৫৬তম বনপর্ব-অক্ষয় পাত্রের মহিমা এবং দুর্বাসা ঋষির দর্পচূর্ণ-


৫৬তম বনপর্ব-অক্ষয় পাত্রের মহিমা এবং দুর্বাসা ঋষির দর্পচূর্ণ-

অরণ্যের আলো-ছায়ার খেলা তখন অন্যরকম। রাজপ্রাসাদের বিলাসিতা নেই ঠিকই, কিন্তু পাণ্ডবদের এই বনবাসকাল যেন এক তপোবনের শান্তি বয়ে এনেছিল। সুখে-দুঃখে, ভাইয়ে-ভাইয়ে নিবিড় বাঁধনে দ্রৌপদীকে নিয়ে তাঁরা এমন এক নিরাসক্ত আনন্দে দিন কাটাচ্ছিলেন, যা নগরের ঐশ্বর্যকেও হার মানায়।

কিন্তু হস্তিনাপুরের প্রাসাদে বসে এই শান্তির খবর ধৃতরাষ্ট্র-নন্দন দুর্যোধনের বুকে শেলের মতো বিঁধছিল। পাণ্ডবরা বনে গিয়েও সুখে আছে? এই ঈর্ষা তাঁকে ঘুমোতে দেয় না। ছলনায় ও চাতুরীতে বিজ্ঞ কর্ণ আর দুঃশাসনকে পাশে বসিয়ে দুর্যোধন গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে লাগলেন। কীভাবে পাণ্ডবদের এই মানসিক শান্তি চূর্ণ-বিচূর্ণ করা যায়, সেটাই হয়ে উঠল তাঁদের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান।

দুর্যোধনের কুটকৌশল ও ঋষির বরদান

ঠিক এমন সময় হস্তিনাপুরে পদার্পণ করলেন ত্রিলোকবিখ্যাত, পরম ক্রোধী মহর্ষি দুর্বাসা। দুর্যোধন চতুর, তিনি জানতেন এই ঋষির ক্রোধ যেমন প্রলয়ঙ্কর, তেমনি তাঁর তুষ্টি পরম ফলদায়ী। বিন্দুমাত্র আলস্য না করে, ভাইদের নিয়ে দুর্যোধন ঋষির পায়ের কাছে গিয়ে নত হলেন। দাসের মতো জোড়হাতে দিন-রাত তাঁর সেবা করতে লাগলেন। তবে এই সেবা ভক্তির নয়, ছিল শাপের ভয় আর এক নিগূঢ় অভিসন্ধি।

দুর্বাসার স্বভাব ছিল ভারী অদ্ভুত। কখনো মধ্যরাতে বলে উঠতেন—

 "রাজন, তীব্র ক্ষুধা পেয়েছে! শীঘ্র অন্ন প্রস্তুত করো।"

আবার যখন রাজকীয় আয়োজনে থালা সাজানো হতো, তখন তিনি স্নান সেরে এসে উদাস গলায় বলতেন—

"আজ আর ক্ষিদে নেই, খাব না।"

এত বিভ্রান্তিকর আচরণের পরেও দুর্যোধন একটুও ক্ষোভ প্রকাশ করলেন না, ধৈর্যের চরম পরীক্ষা দিয়ে ঋষিকে সন্তুষ্ট করলেন। অবশেষে প্রসন্ন হয়ে দুর্বাসা বললেন, "দুর্যোধন, আমি তোমার সেবায় তুষ্ট। বর চাও, কী তোমার অভিলাষ?"

দুর্যোধনের ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে কুটিল হাসি। কর্ণ আর দুঃশাসনের সঙ্গে আগেই ছক কষে রেখেছিলেন তিনি। অত্যন্ত বিনয়ী ভঙ্গিতে বললেন:

"হে ব্রহ্মন, আমাদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যুধিষ্ঠির এখন ভাইদের নিয়ে বনে আছেন। তিনি অত্যন্ত গুণবান ও অতিথিভক্ত। আপনি যেমন সশিষ্য আমার আতিথ্য নিলেন, তেমনই অনুগ্রহ করে তাঁর কুটিরেও একবার যান। তবে আমার একটি সামান্য প্রার্থনা—পরমাদরণীয় রাজকুমারী দ্রৌপদী যখন তাঁর সমস্ত অতিথি এবং স্বামীদের অন্ন পরিবেশন করে, নিজে আহার শেষ করে বিশ্রাম নেবেন—আপনি ঠিক সেই সময়টিতে সেখানে পদার্পণ করবেন।"

দুর্বাসা মুনি দুর্যোধনের মনের ভেতরের বিষাক্ত চালটি বুঝতে পারলেন না। তিনি হেসে বললেন, "তোমার প্রতি আমার প্রীতি জন্মেছে, আমি তেমনই করব।"

ঋষি চলে যেতেই দুর্যোধন কর্ণের হাত চেপে ধরে আনন্দে মেতে উঠলেন। কর্ণ পিঠ চাপড়ে বললেন, "রাজন! এবার কাজ হাসিল। তোমার শত্রুরা এবার ধ্বংসের মহাসাগরে ডুববে।"

কাম্যক বনে মহাসংকট

দুর্যোধন যা চেয়েছিলেন, ঠিক তা-ই ঘটল। মহর্ষি দুর্বাসা তাঁর দশ হাজার শিষ্য নিয়ে তখন কাম্যক বনে যুধিষ্ঠিরের কুটিরের সামনে এসে দাঁড়ালেন, যখন দ্রৌপদীর মধ্যাহ্নভোজন শেষ হয়েছে।

ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির অতিথি দেখে পরম সমাদরে এগিয়ে গেলেন। প্রণাম জানিয়ে বললেন, "ভগবান, আপনারা স্নান ও নিত্যাহ্নিক সেরে আসুন, তার মধ্যে আমরা অন্ন প্রস্তুত করছি।"

কিন্তু দ্রৌপদীর বুকের ভেতর তখন ঝোড়ো হাওয়া বইছে। সূর্যদেবের দেওয়া সেই অলৌকিক 'অক্ষয় পাত্র'-এর নিয়ম ছিল—দ্রৌপদী নিজে আহার করার আগে পর্যন্ত সেখান থেকে অসীম অন্ন পাওয়া যায়। কিন্তু আজ তো তাঁর আহার শেষ! পাত্র শূন্য। দশ হাজার ক্ষুধার্ত ঋষিকে অন্ন দিতে না পারলে দুর্বাসার অভিশাপে পাণ্ডব বংশ ছাই হয়ে যাবে।

কোনো উপায় না দেখে যাজ্ঞসেনী দ্রৌপদী কুটিরের কোণে বসে চোখ বুজে অশ্রুসজল চোখে মনে মনে স্মরণ করলেন পরম সখা, ভক্তবৎসল শ্রীকৃষ্ণকে—

 "হে কৃষ্ণ! হে বাসুদেব! দুঃশাসনের হাত থেকে যেভাবে সেদিন রাজসভায় আমার লজ্জা নিবারণ করেছিলে, আজ এই মহাসংকট থেকেও তোমার এই অসহায় ভগিনীকে রক্ষা করো প্রভু!"

শ্রীকৃষ্ণের লীলা ও অলৌকিক তৃপ্তি

ভক্তের আকুল ডাক বৃথা যায় না। আচমকাই কুটিরের সামনে এসে দাঁড়ালেন দ্বারকাধীশ শ্রীকৃষ্ণ। দ্রৌপদী তাঁকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন এবং সব খুলে বললেন। কিন্তু কৃষ্ণ হাসলেন। বললেন, "কৃষ্ণা, ওসব পরে হবে। আমি দূর থেকে আসছি, বড্ড ক্লান্ত আর ক্ষুধার্ত। আগে আমাকে কিছু খেতে দাও।"

দ্রৌপদী লজ্জিত হয়ে বললেন, "সখা, আজ যে আমার খাওয়া হয়ে গেছে। অক্ষয় পাত্রে আর এক দানা অন্নও অবশিষ্ট নেই।"

কৃষ্ণ ছাড়লেন না। বললেন, "তুমি বানিয়ে বলছ না তো? নিয়ে এসো দেখি পাত্রটি।"

পাত্রটি আনা হলে কৃষ্ণ খুঁটিয়ে দেখলেন, তার কোণে এক টুকরো শাকের পাতা লেগে আছে। কৃষ্ণ পরম তৃপ্তিতে সেই ক্ষুদ্র শাকের অংশটুকু মুখে তুলে নিলেন এবং বললেন—

"এই শাকের দ্বারা সমস্ত জগতের আত্মা ও যজ্ঞভোক্তা পরমেশ্বর তৃপ্ত ও সন্তুষ্ট হোন।"

তারপর সহদেবকে বললেন, "যাও সহদেব, নদীঘাট থেকে মুনিদের ডেকে আনো।"

এদিকে নদীর ঘাটে তখন এক অভূতপূর্ব কাণ্ড ঘটছে। দুর্বাসা ও তাঁর দশ হাজার শিষ্য জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আহ্নিক করছিলেন। হঠাৎ প্রত্যেকে অনুভব করলেন, তাঁদের পেট যেন গলা পর্যন্ত ভরে উঠেছে! এমন এক তৃপ্তির ঢেঁকুর উঠতে লাগল, যেন তাঁরা রাজকীয় ভোজ খেয়ে উঠেছেন।

শিষ্যরা ব্যাকুল হয়ে দুর্বাসাকে বললেন, "গুরুদেব! রাজা যুধিষ্ঠিরকে তো অন্ন প্রস্তুত করতে বলে এসেছি। কিন্তু আমাদের পেট তো সম্পূর্ণ ভর্তি, এক গ্রাস অন্ন নেওয়ারও জায়গা নেই। এখন ওখানে গেলে তো অন্ন অপচয় হবে, রাজাও ক্ষুব্ধ হবেন!"

দুর্বাসা মুনি প্রমাদ গুনলেন। তাঁর মনে পড়ে গেল রাজা অম্বরীষের সেই ভয়ংকর সুদর্শন চক্রের তাড়া খাওয়ার কথা। তিনি ভয়ার্ত স্বরে বললেন:

বি: দ্র:-রাজা অম্বরীষের সেই ভয়ংকর সুদর্শন চক্রের পৌরাণিক কাহিনিটি জানতে এখানে ক্লিক করুন


"আমরা পাণ্ডবদের মতো মহাত্মা ও পরম বিষ্ণুভক্তদের কাছে অপরাধ করে ফেলেছি। পাণ্ডবরা ধার্মিক ও তপস্বী। তাঁদের ক্রোধাগ্নি তুলোর বস্তার মতো আমাদের পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে। তার চেয়ে মঙ্গল, কাউক কিছু না বলে আমরা এখান থেকেই পালিয়ে যাই।"

ব্যস, এক পলকও দেরি না করে দশ হাজার শিষ্যসহ ক্রোধী ঋষি উল্টো পথ ধরে বনের গভীরে মিলিয়ে গেলেন। সহদেব ঘাটে এসে কাউকে না পেয়ে ফিরে এসে যুধিষ্ঠিরকে সব জানালেন। পাণ্ডবরা ভাবলেন, হয়তো ঋষি গভীর রাতে এসে পরীক্ষা নেবেন।

সংকটের অবসান

পাণ্ডবদের ব্যাকুলতা দেখে শ্রীকৃষ্ণ মৃদু হেসে বললেন, "যুধিষ্ঠির, আপনাদের আর কোনো ভয় নেই। দুর্বাসার ক্রোধের যে ভয়াবহ সংকট আসছিল, দ্রৌপদীর ডাকে সাড়া দিয়ে আমি তা খণ্ডন করেছি। তিনি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে ভয় পেয়ে পালিয়েছেন। মনে রাখবেন, যাঁরা ধর্মের পথে চলেন, ঈশ্বর স্বয়ং তাঁদের রক্ষা করেন। এবার আমাকে বিদায় দিন।"

পাণ্ডবরা ও দ্রৌপদী করজোড়ে বললেন, "গোবিন্দ, মহাসাগরে ডুবতে থাকা মানুষ যেমন হঠাৎ জাহাজের দেখা পায়, তুমি আমাদের জীবনে ঠিক তেমনই। এভাবেই তুমি যুগে যুগে ভক্তের কল্যাণ করো।"

শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকায় ফিরে গেলেন, আর পাণ্ডবরা দ্রৌপদীকে নিয়ে পরম শান্তিতে ও নির্ভয়ে এক বন থেকে অন্য বনে বিচরণ করতে লাগলেন। দুর্যোধনের কুটিল চক্রান্ত আবার চূর্ণ হয়ে গেল কৃষ্ণের এক কণা শাকের মহিমায়।

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের   ৫৬তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বি:দ্র:বনপর্বের ৫৫তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

মহাভারতের  বিষয়সূচির প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)