৪০তম বনপর্ব-মহাশূন্যের হিরণ্যপুরী এবং অর্জুনের অলৌকিক অস্ত্র প্রদর্শণ



৪০তম বনপর্ব-মহাশূন্যের হিরণ্যপুরী এবং অর্জুনের অলৌকিক অস্ত্র  প্রদর্শণ

ফিরে আসার পথটা ছিল অদ্ভুত রকমের নির্জন। মেঘেদের ওপর দিয়ে যখন রথ ছুটে যাচ্ছিল, হঠাতই চোখে পড়ল সেই মায়াপুরী। সে এক আশ্চর্য দৃশ্য! যেন মহাকাশের বুকে ভাসমান এক টুকরো তপ্ত কাঞ্চন, যার নিজস্ব এক অলৌকিক জ্যোতি রয়েছে। অগ্নি আর সূর্যের মিলিত আভায় ঝলমল করছে চারদিক। সবচেয়ে বড় কথা, সেই নগরী স্থির নয়; সে যেন এক জীবন্ত যান, যেখানে ইচ্ছা তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। আমি কৌতূহলী হয়ে সারথি মাতলিকে জিজ্ঞেস করলাম, "মাতলি, কার এই বিচিত্র পুরী? কার এত ক্ষমতা যে আকাশের বুকে এমন বৈভব বিস্তার করে বাস করে?"

মাতলি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। সেই হাসির গভীরে ছিল এক প্রাচীন বিষাদ ও বিস্ময়। তিনি বললেন, "অর্জুন, এ বড় দুর্ভেদ্য ইতিহাস। সৃষ্টির আদিকালে পুলোমা আর কালিকা নামে দুই দানবী ছিল। তারা কঠোর, অতি কঠোর তপস্যায় মগ্ন হয়েছিল দীর্ঘ সহস্র বছর। তাদের সেই তিতিক্ষায় স্বয়ং পিতামহ ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হয়ে যখন বর দিতে চাইলেন, দানবীরা কোনো ঐশ্বর্য চায়নি, চেয়েছিল মাতৃত্বের চরম নিরাপত্তা। তারা বলেছিল, তাদের সন্তানদের যেন কোনো ব্যাধি বা শোক স্পর্শ করতে না পারে। দেবতা, রাক্ষস বা নাগ— কারও সাধ্য থাকবে না তাদের বধ করার। আর তাদের জন্য এমন এক আকাশচারী নগরী তৈরি করে দিতে হবে, যা দেবতাদের কাছেও হবে অজেয়।"

মাতলি একটু থামলেন, তারপর আকাশের সেই দীপ্তিময় দুর্গের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, "ব্রহ্মা তাদের সেই প্রার্থনা পূরণ করেছিলেন। এই হিরণ্যপুরী রোগহীন, উদ্বেগহীন এক স্বর্গ। কিন্তু ব্রহ্মা একটি গোপন পথ খোলা রেখেছিলেন, অর্জুন। তিনি জানতেন, অহঙ্কার মানুষকে অন্ধ করে। তাই এদের মৃত্যুর চাবিকাঠি তিনি রেখে গেছেন কেবল মানুষের হাতে। দেবরাজ ইন্দ্রও যা পারেননি, আজ তোমাকে তা করতে হবে। ওই উগ্র বজ্রের মতো বাণে এই দুষ্ট দানবদের অহঙ্কার চূর্ণ করো।"

মাতলির কথা শুনে আমার ধমনীতে রক্তের গতি তীব্র হয়ে উঠল। যারা দেবরাজের বিরুদ্ধে অস্ত্র তোলে, যারা বিশ্বসংসারের শান্তি নষ্ট করে, তাদের রেহাই দেওয়া পাপ। আমি মাতলিকে বললাম, "আর বিলম্ব নয়, রথ এগিয়ে চলুন।"

রথ যখন সেই সুবর্ণ নগরীর কাছাকাছি পৌঁছল, তখনই দানবেরা সেজে উঠেছে যুদ্ধসজ্জায়। হাজার হাজার রথ আমাদের ঘিরে ফেলল, বর্ষিত হতে লাগল নানা মায়াবী অস্ত্র। কিন্তু আমি তখন রণমদে মত্ত। অস্ত্রবিদ্যার গূঢ় কৌশলে তাদের সব আক্রমণ প্রতিরোধ করলাম। তারপর প্রয়োগ করলাম এক সম্মোহন মায়া। দানবেরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল, নিজেদের শত্রু ভেবে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। সেই বিশৃঙ্খলার সুযোগে আমার বাণ তাদের মস্তক ছিন্ন করতে লাগল। কিন্তু তারা দমবার পাত্র নয়। আবার নগরের ভেতরে ঢুকে মায়াবলে পুরো নগরীটাকেই আকাশে উড়িয়ে নিয়ে গেল। আমি তখন মহাজাগতিক দিব্যাস্ত্র নিক্ষেপ করে সেই ভাসমান পুরীকে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করলাম। আমার নিক্ষিপ্ত লৌহবাণের প্রচণ্ড আঘাতে সেই অহঙ্কারী নগরী আকাশ থেকে খসে পড়ল মাটির বুকে, ঠিক যেমন কোনো উল্কা খসে পড়ে।

কিন্তু যুদ্ধ তখনও শেষ হয়নি। মাটি থেকে আবার ধেয়ে এল ষাট হাজার রথী। সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের মতো একের পর এক দল আক্রমণ করতে লাগল। সাধারণ অস্ত্রে এদের বিনাশ অসম্ভব বুঝে আমি মনে মনে দেবাদিদেব মহাদেবকে প্রণাম করলাম। গাণ্ডীবে চড়ালাম সেই অমোঘ, ত্রিলোকত্রাস পাশুপত অস্ত্র। মুখে উচ্চারণ করলাম, "বিশ্বের কল্যাণ হোক।" অস্ত্র মুক্ত হতেই এক প্রলয়ঙ্করের সৃষ্টি হলো। মুহূর্তের মধ্যে সেই দুর্ধর্ষ দানবকূল ধুলোয় মিশে গেল।

মাতলি হাত জোড় করে আমার দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে তখন অপরিসীম শ্রদ্ধা। তিনি বললেন, "ধন্য পার্থ! যে নগরী স্বয়ং ইন্দ্রের কাছেও অধরা ছিল, আজ তোমার তপোবল আর পরাক্রমে তা ধ্বংস হলো।" সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে দানব-রমণীদের হাহাকার ভেসে আসছিল, আর দেখতে দেখতে সেই মায়াপুরী গন্ধর্বনগরের মতোই মিলিয়ে গেল মহাশূন্যে।

বিজয়ীর গৌরবে যখন ইন্দ্রপুরীতে ফিরে এলাম, মাতলি সব কথা বিস্তারিত জানালেন দেবরাজকে। ইন্দ্র পরম প্রীতিতে আমার মস্তকে পরিয়ে দিলেন এক দিব্য কিরীট, উপহার দিলেন অভেদ্য কবচ, স্বর্ণহার আর সেই বিখ্যাত 'দেবদত্ত' শঙ্খ। বললেন, "পার্থ, যুধিষ্ঠির এবার নিষ্কণ্টক পৃথিবীতে রাজত্ব করবেন। ভীষ্ম, দ্রোণ বা কর্ণের মতো বীরও তোমার যুদ্ধকলার সমকক্ষ হতে পারবে না।" সেখানে পাঁচ বছর পরম আনন্দে কাটিয়ে, ভাইদের টানে আবার এই গন্ধমাদন পর্বতে ফিরে এলাম।

অর্জুনের মুখে এই রোমাঞ্চকর বীরত্বগাথা শুনে রাজা যুধিষ্ঠিরের চোখ আনন্দে ছলছল করে উঠল। তিনি বললেন, "অনুজ, তুমি মহাদেব আর পার্বতীকে প্রত্যক্ষ করেছ, এর চেয়ে বড় ভাগ্য আর কী হতে পারে! আমার মনে হচ্ছে আমরা যেন আজই সমগ্র পৃথিবী জয় করে ফেলেছি। অর্জুন, আমাকে একবার সেই দিব্যাস্ত্রগুলি দেখাও না, যা দিয়ে তুমি ওই দানবদের বধ করলে?"

জ্যেষ্ঠের আদেশ শিরোধার্য করে অর্জুন স্নান সেরে শুদ্ধ হলেন। সেই দিব্য কবচ বক্ষে ধারণ করে, একহাতে গাণ্ডীব আর অন্যহাতে দেবদত্ত শঙ্খ নিয়ে যখন তিনি অস্ত্র প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত হলেন, তখন এক অলৌকিক কাণ্ড ঘটল। আকাশ ভেঙে পড়তে চাইল, পৃথিবী কেঁপে উঠল প্রলয়ের আশঙ্কায়, সমুদ্রের জল উথালপাথাল হয়ে উঠল। স্বয়ং ব্রহ্মা আর শিব নেমে এলেন অন্তরীক্ষে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দেবতারা দেবর্ষি নারদকে পাঠালেন দূত হিসেবে।

নারদ এসে অর্জুনের হাত চেপে ধরলেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল সাবধানবাণী, "অর্জুন, শান্ত হও! এই পরম অস্ত্র কোনো লক্ষ্য ছাড়া, বিনা যুদ্ধে কেবল প্রদর্শনের জন্য প্রয়োগ করতে নেই। এতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মহা অনর্থ ঘটবে। যুধিষ্ঠির, তুমিও এই কৌতূহল ত্যাগ করো। সময় এলে রণক্ষেত্রেই এর প্রতাপ দেখতে পাবে।" দেবর্ষির কথায় অর্জুন শান্ত হলেন, প্রকৃতি আবার তার স্বাভাবিক রূপ ফিরে পেল।

তারপর কেটে গেল আরও কিছু বছর। গন্ধমাদনের সেই কুবেরের আশ্রমে চার বছর কেটে গেল যেন একটি মাত্র রাতের মতো। দেখতে দেখতে বনবাসের দশটি বছর পার হয়ে গেল। একদিন ভীম, নকুল আর সহদেব যুধিষ্ঠিরের কাছে এসে বিনীত স্বরে বললেন, "দাদা, আমাদের বনবাসের এগারো বছর চলছে। আমরা অজ্ঞাতবাসের সেই ত্রয়োদশ বছরও সাফল্যের সাথে পার করব। এবার আমাদের দ্বৈতবনের দিকে যাত্রা করা উচিত, যাতে সময়মতো আমরা আমাদের হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করতে পারি।"

যুধিষ্ঠির ভাইদের মনের কথা বুঝলেন। যক্ষ ও রাক্ষসদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তাঁরা আবার পথ চলতে শুরু করলেন। দুর্গম পাহাড়ি পথ, যেখানেই বাধা আসছিল, ভীমপুত্র ঘটোৎকচ সকলকে কাঁধে তুলে পার করে দিচ্ছিল। মহর্ষি লোমশ এবং রাজর্ষি আর্ষ্টিষেণ তাঁদের আশীর্বাদ ও উপদেশ দিয়ে বিদায় নিলেন।

পথের ক্লান্তি ভুলে পাণ্ডবেরা চললেন নতুন এক যাত্রায়। নদী, পর্বতগুহা পেরিয়ে তাঁরা পৌঁছলেন রাজা বৃষপর্বার আশ্রমে। সেখানে আতিথ্য গ্রহণ করে পরদিন গেলেন বদরিকাশ্রমের সেই পুণ্যভূমি নর-নারায়ণ ক্ষেত্রে। সেখানে একমাস কাটিয়ে তাঁরা চীন, তুষার আর কুলিন্দ দেশের পার্বত্য অঞ্চল পেরিয়ে রাজা সুবাহুর রাজ্যে উপস্থিত হলেন। সুবাহু তাঁদের রাজকীয় সমাদর করলেন। সুবাহুর দেওয়া রথ নিয়ে পাণ্ডবেরা যমুনার উৎসস্থলের কাছে বিশাশ্বযূপ বনে এসে কিছুকাল বাস করতে লাগলেন।

সেখানেই ঘটল সেই অদ্ভুত ঘটনা। 

গন্ধমাদনের ছায়া মাড়িয়ে একদিন ভীম একা একাই ঢুকে পড়লেন হিমালয়ের এক গভীর, দুর্গম গিরিকন্দরে। বিশাল শাল আর দেবদারু গাছের ছায়ায় সেখানে আলো-আঁধারির খেলা। ভীম নিজের বাহুবলের অহঙ্কারে মত্ত হয়ে বুক ফুলিয়ে হাঁটছিলেন। তিনি ভাবতেও পারেননি, প্রকৃতির এই আদিম রূপের আড়ালে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে এক চরম নিয়তি।

হঠাৎই বনের নীরবতা ভেঙে এক তীব্র হিসহিস শব্দ ভেসে এল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই, এক বিশাল, পর্বতপ্রমাণ অজগর সাপ অন্ধকার ফাটল থেকে বিদ্যুৎগতিতে বেরিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল ভীমের বলিষ্ঠ শরীর।সাধারণ কোনো সাপ নয় এটি। তার দেহের প্রতিটি আঁশ যেন ইস্পাতের মতো শক্ত, আর চোখ দুটো জ্বলছে ক্ষুধার্ত লাল আভায়।

 দশটি হাতির বল যাঁর বাহুতে, সেই ভীমসেন মুহূর্তে অবশ হয়ে গেলেন। তিনি তাঁর সর্বশক্তি দিয়ে সেই রাক্ষুসে বাঁধন আলগা করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু যতবার তিনি পেশি ফোলালেন, অজগরের বেষ্টনী তত বেশি চেপে বসতে লাগল। ভীমের মতো অপরাজেয় বীরের মনে এই প্রথম এক শীতল ভয়ের সঞ্চার হলো। তাঁর মনে হলো, এই হিংস্র প্রকৃতির কাছে মানুষের বাহুবল কতখানি তুচ্ছ! মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ যখন তাঁর চেতনাকে গ্রাস করতে চলেছে, তখনই সেখানে এসে পৌঁছলেন মহারাজ যুধিষ্ঠির।অনুজ ভীমকে অনেকক্ষণ না পেয়ে উৎকণ্ঠিত যুধিষ্ঠির তাঁর সন্ধানে বনের গভীরে চলে এসেছিলেন। 

সেখানে এসে এই দৃশ্য দেখে তাঁর বুক কেঁপে উঠল। সমুদ্রের মাঝে যেমন কোনো আশার দ্বীপ জেগে ওঠে, যুধিষ্ঠির ভীমের কাছে ঠিক তেমনই এক রক্ষাকর্তা রূপে আবির্ভূত হলেন। যুধিষ্ঠির কিন্তু অস্ত্র তুললেন না। তিনি বুঝতে পারলেন, এই সর্প সাধারণ কোনো বন্য জন্তু নয়; এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো অতিপ্রাকৃতিক সত্য।

 

 তিনি শান্ত গলায় সর্পকে সম্বোধন করে বললেন, "হে মহাবল সরীসৃপ, তুমি কে? আমার পরম শক্তিশালী ভাইকে তুমি এভাবে বন্দী করেছ কেন? তোমার পরিচয় কী?"অজগরটি এক অদ্ভুত, গম্ভীর মনুষ্যকণ্ঠে উত্তর দিল। তার গলায় ছিল এক সুপ্রাচীন আভিজাত্যের সুর। সে বলল, "আমি তোমাদেরই পূর্বপুরুষ, চন্দ্রবংশীয় রাজা নহুষ। নিজের পুণ্যবলে একসময় আমি স্বর্গের ইন্দ্রত্ব লাভ করেছিলাম। কিন্তু অহঙ্কারের বশে আমি ব্রাহ্মণদের অবজ্ঞা করি এবং মহর্ষি অগস্ত্যের অভিশাপে আজ আমার এই সর্পযোনি প্রাপ্তি হয়েছে। এই ক্ষুধার্ত শরীরে আজ এই বীরকে আমি খাদ্য হিসেবে পেয়েছি।

"যুধিষ্ঠির হাত জোড় করে বিনীতভাবে বললেন, "হে রাজর্ষি, আপনাকে মুক্ত করার কি কোনো উপায় নেই? আমার ভাইকে ছেড়ে দিন। আপনি যা জানতে চান, আমি তার উত্তর দেব।"নহুষ তখন যুধিষ্ঠিরের দিকে তাঁর জ্বলন্ত চোখ দুটি রেখে বললেন, "যদি তুমি আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারো, তবেই আমি একে মুক্তি দেব। বলো— প্রকৃত ব্রাহ্মণ কে? আর মানুষের পরম জ্ঞেয় তত্ত্বই বা কী?"যুধিষ্ঠির এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে অত্যন্ত শান্ত ও ধীর গলায় উত্তর দিলেন:"হে সর্পরাজ, সত্য, দান, ক্ষমা, সুশীলতা, আনৃশংস্য (অহিংসা), তপস্যা ও দয়া— যার মধ্যে এই গুণগুলো বিদ্যমান, তিনিই প্রকৃত ব্রাহ্মণ। 

আর সুখ-দুঃখের অতীত যে পরমব্রহ্ম, যেখানে পৌঁছলে মানুষকে আর শোক করতে হয় না, তিনিই হলেন পরম জ্ঞেয় তত্ত্ব।"নহুষ যুধিষ্ঠিরের এই গভীর আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ব্যাখ্যা শুনে বিস্মিত হলেন। তিনি আরও কিছু জটিল প্রশ্ন করলেন— মানুষের আচরণ, ধর্ম ও কর্মের গতি নিয়ে। যুধিষ্ঠির পরম প্রজ্ঞা ও বিনয়ের সাথে প্রতিটি প্রশ্নের এমন সূক্ষ্ম উত্তর দিলেন যে, নহুষের দীর্ঘকালের জমে থাকা মোহ আর অন্ধকারের পর্দা ছিন্ন হয়ে গেল।যুধিষ্ঠিরের এই তত্ত্বজ্ঞানে সন্তুষ্ট হয়ে নহুষ বললেন, "হে ধর্মরাজ, তোমার প্রজ্ঞা অতুলনীয়। তোমার কথা শুনে আমার পাপের অবসান হলো।"এই বলে তিনি আলগা করে দিলেন তাঁর মরণকামড়। অবশ শরীর নিয়ে ভীম মুক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন এবং জ্যেষ্ঠের চরণে কৃতজ্ঞতায় মাথা নত করলেন। আর দেখতে দেখতে, অভিশাপমুক্ত রাজা নহুষ তাঁর সর্পদেহ ত্যাগ করে এক দিব্য রূপ ধারণ করে স্বর্গের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন।

অরণ্যের সেই নিস্তব্ধতায় দুই ভাই একে অপরের দিকে চাইলেন। বাহুবলের চেয়ে যে মনের জোর আর প্রজ্ঞার শক্তি কত বেশি— তা আরও একবার প্রমাণ হয়ে গেল। যুধিষ্ঠির ভীমকে বুকে টেনে নিয়ে ধীর পায়ে ফিরে চললেন তাঁদের আশ্রমে, যেখানে তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিল বনবাসের দ্বাদশ বছরের এক নতুন ভোর।

অবশেষে, বনবাসের একাদশ বছর পূর্ণ করে যখন দ্বাদশ বছর ছুঁইছুঁই, তখন পাণ্ডবেরা দ্রৌপদীকে সঙ্গে নিয়ে সেই বিশাশ্বযূপ বন ত্যাগ করলেন। মরুভূমির পাশ দিয়ে বয়ে চলা পবিত্র সরস্বতী নদীর তীরে, শান্ত-স্নিগ্ধ দ্বৈতবনের সেই মনোরম সরোবরের পাড়ে এসে তাঁরা তাঁদের পরবর্তী আস্তানা গাড়লেন। এক নতুন সংগ্রামের অপেক্ষায়, প্রকৃতির কোলেই অতিবাহিত হতে লাগল তাঁদের দিনগুলি।

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের   ৪০তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বনপর্বের ৩৯তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)

 সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা