৬২তম বনপর্ব -অধর্মের পতন ও অযোধ্যার সূর্যোদয়


৬২তম বনপর্ব -অধর্মের পতন ও অযোধ্যার সূর্যোদয়

বনবাসের ক্লান্তিকর দিনগুলো তখন দ্রৌপদী আর ভাইদের নিয়ে গুটিয়ে আনছেন যুধিষ্ঠির। মনের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, অনিশ্চয়তা আর গ্লানি। ঠিক তখনই ঋষি মার্কণ্ডেয় এলেন—যেমনটা তিনি সব সময় আসেন, যেন এক জীবন্ত মহাকাব্যের ইতিহাস বহন করে। যুধিষ্ঠিরের বিষণ্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে মার্কণ্ডেয় শোনাতে শুরু করলেন এক মহা-উপাখ্যান, মহাভারতের পাতায় রামায়ণের সেই রামোপাখ্যান।

রাবণ তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্রধারী বীরপুত্র ইন্দ্রজিতের দিকে তাকিয়ে বললেন, “পুত্র, তুমি স্বয়ং স্বর্গের ইন্দ্রকে পরাস্ত করেছ। আজ যুদ্ধক্ষেত্রে যাও, ওই রাম-লক্ষ্মণ আর সুগ্রীবকে শেষ করে এসো।”

বি: দ্র: রাবন পুত্র মেঘনাথের ইন্দ্রজিৎ হয়ে ওঠার কাহিনি জানতে এখানে ক্লিক করুন।

পিতৃ-আজ্ঞা শিরে ধার্য করে ইন্দ্রজিৎ কবচ পরে, রথে চেপে ধাবিত হলেন রণক্ষেত্রে। হুঙ্কার দিয়ে ডেকে উঠলেন লক্ষ্মণকে। লক্ষ্মণও কালবিলম্ব না করে ধনু হাতে সামনে এলেন। হরিণ যেমন সিংহের গর্জনে শিউরে ওঠে, লক্ষ্মণের ধনুষ্টঙ্কারে রাক্ষসসেনারা তেমনই কম্পমান। দুজনেই দিব্যাস্ত্রের ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত, দুজনেই মরিয়া।

যুদ্ধের তীব্রতার মধ্যেই বালিকুমার অঙ্গদ আস্ত এক গাছ উপড়ে আঘাত করলেন ইন্দ্রজিতের মাথায়। রাবণপুত্র ক্ষণিকের জন্য থমকে গিয়ে গদা চালিয়ে দিলেন অঙ্গদের পাঁজরে। কিন্তু অঙ্গদের তেজ কম নয়; তিনি রক্তচক্ষু মেলে আস্ত এক শালগাছ তুলে আছড়ে ফেললেন ইন্দ্রজিতের রথের ওপর। ঘোড়া, সারথি নিভে গেল, চূর্ণ হলো রথ।

পরাজয় সন্নিকট দেখে ইন্দ্রজিৎ এক লাফে নিচে নেমে মায়াবলে মিলিয়ে গেলেন শূন্যে। আর অদৃশ্য আকাশ থেকে রাম ও লক্ষ্মণের ওপর নামিয়ে আনলেন হাজার হাজার বাণের বৃষ্টি। শরবিদ্ধ দুই ভাই ধূলিশয্যা নিলেন।

পরিস্থিতি যখন ঘোর সংকটময়, বিভীষণ এসে উপস্থিত হলেন সেখানে। প্রজ্ঞাসূত্র আর ওষধি ‘বিশল্যা’ দিয়ে রাম-লক্ষ্মণের ক্ষত নিরাময় করে দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে কেটে গেল চেতনা হারানোর আলস্য। বিভীষণ তখন এক পরম গোপনীয় কথা বললেন শ্রীরামকে, “কুবেরের আদেশে শ্বেতগিরি থেকে এক গুহ্যক এনেছে এই দিব্য জল। এতে চোখ ধুলে মায়াবলে লুকিয়ে থাকা শত্রুকেও স্পষ্ট দেখা যাবে।”

শ্রীরাম সেই পবিত্র জলে নয়ন ধৌত করলেন। লক্ষ্মণ, সুগ্রীব, হনুমান, অঙ্গদ সহ সমস্ত বানরপতিরা ধুয়ে নিলেন নিজেদের চোখ। আর অমনি মায়ার পর্দা ছিটকে গেল—অগোচর ইন্দ্রজিৎ ধরা দিলেন চাক্ষুষ বাস্তবে। লক্ষ্মণ অগ্নিসম তীব্র তিনটি বাণে বিদ্ধ করলেন ইন্দ্রজিতকে। রাবণপুত্রের দেহ প্রাণহীন হয়ে লুটিয়ে পড়ল ধরণীতে।

পুত্রশোকে উন্মত্ত রাবণ এবার স্বয়ং রত্নখচিত স্বর্ণরথে চেপে লঙ্কাপুরী থেকে ধেয়ে এলেন। রামের রূপ ধরে মায়াজাল বিস্তার করতে চাইলে লক্ষ্মণ সোজা রামকে বললেন, “প্রভু, এই রূপধারী পাপীকে বধ করুন।”

দেবারাজ ইন্দ্রের সারথি মাতলি তখন সুর্যের ন্যায় তেজস্বী 'জৈত্র' রথ নিয়ে হাজির রামের সামনে। শ্রীরাম রথে আরোহণ করা মাত্রই শুরু হলো এক প্রলয়ংকর যুদ্ধ। রাবণের কঠিন ত্রিশূল কেটে রাম যখন ব্রহ্মাশ্র যোজনা করলেন, তখন সেই বাণের তেজে রথ, অশ্ব ও সারথিসহ রাবণ ভস্মীভূত হলেন রণক্ষেত্রে। আকাশে দুন্দুভি বাজিয়ে দেবতারা জয়ধ্বনি করলেন।

কিন্তু নাটকের আসল ট্র্যাজেডি আর পরীক্ষা তো অপেক্ষা করছিল লঙ্কার জয়ের পর!

বৃদ্ধ মন্ত্রী অবিন্ধ্য এক পালকিতে করে মলিনবসনা, ধূলিধূসরিত সীতাদেবীকে নিয়ে এলেন রামের সামনে। কিন্তু দীর্ঘ বিরহের পর জানকীকে দেখে রামের চোখে প্রেমের স্নিগ্ধতা ফুটে উঠল না। ফুটে উঠল এক নির্মম, নীতিবাদী পুরুষের কঠোরতা। রাম বললেন, “জনকনন্দিনী, আমার যা কর্তব্য ছিল, তা আমি করেছি। কিন্তু পরপুরুষের স্পর্শে থাকা স্ত্রীকে আমার মতো ধর্মজ্ঞ পুরুষ গ্রহণ করতে পারে না। তুমি যেখানে খুশি চলে যাও।”

এক ঝটকায় কর্তিত কলাগাছের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন জানকী। স্তব্ধ হয়ে গেল পুরো বানরসেনা, লক্ষ্মণের চোখও জলে ভরে উঠল।

ঠিক তখনই মেঘ চিরে বিমানে চেপে নেমে এলেন ব্রহ্মা, ইন্দ্র, অগ্নি, বায়ু, কুবের এবং স্বর্গের দশরথ।

বায়ুদেব হেঁকে বললেন, “রাম! সীতা নিষ্কলঙ্ক।”

অগ্নিদেব প্রমান দিলেন, “মৈথিলীর কোনো অপরাধ নেই।”

স্বয়ং ব্রহ্মা স্মরণ করিয়ে দিলেন, “রাবণ নলকুবেরের অভিশাপে আবদ্ধ ছিল। সীতার সতীত্ব অক্ষুণ্ণ। দেবকার্য নিষ্পন্ন হয়েছে, তুমি সীতাকে গ্রহণ করো।”

পিতার আজ্ঞা ও দেবগণের বাক্যে রাম পরম আনন্দে সীতাকে গ্রহণ করলেন। ব্রহ্মার বরে প্রাণ ফিরে পেল যুদ্ধে নিহত বানররা, আর সীতা হনুমানকে দিলেন চিরঞ্জীব হওয়ার অমর বর।

পুষ্পক বিমানে চেপে রাম, সীতা, লক্ষ্মণ, সুগ্রীব ও বিভীষণ ফিরে চললেন অযোধ্যার পানে। অযোধ্যার কাছে পৌঁছে হনুমানকে পাঠানো হলো ভরতের মনোভাব জানতে। নন্দীগ্রামে গিয়ে দেখা গেল, ভরত চীরবস্ত্র পরে, রামের পাদুকা জোড়াকে সিংহাসনে বসিয়ে সন্ন্যাসীর মতো দিন কাটাচ্ছেন।

অশ্রুসজল এক মহা মিলনের পর, শুভ নক্ষত্রের পূর্ণ তিথিতে বশিষ্ঠ ও বামদেব শ্রীরামকে অযোধ্যার রাজ্যাভিষিক্ত করলেন। রাম সুগ্রীব ও বিভীষণকে পরম আদরে বিদায় জানালেন, পুষ্পক বিমান কুবেরকে ফিরিয়ে দিয়ে গোমতীর তীরে আয়োজন করলেন দশটি অশ্বমেধ যজ্ঞের।

গল্প শেষ করে মহর্ষি মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরের কাঁধে হাত রাখলেন। তাঁর গলায় এক অভিজ্ঞ আশ্বাসের সুর—

“রাজন! পুরুষসিংহ যুধিষ্ঠির, একা রামচন্দ্রও কেবল বানর আর ভালুকদের সঙ্গে নিয়ে ওই অপরাজেয় রাবণকে হারাজিত করে সীতাকে উদ্ধার করেছিলেন। আর তোমার পাশে তো রয়েছে মহাবীর অর্জুন, ভীমের মতো দেবতুল্য ভাইয়েরা! এই দুঃসময় সাময়িক, সংকট দেবতা ও অসুরদেরও ভোগ করতে হয়। নিজের বাহুবলে ভরসা রাখো, জয় তোমার সুনিশ্চিত!”

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের   ৬২তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বনপর্বের ৬১তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির  প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)