৩৪তম বন পর্ব -জটাসুর-বধ: ভীমসেনের বজ্রনির্ঘোষ


৩৪তম বন পর্ব -জটাসুর-বধ: ভীমসেনের বজ্রনির্ঘোষ

সেদিন ললাটের লিখন মেনেই যেন এক অদ্ভুত ব্রাহ্মণের আগমন ঘটল পাণ্ডবদের পর্ণকুটিরে। সৌম্য তনু, কপালে তিলক, মুখে শাস্ত্রের খই। সে সগর্বে ঘোষণা করল, "মন্ত্রবিদ্যায় আমার সমকক্ষ কেউ নেই, শাস্ত্রের গূঢ়ার্থ আমার নখদর্পণে।" পাণ্ডবগণ সরল বিশ্বাসে সেই সুপণ্ডিতকে সমাদর করলেন। কিন্তু কে জানত, সেই ছদ্মবেশের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ক্রূর রাক্ষস—যার নাম জটাসুর! তার লোলুপ দৃষ্টি ছিল পাণ্ডবদের দিব্যাস্ত্র এবং পাঞ্চালীর অলৌকিক লাবণ্যের ওপর। সে শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষায় ওত পেতে রইল।

একদিন সুযোগ এসেও গেল। মহাবাহু ভীমসেন গভীর বনে মৃগয়ায় গিয়েছেন, আর সর্বজ্ঞ ঋষি লোমশ গিয়েছেন জাহ্নবীর জলে মধ্যাহ্ন-আহ্নিকে। কুটির তখন পুরুষসিংহ-শূন্য। হঠাৎ ছদ্মবেশ ছুড়ে ফেলে নিজের প্রকাণ্ড, কুৎসিত মূর্তিতে আবির্ভূত হলো জটাসুর। মুহূর্তের মধ্যে সে তিন পাণ্ডব, দ্রৌপদী এবং তাঁদের সমস্ত পবিত্র শাস্ত্রগ্রন্থ একসাথ আঁকড়ে ধরে দে ছুট! সহদেব কোনোমতে তার কবল থেকে পিছলে বেরিয়ে এলেন। দেওয়ালে ঝুলছিল তাঁর প্রিয় খড়্গ 'কৌশিকী'। সেই তরবারি মুঠোয় চেপে ধরে, ঝড়ের বেগে ভীমের সন্ধানে ছুটলেন সহদেব, কণ্ঠে তাঁর আর্তনাদ।

এদিকে রাক্ষসের কাঁধে চড়েও ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির অবিচলিত, গম্ভীর। তিনি মেঘমন্দ্রস্বরে তিরস্কার করে বললেন, "ওরে মূঢ়, এই বিশ্বাসঘাতকতায় তোর নিজের ধর্মই ছারখার হয়ে গেল। আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করে, আমাদেরই অন্ন খেয়ে এই নীচতা? এই পাপ তোর আয়ু, তোর প্রজ্ঞা, তোর সদাচার সব ধূলিসাৎ করে দেবে। মনে রাখিস, দ্রৌপদীকে স্পর্শ করা আর কালকূটের পাত্রে চুমুক দেওয়া একই কথা।" যুধিষ্ঠির যোগবলে নিজের শরীরকে পর্বতের মতো ভারী করে তুললেন। রাক্ষসের গতি শ্লথ হয়ে এল। ধর্মরাজ অভয় দিয়ে নকুল ও দ্রৌপদীকে বললেন, "ভয় পেয়ো না, বৃকোদর আসছে।"

ক্রোধে জ্বলতে জ্বলতে সহদেব সামনে এসে পথ আগলে দাঁড়ালেন, "রে নরাধম, যুদ্ধ কর! হয় আমাকে বধ করে দ্রৌপদীকে নিয়ে যা, নয়তো আমার হাতে মরে যমালয়ে প্রবেশ কর।"

ঠিক সেই মুহূর্তে, দেবরাজ ইন্দ্রের মতো হাতে গদা নিয়ে ঝড়ের বেগে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন ভীমসেন। ভাইদের আর দ্রৌপদীকে ওই অবস্থায় দেখে তাঁর চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরতে লাগল। ভীম গর্জে উঠলেন, "দুরাত্মা! যেদিন তুই শাস্ত্রের পরীক্ষা দিচ্ছিলি, সেদিনই তোর আসল রূপ আমি চিনেছিলাম। কিন্তু ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে ছিলি বলে হাত তুলিনি, কারণ বিনাদোষে কাউকে বধ করা ক্ষত্রিয়ের ধর্ম নয়। কিন্তু আজ তোর কাল ঘনিয়েছে। বক আর হিড়িম্ব যে পথে গেছে, তোকেও আজ সেই যমপুরীর পথ দেখাব।"

ভীমের সেই রুদ্রমূর্তি দেখে জটাসুর ভয়ে সবাইকে মাটিতে নামিয়ে দিল। কিন্তু রাক্ষসের অহংকার তো সহজে যায় না, সে-ও বুক চিতিয়ে চিৎকার করে উঠল, "ভীম! আজ তোর তপ্ত রক্ত দিয়ে আমি আমার স্বজাতীয়দের তর্পণ করব!"

শুরু হলো তুমুল যুদ্ধ। নকুল ও সহদেব খড়্গ হাতে জটাসুরের দিকে এগোতেই ভীম তাঁদের বাধা দিয়ে বললেন, "তোমরা সরে দাঁড়াও, শান্ত হয়ে যুদ্ধ দ্যাখো। এই কীটের জন্য আমি একাই যথেষ্ট।"

তারপর শুরু হলো দুই মহাবলী—এক মানব আর এক দানবের সেই আদিম মল্লযুদ্ধ। প্রথমে উপড়ে নেওয়া বড় বড় শাল মহীরুহ দিয়ে আঘাত, তারপর বজ্রের মতো ভারী পাথর ছোঁড়াছুঁড়ি, আর শেষে শুরু হলো হাতাহাতি—মুষ্টির পর মুষ্টির প্রহার। কুরুক্ষেত্রের পূর্বাভাস যেন সেদিন দেখল হিমালয়ের অরণ্য।

অবশেষে এল সেই মোক্ষম মুহূর্ত। ভীমসেনের এক প্রচণ্ড, নিখুঁত মুষ্ট্যাঘাত আছড়ে পড়ল জটাসুরের ঘাড়ে। রাক্ষস টাল সামলাতে না পেরে অবশ হয়ে গেল। সেই সুযোগে ভীম তাকে শূন্যে তুলে সজোরে আছাড় মারলেন মাটিতে, ভেঙে গেল তার অস্থিমজ্জা। তারপর নিজের কনুইয়ের এক অমানুষিক চাপে ধড় থেকে ছিন্ন করে ফেললেন জটাসুরের মাথা।

রক্তাক্ত রাক্ষসকে বধ করে হাঁপাতে হাঁপাতে ধর্মরাজের চরণে এসে বসলেন ভীম। চারপাশ থেকে ছুটে এলেন আশ্রয়ের ব্রাহ্মণেরা। দেবরাজ ইন্দ্র যখন দানবদের পরাজিত করে ফিরে আসেন, মরুৎগণ যেভাবে তাঁর স্তব করে, ঠিক সেভাবেই পাণ্ডবদের কুটিরে মুখরিত হলো মধ্যম পাণ্ডবের জয়ধ্বনি।

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৩৪তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বনপর্বের ৩৩তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)

 সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা