Posts

Showing posts with the label Bana parba mahabharata

৪০তম বনপর্ব-মহাশূন্যের হিরণ্যপুরী এবং অর্জুনের অলৌকিক অস্ত্র প্রদর্শণ

Image
৪০তম বনপর্ব-মহাশূন্যের হিরণ্যপুরী এবং অর্জুনের অলৌকিক অস্ত্র  প্রদর্শণ ফিরে আসার পথটা ছিল অদ্ভুত রকমের নির্জন। মেঘেদের ওপর দিয়ে যখন রথ ছুটে যাচ্ছিল, হঠাতই চোখে পড়ল সেই মায়াপুরী। সে এক আশ্চর্য দৃশ্য! যেন মহাকাশের বুকে ভাসমান এক টুকরো তপ্ত কাঞ্চন, যার নিজস্ব এক অলৌকিক জ্যোতি রয়েছে। অগ্নি আর সূর্যের মিলিত আভায় ঝলমল করছে চারদিক। সবচেয়ে বড় কথা, সেই নগরী স্থির নয়; সে যেন এক জীবন্ত যান, যেখানে ইচ্ছা তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। আমি কৌতূহলী হয়ে সারথি মাতলিকে জিজ্ঞেস করলাম, "মাতলি, কার এই বিচিত্র পুরী? কার এত ক্ষমতা যে আকাশের বুকে এমন বৈভব বিস্তার করে বাস করে?" মাতলি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। সেই হাসির গভীরে ছিল এক প্রাচীন বিষাদ ও বিস্ময়। তিনি বললেন, "অর্জুন, এ বড় দুর্ভেদ্য ইতিহাস। সৃষ্টির আদিকালে পুলোমা আর কালিকা নামে দুই দানবী ছিল। তারা কঠোর, অতি কঠোর তপস্যায় মগ্ন হয়েছিল দীর্ঘ সহস্র বছর। তাদের সেই তিতিক্ষায় স্বয়ং পিতামহ ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হয়ে যখন বর দিতে চাইলেন, দানবীরা কোনো ঐশ্বর্য চায়নি, চেয়েছিল মাতৃত্বের চরম নিরাপত্তা। তারা বলেছিল, তাদের সন্তানদের যেন কোনো ব্যাধি বা শোক স্প...

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

Image
  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata)  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)  সংক্ষিপ্ত   মহাভারতের বিষয়সূচি-প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata)  ৩১তম বনপর্ব-গন্ধমাদনের ঝঞ্ঝা ও এক মায়াবী ডানার আশ্রয় ৩২তম বন পর্ব, গন্ধমাদনে দুই ভায়ের মিলন: ভীম যেদিন হনুমানের লেজ নাড়াতে পারেননি ৩৩তম বন পর্ব- গন্ধমাদনের পদ্ম আর ভীমসেনের দর্প ৩৪তম বন পর্ব -জটাসুর-বধ: ভীমসেনের বজ্রনির্ঘোষ ৩৫ তম বন পর্ব-গন্ধমাদনের ছায়ায় পাঁচ বছর: অর্জুনের প্রতীক্ষায় পাণ্ডব ৩৬তম বনপর্ব- গন্ধমাদনে ভীমের রণহুংকার ৩৭তম বন পর্ব-আলোকের তীরে অর্জুন: এক মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন ৩৮তম বন পর্ব-অর্জুনের স্বর্গ-প্রত্যাবর্তন: পাশুপত অস্ত্রলাভের রোমাঞ্চকর উপাখ্যান ৩৯তম বনপর্ব-অমরাবতীর রাজপথ ও অর্জুনের নিবাতকবচ যুদ্ধ ৪০তম বন পর্ব-মহাশূন্যের হিরণ্যপুরী এবং অর্জুনের অলৌকিক অস্ত্র  ৪১তম বনপর্ব- কৃষ্ণ- মার্কণ্ডেয় সংবাদ ও কর্মফলের গূঢ় রহস্য

৩৭তম বন পর্ব-আলোকের তীরে অর্জুন: এক মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন

Image
৩৭তম বন পর্ব-আলোকের তীরে অর্জুন: এক মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। গন্ধমাদন পর্বতের চূড়ায় মায়াবী আলোর আলপনা। ঠিক তখনই মহর্ষি ধৌম্য তাঁর প্রাতঃস্নান আর জপ-আহ্নিক শেষ করে পাণ্ডবদের কুটিরের দিকে এগিয়ে গেলেন। সঙ্গে একদল তপস্বী, যাঁদের চোখে তপস্যার শান্ত দীপ্তি। যুধিষ্ঠির, ভীম আর দ্রৌপদী পরম শ্রদ্ধায় এগিয়ে এসে প্রণাম করলেন তাঁদের। ধৌম্য মৃদু হেসে যুধিষ্ঠিরের হাতটি নিজের হাতের মধ্যে নিলেন। এক অদ্ভুত স্নেহ আর গাম্ভীর্য ঝরে পড়ল তাঁর কণ্ঠে। তিনি পুব আকাশে আঙুল উঁচিয়ে বললেন, "দেখো যুধিষ্ঠির, ওই যে সুদূর প্রসারিত পর্বতমালা সমুদ্রের কোল ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ওর নাম মন্দরাচল। সবুজ বরণ অরণ্য আর রূপালি শৃঙ্গ নিয়ে কেমন রূপসী দেখাচ্ছে ওকে, তাই না? এই পূর্ব দিকটাই হলো দেবরাজ ইন্দ্র আর ধনকুবেরের আবাস। এখানেই ঋষি, গন্ধর্ব আর দেবতারা উদীয়মান সূর্যকে বন্দনা জানান।" ধৌম্য একে একে দিকচক্রবালের রহস্য উন্মোচন করতে লাগলেন, যেন এক প্রাচীন ভূগোলের গল্প বলছেন। তিনি দক্ষিণ দিকে ইশারা করে বললেন, "ওই দিকে থাকেন ধর্মের দেবতা, যমরাজ। তাঁর নগরী সংযমনী বড় বিচিত্র, বড় সমৃদ্ধ। আর প...

৩৬তম বনপর্ব- গন্ধমাদনে ভীমের রণহুংকার

Image
৩৬তম বনপর্ব- গন্ধমাদনে ভীমের রণহুংকার — মণিমানের পতনে অগস্ত্যের অভিশাপ সমাপ্ত গন্ধমাদন পর্বতের নির্জন এক প্রান্তে, যেখানে মেঘেরা নেমে আসে পাহাড়ের কাঁধে মাথা রাখতে, সেখানে একদিন শান্ত হয়ে বসেছিলেন মহাবাহু ভীম। বাতাসে তখন বন্য পুষ্পের গন্ধ, দূরে কোথাও ঝর্নার জলধ্বনি। এমন সময় দ্রৌপদী তাঁর কাছে এসে বললেন, "মহাবাহু, যদি এই পর্বতের রাক্ষসেরা তোমার ভয়ে পলায়ন করে, তবে আমাদের বন্ধুরা নিশ্চিন্তে এর পুষ্পশোভিত শিখরগুলি উপভোগ করতে পারবে। বহুদিন ধরে আমি এই ইচ্ছা পোষণ করে আসছি।" দ্রৌপদীর এই কথা শুনে ভীমের রক্তে যেন আগুন জ্বলে উঠল। তিনি ধনুক, তরবারি, তূণীর ও গদা— এই চতুরাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পর্বত আরোহণ শুরু করলেন। দ্রৌপদী আনন্দে উদ্ভাসিত হলেন। ভীমের হৃদয়ে ভয় নেই, দ্বিধা নেই, ক্লান্তির লেশমাত্র নেই। শিখরে পৌঁছে তিনি দেখলেন কুবেরের প্রাসাদ— স্বর্ণ ও স্ফটিকে উজ্জ্বল, স্বর্ণপ্রাচীরে বেষ্টিত, চারিদিকে দীপ্তিমান উদ্যান। ভীম তাঁর শঙ্খে ফুঁ দিলেন। সেই শব্দ পর্বতের গায়ে গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে গেল, তারপর তিনি ধনুকের ছিলা টংকার দিলেন। সেই ভয়ংকর আওয়াজে যক্ষ, রাক্ষস ও গন্ধর্বরা কম্পিত হয়ে অস্...

৩৫ তম বন পর্ব-গন্ধমাদনের ছায়ায় পাঁচ বছর: অর্জুনের প্রতীক্ষায় পাণ্ডব

Image
৩৫ তম বন পর্ব-গন্ধমাদনের ছায়ায় পাঁচ বছর: অর্জুনের প্রতীক্ষায় পাণ্ডব জটাসুর বধের পর রক্তাক্ত অধ্যায়টা শেষ হলো। যুধিষ্ঠির তাঁর ভাইদের আর দ্রৌপদীকে নিয়ে আবার ফিরে এলেন নর-নারায়ণের সেই শান্ত তপোবনে। কিন্তু মনের ভেতর যে একটা কাঁটা খচখচ করছে প্রতিনিয়ত। অর্জুনের অনুপস্থিতি যেন এই হিমালয়ের চেয়েও ভারী। যুধিষ্ঠির একদিন সবার দিকে তাকিয়ে চেনা শান্ত গলায় বললেন, "অর্জুন বিদায় নেওয়ার সময় বলেছিল, স্বর্গে পাঁচটা বছর ও অস্ত্রশিক্ষা করবে। তারপর ফিরে আসবে আমাদের কাছে। সময় তো বয়ে যাচ্ছে, এবার আমাদের প্রস্তুত হতে হবে। ওকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের এগোতে হবে।" কথাটা মনে ধরল সবার। পাণ্ডবেরা আবার পথ চলতে শুরু করলেন। সঙ্গে সেই নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণেরা আর অনুচরেরা। পথ কখনো মসৃণ, কখনো দুর্গম। যখন শরীর আর চলে না, তখন রাক্ষসেরা তাদের কাঁধে তুলে নেয়, অবলীলায় পার করে দেয় পাহাড়ি চড়াই-উতরাই। চোখের সামনে দিয়ে কেটে গেল কৈলাস, মৈনাক আর গন্ধমাদনের নিচুদিকের উপত্যকাগুলো। কত নাম না-জানা পবিত্র নদীর জল ছুঁয়ে সপ্তম দিনে তাঁরা পৌঁছালেন এক আশ্চর্য জায়গায়—রাজর্ষি বৃষপর্বার আশ্রম। চারদিকে তখন ফুলের গন্ধ, গাছে গাছে বসন্তের মে...

৩৪তম বন পর্ব -জটাসুর-বধ: ভীমসেনের বজ্রনির্ঘোষ

Image
৩৪তম বন পর্ব -জটাসুর-বধ: ভীমসেনের বজ্রনির্ঘোষ সেদিন ললাটের লিখন মেনেই যেন এক অদ্ভুত ব্রাহ্মণের আগমন ঘটল পাণ্ডবদের পর্ণকুটিরে। সৌম্য তনু, কপালে তিলক, মুখে শাস্ত্রের খই। সে সগর্বে ঘোষণা করল, "মন্ত্রবিদ্যায় আমার সমকক্ষ কেউ নেই, শাস্ত্রের গূঢ়ার্থ আমার নখদর্পণে।" পাণ্ডবগণ সরল বিশ্বাসে সেই সুপণ্ডিতকে সমাদর করলেন। কিন্তু কে জানত, সেই ছদ্মবেশের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ক্রূর রাক্ষস—যার নাম জটাসুর! তার লোলুপ দৃষ্টি ছিল পাণ্ডবদের দিব্যাস্ত্র এবং পাঞ্চালীর অলৌকিক লাবণ্যের ওপর। সে শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষায় ওত পেতে রইল। একদিন সুযোগ এসেও গেল। মহাবাহু ভীমসেন গভীর বনে মৃগয়ায় গিয়েছেন, আর সর্বজ্ঞ ঋষি লোমশ গিয়েছেন জাহ্নবীর জলে মধ্যাহ্ন-আহ্নিকে। কুটির তখন পুরুষসিংহ-শূন্য। হঠাৎ ছদ্মবেশ ছুড়ে ফেলে নিজের প্রকাণ্ড, কুৎসিত মূর্তিতে আবির্ভূত হলো জটাসুর। মুহূর্তের মধ্যে সে তিন পাণ্ডব, দ্রৌপদী এবং তাঁদের সমস্ত পবিত্র শাস্ত্রগ্রন্থ একসাথ আঁকড়ে ধরে দে ছুট! সহদেব কোনোমতে তার কবল থেকে পিছলে বেরিয়ে এলেন। দেওয়ালে ঝুলছিল তাঁর প্রিয় খড়্গ 'কৌশিকী'। সেই তরবারি মুঠোয় চেপে ধরে, ঝড়ের বেগে ভীমের সন্ধানে ছুটলেন...

৩৩তম বন পর্ব- গন্ধমাদনের পদ্ম আর ভীমসেনের দর্প

Image
  ৩৩তম বন পর্ব- গন্ধমাদনের পদ্ম আর ভীমসেনের দর্প হনুমান বিদায় নেওয়ার পর, তাঁর দেখানো পথ ধরে মহাবলী ভীমসেন গন্ধমাদন পর্বতের চড়াই ভাঙতে শুরু করলেন। পথ চলতে চলতে তাঁর মনে বারেবারে ভেসে উঠছিল পবনপুত্রের সেই পর্বতপ্রমাণ রূপ, অলৌকিক শৃঙ্গমালা আর শ্রীরামচন্দ্রের মহিমার কথা। সুগন্ধী বনের খোঁজে এগিয়ে যেতে যেতে ভীমের চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল রূপসী প্রকৃতির শোভায়—কোথাও ফুটে রয়েছে নাম না জানা ফুলের মেলা, কোথাও টলটলে জলের হ্রদ আর কলতানরত পাহাড়ি নদী। হাঁটতে হাঁটতে একসময় ভীম এসে পৌঁছলেন কৈলাস পর্বতের পাদদেশে, ধনাধিপতি কুবেরের প্রাসাদের ঠিক কাছেই এক দিব্য সরোবরের তীরে। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি দূর করতে তিনি মন ভরে পান করলেন সেই স্ফটিকস্বচ্ছ জল। এই সরোবরটি ছিল কুবেরের পরম প্রিয় জলবিহারের স্থান; দেব-গন্ধর্ব, অপ্সরা আর ঋষিমুনিদের আনাগোনায় যা সর্বদা মুখরিত থাকত। বনের এমন শান্ত রূপ দেখে ভীম যখন মনে মনে প্রীত হচ্ছেন, তখনই তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল কুবেরের অনুচর হাজার হাজার ক্রোধোন্মত্ত রাক্ষস। তারা পথ আগলে গর্জে উঠে জানতে চাইল ভীমের পরিচয় আর এই দুর্গম স্থানে আসার কারণ। ভীম দৃপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন, "আমি পাণ্ডুপুত্র ...

কিষ্কিন্ধ্যার রাজপ্রাসাদে রক্তের টান ও প্রতিশোধের রাজনীতি: বালী-সুগ্রীবের আদিম দ্বন্দ্ব

Image
কিষ্কিন্ধ্যার রাজপ্রাসাদে রক্তের টান ও প্রতিশোধের রাজনীতি: বালী-সুগ্রীবের আদিম দ্বন্দ্ব মহাকাব্যের পাতায় কত রকমের ট্র্যাজেডি থাকে, কিন্তু দুই ভাইয়ের এমন নির্মম দূরত্বের গল্প বোধহয় আর দ্বিতীয়টি নেই। কিষ্কিন্ধ্যার বনাঞ্চলে যে কেবল বানর সেনা বাস করত তা তো নয়, সেখানে বাস করত মানুষের মতোই লোভ, হিংসা, ভুল বোঝাবুঝি আর ক্ষমতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।  রক্তের টান ও এক ভয়ানক ভুল বালী ছিলেন কিষ্কিন্ধ্যার জ্যেষ্ঠ রাজপুত্র—পরাক্রমশালী, অপরাজেয় এবং জন্মগত শাসক। আর ছোট ভাই সুগ্রীব ছিলেন তাঁর অনুগত ছায়া। দুজনের মধ্যে স্নেহ ছিল গভীর। কিন্তু নিয়তি অন্য এক খেলা খেলল। একবার মায়াবী নামের এক রাক্ষস বালীকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করে এক অন্ধকার গুহার ভেতর ঢুকে পড়ে। বালীও তার পিছু পিছু গুহায় প্রবেশ করেন এবং সুগ্রীবকে বাইরে পাহারা দিতে বলেন। দিন যায়, মাস যায়, বালী ফিরে আসেন না। এক বছর পার হওয়ার পর, গুহার মুখ থেকে রক্তের স্রোত ভেসে আসতে দেখে সুগ্রীব ধরে নিলেন তাঁর প্রিয় দাদা আর বেঁচে নেই। রাক্ষসটি যেন বাইরে এসে কিষ্কিন্ধ্যা ধ্বংস না করতে পারে, তাই ভারী পাথর দিয়ে গুহার মুখ বন্ধ করে চোখের জল মুছতে মুছতে সুগ্রীব রাজ্যে...

৩২তম বন পর্ব, গন্ধমাদনে দুই ভায়ের মিলন: ভীম যেদিন হনুমানের লেজ নাড়াতে পারেননি

Image
৩২তম বন পর্ব, গন্ধমাদনে দুই ভায়ের মিলন: ভীম যেদিন হনুমানের লেজ নাড়াতে পারেননি নর-নারায়ণের সেই আশ্রমে অর্জুনের প্রতীক্ষায় ছয়টি রাত কেটে গেল পাণ্ডবদের। বনবাসের দিনগুলো এমনই—অপেক্ষা যেন এক নিরন্তর তপস্যা, প্রতিটি প্রহর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। সেদিন হঠাৎই ঈশানকোণ থেকে বাতাসে ভেসে এলো একটি সহস্রদল পদ্ম। দিব্য তার আভা, সূর্যের মতো উজ্জ্বল, আর তার গন্ধ এমন যে মনে হয় স্বর্গের কোনো উদ্যান থেকেই যেন খসে পড়েছে। ফুলটি এসে পড়ল মাটিতে, আর ঠিক তখনই দ্রৌপদীর চোখ আটকে গেল তার ওপর। কৌতূহলী পায়ে এগিয়ে গিয়ে তিনি ফুলটি তুলে নিলেন, তারপর প্রসন্ন মুখে ভীমের দিকে তাকিয়ে বললেন—"আর্যপুত্র, এই কমলটি আমি ধর্মরাজকে উপহার দেব। আপনার যদি আমার প্রতি একটুও স্নেহ থাকে, তাহলে এমন আরও কিছু ফুল এনে দিন। আমি কাম্যকবনের আশ্রমে এগুলো নিয়ে যেতে চাই।" এই বলে দ্রৌপদী ফুলটি নিয়ে চলে গেলেন যুধিষ্ঠিরের কাছে। আর ভীম—মহাবলী ভীমসেন, যাঁর হৃদয়ে দ্রৌপদীর সামান্যতম ইচ্ছাও পাহাড়ের মতো ভারী হয়ে বাজে—তিনি সেই মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিলেন, যেদিক থেকে ফুলটি এসেছিল, সেদিকেই যাত্রা করবেন। সোনার কারুকাজ করা ধনুক-বাণ কাঁধে ...

৩১তম বনপর্ব-গন্ধমাদনের ঝঞ্ঝা ও এক মায়াবী ডানার আশ্রয়

Image
৩১তম বনপর্ব-গন্ধমাদনের ঝঞ্ঝা ও এক মায়াবী ডানার আশ্রয় আকাশটা হঠাৎ কেমন যেন বিগড়ে গেল। পাণ্ডবেরা তখন গন্ধমাদন পর্বতের চড়াই ভাঙছেন। প্রথমে এল এক দমকা হাওয়া, তারপরই চারপাশ ওলটপালট করে ধেয়ে এল তীব্র ঘূর্ণি। শুকনো পাতা আর ধুলোর চাদরে আকাশ এমনভাবে ঢাকা পড়ল যে দিনদুপুরেই নেমে এল নিকষ অন্ধকার।  যুধিষ্ঠির কিংবা ভীম তখন একে অপরের মুখ দেখতে পাচ্ছেন না, বাতাসে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের কণ্ঠস্বর। কিছুক্ষণ পর অবশ্য ধুলোর দাপট কমল, কিন্তু প্রকৃতি শান্ত হলো না। শুরু হলো তুমুল বর্ষণ। মেঘের ডাক আর বিদ্যুতের তরবারি যেন আকাশটাকে চিরে ফেলতে চাইল। দ্রৌপদী সেই মহাপ্রলয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছিলেন। শেষমেশ ঝড় থামল, মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিল ক্লান্ত সূর্য। কিন্তু বিপত্তি ঘটল এর পরেই। প্রায় এক মাইল পথ হাঁটার পর রাজকুমারী দ্রৌপদী আর এক পা-ও নড়তে পারলেন না। যাঁর পায়ের নিচে নরম গালিচা থাকার কথা, তিনি আজ রুক্ষ পাহাড়ি পথ ভেঙে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। একটা পাথরের ওপর বসে পড়লেন তিনি। যুধিষ্ঠির চিন্তিত মুখে ভীমের দিকে তাকিয়ে বললেন, "ভীম, সামনে তো শুধু খাড়া পাহাড় আর বরফের চাদর। আমাদের সুকুমারী দ্রৌপদী এই পথ পার হবে কী ক...

৩০তম বন পর্ব-গন্ধমাদনের মহাপ্রস্থান: বরফের চাদরে অর্জুনের খোঁজ

Image
৩০তম বন পর্ব-গন্ধমাদনের মহাপ্রস্থান: বরফের চাদরে অর্জুনের খোঁজ লোমশ মুনির কণ্ঠস্বর শান্ত, অথচ তার ভেতরে একটা তীক্ষ্ণ প্রজ্ঞা খেলা করে যায়। তিনি হাত বাড়িয়ে দেখালেন, "রাজন, ঐ যে জলধারা দেখছ, ওটাই মধুবিলা— লোকে তাকে সমঙ্গাও বলে। এই কর্দামিল ক্ষেত্রে একদিন রাজা ভরত অভিষিক্ত হয়েছিলেন। বৃত্রাসুরকে বধ করার পর দেবরাজ ইন্দ্র যখন ব্রহ্মহত্যার পাপে সিংহাসনচ্যুত আর শ্রীহীন হয়ে পড়েছিলেন, ( বৃত্রাসুর বধের কাহিনি জানতে এখানে ক্লিক করুন ) তখন এই সমঙ্গার জলেই স্নান করে তিনি পবিত্র হন। আর ঐ যে দূরে কুয়াশায় ঘেরা পর্বতমালা, ওটাই কনখল— ঋষিদের বড় প্রিয় স্থান। মৈনাক পর্বতের ঠিক মাঝখানটিতে রয়েছে বিনশন তীর্থ। তাকিয়ে দ্যাখ যুধিষ্ঠির, কাছেই বয়ে চলেছে সুরধুনী গঙ্গা। বহু প্রাচীন কালে এই পুণ্যভূমিতেই ভগবান সনৎ কুমার সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। এখানে একটিবার ডুব দিলে মানুষের সব কলুষ ধুয়ে যায়।" মুনি থামলেন না। প্রকৃতির এই আদিম রূপের খতিয়ান দিতে দিতে তিনি আবার বললেন, "এর পরেই পাবে পুণ্য সরোবর আর ভৃগুাতুঙ্গ পর্বত। সেখানে স্নান সেরে নেবে। তবে মনে রেখ রাজন, সামনেই স্থলশিবা মুনির আশ্রম। সেখানে পা রাখার আগে মন থেকে...

২৭তম বন পর্ব-পিতার তৃষ্ণা ও ইন্দ্রের অঙ্গুলি: যুবনাশ্বপুত্র মান্ধাতার উপাখ্যান

Image
  ২৭তম বন পর্ব-পিতার তৃষ্ণা ও ইন্দ্রের অঙ্গুলি: যুবনাশ্বপুত্র মান্ধাতার উপাখ্যান যুধিষ্ঠিরের চোখের তারা তখন শিশুর মতো কৌতূহলে চকচক করছে। মহর্ষি লোমশের দিকে একটু ঝুঁকে বসে তিনি বললেন, "মহর্ষি, ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা যুবনাশ্বের সেই মহাতেজস্বী পুত্র মান্ধাতার কীর্তি তো ত্রিলোকখ্যাত। তাঁর সেই অলৌকিক জন্মের কাহিনীটি আমায় একটু বিস্তারিত বলবেন? শোনার জন্য বড্ড ব্যাকুল হয়ে আছি।" লোমশ মুচকি হাসলেন। পাথরের আসনটায় আর একটু আরাম করে বসে নিলেন তিনি। এ গল্প বলতে তাঁর নিজেরও ভারী ভালো লাগে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্মৃতির সিন্দুকটা যেন খুলে ধরলেন মহর্ষি। "শোনো তবে যুধিষ্ঠির," লোমশ বলতে শুরু করলেন, "ইক্ষ্বাকু বংশের বহু রাজর্ষির গল্প তোমরা শুনেছ, কিন্তু মান্ধাতার মতো দীপ্তিময় পুরুষ আর দুটি মেলা ভার। সে এক অদ্ভুত সময়। রাজা যুবনাশ্ব ছিলেন পরম ধার্মিক ও ন্যায়পরায়ণ শাসক। প্রজারা তাঁকে দেবতার মতো মানত। কিন্তু এত সুখের মধ্যেও রাজার বুকে একটা তীব্র কাঁটা বিঁধে ছিল—তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। শূন্য প্রাসাদের অলিন্দে অলিন্দে শুধু এক হাহাকার ঘুরে বেড়াত। কোনো উত্তরাধিকারী নেই, এই ভাবনায় রাজার রাত...