাস্ত্রের মন্ত্রের চেয়ে তীরের শাঁ শাঁ শব্দই তাঁর কানে বেশি মধুর লাগত। যজ্ঞের আগুনের চেয়ে তাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল লক্ষ্যভেদ। কঠোর সাধনায় তিনি এমন সব মারণাস্ত্র আয়ত্ত করলেন যে স্বর্গের অধিপতি ইন্দ্রের সিংহাসন টলমল করে উঠল। ইন্দ্রের পুরনো অভ্যাস—কারও সাধনা বাড়লেই তাতে বিঘ্ন ঘটানো। আর সেই বিঘ্নের চিরকালীন নাম হলো নারী। ইন্দ্র পাঠালেন অপ্সরা জানপদীকে। শরদ্বান তখন গভীর ধ্যানে। হঠাৎ চোখের পাতা খুলতেই দেখলেন, অরণ্যের সবুজ ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে এক মায়াবী রূপসী। তাঁর আলুলায়িত কেশ আর কামুক দৃষ্টি শরদ্বানের আজীবনের সংযমের বাঁধে ফাটল ধরাল। শরদ্বান ঋষিপুত্র হলেও মানুষ তো বটেন! তাঁর শরীরের রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠল। তিনি লড়াই করেছিলেন নিজের মনের সঙ্গে, কিন্তু প্রকৃতির আদিম টানকে অস্বীকার করার সাধ্য কার? নিজের অজান্তেই তাঁর রেতস্খলন হলো। লজ্জা আর আত্মগ্ল...

কালকূট ও কুণ্ডক রস: ভীমের নবজন্ম এবং দুর্যোধনের ষড়যন্ত্র

Image
কালকূট ও কুণ্ডক রস: ভীমের নবজন্ম এবং দুর্যোধনের  ষড়যন্ত্র হস্তিনাপুরের সেই বিশাল প্রাসাদের অলিন্দে যখন কুরু-পাণ্ডব ভাইরা একসঙ্গে বড় হচ্ছিল, বাইরে থেকে মনে হতো সবটাই বুঝি নিস্তরঙ্গ জলচ্ছবি। কিন্তু সেই আপাতশান্ত জলের নিচেই পাক খাচ্ছিল এক কালান্তক ঈর্ষার স্রোত। —মানুষের মনের গহিন কোণে যখন বিষ জন্মে, তখন তার নীল ছায়া এসে পড়ে চোখের মণি আর ঠোঁটের হাসিতেও। দুর্যোধনের চোখে সেই বিষ ছিল প্রথম থেকেই। ভীমকে সে সহ্য করতে পারত না। ভীম যেন এক অতিকায় মহীরুহ, যার ছায়ায় দুর্যোধন নিজেকে বড় বেশি বামন মনে করত। ভীমের অট্টহাসি, তার সীমাহীন ভোজনবিলাস, আর তার ওই অবলীলায় হাতিকে উপড়ে ফেলার মতো গায়ের জোর—দুর্যোধনের বুকের ভেতরটা খকখক করে জ্বলত। একদিন এই হিংসে রূপ নিল এক কুটিল ষড়যন্ত্রের। উদক-ক্রীড়ন ও বিষের পাত্র দুর্যোধন একদিন খুব বিনয়ী সেজে বড় ভাইয়ের মতো প্রস্তাব দিল, "চলো, গঙ্গার তীরে উদক-ক্রীড়নে যাই।" প্রমাণ করার চেষ্টা করল, সে বড় স্নেহশীল। গঙ্গার তীরে উদক-ক্রীড়ন বা জলক্রীড়ার আয়োজন হলো। তাঁবু পড়ল, এলাহি ভোজের ব্যবস্থা হলো। কিন্তু দুর্যোধন খুব চতুরভাবে কোনো মন্ত্রী বা বিদুরকে সেই উৎসবে ডাকল না। বড়দের ...

কুন্তী ও পাণ্ডবদের প্রত্যাবর্তন এবং সত্যবতীর মহাপ্রস্থান

Image
  কুন্তী ও পাণ্ডবদের প্রত্যাবর্তন এবং সত্যবতীর মহাপ্রস্থান হস্তিনাপুরের আকাশটা আজ বড় বেশি ফ্যাকাসে। মেঘ নেই, কিন্তু রোদের তেজও যেন কোনো এক বিষণ্ণ চাদরে ঢাকা। প্রাসাদের চত্বরে রথের চাকার ঘড়ঘড় শব্দটা যখন থামল, তখন বাতাস ভারী হয়ে এল এক আর্তনাদে। কুন্তী ফিরেছেন, কিন্তু তাঁর সেই চিরপরিচিত দৃপ্ত পদচারণা আজ পাথরচাপা কান্নায় স্তব্ধ। সঙ্গে পাঁচটি শিশু—পিতৃহীন পাঁচ পাণ্ডব। ধুলোমাখা মুখে তারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছে এই বিশাল পাথরের প্রাসাদকে, যা তাদের অধিকারের, অথচ আজ বড় অচেনা। অম্বালিকা বাতায়নের ধারে বসে ছিলেন। সংবাদটা যখন এল যে পাণ্ডু নেই, আর তাঁর প্রিয়তমা পত্নী মাদ্রীও আগুনের শিখায় নিজেকে সঁপে দিয়েছেন, তখন মুহূর্তের জন্য তাঁর হৃৎস্পন্দন থমকে গেল। শরীরটা তাঁর জন্ম থেকেই পাণ্ডুর ছিল, আজ যেন তা স্বচ্ছ পাথরের মতো সাদা হয়ে গেল। পুত্রশোকের এই দহন রাজকীয় বসনের চেয়েও অনেক বেশি ভারী, অনেক বেশি নিষ্ঠুর। পা টলছিল, তবু তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন বড় দিদি অম্বিকার কক্ষে। সেখানে ধৃতরাষ্ট্রের পাশে অম্বিকা এক মূর্তিমতী উদ্বেগের মতো বসে ছিলেন। অম্বালিকার দীর্ঘশ্বাসের শব্দে অম্বিকা চমকে উঠলেন। "অম্বা? পাণ্ডু ...

পান্ডবদের জন্ম এবং পান্ডুর পরলোক যাত্রা

Image
  পান্ডবদের জন্ম এবং পান্ডুর পরলোক যাত্রা শতশৃঙ্গের সেই বিষণ্ণ বসন্ত সেদিন আকাশ জুড়ে ছিল ঘন অমাবস্যার ছায়া। শতশৃঙ্গ পর্বতের নির্জনতায় বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। পাণ্ডু দেখলেন, একদল মুনি-ঋষি গন্তব্যহীন এক যাত্রার জন্য তৈরি হচ্ছেন। পাণ্ডু কৌতূহলী হয়ে হাত জোড় করে শুধোলেন, "আপনাদের এই যাত্রা কোথায়?" এক ঋষি স্মিত হাসলেন, তাতে জাগতিক কোনো চপলতা ছিল না। বললেন, "আমরা ব্রহ্মলোকের পথে চলেছি, মহারাজ।" পাণ্ডুর মনে হলো, তাঁরও তো মুক্তি দরকার। রাজপ্রাসাদের ঐশ্বর্য ত্যাগ করে তিনি অরণ্যবাসী হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতরটা যে এখনো খাঁ খাঁ করছে। তিনি দুই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ঋষিদের পিছু নিলেন। কিন্তু পথ বড় কঠিন। ঋষিরা থামিয়ে দিলেন তাঁকে। তাঁদের কণ্ঠে ছিল রুক্ষ সত্যের সুর, "এ পথ বড় দুর্গম রাজন্‌! কোথাও জমাট বরফের মরুভূমি, কোথাও অপ্সরাদের চপলতা। রানীদের কোমল শরীরে এই পথ সইবে না। ফিরে যান।" পাণ্ডুর বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। তিনি ম্লান স্বরে বললেন, "ঋষিবর, নিঃসন্তান মানুষের কাছে কি কোনো লোকই অবারিত নয়? পিতৃঋণ, দেবঋণ তো মিটিয়েছি, কিন্তু ব...

পাণ্ডুর রাজসুখ থেকে তপোবন: পাণ্ডুর নির্বাসন ও একটি অভিশপ্ত মুহূর্ত

Image
পাণ্ডুর রাজসুখ থেকে তপোবন: পাণ্ডুর নির্বাসন ও একটি অভিশপ্ত মুহূর্ত সে এক আশ্চর্য ধূসর দিন। বনের গভীরে তখন ছায়ার আলপনা। হস্তিনাপুরের অধিপতি পাণ্ডু তখন মৃগয়ার নেশায় মত্ত, রক্তের ভেতর ছুটছে আদিম উত্তেজনা। তিনি জানতেন না, নিয়তি তাঁর অলক্ষ্যে এক অমোঘ জাল বুনে রেখেছে। পাশে দুই ছায়াসঙ্গিনী—কুন্তী আর মাদ্রী। হঠাৎ ঝোপের আড়ালে নজরে এল এক জোড়া হরিণ-হরিণী। জাগতিক সব ভুলে তারা তখন মিলনের শিখরে। ঠিক সেই কামাতুর মুহূর্তে পাণ্ডুর ধনুক থেকে পাঁচটি তীক্ষ্ণ সায়ক তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে বিঁধল তাদের শরীরে। রক্তাক্ত হরিণটি যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে হঠাৎ মানুষের গলায় আর্তনাদ করে উঠল। সে কণ্ঠস্বর কোনো পশুর নয়, বরং এক ক্রুদ্ধ ঋষির। "মহারাজ, আপনি কি মানুষ? চরম মূর্খ বা নৃশংস ব্যাধও তো এমন কাজ করে না!" পাণ্ডু স্তম্ভিত। হরিণরূপী ঋষি কিংদম বলে চললেন, "মানুষের বেশে মিলনে লজ্জিত বোধ করেছিলাম বলেই এই মৃগরূপ ধারণ। আপনি অজ্ঞাতসারে আমায় শরবিদ্ধ করেছেন ঠিকই, কিন্তু মিলনের এই সুতীব্র ব্যাঘাতের অপরাধ ক্ষমা করা যায় না। আজ থেকে আপনিও যখনই কোনো স্ত্রীর সান্নিধ্যে যাবেন, সেই মিলনের মুহূর্তই হবে আপনার অন্তিম মুহূর্ত...

এ যুগের একটি অবক্ষয়ের আখ্যান- রক্তের ঋণ ও একটি নীল তৃষ্ণা-বাস্তব ঘটনার ছায়ায় রচিত

Image
এ যুগের একটি অবক্ষয়ের আখ্যান- রক্তের ঋণ ও একটি নীল তৃষ্ণা-বাস্তব ঘটনার ছায়ায় রচিত সুমন মানুষটা ছিলেন খটখটে শুকনো কাঠের মতো। পুলিশের হেড কনস্টেবল, খাকি উর্দির ভেতরে একটা পুরনো আমলের নীতিবোধকে সবসময় ইস্ত্রি করে রাখতেন। কিন্তু সেই উর্দির তলায় যে একটা নরম পিতা লুকিয়ে ছিল, সেটা তিনি বুঝতে পারেননি। মেয়ে শিউলি যখন কমলের প্রেমে পড়ল, সুমনবাবু সেটাকে স্রেফ একটা অবাধ্যতা হিসেবে দেখেননি, দেখেছিলেন তাঁর এতদিনের গড়ে তোলা সংসারের শৃঙ্খলায় একটা বড়সড় ফাটল হিসেবে। আজকালকার মেয়েদের মন বোঝা বড় দায়। তাদের কাছে আবেগ আর অধিকারের সীমানাটা বড় দ্রুত বদলে যায়। শিউলির  চোখে তখন কমল মানেই মুক্তি, আর বাবা মানে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। সেই দেয়াল টপকানোর চেয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়াটাই তার কাছে সহজ মনে হয়েছিল। বিষের নীল নকশা মদতদাতা হিসেবে শিউলি বেছে নিল নিজেরই ভাই চেতনকে। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা—একটা মানুষের জীবনের দাম কি আজকের দিনে এতটাই সস্তা? সেই টাকায় কেনা হলো বিষ। শিউলির  হাত কাঁপেনি। যে হাতে ছোটবেলায় বাবার আঙুল ধরে মেলায় যেত, সেই হাতেই সে তৈরি করল এক গ্লাস মিল্কশেক। উপরে ঘন ফেনা, ভেতরে মৃত্যু। "বাবা, ডিউটিতে যাওয়ার...

দুর্যোধনের জন্ম -হস্তিনাপুরের সেই কালবেলা

Image
দুর্যোধনের জন্ম -হস্তিনাপুরের সেই কালবেলা হস্তিনাপুরের প্রাসাদে সেদিন এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেব এসেছেন। গান্ধারীর সেবা আর নিষ্ঠায় ঋষি প্রসন্ন, আর ঋষিরা যখন তুষ্ট হন, তাঁদের দাক্ষিণ্য তখন বাঁধ মানে না। ব্যাসদেব দু-হাত উজাড় করে বর দিতে চাইলেন। কিন্তু গান্ধারীর মনের গভীরে তখন এক চোরা স্রোত বইছে। খবর এসেছে, কুন্তী সন্তানসম্ভবা।   গান্ধারী জানতেন, কুন্তীর সন্তান আগে ভূমিষ্ঠ হওয়া মানেই হস্তিনাপুরের রাজমুকুট তার মাথায় ওঠা। উত্তরাধিকারের এই লড়াইয়ে নিজের অনাগত সন্তান কি তবে ব্রাত্য হয়ে থাকবে? ঈর্ষা আর আশঙ্কার এক জটিল বুনোটে গান্ধারী চাইলেন এক অদ্ভুত বর— ধৃতরাষ্ট্রের মতোই একশোটি বলবান পুত্র। ব্যাসদেব স্মিত হেসে বললেন, ‘তথাস্তু’। যেন অমোঘ নিয়তির এক নীল নকশা আঁকা হয়ে গেল সেদিনই। লোহার পিণ্ড ও ১০১টি ঘৃতকুম্ভ দিন যায়, মাস যায়, কিন্তু গান্ধারীর প্রতীক্ষা আর ফুরোয় না। দীর্ঘ দুই বছর অতিক্রান্ত, অথচ গর্ভস্থ সন্তান পৃথিবীর আলো দেখল না। ওদিকে সংবাদ এল, কুন্তীর কোলে এসেছে যুধিষ্ঠির। হতাশায়, যন্ত্রণায় আর নিজের ওপর তীব্র অভিমানে গান্ধারী সজোরে আঘাত করলেন নিজের উদরে। ভূমিষ্ঠ হলো ন...

পান্ডুর বিবাহ এবং দিগ্বিজয়

Image
  সূর্যালোকে ঝকঝক করছে চম্বল নদীর রুপোলি জল। তীরের সেই উর্বর পলিমাটিতে পা রেখে দাঁড়ালে আজ আর বোঝা যায় না, এই ধুলিকণায় মিশে আছে কত ইতিহাস। মানচিত্রের এক কোণে পড়ে থাকা কুন্তিভোজের এই ছোট্ট রাজ্যটি হয়তো একদিন বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেত, যদি না সেখানে জন্মাতো একটি মেয়ে—যার গর্ভজাত পাঁচ পুত্র একদিন থরথর করে কাঁপিয়ে দিয়েছিল অখণ্ড ভারতবর্ষের বুক। কুন্তিভোজ ছিলেন যদুবংশীয় শূরসেনের পরম মিত্র ও ভাই। শূরসেনের ঘরে প্রথম যখন এক কন্যাসন্তান এল, নাম রাখা হলো পৃথা। রূপ যেন ফেটে পড়ছে। কিন্তু শূরসেনের একটি পুরনো অঙ্গীকার ছিল—প্রথম সন্তান তিনি দেবেন নিঃসন্তান কুন্তিভোজকে। কথা রাখতে পিছপা হলেন না শূরসেন। নিজের বুকের টুকরো পৃথাকে তুলে দিলেন ভাইয়ের হাতে। সেদিন থেকে পৃথা হয়ে গেল ‘কুন্তী’। প্রাসাদের বিলাসিতায় কুন্তী গা ভাসাননি। তাঁর চোখের মনিতে ছিল এক আশ্চর্য স্থিরতা আর সেবাপরায়ণতা। একদিন প্রাসাদে এলেন মহর্ষি দুর্বাসা। ঋষির মেজাজ মানেই জ্বলন্ত অঙ্গার; একটু ত্রুটি হলেই অভিশাপের দাবানল। কিন্তু কুন্তী ভয় পেলেন না। সেই যে প্রদীপ হাতে ভোরের আলো ফোটার আগে ঋষির দুয়ারে গিয়ে দাঁড়াতেন, সারাদিন তাঁর খুঁটিনাটি প্রয়োজন...

কুরুবংশের নবজন্ম ও গান্ধারীর মহত্যাগ

Image
  কুরুবংশের নবজন্ম ও গান্ধারীর মহত্যাগ সে এক আশ্চর্য সময়। কুরুরাজ্যে তখন কেবলই বসন্তের দীর্ঘশ্বাস। হস্তিনাপুরের প্রতিটি অলিতে-গলিতে যেন উৎসবের রোশনাই লেগে আছে। মহারাজ বিচিত্রবীর্যের অকাল মৃত্যুর পর রাজপ্রাসাদের অলিন্দে যে শূন্যতা হাহাকার করত, তাকে পূর্ণ করতেই যেন মর্ত্যে এলেন তিন ভাই—ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু আর বিদুর। প্রজারা সুখে আছে, ঘরে ঘরে অন্নের অভাব নেই, এমনকি রাজধানীর রাজপথে কোনো চোর-ছ্যাঁচোড়ের উপদ্রব পর্যন্ত নেই। এক কথায়, কুরুরাজ্য তখন এক পুষ্পিত উদ্যান। ভীষ্মের কড়া শাসন আর স্নেহের ছায়ায় বেড়ে উঠছে তিন ভাই। অথচ তিনজনেরই তিন রূপ। ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ হলেও তাঁর পেশীবহুল শরীরে যেন সহস্র হস্তীর বল। আক্রোশে একটা আস্ত লৌহদণ্ড অবলীলায় দুমড়ে দিতে পারেন তিনি। অন্যদিকে পাণ্ডু ধনুর্ধর হিসেবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, তীরের ফলায় তিনি আকাশ ছুঁতে চান। আর বিদুর? তাঁর মধ্যে যেন স্বয়ং ধর্ম সশরীরে বাস করছেন। শান্ত, ধীর আর অসীম প্রজ্ঞার অধিকারী এক মানুষ। কিন্তু নিয়তির লিখন বড় অদ্ভুত, বড় নিষ্ঠুর। বিদুর পরম জ্ঞানী হলেও তিনি দাসীপুত্র, তাই সিংহাসনের উত্তরাধিকার তাঁর নেই। বড় ভাই ধৃতরাষ্ট্রের কপালেই রাজমুকুট ওঠার...

ধর্মরাজের মর্ত্যবাস: অণিমাণ্ডব্যের ক্রোধ ও বিদুরের জন্ম

Image
  ধর্মরাজের মর্ত্যবাস: অণিমাণ্ডব্যের ক্রোধ ও বিদুরের জন্ম ইতিহাসের চাকা ঘোরে আপন নিয়মে, কিন্তু তার নেপথ্যে থাকে ছোট ছোট কিছু মুহূর্তের অভিঘাত। মহাভারতের সেই বিশাল ক্যানভাসে বিদুর এক আশ্চর্য চরিত্র। তিনি দাসীপুত্র, অথচ তাঁর ধমনীতে বইছিল ধর্মের বিশুদ্ধতম স্রোত। কেন এক পরম জ্ঞানীকে শূদ্রাণীর গর্ভে আসতে হলো, তার উত্তর লুকিয়ে আছে মহর্ষি মাণ্ডব্যের অপমানে। ঋষির মৌনব্রত ও নিয়তির নিষ্ঠুর খেলা বহু কাল আগের কথা। মহর্ষি মাণ্ডব্য ছিলেন এক অসাধারণ মানুষ—ধৈর্য যাঁর ভূষণ আর সত্য যাঁর আশ্রয়। নিজের আশ্রমের বাইরে এক বিশাল বৃক্ষের তলে তিনি দু’হাত তুলে ঊর্ধ্ববাহু হয়ে মৌনব্রত পালন করছিলেন। ধ্যানের এমন এক শিখরে তিনি পৌঁছেছিলেন যে, চারপাশের জগৎ তাঁর কাছে তখন ধূসর কুয়াশামাত্র। ঠিক সেই সময়, একদল দস্যু রাজকোষ লুঠ করে পালাচ্ছিল। পেছনে ধেয়ে আসছে ক্রুদ্ধ রাজসৈন্য। প্রাণভয়ে দস্যুরা ঋষির আশ্রমে ঢুকে লুণ্ঠিত সামগ্রীসহ লুকিয়ে পড়ল। সেনারা এসে ঋষিকে প্রশ্ন করল চোরদের হদিস নিয়ে। কিন্তু মাণ্ডব্য তখন অন্য জগতে, তাঁর মুখে কুলুপ আঁটা। সৈন্যরা তল্লাশি চালিয়ে দস্যুদের ধরল, আর ভাবল এই নিশ্চুপ সাধুই বোধহয় চোরদের সর্দার। রাজদ...

মেদহীন এক সাম্রাজ্য এবং নিয়তির খেলা-ধৃতরাষ্ট্র,পাণ্ডু ও বিদুরের জন্ম-

Image
মেদহীন এক সাম্রাজ্য এবং নিয়তির খেলা-ধৃতরাষ্ট্র,পাণ্ডু ও বিদুরের জন্ম- বিচিত্রবীর্যের অকালমৃত্যু কেবল একটি জীবনের অবসান ছিল না, তা ছিল কুরু বংশের ভবিষ্যতের ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। হাস্তিনাপুরের সিংহাসন শূন্য, আর সত্যবতীর বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে। যে সাম্রাজ্যকে তিনি তিল তিল করে আগলে রেখেছিলেন, তা আজ উত্তরাধিকারহীন। বিচিত্রবীর্যের দুই রাণী অম্বিকা আর অম্বালিকা তখন ভরা যৌবনে বিধবা। সত্যবতীর মনে হলো, তাঁর আজন্মের স্বপ্ন বুঝি এক নিমেষে ধূলিসাৎ হতে চলেছে। ভীষ্মের অটল প্রতিজ্ঞা তিনি দ্বারস্থ হলেন ভীষ্মের। সোজাসুজি বললেন, "বৎস, কুরুবংশ আজ বিলুপ্তির পথে। তুমি এই দায়ভার গ্রহণ করো। অম্বিকা আর অম্বালিকার গর্ভে সন্তান উৎপাদন করে তুমিই রক্ষা করো এই বংশ।" ভীষ্মের মুখচ্ছবিতে কোনো বিকার দেখা দিল না। সেই শান্ত, সমাহিত কণ্ঠস্বর। তিনি মনে করিয়ে দিলেন গঙ্গার তীরে নেওয়া সেই ভয়ানক প্রতিজ্ঞার কথা। যে প্রতিজ্ঞার বিনিময়ে একদিন সত্যবতী শান্তনুর মহিষী হতে পেরেছিলেন। ভীষ্ম বললেন, "মা, পৃথিবী তার গন্ধ ত্যাগ করতে পারে, আকাশ শব্দহীন হতে পারে, এমনকি চাঁদও তার শীতলতা হারানো সম্ভব—কিন্তু আমার দেওয়া কথা...

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

Image
সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ শান্তনু ও সত্যবতীর মিলনের পর সময় বয়ে গেল আপন গতিতে। যমুনার সেই মায়াবী সুগন্ধ এখন হস্তিনাপুরের অন্দরমহলে। সত্যবতী জন্ম দিলেন দুই পুত্র—চিত্রাঙ্গদ আর বিচিত্রবীর্য। বড় হচ্ছে দুই রাজপুত্র, কিন্তু তাঁদের ছায়া হয়ে আগলে রেখেছেন বড় ভাই ভীষ্ম। শান্তনুর মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসলেন চিত্রাঙ্গদ। এক অকালমৃত্যুর উপাখ্যান চিত্রাঙ্গদ ছিলেন তেজী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী আর দক্ষ শাসক। দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে তিনি একের পর এক রাজ্য জয় করতে লাগলেন। কিন্তু নিয়তির খেলা বোঝা বড় দায়। গন্ধর্বরাজার নামও ছিল চিত্রাঙ্গদ। মানুষের ঘরে তাঁরই নামের এক রাজা রাজত্ব করবে, এই অহংকার গন্ধর্বরাজ সইতে পারলেন না। শুরু হলো এক অসম যুদ্ধ। যমুনার তীরে তিন বছর ধরে চলল সেই সংগ্রাম। শেষ পর্যন্ত গন্ধর্বরাজের হাতে অকালে প্রাণ হারালেন হস্তিনাপুরের রাজা চিত্রাঙ্গদ। একরাশ সম্ভাবনা অকালেই ঝরে গেল। ভীষ্মের অভিভাবকত্ব ও কাশীর রাজসভা চিত্রাঙ্গদের মৃত্যুর পর বিচিত্রবীর্য তখন নেহাতই বালক। সিংহাসনে বসার মতো বয়স বা অভিজ্ঞতা কোনোটাই তাঁর নেই। ভীষ্ম আবার ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন। বিচিত্রবীর্যকে সিংহাসনে বসিয়ে ...

দেবব্রতর মহান ত্যাগ ও ভীষ্মের জন্ম মহারাজ শান্তনুর সাথে সত্যবতীর বিবাহ

Image
দেবব্রতর মহান ত্যাগ ও ভীষ্মের জন্ম মহারাজ শান্তনুর সাথে  সত্যবতীর  বিবাহ  হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে তখন উৎসবের আমেজ। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর পুত্র দেবব্রতকে ফিরে পেয়েছেন মহারাজ শান্তনু। গঙ্গার কোল থেকে ফিরে আসা এই তরুণ শুধু রূপবান নয়, অসামান্য বীর এবং প্রজ্ঞাবান। শান্তনু নিশ্চিন্ত মনে তাঁকে যুবরাজ ঘোষণা করলেন। প্রজারাও খুশি, কারণ দেবব্রতর দুচোখে আগামীর এক উজ্জ্বল ন্যায়পরায়ণ রাজার স্বপ্ন দেখা যায়। কিন্তু নিয়তি বোধহয় অলক্ষ্যে হাসছিল। শান্তনুর জীবনে প্রশান্তি দীর্ঘস্থায়ী হলো না। যমুনাতীরের সেই মায়াবী সুগন্ধ একদিন মৃগয়ায় গিয়ে শান্তনু যমুনার তীরে এক অলৌকিক সুগন্ধ পেলেন। ফুলের নয়, চন্দনের নয়—এ এক অচেনা মাদকতাময় ঘ্রাণ। সেই সুগন্ধ অনুসরণ করে এগোতেই তিনি দেখলেন এক পরমাসুন্দরী কন্যাকে। নাম তার সত্যবতী। মাছের পেট থেকে জন্ম নেওয়া এই কন্যার রূপ যেন বনভূমিকে আলো করে রেখেছে। ধীবররাজ দাসরাজার পালিতা কন্যা সে। শান্তনু প্রথম দর্শনেই তাঁর প্রেমে পড়লেন। স্থির করলেন, এই সত্যবতীকেই তিনি মহিষী করে প্রাসাদে নিয়ে যাবেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালেন সত্যবতীর পিতা। দাসরাজ বিনীতভাবে কিন্তু অত্যন্ত কঠিন এক শর...

এক ধর্মনিষ্ঠ রাজার নির্জনতা

Image
  এক ধর্মনিষ্ঠ রাজার নির্জনতা শান্তনু আর পাঁচটা রাজার মতো ছিলেন না। তাঁর রাজ্যে হস্তিনাপুরের আকাশ ছিল মেঘমুক্ত, প্রজাদের মনে ছিল না কোনো সংশয়। কিন্তু রাজার নিজের মনের গহীনে ছিল এক অদ্ভুত নির্জনতা। দীর্ঘ ছত্রিশ বছর তিনি ব্রহ্মচর্য পালন করেছেন। সিংহাসনে বসেও তিনি ছিলেন অরণ্যচারী ঋষির মতো সংযমী। সত্য আর ধর্মের প্রতি তাঁর যে অবিচল নিষ্ঠা, তা সেকালের আর কোনো বীরের মধ্যে দেখা যেত না। কিন্তু নিয়তি তো শান্ত বসে থাকে না, সে নিঃশব্দে জাল বোনে। থমকে যাওয়া জাহ্নবী সেদিন গঙ্গার তীরে একা হাঁটছিলেন শান্তনু। গঙ্গা তাঁর বহুদিনের সখী, তাঁর স্মৃতির চিরন্তন স্পন্দন। কিন্তু সেদিন ঘাটে গিয়ে রাজা থমকে দাঁড়ালেন। গঙ্গার চঞ্চল জলধারা আজ যেন কোনো মায়ায় স্থবির হয়ে গেছে। যে নদী উদ্দাম বেগে পাহাড় থেকে সমতলে নেমে আসে, সে আজ ক্লান্ত, দ্বিধাগ্রস্ত। স্রোত নেই, কেবল এক অদ্ভুত নীরবতা চারদিকে। কৌতূহলী শান্তনু নদীর পাড় ধরে উজানে হাঁটতে লাগলেন। দেখতে চাইলেন, কিসের দাপটে মহাপ্রাণ গঙ্গা এমন অচল হয়ে পড়ল। বাণের বাঁধ ও এক দিব্য বালক কিছুদূর এগোতেই রাজা দেখলেন এক অভাবনীয় দৃশ্য। এক দীর্ঘকায় কিশোর দাঁড়িয়ে আছে তীরের ঠিক মাঝখানে...