৬৫তম বনপর্ব-তৃষ্ণার সরোবর ও ধর্মরাজের পরীক্ষা
৬৫তম বনপর্ব-তৃষ্ণার সরোবর ও ধর্মরাজের পরীক্ষা
কাম্যক বনের সেই বিভীষিকাময় রাতটার কথা আজও মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। জয়দ্রথের হাত থেকে দ্রৌপদীকে উদ্ধার তো করা গেল, কিন্তু মনের ভেতর যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল, তা মেটার নয়। অপমানের সেই তীব্র জ্বালা বুকে নিয়ে রাজা যুধিষ্ঠির আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকতে পারলেন না। ভাইদের ডেকে বললেন, "চলো, আমরা আবার দ্বৈতবনেই ফিরে যাই।"
দ্বৈতবন তখন এক অন্য রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ জুড়িয়ে যাওয়া গাঢ় সবুজ বৃক্ষরাজি, ডালে ডালে সুমিষ্ট ফল, আর বাতাসজুড়ে এক অলৌকিক প্রশান্তি। পাণ্ডবরা স্থির করলেন, রাজকীয় ঐশ্বর্যের মোহ ছেড়ে এবার কেবল ফল-মূল খেয়ে, মিতাহারী হয়ে এখানেই দিন কাটাবেন। দ্রৌপদীকে ঘিরে পাঁচ ভাই নিঃশব্দে গড়ে তুললেন এক আশ্রয়ের বলয়। কিন্তু নিয়তির খেলা যে তখনও ঢের বাকি!
হরিণ ও অরণিকাষ্ঠের রহস্য
একদিন সকালবেলা। বনের এক কোণে তপস্যায় বসেছিলেন এক ব্রাহ্মণ। অগ্নিকার্যের জন্য গাছের ডালে সাবধানে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন তাঁর অরণি ও মন্থনকাষ্ঠ—যা দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়। এমন সময় কোত্থেকে এক হৃষ্টপুষ্ট বিশালাকার হরিণ এলো সেখানে। গা চুলকানোর সুড়সুড়িতে গাছের গায়ে শিঙ ঘষতে গিয়ে দৈবাৎ সেই কাষ্ঠ আটকে গেল তার পেঁচানো শিঙে।
ব্যস! চমকে উঠে লাফ দিল হরিণটি। শিঙে বাঁধা অরণি নিয়ে সে ছুটল অন্য আশ্রমের দিকে। ব্রাহ্মণ তো হতবাক! নিত্য অগ্নিহোত্র রক্ষা করাই যাঁর ধর্ম, তিনি কাঠ ছাড়া আগুন জ্বালবেন কীভাবে? আকুল হয়ে তিনি ছুটে এলেন পাণ্ডবদের কুটিরে। যুধিষ্ঠির তখন ভাইদের নিয়ে বসেছিলেন। ব্রাহ্মণের কাতর আর্তনাদ শুনে ধর্মরাজের মন কেঁদে উঠল—"রাজন! আমার ধর্ম রক্ষা করুন! সেই মায়াবী হরিণটি আমার অরণি নিয়ে পালিয়েছে, তার পায়ের চিহ্ন ধরে আমাকে ওটা এনে দিন!"
ব্রাহ্মণকে কথা দিয়ে পাণ্ডব ভ্রাতারা তক্ষুণি ধনুক হাতে ছুটলেন বনের গভীরে।
ক্লান্তির প্রহর ও মায়াবী বটবৃক্ষ
কিন্তু হরিণটি যেন বাতাস হয়ে গেল। বহু চেষ্টা করেও, একের পর এক তির ছুড়েও তার গতি রোখা গেল না। চোখের পলকে ঘন জঙ্গল আর ঝোপঝাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল সেই মায়াবী মৃগ।
ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে পাঁচ ভাইয়ের। মধ্যাহ্নের সূর্য তখন মাথার ওপর আগুন ঢালছে। পরিশ্রান্ত, শোকার্ত পাণ্ডবরা ঘুরে ঘুরে এসে পৌঁছালেন এক বিশাল বটবৃক্ষের ছায়ায়। যুধিষ্ঠির ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে নকুলকে বললেন, "নকুল, ভাই আমার, সবাই আর এক পা-ও চলতে পারছে না। জঙ্গলটা একটু ভালো করে দেখো তো, আশেপাশে কোথাও জল পাওয়া যায় কিনা?"
নকুল চটপট বটগাছের এক মগডালে উঠে চারদিক পরখ করলেন। তারপর চেঁচিয়ে বললেন, "রাজন! দূরে জলাশয়ের চারপাশে যেসব গাছ জন্মায়, তেমন প্রচুর গাছ দেখতে পাচ্ছি! সারস পাখির ডাকও ভেসে আসছে। জল খুব কাছেই আছে!"
যুধিষ্ঠির স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, "যাও সৌম্য, দেরি কোরো না। আমাদের জন্য জল নিয়ে এসো।"
একে একে নিভিল তারা
নকুল দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলেন। ঘন জঙ্গলের মাঝে যেন এক টুকরো স্বর্গ—একটি স্বচ্ছ, নির্মল সরোবর, ঘিরে রয়েছে একঝাঁক শুভ্র সারস। তীব্র তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছিল নকুলের। তিনি আঁজলা ভরে জল পান করতে যাবেন, ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে এক অলৌকিক গম্ভীর কণ্ঠস্বর বেজে উঠল—
"সাবধান নকুল! জলপানের চেষ্টা কোরো না। এই সরোবর আমার অধিকারে। আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও, তারপর জলপান করবে এবং পাত্রে নিয়ে যাবে।"*
কিন্তু নকুল তখন তৃষ্ণায় অন্ধ। সেই অদৃশ্য সতর্কবার্তাকে বাতাসের ভুল ভেবে তিনি এক ঢোক শীতল জল পান করে নিলেন। আর মুহূর্তের মধ্যে নিথর হয়ে ঢলে পড়লেন মাটিতে।
অনেকক্ষণ কেটে গেল, নকুল ফিরলেন না। উদ্বিগ্ন যুধিষ্ঠির সহদেবকে পাঠালেন—"ভাই, নকুল গেল কোথায়? তুমি গিয়ে দেখো আর জল নিয়ে এসো।"
সহদেব গিয়ে দেখলেন, সরোবরের ধারে অচৈতন্ভাবে পড়ে আছেন নকুল। শোকে আর পিপাসায় কাতরে উঠে তিনি যেই জলের দিকে এগোতে গেলেন, আবার বেজে উঠল সেই দৈববাণী! সহদেবও তৃষ্ণার তাড়নায় তা উপেক্ষা করে জল স্পর্শ করলেন, এবং পরক্ষণেই নকুলের মতো নির্জীব হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
এরপর এলেন মহাবীর অর্জুন। দুই ভাইকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে তাঁর বুকে সন্দেহের ঝড় উঠল। ধনুক উঁচিয়ে বনের অলিগলি খুঁজলেন, কিন্তু কোনো শত্রুর দেখা পেলেন না। তৃষ্ণায় বুক শুকিয়ে কাঠ। জল পানের মুখে যখন আবার সেই অদৃশ্য যক্ষের কণ্ঠ হুংকার দিয়ে উঠল, অর্জুন গর্জে উঠলেন—"সামনে এসে কথা বলো! আমার শব্দভেদী বাণ তোমায় চিনে নেবে!"
অর্জুন মন্ত্রপূত বাণে চারদিক ছেয়ে দিলেন। কিন্তু যক্ষ হেসে বলল, "অর্জুন, বীরত্ব দেখিয়ে লাভ নেই। উত্তর না দিয়ে জল ছুঁলেই মৃত্যু!" অর্জুনও তা না মেনে জল পান করলেন এবং জ্ঞান হারিয়ে ধরণীতে লুটিয়ে পড়লেন।
অবশেষে গেলেন ভীম। তিন ভাইকে মৃতপ্রায় দেখে বৃকোদর ভীমের চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরে বের হতে লাগল। তিনি ভাবলেন—এ কোনো যক্ষ বা রাক্ষসের চক্রান্ত। যুদ্ধ করতে হলেও আগে গায়ে জোর চাই, তাই তিনি জল পান করতে গেলেন। যক্ষের মানা তিনি শুনলেন না। ফল হলো একই—পর্বতের মতো বিশাল ভীমও ঢলে পড়লেন মৃত্যুর কোলে।
সরোবর তীরে ধর্মরাজ
চার ভাইয়ের কেউই ফিরে এলো না দেখে যুধিষ্ঠিরের বুকটা দুলতে লাগল অশুভ আশঙ্কায়। মনের তীব্র উদ্বেগ চেপে তিনি নিজেই হেঁটে এলেন সরোবরের তীরে।
পৌঁছেই যে দৃশ্য দেখলেন, তাতে তাঁর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। চার ভাই—যাঁদের একেকজন হাজার হাতির শক্তি রাখেন—মাটিতে অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছেন! নেই কোনো অস্ত্রের আঘাত, নেই কোনো রক্তপাত, এমনকি শত্রুর পদচিহ্নও নেই!
যুধিষ্ঠির বিলাপ করতে লাগলেন—"কে মারল আমার ভাইদের? দুর্যোধনের চক্রান্তে বিষ মেশানো জল নয়তো? না, বিষ হলে দেহের বর্ণ তো বদলে যেত! এ নিশ্চয়ই কোনো অতিপ্রাকৃতিক দেবতার কাজ!"
তৃষ্ণা মেটাতে তিনি যেই জলে পা দিলেন, অমনি এক বিকট দর্শন পাখির কণ্ঠে বেজে উঠল সেই চেনা বাণী—
"আমি এক বক, আমিই তোমার ভাইদের এই দশা করেছি! আমার প্রশ্ন এড়িয়ে জল খেলে তোমার পরিণতিও এদের মতোই হবে!"*
যুধিষ্ঠির এক মুহূর্ত থামলেন। তারপর হাত জোড় করে শান্তস্বরে বললেন, "আপনি কোনো সাধারণ পাখি হতে পারেন না। বলুন, আপনি কে? রুদ্র, বসু না স্বয়ংস্রষ্টা ব্রহ্মা? কার অধিকারে এই জলাশয়?"
তখন সেই বক রূপ ত্যাগ করে প্রকাশ পেলেন এক বিশালকায় যক্ষ। তালগাছের মতো দীর্ঘ, পর্বতের মতো বিশাল, আর আগুনের মতো তেজস্বী তাঁর রূপ। যক্ষ গম্ভীর স্বরে বললেন, "আমি যক্ষ! তোমার ভাইরা আমার বারণ শোনেনি বলেই আজ তাদের এই অবস্থা। তুমি যদি প্রাণ বাঁচাতে চাও, তবে আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও!"
যুধিষ্ঠির শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন, "আপনার অধিকারের জিনিস আমি জোর করে নেব না। আপনি প্রশ্ন করুন, আমি আমার বুদ্ধি অনুযায়ী উত্তর দিচ্ছি।"
যক্ষ- যুধিষ্ঠির সংবাদ: মহাজাগতিক জ্ঞানের মহাবিনিময়
সরোবরের স্ফটিকস্বচ্ছ জলের ধারে শুরু হলো সৃষ্টি ও দর্শনের সবচেয়ে গভীর এক সত্য-পরীক্ষা।
যক্ষ:সূর্য কার দ্বারা উদিত হন? তাঁর চারদিকে কারা চলেন? কে তাঁকে অন্তে পাঠায়? আর তিনি কিসে প্রতিষ্ঠিত?
যুধিষ্ঠির:সূর্য ব্রহ্মা দ্বারা উদিত হন। তাঁর চারদিকে দেবতারা চলেন। ধর্ম তাঁকে অন্তে পাঠায় এবং তিনি সত্যে প্রতিষ্ঠিত।
যক্ষ: পৃথিবীর চেয়ে ভারী কী? আকাশের চেয়ে উঁচু কী? বায়ুর চেয়ে দ্রুতগামী কী? আর তৃণের চেয়ে সংখ্যায় বেশি কী?
যুধিষ্ঠির: মাতা পৃথিবীর চেয়েও ভারী। পিতা আকাশের থেকেও উঁচু। মন বায়ুর চেয়েও বেগে ধায়। আর উদ্বেগ বা চিন্তা তৃণের চেয়েও সংখ্যায় অধিক!
যক্ষ: বিদেশে গমনকারীর মিত্র কে? গৃহে বাসকারীর মিত্র কে? রোগীর মিত্র কে? আর মৃত্যুপথযাত্রীর মিত্র কে?
যুধিষ্ঠির: সঙ্গের সহযাত্রীই প্রবাসীর মিত্র। গৃহীর মিত্র তাঁর পত্নী। রোগীর মিত্র চিকিৎসক। আর মুমূর্ষু ব্যক্তির একমাত্র মিত্র হলো তাঁর কৃত দান।
যক্ষ: মানুষের দুর্জয় শত্রু কে? অনন্ত ব্যাধি কী? সাধুই বা কে, আর অসাধুই বা কে?
যুধিষ্ঠির:ক্রোধই দুর্জয় শত্রু। লোভ হলো অনন্ত ব্যাধি—যার শেষ নেই। যে সর্বজীবের কল্যাণ চায় সে-ই সাধু, আর যে নির্দয় সে-ই অসাধু।
যক্ষ:*হে রাজন, সবচেয়ে সুখী কে? সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় কী? প্রকৃত পথ কোনটি? আর এই পৃথিবীর বার্তাই বা কী?
যুধিষ্ঠির:
১. সুখী:যে ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত নয়, যাকে পরবাসে থাকতে হয় না, আর দিনে অন্তত একবার নিজের ঘরে সামান্য শাক-ভাত রেঁধে খেতে পায়—সে-ই সবচেয়ে সুখী।
২. আশ্চর্যের বিষয়:প্রতিনিয়ত অসংখ্য প্রাণী যমের দ্বারে চলে যাচ্ছে, তা স্বচক্ষে দেখেও মানুষ ভাবে সে চিরকাল বেঁচে থাকবে! এর চেয়ে বড় আশ্চর্য আর কী হতে পারে?
৩. প্রকৃত পথ: তর্ক দিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসা যায় না, শাস্ত্রের ব্যাখ্যাও ভিন্ন। মহাপুরুষেরা যে পথে হেঁটেছেন, তা-ই একমাত্র অনুসরণীয় পথ।
৪. বার্তা: এই সংসার হলো এক কড়াই। কাল বা সময় হলো রাঁধুনী। রাত আর দিন হলো জ জ্বালানি, আর সূর্য হলো আগুন। এই আগুনে ঋতু রূপ হাতা দিয়ে সময় সমস্ত প্রাণীকে রান্না করছে—এটাই পৃথিবীর আসল বার্তা!
যুধিষ্ঠিরের প্রতিটি উত্তর শুনে যক্ষ বিস্মিত ও আপ্লুত হলেন। শেষ প্রশ্ন করে তিনি বললেন, "তুমি শ্রেষ্ঠ পুরুষের ব্যাখ্যা দিয়েছ। এবার বলো, তোমার চার ভাইয়ের মধ্যে কাকে তুমি জীবিত দেখতে চাও? আমি একজনকে প্রাণদান করব।"
ধর্মের আসল জয়
যুধিষ্ঠির এক মুহূর্তও ইতস্তত না করে বললেন, "যক্ষ, ওই শ্যামবর্ণ, শালবৃক্ষের মতো দীর্ঘ, সুবিশাল বক্ষের অধিকারী আমার ছোট ভাই **নকুল** যেন বেঁচে ওঠে!"
যক্ষ অবাক হয়ে বললেন, "রাজন! যার দেহে দশ হাজার হাতির বল, সেই ভীমকে ছেড়ে তুমি নকুলকে চাইলে? নাকি যার বাহুবলে তোমরা জগৎ জয় করতে পারো, সেই অর্জুনকে ছেড়ে নকুলকে বেছে নিলে? এ কেমন বিচার?"
যুধিষ্ঠির গভীর মমতায় হেসে বললেন—
"ধর্মকে যদি রক্ষা করা হয়, তবে ধর্মই আবার মানুষকে রক্ষা করে। আমার পিতা পাণ্ডুর দুই স্ত্রী—কুন্তী আর মাদ্রী। আমি কুন্তীর সন্তান হিসেবে জীবিত আছি। কিন্তু মাদ্রীর কোনো সন্তান বেঁচে থাকবে না? আমার কাছে কুন্তী ও মাদ্রী—দুই মাতাই সমান। আমি সাম্য ও ধর্ম ত্যাগ করতে পারব না। তাই মাদ্রীর জ্যেষ্ঠ পুত্র নকুলই জীবিত হোক।"*
যুধিষ্ঠিরের এই নিরপেক্ষতা, উদারতা ও পরম ধর্মবোধ দেখে যক্ষ আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলেন। তিনি বললেন, "হে ভরতশ্রেষ্ঠ! তুমি স্বার্থ ও কাজের চেয়ে সাম্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছ। তাই তোমার কোনো এক ভাই নয়, চার ভাই-ই বেঁচে উঠুক!"
যক্ষ বাণিমাত্রই চার ভাই যেন এক দীর্ঘ গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। তাঁদের ক্লান্তি, ক্ষুধা, তৃষ্ণা নিমেষে মিলিয়ে গেল।
পিতৃদেবের বরদান ও অজ্ঞাতবাসের প্রস্তুতি
যুধিষ্ঠির তখন শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে বললেন, "হে দেব, আপনি কেবল যক্ষ হতে পারেন না। আপনি কে? আমাদের পরিচয় দিন।"
যক্ষ রূপ ত্যাগ করে স্বয়ং ধর্মরাজ (যম) নিজের আসল রূপে আবির্ভূত হলেন। তিনি হেসে বললেন, "বাছা যুধিষ্ঠির, আমি তোমার পিতা ধর্ম। তোমার ধর্মনিষ্ঠা পরীক্ষা করতেই আমি এই রূপ ধরেছিলাম। তোমার ব্যবহারে আমি পরম প্রীত! ওই ব্রাহ্মণের অরণি কাঠ আমিই হরিণ রূপ ধরে নিয়ে এসেছিলাম, তা তুমি ফিরিয়ে নাও। এবার তোমার বর চেয়ে নাও।"
যুধিষ্ঠির প্রণাম জানিয়ে বললেন, "পিতঃ, আমাদের বারো বছরের বনবাস শেষ হতে চলল। এবার ত্রয়োদশ বছরে আমাদের অজ্ঞাতবাসে থাকতে হবে। বর দিন, যেন কেউ আমাদের আসল পরিচয় চিনতে না পারে।"
ধর্মরাজ আশীর্বাদ করে বললেন, "তথাস্তু! তোমরা ছদ্মবেশে রাজপ্রাসাদে বা লোকালয়ে ঘুরে বেড়ালেও কেউ তোমাদের চিনতে পারবে না। প্রয়োজনমতো তোমরা রূপ বদলাতে পারবে। আর কোনো বর চাইলে বলো।"
যুধিষ্ঠির হাত জোড় করে বললেন, "আমাকে এমন বর দিন, যেন আমি সর্বদা লোভ, মোহ ও ক্রোধকে জয় করতে পারি। আমার মন যেন সর্বদা সত্য, তপস্যা ও দানে স্থির থাকে।"
ধর্মরাজ বললেন, "তুমি তো স্বভাবতই এই সব গুণের অধিকারী। তোমার ইচ্ছা পূরণ হোক।"—এই বলে ধর্মরাজ অন্তর্হিত হলেন।
পাণ্ডবরা ব্রাহ্মণের অরণি ফিরিয়ে দিয়ে দ্বৈতবনের আশ্রমে ফিরে এলেন। মহর্ষি ধৌম্য ও বনবাসী মুনিদের কাছে হাত জোড় করে অনুমতি চাইলেন—"আমরা দীর্ঘ বারো বছর চরম কষ্ট সহ্য করেছি। এবার দুর্যোধনের গুপ্তচরদের চোখ এড়িয়ে আমাদের অজ্ঞাতবাসে যেতে হবে। আপনারা আমাদের আশীর্বাদ করুন।"
মুনিরূপী ঋষিরা ছলছল চোখে পাণ্ডবদের বিদায় দিলেন। দ্রৌপদী ও ধৌম্যকে সঙ্গে নিয়ে পাঁচ ভাই হেঁটে চললেন বনের সীমানা পেরিয়ে। এক ক্রোশ পথ অতিক্রম করার পর, এক অচেনা অরণ্যের ছায়ায় বসে তাঁরা শুরু করলেন এক নতুন অধ্যায়ের গোপন ছক—যা ইতিহাসের পাতায় পরিচিত 'অজ্ঞাতবাস' নামে।
এখানেই বনপর্ব সমাপ্ত-
এর পর শুরু হবে মহাভারতের বিরাট পর্ব
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৬৫তম ও বনপর্বের শেষ ভাগের আলোচনা এবং পরবর্তীতে চলবে বিরাট পর্বের ভাগ।
বনপর্বের ৬৪তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচির প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচির দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচির- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment