২১তম বন পর্ব- সমুদ্র শোষক অগস্ত্যমুনি: এক মহাবৈপ্লবিক আখ্যান
২১তম বন পর্ব- সমুদ্র শোষক অগস্ত্যমুনি: এক মহাবৈপ্লবিক আখ্যান।
যুধিষ্ঠির করজোড়ে বসলেন। চারধারে বনের স্তব্ধতা। রোমশ মুনির চোখের কোণে এক অদ্ভুত দ্যুতি। তিনি বলতে শুরু করলেন, "শোনো যুধিষ্ঠির, সত্যযুগের সেই ভয়ঙ্কর কালকেয় অসুরদের কথা। দেবতারা যখন বৃত্রাসুরের অত্যাচারে স্বর্গছাড়া, তখন ব্রহ্মা তাঁদের পথ দেখালেন। বললেন, দধীচি মুনির কাছে যাও। তাঁর অস্থি ছাড়া এই অসুরবধ অসম্ভব।"
দেবতারা মর্ত্যে এলেন। সরস্বতী নদীর তীরে বসে তপস্যারত দধীচি কোনো দ্বিধা না করে নিজের দেহ বিসর্জন দিলেন। এক মহান ত্যাগের কঙ্কাল থেকে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা গড়ে তুললেন এক অমোঘ অস্ত্র—ছয় দাঁতবিশিষ্ট বজ্র। ইন্দ্রের সেই বজ্রের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল বৃত্রাসুর।
বজ্রের আলো, মনের অন্ধকার
বৃত্রাসুরের বিশাল শরীরটা যখন দধীচি মুনির হাড় দিয়ে তৈরি বজ্রের আঘাতে ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল, তখন স্বর্গলোকে জয়ধ্বনি উঠেছিল। দেবতারা ফুল ছড়ালেন, গন্ধর্বরা গান গাইলেন। কিন্তু সেই মহোল্লাসের মাঝেও যিনি বিজয়ী, সেই দেবরাজ ইন্দ্রের বুকের ভেতরটা আচমকা ফাঁকা হয়ে গেল।
বিজয়ীর আনন্দ নয়, এক তীব্র, হিমশীতল অপরাধবোধ গ্রাস করল তাঁকে।
বৃত্রাসুর কেবল দেবতাদের শত্রু বা এক ভয়ংকর দানবই ছিল না, সে ছিল ত্বষ্টা ঋষির পুত্র—জন্মসূত্রে এক পরম পণ্ডিত ব্রাহ্মণ। যুদ্ধক্ষেত্রে তাকে বধ করা রাজনৈতিকভাবে যতই অনিবার্য হোক না কেন, সনাতন নিয়মের দাঁড়িপাল্লায় তা ছিল এক চরম অপরাধ।
ইন্দ্রের চোখের সামনে সেই দৃশ্য ভেসে উঠল। তিনি দেখলেন, বৃত্রাসুরের কাটা মুণ্ডু থেকে যেন এক অদৃশ্য, কুৎসিত অবয়ব বেরিয়ে আসছে। রক্তবর্ণ চোখ, আলুলায়িত চুল আর বিকট অট্টহাসি নিয়ে সেই অবয়ব তাড়া করল ইন্দ্রকে। সে আর কেউ নয়—স্বয়ং ব্রহ্মহত্যা পাপ।
অমরাবতীর পতন ও পলাতক দেবরাজ
পাপের স্পর্শ লাগা মাত্রই ইন্দ্রের শরীর থেকে সমস্ত দৈব জ্যোতি ম্লান হয়ে গেল। যে ইন্দ্রের অঙ্গের সুবাসে স্বর্গ আমোদিত থাকত, সেখান থেকে নির্গত হতে লাগল এক দুর্সহ দুর্গন্ধ। তাঁর হাতের বজ্র ভারী ঠেকতে লাগল। রূপ, ঐশ্বর্য আর তেজ হারিয়ে দেবরাজ মুহূর্তে শ্রীহীন, দীন এক ভিখারিতে পরিণত হলেন।
স্বর্গের সিংহাসন তাঁকে আর টানল না। ওই রাজমুকুট তাঁর কাছে তখন তপ্ত লোহার মতো ভারী। দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ইন্দ্র পালালেন। দেবতাদের রাজা, ত্রিভুবনের অধিপতি সামান্য এক অপরাধীর মতো লুকিয়ে বেড়াতে লাগলেন প্রকৃতির নিভৃত কোণে।
তিনি গিয়ে আশ্রয় নিলেন মানস সরোবরের এক পদ্মফুলের মৃণালের (ডাঁটা) ভেতর। সূক্ষ্ম রূপ ধারণ করে, জলের নিচে, অন্ধকারের অতলে লুকিয়ে রইলেন ইন্দ্র। বাইরে তখন মেঘ ডাকছে, কিন্তু দেবরাজের মনে তখন তার চেয়েও বড় ঝড়।
এদিকে রাজা ছাড়া স্বর্গ অচল। ইন্দ্রের অনুপস্থিতিতে স্বর্গের শ্রী হারিয়ে গেল। ঋতুচক্র ওলটপালট হয়ে গেল, গাছে ফুল ফুটল না, মর্ত্যে বৃষ্টি থামল। দেবতারা পড়লেন মহা বিপদে। সিংহাসন শূন্য রাখা যায় না, তাই তাঁরা মর্ত্যের পরম ধার্মিক ও শক্তিশালী রাজা নহুষকে সাময়িকভাবে স্বর্গের সিংহাসনে বসালেন। কিন্তু ক্ষমতার লোভ নহুষকে অহংকারী করে তুলল, তিনি ইন্দ্রের পত্নী শচীকেও গ্রাস করতে চাইলেন।
প্রায়শ্চিত্ত এবং প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘকাল পর, স্বর্গের দেবতারা এবং ঋষিরা বুঝতে পারলেন যে ইন্দ্রের এই অন্তর্ধাম স্বর্গ ও মর্ত্য উভয়ের জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনছে। শচীদেবী এবং দেবগুরু বৃহস্পতির প্রচেষ্টায় অবশেষে মানস সরোবরে ইন্দ্রের সন্ধান পাওয়া গেল।
কিন্তু সিংহাসনে ফেরার আগে পাপমুক্ত হওয়া জরুরি ছিল। দেবতারা ইন্দ্রকে অভয় দিলেন এবং তাঁর ব্রহ্মহত্যার পাপকে চার ভাগে ভাগ করে দিলেন:
পৃথিবীর উষর মরুভূমিতে,
নদীর ফেনিল জলস্রোতে,
বৃক্ষরাজির আঠায়,
নারীদের ঋতুচক্রে
পাপের বোঝা হালকা হতেই ইন্দ্রের শরীরে আবার ফিরে এল পুরোনো দৈব জ্যোতি। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল তাঁর অঙ্গের সুবাস। এদিকে অহংকারী নহুষ ঋষি অগস্ত্যের অভিশাপে সর্প হয়ে মর্ত্যে পতিত হলে, স্বর্গের সিংহাসন আবার শূন্য হয়।
মুক্ত, পবিত্র এবং নবালোকে উদ্ভাসিত ইন্দ্র আবার ফিরে এলেন অমরাবতীতে। বসলেন তাঁর নিজের সিংহাসনে। তবে এবার আর সেই পুরনো অহংকার নিয়ে নয়, এক গভীর জীবনবোধ আর নিয়তির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিয়ে তিনি আবার দেবরাজ হলেন।
কিন্তু গল্পটা সেখানে শেষ হলো না। আসল সংকট শুরু হলো তারপর।
অসুরদের নতুন কৌশল: ধর্মের মূলে আঘাত
বৃত্রাসুরের পতনের পর অবশিষ্ট কালকেয় অসুরেরা পালালো। তারা গিয়ে আশ্রয় নিল অতল সমুদ্রের তলদেশে। তারা জানত, এই পৃথিবীর প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে ঋষিদের তপস্যায়। তাই রাত্রি নামলেই তারা সমুদ্রের বুক থেকে উঠে এসে মর্ত্যের তপোবনগুলো ধ্বংস করতে লাগল, ঋষিদের হত্যা করতে লাগল। পৃথিবী জুড়ে নেমে এলো এক ঘোর অন্ধকার।
বিপন্ন দেবতারা আর উপায় না দেখে ছোটেন শ্রীহরির কাছে। নারায়ণের স্তব করে বলেন, "প্রভু, তুমিই বরাহ অবতারে পৃথিবীকে উদ্ধার করেছ, নৃসিংহ রূপে হিরণ্যকশিপুকে বধ করেছ, বামন রূপে বলিকে ছলনা করেছ। আজ এই গভীর রাতে কারা এসে ঋষিকুল ধ্বংস করছে, আমরা জানি না। ব্রাহ্মণ না বাঁচলে তো সৃষ্টিই থাকবে না!"
নারায়ণ মৃদু হেসে বললেন, "আমি জানি। ওরা কালকেয় অসুর। সমুদ্রের অতলে লুকিয়ে থাকে বলে তোমরা ওদের ছুঁতে পারছ না। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কেবল একজনই আছেন, যিনি এই সমুদ্রকে শূন্য করতে পারেন—তিনি তেজস্বী মহর্ষি অগস্ত্য।"
অগস্ত্যের সেই মহাজাগতিক আজলা
দেবতারা আর বিলম্ব না করে পৌঁছলেন অগস্ত্যের আশ্রমে। শান্ত, সমাহিত ঋষির চরণে নিবেদন করলেন তাঁদের আকুল প্রার্থনা। অগস্ত্য সব শুনলেন। তাঁর চোখে কোনো উত্তেজনার আভাস নেই, যেন এ এক অতি সাধারণ কাজের আহ্বান। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। শান্ত পায়ে হেঁটে এলেন সমুদ্রের তীরে।
চারপাশে তখন দেবতাদের ভিড়, উদ্বেলিত সমুদ্রের গর্জন। অগস্ত্য নত হলেন। দুই হাতের তালু দিয়ে এক আজলা জল তুললেন—আর তারপর...
1. প্রথম আজলা ও সমুদ্রের সংকোচন
মুহূর্তের স্তব্ধতা
ঋষি অগস্ত্য যখন প্রথম আজলা জল মুখে তুললেন, তখন মনে হলো অনন্ত দিগন্তব্যাপী জলরাশি এক তীব্র টানে পিছিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের কূল ভাঙতে শুরু করল।
2. অতল গর্ভ উন্মোচন
প্রকৃতির বিস্ময়
জল যত কমছে, তলা থেকে জেগে উঠছে হাজার বছরের প্রাচীন পলি, প্রবাল, শঙ্খ আর হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন সভ্যতার কঙ্কাল। দেবতারা রুদ্ধশ্বাসে দেখলেন, প্রকৃতির বুক চিরে এক ধূ ধূ মরুভূমি জেগে উঠছে।
3. শেষ বিন্দু ও অসুরদের প্রকাশ
লুকিয়ে থাকা পাপের অবসান
দেখতে দেখতে সম্পূর্ণ সমুদ্রটাই ঢুকে গেল ঋষির জঠরে। এক ফোঁটা জলও অবশিষ্ট রইল না। আর সেই কাদা-মাখা শুষ্ক সমুদ্রবক্ষে উন্মোচিত হয়ে পড়ল কালকেয় অসুরদের গোপন আস্তানা।
সুযোগ হাতছাড়া করলেন না দেবতারা। তরবারি আর শূল নিয়ে আছড়ে পড়লেন কালকেয়দের ওপর। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুষ্ক সমুদ্রের বুক অসুরদের রক্তে লাল হয়ে উঠল। এক কালান্তক ত্রাসের অবসান ঘটল।
এক সংকট কাটল, জন্ম নিল অন্য সংকট
অসুর তো মরল, কিন্তু এবার দেবতারা চাইলেন তাদের চেনা সমুদ্র ফিরে আসুক। জল ছাড়া যে পৃথিবী মরুভূমি হয়ে যাবে! মেঘ উড়বে না, বৃষ্টি হবে না, নদীগুলো শুকিয়ে মরবে। দেবতারা করজোড়ে বললেন, "ঠাকুর, এবার সমুদ্রটা ফিরিয়ে দিন।"
অগস্ত্য শান্ত মুখে চাইলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসি। বললেন, "সে কী করে হয়? ও জল তো আমি হজম করে ফেলেছি! ও আর ফেরানো সম্ভব নয়।"
দেবতারা তো মাথায় হাত দিয়ে বসলেন! এক সমস্যা মেটাতে গিয়ে এ তো মহাশূন্যতা তৈরি হলো। তাঁরা আবার ছোটেন ব্রহ্মার কাছে। ব্রহ্মা আশ্বস্ত করে বললেন, "এখন ধৈর্য ধরো। এই যুগে আর সমুদ্র ফিরবে না। বহু পরে, মর্ত্যের এক রাজা ভগীরথের কঠোর তপস্যায় স্বর্গ থেকে গঙ্গা নেমে আসবেন মর্ত্যে। তাঁর সেই পুণ্যতোয়া ধারায় আবার পূর্ণ হবে এই শূন্য সমুদ্রের উদর। ততকাল অপেক্ষা করো।"
রোমশ মুনির গল্প শেষ হলো। যুধিষ্ঠির এবং তাঁর ভাইয়েরা দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। চারপাশের অরণ্যের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়েছে। এক ঋষির ভেতরের তপোবল যে আস্ত একটা মহাসমুদ্রকে উদরস্থ করে নিতে পারে—এই সত্যের গুরুত্ব তাঁদের বুকের ভেতর এক গভীর বিস্ময় আর শ্রদ্ধার জন্ম দিল।

Comments
Post a Comment