২৮তম বনপর্ব-রক্তমাংসের দাঁড়িপাল্লা: রাজা উশীনর ও ধর্মের চরম পরীক্ষা
২৮তম বনপর্ব-রক্তমাংসের দাঁড়িপাল্লা: রাজা উশীনর ও ধর্মের চরম পরীক্ষা
লোমশ ঋষি পাণ্ডবদের সঙ্গে নিয়ে হেঁটে চলেছেন। চারপাশের পবিত্র ভূমি হাত দিয়ে দেখিয়ে তিনি বললেন, "হে রাজন, এই দেখো বিনাশন। এখানেই মহিমান্বিতা নদী সরস্বতী আকস্মিক অন্তর্হিত হয়েছেন। নিযাদদের স্পর্শ থেকে নিজেকে বাঁচাতে নদী এখানে পাতালপ্রবেশ করেন। আবার কিছুটা দূরে চমসোদ্ভেদ নামক স্থানে তিনি পুনরায় মর্ত্যে জেগে উঠেছেন সাগরের পানে ছুটে যাওয়ার জন্য।"এখানেই একদিন লোপামুদ্রার সঙ্গে অগস্ত্য মুনির মোলাকাত হয়েছিল, তারপর তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই পবিত্র ভূমিতেই আজও বিরাজ করছে পুণ্যতীর্থ বিষ্ণুপদ, আর পাশ দিয়েই কুলকুল রবে বয়ে চলেছে পবিত্র নদী বিপাশা।
লোপামুদ্রার সঙ্গে অগস্ত্য মুনির কাহিনী ঝালিয়ে নিতে এখানেই ক্লিক করুন।
ঋষি একে একে সিন্ধুতীর, বিষ্ণুপদ আর কাশ্মীর মণ্ডলের পুণ্যতীর্থগুলির কথা বলতে বলতে এগিয়ে চললেন। যমুনার কোল ঘেঁষে বয়ে চলা বিতস্তা নদীর তীরে এসে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে তখন এক সুদূর অতীত ভেসে উঠেছে। তিনি যুধিষ্ঠিরকে বললেন—
"এই বিতস্তার তীরেই রাজা উশীনর এমন এক যজ্ঞ করেছিলেন, যার মহিমা দেবরাজ ইন্দ্রকেও ঈর্ষান্বিত করেছিল। এখানেই ইন্দ্র আর অগ্নি এসেছিলেন রাজার ধার্মিকতার পরীক্ষা নিতে। ইন্দ্র রূপ নিলেন এক হিংস্র শ্যেন বা বাজের, আর অগ্নি সাজলেন এক নিরীহ কপোত।"
গল্পটা তবে শোনো।
রাজা উশীনরের রাজ্যে শান্তি আর সত্যের কোনো অভাব ছিল না। তাঁর পুণ্যগাথা মর্ত্য পেরিয়ে স্বর্গের দেবতাদের সভাতেও আলোচিত হতো। কোনো মরণশীল মানুষ কি সত্যিই নিজের চরম ক্ষতি স্বীকার করেও ধর্মে অটল থাকতে পারে? দেবরাজ ইন্দ্র আর অগ্নিদেব চাইলেন সেই সত্যেরই মুখোমুখি হতে।
হঠাৎ একদিন এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল। আকাশের বুক চিরে একটা কালান্তক বাজপাখি তাড়া করেছে এক চিলতে সাদা পায়রাকে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে, প্রায় শেষ নিশ্বাসটুকু নিয়ে সেই পায়রাটি আকাশ থেকে সোজা এসে পড়ল উশীনরের রাজসভায়, খোদ রাজার কোলে। সে যেন এক পরম আশ্রয়ের খোঁজে বুকভাঙ্গা আর্তনাদ করে উঠল, "মহারাজ! আমাকে বাঁচান। ওই শ্যেন আমাকে ছিঁড়ে খেতে আসছে। শরণাগতের আর্তনাদ কি উশীনরের দরবারে ব্যর্থ হবে?"
উশীনরের হৃদয় মমতায় আর্দ্র হলো। তিনি আলতো করে পাখিটিকে ছুঁয়ে বললেন, "ভয় নেই ছোট প্রাণ। আমি বেঁচে থাকতে তোমার গায়ে কেউ আঁচড় কাটতে পারবে না।"
ঠিক তখনই ডানা ঝাপটে সেখানে এসে বসল সেই হিংস্র বাজপাখি। তার চোখে তীক্ষ্ণ চাতুর্য। মানুষের গলায় সে তীব্র ক্ষোভের সাথে বলল, "রাজন, দুর্বলকে রক্ষা করা ভালো কাজ, সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার ন্যায়ের কথাটাও ভাবুন। এই কপোত আমার বিধিনির্ধারিত খাদ্য। আমরা বাজপাখিরা তো ফলমূল বা শস্য খেয়ে বাঁচি না। আপনি একে আটকে রেখে আমাকে অনাহারে মারতে চান? একটা প্রাণ বাঁচাতে অন্য একটা প্রাণকে ক্ষুধার আগুনে পুড়িয়ে মারা কি আদেও ধর্ম?"
রাজা উশীনর সংকটে পড়লেন। বাজের যুক্তি অকাট্য। তিনি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, "তোমার কথা সত্য, পক্ষীরাজ। আমি তোমাকে ক্ষুধার্ত রাখতে চাই না। এই কপোতের বদলে তুমি আমার রাজ্যের যেকোনো পশুর তাজা মাংস চেয়ে নাও, আমি দেব।"
বাজপাখিটি মাথা নেড়ে বলল, "অন্য কোনো মাংস নয় মহারাজ। আমি নিজে শিকার করা পাখির গরম মাংসই খাই। যদি আপনার দয়া এতই অগাধ হয়, তবে এই কপোতের শরীরের ওজনের ঠিক সমপরিমাণ মাংস আপনার নিজের দেহ থেকে কেটে আমাকে দিন। তবেই আমার ক্ষিধে মিটবে।"
এক মুহূর্তও দ্বিধা করলেন না উশীনর। রাজসভার মাঝখানে আনা হলো তুলাদণ্ড। একদিকে বসানো হলো সেই ছোট্ট কপোতটিকে। রাজা নিজের হাতে ধারালো ছুরি তুলে নিলেন। নিজের উরু থেকে, হাত থেকে, পাঁজর থেকে মাংস কেটে কেটে দাঁড়িপাল্লার অন্য প্রান্তে চাপাতে লাগলেন।
কিন্তু এ কী অলৌকিক কাণ্ড! রাজা যত মাংসই দিচ্ছেন, পায়রার দিকটাই ভারী হয়ে থাকছে। উশীনরের শরীর ক্ষতবিক্ষত, রক্তের ধারায় রাজসভার মেঝে ভেসে যাচ্ছে, চেতনার আলো ক্রমশ আবছা হয়ে আসছে—তবুও সেই এক রত্তি পাখির ওজন কিছুতেই সমান হচ্ছে না।
অবশেষে ক্ষতবিক্ষত উশীনর বুঝতে পারলেন, আংশিক ত্যাগে এই পরীক্ষার শেষ হবে না। সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে তিনি নিজেই উঠে বসলেন দাঁড়িপাল্লার সেই মাংসের পাত্রে। নিজের গোটা অস্তিত্বকেই সঁপে দিলেন ওই কপোতের বিনিময়ে।
ঠিক সেই মুহূর্তে রাজসভা এক স্বর্গীয় আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। শ্যেন আর কপোত অদৃশ্য হয়ে সেখানে আবির্ভূত হলেন স্বয়ং ইন্দ্র আর অগ্নিদেব। তাঁদের চোখে তখন রাজার প্রতি সীমাহীন শ্রদ্ধা।
ইন্দ্র মৃদু হেসে বললেন, "উঠে দাঁড়াও, হে মহৎ রাজন। তুমি প্রমাণ করেছ যে মর্ত্যের মানুষের করুণা আর ধর্মের সীমানা কতখানি অসীম হতে পারে। একটি সামান্য পাখির আশ্রয়ের জন্য তুমি নিজের জীবন দিতেও কুণ্ঠিত হওনি। যতদিন এই পৃথিবী থাকবে, তোমার এই পরম ত্যাগের কথা মানুষ স্মরণ করবে। একশত অশ্বমেধ যজ্ঞ করেও যে পুণ্য অর্জন করা যায় না, আজ তুমি তা লাভ করলে।"
লোমশ ঋষি থামলেন। বিতস্তা নদীর জল তখনো এক উদাসীন ছন্দে বয়ে চলেছে। যুধিষ্ঠির ও তাঁর ভাইয়েরা দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। মানুষের ভেতরের এই যে সীমাহীন করুণা আর ধর্মের অহংকারহীন রূপ—তাঁদের মনকে এক পরম শান্তিতে ভরিয়ে দিল। তারপর এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাঁরা আবার ঋষির পিছু পিছু এগিয়ে চললেন আগামীর পথে।
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ২৮তম ভাগের আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
বনপর্বের ২৭তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment