৫৩তম বনপর্ব-লজ্জার চোরাবালিতে দুর্যোধন: প্রায়োপবেশন থেকে মহাযুদ্ধের মন্ত্র


৫৩তম বনপর্ব-লজ্জার চোরাবালিতে দুর্যোধন: প্রায়োপবেশন থেকে মহাযুদ্ধের মন্ত্র

দ্বৈতবনের সেই ধূসর প্রান্তর থেকে যখন পাণ্ডবজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠির বিদায় নিলেন, দুর্যোধনের ওষ্ঠাধর তখন থরথর করে কাঁপছে। একটি বাক্যও সরল না তাঁর মুখ থেকে। লজ্জা? না, লজ্জার চেয়েও এক ভয়ংকর আত্মগ্লানি এবং অপমানের কালো চাদর যেন জড়িয়ে ধরেছে তাঁর কুরুবংশের শ্রেষ্ঠ অহংকারকে। হস্তিনাপুরের দিকে যখন তাঁর চতুরঙ্গ সেনা যাত্রা শুরু করল, তখন মনে হচ্ছিল কোনো বিজয়ী সম্রাট নন, এক জীবন্ত শবদেহ নিজের ছায়ার পিছু পিছু হেঁটে চলেছে।


পথের পাশে এক নিভৃত, শ্যামল সরোবর। ক্লান্ত সৈন্যদল সেখানে বিশ্রামের জন্য থামল। বাতাসের দোলায় সরোবরের জল কাঁপছিল। সেই চঞ্চল জলের দিকে তাকিয়ে দুর্যোধন যেন নিজের ভেতরের খণ্ড-বিখণ্ড, অস্থির আত্মাটাকেই দেখতে পাচ্ছিলেন।ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়ালেন অঙ্গরাজ কর্ণ। তাঁর মুখে সান্ত্বনার, কিছুটা স্বস্তির হাসি।

“রাজন! সৌভাগ্য যে আপনি অক্ষত শরীরে ফিরে এসেছেন। গন্ধর্বদের ওই মায়াযুদ্ধের চক্রে আমি এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছিলাম, সৈন্যদের সামলানো অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। বাধ্য হয়েই পিছু হটতে হয়েছিল। কিন্তু আপনি যে সপরিবারে এই বিপদ থেকে মুক্ত হয়ে ফিরলেন, এ কেবল আপনারই অলৌকিক বীরত্বের প্রমাণ।”


কর্ণের এই স্তুতিবাক্য তীরের মতো বিঁধল দুর্যোধনের বুকে। কণ্ঠস্বর বুজে এল তাঁর, “রাধেয়! তুমি সত্য জানো না, তাই তোমাকে দোষ দিই না। তুমি ভাবছ এ আমার পরাক্রম? না, কর্ণ, না! গন্ধর্বদের মায়াযুদ্ধের সামনে আমরা ধুলোর মতো উড়ে গিয়েছিলাম। তারা আমাকে, আমার ভাইদের, এমনকি আমাদের স্ত্রীদেরও বন্দী করে আকাশপথে নিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখন, আমাদেরই কিছু পলাতক সৈন্য পাণ্ডবদের কাছে গিয়ে জীবনভিক্ষা চায়।”একটু থামলেন দুর্যোধন। চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে এল এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু।


“যাকে আমরা আজীবন শত্রু ভাবলাম, সেই ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির তাঁর ভাইদের নির্দেশ দিলেন আমাদের উদ্ধার করতে। ভীম-অর্জুনের বাণবর্ষণে গন্ধর্বরাজ চিত্রসেন পরাস্ত হলেন। অর্জুনের সেই দিব্য অস্ত্রের তেজ দেখে চিত্রসেন স্বরূপে প্রকট হয়ে বললেন, তিনি কেবল আমাদের দর্পচূর্ণ করতেই এই বন্দীদশা তৈরি করেছিলেন। কর্ণ, তুমি ভাবো, আমার স্ত্রীদের সামনে, আমার চিরশত্রু যুধিষ্ঠিরের সামনে আমাকে নতজানু করে দাঁড় করানো হলো! এর চেয়ে মৃত্যুও কি শ্রেয় ছিল না? যে শত্রুর দয়ায় এই প্রাণ ফিরে পেলাম, সেই প্রাণ আমি আর রাখব না। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এই সরোবরের তীরেই অন্নজল ত্যাগ করে আমি প্রায়োপবেশনে প্রাণ বিসর্জন দেব। দুঃশাসন, তুই হস্তিনাপুরে ফিরে যা। কর্ণ ও শকুনির পরামর্শে তোরা রাজ্য ভোগ কর। আমি পিতামহ ভীষ্ম, আচার্য দ্রোণ বা বিদুরের চোখের দিকে তাকাতে পারব না।”


জ্যেষ্ঠভাতার এই আত্মহননের সংকল্প শুনে দুঃশাসন কান্নায় ভেঙে পড়লেন। দুর্যোধনের পা জড়িয়ে ধরে বললেন, “সূর্য তার উত্তাপ হারাতে পারে, চন্দ্র হারাতে পারে তার স্নিগ্ধতা, কিন্তু আপনাকে ছাড়া আমি এই পৃথিবী শাসন করব না জ্যেষ্ঠ!”কর্ণ এবং শকুনিও নানাভাবে তাঁকে বোঝাতে চাইলেন। কর্ণ বললেন, “পাণ্ডবরা রাজার প্রজা হিসেবে তাদের কর্তব্য করেছে মাত্র, এতে ক্ষোভের কী আছে? আপনি মরলে তো শত্রুরই জয়।” 

শকুনি কুটিল হেসে বললেন, “যদি এতই অপরাধবোধ, তবে পাণ্ডবদের রাজ্য ফিরিয়ে দিয়ে সন্ধি করো, তাতেও তো ধর্ম হবে! এভাবে কাপুরুষের মতো প্রাণ দিচ্ছ কেন?”
কিন্তু দুর্যোধন অনড়। সমস্ত রাজকীয় বৈভব ত্যাগ করে, কুশ ও বল্কল ধারণ করে তিনি স্তব্ধ হয়ে বসলেন মৃত্যুর প্রতীক্ষায়।
ঠিক সেই সময়, মর্ত্যের এই দৃশ্য দেখে পাতালে কম্পন জাগল দেবতা-পরাজিত দৈত্য ও দানবদের মনে। দুর্যোধনই তাদের শেষ ভরসা, কলির দাবার ঘুঁটি। তিনি প্রাণ হারালে দেবতাদের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই শুরুতেই শেষ হয়ে যাবে।
দৈত্যরা কালবিলম্ব না করে শুক্র ও বৃহস্পতি বর্ণিত অথর্ববেদের মন্ত্রে এক মহাযজ্ঞ শুরু করল। 

যজ্ঞকুণ্ড থেকে জেগে উঠল ‘কৃত্যা’ নামের এক ভয়ংকরী রাক্ষসী। দৈত্যদের আদেশে সেই রাক্ষসী মুহূর্তের মধ্যে মর্ত্যলোক থেকে সুপ্তপ্রায় দুর্যোধনকে তুলে নিয়ে এল রসাতলে, দানবদের সভায়।দানবরাজ দুর্যোধনকে দেখে বললেন, “হে ভরতশ্রেষ্ঠ! আত্মহনন পাপ। আপনি শোক করবেন না। আপনার বিজয় সুনিশ্চিত করতে আমরা পৃথিবীর বুকে সহস্র সংশপ্তক রাক্ষস ও দৈত্যদের পাঠাচ্ছি, যারা অর্জুনের তেজ হরণ করবে। এমনকি ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপাচার্যের শরীরেও আমাদের আবেশ থাকবে, যাতে তাঁরা স্নেহ ভুলে পাণ্ডবদের সংহার করেন। আর আপনার মিত্র কর্ণ তো আছেনই, যিনি অর্জুনকে বধ করবেন। আপনি নিশ্চিন্তে রাজধানীতে ফিরে যান।”


দানবদের মায়াবী আশ্বাসে দুর্যোধনের মোহভঙ্গ হলো। কৃত্যা রাক্ষসী আবার তাঁকে মর্ত্যের সেই সরোবরতীরে ফিরিয়ে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। দুর্যোধনের মনে হলো, তিনি যেন এক দীর্ঘ, অলৌকিক স্বপ্ন দেখলেন।
পরদিন ভোরের আলো যখন ফুটল, কর্ণ এসে দুর্যোধনের হাত ধরলেন। মৃদু হেসে বললেন, “মহারাজ, মৃত মানুষ কোনোদিন প্রতিশোধ নিতে পারে না। যে বেঁচে থাকে, জয়মাল্য তারই জুটবে। আমি ধনুক ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করছি, পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাস শেষ হলেই এই কর্ণের বাণে অর্জুনের পতন হবে।”


দৈত্যদের সেই গোপন আশ্বাস আর কর্ণের এই অমোঘ প্রতিজ্ঞা—দুর্যোধনের ভেতরের সুপ্ত প্রতিহিংসাকে আবার জাগিয়ে তুলল। মৃত্যুর হিমশীতল সংকল্প কর্পূরের মতো উড়ে গেল, সেখানে স্থান করে নিল যুদ্ধের দাবানল।
তীব্র হুংকারে দুর্যোধন আদেশ দিলেন হস্তিনাপুর যাত্রার। রথ, গজ, অশ্ব আর পদাতিকের সেই বিশাল চতুরঙ্গ সেনা আবার সচল হলো। গঙ্গার অবাধ্য স্রোতের মতো সেই বাহিনী যখন হস্তিনাপুরের দিকে ধাবিত হলো, তখন দুর্যোধনের চোখে আর লজ্জা ছিল না, সেখানে জ্বলছিল এক সর্বগ্রাসী কুরুক্ষেত্রের পূর্বাভাস।

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের   ৫৩তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বনপর্বের ৫২তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)

 সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ