৩য়ভাগ বিরাটপর্ব -মৎস্যদেশে বল্লবের (ভীমের) মল্লযুদ্ধ ও পাণ্ডবদের গুপ্তকাহিনি
৩য়ভাগ বিরাটপর্ব -মৎস্যদেশে বল্লবের (ভীমের) মল্লযুদ্ধ ও পাণ্ডবদের গুপ্তকাহিনি
বিরাট রাজার পুরীতে পাণ্ডবরা স্থান পেয়েছেন, কিন্তু বুকের ভেতর প্রতি মুহূর্তে অনুরণিত হচ্ছে ধরা পড়ার আশঙ্কাসঙ্কুল ভয়। ধৃতরাষ্ট্রের চতুর ও হিংস্র পুত্রেরা চারদিকে ঘুণপোকার মতো গুপ্তচর ছড়িয়ে রেখেছে। কোনোভাবে যদি এই তেরো নম্বর বছরটিতে তাঁদের সন্ধান মেলে, তবে আবার নতুন করে বারো বছরের জন্য বনে বনে ঘুরে বেড়াতে হবে! তাই কৃষ্ণাসহ পাঁচ ভাই যেন মাতৃগর্ভের অন্ধকারের মতোই নীরব, সতর্ক এবং আত্মগোপন করে রইলেন।
এমনি করে আশঙ্কার দোলাচলেই কেটে গেল তিনটি দীর্ঘ মাস। এলো চতুর্থ মাস। মৎস্যদেশে তখন এক বিপুল আয়োজনের সাড়াশব্দ। রাজপরিবার ও প্রজাসাধারণের মহাসমারোহে শুরু হলো ঐতিহ্যবাহী 'ব্রহ্মমহোৎসব'। চতুর্দিক থেকে রাজপ্রাসাদের আঙিনায় ধেয়ে এলো নামজাদা মল্লবীরের দল। রাজা বিরাট তাঁদের যথাবিহিত সম্মান জানালেন। এই মল্লদের চেহারা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়—সিংহের মতো প্রকাণ্ড ও উন্নত কাঁধ, চওড়া গ্রীবা, সুগঠিত কোমর আর সুঠাম গৌরবর্ণ শরীর। রাজপরিবারের মল্ল-আখড়ায় বহুবার বিজয়ের জয়ধ্বজা উড়িয়েছে এই বীরেরা।
সেই মল্লবীরদের পুরোভাগে দম্ভভরে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল জীমূত। নাম যেমন জীমূত, তেমনই তার প্রকাণ্ড চেহারা ও মেঘের মতো গম্ভীর হাঁক। আখড়ার মাঝখানে নেমে সে হুংকার ছেড়ে সবাইকে দ্বৈরথ যুদ্ধে আহ্বান জানাল। কিন্তু তার শরীরচর্চার কৌশল আর পশুর মতো গর্জন দেখে সেখানকার নামজাদা কোনো কুস্তিগীরই তার সামনে দাঁড়ানোর দুঃসাহস পেল না। চারদিকে এক শ্মশানসম নীরবতা ও হতাশা নেমে এলো।
মৎস্যদেশের মান-সম্মান যখন ধূলিসাৎ হতে বসেছে, মৎস্যনরেশ বিরাট তখন উপায়ান্তর না দেখে নিজের প্রধান পাচক 'বল্লব'-এর দিকে তাকালেন। রান্নাঘরের হাঁড়ি-কড়াই ঠেললেও বল্লবের বিশাল বপু ও অসীম শক্তির কথা রাজার অজানা ছিল না। রাজা তাঁকে ডেকে জীমূতের সঙ্গে দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হতে নির্দেশ দিলেন।
প্রভুর সম্মান রক্ষার্থে আর নিজের অন্তরের সুপ্ত যুদ্ধভাবকে জাগিয়ে তুলে, ছদ্মবেশী ভীমসেন অর্থাৎ বল্লব ধীর অথচ দৃঢ় পদক্ষেপে রণভূমিতে প্রবেশ করলেন। যেন এক জাগ্রত কেশরী শিকারের খোঁজে বেরিয়েছে। জনতা এক মুহূর্ত স্তব্ধ থেকে তারপরই হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ল।
ভীমসেন প্রস্তুত হয়ে বৃত্রাসুরের মতো পরাক্রমশালী জীমূতকে আহ্বান জানালেন। দুজনই পাহাড়ের মতো অটল, বিশালকায় হাতির মতো হৃষ্টপুষ্ট। মুহূর্তে শুরু হলো ঘোর গর্জন ও মল্লযুদ্ধ। একের পর এক চাপড়, কিল আর বাহুর প্রহারে চারপাশের বাতাস বিদীর্ণ হতে লাগল। কখনো জীমূত ভীমকে মাটিতে আছড়ে ফেলে, তো পরক্ষণেই ভীম নিচ থেকে এক প্রচণ্ড লাথিতে তাকে শূন্যে ছুড়ে দেন। বাহুবল, প্রাণশক্তি আর শরীরের তীব্র ক্ষমতায় সেই বীরদের ভয়ানক যুদ্ধ চলতে লাগল—কারো হাতে কোনো অস্ত্র নেই, কেবল খাঁটি পেশিবল।
হঠাৎই ঘনিয়ে এলো শেষ দৃশ্য। এক ক্ষুধার্ত সিংহ যেমন প্রকাণ্ড হাতিকে জাপটে ধরে, ঠিক তেমনই ভীম তাঁর দুই লৌহকঠিন বাহু দিয়ে জীমূতকে শক্ত করে চেপে ধরলেন। তারপর এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য—জীমূতকে মাথার ওপর তুলে চক্রের মতো ঘোরাতে লাগলেন! মৎস্যদেশের হাজার হাজার মানুষ ও অন্যান্য মল্লবীরের দল চরম বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে তা দেখতে লাগল।
ঘোরাতে ঘোরাতে যখন জীমূতের চেতনা বিলুপ্ত হয়ে এলো, তখন ভীম তাকে সজোরে আছড়ে ফেললেন কঠিন মাটিতে। এক বিকট আর্তনাদ করে প্রাণ ত্যাগ করল জগৎপ্রসিদ্ধ মল্ল জীমূত। রাজা বিরাট আনন্দে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
সেই মল্লভূমিতে আরও বহু কুস্তিগীরকে পরাস্ত ও নিহত করে বল্লব হয়ে উঠলেন রাজা বিরাটের পরম স্নেহের পাত্র। কেবল ভীমই নন, অন্য পাণ্ডবরাও নিজ নিজ দক্ষতায় জয় করে নিচ্ছিলেন সবার হৃদয়। বৃহন্নলা রূপী অর্জুন তাঁর অতুলনীয় নৃত্য-গীত পরিবেশনায় অন্তঃপুরের নারী ও রাজাকে মুগ্ধ করে রাখলেন। নকুল অশ্বশালার ঘোড়াদের এমন অদ্ভুত শিক্ষা দিতে লাগলেন যে সবাই তাজ্জব বনে গেল। আর সহদেব তাঁর বিচক্ষণতায় রাজকীয় গোধন রক্ষা ও তা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলে বিরাটের মনে স্থায়ী আসন করে নিলেন।
এইভাবে, আশঙ্কার কালো ছায়াকে হাসিমুখে পরাস্ত করে, নিজেদের পরিচয় গোপন রেখেও পাণ্ডবেরা মৎস্যরাজ্যে আপন আপন দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করে যেতে লাগলেন।
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে এবং বনপর্ব ৬৫তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিরাটপর্বের ৩য় ভাগের আলোচনা এবং বিরাট পর্বের পরবর্তী ভাগ চলবে।
বিরাটপর্বের ২য় ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment