৪৬ তম বনপর্ব-ছায়াহীন যমপথ ও পুণ্যময়ী নৌকা: যুধিষ্ঠির-মার্কণ্ডেয় সংবাদ
৪৬ তম বনপর্ব-ছায়াহীন যমপথ ও পুণ্যময়ী নৌকা: যুধিষ্ঠির-মার্কণ্ডেয় সংবাদ
দ্বৈতবনের শান্ত অপরাহ্নে গাছের পাতা চিরে আসা আলোয় বসে আছেন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির। তাঁর চোখে ক্লান্তির চেয়েও বড় এক সংশয়। পাশেই উপবিষ্ট ত্রিকালজ্ঞ মহর্ষি মার্কণ্ডেয়। তাঁর প্রশান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে যুধিষ্ঠির এক গভীর জীবন-জিজ্ঞাসা মেলে ধরলেন।
"হে মুনিবর, মানুষ ঠিক কোন অবস্থায় দান করলে ইন্দ্রলোকে পরম সুখ লাভ করে? দান বা সৎকর্মের সেই অলৌকিক ফল সে কীভাবে ফিরে পায়?"
মহর্ষির ঠোঁটে ফুটে উঠল মৃদু, বিষণ্ণ হাসি। তিনি বলতে শুরু করলেন যেন এক পরম সত্যের উন্মোচন ঘটছে এই মর্ত্যের মাটিতে।
দানের নিষ্ফলতা ও প্রকৃত পাত্রের সন্ধান
মহর্ষি বললেন, "ধর্মরাজ, আগে বোঝো কার জীবন এবং কার দান বৃথা। সংসারে চার প্রকার মানুষের জন্ম একেবারেই অর্থহীন—
১. যে অপুত্রক,
২. যে অধার্মিক জীবন কাটায়,
৩. যে সদা অন্যের গৃহে অন্ন ধ্বংস করে, এবং
৪. যে অতিথি বা দেবতাকে না দিয়ে কেবল নিজের উদরপূর্তির জন্য খাদ্য রাঁধে।
আবার যারা বাণপ্রস্থ বা সন্ন্যাস থেকে পুনরায় গৃহস্থাশ্রমে ফিরে আসে, তাদের দান এবং অন্যায় উপায়ে উপার্জিত অর্থের দান—উভয়ই নিষ্ফল। পাপিষ্ঠ, চোর, মিথ্যাবাদী গুরু, কৃতঘ্ন, বেদ-বিক্রেতা, শূদ্রের যজ্ঞকারী, আচারহীন ব্রাহ্মণ এবং নারীর অযাচিত দানও কোনো ফল প্রসব করে না। তাই সর্বাবস্থায় উত্তম ব্রাহ্মণকেই দান করা শ্রেয়।"
শুনে যুধিষ্ঠিরের কৌতূহল আরও বাড়ল, "ব্রাহ্মণ কোন ধর্ম পালন করলে নিজে মুক্ত হন এবং অন্যকেও উদ্ধার করতে পারেন?"
মহর্ষি উত্তর দিলেন, "ব্রাহ্মণ তাঁর জপ, হোম, মন্ত্র আর বেদ-অধ্যয়নের মাধ্যমে এক বেদময়ী নৌকা তৈরি করেন। সেই নৌকায় তিনি নিজে তো পার হনই, অন্যকেও পার করে দেন। তবে শ্রাদ্ধকর্মে পাত্র নির্বাচনের সময় তীব্র সতর্ক থাকতে হবে। যার নখ অপরিষ্কার, যে কুৎসিত ব্যাধিতে আক্রান্ত, প্রবঞ্চক, বিধবা মায়ের গর্ভজাত বা পিতার জীবিতাবস্থায় পরপুরুষের সংসর্গে জন্ম যার, কিংবা যে ক্ষত্রিয়বৃত্তি ধারণ করে তির-ধনুক নিয়ে ঘোরে—তাদের শ্রাদ্ধে ভোজন করালে যজমানের পুণ্য কাঠপোড়া আগুনের মতো ছাই হয়ে যায়। তবে অন্ধ, বধির বা বোবা যদি বেদজ্ঞ হন, তবে তাঁদের সানন্দে আমন্ত্রণ জানানো যায়।"
অতিথি সেবা এবং সর্বশ্রেষ্ঠ দান
মার্কণ্ডেয় ঋষি যুধিষ্ঠিরের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "যুধিষ্ঠির, এবার শোনো দানের মহিমা। যে গৃহস্থ দূর থেকে আসা ক্লান্ত অতিথিকে পা ধোয়ার জল দেয়, অন্ধকারে আলো দেখায়, অন্ন ও আশ্রয় দেয়, যমরাজ কখনো অসময়ে তার দুয়ারে কড়া নাড়েন না।
দান করতে হলে শ্রোত্রিয়, দরিদ্র ব্রাহ্মণকে সাজিয়ে কপিলা গাভী দান করো। তবে মনে রেখো, একটি গাভী কেবল একজনকেই দেবে। বহুজন মিলে সেই গাভী বিক্রি করে দিলে দাতার ভাগ্যে পাপ জোটে। যিনি বলশালী বলদ দান করেন, তিনি স্বর্গে যান। আর সব দানের ঊর্ধ্বে হলো অন্নদান।
"বেদে অন্নই হলো প্রজাপতি। ক্লান্ত পথিকের মুখে যে অন্ন তুলে দেয়, সে যেন ঈশ্বরেরই সেবা করে। এর চেয়ে বড় পুণ্য আর কিছুতে নেই। যে জলকষ্ট দূর করতে দিঘি বা কুয়ো খনন করে, পান্থশালা বানায়, সে যমলোকের যাতনা থেকে মুক্তি পায়।"
ছিয়াত্তর হাজার যোজনের সেই ছায়াহীন ভয়ানক পথ
যমের নাম শুনতেই যুধিষ্ঠির এবং অন্য পাণ্ডবদের বুক কেঁপে উঠল। তাঁরা রুদ্ধশ্বাসে শুধালেন, "মুনিবর, মর্ত্য থেকে যমলোক কত দূরে? কেমন সেই পথ?"
মহর্ষি এক অপার্থিব কণ্ঠে বললেন, "সে এক অতি গূঢ় ও রহস্যময় পথ, ধর্মরাজ। মর্ত্য থেকে যমলোকের দূরত্ব ছিয়াশি হাজার যোজন। আদিগন্ত বিস্তৃত শূন্য আকাশই এর পথ। অত্যন্ত ভয়ানক, দুর্গম। সেখানে কোনো গাছ নেই যার তলায় জিরোনো যায়, নেই এক ফোঁটা জল। যমদূতরা যখন আত্মাকে বলপূর্বক টেনে নিয়ে যায়, তখন ইহলোকের কর্মই মানুষের একমাত্র সহায় হয়।
যারা মর্ত্যে ঘোড়া বা বাহন দান করেছে, তারা যমপথে বাহন পায়।
ছত্রদানকারীরা পায় শীতল ছাতা।
অন্নদানকারী ক্ষুধায় কাতর হয় না, আর জলদানকারী পায় না তৃষ্ণা।
সেখানে রয়েছে পুষ্পোদকা নদী। পুণ্যবানরা সেখানে সুশীতল মিষ্টি জল পান করে, আর পাপীদের কাছে সেই জলই হয়ে ওঠে দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ।
যারা উপবাস ব্রত পালন করে, তারা হংস কিংবা ময়ূরবাহী দিব্য বিমানে চড়ে পরম সুখে যাত্রা করে।"
অন্তরের পবিত্রতা ও মোক্ষের চাবিকাঠি
যুধিষ্ঠির হাত জোড় করে বললেন, "আমি সেই পরম পবিত্রতার কথা জানতে চাই, যা মানুষকে সর্বদা শুদ্ধ রাখে।"
মহর্ষির কণ্ঠস্বর এবার আরও গম্ভীর ও মরমী হয়ে উঠল, "পবিত্রতা বাহ্যিক নয়, যুধিষ্ঠির। পবিত্রতা তিন প্রকার—বাক্য, কর্ম এবং জলের। যিনি এই ত্রিমুখী পবিত্রতায় শুদ্ধ, তিনিই স্বর্গের অধিকারী। সকাল-সন্ধ্যায় গায়ত্রী জপকারী ব্রাহ্মণকে পৃথিবীর কোনো প্রতিগ্রহের দোষ স্পর্শ করে না। ছাইচাপা আগুনের মতো জ্ঞানহীন বা সংস্কারহীন ব্রাহ্মণকেও কখনো অপমান করতে নেই।
কিন্তু মনে রেখো, শুধু শরীর শুকিয়ে বা কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন করে তপস্বী হওয়া যায় না। দয়া না থাকলে সব তপস্যাই ভস্মে ঘৃতাহুতির মতো।
"যার অন্তরে শ্রদ্ধা নেই, স্বয়ং অগ্নিও তার পাপ পোড়াতে পারে না। মাথা মুণ্ডন করা, জটা রাখা, শীতে জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা বা খোলা আকাশের নিচে শুয়ে থাকলেই মোক্ষ মেলে না। মোক্ষ আসে জ্ঞানে এবং নিষ্কাম কর্মে। পুড়ে যাওয়া বীজ থেকে যেমন আর অঙ্কুর বের হয় না, তেমনই জ্ঞানাগ্নিতে অবিদ্যা পুড়ে গেলে মানুষকে আর এই যন্ত্রণাময় সংসারে পুনর্জন্ম নিতে হয় না।"
যুধিষ্ঠির শান্ত হয়ে শুনছিলেন। মহর্ষির কথাগুলো তাঁর মনের সমস্ত সংশয় ধুয়ে দিয়ে এক অলৌকিক আলোয় তাঁর হৃদয় ভরিয়ে দিল। দ্বৈতবনের বাতাস তখন এক গভীর অধ্যাত্ম-ঐশ্বর্যে থমথম করছে।
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৪৬তম ভাগের আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
বনপর্বের ৪৫তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment