২৭তম বন পর্ব-পিতার তৃষ্ণা ও ইন্দ্রের অঙ্গুলি: যুবনাশ্বপুত্র মান্ধাতার উপাখ্যান

 


২৭তম বন পর্ব-পিতার তৃষ্ণা ও ইন্দ্রের অঙ্গুলি: যুবনাশ্বপুত্র মান্ধাতার উপাখ্যান

যুধিষ্ঠিরের চোখের তারা তখন শিশুর মতো কৌতূহলে চকচক করছে। মহর্ষি লোমশের দিকে একটু ঝুঁকে বসে তিনি বললেন, "মহর্ষি, ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা যুবনাশ্বের সেই মহাতেজস্বী পুত্র মান্ধাতার কীর্তি তো ত্রিলোকখ্যাত। তাঁর সেই অলৌকিক জন্মের কাহিনীটি আমায় একটু বিস্তারিত বলবেন? শোনার জন্য বড্ড ব্যাকুল হয়ে আছি।"

লোমশ মুচকি হাসলেন। পাথরের আসনটায় আর একটু আরাম করে বসে নিলেন তিনি। এ গল্প বলতে তাঁর নিজেরও ভারী ভালো লাগে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্মৃতির সিন্দুকটা যেন খুলে ধরলেন মহর্ষি।

"শোনো তবে যুধিষ্ঠির," লোমশ বলতে শুরু করলেন, "ইক্ষ্বাকু বংশের বহু রাজর্ষির গল্প তোমরা শুনেছ, কিন্তু মান্ধাতার মতো দীপ্তিময় পুরুষ আর দুটি মেলা ভার।

সে এক অদ্ভুত সময়। রাজা যুবনাশ্ব ছিলেন পরম ধার্মিক ও ন্যায়পরায়ণ শাসক। প্রজারা তাঁকে দেবতার মতো মানত। কিন্তু এত সুখের মধ্যেও রাজার বুকে একটা তীব্র কাঁটা বিঁধে ছিল—তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। শূন্য প্রাসাদের অলিন্দে অলিন্দে শুধু এক হাহাকার ঘুরে বেড়াত। কোনো উত্তরাধিকারী নেই, এই ভাবনায় রাজার রাতের ঘুম ছুটে গিয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত মরিয়া হয়ে যুবনাশ্ব ঋষিদের শরণাপন্ন হলেন। এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করা হলো। ঋষিরা কঠোর মন্ত্রপূত করে একটি কলসের জলকে এমন অলৌকিক শক্তিতে পূর্ণ করলেন, যা পান করলে রানীর গর্ভে এক অপরাজেয় বীরের জন্ম হবে। যজ্ঞের কাজ শেষ হতে হতে গভীর রাত। ক্লান্ত ঋষিরা সেই পবিত্র জলের কলসটি যজ্ঞশালায় রেখে বিশ্রামের জন্য গেলেন। নিয়ম ছিল, পরদিন ভোরে প্রধান মহিষী এই জল পান করবেন।

কিন্তু নিয়তির লিখন কে বদলাবে বলো? মাঝরাতে রাজা যুবনাশ্বের হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। বুক ফেটে যাচ্ছে তৃষ্ণায়। অন্ধকার প্রাসাদের ভেতর একটু জলের খোঁজে হাতড়াতে হাতড়াতে তিনি এসে ঢুকলেন সেই যজ্ঞশালায়। অন্ধকারে ওই কলসটি তাঁর হাতে ঠেকল। ভেতরে কী আছে না জেনেই, তৃষ্ণার্ত রাজা সেই মন্ত্রপূত জল এক নিশ্বাসে সবটা পান করে ফেললেন।

পরদিন সকালে যজ্ঞশালায় এসে ঋষিদের তো মাথায় হাত! এ কী কাণ্ড! যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। স্বয়ং রাজাই গর্ভধারণ করেছেন। প্রকৃতির সমস্ত নিয়ম উল্টে দিয়ে, যথাসময়ে রাজার বাম উদর ভেদ করে জন্ম নিল এক পরম সুন্দর, জ্যোতির্ময় পুত্রসন্তান।

কিন্তু সমস্যা তো অন্য জায়গায়। মা ছাড়া এ শিশুকে স্তন্যপান করাবে কে? পিতার শরীর থেকে জন্মানো এই শিশুর ক্রন্দন শুনে স্বর্গের দেবতাদের মন গলে গেল। স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র নেমে এলেন মর্ত্যে। শিশুর মুখে নিজের তর্জনীটি গুঁজে দিয়ে বললেন, 'মাম্ অয়ম্ ধাস্যতি'—অর্থাৎ, এ আমাকেই পান করুক। ইন্দ্রের এই অমোঘ বাণী থেকেই শিশুটির নাম হলো 'মান্ধাতা'।

ইন্দ্র শুধু তাকে বাঁচিয়েই রাখলেন না, নিজের ধ্যানে তার অবচেতনে ঢুকিয়ে দিলেন সমগ্র বেদ ও ধনুর্বেদের গূঢ় রহস্য। উপহার দিলেন 'অজগব' নামের এক মহাশক্তিধর ধনু, যা থেকে ছিটকে বেরোনো বাণ কখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। আর দিলেন এমন এক বর্ম, যা শরীরের সঙ্গে এমনভাবে মিশে থাকে যে আলাদা করে চেনাই যায় না।

দেবরাজের কৃপায় সেই শিশু অলৌকিক গতিতে বাড়তে লাগল। কয়েকদিনের মধ্যেই সে পূর্ণ যুবকের অবয়ব আর শক্তি লাভ করল। পিতার পর সিংহাসনে বসলেন মান্ধাতা। আর তার পরেই শুরু হলো এক রূপকথার মতো স্বর্ণযুগ।

যুধিষ্ঠির, তোমরা আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছ, এই পবিত্র কুরুক্ষেত্রভূমিই ছিল মান্ধাতার যজ্ঞের প্রধান ক্ষেত্র। এই মাটিতেই একদিন প্রজাপতি স্বয়ং সহস্র বছর ধরে 'ইষ্টিকৃত' যজ্ঞ করেছিলেন। এখানেই নাভাগপুত্র অম্বরীক্ষ যজ্ঞের পুরোহিতদের কোটি কোটি গোদান করেছিলেন। এই মাটি নহুষপুত্র যযাতির বংশেরই পুণ্যভূমি। এখানেই ভরত তাঁর অশ্বমেধের ঘোড়া ছুটিয়েছিলেন।

মান্ধাতা হয়ে উঠলেন 'চক্রবর্তী' সম্রাট। তাঁর রথের চাকা পৃথিবীর চার প্রান্তে বিনা বাধায় ঘুরে বেড়াত। সমস্ত দিক জয় করে, অন্যায়ের অবসান ঘটিয়ে তিনি এমন এক সাম্রাজ্য গড়ে তুললেন যে স্বয়ং ইন্দ্রও তাঁকে নিজের সমকক্ষ বন্ধু বলে মনে করতেন। তাঁর দানশীলতা আর যজ্ঞের মহিমা আজও পৃথিবীর ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

পিতার তৃষ্ণা থেকে যার জন্ম আর দেবরাজের আঙুল চুষে যে বড় হলো—সেই মান্ধাতা এ পৃথিবীর বুকেও এক দেবতুল্য অধ্যায় লিখে গেছেন।"

লোমশের মুখে এই আশ্চর্য কাহিনী শুনে যুধিষ্ঠির ও তাঁর ভাইয়েরা পরম শ্রদ্ধায় মাথা নত করলেন। তারপর সেই পবিত্র ভূমির জলেই স্নান সেরে নিলেন তাঁরা, যেখানে বহু যুগ আগে রাজর্ষি মান্ধাতার পায়ের ধুলো পড়েছিল।


বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ২৭তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বনপর্বের ২৬তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 


সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page) 


আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া