৩৯তম বনপর্ব-অমরাবতীর রাজপথ ও অর্জুনের নিবাতকবচ যুদ্ধ
৩৯তম বনপর্ব-অমরাবতীর রাজপথ ও অর্জুনের নিবাতকবচ যুদ্ধ
কীরকম ছিল সেই অভিজ্ঞতা? অর্জুন যখন যুধিষ্ঠিরের সামনে এসে দাঁড়ালেন, তাঁর চোখে তখনো স্বর্গের সেই আশ্চর্য আলোর রেশ লেগে আছে। কিন্তু গলার স্বর অতি শান্ত। ঠিক যেভাবে একজন পরিব্রাজক তাঁর দীর্ঘ ভ্রমণের গল্প শোনান, অর্জুনও সেভাবেই শুরু করলেন।
"মহারাজ, শুনুন তবে। আমাদের এই মাটির পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে যখন দেবরাজের রথ এসে দাঁড়াল, আমার মনে কোনো দ্বিধা ছিল না। মাতলি এলেন ইন্দ্রের সেই দিব্য রথ নিয়ে। অশ্বদের গা থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে এক মায়াবী আলো। আমি আরোহণ করার আগে হিমালয় পর্বতকে মনে মনে প্রণাম জানালাম, চেয়ে নিলাম বিদায়ের অনুমতি।
তারপর রথ ছুটল। বাতাস আর মন— এই দুইয়ের গতিকে হার মানিয়ে যখন রথ ছুটে চলেছে মহাশূন্যের বুক চিরে, মাতলি হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে অবাক হলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে খেলা করে গেল মৃদু বিস্ময়। বললেন, 'ভারী অদ্ভুত তো! দেবরাজ ইন্দ্র স্বয়ং যখন এই রথে বসেন, তাঁর আসনও মাঝে মাঝে কেঁপে ওঠে। আর তুমি এমন স্থির, যেন কোনো এক অচেনা পাথরের মূর্তি! হে অর্জুন, তোমার এই মানসিক স্থৈর্য দেবরাজকেও টেক্কা দিতে পারে।'
আমি হাসলাম। মাতলি আমাকে একে একে দেখাতে লাগলেন দেবতাদের আশ্চর্য নগরী, তাঁদের উপবন, নন্দনকানন। অমরাবতীতে পৌঁছতেই এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো। সেখানে আমাদের পৃথিবীর মতো ঝলসানো রোদ নেই, হাড়কাঁপানো শীত নেই, নেই জরা আর বার্ধক্যের গ্লানি। রোগ-শোকের ছায়াটুকু পর্যন্ত সেখানে মাড়াতে পারে না কেউ। চারিদিকে কেবল আলোর খেলা। সেখানে দেখা হলো বসু, রুদ্র, সাধ্য ও অশ্বিনীকুমারদের সঙ্গে। তাঁদের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে আমি প্রবেশ করলাম ইন্দ্রের খাস দরবারে।
দেবরাজ নিজের সিংহাসনের অর্ধেক ছেড়ে দিলেন আমার জন্য। শুরু হলো আমার কঠোর অস্ত্রশিক্ষার দিনগুলো। এরই মাঝে গন্ধর্বরাজ চিত্রসেনের সঙ্গে আমার ভারী চমৎকার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তাঁর কাছে আমি শিখলাম গান, বাজনা আর নৃত্যের ব্যাকরণ। কিন্তু মহারাজ, স্বর্গের সেই নূপুরের নিক্বণ আর সুরের মূর্ছনা আমার মনকে বেঁধে রাখতে পারেনি। আমার লক্ষ্য ছিল স্থির। আমি কেবলই অস্ত্রের সাধনা করে গেছি। ইন্দ্র আমার এই একাগ্রতা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
তারপর একদিন ডাক পড়ল দেবরাজের ঘরে।
ইন্দ্র আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, 'বৎস অর্জুন, তুমি এখন অজেয়। স্বর্গের দেবতারাও তোমাকে যুদ্ধে পরাস্ত করতে পারবেন না। কিন্তু তোমার শিক্ষা তখনই পূর্ণ হবে, যখন তুমি গুরুদক্ষিণা দেবে। সমুদ্রের অতল অন্ধকারে বাস করে আমার পরম শত্রু দানব নিবাতকবচ। তার দর্প চূর্ণ করতে হবে তোমাকে। তাকে বধ করলেই তোমার এই ব্রত সাঙ্গ হবে।'
ইন্দ্র আমাকে দিলেন তাঁর তেজস্বী রথ, সারথি মাতলিকে, আর আমার মাথায় পরিয়ে দিলেন এক দেদীপ্যমান মুকুট। আমার গাণ্ডীব ধনুকে ছিলা পরিয়ে আমি যখন রথে উঠলাম, স্বর্গের দেবতারা ভিড় করে এলেন। তাঁরা বললেন, 'এই রথেই একদিন নমুচি, বৃত্র আর শম্বরের মতো দানবরা ধুলোয় মিশেছে। তুমিও জয়ী হবে, কুন্তীনন্দন।'
সমুদ্রের বুকে মৃত্যুর অর্কেস্ট্রা-
মহারাজ, রথ যখন সমুদ্রের কূলে এসে পৌঁছল, সে এক প্রলয়ংকর দৃশ্য! পাহাড়প্রমাণ ঢেউ আছড়ে পড়ছে বেলাভূমিতে। জলের গভীরে কিলবিল করছে হাজার হাজার হাঙর, কুমির আর তিমির দল। সেই ফেনিল নীল জলের ওপারেই ছিল দানবদের সুদৃশ্য নগরী।
আমি দেবদত্ত শঙ্খে ফুঁ দিলাম। সেই তীব্র কাঁপুনিতে কেঁপে উঠল সমুদ্রের বুক। নগরী থেকে পিলপিল করে বেরিয়ে এলো হাজার হাজার নিবাতকবচ দানব। তাদের হাতে শূল, গদা আর বিষাক্ত সব অস্ত্র। আকাশ থেকে মহর্ষিরা সেই মরণ-খেলা দেখতে জড়ো হলেন।
যুদ্ধ শুরু হতেই দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দানবরা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমার গাণ্ডীব থেকে তখন বিদ্যুতের মতো বাণ ছুটে যাচ্ছে। একের পর এক দানবের ছিন্ন মস্তক আছড়ে পড়তে লাগল মাটিতে। পাহাড়ের গা বেয়ে যেভাবে ঝরনা নামে, দানবদের শরীর থেকে ঠিক সেভাবেই রক্তের লাল স্রোত বয়ে যেতে লাগল সমুদ্রের নোনা জলে।
দানবরা তখন মায়াবিদ্যা শুরু করল। আকাশ থেকে নেমে এলো দানবীয় পাথরের বৃষ্টি। আমি ইন্দ্রাস্ত্র দিয়ে সেই পাথরগুলোকে শূন্যেই গুঁড়ো করে দিলাম। তারপর তারা নামিয়ে আনল এক মহাপ্লাবন। আমি প্রয়োগ করলাম 'বিশোষণ' অস্ত্র— মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত জল বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। এরপর এলো আগুন আর ঝড়ের মায়া। বারুণাস্ত্র আর শৈলাস্ত্র দিয়ে আমি তাদের সেই মায়াজালও কেটে ফেললাম।
উপায় না দেখে তারা অদৃশ্য হয়ে যুদ্ধ করতে লাগল। চারিদিক শূন্য, অথচ অনবরত আঘাত আসছে। আমি গাণ্ডীবে 'অদৃশ্যাস্ত্র' জুড়ে অন্ধের মতো বাণ ছুড়তে লাগলাম। কেবল শব্দের উৎস লক্ষ্য করে ধেয়ে গেল আমার তীর। হাজার হাজার নিবাতকবচ অদৃশ্য অবস্থাতেই লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। লাশের পাহাড়ে রথের চাকা বসে যাচ্ছিল, ঘোড়াগুলো মাটিতে পা ফেলার জায়গা না পেয়ে শূন্যে ডানা মেলল।
শেষ অস্ত্র হিসেবে তারা আবার আকাশ জুড়ে পাথরের বৃষ্টি শুরু করলে আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। মাতলি তখন রথের রাশ শক্ত করে ধরে চেঁচিয়ে উঠলেন, 'অর্জুন! আর বিলম্ব নয়, বজ্রাস্ত্র প্রয়োগ করো!'
আমি আর দ্বিধা করিনি। দেবরাজের সেই পরম প্রিয় অভ্রান্ত অস্ত্রটি গাণ্ডীবে জুড়ে মন্ত্রপূত করে ছেড়ে দিলাম। এক তীব্র আলোর ঝলকানিতে আকাশ চিরে গেল। লোহার মতো শক্ত, বজ্রের মতো তীব্র সেই বাণের আঘাতে দানবদের সমস্ত প্রতিরোধ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। মহীরুহের মতো তারা একের পর এক আছড়ে পড়ল মাটিতে। আশ্চর্যের বিষয়, এত বড় ধ্বংসযজ্ঞের পরেও আমাদের রথ বা ঘোড়াগুলোর একটা আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি।
মাতলি আমার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসলেন। বললেন, 'অর্জুন, তোমার এই বিক্রম দেখে স্বয়ং দেবতারাও আজ লজ্জিত হবেন।'
একটি আশ্চর্য নগরী ও ব্রহ্মার বিধান-
যুদ্ধ শেষ হলে আমরা সেই নগরীতে প্রবেশ করলাম। তখন চারদিক থেকে ভেসে আসছে অসুর রমণীদের বুকফাটা কান্নার রোল। কিন্তু নগরীটি দেখে আমার চোখ জুড়িয়ে গেল। কী অপূর্ব তার স্থাপত্য! কী অনিন্দ্য তার কারুকার্য!
আমি মাতলিকে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'মাতলি, এত সুন্দর একটা নগরী দেবতাদের নয় কেন? এ তো অমরাবতীর চেয়েও সুন্দর!'
মাতলি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'একসময় এটা দেবতাদেরই ছিল অর্জুন। কিন্তু ব্রহ্মার বরে বলীয়ান হয়ে নিবাতকবচেরা দেবতাদের এখান থেকে তাড়িয়ে দেয়। ইন্দ্র যখন ব্রহ্মার কাছে এদের ধ্বংসের উপায় জানতে চান, ব্রহ্মা বলেছিলেন— "তুমি নিজে এদের মারতে পারবে না ইন্দ্র। অন্য কোনো মানবদেহে ভর করে তোমাকে এদের বিনাশ করতে হবে।" আজ তোমার রূপ ধরে দেবরাজ নিজেই তাঁর অস্ত্র দিয়ে এদের বিনাশ করলেন। তুমি তো আসলে তাঁরই অংশ।'
মহারাজ, এভাবেই সমুদ্রের সেই অন্ধকার দূর করে, সেখানে আবার শান্তির আলো জ্বালিয়ে আমি আর মাতলি আবার স্বর্গের দিকে রথ ছুটিয়ে দিলাম। আমার গুরুদক্ষিণা সম্পূর্ণ হয়েছিল।"
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৩৯তম ভাগের আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
বনপর্বের ৩৮তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment