৫৫তম বনপর্ব-অকিঞ্চন মুদগল ঋষির মোক্ষলাভ-

 


৫৫তম বনপর্ব-অকিঞ্চন মুদগল ঋষির মোক্ষলাভ-

এগারো বছর কেটে গেছে। এগারোটা বছর, যেন এগারোটা যুগ। বনের গহন স্তব্ধতার ভেতর দিয়ে সময় বয়ে যায় এক আশ্চর্য মন্থরতায়—গাছের পাতা ঝরে, আবার নতুন কুঁড়ি গজায়, কিন্তু পাণ্ডবদের ভেতরের সেই একটানা, প্রচ্ছন্ন কষ্টের অনুভূতিটা কিছুতেই মুছে যায় না। যাঁরা একদিন রাজপ্রাসাদের সুবর্ণছায়ায় সুখভোগের যোগ্য ছিলেন, আজ বনের ফলমূল আর বন্য লতাপাতা খেয়ে তাঁদের দিন কাটাতে হচ্ছে। তবু তাঁরা কেউ ভেঙে পড়েননি। মহাপুরুষদের এই এক লক্ষণ, তাঁরা জানতেন—এ কষ্টের একটা অদৃশ্য সময়সীমা আছে, এবং চরম ধৈর্য ধরে এই কালবেলা পার হয়ে যেতে হবে।

যুধিষ্ঠিরের মনে অবশ্য একটা সূক্ষ্ম কাঁটা সবসময় বিঁধে থাকত। রাতে গভীর জঙ্গল যখন নিশুতি হয়ে যেত, ঘুম আসত না তাঁর। বিষণ্ণ মনে ভাবতেন—আমার জন্যই তো ভাইদের এই দুর্দশা। আমার সেই আত্মঘাতী পাশা খেলার অপরাধেই আজ ওরা বনে বনে ঘুরছে। এই অপরাধবোধ কিছুতেই তাঁকে শান্ত হতে দিত না। কিন্তু ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব, কিংবা দ্রৌপদী—কেউই যুধিষ্ঠিরের সামনে সেই দুঃখের ছায়া মুখে ফুটতে দিতেন না। ভেতরে ভেতরে রক্তক্ষরণ হলেও, বাইরে তাঁরা ছিলেন হ্রদের মতো স্থির, শান্ত।

এমনই এক দিনে, যখন বনের নিস্তব্ধতা বিকেলবেলার ম্লান আলোয় আরও গাঢ় হয়ে এসেছে, সেখানে হঠাৎ এসে উপস্থিত হলেন সত্যবতীর পুত্র, পরম তেজস্বী মহর্ষি ব্যাসদেব। যুধিষ্ঠির দূর থেকে তাঁকে দেখেই লঘু পায়ে ছুটে গেলেন। সসম্মানে কুশাসন পেতে বসালেন প্রবীণ ঋষিকে, প্রণাম জানালেন ভক্তিভরে। তারপর কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে পাশে বসে রইলেন, যেন কোনো অলৌকিক নির্দেশের অপেক্ষায়।

ব্যাসদেব সুগভীর দৃষ্টিতে তাকালেন যুধিষ্ঠিরের দিকে। রাজপুত্রের শরীর আজ শীর্ণ, মুখ ম্লান; বনবাসের ক্লান্তি আর জঙ্গলের রূঢ় আহারের ছাপ সেখানে স্পষ্ট। বৃদ্ধ মুনির বুকের ভেতরটা কেমন যেন মুচড়ে উঠল। তিনি এক অদ্ভুত ব্যথিত অথচ গম্ভীর স্বরে বললেন—

"মহাবাহু যুধিষ্ঠির, এ নশ্বর জগতে তপস্যা ছাড়া প্রকৃত সুখ কেউ কখনো পায়নি। তপস্যার চেয়ে বড় কোনো সাধনা মানুষের জানা নেই। এই তপস্যার মধ্য দিয়েই মানুষ তার পরম পদ লাভ করে। তার মাহাত্ম্য আর কত বলব! শুধু এইটুকু জেনে রাখো—চরাচরে এমন কিছুই নেই যা কঠোর তপস্যা দিয়ে জয় করা যায় না। সত্য, সরলতা, ক্রোধহীনতা, দেবতা আর অতিথিকে নিবেদন করে অবশিষ্ট অন্নগ্রহণ, ইন্দ্রিয় আর মনকে বশে রাখা, অন্যের দোষ না দেখা, কোনো প্রাণীকে কায়মনোবাক্যে আঘাত না করা, ভেতরে-বাইরে এক আশ্চর্য পবিত্রতা বজায় রাখা—এইসব গুণই মানুষকে শুদ্ধ করে, চরম মঙ্গল বয়ে আনে। যারা এই সনাতন ধর্ম পালন না করে কেবল অধর্মেই আসক্ত থাকে, তাদের পরবর্তী জন্মে পশু-পাখির যোনিতে জন্ম নিতে হয়, আর সেখানে কোনো আত্মিক সুখ নেই। এ জীবনে মানুষ যা বপন করে, পরজীবনে তারই ফসল ভোগ করে। তাই তপস্যা আর নিয়মপালন এত জরুরি। রাজন, তোমার আশ্রমে কোনো ব্রাহ্মণ বা অতিথি এলে সাধ্যমতো তাকে দান করে সেবা কোরো, মনে কোনো বিদ্বেষের ছায়া রেখো না।"

যুধিষ্ঠির মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন। গভীর সংশয় নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "হে মহামুনি, দান আর তপস্যা—এই দুয়ের মধ্যে কোনটার ফল বেশি মহৎ, কোন পথটা বেশি কঠিন?"

ব্যাসদেব একটু থামলেন, যেন তাঁর অগাধ জ্ঞানভাণ্ডার থেকে উত্তরটা মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছেন। তারপর বললেন—

"রাজন, দানের চেয়ে কঠিন কাজ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় কিছু নেই। মানুষের অর্থের প্রতি যে টান, তা অতি প্রবল, আর অর্থ উপার্জনও বড় কষ্টসাধ্য। কেউ ধনের লোভে নিজের প্রিয় প্রাণের মায়া ত্যাগ করে ভয়ংকর জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়, কেউ অতল সমুদ্রে রত্নের সন্ধান করে। কেউ কঠোর শ্রমে চাষ করে, কেউ পশুপালন করে, আবার কেউ সামান্য ধনের আশায় অন্যের দাসত্বও মেনে নেয়। এত দুঃখ করে উপার্জিত ধন অন্যের হাতে তুলে দেওয়া—এ বড় কঠিন কাজ। তাই আমি মনে করি দানের চেয়ে দুরূহ কর্ম আর নেই। আর সেই ধন যদি ন্যায়সঙ্গতভাবে উপার্জিত হয়, উপযুক্ত পাত্র আর সঠিক সময় বিচার করে দান করা হয়, তবে তার মহিমা আকাশছোঁয়া হয়। অন্যায়ভাবে অর্জিত ধন দান করলে তা কর্তাকে পরলোকের মহাভয় থেকে রক্ষা করতে পারে না। যুধিষ্ঠির, সঠিক সময়ে শুদ্ধ চিত্তে সৎপাত্রে সামান্য একমুঠো দানও যদি করা হয়, তার সুফল পরলোকে অনন্তকাল স্থায়ী হয়। এই প্রসঙ্গে জ্ঞানীরা একটা প্রাচীন উদাহরণ দেন—মুদগল ঋষি মাত্র এক দ্রোণ ধান দান করে যে মহৎ গতি লাভ করেছিলেন, সেই আশ্চর্য আখ্যান।"

যুধিষ্ঠিরের চোখের কোণে কৌতূহল জ্বলে উঠল। "ভগবান, মহাত্মা মুদগল কীভাবে সেই এক দ্রোণ ধান দান করলেন, আর কাকে করলেন—দয়া করে আমাকে সেই কাহিনিটি সবিস্তারে বলুন।"

ব্যাসদেব তখন যেন অতীতের এক গভীর, শান্ত জলের তলে ডুব দিলেন। মৃদু অথচ গম্ভীর স্বরে বলতে শুরু করলেন সেই গল্প—

কুরুক্ষেত্রে একদা বাস করতেন মুদগল নামে এক ঋষি। অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ, পরম জিতেন্দ্রিয় মানুষ। ললাটে তাঁর সত্যের আলো, কখনো কারো পরনিন্দা করতেন না। অতিথিসেবাই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত। তিনি জীবনধারণ করতেন "শিলোঞ্চ বৃত্তি"তে—অর্থাৎ কৃষকেরা মাঠ থেকে ফসল তুলে নিয়ে যাওয়ার পর যে দু-চারটে শস্যকণা মাটিতে পড়ে থাকে, তা কুড়িয়ে কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। দীর্ঘ পনেরো দিন ধরে জঙ্গল আর মাঠ ঘুরে তিনি মাত্র এক দ্রোণ পরিমাণ ধান জমাতেন। তা দিয়েই করতেন "ইষ্টীকৃত" নামে এক পবিত্র যজ্ঞ, আর প্রতি অমাবস্যা-পূর্ণিমায় করতেন দর্শ-পৌর্ণমাস যজ্ঞ। দেবতা আর আকস্মিক অতিথিদের সেবার পর যে যৎসামান্য অন্ন উদ্বৃত্ত থাকত, তা দিয়েই স্ত্রী ও পুত্র সহ নিজের সংসার চালাতেন। তিনজন মানুষ—স্বামী, স্ত্রী ও পুত্র—পনেরো দিনে মাত্র একবার আহার করতেন! এমনই ছিল তাঁর ত্যাগের তেজ যে দেবরাজ ইন্দ্র স্বয়ং দেবতাদের নিয়ে তাঁর যজ্ঞে উপস্থিত হতেন এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে যজ্ঞভাগ গ্রহণ করতেন।

এইভাবেই মুনিবৃত্তিতে পরম তৃপ্তিতে জীবন কাটাতেন মুদগল। কারো প্রতি বিন্দুমাত্র বিদ্বেষ না রেখে অত্যন্ত বিশুদ্ধ মনে দান করতেন। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা—তাঁর সেই এক দ্রোণ অন্ন পনেরো দিনে কখনো ফুরাতো না, বরং অক্ষয় পাত্রের মতো বেড়েই চলত। যত অভাবী ব্রাহ্মণ বা বিদ্বান মানুষই তাঁর আশ্রমে এসে অন্নগ্রহণ করুন না কেন, পাত্রের অন্ন কখনো কমত না।

মুনির এই অলৌকিক ব্রতের সুখ্যাতি ধীরে ধীরে চরাচরে ছড়িয়ে পড়ল। একদিন এই কথা পৌঁছাল মহাক্রোধী দুর্বাসা মুনির কানে। তিনি তো আর পাঁচজন মুনির মতো নন, পরীক্ষা নিতে ভালোবাসেন। একদিন এক ছেঁড়া মলিন পোশাক পরে, এলোমেলো চুলে, পাগলের মতো তীক্ষ্ণ অসংলগ্ন কথা বলতে বলতে তিনি এসে হাজির হলেন মুদগলের তপোবনে। এসেই রুক্ষ স্বরে বললেন—"বিপ্রবর, শুনে রাখো, আমি তীব্র ক্ষুধার্ত এবং এখানে শুধু খেতেই এসেছি।"

মুদগল বিন্দুমাত্র বিচলিত বা শঙ্কিত হলেন না। বিনীত মুখে বললেন, "আপনাকে পরম স্বাগত জানাই।" ভক্তিভরে পাদ্য-অর্ঘ্য দিয়ে অতিথিসৎকার করলেন, তারপর ক্ষুধার্ত সেই ঋষিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে অন্ন পরিবেশন করলেন। শ্রদ্ধায় দেওয়া খাবার তো শুধু অন্ন নয়, তা যেন অমৃত। দুর্বাসা মুনি প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ছিলেন, গোগ্রাসে সব খেয়ে ফেললেন। মুদগল দিতেই থাকলেন, তিনি খেতেই থাকলেন। শেষে পাত্রের অন্ন যখন শেষ হলো, দুর্বাসা তৃপ্তির ঢেকুর তুলে, অবশিষ্ট যেটুকু অন্ন পাত্রের গায়ে লেগে ছিল, তা নিজের শরীরে মেখে নিয়ে যেদিক থেকে এসেছিলেন সেদিকেই হনহন করে চলে গেলেন। কোনো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন না।

পরের যজ্ঞের দিনও ঠিক একইভাবে এলেন তিনি। আবার সব অন্ন খেলেন, আবার চলে গেলেন। মুদগল আর তাঁর পরিবার সেদিনও ক্ষুধার্তই রইলেন। তবু তাঁদের মুখে কোনো অভিযোগ নেই, মনের কোণে কোনো ক্ষোভ নেই। পরদিন সকালে আবার নতুন করে মাঠে পড়ে থাকা শস্যকণা সংগ্রহে লেগে গেলেন তাঁরা—স্বামী, স্ত্রী, পুত্র সবাই মিলে। ক্ষুধার তীব্র কষ্টে তাঁদের মনে কোনো বিকার এল না, কোনো ক্রোধের আগুন জ্বলল না। তাঁরা রইলেন আগের মতোই শান্ত।

এইভাবে একবার নয়, দু-বার নয়—টানা ছয়বার, প্রতি যজ্ঞের দিন দুর্বাসা মুনি এসে হাজির হলেন এবং প্রতিবারই সব অন্ন নিঃশেষ করে চলে গেলেন। কিন্তু মুদগলের চিত্ত রইল অচঞ্চল, যেন এক মহাসমুদ্র, যার জলরাশি ঝড়েও বিক্ষুব্ধ হয় না।

দুর্বাসা মুনি এবার এই অতিমানবীয় ধৈর্য লক্ষ করে গভীরভাবে প্রসন্ন হলেন। তাঁর রুক্ষ চোখ দুটো আর্দ্র হয়ে এল। তিনি বললেন—

"মুনিবর, তোমার সমান দাতা ও ত্যাগী এ জগতে আর দ্বিতীয় কেউ নেই। ঈর্ষা বা ক্রোধ তোমাকে স্পর্শ করতে পারে না। আমি দেখেছি, বড় বড় ধার্মিক মানুষকেও ক্ষুধার তীব্র জ্বালা কাবু করে ফেলে, তাদের আজন্মের ধৈর্য কেড়ে নেয়। এই মানুষের জিব বড় চঞ্চল, সে সবসময় রসের স্বাদ খোঁজে, মনকে মোহময় রূপের দিকে টানে। খাদ্যেই তো প্রাণ বাঁচে, তাই খাদ্যের লোভ সংবরণ করা সবচেয়ে কঠিন। মন আর ইন্দ্রিয়ের এই যে একাগ্রতা, একেই আসলে প্রকৃত তপস্যা বলে। এই ইন্দ্রিয়গুলোকে বশে রেখে, ক্ষুধার অসীম কষ্ট সহ্য করে, নিজের কষ্টার্জিত সামান্য অন্ন শুদ্ধচিত্তে দান করা—এ এক অসম্ভব সাধনা। তুমি তা করে দেখিয়েছ। তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে আমি ধন্য। ইন্দ্রিয়জয়, ধৈর্য, দান, শম, দম, দয়া, সত্য আর ধর্ম—সব কিছুই তোমার মধ্যে পূর্ণরূপে বিরাজ করছে। তোমার এই শুভকর্মের দ্বারা তুমি সমস্ত মর্ত্য জগৎ জয় করেছ, আজ পরম পদ লাভ করেছ। দেবতারাও স্বর্গে তোমার মহিমা গান করছেন।"

দুর্বাসা মুনি যখন এই কথাগুলো বলছেন, ঠিক তখনই মেঘ চিরে আকাশে একটা দিব্য বিমান এসে থামল। শ্বেত হংস আর সারস পাখি টানা সেই অলৌকিক বিমান, তা থেকে ভেসে আসছিল এক স্বর্গীয় পারিজাতের সুগন্ধ। চালকের প্রয়োজন ছিল না, মনের ইশারাতেই চলত সেই রথ। তা থেকে নেমে এলেন এক জ্যোতির্ময় দেবদূত। তিনি মুদগলকে প্রণাম করে বললেন—

"মুনিবর, এই বিমান আপনি নিজের শুদ্ধ শুভকর্মের ফলে অর্জন করেছেন। আর বিলম্ব করবেন না, বিমানে উঠুন, আপনি আজ সিদ্ধিলাভ করে স্বর্গের অধিকারী হয়েছেন।"

মুদগল কিন্তু প্রলোভিত হলেন না, বিমানে পা বাড়ালেন না। তাঁর গভীর চোখের কোণে তখন কী যেন একটা দার্শনিক প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিল। তিনি শান্ত স্বরে বললেন—

"দেবদূত, জ্ঞানীরা বলেন সৎ মানুষেরা একসঙ্গে সাত পা হাঁটলেই তাদের মধ্যে এক পরম বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে যায়। সেই প্রীতির সূত্রে আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করছি। যা পরম সত্য আর হিতকর, দয়া করে আমাকে তাই বলুন। আপনার উত্তর শুনেই আমি স্থির করব আমার করণীয় কী। আপনি আমাকে স্পষ্ট করে বলুন—স্বর্গে কী সুখ আছে, আর তার অন্তরালে কী গভীর দোষ লুকিয়ে আছে?"

দেবদূত একটু হাসলেন। এই গ্রামীণ ঋষির প্রজ্ঞার গভীরতা দেখে তিনি মুগ্ধ। বললেন—

"মহর্ষি মুদগল, আপনার বুদ্ধি সত্যিই অনন্য। যে স্বর্গসুখকে মর্ত্যের সমস্ত মানুষ শ্রেষ্ঠ সুখ বলে মনে করে, তা আজ আপনার পায়ের কাছে এসে পড়ে আছে, তবু আপনি তার গুণাগুণ বিচার করছেন! বেশ, আপনার আদেশ শিরোধার্য করে বলছি।

স্বর্গ এখান থেকে অনেক ওপরের এক জ্যোতির্ময় লোক, একে বলে স্বর্লোক। পুণ্যময় পথ ধরে সেখানে পৌঁছাতে হয়। সেখানকার বাসিন্দারা সবসময় দিব্য বিমানে বিচরণ করেন। যাঁরা মর্ত্যে বাস করে তপস্যা করেননি, দান করেননি, মহাযজ্ঞ করেননি, কিংবা যাঁরা মিথ্যাবাদী ও নাস্তিক, তাঁরা কোনোদিন সেখানে প্রবেশাধিকার পান না। কেবল যাঁরা ধর্মপরায়ণ, জিতেন্দ্রিয়, ক্রোধহীন—আর যাঁরা আজীবন দানধর্ম পালন করেছেন, তাঁরাই সেখানে যান। আর যান সেইসব বীর, যুদ্ধে যাঁদের শৌর্য ও ত্যাগ প্রমাণিত হয়েছে। স্বর্গে দেবতা, সাধ্য, বিশ্বদেব, মহর্ষি, গন্ধর্ব আর অপ্সরাদের আলাদা আলাদা লোক আছে; সবই পরম কান্তিময়, ইচ্ছামতো ভোগসম্পন্ন আর তেজপূর্ণ। স্বর্গে আছে তেত্রিশ হাজার যোজন উঁচু এক মহাপর্বত, নাম সুমেরু, যা খাঁটি সোনায় মোড়া। তার ওপরেই দেবতাদের নন্দনকানন—পুণ্যাত্মাদের পরম বিহারস্থান। সেখানে কারো ক্ষুধা-তৃষ্ণা নেই, মন কখনো বিষণ্ণ হয় না, শীত-গ্রীষ্মের রূঢ় কষ্ট নেই, কোনো ভয়ও নেই।

সেখানে এমন কোনো দৃশ্য বা বস্তু নেই যা দেখলে মনে ঘৃণা জাগে। সেখানে সর্বদাই সুগন্ধি শীতল বাতাস বয়, বাতাসে মধুর দেববাদ্য শোনা যায়। সেখানে কোনো শোক নেই, পাপের কথা কেউ জানেই না, বার্ধক্য আসে না, শরীরে কোনো ক্লান্তি নেই। স্বর্গবাসীদের শরীর আমাদের মতো রক্ত-মাংসের বা মাতাপিতার জন্মদানে তৈরি নয়, তা তৈরি হয় পুণ্যকর্মের এক দিব্য তেজস তত্ত্ব দিয়ে। তাঁদের গায়ে কখনো ঘাম হয় না, শরীরে দুর্গন্ধ নেই, মলমূত্র নেই। কিছুই সেখানে মলিন হয় না, গলার ফুল কখনো শুকোয় না। যে বিমানটা আপনি দেখছেন, এমন বিমান সেখানে সবারই আছে।

এই দেবলোকের ওপরেও আরও অনেক দিব্যলোক আছে। সবচেয়ে ওপরে ব্রহ্মলোক। নিজেদের নিস্পৃহ শুভকর্মের ফলেই মুনি-ঋষিরা সেখানে যান। সেখানে থাকেন 'ঋভু' নামে এক শ্রেণির দেবতা, দেবতারাও যাঁদের পুজো করেন। এই লোক স্বপ্রকাশ, তেজস্বী, সব কামনা পূরণ করে। অন্যের কোনো ঐশ্বর্যের জন্য তাঁদের মনে কখনো ঈর্ষা জাগেছে বলে শোনা যায় না। যজ্ঞের আহুতির ওপর তাঁদের জীবন নির্ভর করে না, অমৃত পানেরও প্রয়োজন হয় না। তাঁদের দেহ দিব্য জ্যোতির্ময়, কোনো নির্দিষ্ট অবয়ব নেই। তাঁরা নিজেরাই সুখস্বরূপ, তাই আলাদা করে সুখভোগের ইচ্ছাও তাঁদের হয় না। তাঁরা দেবতাদেরও দেবতা, সনাতন। মহাপ্রলয়েও তাঁদের বিনাশ হয় না, তাই জরা-মৃত্যুর কোনো সম্ভাবনা সেখানে নেই। হর্ষ-প্রীতি, সুখ-দুঃখ, রাগ-দ্বেষ—কিছুই তাঁদের স্পর্শ করে না। স্বর্গের দেবতারাও এই পরম অবস্থা পেতে চান। কিন্তু বিপ্র, যে ভোগের আকাঙ্ক্ষা রাখে, সে কখনো এই ব্রহ্মলোকের সিদ্ধি পায় না। আপনি আপনার দানের প্রভাবেই এই সুখদায়ক সিদ্ধি পেয়েছেন। বিপ্র, এই তো গেল স্বর্গসুখের কথা। এবার তার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা চরম দোষের কথা শুনুন।

স্বর্গে গিয়ে আপনি কেবল পূর্বজন্মের কৃত কর্মের ফলই ভোগ করতে পারবেন, নতুন কোনো পুণ্যকর্ম করার উপায় সেখানে নেই। অর্থাৎ, আসল পুঁজি ভেঙে ভেঙে আপনাকে দিন কাটাতে হবে। আমার মনে হয় এটাই স্বর্গের সবচেয়ে বড় অভিশাপ—আর পুণ্য শেষ হলেই একদিন না একদিন সেখান থেকে মর্ত্যের মাটিতে পতন অনিবার্য। যে সুখদায়ক ঐশ্বর্য ভোগ করার পর আবার শূন্য হাতে নিচে নেমে আসতে হয়, পতনের সেই যে তীব্র বেদনা আর অনুতাপ, তা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। স্বর্গ থেকে পতনের প্রথম সংকেত মেলে যখন স্বর্গবাসীর গলার পারিজাত মালা শুকোতে শুরু করে। সেই ম্লান মালা দেখেই পুণ্যবানের মনে চরম ভয় ঢুকে যায়—এবার বুঝি সময় শেষ। তখন তাদের ওপর রজোগুণের প্রভাব পড়ে, বুদ্ধি আর চেতনা লুপ্ত হয়ে যায়। ব্রহ্মলোক পর্যন্ত—যত লোক আছে, সবখানেই এই পতন আর ফুরিয়ে যাওয়ার ভয় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে।"

মুদগল ঋষি অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। আকাশের সেই আলোর রথের দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখে কোনো মোহ দেখা গেল না। তিনি শান্ত গলায় বললেন, "দেবদূত, আপনি তো স্বর্গের সবচেয়ে বড় অন্ধকার দিকটাই বলে দিলেন। এবার বলুন, এমন কোনো স্থান কি এই মহাবিশ্বে আছে, যা সম্পূর্ণ নির্দোষ, যেখানে পতন নেই?"

দেবদূত মৃদু হেসে মস্তক অবনত করলেন। বললেন—

"আছে মহর্ষি। ব্রহ্মলোকেরও ওপরে আছে ভগবান বিষ্ণুর পরম ধাম। সেই ধাম পরম শুদ্ধ, সনাতন ও স্বয়ম্প্রভ। একে পরব্রহ্মপদও বলে। জাগতিক বিষয়াসক্ত মানুষ সেখানে কখনো পৌঁছাতে পারে না। দম্ভ, লোভ, ক্রোধ, মোহ, দলাদলি যাদের মধ্যে আছে, তাদের সেখানে প্রবেশ নিষেধ। শুধুমাত্র যাঁরা মমতা আর অহংকার চিরতরে ত্যাগ করেছেন, সমস্ত দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠেছেন, ইন্দ্রিয় জয় করেছেন, আর পরম ধ্যানযোগে নিমগ্ন—কেবল সেই মুক্তাত্মারাই সেখানে যেতে পারেন। মহাত্মা মুদগল, আপনার প্রশ্নের উত্তরে যা সত্য, সব বলে দিলাম। এবার দয়া করে বিমানে উঠুন, বিলম্ব করবেন না।"

ব্যাসদেব এই পর্যন্ত বলে একটু থামলেন। বনের অন্ধকার তখন ঘন হয়ে নেমে এসেছে। যুধিষ্ঠিরের দিকে সরাসরি তাকিয়ে, এক গভীর প্রাজ্ঞ গলায় বললেন—

দেবদূতের এই পরম সত্য কথাগুলো শুনে মুদগল ঋষি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। মনে মনে জীবনের অঙ্কটা কষে নিলেন তিনি। তারপর ধীরে ধীরে, পরম শান্তিতে বললেন—

"দেবদূত, আপনাকে আমার প্রণাম। আপনি এই শূন্য বিমান নিয়ে স্বর্গে ফিরে যান। স্বর্গের এই ক্ষীয়মাণ সুখের আমার আর কোনো প্রয়োজন নেই। ভোগের পর পতনের যে দুঃখ আর অনুতাপ, তা আমি সইতে চাই না।

যেখানে গেলে জীবনের সমস্ত দুঃখ-কষ্টের মূলটাই চিরতরে উপড়ে যায়, আমি এখন থেকে শুধু সেই পরম ধামেরই সন্ধান করব।"

এই বলে সেই সর্বত্যাগী ধর্মাত্মা মুনি দেবদূতকে বিদায় জানালেন। আকাশের রথ আকাশে বিলীন হয়ে গেল। মুদগল আবার ফিরে গেলেন সেই পুরনো শিলোঞ্চ বৃত্তিতে। কুড়িয়ে আনা শস্যের সামান্য কণাটুকুই হয়ে রইল তাঁর সম্বল। নিন্দা আর স্তুতি, মাটির ঢেলা আর খাঁটি সোনা—তাঁর কাছে সব একাকার হয়ে গিয়েছিল ততদিনে। বিশুদ্ধ জ্ঞানযোগের আশ্রয় নিয়ে তিনি দিনরাত অন্তহীন ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। সেই ধ্যান থেকেই তিনি পেলেন চরম বৈরাগ্যের শক্তি, তা থেকে জন্ম নিল উত্তম বোধ—আর সেই বোধের হাত ধরে অবশেষে লাভ করলেন মোক্ষরূপ পরম সিদ্ধি, যার পর আর কোনো পতন হয় না।

ব্যাসদেব গল্প শেষ করে যুধিষ্ঠিরের কাঁধে একটা হাত রাখলেন। তাঁর চোখ দুটো স্নেহে আর্দ্র।

"তাই যুধিষ্ঠির, মহাত্মা মুদগলের এই আখ্যান মনে রাখো। তোমারও এখন শোক করা উচিত নয়। মানুষের জীবনে চক্রের মতো সুখের পরে দুঃখ আসে, দুঃখের পরে আবার পরম সুখ ফিরে আসে। এই তো প্রকৃতির নিয়ম। আর মাত্র দুটো বছর। ত্রয়োদশ বছর পার হলেই তুমি নিশ্চয়ই ফিরে পাবে তোমার পিতা-পিতামহের সেই হৃত রাজ্য। এখন মন থেকে সব গ্লানি আর দুশ্চিন্তা মুছে ফেলো, ধ্যানে স্থির হও।"

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের   ৫৫তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বনপর্বের ৫৪তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ