৫০তম বনপর্ব-কার্তিকের জন্ম এবং তাঁর দেবসেনাপতিত্ব গ্রহণের উপাখ্যান


৫০তম বনপর্ব-কার্তিকের জন্ম এবং তাঁর দেবসেনাপতিত্ব গ্রহণের উপাখ্যান

যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলেন-ভার্গবশ্রেষ্ঠ। স্বামী কার্তিকের জন্ম কীভাবে হয়েছিল এবং তিনি কেমন করে অগ্নিপুত্র হলেন, সেইসব কথা আমাকে যথাবৎ কৃপা করে বলুন।

ঋষি মার্কণ্ডেয় বললেন-কুরুনন্দন। আমি তোমাকে স্বামী কার্তিকের জন্ম বৃত্তান্ত শোনাচ্ছি। পূর্বকালে দেবতা এবং অসুর নিজেদের মধ্যে প্রায়ই সংগ্রামে রত থাকতেন। ভয়ংকর রূপধারণকারী অসুররা দেবতাদের সর্বদাই পরাজিত করত। ইন্দ্র যখন বারবার তাঁর সেনাদের নাশ হতে দেখলেন, তখন তিনি মানস পর্বতে গিয়ে এক শ্রেষ্ঠ সেনাপতি কী করে লাভ করা যায় তার জন্য চিন্তা করতে লাগলেন। সেইসময় তিনি এক নারীর করুণ আর্তনাদ শুনতে পেলেন। সে বারংবার চেঁচিয়ে বলছিল- 'কোনো পুরুষ আছ, আমাকে রক্ষা করো!' ইন্দ্র তার আর্তনাদ শুনে বললেন- 'ভয় পেয়ো না, এখানে তোমার ভয় পাবার কিছু

নেই।' এই বলে সেখানে পৌঁছে দেখলেন হাতে গদা নিয়ে কেশী দৈতা সেই নারীটির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ইন্দ্র সেই নারীর হাত ধরে বললেন- 'ওরে নীচ কুকর্মকারী! তুই কী করে এই নারীটিকে হরণ করতে চাস? মনে বাখিস, আমি বজ্রধারী ইন্দ্র। তুই এখনই একে ছেড়ে দে।' তখন কেশী বলল- 'আরে ইন্দ্র!, একে আমি বরণ করে নিয়েছি। তুই একে ছেড়ে দে তাহলেই তুই বেঁচে নিজপুরীতে ফিরতে পারবি।'

এই বলে কেশী তার গদা ইন্দ্রের ওপরে ছুঁড়ে দিল। ইন্দ্র বজ্রের সাহায্যে তাকে মধ্যপথে কেটে ফেললেন। কেশী তখন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে ইন্দ্রের ওপর এক বিশাল পাথর ছুঁড়ল। পাথর আসতে দেখে ইন্দ্র সেটিও টুকরো টুকরো করে দিলেন। সেই টুকরো পড়ার সময় তাতে কেশী আঘাত পেল। কেশী সেই আঘাতে ভয় পেয়ে নারীটিকে ফেলে পালিয়ে গেল। কেশী চলে গেলে ইন্দ্র সেই নারীটিকে জিজ্ঞাসা করলেন-'তুমি কে? কার কন্যা? এখানে তোমার কী কাজ?'

কন্যা উত্তর দিল-'ইন্দ্র! আমি প্রজাপতির কন্যা, আমার নাম দেবসেনা। দৈত্যসেনা আমার বোন, কেশী তাকে নিয়ে গেছে। আমরা দুই বোন প্রজাপতির অনুমতি নিয়ে একসঙ্গে খেলার জন্য এই মানসপর্বতে আসতাম: কেশী দৈত্য প্রতিদিন তার সঙ্গে যাওযার জন্য বলত, দৈত্যসেনার তার সঙ্গে প্রণয় ছিল, কিন্তু আমি তাকে পছন্দ করতাম না। 

তাই দৈত্যসেনাকে কেশী নিয়ে গেলেও, আপনার পরাক্রমে আমি রক্ষা পেয়েছি। এখন আপনি যে পরাক্রমী বীরকে ঠিক করবেন, আমি তাকেই আমার পতি বলে বরণ করব।' ইন্দ্র বললেন- 'আমার মা দক্ষকন্যা অদিতি, সুতরাং তুমি আমার মাসতুতো বোন। এখন বলো তোমার পতির কীরকম বিক্রম তুমি চাও।' কন্যা উত্তর দিল-'যিনি দেবতা, দানব, যক্ষ, কিন্নর, নাগ, রাক্ষসা এবং দুষ্ট দৈত্যদের পরাজিত করবেন, মহা পরাক্রমশালী, অত্যন্ত বলবান এবং যিনি আপনার সঙ্গে মিলে সমস্ত প্রাণী ওপর বিজয়লাভ করবেন, সেই ব্রহ্মনিষ্ঠ এবং কীতি বৃদ্ধিকারী ব্যক্তিকেই আমি পতি হিসাবে চাই।'

ঋষি মার্কণ্ডেয় বললেন-রাজন! সেই কন্যার কথা শুনে ইন্দ্র অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে ভাবলেন যে এই মেয়ে যেমন চায় তেমন কোনো পাত্র দেখা যাচ্ছে না। তখন তিনি কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে ব্রহ্মলোকে পিতামহ ব্রহ্মার কাছে গিয়ে। তাঁকে বললেন, 'ভগবান! আপনি এই কন্যার জন্য কোনো সদ্‌গুণ সম্পন্ন শূরবীর পাত্রের সন্ধান দিন।' ব্রহ্মা বললেন- 'এরজন্য তুমি যেমন ভেবেছ, আমিও তেমনই ভেবেছি। অগ্নির সাহায্যে এক মহাপরাক্রমী বালক জন্ম নেবে, সেই হবে এই কন্যার পতি এবং তোমার সেনাধ্যক্ষের কাজও সেই করবে।'

ব্রহ্মার কথা শুনে ইন্দ্র তাঁকে প্রণাম করে কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে বশিষ্ঠ প্রমুখ প্রধান প্রধান ব্রহ্মর্ষি ও দেবর্ষি যেখানে ছিলেন, সেখানে গেলেন। সেইসময় এই মহর্ষিগণ যে যজ্ঞ করেছিলেন, দেবতারা এসে তার থেকে নিজেদের ভাগ গ্রহণ করতেন। ঋষিরা আবাহন করায় অগ্নিদেবও সেখানে এলেন এবং ঋষিদের মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক প্রদত্ত বলি গ্রহণ করে বিভিন্ন দেবতাদের দিতে লাগলেন। সেইসময় ঋষিপত্নীদের রূপে অগ্নিদেব মোহগ্রস্ত হয়ে পড়লেন এবং নিজেকে সংযত করতে চেষ্টা করেও সংযত হতে পারলেন না। কিন্তু সেই কামাগ্নি শান্ত করার কোনো উপায় করতে পারলেন। 

কারণ ঋষিপত্নীরা ছিলেন অত্যন্ত পতিব্রতা ও শুদ্ধচাধিল অগ্নিদেব অত্যন্ত সন্তপ্ত হয়ে নিরাশচিত্তে দেহত্যাগ করা করে বনে চলে গেলেন।অগ্নিপত্নী স্বাহা যখন জানতে পারলেন যে অগ্নি ঋষি পত্নীদের রূপে মোহিত হয়ে বনগমন করেছেন, তখন তিনি স্থির করলেন যে, তিনি ঋষিপত্নীদের রূপ ধারণ করে তাঁর নিজের প্রতি আসক্ত করবেন। 

তাতে অগ্নির তাঁর ও প্রেমবৃদ্ধি পাবে এবং তাঁর কামনাও তৃপ্ত হবে। এই ভেবে স্বাহা প্রথমে মহর্ষি অঙ্গিরার পত্নী রূপ-গুণশীলন শিবার রূপ ধারণ করে অগ্নিদেবের কাছে গিয়ে বললেন-'অগ্নিদেব! আমি কামাগ্নিতে জ্বলে যাচ্ছি, তুমি আমার পূরণ করো। তুমি তা না করলে আমার প্রাণ বাঁচবে আমি মহর্ষি অঙ্গিরার পত্নী শিবা।' অগ্নি তখন অত্যন্ত হয়ে তার সঙ্গে সমাগম করলেন। স্বাহা তাঁর বীর্য হাতে নিয়ে একটি স্বর্ণকুণ্ডে রাখলেন।

প্রত্যেকের পত্নীর রূপ ধারণ করে অগ্নির কামবাসনা করলেন। কিন্তু অরুন্ধতীর তপস্যা এবং শক্তির প্রভাবে রূপ ধারণ করতে সক্ষম হলেন না। এইভাবে প্রতিপদের দিন ছয়বার অগ্নির বীর্য সেই সুবর্ণর রাখলেন। সেই বীর্য থেকে এক ঋষিপূজ্য বালক জন্মভকরলেন। স্খলিত বীর্য থেকে উৎপন্ন হওয়ায় তাঁর নাম 'স্কন্দ'। তাঁর ছয়টি মাথা, বারোটি কান, বারোটি চোখ বারোটি হাত এবং একটি গ্রীবা ও একটি পেট ছিল। 

দ্বিতীয়াতে অভিব্যক্ত হয়ে তৃতীয়াতে শিশুরূপ হলে চতুর্থীতে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পন্ন হন। উদীয়মান সূর্য তে অরুণবর্ণ মেঘে সুশোভিত থাকে, তেমনই এই বালকে মনে হত অরুণবর্ণ মেঘে ঢাকা। ত্রিপুরবিনাশক মহা দৈত্য সংহারকারী যে বিশাল রোমাঞ্চকারী রেখেছিলেন, স্বন্দ সেই বিশাল ধনুক তুলে নিয়ে সিংহনাদ করে ত্রিলোকের সমস্ত প্রাণীকে হতচেতন ন দিলেন। তাঁর সেই মেঘের ন্যায় ভীষণ গর্জনে বহু ভূমিতলে পতিত হল। সেইসময় যেসব প্রাণী তাঁর। গ্রহণ করেছিল, তাদের তাঁর পার্ষদ বলা হয়। তা সকলকে মহাবাহু স্বামী কার্তিক সান্ত্বনা প্রদান করেন।

তারপর তিনি শ্বেতপর্বতে উঠে হিমালয়ের ক্রৌঞ্চপর্বকে বাণবিদ্ধ করেন। সেই ছিদ্রপথে এখনও এবং গৃধুপক্ষী মেরুপর্বতের ওপর দিয়ে গমন করে তা কার্তিকের বাণে বিদ্ধ হয়ে ক্রৌঞ্চপর্বত আর্তনাদ করতে করতে পড়ে গেল। তাকে পড়তে দেখে অন্যান্য পর্বতও তীব্র চিৎকার করতে লাগল। পর্বতদের সেই আর্ত তীব্র চিৎকার শুনেও মহাবলী কার্তিক বিচলিত হননি। তিনি এক শক্তিশালী আয়ুধ হাতে নিয়ে সিংহনাদ করতে লাগলেন।

তিনি সেই শক্তিশালী আয়ুধ ছুঁড়ে শ্বেতগিরির এক বিশাল শিখর ভেঙে ফেললেন। তাঁর আঘাতে বিদীর্ণ সেই শ্বেতপর্বত ভীত হয়ে অন্যান্য পাহাড়ের সঙ্গে পৃথিবী ত্যাগ করে আকাশে উড়ে গেল। পৃথিবীও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ায় তাতে যেখানে-সেখানে ফাটল ধরতে লাগল, কিন্তু ব্যাকুল হয়ে কার্তিকের কাছে গেলে পৃথিবী আবার বলশালী হয়ে উঠল। পর্বতরাও তাঁর চরণে মস্তক অবনত করে আবার পৃথিবীতে ফিরে এল। তারপর থেকে প্রতি শুক্লপক্ষের পঞ্চমীর দিন লোকে তাঁর পূজা করতে থাকল।

এদিকে সপ্তর্ষিরা যখন এই মহাতেজস্বী পুত্রের জন্ম-বৃত্তান্ত শুনলেন, তখন অরুন্ধতী ব্যতীত অন্য সকল ঋষি-পত্নীদেরই তাদের স্বামী-ঋষিরা পরিত্যাগ করলেন। স্বাহা বারবার সপ্তঋষিদের বলতে লাগলেন যে 'এ আমারই পুত্র, আপনারা যা মনে করছেন, তা নয়।' অগ্নিদেব যখন কামাতুর হয়ে বনগমন করেছিলেন ঋষি বিশ্বামিত্র গোপনে তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন, তাই তিনি সবই জানেন। তিনিও সপ্তর্ষিদের জানালেন যে তাঁদের স্ত্রীদের কোনোই অপরাধ নেই। কিন্তু সবকিছু সম্পূর্ণভাবে শুনেও তাঁরা পাত্রীদের আর গ্রহণ করলেন না।

দেবতারা স্বন্দের বল ও পরাক্রমের কথা শুনে ইন্দ্রের কাছে এসে বললেন, 'দেবরাজ! স্বন্দের বল অসহ্য, আপনি শীঘ্র ওকে হত্যা করুন। যদি ওকে হত্যা না করেন, তাহলে সেই একদিন দেবতাদের রাজা হয়ে বসবে।' ইন্দ্রের যদিও তাঁর বলের সম্বন্ধে ধারণা ছিল না, তা সত্ত্বেও তিনি ঐরাবতে চড়ে দেবতাদের সঙ্গে নিয়ে স্কন্দকে আক্রমণ করলেন। 

স্বন্দের কাছে এসে ইন্দ্র এবং সমস্ত দেবতা ভীষণ সিংহনাদ করলেন। সেই শব্দ শুনে কার্তিকও সমুদ্রের ন্যায় ভীষণ গর্জন করলেন। সেই মহাগর্জনে দেবদের সেনাদল হতচেতন হয়ে পড়ল এবং তাদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিল। দেবতারা তাঁকে বধ করতে এসেছেন দেখে কার্তিক ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর মুখ দিয়ে জ্বলন্ত অগ্নির হল্কা ছাড়তে লাগলেন। সেই আগুনের হল্কা ভীতসন্ত্রস্ত দেবতাদের দগ্ধ করতে লাগল। এতে দেবতাদের মস্তক, শরীর, অস্ত্র-শস্ত্র এবং বাহনও দগ্ধ হয়ে ছিন্নভিন্ন তারার মতো মনে হতে লাগল। এইভাবে দগ্ধ হয়ে তাঁরা ইন্দ্রকে পরিত্যাগ করে অগ্নিপুত্র স্কন্দের শরণ গ্রহণ করলেন। ফলে দেবতারা কার্তিকের হাত থেকে রক্ষা পেলেন।

দেবতারা ইন্দ্রকে পরিত্যাগ করলে ইন্দ্র স্কন্দের ওপর বজ্র নিক্ষেপ করলেন। সেই বজ্রের আঘাতে কার্তিকের দক্ষিণ অঙ্গ আহত হয়, এবং সেই অঙ্গ থেকে আর একজন পুরুষ প্রকটিত হয়। সেই পুরুষ যুবাবস্থা প্রাপ্ত এবং স্বর্ণা কবচ, শক্তি এবং দিব্যকুণ্ডল পরিহিত। স্কন্দের শরীরে বলে প্রবেশ হওয়াতে এই পুরুষ উৎপন্ন হওয়ায়, তিনি 'বিশাখ” নামে প্রসিদ্ধ হন। প্রলয়াগ্নির মতো তেজস্বী আর একজন পুরুষকে উৎপন্ন হতে দেখে ইন্দ্র অত্যন্ত ভীত হলেন, তিনি হাতজোড় করে তখন স্কন্দেরই শরণাপন্ন হলেন। স্কন্দ তখন সেনাসহ ইন্দ্রকে অভয়দান করলেন। দেবতারা তখন প্রসন্ন হয়ে বাদ্যধ্বনি করতে লাগলেন।

তখন ঋষিরা তাঁকে বললেন- 'দেবশ্রেষ্ঠ! তোমার কল্যাণ হোক, তুমি সমস্ত জগতের মঙ্গল করো। তুমি মাত্র ছয়দিন পূর্বে উৎপন্ন হয়েছ; এর মধোই তুমি সমগ্র পৃথিবীকে নিজ বশে এনেছ এবং তাদের অভয়প্রদা করেছ। সুতরাং তুমি এবার ইন্দ্র হয়ে তিনলোককে নির্ভন করো।' স্বামী কার্তিক জিজ্ঞাসা করলেন-'হে মুনিগণ ইন্দ্র ত্রিলোকের কী কাজ করেন এবং কীভাবে দেবতাদের রক্ষা করেন?' 

ঋষিরা বললেন- 'ইন্দ্র সমস্ত প্রাণীদের বল, তেজ ও সুখপ্রদান করেন এবং প্রসন্ন হয়ে সর্বপ্রকার ইচ্ছা পূরণ করেন। তিনি দুরাচারীকে সংহার করেন এবং সদাচারীকে রক্ষা করেন। সকল প্রাণীর প্রত্যেক কাজে তাঁর অনুশাসন মানা হয়। সূর্য না থাকেল তিনিই সূর্য হন, চন্দ্রের অগ্নি, বায়ু, যান। এসব কাজই ইন্দ্রকে করতে হয়, পৃথিবী। স্থলহয়ে যান অত্যন্ত শাক্ত আছে। বীরবর! তুমিও অত্যন্ত বলবান, অতএব তুমিই আমাদের হয়ে আমাদের সকলকে সুখী করো। তুমিই প্রকৃতপক্ষে এই পদের যোগ্য, অতএব আজই তোমার অভিষেক হোক।' স্বন্দ বললেন-'আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে অতিলোক শাসন করুন। আমি আপনার সেবক, আমার ইন্দ্রপদের কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই।' ইন্দ্র বললেন- 'বীর! অদ্ভুত তোমার শক্তি, তোমার পরাক্রমে চমকিত হয়ে প্রাণী সব আমাকে হীনভাবে দেখবে। শুধু তাই নয়, তারা আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চেষ্টা করবে। এইরূপ মতভেদ থাকলে তোমার আমার মধ্যে লড়াই চলতেই থাকবে। আমার ধারণা তাতে তোমারই জয় হবে। সুতরাং তুমি ইন্দ্র হও, এ নিয়ে আর চিন্তা-ভাবনা করো না।' স্বন্দ বললেন- 'ত্রিলোকে আপনি আমারও রাজা; বলুন আমি আপনার কোন নির্দেশ পালন করব?' ইন্দ্র বললেন- 'ঠিক আছে, তোমার কথায় আমিই ইন্দ্র হয়ে থাকলাম; কিন্তু সত্যি যদি তুমি আমার আদেশ মানতে চাও, তাহলে শোনো, তুমি দেবসেনাপতির পদে অভিষিক্ত হও।' স্কন্দ বললেন-'ঠিক আছে; দানবদের বিনাশ, দেবতাদের অর্থসিদ্ধি এবং গো-ব্রাহ্মণদের হিতার্থে আপনি প্রসন্নতা সহকারে আমাকে দেবসেনাপতিপদে অভিষিক্ত করুন।'

ঋষি মার্কণ্ডেয় বললেন-স্কন্দের ইচ্ছায় ইন্দ্র তাঁকে সমস্ত দেবতাদের সেনাপতি নিযুক্ত করলেন। মহর্ষিদের দ্বারা পূজিত হয়ে তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে শোভিত হয়ে ছিলেন। তাঁর মাথার ওপর সোনার ছাতা লাগানো হয়েছিল। সেইসময় পার্বতীসহ ভগবান শংকর সেখানে এলেন। তাঁরা এসে বিশ্বকর্মা নির্মিত একটি মালা তাঁর গলায় পরালেন। অগ্নিদেব প্রদত্ত লাল রংয়ের ধ্বজা সর্বদা তাঁর রথে শোভা পেত। যিনি সমস্ত প্রাণীর প্রচেষ্টা, প্রভা, শান্তি এবং বল ও দেবতাদের জয়বৃদ্ধিকারী শক্তি সেই তিনি স্বয়ং তাঁর কাছে -এসে উপস্থিত হলেন এবং তাঁর শরীরে জন্মের সঙ্গে উৎপন্নহওয়া কবচে প্রবেশ করলেন। যুদ্ধের সময় তা স্বয়ংই প্রকটিত হত। শক্তি, ধর্ম, বল, তেজ, কান্তি, সত্য, উন্নতি ব্রহ্মাণ্যতা, অসম্মোহ, ভক্তের রক্ষা, শত্রু সংহার এবং জগৎ রক্ষা-এইসব গুণ স্বন্দের মধ্যে জন্মগত ছিল। 

তাইতারপর কার্তিকের কাছে সহস্র সহস্র দেবসেনা উপস্থিত হয়ে বলতে লাগল 'আপনিই আমাদের প্রভু।' তখন দেবতারা  তা মেনে নিলেন এবং তাঁদের দ্বারা সম্মানিত হয়ে সকলকে ইন্দ্রের তখন কেশী দৈতোর হাত রক্ষা পাওয়া দেবসেনার কথা স্মরণ হল, তিনি ভাবলেন যে, 'এতে কোনোই সন্দেহ নেই যে ব্রহ্মা এঁকেই দেবসেনার পতি হিসাবে নির্দিষ্ট করেছেন।' তখন তিনি দেবসেনাকে বস্ত্রালঙ্কারে সুসজ্জিত করে তাকে স্কন্দের কাছে এনে বললেন- 'দেবশ্রেষ্ঠ! আপনার জন্মের পূর্বেই ব্রহ্মা এঁকে আপনার পত্নীরূপে নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। অতএব আপনি বিধিপূর্বক মন্ত্রোচ্চারণ করে এর পাণিগ্রহণ করুন।' স্কন্দ দেবসেনার পাণিগ্রহণ করলেন। মন্ত্রবেত্তাবৃহস্পতি হোম-যজ্ঞ সহকারে বিবাহ সুসম্পন্ন করালেন। দেবসেনা কার্তিকের পাটরানি হলেন। তাঁকেই ব্রাহ্মণরা ষষ্ঠী, লক্ষ্মী, আশা, সুখপ্রদা, সিনীবালী, কুহু, সদৃত্তি এবং অপরাজিতা নামে অভিহিত করেন।

শ্রীকার্তিকের কয়েকটি উদার কর্মের কথা

ঋষি মার্কণ্ডেয় বললেন-রাজন। কার্তিককে শ্রীসম্পন্ন এবং দেবসেনাপতি হতে দেখে সপ্তঋষির ছয়জন পত্নী তাঁর কাছে এলেন। তাঁরা সকলেই ধার্মিক ও ব্রতশীলা ছিলেন, তা সত্ত্বেও ঋষিরা তাঁদের পরিত্যাগ করেছিলেন। তাঁরা দেবসেনার পতি কার্তিকের কাছে গিয়ে বললেন- 'পুত্র! আমাদের দেবতুল্য পতিগণ অকারণে আমাদের ত্যাগ করেছেন, তাই আমরা পুণ্যলোক চ্যুত হয়ে রয়েছি। তাঁদের কেউ বুঝিয়েছে যে, আমাদের থেকেই তোমার জন্ম হয়েছে। তুমি আমাদের সত্যকাহিনী শুনে আমাদের রক্ষা করো। তোমার কৃপায় আমাদের অক্ষয় স্বর্গলাভ হতে পারে। তাছাড়া তোমাকে আমরা পুত্ররূপেও চাই।' স্কন্দ বললেন-'হে নির্দোষ দেবীগণ! আপনারা আমার মাতা,

আমি আপনাদের পুত্র। এছাড়া আর কোনো আকাঙ্ক্ষা যদি আপনাদের থাকে, তাও পূর্ণ হবে।'

কার্তিক যখন মাতাদের এইসব প্রিয় কথা বলছিলেন তখন স্বাহা তাঁকে বললেন- 'তুমি আমার ঔরসজাত পুত্র, আমি চাই তুমি আমার এক দুর্লভ প্রিয় কাজ করো।' স্কন্দ বললেন-কী তোমার ইচ্ছা?' স্বাহা বললেন-'আমি দক্ষ প্রজাপতির প্রিয় কন্যা। শিশুকাল থেকেই আমি অগ্নিদেবের অনুরক্ত, কিন্তু অগ্নি সঠিকভাবে আমার প্রেমকে

জানেন না। আমি সর্বক্ষণ তাঁর সঙ্গে থাকতে চাই।' স্কন্দ বললেন-'ব্রাহ্মণবা যাগ-যজ্ঞতে যেসব পদার্থ মন্ত্রদ্বারা শুদ্ধ করবেন, তাঁরা 'স্বাহা' বলেই তা অগ্নিতে প্রধান করবেন। কল্যাণী। এইভাবে অগ্নিদেব সর্বদাই আপনার সঙ্গে থাকবেন।'

এইকথা বলে ছন্দ স্বাহাকে পূজা করলেন, স্বাহা তাতে অত্যন্ত সন্তষ্ট হলেন এবং অগ্নির সঙ্গে যুক্ত হয়ে জন্মের পূজা করলেন। ব্রহ্মা তারপর চন্দকে বললেন- 'তুমি তোমার পিতা ত্রিপুরারি শ্রীমহাদেবের কাছে যাও, কারণ সমস্ত জগতের হিতার্থে ভগবান রুদ্র অগ্নিতে ও উমা স্বাহাতে প্রবেশ করে তোমাকে উৎপন্ন করেছেন।' ব্রহ্মার কথা শুনে কার্তিক 'তথাস্ত' বলে মহাদেবের কাছে চলে গেলেন।

ঋষি মার্কণ্ডেয় বললেন-ইন্দ্র যখন অগ্নিকুমাব কার্তিককে সেনাপতি পদে অভিষিক্ত করেন, তখন ভগবান শংকর অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে পার্বতীর সঙ্গে সূর্যসম কান্তিসম্পন্ন এক রথে চড়ে ভদ্রবটে গেলেন। সেইসময় গুহ্যকের সঙ্গে পুষ্পক বিমানে করে শ্রীকুবের তাঁদের আগে আগে চলতেন। ইন্দ্র ঐরাবতে করে দেবতাদের সঙ্গে তাঁর পিছন পিছন যেতেন। তাঁদের দক্ষিণ দিকে বসু এবং রুদ্র সহ বহু স্বনামধন্য দেবসেনানী ছিলেন। যমরাজও মৃত্যুর সঙ্গে তাঁদের অনুগমন করছিলেন। যমরাজের পশ্চাতে ভগবান শংকরের তীক্ষ্ণ ফলাযুক্ত বিজয় নামের ত্রিশূল চলত। তার পিছনে নানাপ্রকার জলচরবেষ্টিত হয়ে জলাধীশ বরুন সেছিলেন। চন্দ্র তখন মহাদেবের মাথার শ্বেতছত্র ধরেছিলেন। বায়ু এবং অগ্নি মমর নিয়ে অবস্থান করছিলেন। তাঁদের পিছনে রাজর্ষিদের সঙ্গে দেবরাজ ইন্দ্র স্তুতি করতে করতে যাচ্ছিলেন।

মহাদের অত্যন্ত উদারভাবে তখন কার্তিককে বললেন- 'তুমি সর্বদা সতর্কতার সঙ্গে ব্যূহ রক্ষা করবে।' স্কন্দ বললেন- 'ভগবান! আমি অবশ্য তা রক্ষা করব। এছাড়া আর কোনো কাজ থাকলে বলুন।' শ্রীমহাদেব বললেন- 'পুত্র! কর্তব্যে রত থাকাকালেও তুমি আমার সঙ্গে মাঝেমধ্যে সাক্ষাৎ করবে। আমার দর্শনলাতে ও ভক্তির দ্বারা তোমার পরম কল্যাণ হবে।' এই বলে তিনি কার্তিককে আলিঙ্গন করে বিদায় নিলেন। তিনি প্রস্থান করতেই অত্যন্ত উৎপাত আরম্ভ হল। সমস্ত দেবতা তাতে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। নক্ষত্রসহ আকাশ জ্বলতে লাগল, জগৎ রুদ্ধ হয়ে গেল, পৃথিবী টালমাটাল হতে লাগল, জগৎ অন্ধকারে ছেয়ে গেল। তার মধ্যে পর্বত ও মেঘের ন্যায় নানাপ্রকার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ভয়ানক সেনাবাহিনী দেখা গেল। তারা অত্যন্ত ভয়ংকর এবং অসংখ্য ছিল। সেই ভীষণ বাহিনী সহসা ভগবান শংকর এবং সমস্ত দেবতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং নানাপ্রকার অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে আঘাত করতে লাগল। সেই ভয়ংকর অস্ত্রযুদ্ধে আহত হয়ে একটু পরেই দেবসেনারা সংগ্রাম ছেড়ে পালাতে লাগল।

দানবদের আঘাতে আহত সেনাদের পালাতে দেখে ইন্দ্র তাদের সাহস দেবার জন্য বললেন- 'বীরগণ! ভয় পরিত্যাগ করো, অস্ত্র হাতে নাও, তোমাদের মঙ্গল হবে। একটু ধৈর্য ধরো, তোমাদের দুঃখ দূর হবে। এই ভয়ানক, দুষ্ট দানবদের পরাস্ত করো। এসো, আমরা সকলে মিলে ওদের আক্রমণ করি।' ইন্দ্রের কথা শুনে দেবতারা ধৈর্য ধরে ইন্দ্রের সঙ্গে এসে দানবদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন। সমস্ত দেবতা, মহাবলী মরুৎ, সাধ্য এবং

বসুগণও যুদ্ধে যোগদান করলেন। তাঁদের অস্ত্রের আঘাতে দৈত্যদের শরীর রক্তে লাল হয়ে গেল। তাদের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে রণভূমিতে ছড়িয়ে পড়তে লায়ন এইভাবে দেবতারা দানবসেনাদের আহত করে দিলেন। এর মধ্যে মহিষ নামের এক দৈতা বিশাল পর্বত নিয়ে দেবতাদের দিকে ধাবিত হল, তাকে দেখে দেবতারা পালিয়ে লাগলেন। কিন্তু সে তাঁদের পিছনে গিয়ে দেবতাদের ওপর সেই বিশাল পাহাড় ছুঁড়ে মারল। সেই আঘাতে দশ হাজার সৈন্য ধরাশায়ী হল। তারপর মহিষাসুর অন্য দানবদের নিয়ে দেবতাদের ওপর আক্রমণ হানল। তাকে আসতে দেখ ইন্দ্র সহ সমস্ত দেবতা পালাতে লাগলেন। ক্রুদ্ধ মহিষাসুর তখন অতি বেগে গিয়ে ভগবান রুদ্রের রথের রশি হয়ে ফেলল। 

তাই দেখে শ্রীমহাদেব মহিষাসুর বধের সংকল্প করে কালরূপ শ্রীকার্তিককে স্মরণ করলেন। কান্তিমান কার্তিক তৎক্ষণাৎ রণভূমিতে উপস্থিত হলেন। তিনি ক্রোধে সূর্যের ন্যায় অগ্নিগর্ত হয়েছিলেন। তিনি লালবস্তু পরিধান করেছিলেন, গলায় রক্তবর্ণের মালা, ঘোড়ার রংও লাল। তিনি স্বর্ণকবচ ধারণ করেছিলেন এবং অগ্নির ন্যায় সুখব কান্তিসম্পন্ন রথে আরোহণ করেছিলেন। তাঁকে দেখেই দৈত্যসেনারা রণভূমি পরিত্যাগ করে পালাতে লাগল।

মহাবলী কার্তিক মহিষাসুরকে বধ করার জন্য এক প্রজ্বলিত। শক্তি নিক্ষেপ করলেন। সেটি গিয়ে তার বিশাল মস্তক কেটে ফেলল এবং মহিষাসুর প্রাণহীন হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। মহিষাসুরের পর্বতসমান মস্তক গিয়ে উত্তর কুরুদেশের ষোলো যোজন বিস্তৃত পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। শক্তি বার বার নিক্ষেপ করে কার্তিক বহু দৈত্য সংহার করলেও তা পুনরায় কার্তিকের হাতেই ফিরে আসত। এইভাবে কার্তিক সমস্ত শত্রুকে পরাস্ত করলেন। সূর্য যেমন অন্ধকারকে, অগ্নি যেমন বৃক্ষকে এবং বায়ু যেমন মেঘকে নাশ করে, তেমনই কার্তিক সমস্ত শত্রুকে নাশ করলেন।

তারপর তিনি ভগবান শংকরকে প্রণাম করলেন এবং বর চাইলেন। দেবতাদের পূজা করলেন। তাঁকে তখন কিরণজালমণ্ডিত সূর্যের মতো দীপ্ত বলে মনে হচ্ছিল। ইন্দ্র তাঁকে আলিঙ্গন করে বললেন-'কার্তিক! এই মহিষাসুর ব্রহ্মার কাছে বরপ্রাপ্ত হয়েছিল, তাই সমস্ত দেবতাই এর কাছে তৃণের মতো, তাকে আজ আপনি বধ করলেন। এর ফলে আপনি আজ দেবতাদের এক ভয়ানক কণ্টক দূর করলেন। এতদ্ব্যতীত আপনি আরও অন্য বহু দৈত্য বধ করেছেন, যারা এর আগে বহু ক্লেশ দিয়েছে। দেব, আপনি ভগবান শংকরের মতোই সংগ্রামে অজেয় হবেন আর আপনার এই প্রথম যুদ্ধপরাক্রম প্রসিদ্ধ হয়ে থাকবে। ত্রিলোকে আপনার অক্ষয় কীর্তি ছড়িয়ে পড়বে এবং হে মহাবাহো, সকল

দেবতাই আপনার অধীনে থাকবেন।' এই কথা বলে ইন্দ্র ভগবান শিবের অনুমতি নিয়ে দেবতাদের সঙ্গে করে রওনা হলেন। মহাদেব তখন অন্য সব দেবতাদের বললেন 'তোমরা কার্তিককে আমার মতোই মান্য করবে।' তারপর তিনি ভদ্রবটে চলে গেলেন এবং দেবতারাও যে যার নিজ স্থানে চলে গেলেন। অগ্নিকুমার কার্তিক একদিনেই সমস্ত দানব সংহার করে ত্রিলোক জয় করে নিলেন। মহর্ষিরা তাঁকে সাধ্যমতো পূজা করলেন।

যুধিষ্ঠির বললেন-দ্বিজবর। ভগবান কার্তিকের তিনলোকে বিখ্যাত যে সব নাম আছে, আমি তা জানতে চাই।

মহর্ষি মার্কণ্ডেয় বললেন-শুনুন! আগ্নেয়, স্বন্দ, দীপ্তকীর্তি, অনাময়, ময়ূরকেতু, ধর্মাত্মা, ভূতেশ, মহিযমর্দন, কামজিৎ, কামদ, কান্ত, সত্যবাক্, ভুবনেশ্বর, শিশুশীঘ্র, শুচি, চণ্ড, দীপ্তবর্ণ, শুভানন, অমোঘ, অনঘ, রৌদ্র, প্রিয়, চন্দ্রানন, দীপ্তশক্তি, প্রশান্তাত্মা, ভদ্রকৃৎ, কূটমোহন, যষ্ঠীপ্রিয়, ধর্মাত্মা, পবিত্র, মাতৃবৎসল, কন্যাভর্তা, বিভক্ত, স্বাহেয়, রেবতীসূত, প্রভু, নেতা, বিশাখ, নৈগমেয়, সুদুশ্চর, সুব্রত, ললিত, বালক্রীড়নক-প্রিয়, বাসুদেবপ্রিয় ও প্রিয়কৃৎ-কার্তিকেয়র এইগুলি দিব্য নাম। যে এটি পাঠ করে সে নিঃসন্দেহে স্বর্গ, কীর্তি ও ধনলাভ করে।

বি: আলোচ্য: মহাকাব্যের পাতায় কার্তিকেয় (বা স্কন্দ) কর্তৃক মহিষাসুর বধ এবং পরবর্তীতে পুরাণ ও বাঙালির ঘরে ঘরে জনপ্রিয় দেবী দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপ—এই দুটি কাহিনীর মধ্যে সম্পর্কটি অত্যন্ত চমৎকার ও গভীর। ওপর ওপর মনে হতে পারে এরা একে অপরের বিরোধী, কিন্তু সনাতন ধর্মে ও পৌরাণিক বিবর্তনে এদের সম্পর্কটি আসলে ধারাবাহিকতা, রূপক এবং দেবত্বের রূপান্তর বা মেলবন্ধনের।

১. উৎসের ভিন্নতা এবং গ্রন্থগত বিবর্তন

মহাভারতের এই কাহিনী এবং দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের কাহিনীর মধ্যে যুগের ও গ্রন্থের একটি বড় তফাত রয়েছে:

 মহাভারতের স্কন্দ (প্রাচীন রূপ): মহাভারতের 'বনপর্ব'-এ মার্কণ্ডেয় মুনি যুধিষ্ঠিরকে যে কাহিনী শোনাচ্ছেন, সেটি অনেক প্রাচীন। সেই যুগে স্কন্দ বা কার্তিকেয় ছিলেন মূল যোদ্ধা ও প্রধানতম দেবসেনাপতি। এখানে অসুরদের দমন করার মূল পুরুষ সিংহ ছিলেন তিনিই।

 দেবীভাগবত ও শ্রীশ্রীচণ্ডী (পরবর্তী রূপ): এর বেশ কিছু শতাব্দী পরে যখন 'মার্কণ্ডেয় পুরাণ' (যার অংশ শ্রীশ্রীচণ্ডী) বা 'দেবীভাগবত পুরাণ' রচিত হয়, তখন সনাতন ধর্মে 'শাক্ত' বা নারী শক্তির মহিমা চূড়ান্ত রূপ পায়। সেখানে দেখানো হয় যে, মহিষাসুর ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর ও অন্যান্য পুরুষ দেবতাদের তেজকে পরাস্ত করে স্বর্গ দখল করেছিল। তখন সমস্ত দেবতার সম্মিলিত তেজ বা শক্তি ঘনীভূত হয়ে জন্ম নেন অষ্টাদশভূজা বা দশভূজা দেবী দুর্গা।

২. তেজ বা শক্তির উত্তরাধিকার (মা ও ছেলের অভিন্নতা)

মহাজাগতিক বা আধ্যাত্মিক দিক থেকে বিচার করলে দেখা যাবে, কার্তিকেয় এবং দুর্গা আলাদা কেউ নন।

মহাভারতের গল্পেই ব্রহ্মাদেব কার্তিককে শিবের কাছে পাঠানোর সময় বলছেন:

"জগতের হিতের জন্য ভগবান রুদ্র অগ্নিতে আর উমা (পার্বতী) স্বাহাতে প্রবেশ করে তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।"অর্থাৎ, কার্তিকের ভেতরে স্বয়ং দেবী পার্বতী বা উমার তেজ প্রথম থেকেই বিদ্যমান ছিল। মা দুর্গা যখন মহিষাসুর বধ করেন, তখন কার্তিকেয় তাঁরই পাশে থেকে যুদ্ধ করেন। রূপক অর্থে, মায়ের ভেতরের যে সংহারক শক্তি অসুর বধ করেছিল, মহাভারতের যুগে সেই শক্তিরই প্রকাশ ঘটেছিল তাঁর পুত্র স্কন্দের মাধ্যমে। মায়ের তেজই পুত্রের হাত ধরে মহিষাসুরকে প্রথম ধাক্কাটি দিয়েছিল। 

৩. একাধিক 'মহিষাসুর' এবং কল্পভেদ (Time-loop বা বিভিন্ন সময়ের যুদ্ধ)

পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সৃষ্টি একবারে হয়নি। হিন্দু ধর্মে 'কল্পভেদ' বলে একটি তত্ত্ব আছে। এর অর্থ হলো, মহাবিশ্ব বারবার ধ্বংস হয় এবং বারবার সৃষ্টি হয় (Time Cycles)।

 একটি কল্পে বা সময়ে যখন দেবতারা অত্যাচারিত হয়েছিলেন, তখন শিব-পার্বতীর তেজ থেকে জাত অগ্নিপুত্র কার্তিকেয় সেনাপতি হয়ে মহিষাসুরকে বধ করেন।

 অন্য এক কল্পে, মহিষাসুর যখন ব্রহ্মার কাছ থেকে বর পায় যে "কোনো পুরুষ তাকে বধ করতে পারবে না", তখন পুরুষ দেবতা হিসেবে কার্তিকেয় বা শিব কেউই তাকে মারতে পারতেন না। সেই সময় পুরুষ দেবতাদের তেজ একত্রিত হয়ে নারী রূপ ধারণ করে—যিনি দেবী দুর্গা।

তাই পুরাণের পণ্ডিতদের মতে, এই দুটি ঘটনা দুটি আলাদা সময়ের (কল্পের) যুদ্ধ, যা অসুরের আদি রূপ ও তার অহংকারকে চূর্ণ করার ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়।

৪. লোকসংস্কৃতি ও বাঙালির পারিবারিক মেলবন্ধন

বাঙালির দুর্গাপূজায় এই দুটি ভাবধারা এসে এক জায়গায় মিলেমিশে গেছে। মহাভারতে যিনি একা যুদ্ধজয়ী মহানায়ক, আজকের বাঙালির মণ্ডপে তিনি ঘরের ছেলে কার্তিক—যিনি মা দুর্গার যুদ্ধযাত্রার অন্যতম সঙ্গী।

রণক্ষেত্রের সেই রক্তক্ষয়ী ইতিহাসকে বাঙালি এক মিষ্টি পারিবারিক আবহে বেঁধে ফেলেছে। মা দুর্গা যখন মহিষাসুরকে ত্রিশূল দিয়ে বিদ্ধ করছেন, তখন তাঁর পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী ও গণেশের সাথে কার্তিকেয়ও অস্ত্রহাতে দাঁড়িয়ে আছেন। মহাভারতের সেই প্রাচীন রণক্ষেত্রের দুর্ধর্ষ দেবসেনাপতি আজ মায়ের মহিষাসুর বধের অন্যতম প্রধান সাক্ষী ও রক্ষাকর্তা।

সংক্ষেপে বলতে গেলে: মহাভারতের স্কন্দ-কাহিনী হলো পুরুষতান্ত্রিক বীরত্বের যুগে শক্তির প্রকাশ, আর চণ্ডীর দুর্গাকাহিনী হলো আদি পরাশক্তি বা নারী শক্তির চূড়ান্ত বিজয়। পাত্র বদলালেও, দুটিরই মূল বার্তা এক—অশুভ শক্তির বিনাশ এবং ধর্মের জয়।

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের   ৫০তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বনপর্বের ৪৯তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)

 সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ