৩৬তম বনপর্ব- গন্ধমাদনে ভীমের রণহুংকার


৩৬তম বনপর্ব- গন্ধমাদনে ভীমের রণহুংকার — মণিমানের পতনে অগস্ত্যের অভিশাপ সমাপ্ত

গন্ধমাদন পর্বতের নির্জন এক প্রান্তে, যেখানে মেঘেরা নেমে আসে পাহাড়ের কাঁধে মাথা রাখতে, সেখানে একদিন শান্ত হয়ে বসেছিলেন মহাবাহু ভীম। বাতাসে তখন বন্য পুষ্পের গন্ধ, দূরে কোথাও ঝর্নার জলধ্বনি। এমন সময় দ্রৌপদী তাঁর কাছে এসে বললেন, "মহাবাহু, যদি এই পর্বতের রাক্ষসেরা তোমার ভয়ে পলায়ন করে, তবে আমাদের বন্ধুরা নিশ্চিন্তে এর পুষ্পশোভিত শিখরগুলি উপভোগ করতে পারবে। বহুদিন ধরে আমি এই ইচ্ছা পোষণ করে আসছি।"

দ্রৌপদীর এই কথা শুনে ভীমের রক্তে যেন আগুন জ্বলে উঠল। তিনি ধনুক, তরবারি, তূণীর ও গদা— এই চতুরাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পর্বত আরোহণ শুরু করলেন। দ্রৌপদী আনন্দে উদ্ভাসিত হলেন। ভীমের হৃদয়ে ভয় নেই, দ্বিধা নেই, ক্লান্তির লেশমাত্র নেই। শিখরে পৌঁছে তিনি দেখলেন কুবেরের প্রাসাদ— স্বর্ণ ও স্ফটিকে উজ্জ্বল, স্বর্ণপ্রাচীরে বেষ্টিত, চারিদিকে দীপ্তিমান উদ্যান।

ভীম তাঁর শঙ্খে ফুঁ দিলেন। সেই শব্দ পর্বতের গায়ে গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে গেল, তারপর তিনি ধনুকের ছিলা টংকার দিলেন। সেই ভয়ংকর আওয়াজে যক্ষ, রাক্ষস ও গন্ধর্বরা কম্পিত হয়ে অস্ত্র হাতে ছুটে এল। ভীম তাঁর অস্ত্রাঘাতে তাদের বাহু ও দেহ চূর্ণ করে দিলেন, ভয়ে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে লাগল।

তাদের মধ্যে ছিল মণিমান, একজন রাক্ষস, কুবেরের বন্ধু। সঙ্গীদের পলায়ন দেখে সে বিদ্রূপ করে বলল, "এত জন একজন মানুষের কাছে পরাজিত! কুবেরকে কী জবাব দেবে?" তারপর সে ত্রিশূল ও গদা নিয়ে ভীমকে আক্রমণ করল। ভীম তাকে বাণে বিদ্ধ করলেন, ক্রুদ্ধ মণিমান তখন তাঁর ভারী গদা নিক্ষেপ করল। গদাযুদ্ধে পারদর্শী ভীম সেই আঘাত প্রতিহত করলেন। এরপর মণিমান একটি স্বর্ণমণ্ডিত ইস্পাত-বাণ নিক্ষেপ করে ভীমের বাহু ক্ষতবিক্ষত করে দিল। ক্রোধে জ্বলে উঠে ভীম তাঁর স্বর্ণগদা তুলে প্রচণ্ড এক আঘাতে মণিমানকে হত্যা করলেন। অবশিষ্ট রাক্ষসেরা আর্তনাদ করে পূর্বদিকে পালিয়ে গেল।

অস্ত্রের সেই সংঘাত-ধ্বনি শুনে যুধিষ্ঠির, নকুল, সহদেব, ধৌম্য, দ্রৌপদী ও অন্যান্যরা ভীমকে দেখতে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। তাঁরা অস্ত্র হাতে পর্বতে আরোহণ করলেন, এবং নিহত রাক্ষসদের মাঝে ভীমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। সকলে তাঁকে আলিঙ্গন করলেন, কিন্তু যুধিষ্ঠির তাঁকে ভর্ৎসনা করে বললেন, "ভাই, সাহসের বশে হোক বা অহংকারের বশে, এই নিধনযজ্ঞ শোভা পায় না। আমরা এখন তপস্বীর জীবন যাপন করছি; এমন ধ্বংস তোমার উপযুক্ত নয়। আমাকে সন্তুষ্ট করতে চাইলে, এই কাজ আর কোরো না।"

এদিকে জীবিত রাক্ষসেরা কুবেরের কাছে ছুটে গিয়ে কেঁদে বলল, "প্রভু! একজন মাত্র মানুষ আমাদের সকল স্বজনকে বধ করেছে। আপনার বন্ধু মণিমান নিহত। আমাদের মধ্যে অল্প কয়েকজনই পালিয়ে আসতে পেরেছি।" ক্রুদ্ধ কুবের তাঁর রথ প্রস্তুত করার আদেশ দিলেন। যক্ষ ও রাক্ষসদের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে তিনি গন্ধমাদনে এসে উপস্থিত হলেন।

কিন্তু পাণ্ডবদের দেখামাত্র কুবেরের মন প্রসন্ন হয়ে উঠল। তাঁর মনে পড়ে গেল এক দৈব উদ্দেশ্যের কথা— একদা তাঁর বন্ধু মণিমান মুনি অগস্ত্যকে অপমান করে তাঁর গায়ে থুতু নিক্ষেপ করেছিল। অগস্ত্য তখন অভিশাপ দিয়েছিলেন যে মণিমান ও তার অনুচরেরা এক মানুষের হাতে নিহত হবে, আর যতদিন না সেই অভিশাপ পূর্ণ হয়, ততদিন কুবেরকে শোক ভোগ করতে হবে। আজ ভীমের হাতে সেই অভিশাপের অবসান ঘটল।

কুবের যুধিষ্ঠিরকে বললেন, "ভীমের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ো না। এই রাক্ষসেরা নিহত হয়েছে কারণ তাদের কাল উপস্থিত হয়েছিল; তোমার ভাই কেবল নিমিত্তমাত্র। ধৈর্য, কৌশল, সময়জ্ঞান ও বল— এই সবই রাজার পক্ষে অপরিহার্য। যারা ক্রোধের বশে কাজ করে তারা পতিত হয়, কিন্তু যারা প্রজ্ঞার সঙ্গে কাজ করে তারা সম্মান ও মুক্তি লাভ করে। ভীম সাহসী, কিন্তু তার মধ্যে অবিবেচনার ছায়া আছে; তাকে পথ দেখিয়ো। অর্জুন এর বিপরীতে সংযত ও ধর্মপরায়ণ, সে দিব্য শক্তি অর্জন করেছে। শীঘ্রই সে স্বর্গ থেকে ফিরে আসবে।"

তারপর কুবের ভীমকে আশীর্বাদ করে বললেন, "তুমি শত্রুর বিনাশকারী এবং বন্ধুর রক্ষাকর্তা।" তিনি যুধিষ্ঠিরকে আশ্বস্ত করলেন যে অর্জুন শীঘ্রই তাঁদের সঙ্গে মিলিত হবে, এবং তারপর নিজ আবাসে প্রত্যাবর্তন করলেন। তাঁর আদেশে নিহত রাক্ষসদের দেহ পর্বত থেকে নিক্ষিপ্ত হল। এইভাবে মণিমানের প্রতি অগস্ত্যের অভিশাপ পূর্ণ হল।

সেই রাত্রি পাণ্ডবেরা কুবেরের প্রাসাদেই যাপন করলেন।

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৩৬তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বনপর্বের ৩৫তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)

 সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা