ষষ্ঠভাগ-বিরাটপর্ব গোধূলির আলোয় রক্তের দাগ: সুশর্মার দম্ভ চূর্ণ


ষষ্ঠভাগ-বিরাটপর্ব গোধূলির আলোয় রক্তের দাগ: সুশর্মার দম্ভ চূর্ণ

কৃষ্ণপক্ষের সপ্তমীর আকাশটা সেদিন যেন একটু বেশিই থমথমে হয়ে উঠেছিল। বাতাসের গায়ে কেমন এক অনিশ্চয়তার গন্ধ। ত্রিগর্তের রাজা সুশর্মা বহুদিনের জমানো পুরনো রাগের খাঁজগুলো ঘষে মেজে শাণ দিচ্ছিলেন বহু সময় ধরে। আজ সেই হিসেব চুকোনোর দিন। অগ্নিকোণ থেকে তিনি আছড়ে পড়লেন বিরাট রাজার গোধনের ওপর। প্রথম দিনেই লুঠ হয়ে গেল হাজার হাজার গোরু, আর ঠিক তার পরের দিন, যেন কোনো গোপন সংকেতে, কৌরবদের পুরো বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল অন্য দিক থেকে।

কিন্তু সুশর্মা জানতেন না, সময় আর নিয়তি কীভাবে একই রেখায় এসে দাঁড়ায়। পাণ্ডবদের বারো বছরের বনবাস আর এক বছরের ছদ্মবেশের মেয়াদ ঠিক ওই দিনটিতেই নিঃশব্দে শেষ হয়েছিল।

গোরুর ধুলো উড়িয়ে ত্রিগর্তের সেনাদল যখন বহুদূরে চলে যাচ্ছে, রাজপ্রাসাদে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এল প্রধান রাখাল। হাঁটু মুড়ে বসে আর্জি জানাল, "মহারাজ! ত্রিগর্তরাজ এক লাখ গোরু ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। এখনই না থামাল সব শেষ হয়ে যাবে!"

মৎস্যরাজ বিরাট মুহূর্তও দ্বিধা করলেন না। মুহূর্তে চারদিকে রণশিঙা বেজে উঠল। রথ, হাতি, ঘোড়া, পদাতিক—সমস্ত বাহিনীকে সাজিয়ে তিনি প্রস্তুত হলেন যুদ্ধের জন্য। ঠিক তখন বিরাটের চোখ পড়ল ছদ্মবেশী পাণ্ডবদের দিকে। ছোট ভাই শতানীককে ডেকে বললেন, "আমার কেন যেন মনে হয় কঙ্ক, বল্লব, তন্ত্রিপাল আর গ্রন্থিক—ওদের শরীরেও যোদ্ধার রক্ত আছে। ওদেরও বর্ম দাও, রথ দাও। আমাদের সঙ্গে চলুক।"

কেউ জানল না, কারুকাজ করা সোনার রথে চড়ে যাঁরা বেরোলেন, তাঁরা আসলে কারা। আট হাজার রথী, এক হাজার গজআরোহী আর ষাট হাজার সওয়ারি নিয়ে বিরাট রাজার বাহিনী গরুর খুরের দাগ অনুসরণ করে এগিয়ে চলল। সূর্য যখন পাটে নামছে, ঠিক তখনই ধুলোর মেঘ ভেদ করে সামনে ফুটে উঠল ত্রিগর্ত সেনার ব্যূহ।

তারপর শুরু হলো এক আদিম, রক্তাক্ত লড়াই।

রণক্ষেত্র দেখতে দেখতে এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হলো। কাটা মাথা আর নিথর দেহের পাহাড়ে পথ চলা দায়। শতানীক একাই একশো ত্রিগর্ত বীরকে কুপোকাত করলেন, বিশালাক্ষ বধ করলেন চারশো। আর বিরাট রাজা নিজে যেন মৃত্যুর রূপ ধরে পাঁচশো রথী আর আটশো অশ্বারোহীকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন সুশর্মার সামনে। দশটি বাণে বিদ্ধ করলেন সুশর্মাকে, পাঁচ বাণে ছড়িয়ে দিলেন তাঁর চার ঘোড়ার রক্ত।

কিন্তু সুশর্মাও কম যান না। কৌশলে বিরাটের সারথি আর ঘোড়াকে মেরে ফেলে বৃদ্ধ বিরাটকে জীবন্ত বন্দী করে নিজের রথে তুলে নিলেন। ছুটিয়ে দিলেন রথ।

দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে যুধিষ্ঠিরের চোখ জ্বলে উঠল। ভীমকে ডেকে বললেন, "ভীম, মহারাজ বিরাট বন্দী! এখনই যাও, তাঁকে মুক্ত করো।"

ভীম চারপাশের প্রকাণ্ড একটা গাছের দিকে তাকিয়ে বললেন, "দাদা, ওখানকার একটা মোটা ডাল ভেঙে নিলেই তো সুন্দর গদা হয়ে যায়! ওটা দিয়েই সব কটাকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছি।"

যুধিষ্ঠির শান্ত কিন্তু শক্ত গলায় বাধা দিলেন, "না ভীম, অমন পাগলামি কোরো না। গাছ উপড়ে যুদ্ধ করা মানুষের কাজ নয়, ওতে আমাদের আসল পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যাবে। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করো, সাধারণ মানুষের মতো।"

দাদার আদেশে ভীম ধনুক হাতে নিলেন। তাঁর বাণবর্ষণ যেন মুষলধারে বৃষ্টি। যুধিষ্ঠির, নকুল, সহদেব—চার ভাই মিলে ত্রিগর্ত বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। চতুর্দিক থেকে সুশর্মার রথ ঘিরে ফেলা হলো। ভীম এবার ধনুক ফেলে গদা হাতে নামলেন মাঠে। একটার পর একটা হাতি, রথ আর ঘোড়া তাঁর গদার আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেতে লাগল।

সুশর্মা হাহাকার করে উঠলেন, "আমার ভাই! ওরে, যে ভাই কোনোদিন রণক্ষেত্র থেকে পিছু হটে নি, সেও শেষ হয়ে গেল!"

তবু তিনি বাণ ছুঁড়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ভীমসেনকে থামানো তখন অসুরের সাধ্যও ছিল না। সুশর্মার ঘোড়া, সারথি, বর্ম—সব ধুলোয় মিশিয়ে দিলেন ভীম। রথহীন সুশর্মা যখন প্রাণভয়ে ছুট লাগালেন, ভীমের গর্জন ভেসে এল, "কোথায় পালাচ্ছো রাজকুমার? গরু চুরি করার সময় তো খুব বীরত্ব দেখাচ্ছিলে! পিঠ দেখানো কি বীরের ধর্ম?"

দৌড়ে গিয়ে সুশর্মার চুলের মুঠি ধরে শূন্যে তুললেন ভীম। তারপর সজোরে আছড়ে ফেললেন শক্ত মাটিতে। হাঁটু দিয়ে বুক চেপে ধরে একের পর এক মুষ্টিঘাত বর্ষণ করতে লাগলেন, যতক্ষণ না সুশর্মার আর্তনাদ নিভে গিয়ে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন।

নেতাকে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখে ত্রিগর্তের অবশিষ্ট সৈন্যরা প্রাণ নিয়ে দিগ্বিদিকে দৌড় লাগাল। পাণ্ডবরা সব গোধন উদ্ধার করলেন, কেড় নেওয়া হলো সুশর্মার সমস্ত ধনসম্পদ।

অর্ধচেতন, ধুলোমাখা সুশর্মাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে যুধিষ্ঠিরের সামনে এনে ফেললেন ভীম। যুধিষ্ঠির একঝলক দেখে একটু হেসে বললেন, "ছেড়ে দাও ভীম, ছেড়ে দাও এই হতভাগ্যকে।"

ভীম তবু সুশর্মার কানের কাছে মুখ নিয়ে গর্জে উঠলেন, "শোন মূর্খ, যদি প্রাণ বাঁচাতে চাস, তবে  রাজসভায় গিয়ে স্পষ্ট বলবি—'আমি পাণ্ডবদের দাস'। তবেই তোর মুক্তি।"

ধর্মরাজ মৃদু হেসে ভীমের কাঁধে হাত রাখলেন, "থাক ভীম, আর নয়। ও তো মহারাজ বিরাটের দাস হয়েই গেছে।" তারপর সুশর্মার দিকে তাকিয়ে বললেন, "যাও সুশর্মা, তুমি মুক্ত। তবে ভবিষ্যতে আর কখনো এমন দুঃসাহস কোরো না।"

লজ্জায়, অপমানে মাথা নিচু করে সুশর্মা মৎস্যরাজ বিরাটের চরণে প্রণাম করে নিঃশব্দে হেঁটে চলে গেলেন নিজের দেশের দিকে।

বিরাট রাজা আনন্দে আত্মহারা হয়ে যুধিষ্ঠিরের হাত ধরে বললেন, "কঙ্ক! আজ থেকে আপনিই এই সিংহাসনের অধিকারী। এই মৎস্যদেশ আপনার। যা চাইবেন, তাই পাবেন।"

যুধিষ্ঠির বিনীতভাবে মাথা নিচু করলেন, "মহারাজ, আপনার এই সান্নিধ্য আর দয়াই আমাদের সবচেয়ে বড় উপহার। আপনি শুধু নগরে দূত পাঠান, সবাই জানুক আজ মৎস্যরাজের জয় হয়েছে।"

রাতের অন্ধকার চিরে বিরাটের দূতেরা ছুটল চারিদিকে। পরদিন ভোরে যখন প্রথম আলোর রশ্মি মৎস্যনগরের ওপর পড়ল, তখন চারদিকে কেবল একটাই শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—বিজয়! বিরাট রাজার জয়!

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে এবং বনপর্ব ৬৫তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিরাটপর্বের ষষ্ঠ  ভাগের  আলোচনা এবং বিরাট পর্বের পরবর্তী ভাগ চলবে।

বিরাটপর্বের পঞ্চমভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)