৪৫তম বন পর্ব-সময়ের নদী ও অহংকারের যুদ্ধ: তিন রাজর্ষির উপাখ্যান
৪৫তম বন পর্ব-সময়ের নদী ও অহংকারের যুদ্ধ: তিন রাজর্ষির উপাখ্যান
১. এক লক্ষ বছরের ক্লান্তি এবং একটুখানি শাক-ভাত
ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের মনের ভেতর তখন এক আশ্চর্য উদাসীনতা। তিনি চেয়ে রইলেন মহর্ষি মার্কণ্ডেয়ের শান্ত চোখের দিকে। বাইরে বনের পাতা ঝরার শব্দ। যুধিষ্ঠির জিজ্ঞেস করলেন, “মুনিবর, বক আর দাল্ভ্য—শুনেছি এঁরা দুজনে জরা-মৃত্যুকে জয় করে বেঁচে আছেন বহুকাল। দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গেও নাকি এঁদের বড় সখ্য। সেই মিলনের গল্পটি একটু বলবেন? এক অতি-দীর্ঘ জীবনের স্বাদ কেমন হয়, জানতে ইচ্ছে করে।”
মার্কণ্ডেয় একটু হাসলেন। সে হাসিতে যেন হাজার বছরের ইতিহাস লেখা রয়েছে। তিনি বলতে শুরু করলেন:
সে এক অস্থির সময় গেছে। দেবতা আর অসুরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষ হয়েছে সবে। ইন্দ্র যুদ্ধে জিতে স্বর্গের সিংহাসনে বসেছেন। চারদিকে তখন প্রাচুর্যের উৎসব—ঠিক সময়ে বৃষ্টি নামে, মাঠে সোনালী শস্যের দোলা, মানুষের শরীরে কোনো রোগ নেই, মনে নেই কোনো মলিনতা।
একদিন দেবরাজ ইন্দ্র ভাবলেন, মর্ত্যের প্রজাদের একটু দেখে আসা যাক। তিনি তাঁর মহিমান্বিত ঐরাবতে চড়ে রওনা হলেন। ঘুরতে ঘুরতে তিনি এসে পৌঁছলেন পূর্ব সমুদ্রের কাছাকাছি এক নিভৃত অরণ্যে। সেখানে এক ছায়া-সুনিবিড় আশ্রম। চারদিকে হরিণের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে, পাখিদের কলকাকলিতে আকাশ মুখর। সেই আশ্রমেরই এক কোণে ধ্যানমগ্ন ছিলেন বক মুনি।
ইন্দ্রকে দেখে মুনি পরম সমাদরে উঠে দাঁড়ালেন। বনের ফলমূল, অর্ঘ্য আর শীতল জল দিয়ে অতিথি সৎকার করলেন। কুশের আসনে মুখোমুখি বসার পর ইন্দ্র কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ব্রহ্মন্, আপনার বয়স তো এখন এক লক্ষ বছর পেরিয়ে গেছে। এই বিপুল আয়ুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাকে বলুন তো, এতকাল বেঁচে থাকার আসল দুঃখটা কোথায়?”
বক মুনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখের কোণে যেন শতাব্দীর ক্লান্তি নেমে এল। তিনি বললেন, “দেবরাজ, দীর্ঘ জীবনের চেয়ে বড় অভিশাপ আর নেই। যে প্রিয়জনদের আপনি ভালোবাসেন, একে একে তাদের চিতাগ্নি আপনাকে নিজের চোখে দেখতে হবে। নিজের পুত্র, স্ত্রী, ভাই, বন্ধু—সবাই চলে যাবে, অথচ আপনি বেঁচে থাকবেন একলা এক পাথর হয়ে। শুধু তাই নয়, চোখের সামনে দেখতে হবে মূর্খ আর অপ্রিয় মানুষদের দম্ভ। জীবিকার জন্য কখনো কখনো অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হয়, সহ্য করতে হয় অপমান। এর চেয়ে বড় নরক আর কী হতে পারে?”
ইন্দ্র স্তব্ধ হয়ে শুনলেন। তারপর মৃদুস্বরে বললেন, “তাহলে এই দীর্ঘ জীবনে সুখের আলোটুকু কোথায়, মুনিবর?”
বক মুনি এবার সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর চোখে এক আশ্চর্য দীপ্তি ফুটে উঠল:
“সুখ লুকিয়ে আছে নিজের স্বাধীনতায়, দেবরাজ। যে মানুষ নিজের শ্রমে অর্জিত যৎসামান্য শাক-ভাতে সন্তুষ্ট থাকে, কারুর দাসত্ব করে না, সে-ই প্রকৃত সুখী। পরের দেওয়া রাজভোগের চেয়ে নিজের ঘরের শুকনো পাতা খাওয়াও অনেক সম্মানের। অন্যের অন্নে যে ভাগ বসায়, সে তো কুকুরের মতো লাঞ্ছিত।
আসল আনন্দ তো যজ্ঞের অবশিষ্ট অংশে, যা অতিথি আর তৃষ্ণার্ত জীবকুলকে খাওয়ানোর পর নিজের পাতে পড়ে। যে গৃহস্থ নিজে খাওয়ার আগে অতিথিকে পরম শ্রদ্ধায় অন্ন দান করে, সে প্রতি গ্রাসে সহস্র গো-দানের পুণ্য লাভ করে। তার যৌবনের সমস্ত মলিনতা সেই পুণ্যস্রোতে ভেসে যায়।”
ইন্দ্র আর বক মুনির সেই কথোপকথন অনেক রাত পর্যন্ত চলেছিল। প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম আর আত্মসম্মানের এই পাঠ নিয়ে দেবরাজ সেদিন শান্ত মনে স্বর্গে ফিরে গিয়েছিলেন।
২. মাঝরাস্তায় দুই রথ এবং নারদের কৌতুক
বক মুনির গল্প শেষ হতে না হতেই ভীম আর অর্জুন অধীর হয়ে উঠলেন। তাঁরা বললেন, “হে মহাত্মন, আপনি তো আমাদের ব্রাহ্মণদের ত্যাগের কথা শোনালেন। এবার আমাদের নিজেদের জাতের—অর্থাৎ ক্ষত্রিয়দের বীরত্ব ও ঔদার্যের একটা গল্প বলুন।”
মার্কণ্ডেয় মুনি এবার কুরুবংশের এক প্রাচীন কাহিনীর পাতা উল্টোলেন:
সেকালকার কুরুরাজ সুহোত্র ছিলেন এক পরম ধার্মিক ও বীর পুরুষ। একদিন তিনি ঋষিদের আশ্রম থেকে নিজের রথে চড়ে রাজধানীতে ফিরছিলেন। ঠিক সেই সময় অন্য এক পথ দিয়ে রথে চড়ে আসছিলেন উশীনর দেশের রাজা শিবি। দুই রাজার রথ এসে মুখোমুখি দাঁড়াল এক সংকীর্ণ গিরিপথে। কেউ কাউকে এক চুল জায়গা ছাড়তে রাজি নন। দুজনেই মহৎ, দুজনেই বীর। অহংকার নয়, কিন্তু স্বীয় মর্যাদার প্রশ্নে দুজনেই অনড়।
এমন সময় আকাশ থেকে সেখানে অবতরণ করলেন দেবর্ষি নারদ। হাতে তাঁর মহতী বীণা। নারদ হেসে বললেন, “কী হে রাজন্যবর্গ! তোমরা দুজনে রথের চাকা থমকে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”
দুই রাজা প্রায় একসঙ্গেই উত্তর দিলেন, “দেবর্ষি, নীতি বলে যে বয়সে বা গুণে ছোট, সে-ই বড়কে পথ ছেড়ে দেবে। কিন্তু আমাদের দুজনের গুণ আর গৌরব তো সমান। তাহলে কে কাকে পথ ছাড়বে?”
নারদ বীণায় একটা মৃদু টোকা দিলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, “শোনো তবে। একজন ক্রূর মানুষের সঙ্গে ক্রূরতা করা সহজ। কিন্তু যে দুষ্ট, তার সঙ্গেও যিনি সাধু ব্যবহার করেন, তিনিই তো প্রকৃত মহৎ। নিজের প্রতি করা সামান্য উপকারের বদলে যিনি শতগুণ ফিরিয়ে দেন, তিনিই তো শ্রেষ্ঠ। কৌরব সুহোত্র, তোমার চেয়ে রাজা শিবিরের উদারতা কিন্তু এক ধাপ এগিয়ে।
কারণ শাস্ত্রে বলে—নীচকে দান দিয়ে জয় করো, মিথ্যাকে জয় করো সত্য দিয়ে, নিষ্ঠুরকে ক্ষমা দিয়ে আর অসাধুকে জয় করো সদ্ব্যবহার দিয়ে। তোমাদের দুজনের মধ্যে যিনি নিজেকে বেশি উদার বলে মনে করো, তিনিই আগে পথ ছেড়ে দাও।”
নারদের এই কথা সুহোত্রের বুকে গিয়ে তীরের মতো বিঁধল। তিনি এক মুহূর্তও নষ্ট না করে নিজের রথটিকে একপাশে সরিয়ে নিলেন এবং মুক্তকণ্ঠে রাজা শিবিরের জয়গান গাইলেন। নিজের অহংকারকে এভাবে জয় করাই তো প্রকৃত ক্ষত্রিয়ের ধর্ম।
৩. যযাতির অহংকারহীন হাত
মার্কণ্ডেয় মুনি আবার বলতে শুরু করলেন, “ক্ষত্রিয়ের মহত্ত্বের কথা যখন উঠল, তখন নহুষপুত্র যযাতির এই কাহিনীটি না বললে অপূর্ণ থেকে যাবে।”
রাজা যযাতি তখন সাফল্যের মধ্যগগনে। তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। একদিন এক দরিদ্র তরুণ ব্রাহ্মণ এসে তাঁর রাজসভায় দাঁড়ালেন। তাঁর চোখে এক অদ্ভুত দ্বিধা। তিনি বললেন, “মহারাজ, আমি গুরুদক্ষিণা দেওয়ার জন্য ভিক্ষা প্রার্থী। কিন্তু লোকে ভিক্ষুকদের করুণা করে, নয়তো অবজ্ঞা করে। আমি আপনার কাছে যা চাইতে এসেছি, তা কি আপনি দিতে পারবেন? নাকি আমাকেও খালি হাতে ফিরতে হবে?”
যযাতি সিংহাসন থেকে নেমে এলেন। ব্রাহ্মণের হাত দুটি নিজের হাতে নিয়ে বললেন, “হে ব্রাহ্মণ, আমি দান করার সময় কখনো হিসাবের খাতা খুলি না। যা দেওয়ার যোগ্য, তা দিতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। প্রার্থনাকারীর ওপর রাগ করা আমার ধর্মে নেই, আর দান করে পরে অনুতাপ করার মতো ক্ষুদ্রতাও আমার নেই। আপনার গুরুদক্ষিণার জন্য আমি আপনাকে এক সহস্র লাল গাভী দান করলাম।”
ব্রাহ্মণ বিস্মিত ও অশ্রুসজল চোখে রাজার দিকে চেয়ে রইলেন। দান তো অনেকেই করে, কিন্তু এমন অহংকারহীন, শান্ত হৃদয়ে দান করার মতো ক্ষত্রিয় রাজর্ষি পৃথিবীতে সত্যিই বিরল।
মার্কণ্ডেয় মুনি থামলেন। যুধিষ্ঠির গভীর এক প্রশান্তি অনুভব করলেন নিজের ভেতরে। মানুষের পরমায়ু আর রাজধর্মের এই গূঢ় রহস্যগুলি যেন বনের অন্ধকারকে এক লহমায় আলোয় ভরিয়ে দিল।
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৪৫তম ভাগের আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
বনপর্বের ৪৪তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment