২৯তম বনপর্ব -অষ্টাবক্রের স্পর্ধিত জয় ও এক পিতার মুক্তি


২৯তম বনপর্ব - অষ্টাবক্রের স্পর্ধিত জয় ও এক পিতার মুক্তি

লোমশ ঋষি যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। পথ চলতে চলতে চারপাশের অরণ্যের রূপ বদলে যাচ্ছে। ঋষি বললেন, "রাজন, ওই যে সামনে দেখছ, ওটাই উদ্দালকের পুত্র এবং মন্ত্রবিদ্যার মহাসাধক শ্বেতকেতুর আশ্রম। এই আশ্রমে ঋতুরাজ বসন্ত যেন চিরকালের জন্য বাসা বেঁধেছে। তুমি ভাইদের নিয়ে একবার ভেতরে চলো। এই সেই পুণ্যভূমি, যেখানে শ্বেতকেতু স্বয়ং দেবী সরস্বতীকে এক রক্তমাংসের নারীরূপে প্রত্যক্ষ করেছিলেন।"

একটু থেমে, গাছের ছায়ায় বসে লোমশ ঋষি  সেই অদ্ভুত, অথচ চিরন্তন সত্যের গল্পটি বলতে শুরু করলেন।

সে এক অন্য সময়। মহর্ষি উদ্দালকের আশ্রমে কহোড় নামে এক শিষ্য ছিলেন। গুরুর প্রতি তাঁর সেবা আর নিষ্ঠা এতই গভীর ছিল যে, উদ্দালকের স্নেহের পাত্র হতে তাঁর সময় লাগেনি। অল্প দিনেই কহোড়কে সমস্ত বেদ বুঝিয়ে দিয়ে ঋষি নিজের রূপবতী কন্যা সুজাতাকে তাঁর হাতে সম্প্রদান করলেন।

কিছুদিন পর সুজাতা অন্তঃসত্ত্বা হলেন। তাঁর গর্ভের সন্তানটি যেন এক অগ্নিকুণ্ড—মায়ের পেটে বসেই সে পিতার বেদপাঠ শুনতো আর পরম জ্ঞানে ঋদ্ধ হতো। একদিন রাতে ক্লান্ত কহোড় যখন বেদমন্ত্র উচ্চারণ করছিলেন, আচমকা সুজাতারি গর্ভ থেকে একটা অতি ক্ষীণ অথচ স্পষ্ট কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "পিতা, সারারাত ধরে তুমি যা আবৃত্তি করছ, তার ছন্দ ও উচ্চারণ কিন্তু ঠিক হচ্ছে না।"

নিজের অনাগত সন্তানের কাছ থেকে এমন প্রকাশ্য ভুল সংশোধন! অহংকারে আঘাত লাগল কহোড়ের। লজ্জায়, অপমানে অন্ধ হয়ে তিনি গর্ভস্থ শিশুকেই অভিশাপ দিয়ে বসলেন, "এত বড় স্পর্ধা তোমার? পিতার ভুল ধরো? যাও, পৃথিবীর আলো দেখার পর তোমার শরীর আটটি জায়গায় বাঁকা হয়ে থাকবে।"

মায়ের জঠরে আটটি বাঁক নিয়ে শিশুটি যতই বাড়তে লাগল, সুজাতা ততই দুর্বল হয়ে পড়লেন। দারিদ্র্যের সংসারে পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব। নিরুপায় হয়ে সুজাতা একদিন স্বামীকে বললেন, "সংসারে বড় অভাব। তুমি কোথাও গিয়ে কিছু ধনের ব্যবস্থা করো, নয়তো সন্তানকে আমি বাঁচাতে পারব না।"

স্ত্রীর কথায় কহোড় ছুটে গেলেন মিথিলার রাজা জনকের রাজসভায়। সেখানে তখন এক মহাসভা বসেছে। কিন্তু বিধি বাম! জনকের সভায় বন্দী নামের এক মহাপণ্ডিত ছিলেন, যাঁর নিয়ম ছিল—শাস্ত্রে যে তাঁকে হারাতে পারবে না, তাকে জলেই ডুবিয়ে মারা হবে। কহোড় বিদ্যান ছিলেন, কিন্তু বন্দীর কূটতর্কের কাছে হেরে গেলেন। নিয়ম মেনে তাঁকে জলে ডুবিয়ে দেওয়া হলো।

এই দুঃসংবাদ যখন উদ্দালকের কানে পৌঁছাল, তিনি বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। সুজাতাকে ডেকে বললেন, "মা রে, অনাগত সন্তান যেন কোনোদিন জানতে না পারে তার পিতার এই করুণ পরিণতির কথা।"

যথাসময়ে সুজাতা একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেন। পিতার অভিশাপে তার দেহটি ছিল আট জায়গায় কুঁকড়ে যাওয়া, বিকৃত। তাই তার নাম রাখা হলো 'অষ্টাবক্র'। বারোটি বছর কেটে গেল। অষ্টাবক্র জানতেন উদ্দালকের কোলই তাঁর পিতার কোল, আর শ্বেতকেতু তাঁর বড় ভাই।

কিন্তু একদিন সেই ভুল ভাঙল। বারো বছরের অষ্টাবক্র যখন দাদুর কোলে বসে আদর খাচ্ছিলেন, শ্বেতকেতু এসে আচমকা কঠোর স্বরে বলে উঠলেন, "উঠে এসো ওখান থেকে। ওটা তোমার পিতার কোল নয়।"

কথাটা তীরের মতো বিঁধল বালকের বুকে। সে কাঁপতে কাঁপতে মায়ের কাছে গিয়ে সটান প্রশ্ন করল, "মা, আমার পিতা কে? তিনি কোথায়?" সুজাতা আর সত্য লুকিয়ে রাখতে পারলেন না। কেঁদে ফেলে বললেন বন্দী পণ্ডিতের হাতে কহোড়ের পরাজয় ও সলিলসমাধির সেই নির্মম ইতিহাস।

সব শুনে অষ্টাবক্রের চোখ জ্বলে উঠল। তিনি শ্বেতকেতুকে বললেন, "চলো ভাই, রাজা জনকের যজ্ঞসভায় যাব।"

মিথিলার রাজকীয় যজ্ঞশালার দ্বারে পৌঁছতেই দ্বারপাল তাঁদের পথ আগলে দাঁড়াল। বলল, "ক্ষমা করবেন বালকদ্বয়। রাজার আদেশ, কোনো নাবালক এই সভায় প্রবেশ করতে পারবে না। কেবল বৃদ্ধ এবং পরম জ্ঞানী ব্রাহ্মণদের জন্যই এই স্থান।"

অষ্টাবক্র দ্বারপালের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত, দৃপ্ত গলায় বললেন, "হে দ্বারপাল, চুল পাকলেই মানুষ জ্ঞানী হয় না, কিংবা বয়স বা ধনসম্পদ মানুষকে পণ্ডিত বানায় না। ব্রাহ্মণদের মধ্যে যিনি বেদকে আত্মস্থ করেছেন, তিনিই প্রকৃত বৃদ্ধ, প্রকৃত জ্ঞানী—এটাই ঋষিদের বাণী। আমি বন্দীর সঙ্গে শাস্ত্রার্থ করতে এসেছি। রাজাকে গিয়ে বলো, আজ এই সভায় আসল জ্ঞান কার আছে, তা প্রমাণিত হবে।"

বালকের মুখের এমন তেজ দেখে দ্বারপাল চমকে গেল। সে ভেতরে গিয়ে রাজাকে সব জানাল। 

রাজা জনক কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে তখন এক গভীর কৌতূহল। অষ্টাবক্রের দিকে সামান্য ঝুঁকে তিনি পরম আগ্রহে জিজ্ঞেস করলেন, "আচ্ছা অষ্টাবক্র, তুমি তো ত্রিকালজ্ঞ। আমাকে বলো দিকিনি—এই সংসারে কোন জীব ঘুমানোর সময়েও চোখ বোজে না? জন্ম নেওয়ার পরও কার কোনো নিজস্ব শক্তি বা গতি থাকে না? আর এই চরাচরে কার বুকেই বা কোনো স্পন্দন নেই, অর্থাৎ কে সম্পূর্ণ হৃদয়হীন?"

অষ্টাবক্রের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে ম্লান আত্মবিশ্বাসী হাসি। তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, "মহারাজ, উত্তর তো খুবই সহজ। জলের নিচে যে মাছ ভেসে বেড়ায়, সে ঘুমের ঘোরেও কখনো চোখ বোজে না। আর পক্ষী বা সরীসৃপের যে ডিম, তা ভূমিষ্ঠ হওয়ার বা জন্ম নেওয়ার পরও নিজে থেকে নড়াচড়া করার কোনো শক্তি পায় না, যতক্ষণ না তা ফেটে নতুন প্রাণের জন্ম হচ্ছে। আর শেষ প্রশ্নটির উত্তর তো আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে—এই যে নিথর পাথর, তার বুকে কোনোদিন কোনো রক্তের স্রোত বয় না, তাই পাথরের কোনো হৃদয় থাকে না।"

কৌতূহলী রাজা জনক তাঁদের ভেতরে আসার অনুমতি দিলেন।

অষ্টাবক্র যখন বিকৃত, বাঁকা শরীর নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সভার মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন চারপাশের সভাসদ ও পণ্ডিতেরা হেসেই আকুল। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে অষ্টাবক্র নিজে আরও জোরে হাসতে শুরু করলেন।

রাজা জনক বিস্মিত হয়ে বললেন, "বালক, তোমার এই অদ্ভুত দেহ দেখে লোকে হাসছে ঠিক আছে, কিন্তু তুমি নিজে হাসছ কেন?"

অষ্টাবক্র সোজা রাজার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "হাসছি মহারাজ, আপনার এই সভার পণ্ডিতদের দেখে। আমি ভেবেছিলাম এটা জ্ঞানীদের সভা, কিন্তু এসে দেখছি এটা একদল চামার বা চর্মকারের দল! এরা মানুষের ভেতরের জ্ঞান দেখতে পায় না, কেবল বাইরের চামড়া আর হাড়ের বাঁকটুকুই দেখে। মাটির পাত্রটা বাঁকা না সোজা, তা দিয়ে ভেতরের ক্ষীরের স্বাদ বোঝা যায় না রাজন! হাসি তো আপনার এই সভার দীনতা দেখে পাচ্ছে।"

পুরো সভা নিস্তব্ধ। রাজা জনক স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি বুঝলেন, এই বালক সাধারণ নয়। তিনি বন্দীকে আহ্বান করলেন শাস্ত্রার্থের জন্য।

শুরু হলো বিতর্ক। বন্দী একে একে জটিল প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে লাগলেন, 

রাজা জনকের সভাগৃহে তখন এক গভীর নীরবতা নেমে এসেছে। বালক অষ্টাবক্র সেই বিশাল পণ্ডিতমণ্ডলীর সামনে দাঁড়িয়ে বন্দীর দিকে সরাসরি তাকালেন। "চলুন, এই সভার সামনেই এর মীমাংসা হোক," তিনি বললেন, "যারা দেখছে, তারা সকলে সত্যটা জানুক।"

বন্দী, নিজের দীর্ঘ অপরাজিত রেকর্ডে আস্থা রেখে, তর্কে রাজি হল। এইভাবে দুজনে শুরু করলেন, একজন আরেকজনকে সংখ্যা ধরে ধরে উত্তর দিতে লাগলেন, ক্রমশ উপরের দিকে উঠতে উঠতে বেদের গভীরতম শিক্ষার মধ্য দিয়ে বুনে চলতে লাগলেন নিজেদের কথার জাল।

বন্দী শুরু করল। "অগ্নি একটিই, অষ্টাবক্র, যদিও তার রূপ বহু। একটি সূর্যই সমগ্র জগৎকে আলো দেয়। ইন্দ্র একাই শত্রুবিনাশী মহাশক্তি, আর যম একাই পিতৃলোকের অধীশ্বর।"

অষ্টাবক্র সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন। "প্রধান দেবতা দুইজন, ইন্দ্র আর অগ্নি একসাথে। দুই দিব্য ঋষি জগতে বিচরণ করেন, নারদ আর পর্বত। অশ্বিনীকুমারও যমজ দেবতা, দুই। রথ চলে দুই চাকায়, আর স্রষ্টা স্বয়ং নর-নারীকে একে অপরের সহচর করে সৃষ্টি করেছেন।"

বন্দী তিনে এগোল। "সব প্রাণী জন্মায় তিন রকমভাবে, তাদের কর্ম অনুসারে। বেদ তিন প্রকার ক্রিয়ার কথা বলে। যজ্ঞ হয় দিনে তিনবার—সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা। তিনটি লোক আছে যেখানে মানুষ নিজের কর্মফল ভোগ করে—স্বর্গ, মর্ত্য, আর পাতাল। আর বেদ তিনটি পবিত্র জ্যোতির কথাও বলে।"

অষ্টাবক্র চারের ভার নিলেন। "ব্রাহ্মণের জীবন চারটি আশ্রমের মধ্য দিয়ে যায়। সমাজ নিজেই চার বর্ণে বিভক্ত, প্রত্যেকে নিজ নিজ কর্তব্য আর যজ্ঞে বাঁধা। পৃথিবীতে চারটি প্রধান দিক আছে। পবিত্র ওঁকার গঠিত চার অংশে—অ, উ, ম, আর তার পরের নৈঃশব্দ্য। আর বাক্যও চার রূপে প্রকাশ পায়—পরা, পশ্যন্তী, মধ্যমা, বৈখরী।"

বন্দী পাঁচে সরে গেল। "যজ্ঞে পাঁচটি পবিত্র আগুন জ্বলে—গার্হপত্য, দক্ষিণাগ্নি, আহবনীয়, সভ্য, আর আবসথ্য। পঙক্তি ছন্দে পাঁচটি পঙক্তি থাকে। পাঁচটি মহাযজ্ঞ সবার ওপরে—অগ্নিহোত্র, দর্শ, পৌর্ণমাস, চাতুর্মাস্য, আর সোম। মানুষকে দেওয়া হয়েছে পাঁচটি ইন্দ্রিয়, জগৎ চেনার জন্য। বেদ পাঁচ অপ্সরার কথা বলে, প্রত্যেকের পাঁচ গোছা চুল, আর পাঁচটি পবিত্র নদী এই ভূমিতে পূজিত হয়।"

অষ্টাবক্রের কণ্ঠস্বর তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল ছয়ে পৌঁছে। "ঋষিরা শেখান, পবিত্র অগ্নি প্রথম প্রতিষ্ঠার সময় ছয়টি গরু দান করতে হয়। বছর ঘোরে ছয় ঋতুতে। মনের সাথে মিলিয়ে জ্ঞানের ইন্দ্রিয় ছয়টি। কৃত্তিকা নক্ষত্রপুঞ্জে ছয়টি তারা, আর বেদ ছয়টি সাধস্ক যজ্ঞের কথা বলে।"

বন্দী সাতে চলল। "গৃহপালিত পশু সাতটিপ্রকার , বন্য পশুও সাতটি প্রকার।  সাতটি ছন্দ মিলে যজ্ঞ সম্পূর্ণ হয়। সাতজন মহর্ষি এই পৃথিবীতে বিচরণ করেছেন। অতিথিকে সম্মান জানানোর সাতটি পথ আছে, আর বীণা বিখ্যাত তার সাতটি তারের জন্য।"

অষ্টাবক্র আটে উত্তর দিলেন। "ওজন করার দাঁড়িপাল্লার আটটি প্রধান অংশ থাকে তার সর্বোৎকৃষ্ট রূপে। শক্তিশালী শরভ নাকি আটটি পায়ে চলে। দেবতাদের মধ্যে বসু আটজন, আর প্রতিটি যজ্ঞ দাঁড়িয়ে থাকে আটকোনা যজ্ঞস্তম্ভের ওপর।"

বন্দী নয়ে নিয়ে গেল তর্ক। "পিতৃপুরুষের উদ্দেশে সমিধ দেওয়ার সময় নয়টি মন্ত্র উচ্চারিত হয়। প্রকৃতি নিজে নয়টি ভাগে বিভক্ত। বৃহতী ছন্দের প্রতিটি অংশে নয়টি অক্ষর থাকে। আর এক থেকে নয়, এই নয়টি অঙ্ক থেকেই জগতের সব সংখ্যার জন্ম।"

অষ্টাবক্র দশে উঠলেন। "সৃষ্টি জুড়ে দশটি দিক বিস্তৃত। একশোকে দশবার গুণ করলে হাজার হয়। শিশু দশ মাস মায়ের গর্ভে থাকে। পবিত্র জ্ঞানের গুরু দশজন, আর দশজন মানুষ আছেন যাদের প্রতি আমাদের গভীরতম শ্রদ্ধা প্রাপ্য।"

বন্দী এগারোয় পৌঁছল। "শরীর বহন করে এগারোটি ইন্দ্রিয় আর ক্ষমতা। মহাযজ্ঞ দাঁড় করানো হয় এগারোটি যজ্ঞস্তম্ভের ওপর। জীবের জীবনে এগারোটি পরিবর্তন আসে, আর দেবতাদের মধ্যে রুদ্র এগারোজন।"

অষ্টাবক্র বারোয় তাঁর সাথে মিলিত হলেন। "বছর তৈরি বারো মাস দিয়ে। জগতী ছন্দের প্রতিটি পঙক্তিতে বারোটি অক্ষর থাকে। সাধারণ যজ্ঞ বারো দিন ধরে চলে, আর জ্ঞানীরা সর্বদা বারো আদিত্যের কথা বলেন।"

বন্দী তেরোর দিকে হাত বাড়াল, শুরুটা ভালোই হল। "চান্দ্র দিনগুলির মধ্যে ত্রয়োদশী বিশেষ পুণ্যময় বলে ধরা হয়। পৃথিবী নাকি জ্ঞানীদের মতে তেরোটি বৃহৎ অঞ্চলে বিভক্ত।"


কিন্তু সেখানেই বন্দীর কণ্ঠ আটকে গেল। সে একটি শ্লোক শুরু করেছিল, কিন্তু আর এগোতে পারল না—শ্লোকের বাকি অর্ধেক তার স্মৃতিতে কিছুতেই ফিরে এল না। সমস্ত সভার সামনে সে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল, শব্দগুলো যেন তার থেকে হারিয়ে গেছে।

অষ্টাবক্র এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। তিনি নিজেই সেই শ্লোক সম্পূর্ণ করলেন, যা বন্দী শেষ করতে পারেনি—"অগ্নি, বায়ু, আর সূর্য, এই তিন দেবতাই তেরো দিনের সেই যজ্ঞে পূজিত হন, আর বেদ অতিচ্ছন্দ নামক ছন্দের কথাও বলে, যা শুরু হয় তেরোটি অক্ষর দিয়ে।"

শ্লোক শেষ হতেই বন্দী মাথা নত করল। তার বলার আর কিছুই ছিল না। অষ্টাবক্রের জ্ঞান সমগ্র বিতর্ক জুড়ে এক মহানদীর প্লাবনের মতো বয়ে গিয়েছিল, আর সমগ্র সভা স্তম্ভিত হয়ে বসেছিল যা তারা প্রত্যক্ষ করল তাতে। উপস্থিত পণ্ডিত ব্রাহ্মণেরা করতালি দিয়ে উঠলেন, একে একে এগিয়ে এসে সেই বালকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে লাগলেন, যে অসাধ্য সাধন করেছে যা তাদের মধ্যে কেউ কখনো সম্ভব বলে ভাবেননি।

তারপর অষ্টাবক্র রাজা জনকের দিকে ফিরলেন, তাঁর হৃদয়ের সেই পুরনো বেদনা আবার তাঁর কথায় ফুটে উঠল। "মহারাজ, এই বন্দী এর আগে বহু বিদ্বান ব্রাহ্মণকে শাস্ত্রার্থে পরাজিত করে প্রত্যেককে জলে ডুবিয়ে মেরেছে। এবার তারই প্রতিদান তার প্রাপ্য।"

বন্দী বিচলিত হল না। শান্ত স্বরে সে উত্তর দিল। "মহারাজ, আমি বরুণদেবের পুত্র, জলের অধীশ্বরের সন্তান। আমার পিতা বারো বছর ধরে এক মহাযজ্ঞ করছেন, আর আমি সেই ব্রাহ্মণদের হত্যা করতে ডোবাইনি—আমি তাঁদের বরুণলোকে পাঠিয়েছিলাম, যাতে তাঁরা সেই পবিত্র যজ্ঞে পিতাকে সহায়তা করতে পারেন। তাঁরা সকলেই এখন অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসবেন। আর ঋষি অষ্টাবক্র সম্পর্কে বলি, আজ তিনি আমার গভীরতম শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন, আর তাঁর এই বিজয়ের মধ্য দিয়েই আমিও শীঘ্র আমার পিতার কাছে ফিরে যাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করব।"

জনক "পূজনীয় ঋষি," তিনি বললেন, "আপনার প্রতিটি কথা আমি শুনেছি, আর এখন আমি জানি, আপনি কোনো সাধারণ বালক নন, আপনি এক দিব্যস্পর্শ পাওয়া সত্তা। আপনি এই মহান জ্ঞানযুদ্ধে বন্দীকে ন্যায্যভাবে ও সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করেছেন। আমি এখন আপনার ইচ্ছানুসারেই রায় দেব।"

অষ্টাবক্র এবার গর্জে উঠলেন, "বন্দী! তুমি আমার পিতাকে অন্যায় নিয়মে জলে ডুবিয়েছ। এবার বলো, আমার পিতা কোথায়? নইলে তোমার দণ্ড অবধারিত।"

পরাজিত বন্দী তখন হাত জোড় করে সত্য প্রকাশ করলেন। বললেন, "আমি বরুণ দেবের পুত্র। আমার পিতা সমুদ্রের তলে এক মহাযজ্ঞ করছেন, তার জন্যই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের আমি কৌশলে জলপথ দিয়ে বরুণালয়ে পাঠিয়েছিলাম। আপনার পিতা কহোড় মরেননি, তিনি সেখানে জীবিত ও সসম্মানে আছেন।"

বন্দীর মন্ত্রবলে মুহূর্তের মধ্যে জল থেকে উঠে এলেন কহোড়সহ সমস্ত হারিয়ে যাওয়া ব্রাহ্মণরা। পিতা ও পুত্রের মিলন হলো যজ্ঞসভায়। গর্ভে যে সন্তানকে অভিশাপ দিয়েছিলেন, তার এই অসামান্য পাণ্ডিত্য দেখে কহোড়ের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

আশ্রমের পথে ফেরার সময় কহোড় পুত্রকে বললেন, "বৎস, এই সামনের সমঙ্গা নদীতে একবার স্নান করো।"

অষ্টাবক্র যেমনই সেই পবিত্র নদীর জলে ডুব দিলেন, অলৌকিক উপায়ে তাঁর শরীরের আটটি বাঁক মিলিয়ে গেল। জল থেকে যখন তিনি উঠে এলেন, তখন তিনি এক পরম সুপুরুষ, সোজা এবং দীপ্তিময় যুবক। পিতার ক্ষোভের জল যেমন ধুয়ে গেল, তেমনি মুছে গেল শরীরের অভিশাপও।

গল্প শেষ করে লোমশ ঋষি যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকালেন। অরণ্যের বাতাস তখন সমঙ্গা নদীর পবিত্র জলকণা বয়ে নিয়ে আসছে। ঋষি বললেন, "রাজন! এই সেই পুণ্যতোয়া সমঙ্গা নদী, যেখানে স্নান করলে মানুষ সব পাপ থেকে মুক্ত হয়। তুমি তোমার ভাইদের আর দ্রৌপদীকে নিয়ে এই জলেই স্নান সম্পন্ন করো।"


বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ২৯তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।


বনপর্বের ২৮তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।


সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 


সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page) 


আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া