৩৮তম বন পর্ব-অর্জুনের স্বর্গ-প্রত্যাবর্তন
৩৮তম বন পর্ব-অর্জুনের স্বর্গ-প্রত্যাবর্তন: পাশুপত অস্ত্রলাভের রোমাঞ্চকর উপাখ্যান
দেবরাজ ইন্দ্রের সেই দীপ্তিময় সুবর্ণ রথ যখন গন্ধমাদন পর্বতের সেই নির্জন, তুষারশুভ্র শিখরে এসে থামল, তখন চারপাশ যেন এক অলৌকিক নিস্তব্ধতায় ভরে গেল। মহাবীর অর্জুন রথ থেকে অবতীর্ণ হলেন— সে এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য, যেন নীল মেঘের কোল চিরে এক ঝলক তীব্র বিদ্যুৎ নেমে এল ধরিত্রীর বুকে। তাঁর অবয়বে দেবলোকের অমিত তেজ, চোখে জয়ের প্রশান্তি। ভূমিতে পা রেখেই তিনি প্রথম প্রণতি জানালেন কুলপুরোহিত ধৌম্যকে। তারপর পরম ভক্তিতে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মহারাজ যুধিষ্ঠির এবং মহাবলী ভীমসেনের চরণ স্পর্শ করলেন। নকুল ও সহদেব পরম সমাদরে এগিয়ে এসে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে অভিবাদন জানালেন। প্রিয়তমা কৃষ্ণার সঙ্গে সেই বহুপ্রতীক্ষিত ক্ষণিক নীরব সাক্ষাতের পর, অর্জুন অত্যন্ত বিনম্র ভঙ্গিতে জ্যেষ্ঠতাত যুধিষ্ঠিরের পাশে এসে দাঁড়ালেন, যেন সেই মহাশক্তিশালী বীর এক পরম বাধ্য অনুজ মাত্র।
অতুলনীয় প্রভাবশালী ও দেবতাপ্রতিম অর্জুনকে সুদীর্ঘকাল পর অক্ষত শরীরে ফিরে পেয়ে পাণ্ডবদের হৃদয় আনন্দের উদ্বেল তরঙ্গে উপচে পড়ল। অর্জুনও তাঁর প্রিয় ভ্রাতাদের ও কৃষ্ণাকে দেখে অন্তরে গভীর পুলক অনুভব করলেন; জ্যেষ্ঠের অবিচল ধর্মনিষ্ঠা ও স্নেহের প্রশংসায় তাঁর মুখ বারবার মুখরিত হয়ে উঠল। অতলান্ত শ্রদ্ধায় তাঁরা সকলে মিলে ইন্দ্রের সেই অলৌকিক, দিব্য রথটি প্রদক্ষিণ করলেন। দেবরাজের সারথি মাতলিকে তাঁরা স্বয়ং ইন্দ্রের ন্যায় পরম সম্মানে আপ্যায়ন করলেন এবং তাঁরই মুখে শ্রবণ করলেন দেবলোকের কুশল-সংবাদ। বিদায়বেলায় মাতলি কোনো পরম হিতৈষী পিতার ন্যায় স্নেহভরে পাণ্ডবদের মঙ্গলাশীর্বাদ ও অভিনন্দন জানিয়ে, সেই রথে চড়েই পুনরায় অমরাবতীর উদ্দেশ্যে শূন্যে মিলিয়ে গেলেন।
মাতলি দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ার পর, অর্জুন দেবরাজ প্রদত্ত সেই অলৌকিক, অতি সুদৃশ্য ও বহুমূল্য অলংকারসমূহ সযত্নে যাজ্ঞসেনী দ্রৌপদীর হস্তে তুলে দিলেন। তারপর মধ্যাহ্নের সূর্য ও যজ্ঞের অগ্নির মতো তেজোদীপ্ত পাণ্ডবগণ এবং সমবেত তপস্বী ব্রাহ্মণদের মাঝখানে উপবেশন করে অর্জুন তাঁর সেই রোমাঞ্চকর অভিযানের বৃত্তান্ত বর্ণনা করতে লাগলেন। তিনি বললেন, “হে আর্য, আমি এভাবেই কঠোর নিয়ম পালন করে দেবরাজ ইন্দ্র, পবনদেব এবং স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেবের কাছ থেকে দিব্য অস্ত্রসমূহ লাভ করেছি। আমার তপস্যা ও আচরণে দেবরাজ এবং সমস্ত স্বর্গীয় দেবগণ পরম সন্তুষ্ট হয়েছিলেন।” শুদ্ধকর্মা সব্যসাচী এভাবেই সংক্ষেপে তাঁর সেই সুদীর্ঘ স্বর্গবাসের বিচিত্র কাহিনি শোনালেন। নিবিড় রাত্রি নেমে এলে, এক পরম তৃপ্তির আনন্দে তিনি অনুজ নকুল ও সহদেবের পাশে শয়ন করলেন। রাত্রি প্রভাত হলে, পুনরায় ভ্রাতাদের সঙ্গে নিয়ে ধর্মরাজের সমীপে উপস্থিত হয়ে তাঁকে প্রণাম জানালেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে, আকাশমণ্ডল আলোড়িত করে দেবরাজ ইন্দ্র স্বয়ং তাঁর সুবর্ণমণ্ডিত, রত্নখচিত রথে আরোহণ করে সেই পর্বতের শিখরে এসে উপস্থিত হলেন। পাণ্ডবেরা সেই দেবজ্যোতি দেখামাত্র দ্রুত এগিয়ে গেলেন এবং অত্যন্ত বিনম্রভাবে দেবরাজকে তাঁদের পরম শ্রদ্ধা ও স্বাগত সম্মান নিবেদন করলেন। পরম তেজস্বী অর্জুনও দেবরাজকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানিয়ে এক বিনীত সেবকের মতো তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। উদারচিত্ত ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির স্বয়ং ইন্দ্রের এই আকস্মিক আগমনে অত্যন্ত আনন্দিত ও আপ্লুত হলেন। দেবরাজ মৃদু হেসে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, “হে পাণ্ডুপুত্র! তুমি সর্বপ্রকার সংশয় ত্যাগ করে নিশ্চিন্ত হও, ক্ষাত্রধর্মের বলে তুমিই এই অখণ্ড পৃথিবী শাসন করবে। এবার তোমাদের এই পর্বত ত্যাগ করে কাম্যক বনে ফিরে যাওয়ার সময় এসেছে। অর্জুন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও কঠোর ব্রহ্মচর্যের মাধ্যমে আমার সমস্ত দিব্য অস্ত্র আয়ত্ত করেছে। সে আমার অত্যন্ত প্রিয়পাত্র— এখন এই ত্রিলোকের মধ্যে এমন কোনো শক্তি নেই, যে তাকে সমরে পরাস্ত করতে পারে।” এই অমোঘ বাণী উচ্চারণ করে ইন্দ্র পুনরায় স্বর্গে আরোহণ করলেন।
ইন্দ্রের রথ মেঘের আড়ালে বিলীন হলে, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের কণ্ঠ আবেগে রুদ্ধ হয়ে এল। তিনি গভীর কৌতূহল ও বিস্ময়ে অর্জুনকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করলেন, “প্রিয় অনুজ! তুমি সেই দুর্লভ দেবরাজের দর্শন কীভাবে পেলে? স্বয়ং ভগবান শংকরের সঙ্গেই বা তোমার সাক্ষাৎ কেমন করে ঘটল? সেই সংহারক ও রক্ষক অস্ত্রবিদ্যা কীভাবে আয়ত্ত করলে? মহাদেবের আরাধনাই বা তুমি কী উপায়ে সাধন করেছিলে? স্বয়ং ইন্দ্রদেব বললেন যে অর্জুন তাঁর অত্যন্ত প্রিয় কাজ সম্পাদন করেছে— তুমি তাঁর কোন প্রিয় কাজ করেছ, সেই সমস্ত অলৌকিক ঘটনা বিস্তারিতভাবে আমার কাছে ব্যক্ত করো।”
অর্জুন তখন করযুক্তকরে ধীর ও গম্ভীর কণ্ঠে বলতে শুরু করলে
“মহারাজ, তবে শ্রবণ করুন, কীরূপে হিমালয়ের সেই গহন কন্দরে আমার ইন্দ্র ও মহাদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটেছিল। যাত্রাকালে আপনি আমাকে যে গুহ্য পরম বিদ্যা দান করেছিলেন, তারই অমোঘ বলে এবং আপনারই আদেশে তপস্যার উদ্দেশ্যে আমি বনে গমন করেছিলাম। কাম্যক বন থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে প্রথমে আমি ভৃগুতুঙ্গ পর্বতে পৌঁছাই এবং সেখানে ঘোর তপস্যা শুরু করি, কিন্তু উচ্চতর নির্দেশের কারণে সেখানে মাত্র এক রাত্রিই অতিবাহিত করি। তারপর মহাতীর্থ হিমালয়ের এক দুর্গম শিখরে গিয়ে মহাশক্তিশালী ব্রতে রত হই।
প্রথম মাসে আমি কেবল বনের কন্দ ও পক্ক ফলমূল আহার করে শরীর ধারণ করলাম। দ্বিতীয় মাসে কেবল জল পান করে রইলাম। তৃতীয় মাসে সম্পূর্ণ নিরাহারে, বায়ুভুক হয়ে কাল কাটালাম। আর চতুর্থ মাসে দুই হাত ঊর্ধ্বমুখী করে, এক পায়ে ভর দিয়ে অহর্নিহ দাঁড়িয়ে রইলাম। আশ্চর্যের বিষয় মহারাজ, এই তীব্র ও অমানুষিক কষ্টেও আপনার পুণ্যবলে আমার প্রাণবিয়োগ হলো না।
পঞ্চম মাসে পদার্পণ করতেই একদিন এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। এক বিশাল, ভয়ংকর বন্য শূকর ইতস্তত ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ আমার সামনে এসে দাঁড়াল এবং আমাকে আক্রমণ করতে উদ্যত হলো। ঠিক তার পিছু পিছুই আবির্ভূত হলেন এক কিরাতবেশী পুরুষ— তাঁর হাতে প্রকাণ্ড ধনুর্বাণ, কটিদেশে তীক্ষ্ণ তরবারি এবং সঙ্গে কয়েকজন অচেনা নারী। আত্মরক্ষার্থে আমি তখনই আমার গাণ্ডীভে বাণ যুক্ত করে সেই মায়াবী শূকরটিকে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করলাম এবং তাকে বধ করলাম। ঠিক সেই মুহূর্তেই সেই বিশালকায় ভীলও তার প্রকাণ্ড ধনুক থেকে এক তীব্র বাণ ছুঁড়ল— সেই বাণের গর্জনে আমার অন্তরেও ক্ষণিকের জন্য কম্পন জেগেছিল। তারপর সে ক্রুদ্ধস্বরে বলল, ‘এই শূকরটিকে আমিই প্রথম লক্ষ্য করেছিলাম, তুমি শিকারের নিয়ম উপেক্ষা করে একে বধ করলে কেন? সাবধান তপস্বী, এই ধারালো বাণে আমি এখনই তোমার সমস্ত দর্প চূর্ণ করে দেব।’
“এই কথা বলেই সেই পর্বতপ্রমাণ বিরাটকায় ভীল স্থির দাঁড়িয়ে মেঘের মতো বাণবর্ষণ করে আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। আমিও ক্ষাত্রতেজে উদ্দীপ্ত হয়ে পাল্টা বাণে তাকে ঢেকে দিলাম। তখন হঠাৎ এক অলৌকিক মায়ায় তার শত-সহস্র মূর্তি চারিদিকে প্রকট হতে লাগল; আমি বিভ্রান্ত না হয়ে সেই সমস্ত মূর্তির ওপরেই অবিরাম বাণবর্ষণ করতে থাকলাম। পরে সেই সব মায়ামূর্তি সংহত হয়ে পুনরায় একরূপে ফিরে এলে আমি তাকেও তীক্ষ্ণ বাণে বিদ্ধ করলাম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত বাণবর্ষণেও যখন সেই পুরুষ সামান্যতম ক্ষয়প্রাপ্ত বা পরাজিত হলো না, তখন আমি আমার পরম শক্তিশালী বায়ব্যাস্ত্র নিক্ষেপ করলাম। কিন্তু সেই মহাশক্তিও তার গায়ে লেগে ব্যর্থ হয়ে গেল— বায়ব্যাস্ত্র নিষ্ফল হতে দেখে আমি স্তম্ভিত ও বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম।
এরপর আমি ক্রমান্বয়ে স্থূণাকর্ণ, বারুণাস্ত্র, শরবর্ষাস্ত্র, শালভাস্ত্র ও অশ্মবর্ষাস্ত্র নিক্ষেপ করলাম, কিন্তু সেই অদ্ভুত ভীল এক হাসিতে সে-সবই ধূলিসাৎ করে দিল। আমার সমস্ত প্রধান অস্ত্র ব্যর্থ হলে শেষে আমি পরম দাহক ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করলাম— প্রলয়াগ্নির মতো সেই বাণের আগুনে চারিদিক আচ্ছন্ন হয়ে গেল। কিন্তু সেই মহাতেজস্বী কিরাত এক মুহূর্তের মধ্যে সেই দিব্য অগ্নি সম্পূর্ণ নির্বাপিত করে দিল। ব্রহ্মাস্ত্রকে এভাবে ব্যর্থ হতে দেখে আমার মনে প্রথম বারের মতো গভীর ভয়ের সঞ্চার হলো।”
“তখন আমি ধনুক ও অক্ষয় তূণীরদ্বয় হাতে নিয়ে স্বয়ং মল্লযুদ্ধের ন্যায় তাকে আঘাত করতে গেলাম, কিন্তু তাতেও কোনো ফল হলো না। এইভাবে যখন আমার সমস্ত অস্ত্র ও বাহুবল ব্যর্থ হলো, তখন আমরা দুজনে চরম বাহুযুদ্ধে প্রবৃত্ত হলাম। কিন্তু সেই পর্বতের মতো অটল পুরুষের বিরুদ্ধে বহু চেষ্টা করেও আমি সমকক্ষ হতে পারলাম না; তীব্র আঘাতে আমি হতচেতন ও সংজ্ঞাহীন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম। তখন সে এক রহস্যময় হাসি হেসে সেই নারীদের সঙ্গে শূন্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি তখন সম্পূর্ণ হতভম্ব ও অবসন্ন হয়ে মাটিতে পড়ে রইলাম।”
“কিন্তু এই সমস্তই ছিল এক পরম লীলা। কিয়ৎক্ষণ পরেই দেবাদিদেব মহাদেব তাঁর আদিম কিরাতবেশ ত্যাগ করে— হস্তে পিনাক ধনুক এবং পাশে জগৎজননী দেবী পার্বতীকে নিয়ে আমার সম্মুখে দিব্য জ্যোতিতে আবির্ভূত হলেন। আমি তখনও পূর্বের ক্ষত ভুলে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। কিন্তু তিনি পরম মমতায় কাছে এসে বললেন, ‘হে কুন্তীনন্দন, আমি তোমার এই অদম্য বীরত্ব ও তপস্যায় পরম প্রসন্ন হয়েছি।’ তারপর তিনি আমার হৃত ধনুক ও তূণীর সসম্মানে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘হে বীর, এগুলি গ্রহণ করো। বলো, তোমার জন্য আমি কী করব? তোমার মনে যা অভিলাষ আছে, নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করো। অমরত্ব ব্যতীত তোমার সমস্ত কামনাই আজ আমি পূর্ণ করব।’ আমার মনে তখন কেবলই আসন্ন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ও পাণ্ডবদের অপমানের চিন্তা— তাই হাত জোড় করে প্রণাম জানিয়ে বললাম, ‘হে ভগবান ত্রিলোচন, আপনি যদি সত্যই প্রসন্ন হয়ে থাকেন, তবে দেবতাদের দুর্লভ দিব্য অস্ত্রসমূহ লাভ করা এবং তার প্রয়োগ ও সংহারবিদ্যা জানাই আমার একমাত্র অভীষ্ট।’”
“ভগবান তখন স্মিত হেসে বললেন, ‘তথাস্তু, এই বরই তোমাকে দান করলাম। শীঘ্রই তুমি আমার পরম সংহারক পাশুপতাস্ত্র লাভ করবে।’ তারপর তিনি সেই রুদ্রতেজে দীপ্ত পাশুপত অস্ত্র আমার হস্তে তুলে দিয়ে অত্যন্ত সতর্ক করে বললেন, ‘হে অর্জুন, এই মহাপ্রলয়ঙ্কর অস্ত্র কখনো সাধারণ মানুষের উপর প্রয়োগ কোরো না, কারণ অল্পবীর্য প্রাণীর উপর এটি নিক্ষেপ করলে সমগ্র ত্রিলোক ভস্মীভূত হয়ে যাবে। কেবল যখন তুমি চরম সংকটাপন্ন হবে, তখনই এর প্রয়োগ কোরো— অথবা শত্রু-নিক্ষিপ্ত কোনো মহাশক্তি রোধ করার প্রয়োজন হলে।’ এইভাবে মহাদেব প্রসন্ন হলে, সমস্ত অস্ত্র-নিরোধকারী, নিজে কখনো প্রতিহত না হওয়া সেই ভয়ংকর দিব্য অস্ত্র মূর্তিমান হয়ে আমার কাছে এসে দাসবৎ উপস্থিত হলো। তারপর তাঁরই আদেশে আমি সেখানে ধ্যানমগ্ন রইলাম, আর দেবাদিদেব উমার সঙ্গে কৈলাসে অন্তর্হিত হলেন।
“মহারাজ, দেবাদিদেব মহাদেবের সেই পরম কৃপায় সেই পবিত্র রাত্রি আমি পরম আনন্দে অতিবাহিত করলাম। পরদিন যখন সন্ধ্যা নেমে আসছে, তখন হিমালয়ের সেই পাদদেশে চতুর্দিক থেকে দিব্য, তাজা এবং এক সুগন্ধি পুষ্পবৃষ্টি হতে লাগল। আকাশে বেজে উঠল দেবলোকের বাদ্য, গন্ধর্বদের কণ্ঠে শোনা গেল দেবরাজ ইন্দ্রের স্তুতিধ্বনি। কিছুক্ষণ পরেই চারিত্রিক শ্রেষ্ঠ অশ্বে টানা এক মহাজ্যোতির্ময় সুসজ্জিত রথে স্বয়ং ইন্দ্র ও ইন্দ্রাণী সেখানে অবতরণ করলেন, সঙ্গে এলেন স্বর্গের বহু দেবতা। তাঁদেরই মাঝে আমি পরম ঐশ্বর্যশালী যক্ষরাজ কুবেরকে দেখতে পেলাম। তারপর দেখলাম দক্ষিণে দণ্ডধারী যমরাজ বিরাজমান, পূর্বে ইন্দ্র অবস্থিত, আর পশ্চিমে পাশহস্ত মহারাজ বরুণ। রাজন, তাঁরা আমাকে পরম স্নেহে ধৈর্য ধারণ করতে বলে জানালেন— ‘হে সব্যসাচী! আমরা সকল লোকপাল তোমার তপস্যায় প্রীত হয়ে এখানে উপস্থিত হয়েছি। দেবতাদের এক মহান কার্যসিদ্ধির জন্যই তুমি দেবাদিদেবের দর্শন পেয়েছ। এবার আমাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেও নিজ নিজ প্রধান অস্ত্র গ্রহণ করো।’”
“রাজন, আমি তখন পরম ভক্তিভরে সেই লোকপালদের প্রণাম জানিয়ে তাঁদের কাছ থেকে সমস্ত মহান ও অপরাজেয় অস্ত্র গ্রহণ করলাম। অস্ত্রদান শেষে তাঁরা আমাকে আশীর্বাদ জানিয়ে নিজ নিজ ধামে ফিরে গেলেন। পরিশেষে দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর তেজোময় রথে আরোহণ করার পূর্বে আমাকে বললেন, ‘অর্জুন, তোমাকে এই মর্ত্যদেহেই একবার স্বর্গে গমন করতে হবে। তুমি বহুবার তীর্থস্নান করেছ এবং কঠোর তপস্যাও করেছ— তাই তুমি দেবলোকের উপযুক্ত। আমার আদেশে মাতলি অতি শীঘ্রই তোমাকে স্বর্গে পৌঁছে দেবে।’
তখন আমি বিনীতভাবে ইন্দ্রকে বললাম, ‘হে দেবরাজ, আপনি কৃপা করুন, আমি সম্পূর্ণ অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষার জন্য আপনারই শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে চাই।’ ইন্দ্রদেব প্রীত হয়ে বললেন, ‘হে ভারত, তুমি আমার লোকে অবস্থান করে বায়ু, অগ্নি, বসুগণ, বরুণ ও মরুদ্গণের কাছ থেকে অস্ত্রশিক্ষা লাভ করো। এইভাবে সাধ্যগণ, ব্রহ্মা, গন্ধর্ব, সর্প, রাক্ষস এবং স্বয়ং বিষ্ণু— সকলের কাছ থেকেই অস্ত্রজ্ঞান ধারণ করো।’ এই কথা বলে দেবরাজ ইন্দ্র সেখান থেকে অন্তর্হিত হলেন। মহারাজ, এই হলো আমার স্বর্গবাস ও পাশুপত অস্ত্রলাভের আদি-অন্ত উপাখ্যান।”
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৩৮তম ভাগের আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
বনপর্বের ৩৭তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment