রামের ধনুর্বাণ, সুগ্রীবের সেনা: সীতা উদ্ধারের নেপথ্যে এক ঐতিহাসিক চুক্তি


রামের ধনুর্বাণ, সুগ্রীবের সেনা: সীতা উদ্ধারের নেপথ্যে এক ঐতিহাসিক চুক্তি

১. ঋষ্যমূক পর্বত: দুই নিঃসঙ্গ মানুষের মিলন

সীতাহরণের পর রামের বুকে তখন এক গভীর ক্ষত, একটা তীব্র শূন্যতা। লক্ষণকে সঙ্গে নিয়ে তিনি যখন দণ্ডকারণ্য পেরিয়ে ঋষ্যমূক পর্বতের পাদদেশে এসে পৌঁছলেন, তখন তাঁর পরিচয় শুধুই এক রাজ্যহারা, পত্নীহারা পরিব্রাজকের।

ঠিক সেই সময়, পর্বতের চূড়ায় বসে ভয় আর সংশয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন সুগ্রীব। নিজের আপন ভাই, কিষ্কিন্ধ্যার পরাক্রমশালী রাজা বালী তাঁকে ভুল বুঝে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, কেড়ে নিয়েছে তাঁর স্ত্রী রুমাকেও। রামের হাতে ধনুর্বাণ দেখে সুগ্রীব প্রথমে ভেবেছিলেন, বালী বুঝি তাঁকে হত্যা করার জন্য কোনো ঘাতক পাঠিয়েছে। কিন্তু হনুমানের বিচক্ষণতায় ভুল ভাঙল।

রাম আর সুগ্রীব—দুজনেই তখন ভাগ্যাহত, দুজনেই প্রিয়জন-বিচ্যুত। সুনীলবাবুর ভাষায় বলতে গেলে, “এ যেন দুই ভাঙা বুকের মিলন।” অগ্নির সামনে হাত রেখে দুজনে বন্ধুত্বের শপথ নিলেন। সুগ্রীব কথা দিলেন সীতা উদ্ধারে সর্বশক্তি দিয়ে সাহায্য করবেন, আর রাম প্রতিজ্ঞা করলেন সুগ্রীবকে তাঁর সম্মান ও রাজ্য ফিরিয়ে দেবেন।

২. বালীবধ: এক নৈতিক সংকট

রামের আশ্বাসে বুক বেঁধে সুগ্রীব বালীকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করলেন। কিষ্কিন্ধ্যার রাজপথের সেই যুদ্ধ ছিল ভয়ংকর। দুই ভাই দেখতে হুবহু এক, তাই দূর থেকে রাম বুঝতে পারছিলেন না কাকে ছেড়ে কাকে তীর মারবেন। প্রথম দিনের যুদ্ধে সুগ্রীব মার খেয়ে কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালালেন।

দ্বিতীয় দিন রামের পরামর্শে সুগ্রীব গলায় একটা নাগপুষ্পের মালা পরে আবার বালীকে লড়াইতে ডাকলেন। যখন দুই ভাইয়ের লড়াই চরম পর্যায়ে, সুগ্রীব যখন প্রায় মৃতপ্রায়, তখন রাম এক গাছের আড়াল থেকে বালীকে লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়লেন।

বালী মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বালী রামকে প্রশ্ন করেছিলেন—এক রঘুবীর হয়ে, ধর্মাত্মা হয়ে কেন তিনি আড়াল থেকে কাপুরুষের মতো তীর মারলেন? রামের উত্তর ছিল স্পষ্ট ও রাজনৈতিক। বালী তাঁর ছোট ভাইয়ের স্ত্রীকে জোর করে নিজের করে রেখেছিলেন, যা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। আর তাছাড়া, বালী রাবণের মিত্র ছিলেন। বালী ভুল বুঝতে পারলেন, আর তাঁর মৃত্যুর পর সুগ্রীব হলেন কিষ্কিন্ধ্যার রাজা।

৩. বানর সেনা ও সীতার সন্ধান

রাজ্য ফিরে পাওয়ার পর সুগ্রীব কিছুদিনের জন্য বিলাসে মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু লক্ষ্মণের তীব্র ক্রোধ দেখে তাঁর মোহভঙ্গ হয়। তিনি বুঝতে পারেন, বন্ধুকে দেওয়া কথা রাখার সময় এসেছে।

সুগ্রীব আর কালবিলম্ব করলেন না। তাঁর আদেশে পৃথিবীর চারদিকে ছুটে গেল লক্ষ লক্ষ বানর ও ভাল্লুক সেনা। অঙ্গদ, জাম্ববান আর মহাবীর হনুমানের ওপর দায়িত্ব পড়ল দক্ষিণ দিকে যাওয়ার—কারণ লঙ্কা ছিল সেই দিকেই।

মূল বাঁক: জটায়ুর ভাই সম্পাতির কাছ থেকে খবর পেয়ে হনুমান যখন বিশাল সমুদ্র লাফিয়ে পার হয়ে লঙ্কায় পৌঁছলেন, তখনই সীতার খোঁজ মিলল। অশোক বনে মলিন পোশাকে বসে থাকা সীতার হাতে রামের আংটি তুলে দিয়ে হনুমান সুগ্রীবের দেওয়া প্রতিজ্ঞা পূরণ করলেন।

সুগ্রীবের এই অতন্দ্র সাহায্য আর বানর সেনার নিষ্ঠা ছাড়া রামের পক্ষে সীতাকে ফিরে পাওয়া হয়তো অসম্ভব হতো। মহাকাব্যের এই অধ্যায়টি আসলে কোনো অলৌকিক দেবতার গল্প নয়, এ হলো বিপদের দিনে দেওয়া কথা রাখা আর বন্ধুত্বের এক শাশ্বত দলিল।


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া