২৫তম বনপর্ব- তরঙ্গের গর্ভে ইতিহাস: মহেন্দ্র পর্বতে পরশুরামের মহাবিস্ময়
২৫তম বনপর্ব- তরঙ্গের গর্ভে ইতিহাস: মহেন্দ্র পর্বতে পরশুরামের মহাবিস্ময়
কৌশিকী নদীর পুণ্যসলিলে অবগাহন সেরে পাণ্ডবেরা যখন অন্য তীর্থের অভিমুখে যাত্রা করলেন, তখন তাঁদের সাথে রয়েছেন লোমশ মুনি। লোমশ মুনি তাঁদের নিয়ে চললেন যেখানে গঙ্গা সাগরের সাথে মিতালী করেছে, সেই মহাসঙ্গমে। সমুদ্রের তীরবর্তী সেই সংকীর্ণ বালুকাপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে একসময় তাঁরা এসে পৌঁছলেন কলিঙ্গ দেশে।
চারিদিকে গম্ভীর সমুদ্রের গর্জন। মহর্ষি লোমশ হাত তুলে দেখালেন, "যুধিষ্ঠির, ওই দ্যাখ— ওটাই বৈতরণী নদী।"
পাণ্ডবেরা এবং দ্রৌপদী সেই বৈতরণীর পবিত্র জলে দাঁড়িয়ে তাঁদের পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে পরম শ্রদ্ধায় তর্পণ করলেন। জল আর বাতাসের সেই যুগলবন্দীর পর তাঁরা এগিয়ে চললেন মহেন্দ্র পর্বতের দিকে। সেই রাতেই তাঁরা পাহাড়ের কোলে আশ্রয় নিলেন। সেখানে ভৃগু, অঙ্গিরা, বশিষ্ঠের মতো কশ্যপ বংশের প্রথিতযশা ঋষিরা তপস্যায় মগ্ন ছিলেন। লোমশ মুনি পাণ্ডবদের সাথে তাঁদের পরিচয় করিয়ে দিতেই যুধিষ্ঠির ভক্তিভরে তাঁদের চরণে প্রণাম জানালেন।
ঠিক সেই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন পরশুরামের পরম শিষ্য অকৃতব্রণ। যুধিষ্ঠির কৌতূহলী হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "হে মহাত্মন, মহাবীর পরশুরাম যখন ঋষিদের সাথে দেখা করতে আসেন, আমারও বড় ইচ্ছে করে তাঁর দর্শন পেতে। তিনি কবে আসবেন?"
অকৃতব্রণ স্মিত হেসে বললেন, "পরশুরাম তো অন্তর্যামী, তিনি সবার মনের কথা জানেন। এতক্ষণে হয়তো তোমাদের আগমনের বার্তা তাঁর কাছে পৌঁছে গেছে। তিনি সাধারণত চতুর্থী আর অষ্টমী তিথিতে এই আশ্রমে ঋষিদের দর্শন দিতে আসেন। সৌভাগ্যবশত, আগামীকালই চতুর্থী। তিনি নিশ্চয়ই আসবেন। তবে তিনি আসার আগে, এসো তোমাদের জমদগ্নি-পুত্র পরশুরামের সেই রোমাঞ্চকর উপাখ্যান শোনাই।"
ভৃগুবংশের সেই আশ্চর্য নিয়তি
অকৃতব্রণ বলতে শুরু করলেন, "শোনো যুধিষ্ঠির, যাকে তোমরা পরশুরাম বা কুঠারধারী রাম নামে চেনো, তাঁর কাহিনীর সূত্রপাত কিন্তু তাঁর জন্মের বহু আগে, তাঁর পূর্বপুরুষদের এক অদ্ভুত নিয়তির হাত ধরে।
সে বহু প্রাচীনকাল। গাধি নামে এক রাজা রাজ্য ছেড়ে বনে চলে এসেছিলেন তপস্যা করতে। সেই বনেই থাকতেন ভৃগুবংশের তেজস্বী ঋষি ঋচীক। একদিন গাধি রাজার পরমাসুন্দরী কন্যা সত্যবতীকে দেখে ঋচীক তাঁকে বিবাহ করতে চাইলেন। রাজা অসম্মত হলেন না, তবে একটা কঠিন শর্ত দিলেন— কন্যাপণ হিসেবে দিতে হবে এক হাজার এমন ঘোড়া, যারা চাঁদের মতো সাদা কিন্তু তাদের একটি কান হবে কাকের মতো কালো। ঋষি ঋচীক তাঁর তপোবলে বরুণ দেবতাকে সন্তুষ্ট করে ঠিক তেমনই এক হাজার ঘোড়া এনে রাজাকে দিলেন এবং সত্যবতীকে পত্নী হিসেবে গ্রহণ করলেন।
কিছুকাল পর, মহর্ষি ভৃগু তাঁর পুত্র ও পুত্রবধূকে আশীর্বাদ করতে এলেন। সত্যবতীর সেবা ও ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে তিনি তাঁকে একটি বর দিতে চাইলেন। সত্যবতী নিজের জন্য এবং নিজের মায়ের (রাণীর) জন্য একটি করে পুত্রসন্তান চাইলেন। ভৃগু সম্মত হলেন। তিনি মন্ত্রপূত করে দু'টি আলাদা 'চরু' (পবিত্র অন্ন) প্রস্তুত করলেন। সত্যবতীকে বললেন, 'তুমি যজ্ঞডুমুর গাছকে আলিঙ্গন করে নিজের চরুটি খাবে, আর তোমার মাতা অশ্বত্থ গাছকে আলিঙ্গন করে তাঁর চরুটি খাবেন।'
ভৃগু চেয়েছিলেন তাঁর পুত্রবধূ সত্যবতীর গর্ভে আসুক এক শান্ত, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ সন্তান, আর রাণীর গর্ভে জন্ম নিক এক পরাক্রমশালী, যুদ্ধপ্রিয় ক্ষত্রিয় বীর। কিন্তু নিয়তির পরিহাস! মা ও মেয়ে না বুঝেই তাঁদের চরু দুটি অদলবদল করে ফেললেন, এমনকি ভুল গাছকে আলিঙ্গন করলেন। সত্যবতী খেয়ে ফেললেন ক্ষত্রিয়ের তেজযুক্ত অন্ন, আর তাঁর মা খেলেন ব্রাহ্মণের শান্ত গুণসম্পন্ন অন্ন।
মহর্ষি ভৃগু তাঁর দিব্যদৃষ্টিতে সবটা বুঝতে পেরে ব্যাকুল হয়ে সত্যবতীকে বললেন, 'এ কী করলে বত্স! তোমার গর্ভে তো এখন এক উগ্র, ভয়ঙ্কর ক্ষত্রিয়ভাবাপন্ন সন্তান আসবে, আর তোমার মায়ের গর্ভে জন্মাবে শান্ত ব্রাহ্মণ।' সত্যবতী কান্নায় ভেঙে পড়ে শ্বশুরের পায়ে ধরলেন, 'আমার পুত্র যেন এমন উগ্র না হয় পিতা! প্রয়োজনে আমার পৌত্র (নাতি) যেন তেমন রূপ ধারণ করে।' ভৃগু দয়াপরবশ হয়ে বললেন, 'তাই হোক। তোমার পুত্র শান্তই হবে, কিন্তু তোমার পৌত্র হবে অত্যন্ত ভয়ানক, যার প্রতাপে পৃথিবী কাঁপবে।'
সেই অনুযায়ী, সত্যবতীর গর্ভে জন্ম নিলেন পরম জ্ঞানী ও শান্ত প্রকৃতির ঋষি জমদগ্নি। আর ওদিকে রাণীর গর্ভে জন্ম নিলেন বিশ্বামিত্র— যিনি ক্ষত্রিয় বংশে জন্মেও কঠোর তপস্যা দিয়ে হয়ে উঠলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মর্ষি। এইভাবে এক অন্নবদলের ঘটনায় ওলটপালট হয়ে গেল দুটি বংশের ইতিহাস।"
রামের জন্ম ও রেণুকার পতন
"জমদগ্নি বড় হয়ে রাজকন্যা রেণুকাকে বিবাহ করলেন। তাঁদের একে একে চারটি শান্ত স্বভাবের পুত্র হলো। কিন্তু সবার শেষে যিনি জন্ম নিলেন, তিনি হলেন রাম। বহু প্রজন্ম আগের সেই ক্ষত্রিয়ের উগ্র তেজ এই রামের রক্তে এসে খেলা করে উঠল।
জমদগ্নি সপরিবারে বনের আশ্রমে থাকতেন। একদিন রেণুকা নদীতে জল আনতে গেলেন। সেখানে তিনি দেখলেন, গন্ধর্বরাজ চিত্ররথ তাঁর রাণীদের নিয়ে জলকেলি করছেন। তাঁদের সেই আনন্দঘন মুহূর্ত দেখে রেণুকার মনে ক্ষণিকের জন্য একটু ভালোলাগা বা চপলতার উদয় হলো— মনের এক অতি সূক্ষ্ম বিচ্যুতি, যা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু আশ্রমে বসে জমদগ্নি তাঁর তপোবলে স্ত্রীর মনের এই চঞ্চলতা টের পেয়ে ক্রোধে অন্ধ হয়ে গেলেন।
তিনি তাঁর প্রথম চার পুত্রকে একে একে ডেকে আদেশ দিলেন, 'তোমাদের মাতার শিরশ্ছেদ করো!' মাতৃহত্যার মতো মহাপাপের কথা শুনে চার ছেলেই স্তব্ধ হয়ে গেল, তারা পিতার আদেশ অমান্য করল। ক্রুদ্ধ জমদগ্নি অভিশাপ দিয়ে সেই চারজনকেই জড়বুদ্ধি ও চেতনাহীন করে দিলেন।
শেষে জমদগ্নি ডাকলেন ছোট ছেলে রামকে। রাম পিতার আদেশ শোনামাত্রই কোনো দ্বিধা বা প্রশ্ন না করে তাঁর পরশু (কুঠার) তুলে নিলেন এবং এক কোপে মায়ের মাথা কেটে ফেললেন।"
পিতার বর ও পরিবারের পুনর্জীবন
"পুত্রের এই অবিচল পিতৃভক্তি দেখে জমদগ্নির ক্রোধ নিমেষের মধ্যে জল হয়ে গেল। তিনি পরম তৃপ্তিতে বললেন, 'বৎস রাম, আমি তোমার ওপর অত্যন্ত প্রীত হয়েছি। তুমি যা চাও, বর চেয়ে নাও।'
রামের মন তো মায়ের জন্য কাঁদছিল। তিনি তৎক্ষণাৎ বললেন, 'পিতা, যদি বর দিতেই হয়, তবে আমার মাকে এমনভাবে বাঁচিয়ে তুলুন যেন তাঁর মনেই না থাকে যে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল— যেন এক গভীর ঘুম থেকে উঠলেন তিনি। আমার দাদাদের আবার স্বাভাবিক চেতনা ফিরিয়ে দিন। আর আমাকে দীর্ঘায়ু এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অপরাজেয় হওয়ার বর দিন।'
জমদগ্নি সমস্ত বরই মঞ্জুর করলেন। রেণুকা দেবী সুস্থ হয়ে জেগে উঠলেন, দাদারা ফিরে পেলেন তাঁদের চেতনা। আর রাম লাভ করলেন অসীম শক্তি ও দীর্ঘ জীবন।"
ক্ষত্রিয় নিধন ও মহেন্দ্র পর্বতে প্রস্থান
"এর কিছুকাল পরের ঘটনা। কার্তবীর্য অর্জুন নামের এক সহস্রবাহু (হাজার হাত বিশিষ্ট) শক্তিশালী রাজা শিকার করতে করতে জমদগ্নির আশ্রমে এসে হাজির হলেন। জমদগ্নির কাছে ছিল এক অলৌকিক কামধেনু (ইচ্ছাপূরণকারী গাভী)। সেই গরুর প্রভাবে ঋষি নিমেষের মধ্যে রাজা ও তাঁর বিশাল সেনাবাহিনীর জন্য রাজকীয় ভোজের ব্যবস্থা করলেন।
রাজার মনে লোভ জাগল। তিনি ঋষির কাছে সেই কামধেনু দাবি করলেন। জমদগ্নি অস্বীকার করায় রাজার সৈন্যরা জোর করে আশ্রম ভাঙচুর করে সেই পবিত্র গরুকে নিয়ে চলে গেল। রাম আশ্রমে ফিরে যখন এই অপমানের কথা শুনলেন, তাঁর চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরতে লাগল। তিনি একাই তাড়া করলেন কার্তবীর্য অর্জুনকে। এক ভয়ানক যুদ্ধে রাম রাজার এক হাজার হাত কেটে ফেলে তাঁকে বধ করলেন এবং কামধেনুকে উদ্ধার করে নিয়ে এলেন।
কিন্তু প্রতিশোধের আগুন এখানেই নিভল না। কার্তবীর্য অর্জুনের পুত্রেরা একদিন সুযোগ বুঝে, রাম যখন আশ্রমে ছিলেন না, তখন শান্ত জমদগ্নি ঋষিকে নির্মমভাবে হত্যা করল।
ফিরে এসে পিতার রক্তাক্ত দেহ দেখে রামের শোক মুহূর্তে এক প্রলয়ংকরী ক্রোধে রূপান্তরিত হলো। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, এই পৃথিবী থেকে ক্ষত্রিয় বংশকে তিনি নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। কুঠার হাতে নিয়ে তিনি বছরের পর বছর ধরে ক্ষত্রিয় নিধন যজ্ঞ চালালেন। মোট একুশ বার তিনি পৃথিবীকে ক্ষত্রিয়শূন্য করলেন। বলা হয়, ক্ষত্রিয়দের রক্ত দিয়ে তিনি পাঁচটি বিশাল হ্রদ তৈরি করেছিলেন এবং সেই রক্ত দিয়েই পিতৃপুরুষের তর্পণ করেছিলেন।
যখন তাঁর ক্রোধ শান্ত হলো, রাম এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করলেন। চরম বৈরাগ্যে তিনি তাঁর জয় করা সমস্ত পৃথিবী ঋষি কশ্যপকে দান করে দিলেন, নিজের জন্য এক কাঠা জমিও রাখলেন না। তারপর সমস্ত অস্ত্র ত্যাগ করে, তপস্যার উদ্দেশ্যে চলে এলেন এই মহেন্দ্র পর্বতে। এখানেই তিনি চিরকাল ধরে বাস করছেন। মাঝে মাঝে তিনি এখানে সমবেত হওয়া ঋষিদের দেখা দেন। আর ঠিক আগামীকাল, ওই চতুর্থী তিথিতেই তিনি তোমাদের সাথেও দেখা করতে আসছেন।"
অকৃতব্রণের মুখে এই রোমহর্ষক কাহিনী শুনতে শুনতে পাণ্ডবেরা রোমাঞ্চিত হলেন এবং পরশুরামের দর্শনের প্রতীক্ষায় রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত2ফমহাভারতের বনপর্বের ২৫তম ভাগের আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
বনপর্বের ২৪তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment