১ম ভাগ বিরাটপর্ব-পান্ডবদের অজ্ঞাতবাসের প্রাক্কালে
১ম ভাগ বিরাটপর্ব-পান্ডবদের অজ্ঞাতবাসের প্রাক্কালে-
ও শ্রীগণেশার নমঃ।
নারায়ণং নমষ্কৃত্য নবঞ্চৈব নরোত্তমম্।
দেবীং সরস্বতীং ব্যাসং ততো জয়মুদীরয়েৎ।।
নারায়ণং নমষ্কৃত্য নবঞ্চৈব নরোত্তমম্।
দেবীং সরস্বতীং ব্যাসং ততো জয়মুদীরয়েৎ।।
বেদব্যাসকে শ্রদ্ধাভরে প্রণাম জানিয়ে পরম কল্যাণপ্রদ 'জয়' নামক শাস্ত্র পাঠ করা উচিত।
শব্দানুসারে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে পরপর চারজন পরম পূজনীয় সত্তাকে বন্দনা করা হয়েছে। প্রথমত, 'নারায়ণং (নার (Nāra): 'নর' শব্দ থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ—জল, সমস্ত জীব বা মহাবিশ্বের কারণস্বরূপ পরম শক্তি+অয়ন (Ayana): আশ্রয়স্থল, বাসস্থান বা চলার পথ।)নমষ্কৃত্য'—(নমস্ (Namas): প্রনাম +কৃ (Kṛ) অর্থাৎ সৃষ্টির মূল আধার ও পরমেশ্বর শ্রীনারায়ণকে বন্দনা। দ্বিতীয়ত, 'নরঞ্চৈব ( নর + চ + এব) নরোত্তমম্'( নর বা মানুষ+উত্তমম বা শ্রেষ্ঠ)অর্থাৎ পুরুষোত্তম 'নর' বা নর-নারায়ণের নর রূপকে স্মরণ। তৃতীয়ত, 'দেবীং সরস্বতীং'—অর্থাৎ বাক্য ও বুদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীকে বিনম্র প্রণাম। এবং চতুর্থত, 'ব্যাসং'—অর্থাৎ মহাকাব্য ও শাস্ত্রের সংকলক সাক্ষাৎ জ্ঞানগুরু মহর্ষি বেদব্যাসকে শ্রদ্ধা নিবেদন। এই বন্দনা পর্ব সম্পন্ন করেই বলা হয়েছে—'ততো জয়মুদীরয়েৎ' (জয়ম্ (Jayam): +উদীরয়েৎ (Udīrayet): পাঠ করা উচিত জয়' নামক গ্রন্থ (অতঃপর 'জয়' পাঠের সূচনা করা হোক)।
সনাতন ভাবধারায় যেকোনো শুভ কাজ, কাব্য রচনের প্রারম্ভে কিংবা শাস্ত্র পাঠের শুরুতে মঙ্গলাচরণ করার একটি সুপ্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে। মহাভারত, শ্রীমদ্ভাগবত এবং বিভিন্ন পুরাণের সূচনায় উল্লিখিত এই বিখ্যাত শ্লোকটি হলো তেমনই একটি কালজয়ী মঙ্গলাচরণ। এটি কেবল কতগুলো শব্দের সমষ্টি নয়, বরং ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, গুরুভক্তি এবং পরম তত্ত্বলাভের বিনম্র আবেদন।
শ্লোকের সরলার্থ ও শাব্দিক গঠন
আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ও চার সত্তার ভূমিকা
এই শ্লোকের গূঢ় ভাবার্থ অত্যন্ত গভীর। ভারতীয় দর্শনে জ্ঞান অর্জনের জন্য চারটি ভিত্তির প্রয়োজন হয়—পরমেশ্বর, আদর্শ ভক্ত/সাধক, পরম জ্ঞান এবং গুরু। শ্লোকটিতে এই চারটি তত্ত্বেরই অপূর্ব সমাবেশ ঘটেছে:
১. শ্রীনারায়ণ (পরম তত্ত্ব): তিনি জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের নিয়ন্তা। যেকোনো সৎ কাজের সিদ্ধি এবং পরম জ্ঞান লাভের অন্তিম লক্ষ্য হলেন তিনি। তাই সর্বাগ্রে তাঁর স্মরণ আবশ্যক।
২. নরোত্তম নর (সাধক ও আদর্শ মানব): 'নর' ও 'নারায়ণ' সনাতন ঋষিদ্বয়, যাঁরা যথাক্রমে জীব ও পরমাত্মার প্রতীক। মহাভারতে এই নর-ই অর্জুন রূপে অবতীর্ণ হন। তিনি মানবকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বা 'নরোত্তম'। সাধনার জগতে পরমাত্মার তত্ত্ব অনুধাবনের জন্য যে ভক্ত বা সাধকের প্রয়োজন, নর তারই মূর্ত প্রতীক।
৩. দেবী সরস্বতী (শুভ বুদ্ধি ও সাবলীলতা): বিদ্যা, বাক ও সারস্বত সাধনার মূল দেবী হলেন সরস্বতী। শাস্ত্রের কঠিন সত্যকে সঠিকভাবে অনুধাবন করা, প্রকাশ করা এবং অন্তরে ধারণ করার জন্য পবিত্র বুদ্ধির প্রয়োজন, যা দেবীর কৃপা ছাড়া অসম্ভব।
৪. মহর্ষি বেদব্যাস (জ্ঞানচর্চা ও পথপ্রদর্শক গুরু): বেদব্যাস কেবল একজন রচয়িতা নন, তিনি সনাতন ঐতিহ্যের মহাগুরু। তিনি বেদকে বিভাগ করেছেন এবং পুরাণ ও মহাভারতের মাধ্যমে পরম সত্যকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে তুলেছেন। গুরুর অনুকম্পা ছাড়া জ্ঞান অর্জনের পথ সুগম হয় না।
'জয়' শব্দের বিশেষ তাৎপর্য
শ্লোকের শেষ অংশে বলা হয়েছে "ততো জয়মুদীরয়েৎ"। প্রাচীনকালে মহর্ষি বেদব্যাস রচিত মহাভারতের মূল রূপটির নাম ছিল 'জয়'। পরবর্তীতে তা আঠারো হাজার শ্লোকে বর্ধিত হয়ে 'ভারত' এবং অবশেষে এক লক্ষ শ্লোকে রূপ নিয়ে 'মহাভারত' নাম লাভ করে।
তবে আধ্যাত্মিক বিচারে 'জয়' শব্দের অর্থ কেবল একটি ইতিহাস বা গ্রন্থ নয়; 'জয়' হলো আধ্যাত্মিক বিজয়। যা মানুষের মধ্যকার অজ্ঞতা, মায়া ও রিপুকে জয় করে পরম মুক্তির পথ দেখায়, তা-ই জয়। এই শাস্ত্র পাঠ বা শ্রবণের মাধ্যমে জীব তার নিজের ভেতরের তামসিকতাকে জয় করে আলোর দিকে ধাবিত হয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, এই মঙ্গলশ্লোকটি আমাদের শেখায় যে কোনো মহৎ কাজে আত্মনিয়োগ করার আগে অহংকার ত্যাগ করে বিনম্র হতে হয়। ঈশ্বর, গুরু, শাস্ত্র ও দেবশক্তির প্রতি এই পরম শ্রদ্ধা ও ভক্তিই ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতির প্রাণভোমরা। এটি কেবল একটি পাঠারম্ভের প্রার্থনা নয়, বরং অবিদ্যাকে জয় করে পরম সত্যের মুখোমুখি হওয়ার এক আধ্যাত্মিক আহ্বান।
পান্ডবদের অজ্ঞাতবাসের প্রাক্কালে: বনপর্বের শেষ অধ্যায় ও ধৌম্যের অমোঘ রাজধর্ম
যক্ষের কৃপায় পুনর্জীবন লাভ আর ত্রয়োদশ বর্ষের বর পাওয়ার পর, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির একদিন চার ভাই ও দ্রৌপদীকে ডেকে নির্জনে বসলেন। ১২ বছর অরণ্যের ধুলোবালি মেখে কেটেছে; কিন্তু এবার আসছে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা—অজ্ঞাতবাস। ত্রয়োদশতম বছরে যদি একটিবারও ছদ্মবেশ ফাঁস হয়ে যায়, তবে আবার ১২ বছরের বনবাস। বাতাসে তখন স্পষ্ট আশঙ্কার গন্ধ।
যুধিষ্ঠির বললেন, "অর্জুন, শত্রু যেন আমাদের ছায়াও না ছোঁয়। এমন কোনো সুপ্ত, সুন্দর জনপদের কথা বলো, যেখানে আমরা পাঁচটি ভাই আর পাঞ্চালী লোকচক্ষুর আড়ালে একটা বছর কাটিয়ে দিতে পারি।"
অর্জুন শান্তস্বরে উত্তর দিলেন, "মহারাজ, ধর্মরাজের বরে আমাদের কেউ চিনতে পারবে না, সে তো নিশ্চিত। তবু নিরাপত্তার স্বার্থে পঞ্চাল, চেদি, মৎস্য, অবন্তী, শাল্ব কিংবা দশার্ণের মতো সমৃদ্ধ দেশের কথা ভাবা যেতে পারে। সিদ্ধান্ত আপনার।"
যুধিষ্ঠির কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, "মৎস্যদেশের কথা ধরা যাক। সেখানকার রাজা বিরাট প্রবীণ, বলবান এবং পাণ্ডবদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বিরাটনগরেই আমরা আতিথ্য নেব—তবে অতিথি হিসেবে নয়, সেবক হিসেবে। আমি পাশা খেলায় পারদর্শী। কঙ্ক নাম নিয়ে ব্রাহ্মণ ছদ্মবেশে বিরাটের রাজসভায় ঢুকব, তাঁর সঙ্গে পাশা খেলে মন জোগাব।"
তারপর একে একে ছদ্মবেশের পরিকল্পনা স্থির হলো—
ভীম: 'বল্লব' নাম নিয়ে প্রবেশ করবেন বিরাটের পাকশালায়। পঞ্চপাণ্ডবের গদাঘাতী যোদ্ধা হয়ে উঠবেন সুস্বাদু খাবারের প্রধান পাচক।
অর্জুন: হাতে শাঁখের চুড়ি, মাথায় চুল বেধে পুরুষত্ব বিসর্জন দিয়ে হবেন 'বৃহন্নলা'। রাজকন্যার নৃত্য-গীত আর বাদ্যযন্ত্রের শিক্ষক।
নকুল: অশ্ববিদ্যায় যাঁর জুড়ি নেই, তিনি 'গ্রন্থিক' নাম নিয়ে সামলাবেন রাজার আস্তাবল।
সহদেব: 'তন্ত্রিপাল' পরিচয়ে দায়িত্ব নেবেন হাজার হাজার গবাদি পশুর। ষাঁড় আর গাভীর লক্ষণ যাঁর নখদর্পণে, তিনি থাকবেন রাখালের বেশে।
যুধিষ্ঠির পরম মমতায় দ্রৌপদীর দিকে তাকাতেই পাঞ্চালী মৃদু হেসে বললেন, "আমার জন্য ভাববেন না মহারাজ। চন্দন চেনা, চুল বাঁধা আর রানিকে সাজানোর বিদ্যা আমার জানা আছে। আমি 'সৈরন্ত্রী' পরিচয়ে রানি সুদেষ্ণার সেবিকা হব। বলব, আমি একসময় পাণ্ডবদের দ্রৌপদীর দাসী ছিলাম।"
গৃহব্যবস্থাও সুনির্দিষ্ট হলো। পুরোহিত ধৌম্য ও পাচক রাজপুরী পাঞ্চালে ফিরে যাবেন যজ্ঞের পবিত্র অগ্নি সামলাতে। রথ ও ঘোড়া নিয়ে অনুচরেরা চলে যাবে দ্বারকায়। কেউ যদি পাণ্ডবদের খোঁজ চায়, উত্তর একটাই—"দ্বৈতবনে আমাদের ছেড়ে ওঁরা কোথায় হারিয়ে গেছেন, জানি না।"
যাত্রা শুরুর আগে পুরোহিত ধৌম্য পাণ্ডবদের ঘিরে বসলেন। রাজদরবারে ছদ্মবেশে টিকে থাকার যে কঠিন রাজনৈতিক ও আচরণগত বার্তা তিনি দিলেন, তা যেন চিরন্তন রাজধর্মের এক অনন্য দলিল—
"শোনো পাণ্ডবগণ, রাজার গৃহে থাকা আর আগুনের ওপর হাঁটা একই কথা। রাজার মন বোঝা কঠিন, তাই অন্ধবিশ্বাস সেখানে বর্জনীয়। নিজের সীমা কখনো ভুলবে না। রাজার স্ত্রী ও অন্তঃপুরের ঘনিষ্ঠদের থেকে দূরে থাকবে। রাজা অপ্রিয় কথা বললেও বাইরে গিয়ে প্রচার করবে না। অহংকার ত্যাগ করবে, উচ্চস্বরে হাসবে না, গা-হাত নাড়িয়ে অহেতুক অঙ্গভঙ্গি করবে না। রাজা যে কাজে পাঠাবেন, তাতেই আনন্দ পাবে। উৎকোচ বা ঘুস নিলে একদিন না একদিন ধরা পড়তে হবে, আর তার শাস্তি মৃত্যু। চরম অপমানেও যে নিজের রাগ সামলে রাজকাজে অবিচল থাকে, শেষ পর্যন্ত রাজসভায় সেই টিকে থাকে।"
ধৌম্যের সেই গভীর ও ব্যবহারিক উপদেশ শিরে ধার্য করলেন যুধিষ্ঠির।
অতঃপর, বিজয়ের মন্ত্রপূত বেদধ্বনি আর অগ্নিহোত্র যজ্ঞের ধোঁয়া আকাশে মিলিয়ে গেল। পুরোহিত ধৌম্যকে বিদায় জানিয়ে, হস্তিনাপুরের প্রকৃত উত্তরাধিকারী পঞ্চপাণ্ডব আর দ্রৌপদী রাজকীয় অলঙ্কার ও পরিচয় বিসর্জন দিয়ে পা বাড়ালেন এক অজানা, অচেনা বিরাটনগরের উদ্দেশ্যে। শুরু হলো এক মহাকাব্যিক রূপান্তরের ইতিহাস।
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে এবং বনপর্ব ৬৫তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিরাটপর্বের ১ম ভাগের আলোচনা এবং বিরাট পর্বের পরবর্তী ভাগ চলবে।
বনপর্বের ৬৫তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment