৩৫ তম বন পর্ব-গন্ধমাদনের ছায়ায় পাঁচ বছর: অর্জুনের প্রতীক্ষায় পাণ্ডব
৩৫ তম বন পর্ব-গন্ধমাদনের ছায়ায় পাঁচ বছর: অর্জুনের প্রতীক্ষায় পাণ্ডব
জটাসুর বধের পর রক্তাক্ত অধ্যায়টা শেষ হলো। যুধিষ্ঠির তাঁর ভাইদের আর দ্রৌপদীকে নিয়ে আবার ফিরে এলেন নর-নারায়ণের সেই শান্ত তপোবনে। কিন্তু মনের ভেতর যে একটা কাঁটা খচখচ করছে প্রতিনিয়ত। অর্জুনের অনুপস্থিতি যেন এই হিমালয়ের চেয়েও ভারী। যুধিষ্ঠির একদিন সবার দিকে তাকিয়ে চেনা শান্ত গলায় বললেন, "অর্জুন বিদায় নেওয়ার সময় বলেছিল, স্বর্গে পাঁচটা বছর ও অস্ত্রশিক্ষা করবে। তারপর ফিরে আসবে আমাদের কাছে। সময় তো বয়ে যাচ্ছে, এবার আমাদের প্রস্তুত হতে হবে। ওকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের এগোতে হবে।"
কথাটা মনে ধরল সবার। পাণ্ডবেরা আবার পথ চলতে শুরু করলেন। সঙ্গে সেই নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণেরা আর অনুচরেরা। পথ কখনো মসৃণ, কখনো দুর্গম। যখন শরীর আর চলে না, তখন রাক্ষসেরা তাদের কাঁধে তুলে নেয়, অবলীলায় পার করে দেয় পাহাড়ি চড়াই-উতরাই। চোখের সামনে দিয়ে কেটে গেল কৈলাস, মৈনাক আর গন্ধমাদনের নিচুদিকের উপত্যকাগুলো। কত নাম না-জানা পবিত্র নদীর জল ছুঁয়ে সপ্তম দিনে তাঁরা পৌঁছালেন এক আশ্চর্য জায়গায়—রাজর্ষি বৃষপর্বার আশ্রম। চারদিকে তখন ফুলের গন্ধ, গাছে গাছে বসন্তের মেলা।
বৃষপর্বা ত্রিকালজ্ঞ। পাণ্ডবদের দেখে তিনি পরম স্নেহে বুকে টেনে নিলেন। সাতটা রাত সেখানে কেটে গেল পরম সুখে। অষ্টম দিনে যখন বিদায়ের সময় এলো, তখন এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিলেন যুধিষ্ঠির। বনের ভেতরের পথ আরও কঠিন। তাই রাজর্ষির আশ্রমে রেখে গেলেন নিজেদের রাজকীয় জিনিসপত্র, যজ্ঞের পাত্র, গয়না আর ভারী পোশাক। বৃষপর্বা তাঁদের মাথায় হাত রেখে এক পিতার মতো আশীর্বাদ করলেন, দিলেন আগামীর পথনির্দেশ। তারপর পাণ্ডবেরা মুখ ফেরালেন উত্তরের দিকে।
এবার আর রাক্ষসের কাঁধ নয়, সম্পূর্ণ পায়ে হেঁটে চলা। চারদিকে বন্য পশুর ডাক, গা ছমছমে অরণ্য। ছোট ছোট পাহাড়ি কুঞ্জে রাত কাটিয়ে চতুর্থ দিনে তাঁরা এসে দাঁড়ালেন এক শ্বেতশুভ্র পাহাড়ের সামনে—শ্বেত পর্বত। সোনা, রুপো আর মণি-মাণিক্যের খনি যেন চারদিকে ছড়ানো। দ্রৌপদী ক্লান্ত, কিন্তু তাঁর চোখে অদ্ভুত এক আলো। সঙ্গে আছেন মহর্ষি লোমশ আর পুরোহিত ধৌমা। ক্লান্তিহীন সেই যাত্রা যেন এক ঘোরের মতো।
মাল্যবান পর্বত পেরিয়ে অবশেষে চোখের সামনে ভেসে উঠল গন্ধমাদন। সে এক অলৌকিক দৃশ্য! সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিম্পুরুষ, সিদ্ধ আর গন্ধর্বেরা। গন্ধমাদনের সেই পবিত্র বনে পা ফেলে যুধিষ্ঠিরের মনটা কেমন যেন আর্দ্র হয়ে উঠল। তিনি ভীমের কাঁধে হাত রেখে নিচু গলায় বললেন, "দেখ ভীম, কী আশ্চর্য এই বন! ফল-ফুলে ঝুঁকে পড়া গাছগুলো যেন স্বাগত জানাচ্ছে আমাদের। ওই দেখ, গঙ্গায় কেমন রাজহাঁসেরা খেলা করছে। এখানে দেবতা আর ঋষিরা বাস করেন। এই পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে শুধু সোনা-রুপো আর ঝরনা।"
পাণ্ডবদের চোখ জুড়িয়ে গেল। এই সৌন্দর্যের যেন শেষ নেই। এই পথেরই এক প্রান্তে তাঁরা দেখা পেলেন মহাতপা আর্ষ্টিষেণের। শরীরটা শুকিয়ে কাঠ, চামড়ার ওপর দিয়ে শিরাগুলো গোনা যায়, কিন্তু চোখ দুটো দিয়ে যেন ব্রহ্মতেজ ঠিকরে বেরোচ্ছে। পাণ্ডবেরা প্রণাম করতেই ঋষি তাঁর দিব্যদৃষ্টিতে চিনে নিলেন তাঁদের। বসতে দিলেন পরম সমাদরে।
কিন্তু বসার পরেই আর্ষ্টিষেণ যুধিষ্ঠিরকে এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "রাজন, তুমি কি এখনও সত্য আর ধর্মে স্থির আছ? পিতা-মাতার সেবা ঠিকমতো করো তো? গুরুজনদের সম্মান দাও? পাপ কাজ থেকে দূরে আছ তো? কেউ উপকার করলে তা মনে রাখো, আর অপকার করলে তা ভুলে যাও তো? নিজের জ্ঞানের জন্য অহংকার গ্রাস করেনি তো তোমাকে? সাধুসঙ্গ পাচ্ছ? মনে রেখো, সন্তান জন্ম নিলে পিতৃপুরুষেরা যেমন আনন্দ পান, তেমনই চিন্তায় থাকেন—ছেলে কোনো পাপ করে নরকে পাঠাবে না তো? যে বাবা-মা, গুরু আর নিজের আত্মাকে পুজো করে, সে ইহলোক-পরলোক দুই-ই জয় করে।"
যুধিষ্ঠির হাত জোড় করে বিনম্রভাবে বললেন, "ঋষিবর, আপনি ধর্মের আসল রূপটাই বলে দিলেন। আমি সাধ্যমতো এই পথেই চলার চেষ্টা করি।"
আর্ষ্টিষেণ তখন একটু হাসলেন। তারপর গম্ভীর গলায় সতর্ক করলেন, "এখানকার নিয়ম বড় অদ্ভুত। পূর্ণিমা আর অমাবস্যায় আকাশপথ বেয়ে এমন সব ঋষিরা আসেন যারা শুধু হাওয়া আর জল খেয়ে বেঁচে থাকেন। তখন আকাশে দুন্দুভি, শঙ্খ আর করতাল বেজে ওঠে। তোমরা এখানেই থাকো, আর সেই শব্দ শোনো। কিন্তু খবরদার, এর চেয়ে আগে বাড়ার চেষ্টা কোরো না। ওটা দেবতাদের রাজ্য, সাধারণ মানুষের যাওয়ার অধিকার নেই। যদি কেউ জোর করে যেতে চায়, পাহাড়ের যক্ষ আর রাক্ষসেরা লোহার মুগুর দিয়ে তাকে পিষে মেরে ফেলে। ওই কৈলাসের চূড়া হলো কুবের আর দেবতাদের বাগান। তোমরা অর্জুনের ফিরে আসা পর্যন্ত এখানেই অপেক্ষা করো।"
মহর্ষির সেই অমোঘ উপদেশ পাণ্ডবেরা শিরোধার্য করলেন। গন্ধমাদনের বুকেই কেটে গেল আরও কয়েকটা বছর। মহর্ষি লোমশের মুখে নিত্য নতুন শাস্ত্রকথা শুনতে শুনতে কখন যে নির্বাসনের পাঁচটা বছর কেটে গেল, তাঁরা টেরই পেলেন না। ঘটোৎকচ অবশ্য আগেই বিদায় নিয়েছিল তার রাক্ষসসেনা নিয়ে, তবে কথা দিয়ে গেছে—ডাকলেই আবার ফিরে আসবে। একদিন এক অলৌকিক ঘটনা ঘটল। হিমালয়ের চূড়া থেকে বাতাস বয়ে নিয়ে এলো অদ্ভুত সুগন্ধি আর রঙিন সব ফুল। দ্রৌপদীর আঁচল ভরে উঠল সেই ফুলে, আর পাণ্ডবদের মনে হলো—অর্জুনের ফেরার সময় বোধহয় এবার সত্যিই হয়ে এলো।
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৩৫তম ভাগের আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
বনপর্বের ৩৪তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment