২য় ভাগ বিরাটপর্ব ছদ্মবেশে মহামানব: মৎস্যদেশের কুয়াশায় পঞ্চপাণ্ডব
২য় ভাগ বিরাটপর্ব ছদ্মবেশে মহামানব: মৎস্যদেশের কুয়াশায় পঞ্চপাণ্ডব
পায়ে পায়ে যমুনার দক্ষিণ তট ঘেঁষে হেঁটে চলেছেন তাঁরা। কপালে রোদ, গায়ে ধুলোবালি। কখনো পাহাড়ের নির্জন গুহা, কখনো ঘন জঙ্গলের অন্ধকারে একটু জিরিয়ে নেওয়া। দশার্ণ, পাঞ্চাল, যকৃল্লোম আর শূরসেনের সীমানা পেরিয়ে চলেছে পাঁচটি ছায়া। হাতে ধনুক, কোমরে তলোয়ার বাধা, কিন্তু চেহারায় সে এক আশ্চর্য পরিবর্তন! রোদে পুড়ে গায়ের রং কুচকুচে কালো, চুল-দাড়ির জঙ্গলে ঢেকে গেছে রাজার তেজ। অবশেষে বনপথ শেষ হলো, সামনে জেগে উঠল মৎস্যদেশের রাজধানী। বিরাট নগরী।
যুধিষ্ঠির এক থমকে দাঁড়িয়ে অর্জুনের দিকে চাইলেন। গলার স্বর নিচু করে বললেন, "অর্জুন, ওই বিশালাকার গাণ্ডীব নিয়ে নগরে ঢুকলে কিন্তু আর রক্ষে নেই। রাজ্যসুদ্ধ লোক এক নজর দেখলেই চিনে ফেলবে। আমাদের প্রথা ভাঙবে, আর অমনি আবার সেই বারো বছরের বনবাস! অস্ত্রের ব্যবস্থা আগে করতে হবে।"
অর্জুন আঙুল তুলে দেখালেন দূরে, শ্মশানের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশাল শমীবৃক্ষ। ডালপালা এত ঘন যে রোদের আলোও গলতে পারে না, হিংস্র পশুপাখির ডেরা। অর্জুন বললেন, "ওই শমীগাছটাই উপযুক্ত জায়গা, জ্যেষ্ঠ। লোকচক্ষুর বাইরে, বিষধর সাপের পাহারা। কোনো মানুষ ওদিকে ভুল করেও পা বাড়াবে না।"
কথামত কাজ। পাঁচ ভাই মিলে তাঁদের ধনুক, বাণ আর বিখ্যাত গাণ্ডীব দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধলেন। যুধিষ্ঠির বললেন, "নকুল, গাছে উঠে এমন এক কোটরে এগুলো রাখো যাতে শ্রাবণের জলও না ছুঁতে পারে।" নকুল নিঃশব্দে গাছে উঠে সব লুকিয়ে ফেললেন। আর লোকজনকে দূরে রাখতে ডাল থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো একটা পচা মরা দেহাংশ! এরপর পাঁচ ভাই নিজেদের নতুন নাম নিলেন— জয়, জয়ন্ত, বিজয়, জয়ৎসেন আর জয়দ্বল। নগরদ্বারে পৌঁছানোর আগে মহাদেবী দুর্গার স্তব করলেন তাঁরা। দেবী আবির্ভূত হয়ে মৃদু হেসে অভয় দিলেন, "বিরাটনগরে তোমাদের ছদ্মবেশ কাটবে না। জয় নিশ্চিত।"
বিরাট রাজার দরবার তখন জমজমাট। রাজাসনে বসেছেন মৎস্যরাজ। হঠাৎ সভার ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন এক প্রবীণ ব্রাহ্মণ। হাতে একসেট পাশা। বিনীত কণ্ঠে বললেন, "সম্রাট! ভাগ্যের প্রহারে আমার সব গেছে। আমি ব্যাঘ্রপদ গোত্রের ব্রাহ্মণ, নাম কঙ্ক। আগে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে থাকতাম, পাশা খেলায় আমার কিছুটা হাত আছে। একটু ঠাঁই দেবেন জীবিকার জন্য?"
বিরাট রাজা কঙ্কের শান্ত, বিদগ্ধ রূপ দেখে মোহিত হলেন। বললেন, "আপনাকে কঙ্ক নয়, আমার পরম মিত্র হিসেবে বরণ করলাম! রাজ্য, রাজকোষ আর সৈন্যবাহিনীর তদারকি আজ থেকে আপনার। আমার দুয়ার আপনার জন্য সর্বদা খোলা।"
যুধিষ্ঠির আড়ালে হাসলেন। নিজের পরিচয় না দিয়ে তিনি রাজকীয় আদরে বিরাটের আশ্রয়ে রয়ে গেলেন।
তার পরপরই দরবারে প্রবেশ করলেন এক দৈত্যসম পুরুষ। চলনে সিংহের গর্জন, আর হাতে রান্নার হাতা-ছুরি-চামচ! কিন্তু সেই রাঁধুনির ছদ্মবেশেও শরীরের তেজ যেন ফেটে বেরোচ্ছিল।
তিনি বললেন, "মহারাজ! আমার নাম বল্লব। রান্না করায় আমার জুড়ি নেই। যুধিষ্ঠির মহারাজও আমার হাতের রান্না ভালোবেসে খেতেন। আমাকে আপনার পাকশালায় রাখুন।"
বিরাট অবাক হয়ে বললেন, "বল্লব, তোমাকে তো পাচক বলে মনে হচ্ছে না! যেন সাক্ষাৎ দেবরাজ ইন্দ্রের তেজ!"
ভীম মুচকি হেসে বললেন, "বিশ্বাসে মেলায় বস্তু, মহারাজ! শুধু রান্নাই নয়, আমি বাঘ আর হাতির সাথে কুস্তি লড়েও আপনাকে আনন্দ দিতে পারি।" বিরাটের মন গলল, বল্লবকে তিনি প্রধান পাচকের দায়িত্বে বসিয়ে দিলেন।
এদিকে দুঃখিনী নারীর বেশে এক পরমা সুন্দরী ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন বিরাটনগরে। নাম তাঁর সৈরন্ধ্রী। প্রাসাদের জানালা দিয়ে তাঁকে দেখে ডেকে পাঠালেন রানি সুদেষ্ণা।
সুদেষ্ণা বিস্ময়ে বললেন, "কে তুমি সুন্দরী? যক্ষী, দেবকন্যা না কোনো অপ্সরা? তোমাকে দাসী বলে তো মনে হচ্ছে না!"
দ্রৌপদী চোখ নিচু করে বললেন, "আমি কোনো দেবী নই, রানিমা। কেশবিন্যাস আর পুষ্পমালা গাঁথাই আমার কাজ। আগে দেবী দ্রৌপদীর সেবা করতাম।"
সুদেষ্ণা একটু থমকে বললেন, "তোমাকে রাখলে যদি রাজা মোহগ্রস্ত হন, সেই ভয় হচ্ছে!"
দ্রৌপদী দৃঢ়স্বরে বললেন, "আমাকে পরপুরুষের স্পর্শ করার সাধ্য নেই। আমার পাঁচজন শক্তিশালী গন্ধর্ব পতি সবসময় আমাকে আগলে রাখেন। কেউ অন্যায় নজরে তাকালে সেই রাতেই সে শেষ।" আশ্বস্ত হয়ে রানি তাঁকে সসম্মানে অন্তঃপুরে ঠাঁই দিলেন।
কিছুদিন পর গোয়ালার পোশাকে বিরাটের গোশালায় এলেন সহদেব। নাম বললেন 'তন্ত্রিপাল'। চল্লিশ ক্রোশের মধ্যে থাকা সমস্ত গরুর হিসাব তাঁর নখে। কোনটা বন্ধ্যা গরুর চিকিৎসা, কোনটা ভালো বলদ— সব তাঁর জানা। বিরাট মুগ্ধ হয়ে এক লাখ গবাদি পশুর দায়িত্ব তুলে দিলেন তাঁর হাতে।
আর অন্তঃপুরে তখন প্রবেশ ঘটেছে এক অদ্ভুত পুরুষের। গজসেবকের মতো ধীর পদক্ষেপ, গায়ে নারীর অলংকার, নাম 'বৃহন্নলা'। স্বয়ং বীর অর্জুন! অর্জুন বললেন, "মহারাজ, আমি নাচ, গান আর বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী। রাজকন্যা উত্তরাকে গান-নাচ শেখাতে চাই।"
পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর মন্ত্রীদের সাথে আলোচনার পর যখন নিশ্চিত হওয়া গেল বৃহন্নলা নপুংসক, তখন তাঁকে রাজকন্যার অন্তঃপুরে প্রবেশাধিকার দেওয়া হলো। অর্জুন নিজের মনকে সংযত রেখে রাজকন্যাদের নাচ-গান শেখাতে লাগলেন, অতি অল্প দিনেই হয়ে উঠলেন সবার প্রিয়।
বি:দ্র: অর্জুনের মর্ত্যে নপুংসক হয়ে থাকার কাহিনি জানতে এখানে ক্লিক করুন।
অবশেষে এলেন নকুল। অশ্বপালকের ছদ্মবেশে নাম দিলেন 'গ্রন্থিক'। ঘোড়ার স্বভাব চেনা, তাদের রোগ সারানো আর দুষ্টু ঘোড়াকে বশ করায় নকুলের মতো ওস্তাদ আর কেউ ছিল না। বিরাট রাজা পরম আনন্দে নিজের সমস্ত ঘোড়া ও রাজকীয় সারথিদের দায়িত্ব গ্রন্থিকের হাতে সঁপে দিলেন।
এভাবেই, যাঁদের একনজরে দেখলে পাপ কেটে যায়, সেই পৃথিবীর অধিপতি পঞ্চপাণ্ডব আর দ্রৌপদী মৎস্যদেশের ধুলোবালির আড়ালে, লোকচক্ষুর অন্তরালে কাটিয়ে দিতে লাগলেন তাঁদের কঠিন অজ্ঞাতবাসের দিনগুলো।
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে এবং বনপর্ব ৬৫তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিরাটপর্বের ২য় ভাগের আলোচনা এবং বিরাট পর্বের পরবর্তী ভাগ চলবে।
বিরাটপর্বের ১ম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment