৫১তম বনপর্ব-অরণ্যের দুই নারী: মন্ত্র নয়, সেবারই এক গোপন উপাখ্যান


৫১তম বনপর্ব-অরণ্যের দুই নারী: মন্ত্র নয়, সেবারই এক গোপন উপাখ্যান

বনের ছায়া তখন দীর্ঘ হয়ে আসছিল। ঠিক যেমন করে অপস্রিয়মাণ বিকেলের আলো কোনো প্রাচীন লিপির ওপর এসে পড়ে। আশ্রমের সামনের রুক্ষ, ধূসর চত্বরটায় পাণ্ডবেরা বসেছিলেন ব্রাহ্মণদের মুখোমুখি। কারও আঙুলে কুশের ঘ্রাণ, কারও ওষ্ঠে প্রচ্ছন্ন বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ। কিন্তু সেই স্তব্ধ, নিভৃত সন্ধ্যার আলোয় একটু দূরে সরে বসেছিলেন দুই নারী—দ্রৌপদী আর সত্যভামা। বহু কাল পর দেখা। কুরুকুল আর যদুকুলের ভাঙা-গড়ার কত যে গল্প, কত অলিখিত আত্মীয়তার সুতো, একে একে সব জোড়া লাগছিল স্মৃতির সরণি বেয়ে।

হঠাৎই সত্যভামা একটু ঝুঁকে এলেন। গলাটা নামিয়ে আনলেন ফিসফিসে স্বরে, যেমন করে গোপন কৌতুহলে বান্ধবীরা পরস্পরের চোখের দিকে তাকায়।

“ভগ্নী কৃষ্ণা, একটা কথা বলবে? তোমার স্বামীরা প্রত্যেকে লোকপালের মতো তেজস্বী, অথচ কখনো তোমার প্রতি তাঁদের রুষ্ট হতে দেখি না। কী আশ্চর্য এক জাদু তোমার! কোনো ব্রত, কোনো গোপন ওষধি বা বশীকরণ মন্ত্র জানা আছে কি, যা দিয়ে পুরুষের এই উদ্ধত মনকে এমন দাস বানিয়ে রাখা যায়? আমাকেও শিখিয়ে দাও না বোন, যাতে আমার শ্যামসুন্দরও চিরকাল আমারই অনুগত থাকেন।”

দ্রৌপদীর মুখে এক লহমায় নেমে এলো গভীর, জমাট বাঁধা গাম্ভীর্য। যে বিষাদ আর আত্মমর্যাদা শত অপমানেও ম্লান হয়নি, তা তাঁর দু-চোখে ফুটে উঠল। তিনি সোজাসুজি তাকালেন সত্যভামার দিকে, কণ্ঠে কোনো দ্বিধা নেই।

“সত্যভামা, তুমি তো যদুপতির পাটরানি, এক বুদ্ধিমতী নারী। অথচ আমাকে প্রশ্ন করছ কুলটা, দুরাচারিণীদের মতো? ওসব মন্ত্র-তন্ত্রের ছলচাতুরি আমি জানি না, আর তোমার মতো নারীর তা জানা উচিতও নয়। স্বামী যখনই টের পান যে স্ত্রী তাঁকে বশ করতে ওষধি বা মন্ত্রের আশ্রয় নিচ্ছেন, তখনই তাঁর মন বিষিয়ে ওঠে, তিনি দূরে সরে যান। যেখানে সংশয়, সেখানে শান্তি কোথায়? আর শান্তি না থাকলে সুখ আসে কী করে? তা ছাড়া এইসব মন্ত্রের নামে কত অনিষ্টকর জারিত বস্তু পুরুষকে খাওয়ানো হয়, শত্রুরা সেই সুযোগে বিষও মিশিয়ে দিতে পারে। এতে স্বামীর শরীর-মন দুই-ই পঙ্গু হয়। কোনো সাধ্বী নারী কি তা করতে পারে?”

একটু থামলেন দ্রৌপদী। যেন তাঁর যাজ্ঞসেনী জীবনের বহু রক্তাক্ত, ধূসর পাতা উল্টে দেখছেন স্মৃতির নির্জনে। তারপর ধীর অথচ স্পষ্ট স্বরে বললেন, “আমি পাণ্ডবদের সঙ্গে কীভাবে চলি, তবে শোনো। অহংকার, কাম, ক্রোধ—এইসব রিপুকে একপাশে সরিয়ে রেখে আমি সর্বদা সতর্ক থাকি। কেবল স্বামীদের নয়, তাঁদের অন্য স্ত্রীদেরও আমি সমাদরে সেবা করি। ঈর্ষাকে মনে একটুও ঠাঁই দিই না।

 নিজের খেয়াল-খুশি বিসর্জন দিয়ে কেবল সেবার মনোভাব নিয়ে তাঁদের প্রিয় কাজগুলো করি। কড়া কথা বলি না, অভদ্রতাকে প্রশ্রয় দিই না, কোনো কুৎসিত কথা কানে তুলি না। দেবতা, গন্ধর্ব বা কোনো রূপবান বিত্তশালী যুবক—কেউ আমার মন টলাতে পারে না, আমার চিত্ত কেবল পাণ্ডবদের চরণে স্থির। স্বামীরা না খেলে আমি অন্ন গ্রহণ করি না, তাঁরা স্নান না করলে জল স্পর্শ করি না, তাঁরা আসন না নিলে আমি বসি না। তাঁরা ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরলে আমি নিজে উঠে দাঁড়িয়ে আসন এগিয়ে দিই, চরণের জল দিই। ঘর-দোর নিজের হাতে পরিষ্কার রাখি, তাঁদের পছন্দের অম্ল-ব্যঞ্জন ঠিক সময়ে রেঁধে দিই। আলস্য আমার ধাতে নেই। কোনো দুষ্ট নারীর সঙ্গ করি না, দরজায় দাঁড়িয়ে পরপুরুষের দিকে তাকাই না। স্বামীরা যখন পরবাসে যান, আমি সমস্ত অলঙ্কার, ফুল-চন্দন ত্যাগ করে ব্রত পালন করি। তাঁরা যা অপছন্দ করেন, আমিও তা এড়িয়ে চলি।”

দ্রৌপদীর গলায় তখন এক তীব্র শাসন আর ক্লান্ত সততার সুর মিশে গেছে। তিনি বলতে লাগলেন, “শাশুড়ি কুন্তী কুটুম্বদের প্রতি যে ধর্মের কথা বলে দিয়েছেন, তার এক চুলও আমি নড়ি না। অতিথি সেবা, ব্রাহ্মণ ভোজন, শ্রাদ্ধ-উৎসবে রান্না—সবই আমি নিজের দায়িত্বে অতি সাবধানে করি। স্বামীদের সামনে কখনো স্পর্ধা দেখাই না, তাঁদের চেয়ে ভালো পোশাক পরি না। প্রতিদিন তাঁদের আগেই শয্যা ত্যাগ করি। আর আজ এই বনের দীনতা দেখছ সত্যভামা? ইন্দ্রপ্রস্থে যখন যুধিষ্ঠির রাজত্ব করতেন, তখন সোনার থালায় আট হাজার ব্রাহ্মণ ভোজন করতেন, আশি হাজার স্নাতক অন্ন পেতেন। এক লক্ষ ঘোড়া আর এক লক্ষ হাতির দেখাশোনার ভার ছিল আমার ওপর। রাজকোষের আয়-ব্যয়, রত্নভাণ্ডারের গোপন খবর—সব আমি একা রাখতাম। ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলে দিন-রাত এক করে খাটতাম। স্বামীর মন জয় করার এর চেয়ে বড় কোনো ওষধি আমার জানা নেই। দুষ্টা নারীর আচরণ আমি কোনোদিন করিনি, করতেও চাই না।”

পাঞ্চালীর এই জ্বলন্ত সত্যের সামনে সত্যভামা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। নিজের ভুল বুঝতে পেরে লজ্জিত মুখে হাত জোড় করে বললেন, “কৃষ্ণা, আমাকে ক্ষমা করো। সখীরা তো হাসতে হাসতে কত কথাই বলে ফেলে, তুমি অন্যভাবে নিও না।”

দ্রৌপদীর ঠোঁটের কোণে তখন ফুটল এক টুকরো বিষণ্ন, স্নেহমাখা হাসি। “সত্যভামা, তোমাকে স্বামীর মন জয় করার নির্দোষ পথটাই বলে দিলাম। জগৎ আর পরজগতে নারীর স্বামী ছাড়া আর কোনো গতি নেই। মনে রেখো, সস্তা সুখ দিয়ে হৃদয় পাওয়া যায় না, ত্যাগ আর দুঃখের পথেই পরম সুখ মেলে। তাই পরম যত্নে, স্নেহে শ্রীকৃষ্ণের সেবা করো। তিনি দূর থেকে ঘরে ফিরছেন শুনলেই দরজায় গিয়ে দাঁড়াবে, নিজে তাঁর পা ধোবার জল দেবে। স্বামী কোনো কথা গোপন রাখতে বললে, তা যদি সাধারণ কথাও হয়, অন্য কারও কাছে প্রকাশ করবে না। তাঁর বন্ধুদের সমাদর করবে, শত্রুদের থেকে দূরে থাকবে। প্রদ্যুম্ন বা শাম্ব—তোমার নিজের ছেলে হলেও, তাদের সঙ্গেও নির্জনে বেশি সময় কাটাবে না। সতী ও কুলীন নারীদের সঙ্গ করবে, চঞ্চলা বা নিষ্ঠুর নারীদের নয়। এভাবেই তোমার ভাগ্য আর যশ বৃদ্ধি পাবে।”

ততক্ষণে আশ্রমের প্রাঙ্গণে রথ প্রস্তুত। শ্রীকৃষ্ণ ঋষি মার্কণ্ডেয় ও পাণ্ডবদের সঙ্গে আলোচনা শেষ করে দ্বারকায় ফেরার জন্য পা বাড়িয়েছেন। রথে ওঠার আগে তিনি সত্যভামাকে ডেকে নিলেন।

বিদায়বেলায় সত্যভামা দ্রৌপদীকে নিবিড় আবেগে জড়িয়ে ধরলেন। আর্দ্র কণ্ঠে বললেন, “কৃষ্ণা, তুমি দুশ্চিন্তা কোরো না, রাত জেগে আর চোখের জল ফেলো না। তোমার এই দেবতাদের মতো স্বামীরা একদিন ঠিক নিজেদের রাজ্য ফিরে পাবেন। তোমার মতো তেজস্বিনী নারী বেশিদিন দুঃখ বইতে পারে না। দুর্যোধনকে বধ করে যুধিষ্ঠির আবার পৃথিবী শাসন করবেন। আর শোনো, দ্বারকায় তোমার পাঁচ ছেলে—প্রতিবিন্ধ্য, সুতসোম, শ্রুতকর্মা, শতানীক আর শ্রুতসেন—একদম আনন্দে আছে। সুভদ্রা আর রুক্মিণী তাদের নিজের সন্তানের মতোই স্নেহে আগলে রেখেছেন। কৃষ্ণ নিজে তাদের ভালোবাসেন, বলরাম আর যদুবংশের বীরেরা তাদের যুদ্ধবিদ্যা শেখাচ্ছেন। তুমি ছেলেদের নিয়ে কোনো চিন্তা কোরো না।”

এই আশ্বাসের কথা কটি বলে সত্যভামা দ্রৌপদীকে প্রদক্ষিণ করলেন, তারপর উঠে বসলেন শ্রীকৃষ্ণের রথে। কৃষ্ণ একবার মুখ ফেরালেন। তাঁর চিলতে মৃদু হাসিতে আর শান্ত সান্ত্বনার দৃষ্টিতে যেন দ্রৌপদীর সব গ্লানি মুছে গেল। রথ ছুটে চলল দ্বারকার অভিমুখে, বনের ধুলো উড়িয়ে, সন্ধ্যার শেষ আলোটুকু মেখে। পর্ণকুটিরের দ্বারে একা দাঁড়িয়ে রইলেন সাম্রাজ্ঞী দ্রৌপদী।

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের   ৫১তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বনপর্বের ৫০তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ