কিষ্কিন্ধ্যার রাজপ্রাসাদে রক্তের টান ও প্রতিশোধের রাজনীতি: বালী-সুগ্রীবের আদিম দ্বন্দ্ব
কিষ্কিন্ধ্যার রাজপ্রাসাদে রক্তের টান ও প্রতিশোধের রাজনীতি: বালী-সুগ্রীবের আদিম দ্বন্দ্ব
মহাকাব্যের পাতায় কত রকমের ট্র্যাজেডি থাকে, কিন্তু দুই ভাইয়ের এমন নির্মম দূরত্বের গল্প বোধহয় আর দ্বিতীয়টি নেই। কিষ্কিন্ধ্যার বনাঞ্চলে যে কেবল বানর সেনা বাস করত তা তো নয়, সেখানে বাস করত মানুষের মতোই লোভ, হিংসা, ভুল বোঝাবুঝি আর ক্ষমতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
রক্তের টান ও এক ভয়ানক ভুল
বালী ছিলেন কিষ্কিন্ধ্যার জ্যেষ্ঠ রাজপুত্র—পরাক্রমশালী, অপরাজেয় এবং জন্মগত শাসক। আর ছোট ভাই সুগ্রীব ছিলেন তাঁর অনুগত ছায়া। দুজনের মধ্যে স্নেহ ছিল গভীর। কিন্তু নিয়তি অন্য এক খেলা খেলল।
একবার মায়াবী নামের এক রাক্ষস বালীকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করে এক অন্ধকার গুহার ভেতর ঢুকে পড়ে। বালীও তার পিছু পিছু গুহায় প্রবেশ করেন এবং সুগ্রীবকে বাইরে পাহারা দিতে বলেন। দিন যায়, মাস যায়, বালী ফিরে আসেন না। এক বছর পার হওয়ার পর, গুহার মুখ থেকে রক্তের স্রোত ভেসে আসতে দেখে সুগ্রীব ধরে নিলেন তাঁর প্রিয় দাদা আর বেঁচে নেই। রাক্ষসটি যেন বাইরে এসে কিষ্কিন্ধ্যা ধ্বংস না করতে পারে, তাই ভারী পাথর দিয়ে গুহার মুখ বন্ধ করে চোখের জল মুছতে মুছতে সুগ্রীব রাজ্যে ফিরে আসেন।
শূন্য সিংহাসন আর প্রজাদের অনুরোধে সুগ্রীব অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিষ্কিন্ধ্যার রাজা হিসেবে দায়িত্ব নেন।
ভুল বোঝাবুঝি এবং ক্ষমতার অহংকার
কিন্তু বালী মরেননি। রাক্ষসকে বধ করে তিনি যখন গুহার মুখ বন্ধ দেখলেন, তখন তাঁর মনে হলো ছোট ভাই সুগ্রীব ক্ষমতার লোভে তাঁকে জীবন্ত কবর দিতে চেয়েছিল। গুহা ভেঙে বালী যখন কিষ্কিন্ধ্যায় ফিরে এলেন, তাঁর চোখে তখন স্নেহের বদলে জ্বলছে চরম প্রতিশোধের আগুন।
সুগ্রীব দাদাকে দেখে সিংহাসন ছেড়ে পায়ে লুটিয়ে পড়লেন, সমস্ত ভুল বোঝাবুঝি বুঝিয়ে বলতে চাইলেন। কিন্তু ক্ষমতার দম্ভ আর ক্রোধ বালীর বিচারবুদ্ধি গ্রাস করেছিল। “বালী সুগ্রীবের কথা শুনলেন না, শোনার প্রয়োজনও মনে করলেন না। কারণ ততক্ষণে ভাইয়ের প্রতি বিশ্বাসটা ক্ষমতার রাজনীতির কাছে হেরে গেছে।”
বালী সুগ্রীবকে রাজ্য থেকে নির্মমভাবে তাড়িয়ে দিলেন। শুধু তাই নয়, সুগ্রীবের স্ত্রী রুমাকেও জোরপূর্বক নিজের অন্তঃপুরে বন্দি করলেন।
ঋষ্যমূকের নির্বাসন ও প্রতিশোধের শেষ অঙ্ক
প্রাণভয়ে সুগ্রীব এসে আশ্রয় নিলেন ঋষ্যমূক পর্বতে, যেখানে এক অভিশাপের কারণে বালী প্রবেশ করতে পারতেন না। বালী আর সুগ্রীব—একই মায়ের দুই সন্তান, অথচ একজন কিষ্কিন্ধ্যার বিলাসবহুল প্রাসাদে রাজত্ব করছেন, আর অন্যজন জরাজীর্ণ পাহাড়ে এক মুঠো অন্নের জন্য ধুঁকছেন। এই চরম অবিচার আর অপমানের প্রতিশোধ নিতেই পরবর্তীতে সুগ্রীব হাত মিলিয়েছিলেন রামচন্দ্রের সাথে।
লড়াইটা শেষ পর্যন্ত আর ভাইয়ে-ভাইয়ে থাকেনি, তা হয়ে উঠেছিল আত্মসম্মান আর অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াই। বালী ও সুগ্রীবের এই দ্বন্দ্ব আসলে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রক্তের সম্পর্ক কত দ্রুত ক্ষমতার লোভে আর একটা ছোট্ট ভুল বোঝাবুঝিতে চিরশত্রুতায় বদলে যেতে পারে।

Comments
Post a Comment