পোস্টগুলি

অন্ধকারের হাহাকার: পাণ্ডবদের বনগমন ও ধৃতরাষ্ট্রের অনুতাপ

ছবি
অন্ধকারের হাহাকার: পাণ্ডবদের বনগমন ও ধৃতরাষ্ট্রের অনুতাপ এক সভাঘরের গুরুভার দরজা দুটো যখন রুদ্ধ হয়ে গেল, এবং ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল পাণ্ডবদের চলে যাওয়ার শেষ পদধ্বনি, তখন হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে এমন এক নিস্তব্ধতা নেমে এল যা অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্র এর আগে কখনও অনুভব করেননি। এ নিস্তব্ধতা কোনো শান্তির বার্তা বহন করে আনে না; এ এক অপরাধী মানুষের নিজের কৃতকর্মের মুখোমুখি একা বসে থাকার চরম যন্ত্রণা। ধৃতরাষ্ট্রের অঙ্গে কোনো বিশ্রাম নেই। আহারে তাঁর রুচি চলে গেছে, চোখে ঘুম নেই, নিজের শয়নকক্ষে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসতেও পারছেন না তিনি। তাঁর অবশ মগজের অন্ধ অলিন্দে বারবার ঘুরেফিরে ভেসে উঠছে একটিই দৃশ্য—রাজকীয় বৈভব ছেড়ে গাছের বাকল পরিহিত পাঁচ রাজপুত্র নিঃশব্দে হেঁটে চলে যাচ্ছে নগর ছেড়ে, আর তাদের পেছনে আলুলায়িত চুলে রোদন করতে করতে হেঁটে যাচ্ছে এক রমণী। এই সর্বনাশের অনুমতি তিনি নিজেই দিয়েছেন। নিজের অন্ধ স্নেহের কাছে সমর্পণ করেছেন সমস্ত বিবেক। আর এখন সেই পাপের গুরুভার তাঁর বুকের ওপর কোনো পাথরের মতো চেপে বসেছে। অসহ্য যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে তিনি বিদুরকে ডেকে পাঠালেন। বিদুর এলেন। যেমন তিনি বরাবর আসেন—শান্ত, আড়ম্ব...

দ্বিতীয় দ্যূতক্রীড়া: দ্বাদশ বর্ষের বনবাস

ছবি
  দ্বিতীয় দ্যূতক্রীড়া: দ্বাদশ বর্ষের বনবাস ইন্দ্রপ্রস্থের পথ ধরে রথ মাত্র কিছুটা পথ এগিয়েছিল, কিন্তু নিয়তি ততক্ষণে তার পাশা উল্টে দিয়েছে। হস্তিনাপুরের রাজসভায় দূর্যোধন নিজের চোখে দেখেছিলেন, পিতা ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবদের সমস্ত কিছু ফিরিয়ে দিলেন—রাজ্য, অস্ত্র, স্বাধীনতা, আর আত্মসম্মান। তিনি দেখেছিলেন, যুধিষ্ঠির কেমন পরম শ্রদ্ধায় ধৃতরাষ্ট্রের চরণে প্রণত হলেন। ভীমের সেই চওড়া পিঠখানি যখন সভার সিংহদুয়ার পেরিয়ে মিলিয়ে গেল, দূর্যোধনের বুকের ভেতরটা তখন ঈর্ষা আর তিক্ততায় কালো হয়ে উঠেছিল। দুঃশাসনই প্রথম ছুটে এল তাঁর কাছে। কৌরবদের সেই মেজভাইটি তখনও কাঁপছিল অপমানে। প্রকাশ্য রাজসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করতে গিয়ে সে ব্যর্থ হয়েছে—একটার পর একটা শাড়ি টেনে টেনে তার দু-হাত অসাড় হয়ে গিয়েছিল, অথচ দ্রৌপদীর বসনের স্তূপ কেবলই বাড়ছিল। ধুঁকতে ধুঁকতে সে যখন দূর্যোধনের সামনে এসে দাঁড়াল, তার চোখে ছিল এক আসন্ন বিপদের আতঙ্ক। তারা কী ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে, সেটা সে এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে। "দাদা," দুঃশাসন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে দ্যাখো আমরা কী করলাম। শিকার আমাদের হাতের মুঠোয় ছিল। রা...

কুরুসভার অন্ধকার: দ্রৌপদীর লাঞ্ছনা

ছবি
 l কুরুসভার অন্ধকার: দ্রৌপদীর লাঞ্ছনা পাশার দান শেষবারের মতো পড়ল, আর যুধিষ্ঠির হারলেন তাঁর শেষ সম্বলটুকুও। সাম্রাজ্য গেছে। ভাইরা গেছে। এমনকি নিজের স্বাধীনতাটুকুও তিনি খুইয়েছেন ওই কাঠের ছকের ওপর একটা নগণ্য ঘুঁটির মতো। কিন্তু সর্বনাশের এখানেই শেষ নয়; এক চরম ও আত্মঘাতী উন্মাদনায় তিনি বাজি রাখলেন তাঁর শেষ আশ্রয়কে—দ্রুপদ-নন্দিনী দ্রৌপদী। সমগ্র ভারতবর্ষের সবচেয়ে মহিমান্বিত নারী, পাঁচ পাণ্ডবের গৌরব, তিনিও এখন কুরুপক্ষের জয়ের খেরোখাতায় একটা মামুলি বন্ধকী বস্তু। এবং তিনিও হাতছাড়া হয়ে গেলেন। দুর্যোধন এক মুহূর্তও নষ্ট করতে চাইলেন না। কুরুসভার সবচেয়ে প্রাজ্ঞ পুরুষ বিদুরের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, "যাও বিদুর, যাজ্ঞসেনীকে এখানে নিয়ে এসো। সে এখন আমাদের দাসী। আমাদের দাসীদের সঙ্গে থেকে সে এখন রাজপ্রাসাদের মেঝে ঝাঁট দেবে।" বিদুর স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ দুর্যোধনের দিকে চেয়ে রইলেন। যখন কথা বললেন, তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল মৃদু, কিন্তু তাতে মিশে ছিল এক অমোঘ ভবিষ্যৎদ্রষ্টার সাবধানবাণী: "দুর্যোধন, তুমি ঘুমন্ত সিংহের গায়ে হাত দিচ্ছ। তোমার মাথার ওপর কালনাগিনীর ফণা দুলছে, আর তুমি তাক...

দ্যুতি ও দ্যুত: পাণ্ডবদের সর্বস্বান্ত হওয়ার আখ্যান

ছবি
  দ্যুতি ও দ্যুত: পাণ্ডবদের সর্বস্বান্ত হওয়ার আখ্যান তোরণ স্ফটিকের সেই মহাসভা যখন মণি-মাণিক্যের আলোয় এবং বিচিত্র কারুকার্যে সেজেগুজে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হলো, তখন কৌরবদের অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্র তাঁর পরমহীতৈষী বৈমাত্রেয় ভ্রাতা বিদুরকে ডেকে পাঠালেন। ধৃতরাষ্ট্রের কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত, চপল উত্তেজনা। তিনি বললেন, "বিদুর, তুমি অবিলম্বে ইন্দ্রপ্রস্থে যাও। যুধিষ্ঠির এবং তাঁর অনুজদের সপরিবারে এখানে আসার আমন্ত্রণ জানাও। তাদের বলো, হস্তিনাপুরে আমি এক পরম রমণীয়, সর্বসুখদায়ক সভা নির্মাণ করেছি। তারা আসুক, কিছুদিন আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করুক, আর দুই পক্ষে মিলে একটু পাশা খেলার আমোদ প্রমোদ করা যাক।" Ne ws বিদুর তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর বুকের ভেতরটা এক অশুভ আশঙ্কায় মুচড়ে উঠল। যখন তিনি কথা বললেন, তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত ধীর, গম্ভীর এবং সংযত—যেমনটা তিনি গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে বরাবর বলে থাকেন। "মহারাজ," বিদুর বললেন, "এই পাশা খেলার আয়োজনের মধ্যে আমি কুরুবংশের বিন্দুমাত্র কল্যাণ দেখতে পাচ্ছি না। দুই ভাইয়ের দলের এই দ্যুতক্রীড়া আসলে এক পরম তিক্ততার ব...

অন্ধরাজার সম্মতি ও এক মহাবিনাশের স্ফটিক তোরণ

ছবি
  অন্ধরাজার সম্মতি ও এক মহাবিনাশের স্ফটিক তোরণ ইন্দ্রপ্রস্থের সেই চোখ ধাঁধানো রাজসূয় যজ্ঞ শেষ করে দুর্যোধন আর শকুনি যখন হস্তিনাপুরে ফিরে এলেন, তখন নিজেদের চেনা নগরীটাকে বড্ড ম্লান, বড্ড ধূসর বলে মনে হলো। ইন্দ্রপ্রস্থের সেই মায়াবী ঐশ্বর্য আর প্রাসাদের অতিপ্রাকৃত মহিমা তাঁদের পিছু ছাড়েনি; এক অদৃশ্য, ভারী ছায়ার মতো তা যেন গ্রাস করে রেখেছিল তাঁদের অবচেতনাকে। শকুনি বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করলেন না। তিনি সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্রের সম্মুখে। চোখে তাঁর এক ধুরন্ধর রাজনীতিকের কৃত্রিম উদ্বেগ, যিনি খুব ভালো করেই জানেন শিকারকে কোথায় আঘাত করতে হয়। বিনীত স্বরে শকুনি বললেন, "মহারাজ, আপনার জ্যেষ্ঠপুত্র দুর্যোধন দিন দিন ক্ষয়ে যাচ্ছেন, ভেতরে ভেতরে একেবারে শুকিয়ে যাচ্ছেন। আপনি তো চোখে দেখতে পান না, কিন্তু পিতৃহৃদয় দিয়ে কি অনুভবও করতে পারছেন না? এক গভীর বিষাদ কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে যুবরাজকে। প্রাসাদের কেউ কি আপনাকে এই দুঃসংবাদ দেয়নি?" ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধ স্নেহের পরিধি ছিল তাঁর প্রজ্ঞার চেয়েও অনেক বড়। জ্যেষ্ঠপুত্রের এই অবস্থার কথা শোনামাত্রই তিনি ব্যাকুল হয়ে দুর্যোধনকে ডেকে পাঠালেন। অত্যন্ত মৃ...

রাজসূয় যজ্ঞের অবসান: এক অনিবার্য ধ্বংসের পূর্বাভাস

ছবি
  রাজসূয় যজ্ঞের অবসান: এক অনিবার্য ধ্বংসের পূর্বাভাস মহিমান্বিত রাজসূয় যজ্ঞের সমাপ্তি ঘটল। পবিত্র যজ্ঞাগ্নি শান্ত হয়েছে, আমন্ত্রিত ব্রাহ্মণ ও ঋষিকুল দক্ষিণায় সন্তুষ্ট হয়ে বিদায় নিয়েছেন। এতকাল ধরে যে ইন্দ্রপ্রস্থ নগরী পৃথিবীর প্রান্ত থেকে আসা অগণিত রাজা, মহারাজা আর চতুরঙ্গ সেনাবাহিনীর কোলাহলে মথিত হয়ে উঠেছিল, তা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছে। ঠিক যেন বর্ষা শেষে দুকূল প্লাবিত করা নদী আবার তার চেনা খাতের শান্ত জলরেখায় ফিরে যাচ্ছে। বিদায়ের এই অন্তিম প্রহরে যুধিষ্ঠিরের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস। কৃচ্ছ্রসাধনে শুষ্কমুখ শিষ্যদের পরিবৃত করে যখন বেদব্যাস এলেন, পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠির পরম শ্রদ্ধায় তাঁর আসন গ্রহণ করলেন। ব্যাসদেবের সেই চোখে যুগান্তরের সাক্ষী থাকার ক্লান্তি ও প্রজ্ঞা। তিনি শান্ত কিন্তু গম্ভীর স্বরে বললেন, "রাজন, তুমি এক অসম্ভব কাজ সম্পন্ন করেছ। পৃথিবীতে তোমার এই রাজসূয় যজ্ঞ ধর্মের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। কুরুবংশের কীর্তি আজ তোমার কারণে হিমালয়ের চেয়েও উচ্চ। কিন্তু এবার আমাদের বিদায়ের লগ্ন সমাগত।" যুধিষ্ঠির করজোড়ে প্রণাম করে বিনীত মুখে বললেন, "আপনাদের ...