সপ্তমভাগ বিরাটপর্ব -বিরাট রাজার রাজপুত্র উত্তর আর বৃহন্নলা অর্জুন: এক আত্মআবিষ্কারের গল্প


সপ্তমভাগ বিরাটপর্ব -বিরাট রাজার রাজপুত্র উত্তর আর বৃহন্নলা অর্জুন: এক আত্মআবিষ্কারের গল্প

বিরাট রাজার নগরে তখন শ্মশানের নিস্তব্ধতা। ত্রিগর্ত সেনার পিছু নিয়ে রাজা স্বয়ংশে সৈন্যদলের একটা বড় অংশ নিয়ে বেরিয়েছেন গোধন উদ্ধার করতে। আর ঠিক সেই অরক্ষিত মুহূর্তটারই তো অপেক্ষায় ছিলেন হস্তিনাপুরের দুর্যোধন। এমন সুযোগ বারবার আসে না— রাজা নগরের বাইরে, রাজধানীর প্রতিরক্ষা দুর্বল, আর সামনে পড়ে আছে হাজার হাজার অরক্ষিত গবাদিপশু। দুর্যোধন তাই আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করলেন না। মন্ত্রী ও প্রধান প্রধান বীরদের সঙ্গে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বিরাটনগরের ওপর। ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা, শকুনি, দুঃশাসন, বিকর্ণ, চিত্রসেন— কে নেই সেই তালিকায়! প্রায় ষাট হাজার গোধন রথের বেড়া দিয়ে ঘিরে তাঁরা তাড়িয়ে নিয়ে চললেন হস্তিনাপুরের দিকে।

গোপালগণ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল বটে, কিন্তু ঐ কালান্তক মহারথীদের সামনে তাদের সেই প্রচেষ্টা ছিল নিতান্তই করুণ ও নিরুপায়। কৌরব সেনাদের হাতে মার খেয়ে, রক্তাক্ত হয়ে তারা আর্তনাদ করতে করতে ছুটল। তাদের সর্দার কোনোমতে একটা রথ জোগাড় করে ফিরে এল নগরে। সোজা গিয়ে ঢুকল রাজপ্রাসাদে। সেখানে দেখা মিলল বিরাট রাজার পুত্র ভূমিঞ্জয়ের— যাকে সবাই চেনে উত্তর নামে।

গোপরাজ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল— "রাজকুমার, কৌরবরা আমাদের ষাট হাজার গরু নিয়ে চলে যাচ্ছে! মহারাজ যাওয়ার সময় সভায় আপনার কথাই বলে গিয়েছিলেন— বলেছিলেন, আমার এই ছেলে কুলদীপক, আমারই মতো বীর। এখন আপনিই একমাত্র ভরসা, শীঘ্র গিয়ে গোধন রক্ষা করুন।"

উত্তর তখন অবস্থান করছিলেন অন্তঃপুরে, নারীমহলের আরামদায়ক জগতে। যেখানে বসে যুদ্ধ আর বীরত্বের কথা বলাটাই সবচেয়ে সহজ কাজ। খবরটা শোনামাত্রই যেন ওঁর অহংকারের ফানুসটা ফুলে উঠল। বুক ফুলিয়ে তিনি বলে উঠলেন— "যেদিকেই গোধন নিয়ে যাক না কেন, আমি যাবই! আমার শস্ত্রাগারে ধারালো অস্ত্রের কোনো অভাব নেই। শুধু একটাই সমস্যা— একজন যোগ্য সারথি চাই, যে রথ চালনায় নিপুণ। তুমি গিয়ে সেরকম একজনকে খুঁজে আনো। তারপর দেখো, দেবরাজ ইন্দ্র যেমন দানবদের কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন, আমিও তেমনি দুর্যোধন, ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপাচার্য, কর্ণ, অশ্বত্থামা— এই সব মহাধনুর্ধরদের এক নিমেষে উড়িয়ে দিয়ে গোধন ফিরিয়ে আনব। যুদ্ধে আমার পরাক্রম দেখে ওরা নিশ্চয়ই ভাববে, এ কি সাক্ষাৎ অর্জুন নাকি!"

কথাগুলো বলতে বলতে উত্তরের চোখেমুখে এক অদ্ভুত উত্তেজনার আলো ফুটছিল— যেমনটা হয় যখন মানুষ নিজের কল্পনায় নিজেকেই এক বীরপুরুষ বানিয়ে ফেলে, অথচ সেই কল্পনার পরীক্ষা তখনও বাস্তব রণক্ষেত্রে হয়নি। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন দ্রৌপদী। বারবার উত্তরের মুখে অর্জুনের নাম শুনতে শুনতে ওঁর মনে একটা চাপা ব্যথার মোচড় লেগে উঠল। এই বালকটি কী অনায়াসে উচ্চারণ করছে সেই নামটা, যে নাম এখন এই রাজপ্রাসাদেরই এক অন্ধকার কোণে, নাচঘরের নূপুরধ্বনি আর ছদ্মবেশে চুপচাপ লুকিয়ে আছে!

দ্রৌপদী আর থাকতে পারলেন না। এগিয়ে গিয়ে উত্তরকে বললেন— "ঐ যে হাতির মতো বিশাল, সুদর্শন যুবক, নাম বৃহন্নলা— ও আগে অর্জুনের সারথি ছিল। ওকে যদি সারথি করে নেন, আপনার নিশ্চিত জয় হবে, গোধনও ফিরে আসবে।"

সৈরন্ধ্রীর কথা শুনে উত্তর তখনই ডাকলেন তাঁর বোন উত্তরাকে— "যাও তো ভগ্নী, বৃহন্নলাকে ডেকে আনো শীঘ্র।"

উত্তরা ছুটে গেলেন নাচঘরে। বৃহন্নলাকে দেখে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন— "কী ব্যাপার রাজকুমারী, এখানে যে?"

উত্তরা বিনীতভাবে বললেন— "বৃহন্নলা, কৌরবরা আমাদের রাজ্যের গোধন লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। আমার ভাই তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। তুমি ওর রথের সারথি হও, কৌরবরা বেশি দূর যাওয়ার আগেই পৌঁছে যাও।"

বৃহন্নলারূপী অর্জুন চুপচাপ উঠে এলেন রাজকুমার উত্তরের কাছে। উত্তর তাঁকে দেখে দেমাগের সুরে বললেন— "বৃহন্নলা, আমি যখন গোধন ফেরাতে যুদ্ধ করব, তখন তুমি ঘোড়াগুলো ভালো করে সামলে রেখো। শুনেছি তুমি নাকি আগে অর্জুনের সারথি ছিলে, তোমার জন্যই নাকি সে সারা জগৎ জয় করেছিল!"

উত্তর তখন গায়ে কবচ পরলেন, রথে সিংহচিহ্নিত ধ্বজা লাগানো হলো, দামি ধনুক আর তীক্ষ্ণ বাণ নিয়ে প্রস্তুত হলেন যুদ্ধের জন্য। উত্তরা আর তাঁর সখীরা তখন হাসতে হাসতে বলল— "বৃহন্নলা, ভীষ্ম-দ্রোণদের হারিয়ে আমাদের পুতুলের জন্য রংবেরঙের রেশমি কাপড় নিয়ে এসো কিন্তু!"

অর্জুন হেসে বললেন— "এই রাজকুমার যদি ওদের হারাতে পারে, তাহলে আমি নিশ্চয়ই তোমাদের সুন্দর কাপড় এনে দেব।" সেই হাসিটার পেছনে কতটা করুণা আর কতটা কৌতুক মিশে ছিল, তা বোঝার ক্ষমতা মৎস্যদেশের রাজকন্যার তখনও হয়নি।

বি:দ্র: অর্জুনের বৃহন্নলা হবার কাহিনিটি ঝালিয়ে নিতে এখানে ক্লিক করুন। 

নগরের বাইরে এসে উত্তর নির্দেশ দিলেন— "যেদিকে কৌরবরা গেছে, সেদিকে রথ নাও। আমি ওদের সবাইকে হারিয়ে গোধন নিয়ে এক্ষুনি ফিরে আসব।"

অর্জুন ঘোড়ার লাগাম আলগা করে দিলেন। রাজরথ যেন বাতাসের বেগে ভেসে চলল। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরই সামনে ভেসে উঠল সেই বিশাল কৌরব বাহিনী— হাতি, ঘোড়া, রথ আর পতাকার এক অনন্ত সমুদ্র! যার মধ্যে কর্ণ, দুর্যোধন, কৃপাচার্য, ভীষ্ম, অশ্বত্থামা পাহারায় দাঁড়িয়ে।

সেই কালান্তক দৃশ্য দেখা মাত্রই উত্তরের বুকের মধ্যে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। এতক্ষণ অন্তঃপুরে বসে যে বীরত্বের ফানুস তিনি উড়িয়েছিলেন, তা এক মুহূর্তে চুরমার হয়ে গেল। হাত থেকে ধনুক খসে পড়ল, কাঁপা গলায় উত্তর বললেন— "বৃহন্নলা, আমার এত ক্ষমতা নেই যে এদের সঙ্গে যুদ্ধ করি! দেখো আমার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছে। এত বীর একসঙ্গে— দেবতারাও ভয় পাবে এদের সামনে দাঁড়াতে! আমি তো নিছক বালক, ঠিকমতো অস্ত্রবিদ্যাও শিখিনি। একা কী করে এদের মোকাবিলা করব? চলো ফিরে যাই!"

বৃহন্নলা শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বললেন— "রাজকুমার, অন্তঃপুরে বসে নিজের পুরুষার্থের এত অহংকার করে বেরিয়েছিলে, এখন কেন পিছিয়ে যাচ্ছ? এভাবে ফিরে গেলে সারা রাজধানী তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে। সৈরন্ধ্রী আমাকে তোমার সারথি করে পাঠিয়েছে, গোধন উদ্ধার না করে আমিও ফিরব না।"

উত্তর তবু কান্নাকাটি শুরু করলেন— "বৃহন্নলা, গোধন যাক, নারী-পুরুষ সবাই মিলে আমাকে নিয়ে হাসুক, তাতে আমার কিছু যায় আসে না! কিন্তু যুদ্ধ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।" এই বলে রাজকুমার মান-সম্মান আর বংশমর্যাদার কথা ভুলে রথ থেকে লাফিয়ে নেমে অস্ত্র ফেলে উল্টোদিকে দৌড় লাগালেন!

বৃহন্নলা বললেন— "বীর ক্ষত্রিয়দের চোখে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালানো মরণের চেয়েও লজ্জার!" এই বলে তিনি রথ থেকে নেমে ছুটে গিয়ে পালিয়ে যাওয়া উত্তরকে ধরে ফেললেন। উত্তর তখন লজ্জাহীন হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন— "বৃহন্নলা, শীঘ্র রথ ফেরাও! বেঁচে থাকলে আরও অনেক ভালো দিন দেখা যাবে!"

উত্তরের এই কাতর মিনতি শুনেও অর্জুন মুচকি হেসে তাকে টেনে নিয়ে এলেন রথের কাছে। বললেন— "রাজকুমার, যদি শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করার সাহস না-ই থাকে, তবে তুমি শুধু ঘোড়া সামলাও, যুদ্ধটা আমি করব। ভয় পেয়ো না, আমার বাহুবলেই তোমাকে রক্ষা করব। তুমি তো ক্ষত্রিয় সন্তান, শত্রুর সামনে দাঁড়াতে ভয় কীসের? দেখো, আমি এই দুর্জয় সেনার মধ্যে ঢুকে কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করব, তোমাদের গোধন ছাড়িয়ে আনব। তুমি শুধু সারথির কাজটা করো।" এই বলে অর্জুন ভয়ার্ত উত্তরকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আবার রথে বসালেন।

ওদিকে কৌরব সেনাদলে তখন হঠাৎ চাঞ্চল্য। ভীষ্ম-দ্রোণ প্রমুখ প্রধান প্রধান যোদ্ধারা যখন দেখলেন, এক নপুংসকবেশী মানুষ রাজকুমার উত্তরের রথ নিয়ে শমীবৃক্ষের দিকে যাচ্ছে, তখন তাঁদের মনে একটা অজানা আশঙ্কা দানা বাঁধতে লাগল। অস্ত্রবিদ্যায় বিশারদ দ্রোণাচার্য পিতামহ ভীষ্মকে ফিসফিস করে বললেন— "গঙ্গাপুত্র, এই নারীবেশধারীকে আমার ইন্দ্রপুত্র অর্জুন বলেই মনে হচ্ছে! সে নিশ্চয়ই আমাদের হারিয়ে গোধন নিয়ে যাবে। এই সৈন্যদলে ওর সামনে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। শুনেছি, হিমালয়ে তপস্যার সময় সে কিরাতবেশী স্বয়ং মহাদেবকেও যুদ্ধে হারিয়েছিল।"

বি:দ্র: কিরাতবেশী স্বয়ং মহাদেবকে যুদ্ধে কিভাবে হারিয়েছিল তা ঝালিয়ে নিতে এখানে ক্লিক করুন।

কর্ণ তখন বিরক্ত হয়ে বললেন— "আচার্য, আপনি সবসময় অর্জুনের প্রশংসা করে আমাদের ছোট করেন! কিন্তু অর্জুন আমার আর দুর্যোধনের ষোলো ভাগের এক ভাগও নয়।"

দুর্যোধন বললেন— "আরে কর্ণ, এ যদি সত্যিই অর্জুন হয়, তাহলে তো আমাদের কাজ হয়েই গেল! ওকে চিনে ফেললেই তো পাণ্ডবদের আবার বারো বছর বনবাসে যেতে হবে! আর যদি অন্য কেউ নপুংসকের ছদ্মবেশে আসে, তাহলে তো আমি তাকে তীক্ষ্ণ বাণে ধরাশায়ী করবই।"

এদিকে অর্জুন শমীবৃক্ষের কাছে রথ থামিয়ে উত্তরকে বললেন— "রাজকুমার, শীঘ্র এই গাছ থেকে আমার ধনুক নামিয়ে আনো। তোমার ধনুক আমার হাতের জোর সইবে না। এই গাছেই পাণ্ডবদের অস্ত্র লুকানো আছে।"

বি:দ্র:শমীবৃক্ষে অস্ত্র লুকিয়ে রাখার কাহিনিটি ঝালিয়ে নিতে  এখানে ক্লিক করুন 

উত্তর অবাক হয়ে রথ থেকে নেমে গাছে উঠলেন। অর্জুন তাড়া দিলেন— "তাড়াতাড়ি নামিয়ে আনো, দেরি কোরো না! ওপরের কাপড়টা খুলে ফেলো তাড়াতাড়ি।"

উত্তর পাণ্ডবদের সেই অসামান্য ধনুকগুলো নিয়ে নেমে এলেন। কাপড়ের বাঁধন খুলতেই সূর্যের আলোয় সেগুলো এক অদ্ভুত দিব্য জ্যোতি ছড়াতে লাগল। উত্তর জিজ্ঞেস করলেন— "এগুলো কার ধনুক, বৃহন্নলা?"

অর্জুন একে একে হাত ছোঁয়ালেন ধনুকগুলোতে— "রাজকুমার, এটি অর্জুনের বিখ্যাত গাণ্ডীব। যুদ্ধক্ষেত্রে এটি এক নিমেষে শত্রুসেনা ধ্বংস করে। ত্রিভুবনে এর খ্যাতি, সব অস্ত্রের মধ্যে এটিই শ্রেষ্ঠ, এক লাখ অস্ত্রের মোকাবিলা করতে পারে এটি একাই। প্রথমে এক হাজার বছর এটি ব্রহ্মার কাছে ছিল, তারপর পাঁচশো তিন বছর প্রজাপতির কাছে, পঁচাশি বছর ইন্দ্রের কাছে, পাঁচশো বছর চন্দ্রের কাছে, একশো বছর বরুণের কাছে। এখন সাড়ে বত্রিশ বছর ধরে এটি অর্জুনের কাছে রয়েছে। ঐ যে সোনার কারুকাজ করা ধনুকটা, ওটা ভীমসেনের। তৃতীয়টা যুধিষ্ঠিরের, চতুর্থটা নকুলের, আর পঞ্চমটা মাদ্রীপুত্র সহদেবের।"

উত্তর তখন বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলেন— "বৃহন্নলা, এত বড় বড় মহাত্মাদের এই অস্ত্র এখানে, কিন্তু তাঁরা নিজেরা কোথায়? অর্জুন, যুধিষ্ঠির, ভীম, নকুল, সহদেব— এঁরা সবাই কোথায় আছেন? আর সেই নারীরত্ন দ্রৌপদীই বা কোথায়?"

অর্জুন একটুক্ষণ থামলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন— "আমিই অর্জুন। তোমার বাবার সভাসদ কঙ্ক আসলে যুধিষ্ঠির, রাঁধুনি বল্লব ভীমসেন, অশ্বশিক্ষক গ্রন্থিক নকুল, গোপালক তন্ত্রিপাল সহদেব— আর যাঁর জন্য কীচক নিহত হয়েছিল, সেই সৈরন্ধ্রীই দ্রৌপদী।"

উত্তর তবু সন্দিগ্ধ হয়ে বললেন— "আমি অর্জুনের দশটা নাম শুনেছি। তুমি যদি সেই নামগুলোর কারণ বলতে পারো, তবেই বিশ্বাস করব।"

অর্জুন তখন মেঘগম্ভীর স্বরে একে একে বলে গেলেন— "আমি সমস্ত দেশ জয় করে ধনের অধিপতি হয়েছিলাম, তাই আমার নাম 'ধনঞ্জয়'। যুদ্ধে গিয়ে শত্রুকে না হারিয়ে কখনো ফিরি না, তাই আমি 'विजय'। রথে সাদা ঘোড়া লাগানো থাকে, তাই আমি 'শ্বেতবাহন'। উত্তরফাল্গুনী নক্ষত্রে হিমালয়ে জন্ম, তাই আমি 'ফাল্গুনী'। দানবযুদ্ধে ইন্দ্র আমার মাথায় কিরীট পরিয়েছিলেন, তাই আমি 'কিরীটী'। যুদ্ধে কখনো নীচ কাজ করি না, তাই 'বীভৎসু'। গাণ্ডীব চালনায় আমার দুই হাতই সমান কুশল, তাই আমি 'সব্যসাচী'। আমার গায়ের রং ও কাজ দুই-ই শুদ্ধ, তাই 'অর্জুন'। আমি দুর্লভ, দুর্জয়, ইন্দ্রের পুত্র, তাই 'জিষ্ণু'। আর আমার দশম নাম 'কৃষ্ণ'— কারণ আমার গায়ের রং উজ্জ্বল কালো এবং ছোটবেলায় আমি ছিলাম সবার প্রিয়।"

News

এতসব শুনে বিরাটপুত্র উত্তর অর্জুনকে প্রণাম করে বললেন— "আমি ভূমিঞ্জয়, অপর নাম উত্তর। আজ আমার বড় সৌভাগ্য যে পৃথাপুত্র অর্জুনের দর্শন পেলাম। আপনাকে চিনতে না পেরে যা যা অন্যায় কথা বলেছি, তার জন্য ক্ষমা করুন। আপনি রথে উঠুন, আমি সারথি হয়ে যেখানে বলবেন সেখানেই নিয়ে যাব।"

অর্জুন বললেন— "পুরুষশ্রেষ্ঠ, তোমার ওপর আমি প্রসন্ন হয়েছি। ভয় পেয়ো না, তোমার সব শত্রুকে আমি হারাব। শান্তভাবে দেখো, আমি যুদ্ধে কেমন লড়ি।"

উত্তর বললেন— "আমার ভয় কেটে গেছে। বলুন এখন কী করতে হবে। আমি বাবার কাছে সারথির কাজ শিখেছি, আপনার রথের ঘোড়া ঠিকঠাক চালাতে পারব।"

অর্জুন তখন শুদ্ধভাবে রথের ওপর পূর্বমুখী হয়ে বসলেন, একাগ্রচিত্তে স্মরণ করলেন সমস্ত দিব্য অস্ত্রকে। অস্ত্রগুলো প্রকট হয়ে হাতজোড় করে বলল— "পাণ্ডুকুমার, আমরা সবাই উপস্থিত হয়েছি।" অর্জুন বললেন— "তোমরা আমার মনেই থেকো।" অস্ত্রগ্রহণের পর ওঁর মুখে ফুটে উঠল এক অপার্থিব প্রসন্নতা। তিনি গাণ্ডীবে টঙ্কার তুললেন।

উত্তর তবুও সামান্য আশঙ্কায় বললেন— "পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ, আপনি একা এত মহারথীর সঙ্গে কীভাবে লড়বেন?"

অর্জুন সশব্দে হেসে উঠলেন— "বীর, ভয় পেয়ো না। মনে করে দেখো তো, কৌরবদের ঘোষযাত্রার সময় গন্ধর্বদের সঙ্গে যুদ্ধে কে আমাকে সাহায্য করেছিল? নিবাতকবচ আর পৌলোম দানবদের সঙ্গে যুদ্ধের সময় কে ছিল আমার সঙ্গী? গুরুদেব দ্রোণ, ইন্দ্র, কুবের, যমরাজ, বরুণ, অগ্নিদেব, কৃপাচার্য, শ্রীকৃষ্ণ আর স্বয়ং শঙ্কর— এঁদের সকলের আশীর্বাদ আমার আছে। তাহলে এদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারব না কেন?"

উত্তরকে সারথি করে অর্জুন শমীবৃক্ষ প্রদক্ষিণ করলেন, তারপর অগ্নিদত্ত রথের ধ্যান করলেন। আকাশ থেকে নেমে এল এক দিব্যরথ, ধ্বজায় হনুমানের চিহ্ন। অর্জুন তাতে উঠে ধনুক হাতে চললেন উত্তর দিকে। তারপর তিনি বাজালেন তাঁর দেবদত্ত মহাশঙ্খ। সেই ভীষণ ধ্বনিতে শত্রুসেনা কেঁপে উঠল, আর রাজকুমার উত্তর ভয়ে রথের ভেতরে গুটিয়ে বসলেন। অর্জুন তাঁকেও বুকে জড়িয়ে আশ্বস্ত করলেন এবং আবার শঙ্খ বাজালেন— সেই শব্দে পাহাড়, গুহা, দিগ্বিদিক যেন বিদীর্ণ হয়ে গেল!

এই ভীষণ শব্দ শুনে দ্রোণাচার্য কৌরব সৈন্যদের বললেন— "মেঘগর্জনের মতো এই রথের শব্দ, যাতে পৃথিবী কাঁপছে— এ অর্জুন ছাড়া আর কারো নয়! দেখো, আমাদের অস্ত্রগুলো নিষ্প্রভ হয়ে গেছে, ঘোড়াগুলো ভয় পেয়েছে। এতে মনে হচ্ছে যুদ্ধের ফল আমাদের অনুকূলে যাবে না। আমাদের এখন উচিত গোধন হস্তিনাপুরের দিকে পাঠিয়ে ব্যূহ রচনা করে দাঁড়ানো।"

দুর্যোধন তখন তীব্র আপত্তি তুলে বললেন— "পাণ্ডবদের তেরো বছর এখনও পুরো হয়নি! অর্জুন যদি এখন সামনে আসে, তবে ওদের আবার বারো বছর বনে যেতে হবে। পিতামহ ভীষ্মই এ বিষয়ে শেষ কথা বলবেন। এখন নিরুৎসাহ না হয়ে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিন।"

কর্ণ বললেন— "আচার্য দ্রোণকে সেনার পেছনে রাখুন, উনি শত্রু অর্জুনের প্রশংসা করে সেনাদের মনোবল ভাঙছেন। আজ আমি অর্জুনকে বধ করে দুর্যোধনের ঋণ শোধ করব।"

কৃপাচার্য ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন— "কর্ণ, তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে! অর্জুনের সঙ্গে একা লড়ার সাধ্য ইন্দ্রেরও নেই, তুমি আবার কার কথা বলছ? আমাদের সবাই মিলে ওর মুখোমুখি হওয়া উচিত।"

অশ্বত্থামাও তীক্ষ্ণ স্বরে যোগ করলেন— "ছল করে জুয়ায় জিতে দ্রৌপদীকে অপমান করার সময় খুব সাহস দেখিয়েছিলে কর্ণ! এখন অর্জুনের কোপাগ্নি সামলাও। যে লড়তে চায় লড়ুক, আমি যাব না।"

পিতামহ ভীষ্ম শান্ত গলায় সকলকে থামালেন। বললেন— "নিজেদের মধ্যে বিরোধের কোনো মানে নেই। দুর্যোধন, তোমার হিসাব ভুল। সৌর ও চান্দ্র মাসের অতিরিক্ত গণনায় পাণ্ডবদের তেরো বছর তো পূর্ণ হয়েছেই, তার ওপর আরও পাঁচ মাস বারো দিন বেশি হয়ে গেছে! পাণ্ডবরা সৎ ও ধর্মপরায়ণ, মিথ্যাচরণ ওরা করেনি। অর্জুন সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই আমাদের সামনে এসেছে।"

দুর্যোধন তবু অনড় রইলেন— "পিতামহ, রাজ্য আমি কখনোই দেব না! যুদ্ধের ব্যবস্থা করুন।"

ভীষ্ম তখন শেষ রণনীতি বাতলে দিলেন— "তবে শোনো। তুমি এক-চতুর্থাংশ সেনা নিয়ে হস্তিনাপুরে ফিরে যাও গোধন সমেত। বাকি অর্ধেক সৈন্য নিয়ে আমরা— আমি, দ্রোণ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য অর্জুনকে আটকাব।"

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুর্যোধন ও গোধনকে আগে পাঠিয়ে দিয়ে ভীষ্ম ব্যূহ রচনা করলেন। দ্রোণ রইলেন মধ্যভাগে, অশ্বত্থামা বামে, কৃপাচার্য দক্ষিণে, কর্ণ সামনে আর ভীষ্ম রইলেন সবার পেছনে।

বিকেলের সেই ম্রিমাণ আলোয়, শমীবৃক্ষের দীর্ঘ ছায়া মাড়িয়ে যে রথটা এগিয়ে যাচ্ছিল কৌরব ব্যূহের দিকে, তার মধ্যে বসে একজন মানুষ তখন বুঝতে পারছিলেন— তেরো বছরের দীর্ঘ নীরবতা ও অপমানের অবসান হতে চলেছে আজ, আর সেই ভাঙনের প্রথম ইতিহাসপ্রসিদ্ধ শব্দটা বাজতে চলেছে ওঁর নিজের হাতের গাণ্ডীবে!


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)