৩১তম বনপর্ব-গন্ধমাদনের ঝঞ্ঝা ও এক মায়াবী ডানার আশ্রয়


৩১তম বনপর্ব-গন্ধমাদনের ঝঞ্ঝা ও এক মায়াবী ডানার আশ্রয়

আকাশটা হঠাৎ কেমন যেন বিগড়ে গেল। পাণ্ডবেরা তখন গন্ধমাদন পর্বতের চড়াই ভাঙছেন। প্রথমে এল এক দমকা হাওয়া, তারপরই চারপাশ ওলটপালট করে ধেয়ে এল তীব্র ঘূর্ণি। শুকনো পাতা আর ধুলোর চাদরে আকাশ এমনভাবে ঢাকা পড়ল যে দিনদুপুরেই নেমে এল নিকষ অন্ধকার।  যুধিষ্ঠির কিংবা ভীম তখন একে অপরের মুখ দেখতে পাচ্ছেন না, বাতাসে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের কণ্ঠস্বর।

কিছুক্ষণ পর অবশ্য ধুলোর দাপট কমল, কিন্তু প্রকৃতি শান্ত হলো না। শুরু হলো তুমুল বর্ষণ। মেঘের ডাক আর বিদ্যুতের তরবারি যেন আকাশটাকে চিরে ফেলতে চাইল। দ্রৌপদী সেই মহাপ্রলয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছিলেন। শেষমেশ ঝড় থামল, মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিল ক্লান্ত সূর্য।

কিন্তু বিপত্তি ঘটল এর পরেই। প্রায় এক মাইল পথ হাঁটার পর রাজকুমারী দ্রৌপদী আর এক পা-ও নড়তে পারলেন না। যাঁর পায়ের নিচে নরম গালিচা থাকার কথা, তিনি আজ রুক্ষ পাহাড়ি পথ ভেঙে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। একটা পাথরের ওপর বসে পড়লেন তিনি। যুধিষ্ঠির চিন্তিত মুখে ভীমের দিকে তাকিয়ে বললেন, "ভীম, সামনে তো শুধু খাড়া পাহাড় আর বরফের চাদর। আমাদের সুকুমারী দ্রৌপদী এই পথ পার হবে কী করে?"

ভীম তাঁর চওড়া বুকে হাত দিয়ে হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো অহংকার ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত ভরসা। বললেন, "মহারাজ, আপনি সামান্যতম চিন্তা করবেন না। আমি একাই আপনাকে, দ্রৌপদীকে আর নকুল-সহদেবকে পিঠে নিয়ে চলে যেতে পারি। আর তা ছাড়া, আমার ছেলে ঘটোৎকচ তো আছেই। ওর শক্তি আমার চেয়ে কম নয়, আকাশপথে ও অনায়াসে উড়তে পারে। আপনি শুধু একবার অনুমতি দিন।"

যুধিষ্ঠির স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, "তবে আর দেরি কেন ভীম, ডাকো তোমার পুত্রকে।"

বাবার স্মরণ করতেই পলকের মধ্যে সেখানে হাজির হলো মহাবলী ঘটোৎকচ। রাক্ষস কুলের হলেও তার বিনয়ে কোনো খামতি ছিল না। পাণ্ডব এবং উপস্থিত ব্রাহ্মণদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম জানাল সে। তারপর বিনীত গলায় বলল, "পিতা, আপনার আদেশ পেয়েই আমি এসেছি। বলুন, কী করতে হবে?" (ঘটোৎকচের জন্ম কাহিনি জানতে এখানে ক্লিক করুন)

ভীম ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, "বৎস, তোমার মাতা দ্রৌপদী বড্ড ক্লান্ত। ওকে আলতো করে তোমার কাঁধে তুলে নাও, যেন একটুও কষ্ট না হয়।"

ঘটোৎকচ হেসে বলল, "পিতা, শুধু মা কেন? আমি একাই যুধিষ্ঠির, ধৌম্য পুরোহিত, দ্রৌপদী আর নকুল-সহদেবকে একসঙ্গে বহন করতে পারি। আর আমার সঙ্গে যে রাক্ষস বাহিনী আছে, তারা ইচ্ছেমতো রূপ বদলাতে পারে। তারা বাকি ব্রাহ্মণদের আর আপনাকে কাঁধে তুলে নেবে।"

যেই কথা, সেই কাজ। ঘটোৎকচ পরম যত্নে দ্রৌপদীকে নিজের কাঁধে তুলে নিল। অন্য রাক্ষসেরা ব্রাহ্মণদের পিঠে বসাল। শুরু হলো এক রোমাঞ্চকর আকাশযাত্রা। মেঘেদের ফুঁড়ে তারা উড়ে চলল বদ্রীকাশ্রমের দিকে। নিচে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সবুজ বনানী, পাহাড়ি উপত্যকা। রাক্ষসদের গতি বাতাসের চেয়েও দ্রুত।

সেই মায়াবী আকাশভ্রমণে পাণ্ডবেরা দেখতে পেলেন কত বিচিত্র দেশ, রত্নখচিত খনি আর খনিজ সম্পদে ভরা পাহাড়। চোখের সামনে দিয়ে মেঘের মতো ভেসে গেল বিদ্যাধর, কিন্নর, গন্ধর্ব আর কিম্পুরুষদের দল। নিচে পাহাড়ি ঢালে চরে বেড়াচ্ছে চিল্কা হরিণ, ময়ূর, বুনো শুয়োর আর চমরী গাই। অসংখ্য রুপোলি নদীর রেখা যেন মাটির বুকে আঁকিবুঁকি কাটছিল।

অবশেষে তারা এসে পৌঁছাল ভগবান নারায়ণের সেই স্বর্গীয় তপোবনে। বদ্রীকাশ্রম যেন এক টুকরো স্বর্গ। সেখানে গাছে গাছে বারো মাসই ফুল আর ফল ফুটে থাকে। বিশাল এক বদরী (কূল) গাছের নিচে এসে দাঁড়াল তারা। তার স্নিগ্ধ ছায়া আর মিষ্টি ফলের গন্ধ চারপাশের বাতাসকে জুড়িয়ে দিচ্ছিল।

রাক্ষসদের কাঁধ থেকে নেমে পাণ্ডবেরা পা বাড়ালেন নর-নারায়ণের আশ্রমের দিকে। সেখানে তখন জ্বলন্ত অগ্নির মতো তেজস্বী ঋষিরা তপস্যা করছেন। স্বয়ং ব্রাহ্মী ও লক্ষ্মীর মতো দেবীমায়ায় ঘেরা সেই পবিত্র স্থান। একমাত্র পরম ধার্মিক ছাড়া সেখানে কারও প্রবেশাধিকার নেই। ঋষিরা পরম সমাদরে যুধিষ্ঠিরদের স্বাগত জানালেন, কুশল প্রশ্ন করে কন্দমূল ও ফল এগিয়ে দিলেন।

ইন্দ্রের অমরাবতীর মতো সুন্দর সেই আশ্রমে এসে দ্রৌপদীর মুখের ক্লান্তি নিমেষেই মুছে গেল। পাশে বয়ে যাচ্ছিল পবিত্র ভাগীরথী নদী, যা সেখানে 'সীতা' নামে পরিচিত। সেই পুণ্যতোয়া নদীতে স্নান করে পাণ্ডবেরা দেব ও পিতৃপুরুষের তর্পণ সারলেন। প্রকৃতির এই অমোঘ শান্তিতে, সব ক্লান্তি ভুলে, তাঁরা পরম আনন্দে সেই তপোবনেই রয়ে গেলেন কিছুদিনের জন্য।

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৩১তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বনপর্বের ৩০তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page) 

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

হস্তিনাপুরের অলিন্দে ষড়যন্ত্রের ছায়া