Posts

Showing posts with the label Adi parba mahabharata

কালীয়দমন: কালিন্দীর বুকে এক মায়াবী নর্তক

Image
  কালীয়দমন: কালিন্দীর বুকে এক মায়াবী নর্তক বিষ কেবল প্রাণ হরণ করে না, বিষের এক নিজস্ব অহংকার আছে। সে চারপাশের বাতাস, জল আর মাটিকে নিজের মতো করে কলুষিত করতে চায়। যমুনার সেই গভীর দহটি বহু বছর ধরে সেই রকমই এক অহংকারী বিষের নীল চাদরে ঢাকা পড়েছিল। বৃন্দাবনের মানুষ নদীর দিকে যাওয়া ভুলেই গিয়েছিল। গাভীগুলো জল ছুঁত না, ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া পাখি আচমকা ডানা ঝটপট করে মরে ভেসে উঠত কালো জলের বুকে। তীরের কদম্ব গাছটি হয়ে গিয়েছিল অবশ, কুচকুচে কালো। যমুনার যে জল হওয়া উচিত ছিল কাচের মতো স্বচ্ছ আর শীতল, তা এক উগ্র, তপ্ত বিষের কামড়ে সারাক্ষণ ফুটত, বুদবুদ তুলত। সেই দহের অতল অন্ধকারে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে ছিল কালীয়। তিন ভুবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, সবচেয়ে অহংকারী নাগরাজ। সে ভাবত, এই নদী, এই জল—সব তার নিজস্ব সাম্রাজ্য। চারপাশের এই মৃত্যু আর ধ্বংসকে সে তার রাজকীয় অধিকার বলেই ধরে নিয়েছিল। কিন্তু নাগরাজ ভুল ভেবেছিল। আর সেই ভুলটা ভেঙে দেওয়ার জন্য যমুনার ঘাটে এসে দাঁড়াল এক নীল রঙের বালক। রামনক দ্বীপ থেকে বৃন্দাবন: এক পলাতকের ইতিহাস কালীয় চিরকাল যমুনার বাসিন্দা ছিল না। তার আসল ঘর ছিল মহাসমুদ্রের বুকে এক নির্জন ভূখণ্ড—রা...

দেবতাদের অজেয় শত্রু: নিবাতকবচদের বিরুদ্ধে অর্জুনের মহাযুদ্ধ

Image
দেবতাদের অজেয় শত্রু: নিবাতকবচদের বিরুদ্ধে অর্জুনের মহাযুদ্ধ স্বর্গের রাজা ইন্দ্রের বুকে এমন এক দুঃশ্চিন্তা বহু যুগ ধরে পাথরের মতো চেপে ছিল, যার সমাধান তিনি নিজেও করতে পারছিলেন না। শত্রু যদি সাধারণ শত্রু হয়, তবে বজ্রধারী ইন্দ্রের পক্ষে তাকে পরাজিত করা অসম্ভব নয়। কিন্তু যদি সেই শত্রুকে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা এমন আশীর্বাদ দিয়ে থাকেন, যা তাকে দেবতাদের কাছেও অজেয় করে তোলে, তবে? অর্জুনের জন্মের বহু আগে, হস্তিনাপুরে পাশা খেলার বহু আগে, পাণ্ডবদের বনবাসেরও বহু আগে, স্বর্গলোকের আকাশে এই এক নামই আতঙ্কের ছায়া হয়ে ভাসত— নিবাতকবচ। কিন্তু ভাগ্যের অদ্ভুত নিয়ম। যে সমস্যার সমাধান যুগ যুগ ধরে দেবতারা খুঁজে পাননি, তার উত্তর একদিন এসে দাঁড়াল এক মানবযোদ্ধার হাতে— যার হাঁটুর উপর বিশ্রাম নিচ্ছিল গাণ্ডীব ধনুক, আর যার রথ ছুটছিল স্বর্গের পথে। নিবাতকবচদের জন্ম ও তপস্যা অতি প্রাচীন কালে, যখন দেবতা ও অসুরদের সংঘর্ষ ছিল জগতের নিয়মের মতো স্বাভাবিক, তখন মহর্ষি কশ্যপ ও তাঁর পত্নী দিতির গর্ভে জন্ম নেয় এক শক্তিশালী অসুরগোষ্ঠী। এদের নাম ছিল নিবাতকবচ। দেবতাদের মতোই তারা কশ্যপের সন্তান। অর্থাৎ, দেবতা ও অসুর আ...

কামনার স্বর্গ ও মাতৃত্বের পুণ্য: উর্বশী-অর্জুনের সেই অনির্বাণ উপাখ্যান

Image
কামনার স্বর্গ ও মাতৃত্বের পুণ্য: উর্বশী-অর্জুনের সেই অনির্বাণ উপাখ্যান মর্ত্যের ধুলোবালি আর রক্তের তৃষ্ণা থেকে অনেক দূরে, অমরাবতীর স্ফটিক-স্বচ্ছ আলোয় সেদিন এক অদ্ভুত নাটক তৈরি হচ্ছিল। দেবরাজ ইন্দ্রের আমন্ত্রণে অর্জুন তখন স্বর্গলোকে। উদ্দেশ্য—দিব্য অস্ত্র লাভ এবং গন্ধর্বরাজ চিত্রসেনের কাছে নৃত্য-গীতের শিক্ষা নেওয়া। অর্জুনের সেই ক্লান্তিহীন, পেশীবহুল শরীর, চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক মহাসমুদ্রের গাম্ভীর্য আর বীরত্ব দেখে স্বর্গের শ্রেষ্ঠ অপ্সরা উর্বশীর রক্তে দোলা লাগল। যে উর্বশীর এক একটি পলকপাতে ত্রিলোকের মুনি-ঋষিদের ধ্যান ভেঙে যায়, সে আজ মর্ত্যের এক ধনুর্বাজির সামনে ব্যাকুল, কামনার আগুনে দগ্ধ। দেবরাজ ইন্দ্র নিজেই উর্বশীকে পাঠালেন অর্জুনের কক্ষে। বসন্তের মায়াবী বাতাসে উর্বশী যখন অর্জুনের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন, তখন তাঁর পরনে সূক্ষ্ম মেঘের মতো বসন, চোখে মদিরার আহ্বান, আর ঠোঁটে এক আদিম আদিখ্যেতা। স্বর্গের নিয়ম আলাদা; সেখানে সম্পর্ক মানে শুধুই মুহূর্তের আনন্দ, সেখানে কোনো মর্ত্যের বন্ধন নেই। কিন্তু অর্জুন? তিনি তো শুধু এক জন মহান যোদ্ধা নন, তিনি কুরুবংশের শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতির ধারক। উর্বশীর সেই উত...

উর্বশী- ঊরুসম্ভবা: স্বর্গের দর্পচূর্ণ ও এক চিরন্তন রূপকথা

Image
  উর্বশী- ঊরুসম্ভবা: স্বর্গের দর্পচূর্ণ ও এক চিরন্তন রূপকথা নারায়ণের ধ্যানগম্ভীর অবয়বের দিকে তাকিয়ে দেবরাজ ইন্দ্রের সিংহাসন তখন কাঁপছে। হিমালয়ের প্রত্যন্ত বদরিকাশ্রমে যুগল ঋষি— নর আর নারায়ণ। তাঁদের তপস্যার যে তীব্র উত্তাপ, যাকে শাস্ত্রে বলে তপোঅগ্নি, তা মর্ত্যের সীমানা পেরিয়ে সরাসরি গিয়ে আঘাত করছে স্বর্গের অমরাবতীতে। ইন্দ্রের চিরকালের এক রোগ, ক্ষমতার মোহ। যে যেখানেই একটু গভীর সাধনায় বসে, দেবরাজ ভাবেন— এই বুঝি গেল তাঁর তখত-তাউস! তিনি তড়িঘড়ি ডেকে পাঠালেন তাঁর প্রধান সেনাপতিদের। তবে এরা রক্তপাতের সৈন্য নয়, এরা কাম ও মোহের বাহিনী। মদনদেব, তাঁর পত্নী রতি, ঋতুরাজ বসন্ত আর স্বর্গের শ্রেষ্ঠ অপ্সরা মেনকা-রম্ভারা রওনা দিলেন হিমালয়ের দিকে। ঋষিদের ধ্যান ভাঙতে হবে, এই হলো হুকুম। বদরিকাশ্রমে নিমেষের মধ্যে ঋতুপরিবর্তন হয়ে গেল। অসময়ে ফুটল ফুল, মলয় বাতাস বইল, মেনকা-রম্ভার নূপুরনিক্কণে কেঁপে উঠল পাহাড়ের নিস্তব্ধতা। মদনদেব তাঁর পুষ্পশরাসন তাক করলেন ঋষিদের বুক লক্ষ্য করে। কিন্তু আশ্চর্য! নর বা নারায়ণ— কারও ভ্রূযুগল কাঁপল না। তাঁরা যেন অচল মহীধর, ঝোড়ো হাওয়া যাঁদের স্পর্শ করে কিন্তু টলাতে পারে না। কামে...

খাণ্ডব দহন: এক বিধ্বংসী নবনির্মাণ

Image
  খাণ্ডব দহন: এক বিধ্বংসী নবনির্মাণ পাণ্ডবরা ফিরে আসায় ইন্দ্রপ্রস্থের সাধারণ মানুষের মনে যেন উৎসবের রঙ লেগেছে। চারদিকে এক স্বস্তির নিঃশ্বাস। কিন্তু অর্জুন আর শ্রীকৃষ্ণের মন তখন অন্য কোথাও। একদিন যুধিষ্ঠিরের অনুমতি নিয়ে তাঁরা দুজনে মিলে যমুনার তীরে গেলেন একটু নিভৃত সময়ের খোঁজে। বহমান নদীর শীতল হাওয়ায় দুজনে গল্পে মগ্ন, ঠিক তখনই সেখানে এক অদ্ভুত তেজস্বী ব্রাহ্মণের আবির্ভাব হলো। সেই ব্রাহ্মণের গায়ের রঙ যেন তপ্ত কাঞ্চন, মাথায় জটা আর মুখভর্তি দাড়ি। এক আশ্চর্য দীপ্তি ঠিকরে বেরোচ্ছে তাঁর শরীর থেকে। তিনি সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং মেঘমন্দ্র স্বরে বললেন, "তোমরা মহাবীর। আমি সর্বভুক, আজ তোমাদের কাছে এসেছি আমার ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে। ওই খাণ্ডব বনই আমার আহার।" শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন বিস্ময় গোপন করে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি কে? কী আহার আপনার কাম্য? আদেশ করুন, আমরা তা পূর্ণ করব।" ব্রাহ্মণ তখন তাঁর আসল রূপ প্রকাশ করলেন। তিনি অগ্নিদেব। তিনি বললেন, "আমি সাধারণ অন্ন চাই না। আমি এই খাণ্ডব বন দহন করতে চাই। এর আগে বহুবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেখানে সপরিবারে তক্ষক নাগ বাস করে। আ...

রৈবতক উৎসব ও সুভদ্রা হরণ

Image
  রৈবতক উৎসব ও সুভদ্রা হরণ সে এক এলাহি কাণ্ড! রৈবতক পাহাড়জুড়ে তখন উৎসবের মহড়া। বৃষ্ণি, ভোজ আর অন্ধক বংশের মানুষেরা মেতে উঠেছেন আনন্দ-উৎসবে। যদু বংশের তরুণরা—অক্রুর, সারণ, গদ, বভ্রু, নিষঠ, উদ্ধব—সবাই সেজেগুজে স্ত্রী-পরিজন নিয়ে শামিল হয়েছেন সেই মহোৎসবে। চারদিকে গান, নাচ আর হাসির হিল্লোল। দান-ধ্যানেরও কমতি নেই; ব্রাহ্মণদের ঝুলি উপচে পড়ছে বহুমূল্য রত্ন আর অলঙ্কারে। সেই ভিড়ের মধ্যেই ছিলেন কৃষ্ণ আর তাঁর সখা অর্জুন। ঠিক তখনই অর্জুনের নজরে পড়লেন কৃষ্ণের সহোদরা সুভদ্রা। সুভদ্রার সেই রূপ দেখে অর্জুন যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলেন। তাঁর চোখের পলক পড়ছে না। অর্জুনের মনের অন্দরে কী ঝড় বইছে, তা অন্তর্যামী কৃষ্ণের বুঝতে বাকি রইল না। কৃষ্ণ স্মিত হেসে বললেন, "সখা, ক্ষত্রিয়ের ধর্মে স্বয়ংবর সভার রীতি আছে বটে, কিন্তু সেখানে মেয়েটি তোমাকে বেছে নেবেই—এমন নিশ্চয়তা কোথায়? প্রত্যেকের তো নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ থাকে। তার চেয়ে ক্ষত্রিয়ের বীরধর্ম পালন করো। বলপূর্বক হরণ করে বিবাহ করাটাও তো আমাদের শাস্ত্রসম্মত। আমার মনে হয়, তোমার জন্য সেটাই শ্রেয় হবে।" অর্জুন আর কৃষ্ণ পরামর্শ করে যুধিষ্ঠিরের কাছে দূত পাঠাল...

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া

Image
  হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া বারাণাবতের জতুগৃহের লেলিহান শিখা পাণ্ডবদের গ্রাস করতে পারেনি—এই সংবাদ যখন দাবানলের মতো হস্তিনাপুরের প্রাসাদে আছড়ে পড়ল, তখন এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গিয়েছিল। পাণ্ডবরা জীবিত! শুধু জীবিতই নয়, অর্জুন লক্ষ্যভেদ করে দ্রুপদ-কন্যা দ্রৌপদীকে জয় করেছেন এবং পাঞ্চালরাজ এখন তাঁদের পরম মিত্র। ধৃতরাষ্ট্রের সভার গাম্ভীর্যের তলায় তখন এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের পূর্বাভাস। দুর্যোধন তখন নিজের কক্ষের আসবাবপত্র চুরমার করছেন। তাঁর ক্রোধ পাণ্ডবদের বেঁচে থাকার সংবাদে যত না, তার চেয়ে বেশি তাঁদের উত্তরোত্তর বৃদ্ধিতে। পাঞ্চালের সঙ্গে এই মৈত্রী মানেই কৌরবদের সিংহাসনের দাবি এক প্রবল সংকটের মুখে। কক্ষের ভেতরে গুমোট অন্ধকার, আর বাইরে উত্তপ্ত দ্বিপ্রহর। সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তে দুর্যোধন সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্রের সামনে। পাশে ছায়ার মতো দুঃশাসন আর চিরকালের সূর্যসম তেজে উদ্ভাসিত কর্ণ। দুর্যোধন আর্তনাদ করে উঠলেন, "পিতা, আমাদের সমস্ত পরিশ্রম, সমস্ত কৌশল কি তবে ধুলোয় মিশে যাবে? আপনি কি বুঝতে পারছেন না, কুন্তিপুত্ররা এখন আর কেবল আমাদের আত্মীয় নয়, তারা প্রবল প্রতিদ্বন্দ্ব...

নিয়তির লিখন: পাঞ্চালীর পরিণয় ও এক নতুন অধ্যা

Image
  নিয়তির লিখন: পাঞ্চালীর পরিণয় ও এক নতুন অধ্যায়"  পাঞ্চালীর পরিণয়: এক অলৌকিক নিয়তি সিদ্ধান্তটা আপাতদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক ঠেকলেও তার ভেতরে কোনো চপলতা ছিল না। বারণাবতের জতুগৃহ থেকে ফেরার পর পাণ্ডবদের জীবনে এই মুহূর্তটি ছিল সবচেয়ে জটিল। জ্ঞানবৃদ্ধরা দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে রায় দিলেন—দ্রৌপদীর এই পঞ্চভর্তৃক বিবাহ ধর্মবিরুদ্ধ নয়। বরং এর গভীরে লুকিয়ে আছে দেবাদিদেব শিবের অমোঘ বর। নিয়তি অনেক আগেই এই চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল, দ্রুপদ-কন্যা কেবল তার বাস্তবায়ন করছেন মাত্র। এমন এক সন্ধিক্ষণে স্বয়ং মহর্ষি ব্যাসদেব এসে উপস্থিত হলেন রাজা দ্রুপদের রাজসভায়। তাঁর চোখেমুখে অতীন্দ্রিয় প্রশান্তি। যুধিষ্ঠিরের দিকে চেয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে তিনি বললেন, "বৎস যুধিষ্ঠির, আজকের দিনটি অত্যন্ত শুভ। চন্দ্রে এখন পুষ্য়া নক্ষত্রের অবস্থান। লগ্ন বয়ে যাওয়ার আগে আজই বিবাহ সুসম্পন্ন হওয়া উচিত।" ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির মস্তক অবনত করে সেই আদেশ শিরোধার্য করলেন। মুহূর্তের মধ্যে পাঞ্চাল রাজপ্রাসাদে যেন এক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়ে গেল। রাজা দ্রুপদ আর ধৃষ্টদ্যুম্ন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব তদারকি করতে লাগলেন। সুগন্ধি ধূপ আর রাজকীয় আয়োজ...

লক্ষ্যভেদ ও ললাটলিখন: ছদ্মবেশের আড়ালে পাঞ্চালরাজের স্বপ্নপূরণ

Image
লক্ষ্যভেদ ও ললাটলিখন: ছদ্মবেশের আড়ালে পাঞ্চালরাজের স্বপ্নপূরণ স্বয়ংবর সভার সেই তুমুল শোরগোল, অস্ত্রঝনঝনা আর রাজন্যবর্গের বিস্ময়মাখা চোখের পলক তখনও পুরোপুরি থিতিয়ে যায়নি। তার আগেই জনসমুদ্রের সেই উত্তাল ঢেউ কাটিয়ে তিনটে ছায়া নিঃশব্দে সরে এল বাইরে—অর্জুন, ভীম আর সদ্যপরিণীতা দ্রৌপদী। হারের গ্লানিতে জ্বলতে থাকা রাজাদের হতবাক করে দিয়ে তাঁরা পা বাড়ালেন কুমোরপাড়ার সেই নিভৃত কুটিরের দিকে, যেখানে ছদ্মবেশে দিন কাটছে তাঁদের পরিবারের। রাজপ্রাসাদে বসে তখন গভীর চিন্তায় মগ্ন রাজা দ্রুপদ। তাঁর মন বারবার বলছে, ওই লক্ষ্যভেদ অর্জুন ছাড়া আর কারও কর্ম নয়। দ্রৌপদীও তো সেই ব্রাহ্মণ যুবকের গলাতেই মালা দিয়েছেন। কিন্তু খটকাটা তবুও যাচ্ছে না—সত্যিই কি সে অর্জুন? পাঞ্চালরাজের মনের কোণে এক অব্যক্ত সংশয় দানা বেঁধে রইল। সত্যের সন্ধান করতে তিনি পাঠালেন পুত্র ধৃষ্টদ্যুম্নকে। ধৃষ্টদ্যুম্ন সভার শেষ থেকেই গোপনে অনুসরণ করেছিলেন ওই তিনজনকে। প্রাসাদে ফিরে পিতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন, “পিতা, বোন দ্রৌপদী কোনো সাধারণ ব্রাহ্মণের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়নি। যে যুবকটি লক্ষ্যভেদ করেছে, তার তেজ আর শৌর...

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা

Image
  লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা স্বয়ম্বর সভার সেই চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা আর রাজকীয় উন্মাদনা পেছনে ফেলে অর্জুন ও ভীম যখন দ্রৌপদীকে নিয়ে ফিরলেন, তখন চারদিকে সন্ধ্যার ম্লান আলো। পাণ্ডবেরা তখন ছদ্মবেশে এক কুমোরের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। ধুলোমাখা পথ, সাধারণ ব্রাহ্মণের বেশ, কিন্তু অর্জুনের চোখে তখন এক অদ্ভুত জয়ের দীপ্তি। ঘরের দরজায় পৌঁছেই অর্জুন কৌতুকভরে মা কুন্তীকে ডেকে বললেন, "মা, দেখো আজ আমরা ভিক্ষায় কী এনেছি!" কুন্তী তখন ঘরের ভেতর, অন্যমনস্ক। সন্তানদের ফেরার প্রতীক্ষায় থাকা জননী না দেখেই উত্তর দিলেন, "যা এনেছিস, তোরা পাঁচ ভাই সমান ভাগে ভাগ করে নে।" কিন্তু বাইরে বেরিয়ে আসতেই কুন্তীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। অর্জুনের পাশে দাঁড়িয়ে এক অনিন্দ্যসুন্দরী নারী—দীপ্তিময়ী, যেন মর্ত্যে নেমে আসা কোনো দেবী। কুন্তী শিউরে উঠলেন। একি করলেন তিনি? তাঁর মুখনিসৃত বাক্য কি তবে মিথ্যে হয়ে যাবে? আর্যপুত্রদের জননী হিসেবে তাঁর কথা তো অলঙ্ঘ্য বিধান। বিষণ্ণ মনে তিনি যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বললেন, "পুত্র, আমি না জেনেই এক ঘোরতর অন্যায় করে ফেলেছি। এখন উপায় কী? আমার কথা ...

বশিষ্ঠ ও কল্মাষপাদ: এক আশ্চর্য ক্ষমা

Image
  বশিষ্ঠ ও কল্মাষপাদ: এক আশ্চর্য ক্ষমা বনবাসের সেই নিস্তব্ধ রাত। আগুনের শিখাগুলো কাঁপছে আর গন্ধর্বরাজ চিত্ররথ অর্জুনের দিকে তাকিয়ে একটু স্মিত হাসলেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়ছে এক গভীর অভিজ্ঞতার সুর। তিনি বলতে শুরু করলেন, "শোনো পার্থ, বশিষ্ঠের সেই গল্প শুধু কামধেনুর নয়, সে গল্পের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক পাহাড়প্রমাণ ক্ষমার ইতিহাস। সে ইতিহাস ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা কল্মাষপাদের।" রাজা কল্মাষপাদ ছিলেন বীর্যবান, কিন্তু ক্ষমতার দম্ভ মানুষের মস্তিস্কে যে বিষ ঢেলে দেয়, তাঁর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। একদিন গভীর অরণ্যে শিকারের নেশায় মত্ত রাজা এক সংকীর্ণ পথে এসে দাঁড়ালেন। উল্টো দিক থেকে আসছিলেন বশিষ্ঠের জ্যেষ্ঠ পুত্র শক্তি। রাজা চাইলেন ঋষিপুত্র তাঁকে পথ ছেড়ে দিন, কিন্তু শক্তি অটল। ক্ষিপ্ত রাজা হাতের চাবুক সপাটে বসিয়ে দিলেন ঋষিপুত্রের গায়ে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই জ্বলে উঠল শক্তির ক্রোধ—তিনি অভিশাপ দিলেন, "অহংকারে তুমি আমায় আঘাত করলে? যাও, আজ থেকে তুমি নরখাদক রাক্ষস হয়ে বনে বনে ঘুরে বেড়াবে!" বিশমিমিত্র এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি এক রাক্ষসকে পাঠালেন রাজার শরীরে ভর করার জন্য। হিতাহিত জ্ঞা...

ক্ষত্রিয় দম্ভের পরাজয় ও এক ব্রহ্মর্ষির উদয়: বশিষ্ঠ-বিশ্বামিত্রের সেই চিরকালীন সংঘাত

Image
ক্ষত্রিয় দম্ভের পরাজয় ও এক ব্রহ্মর্ষির উদয়: বশিষ্ঠ-বিশ্বামিত্রের সেই চিরকালীন সংঘাত গঙ্গার কূল ঘেঁষে রাতটা তখন মন্থর হয়ে এসেছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর জলের ছলছল শব্দে মিশে যাচ্ছিল গন্ধর্বরাজ চিত্ররথের উদাত্ত কণ্ঠস্বর। অর্জুন চুপচাপ শুনছিলেন, কিন্তু তাঁর বুকের ভেতর এক অস্থির কৌতূহল তোলপাড় করছিল। মহর্ষি বশিষ্ঠের নাম তিনি আগেও শুনেছেন, কিন্তু তাঁর শক্তির উৎস আর ব্যক্তিত্বের গাম্ভীর্য আজ যেন এক নতুন রহস্য হয়ে অর্জুনের সামনে উন্মোচিত হচ্ছিল। অর্জুন সামান্য ঝুঁকে বসলেন। তাঁর কণ্ঠে এক ধরণের ব্যাকুলতা, “চিত্ররথ, তোমার বর্ণনায় বশিষ্ঠের যে রূপ ফুটে উঠছে, তা আমাকে স্তম্ভিত করছে। কে এই মহান ঋষি? যাঁর সামনে দেবরাজ থেকে শুরু করে পরাক্রমশালী রাজারাও বিনম্র হয়ে থাকেন? এই ব্রহ্মর্ষির তেজ আর প্রভাবের উৎসটা ঠিক কোথায়? বিশ্বামিত্রের মতো দিগ্বিজয়ী সম্রাটের সাথে তাঁর সংঘাতেরই বা শুরু কীভাবে?” চিত্ররথ মৃদু হাসলেন। তাঁর চোখেমুখে এক প্রাচীন প্রজ্ঞার ছাপ। তিনি বললেন, “শোনো পার্থ, বশিষ্ঠের কাহিনী ত্রিলোকের এক পবিত্র আখ্যান। মন দিয়ে শোনো সেই ইতিহাস।” কন্যাকুব্জের প্রতাপশালী রাজা গাধি, যাঁর বীরত্বে কম্পমান ছিল আর্...

তপতীনন্দন: কুরুবংশের রক্তে বহমান সূর্যের সেই আদিম অগ্নিশিখা

Image
তপতীনন্দন: কুরুবংশের রক্তে বহমান সূর্যের সেই আদিম অগ্নিশিখা গঙ্গা বয়ে চলেছে আপন ছন্দে। কলকল ধ্বনি আর শান্ত নির্জনতা মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করেছে নদীর তীরে। গন্ধর্বরাজ চিত্ররথের সঙ্গে পাণ্ডবদের যুদ্ধ মিটেছে সামান্য আগে, কিন্তু তার রেশটুকু রয়ে গেছে বাতাসে। সেই হারানো উত্তাপ ছাপিয়ে এখন বইছে বন্ধুত্বের শীতল হাওয়া। অর্জুনের সঙ্গে চিত্ররথের আলাপ জমে উঠতে সময় লাগল না। বীরের সঙ্গে বীরের মোলাকয়াত তো এমনই হয়—চোখে চোখ পড়লেই যেন বহু জন্মের চেনা। আলাপের এক ফাঁকে চিত্ররথ বেশ সহজ স্বরেই পাণ্ডবদের সম্বোধন করলেন— ‘তপতীনন্দন’। অর্জুন থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর কপালে সূক্ষ্ম বলিরেখা। নামটা অচেনা নয়, কিন্তু এর গভীরতা তাঁর কাছে স্পষ্ট নয়। তিনি ফিরে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, "আমাদের কেন তপতীনন্দন বললে? আমরা কুন্তীর পুত্র, এ তো সারা বিশ্ব জানে। তপতী নামটা তো আমাদের কুলের পরিচয়ে সেভাবে কখনও শুনিনি।" চিত্ররথ হাসলেন। সে হাসিতে বিদ্রূপ নেই, বরং আছে এমন একজনের আত্মতৃপ্তি যার ঝুলিতে এক অজানা রহস্যের চাবিকাঠি লুকানো আছে। তিনি ইঙ্গিত করলেন বসবার জন্য। বললেন, "একটু বসো। তোমাদের বংশের শেকড়ে এমন এক নারী আ...

চিত্ররথ চূর্ণ: গঙ্গার ঘাটে বীরের পরীক্ষা

Image
চিত্ররথ চূর্ণ: গঙ্গার ঘাটে বীরের পরীক্ষা একচক্রার সেই নির্জন ব্রাহ্মণগৃহের দিনগুলো ফুরিয়ে এলো। মহর্ষি ব্যাসদেব এসে যখন গন্তব্য স্থির করে দিয়ে গেলেন, তখন কুন্তী আর তাঁর পাঁচ পুত্র বুঝলেন, এবার শিকড় উপড়ানোর সময় হয়েছে। পাণ্ডবদের এই যাযাবর জীবন যেন এক অন্তহীন মহাকাব্য। ধুলোমাখা পথ, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, আর বুকে একরাশ অভিমান নিয়ে তাঁরা পা বাড়ালেন পাঞ্চাল দেশের দিকে। লক্ষ্য—রাজা দ্রুপদের কন্যার স্বয়ংবর সভা। দিনের আলোয় পথ চলা, আর রাত নামলে কোনো মহীরুহের ছায়ায় আশ্রয়। ক্লান্ত শরীর, কিন্তু মনে দ্রৌপদীর রূপকথার হাতছানি। একদিন গোধূলির ম্লান আলোয় তাঁরা এসে পৌঁছলেন পুণ্যতোয়া গঙ্গার তীরে। চারপাশ নিঝুম, কেবল জলের কলতান। কিন্তু হঠাৎ সেই নির্জনতা ভেঙে ভেসে এল খিলখিল হাসি আর নুপুরের নিক্বণ। দেখা গেল, অলকানন্দার স্বচ্ছ সলিলে জলক্রীড়ায় মত্ত এক উদ্ধত পুরুষ—গন্ধর্বরাজ চিত্ররথ, যাঁর আর এক নাম অঙ্গারপর্ণ। তাঁর রথখানি যেন আকাশের বিদ্যুতকে বন্দি করে রেখেছে। পাণ্ডবদের দেখা মাত্র চিত্ররথের ভ্রু কুঁচকে উঠল। আভিজাত্যের অহঙ্কারে অন্ধ হয়ে তিনি হাঁক ছাড়লেন, "থামুন হে মর্ত্যের তুচ্ছ মানবগণ! দেখছ না, এখানে আমি আমার ম...