৪৯তম বনপর্ব ব্রাহ্মণ কৌশিক ও ধর্মব্যাধের পরমাত্মার সংলাপ —
৪৯তম বনপর্ব ব্রাহ্মণ কৌশিক ও ধর্মব্যাধের পরমাত্মার সংলাপ —
মহর্ষি মার্কণ্ডেয়ের কণ্ঠস্বর গঙ্গার মৃদু তরঙ্গের মতো ধীর অথচ গম্ভীর। চারধারে অরণ্যের নিস্তব্ধতা। পাণ্ডবদের কুটিরের সামনে বসে থাকা যুধিষ্ঠির গভীর তৃষ্ণা নিয়ে শুনছিলেন সেই পুণ্য কথা। মহর্ষি বলতে লাগলেন— হে কুন্তীপুত্র, সত্যের অন্বেষণ বড় বিচিত্র পথ ধরে চলে। কখনও তা হিমালয়ের তুষারশুভ্র শিখরে নিয়ে যায়, আবার কখনও তা এনে দাঁড় করায় মিথিলার এক সংকীর্ণ, কোলাহলপূর্ণ কসাইখানায়। অহংকারী ব্রাহ্মণ কৌশিকের অহংকার চূর্ণ হয়েছিল এক ব্যাধের সামান্য পর্ণকুটিরে এসে। ধর্মের আসল রূপ জানতে কৌশিক যখন সেই মাংস বিক্রেতার সামনে করজোড়ে দাঁড়াল, তখনই শুরু হলো মহাভারতের এক পরম অনুপম অধ্যায়।
১. শিষ্টাচারের অন্বেষণ: কৌশিকের প্রথম জিজ্ঞাসা
কৌশিকের মনের সব ঔদ্ধত্য ততক্ষণে গলে জল হয়ে গেছে। এক পতিব্রতা রমণীর অলৌকিক তপোবলের উৎস খুঁজতে এসে সে এসে পৌঁছেছে এক শূদ্র ব্যাধের দ্বারে, যে জীবিকার তাগিদে পশুমাংস বিক্রয় করে। কিন্তু ব্যাধের চোখের সেই অচঞ্চল, শান্ত দীপ্তি দেখে কৌশিক বুঝতে পেরেছিল, এই মানুষটির ভেতরে এমন এক আলোর উৎস রয়েছে যা কোনো শুষ্ক বেদপাঠে সহজে মেলে না।
কৌশিক ব্যাকুল কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, "হে নরশ্রেষ্ঠ! সজ্জন ব্যক্তিদের পরম আশ্রয় যে শিষ্টাচার, তার প্রকৃত রূপটি কী? কীভাবে মানুষ সচ্চরিত্র হয়ে ওঠে? কৃপা করে আমাকে সবিস্তারে বুঝিয়ে বলো।"
ধর্মব্যাধ মৃদু হাসল। চারধারে মাংসের টুকরো আর রক্তের দাগের মাঝে বসেও তার মুখে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি। সে বলল, "হে ব্রাহ্মণ, শিষ্টাচার কোনো বাহ্যিক আবরণ নয়, এটি আত্মার অলংকার। পঞ্চ মহাযজ্ঞ, পরম তপস্যা, মুক্তহস্তে দান, নিয়মিত বেদের স্বাধ্যায় এবং সর্বাবস্থায় সত্যভাষণ— এই পাঁচটি স্তম্ভের ওপর শিষ্ট পুরুষের জীবন দাঁড়িয়ে থাকে। কাম, ক্রোধ, লোভ, দম্ভ এবং মত্ততা— এই পঞ্চ রিপু যে জয় করেছে, যার মন এই কুটিল রিপুগুলির ক্রীড়নক হয় না, শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা তাকেই শিষ্ট বলে সম্মান করেন। তাঁদের জীবন কোনো আকস্মিক উচ্ছৃঙ্খলতা নয়, বরং এক নিয়মিত যজ্ঞের মতো সুন্দর।"
ব্যাধ আরও বুঝিয়ে বলল, "শোনো হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ, সমস্ত বেদের মূল সত্য লুকিয়ে আছে সত্যে; সত্যের সার রয়েছে ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণে, আর ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণের পরম পরিণতি হলো ত্যাগ। এই ত্যাগই শিষ্ট মানুষের প্রধান সম্পদ। জীবনকে এক গভীর নদীর সঙ্গে তুলনা করো। এই নদীর জল হলো পঞ্চ ইন্দ্রিয়, যা আমাদের সর্বদা চঞ্চল করে তোলে। আর এর গভীরে বাস করে কাম আর লোভ নামক দুই হিংস্র কুমির। জন্ম আর মৃত্যুর এই দুর্গম নদী পার হতে হলে ধৈর্য নামের শক্ত নৌকায় চড়তে হবে। সাদা কাপড়ে যেমন যেকোনো রং খুব সুন্দর ফুটে ওঠে, তেমনই যিনি শিষ্টাচার পালন করেন, তাঁর জীবনের প্রতিটি সৎকর্ম ও সঞ্চিত জ্ঞান এক মহাধর্মে রূপান্তরিত হয়ে সুশোভিত হয়।"
২. ধর্মের সূক্ষ্ম গতি ও কর্মফলের অমোঘ চক্র
ধর্মের গভীর জটিলতা কৌশিককে আরও আকুল করে তুলল। সে বিস্মিত হয়ে দেখছিল, বেদবিহিত ধর্মের সঙ্গে এক সামান্য ব্যাধের প্রাত্যহিক চিন্তার মেলবন্ধন কতটা গভীর। কৌশিকের কৌতূহল মেটাতে ব্যাধ এবার ধর্মের সেই দুর্জ্ঞেয়, সূক্ষ্ম তত্ত্বের অবতারণা করল যা সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে থেকে যায়।
ধর্মব্যাধ ধীর স্বরে বলল, "হে ব্রাহ্মণ, বেদই ধর্মের একমাত্র প্রমাণ— এই কথা সত্য। কিন্তু ধর্মের গতি অতি সূক্ষ্ম, তার শাখা-প্রশাখা বড় জটিল। সাধারণ চোখে যা সত্য, গভীর বিচারে তা কখনও কখনও অধর্ম হয়ে উঠতে পারে। ধরো, কারও জীবন সংকটাপন্ন, এক ফালি অসত্য কথা বললে যদি সেই নিরপরাধ প্রাণটি রক্ষা পায়, তবে সেই মুহূর্তে অসত্যই হয়ে ওঠে পরম ধর্ম। আবার যে সত্য কারও বিনাশ ডেকে আনে, তা বাহ্যত সত্য হলেও আদতে তা চরম অধর্ম। কারণ, যা সৃষ্টির হিত সাধন করে, যা জীবের পরম কল্যাণ করে— তা-ই একমাত্র সত্য।"
ব্যাধের কথা শুনে কৌশিক মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে লাগলেন। ব্যাধ বলতে লাগল, "মানুষ তার শুভ আর অশুভ কর্মের ফল ভোগ করতে বাধ্য। যখন তার জীবনে দুঃখের কালো মেঘ নেমে আসে, তখন সে দেবতাকে অভিশাপ দেয়, অদৃষ্টকে গালমন্দ করে। কিন্তু সে বোঝে না, এ তার নিজেরই অতীত কর্মের ফসল। যদি কেবল পুরুষার্থই সব হতো, তবে এই জগতে কেউ অসফল হতো না। বড় বড় তপস্বী ও কার্যকুশল মানুষও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়, আবার কোনো চেষ্টা ছাড়াই কেউ বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়। কেউ সারাজীবন দেবতা ডেকেও কুলকুলাঙ্গার সন্তান পায়, আবার কেউ বিনা প্রার্থনায় সুসন্তানের জনক হয়। এ সমস্তই প্রারব্ধ আর কর্মের খেলা। এই শরীর নশ্বর, কিন্তু আমাদের ভেতরে যে সনাতন জীবাত্মা রয়েছে, তা অবিনাশী। সে কেবল এক বস্ত্র জীর্ণ হলে যেমন অন্য বস্ত্র পরিধান করে, তেমনই এক শরীর ছেড়ে অন্য শরীরে প্রবিষ্ট হয়।"
তত্ত্ব কথা: চব্বিশ তত্ত্ব ও পঞ্চভূতের রহস্য
জগৎ চরাচর পঞ্চভূতে নির্মিত— আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল এবং পৃথিবী। শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ এদের গুণ। এই পঞ্চভূতের সাথে মন (ষষ্ঠ), বুদ্ধি (সপ্তম), অহংকার (অহম) এবং পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, জীবাত্মা ও ত্রিগুণ (সত্ত্ব, রজ, তম) যুক্ত হয়ে চব্বিশ তত্ত্বের সৃষ্টি করে। যখন মানুষ তার ইন্দ্রিয়গুলোকে বশ করে আত্মতত্ত্বের দর্শন পায়, তখন সে সমস্ত জগতের মাঝে নিজেকে এবং নিজের মাঝে সারা বিশ্বকে দেখতে পায়। এটাই ব্রহ্মভাব।
৩. পিতা-মাতার পরম সেবা: ব্যাধের সিদ্ধির আসল চাবিকাঠি
কৌশিক ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "হে পরম জ্ঞানী, তুমি ব্যাধ হয়েও কীভাবে এই দিব্যদৃষ্টি লাভ করলে? কোন সাধনায় তোমার এই সিদ্ধি?"
ধর্মব্যাধ তখন স্মিত হাস্যে কৌশিককে তার গৃহের ভেতরে নিয়ে গেল। কৌশিক বিস্ময়ে দেখলেন, মাংসের দোকানের পেছনেই লুকিয়ে আছে এক দেবালয়সম শ্বেতবর্ণের ভবন। ধূপ আর সুগন্ধি কেশরের সৌরভে চারদিক আমোদিত। সেখানে এক সুন্দর আসনে বসে আছেন ব্যাধের বৃদ্ধ পিতা ও মাতা। তাঁদের পরিধানে শুভ্র বস্ত্র, চোখে-মুখে বার্ধক্যের এক পরম শান্তি।
ব্যাধ ঘরে ঢুকেই সাষ্টাঙ্গে পিতা-মাতার চরণে প্রণাম করল। বৃদ্ধ পিতা অত্যন্ত স্নেহে বললেন, "ওঠো বাবা। তুমি দীর্ঘজীবী হও। তোমার সেবাতেই আজ আমরা ধন্য। কায়মনোবাক্যে তুমি যেভাবে আমাদের পূজা করেছ, তা দেবপূজার চেয়েও শ্রেষ্ঠ।"
ব্যাধ কৌশিককে উদ্দেশ্য করে বলল, "হে দ্বিজবর! এই পিতা-মাতাই আমার পরম ঈশ্বর। তেত্রিশ কোটি দেবতা আমার এই বৃদ্ধ পিতা-মাতার মাঝেই বিরাজমান। চতুর্বেদ আর যজ্ঞের ফল আমি এঁদের সেবার মাধ্যমেই লাভ করি। এঁদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া, এঁদের পছন্দ-অপছন্দের খেয়াল রাখাই আমার একমাত্র তপস্যা। আর এই সেবার পুণ্যেই আমি দিব্যদৃষ্টি লাভ করেছি। এই দৃষ্টি দিয়েই আমি জেনেছি, আপনি এক পতিব্রতা নারীর কথায় এখানে এসেছেন। কিন্তু ব্রহ্মন্, আপনি বেদপাঠের জন্য আপনার অন্ধ বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে না জানিয়ে গৃহত্যাগ করেছেন। আপনার শোকে তাঁরা আজ অন্ধ ও জরাজীর্ণ। আপনার এই তপস্যা সম্পূর্ণ ব্যর্থ, যদি না আপনি তাঁদের সেবা করেন।"
কৌশিকের চোখের পাতা ভিজে উঠল। এক পরম অপরাধবোধ ও একই সাথে পরম সত্যের আলোয় তাঁর অন্তর উদ্ভাসিত হয়ে গেল। তিনি দুই হাত জোড় করে বললেন, "হে মহাত্মন, তুমি শূদ্রকুলে জন্মালেও আমার চোখে তুমিই পরম ব্রহ্মজ্ঞানী শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ। কারণ আচার আর গুণেই মানুষ ব্রাহ্মণ হয়, জন্মে নয়। তুমি আজ আমাকে নরকের পথ থেকে রক্ষা করলে। আমি এখনই গৃহে ফিরে যাব এবং আমার পিতা-মাতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করব।"
ধর্মব্যাধ করজোড়ে বিদায় জানাল। কৌশিক তাকে প্রদক্ষিণ করে এক নতুন মানুষ হিসেবে তাঁর জন্মভূমির দিকে পথ চলতে শুরু করলেন। মহর্ষি মার্কণ্ডেয় তাঁর কাহিনী শেষ করে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, "হে ধর্মরাজ, পিতা-মাতার সেবা আর শম-দম পালনের চেয়ে বড় কোনো ধর্ম এই জগতে নেই।" যুধিষ্ঠির পরম শান্তিতে চোখ বুজলেন, তাঁর অন্তরে তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এসেছে।
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৪৯তম ভাগের আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
বনপর্বের ৪৮তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচির প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচির দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচির- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment