রৈবতক উৎসব ও সুভদ্রা হরণ
রৈবতক উৎসব ও সুভদ্রা হরণ
সে এক এলাহি কাণ্ড! রৈবতক পাহাড়জুড়ে তখন উৎসবের মহড়া। বৃষ্ণি, ভোজ আর অন্ধক বংশের মানুষেরা মেতে উঠেছেন আনন্দ-উৎসবে। যদু বংশের তরুণরা—অক্রুর, সারণ, গদ, বভ্রু, নিষঠ, উদ্ধব—সবাই সেজেগুজে স্ত্রী-পরিজন নিয়ে শামিল হয়েছেন সেই মহোৎসবে। চারদিকে গান, নাচ আর হাসির হিল্লোল। দান-ধ্যানেরও কমতি নেই; ব্রাহ্মণদের ঝুলি উপচে পড়ছে বহুমূল্য রত্ন আর অলঙ্কারে।
সেই ভিড়ের মধ্যেই ছিলেন কৃষ্ণ আর তাঁর সখা অর্জুন। ঠিক তখনই অর্জুনের নজরে পড়লেন কৃষ্ণের সহোদরা সুভদ্রা। সুভদ্রার সেই রূপ দেখে অর্জুন যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলেন। তাঁর চোখের পলক পড়ছে না। অর্জুনের মনের অন্দরে কী ঝড় বইছে, তা অন্তর্যামী কৃষ্ণের বুঝতে বাকি রইল না।
কৃষ্ণ স্মিত হেসে বললেন, "সখা, ক্ষত্রিয়ের ধর্মে স্বয়ংবর সভার রীতি আছে বটে, কিন্তু সেখানে মেয়েটি তোমাকে বেছে নেবেই—এমন নিশ্চয়তা কোথায়? প্রত্যেকের তো নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ থাকে। তার চেয়ে ক্ষত্রিয়ের বীরধর্ম পালন করো। বলপূর্বক হরণ করে বিবাহ করাটাও তো আমাদের শাস্ত্রসম্মত। আমার মনে হয়, তোমার জন্য সেটাই শ্রেয় হবে।"
অর্জুন আর কৃষ্ণ পরামর্শ করে যুধিষ্ঠিরের কাছে দূত পাঠালেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরও সানন্দে এই প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন।
রণহুঙ্কার ও বলরামের ক্রোধ
একদিন পূজা শেষ করে সুভদ্রা রৈবতক পর্বত প্রদক্ষিণ করছিলেন। ব্রাহ্মণদের শান্তিবচন পাঠ শেষ হয়েছে মাত্র, সুভদ্রা রথে চেপে দ্বারকায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে অর্জুন ঝড়ের বেগে এসে সুভদ্রাকে হরণ করলেন। নিমেষের মধ্যে নিজের রথে তুলে নিয়ে তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন।
প্রহরীরা হতভম্ব! তারা ছুটল দ্বারকার রাজসভায়। খবর পেয়ে ভোজ, অন্ধক আর বৃষ্ণি বংশের বীরেরা অপমানে গর্জে উঠলেন। যদুবংশীয়রা যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হতে শুরু করলেন। বলরাম তো রাগে অগ্নিশর্মা! তিনি কৃষ্ণকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "কানাই, তোমার ওই বন্ধুকে আমরা কত সম্মান দিয়েছি, আর সে এই প্রতিদান দিল? আমি একাই কুরুবংশ ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। তুমি শুধু একবার অনুমতি দাও।"
কৃষ্ণ শান্তভাবে সবার দিকে তাকালেন। তারপর ধীর গলায় বললেন, "আপনারা ভুল বুঝছেন। অর্জুন আমাদের বংশের অপমান করেননি, বরং সম্মান দিয়েছেন। তিনি জানতেন স্বয়ংবর সভায় সুভদ্রার মন পাওয়া অনিশ্চিত হতে পারে। তাই বীরের মতো নিজের অধিকার আদায় করে নিয়েছেন। এই বিয়ে আমাদের বংশের মর্যাদা বাড়াবেই। আর মনে রাখবেন, মহাদেব ছাড়া অর্জুনকে জয় করার সাধ্য কারও নেই। খামোখা যুদ্ধ করে কী লাভ? তার চেয়ে অর্জুনকে বন্ধু এবং আত্মীয় হিসেবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। যদি তিনি একাই আমাদের পরাজিত করে সুভদ্রাকে নিয়ে যান, তবে সেটা কি খুব গৌরবের হবে?"
কৃষ্ণের যুক্তিতে সবার ক্রোধ জল হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত ধুমধাম করে দ্বারকাতেই অর্জুন ও সুভদ্রার বিবাহ সম্পন্ন হলো।
ইন্দ্রপ্রস্থে প্রত্যাবর্তন ও নতুন জীবন
দ্বারকায় এক বছর কাটিয়ে অর্জুন ও সুভদ্রা পুষ্কর তীর্থে কিছুদিন সময় কাটালেন। বারো বছরের বনবাস ও ব্রহ্মচর্য শেষ করে যখন তাঁরা ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরলেন, তখন চারদিকে জয়ধ্বনি। অর্জুন ও সুভদ্রা গিয়ে যুধিষ্ঠিরের চরণ স্পর্শ করলেন।
দ্রৌপদী অবশ্য প্রথমে কিছুটা অভিমানে মুখ ভার করেছিলেন। কিন্তু অর্জুন আর সুভদ্রার ভালোবাসা আর নম্রতায় সেই অভিমান ধুয়ে গেল। সুভদ্রা লাল রেশমি শাড়ি পরে কুন্তীর পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন। কুন্তী দুহাত ভরে আশীর্বাদ করলেন নতুন পুত্রবধূকে। তারপর সুভদ্রা দ্রৌপদীর কাছে গিয়ে বিনম্রস্বরে বললেন, "আমি আপনার দাসী মাত্র।" দ্রৌপদী আর স্থির থাকতে পারলেন না, সুভদ্রাকে বুকে টেনে নিলেন।
অর্জুনের ফেরায় হস্তিনাপুর আর ইন্দ্রপ্রস্থে যেন অকাল দীপাবলি শুরু হলো। খবর পেয়ে কৃষ্ণ, বলরাম আর যদু বংশের বিশিষ্টজনেরা উপহারের পসরা নিয়ে হাজির হলেন। রত্ন, অলঙ্কার, গরু, ঘোড়া আর আসবাবে ভরে উঠল পাণ্ডবদের ভাণ্ডার। কয়েকদিন আনন্দ-উৎসবের পর কৃষ্ণ ছাড়া বাকিরা দ্বারকায় ফিরে গেলেন।
সময়ের নিয়মে সুভদ্রার কোল আলো করে এল এক তেজস্বী পুত্র—অভিমন্যু। অর্জুন পরম যত্নে তাকে অস্ত্রশিক্ষা আর বেদ পাঠ করাতে লাগলেন। ওদিকে দ্রৌপদীর কোল জুড়েও একে একে এল পাঁচটি সন্তান। পাণ্ডব প্রাসাদে তখন কেবলই আনন্দের গুঞ্জন।

Comments
Post a Comment