৪১তম বনপর্ব-কৃষ্ণ- মার্কণ্ডেয় সংবাদ ও কর্মফলের গূঢ় রহস্য


৪১তম বনপর্ব-কৃষ্ণ- মার্কণ্ডেয় সংবাদ ও কর্মফলের গূঢ় রহস্য

সরস্বতী নদীর তীরে তখন হেমন্তের মৃদু হাওয়া। কার্তিকী পূর্ণিমার পুণ্য তিথিতে আকাশ জুড়ে এক মায়াবী আলোর উৎসব চলিতেছিল। নদীর পবিত্র স্রোতে স্নান সারিয়া, বহু সাধু-তপস্বীর সান্নিধ্যে পাণ্ডব ভ্রাতারা তাঁহাদের নিত্যকর্ম সমাপন করিলেন। কিন্তু নিয়তির চাকা তো এক স্থানে স্থির থাকে না। কৃষ্ণপক্ষ আরম্ভ হইতেই ধৌম্য মুনিকে অগ্রবর্তী করিয়া, অনুচর ও সারথি সহ তাঁহারা পাণ্ডবদের চিরপরিচিত আশ্রয়ের মায়া ত্যাগ করিলেন। গন্তব্য— নিবিড় ও রহস্যময় কাম্যক বন। বনভূমির প্রবেশদ্বারে মুনি-ঋষিরা তাঁহাদিগকে সাদর অভ্যর্থনা জানাইলেন। দ্রৌপদীকে সঙ্গে লইয়া পঞ্চপাণ্ডব আবার এক নতুন প্রবাস জীবনের পটভূমি রচনা করিলেন।

অরণ্যের দিনগুলি কাটিতেছিল এক বুক চাপা প্রতীক্ষায়। একদিন অর্জুনের পরম সুহৃদ এক ব্রাহ্মণ আশ্রমে আসিয়া এক আনন্দের সংবাদ বহন করিয়া আনিলেন। তিনি কহিলেন, "হে ধর্মরাজ, আপনার প্রিয় সখা, মহাবাহু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অতি শীঘ্রই এই বনভূমিতে পদার্পণ করিবেন। পাণ্ডবেরা কাম্যক বনে আসিয়াছেন শুনিয়া তাঁহার চিত্ত চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে। তিনি সর্বদা আপনাদের কুশল চিন্তায় মগ্ন থাকেন। আর একটি পরম সৌভাগ্য— এই ব্রহ্মাণ্ডের বহু উত্থান-পতনের নীরব সাক্ষী, কল্পান্তজীবী মহাতপস্বী মার্কণ্ডেয় মুনিও আপনাদের দর্শন দিতে আসিতেছেন।"

সেই ব্রাহ্মণের বাক্য শেষ হইতে না হইতেই, অরণ্যের ধূলি উড়াইয়া সুসজ্জিত রথে চড়ে স্বয়ং দেবকীনন্দন শ্রীকৃষ্ণ সত্যভামাকে সঙ্গে লইয়া উপস্থিত হইলেন। রথ হইতে অবতরণ করিয়াই কৃষ্ণের মুখে সেই চিরন্তন প্রশান্তির হাসি। তিনি পরম শ্রদ্ধায় প্রথমে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ও মহাবলী ভীমকে প্রণাম করিলেন। নকুল ও সহদেব পরম ভক্তিতে তাঁহাকে প্রণাম জানাইলে, কৃষ্ণ অর্জুনকে বুকে টানিয়া গভীর আলিঙ্গনে বাঁধিলেন। দ্রৌপদীর অশ্রুসজল চোখের দিকে চাহিয়া মধুর সান্ত্বনা বাক্যে তাঁহার ক্ষুব্ধ হৃদয়ে প্রলেপ দিলেন। সত্যভামাও পরম স্নেহে দ্রৌপদীকে বুকে জড়াইয়া লইলেন। শিষ্টাচার ও কুশল বিনিময়ের সেই মধুর পর্ব সাঙ্গ হইলে, বনের কুটিরখানি যেন এক রাজসভায় পরিণত হইল।

ধর্মের গূঢ় রহস্য ও কৃষ্ণের আশ্বাস:

সকলে আসন গ্রহণ করিবার পর শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরের দিকে চাহিয়া গভীর গম্ভীর কণ্ঠে কহিলেন, "পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ, এই মর্ত্যলোকে রাজ্যলাভের চেয়েও ধর্মের পথে অবিচল থাকা কত কঠিন ও শ্রেষ্ঠ, তাহা তুমি প্রমাণ করিয়াছ। শাস্ত্র বলিয়াছে, ধর্মের জন্যই মানুষ তপস্যা করে। তুমি সত্য ও সরলতার দ্বারা ইহলোক ও পরলোক— উভয়কেই জয় করিয়াছ। কোনো জাগতিক কামনার বশে নয়, তুমি নিষ্কামভাবে নিজের কর্তব্য পালন করো, কোনো লোভই তোমাকে স্বধর্ম হইতে বিচ্যুত করিতে পারে না। সেই জন্যই তো জগত তোমাকে 'ধর্মরাজ' বলিয়া জানে। দান, সত্য, তপস্যা, ক্ষমা ও ধৈর্য— এই সমস্ত দৈব গুণ তোমার চরিত্রে ভূষণ হইয়া রহিয়াছে। ধন-ঐশ্বর্যের মোহ তোমাকে স্পর্শ করিতে পারে নাই। হে সখা, তোমার সকল সঙ্কল্প পূর্ণ হইবে, ইহা আমার ধ্রুব বিশ্বাস।"

এরপর কৃষ্ণ কৃপা দৃষ্টি ফিরাইলেন যাজ্ঞসেনীর দিকে। দ্রৌপদীর মাতৃহৃদয়ের ব্যাকুলতা অনুভব করিয়া তিনি কহিলেন, "ভগিনী, তোমার পুত্রগণ অত্যন্ত সুশীল ও বিনয়ী। ধনুর্বেদে তাহাদের অনুরাগ দিন দিন বৃদ্ধি পাইতেছে। দ্বারকায় প্রদ্যুম্ন যেভাবে অনিরুদ্ধ ও অভিমন্যুকে অস্ত্রশিক্ষা দেয়, ঠিক সেইভাবেই সে প্রতিবিন্ধ্যসহ তোমার পুত্রদেরও পরম যত্নে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী করিয়া তুলিতেছে। তুমি চিন্তা করিও না।"

 

দ্রৌপদীকে আশ্বস্ত করিয়া কৃষ্ণ পুনরায় যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, "রাজন, দশার্হ, কুকুর ও অন্ধক বংশের বীরেরা সর্বদা আপনার আজ্ঞাবহ। আপনার প্রতিজ্ঞার কাল পূর্ণ হইবামাত্রই যাদব যোদ্ধারা শত্রুপক্ষকে খড়্গাহুতি দিবে। আপনি সমস্ত শোক ও গ্লানি মুক্ত হইয়া হস্তিনাপুরের সিংহাসনে আরোহণ করিবেন, ইহা কালপুরুষের লিখন।"

মহর্ষি মার্কণ্ডেয়র আগমন ও কর্মফলের জিজ্ঞাসা:

কৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠিরের এই তত্ত্বালোচনার মাঝেই সেখানে এক অলৌকিক জ্যোতির আবির্ভাব ঘটে। সহস্র বৎসরের আয়ুসম্পন্ন, অজয়-অমর মহর্ষি মার্কণ্ডেয় সেখানে উপস্থিত হইলেন। তাঁহার বয়স গণনা করা সাধ্য নয়, অথচ তাঁহার অবয়বে পঁচিশ বছরের এক তেজস্বী যুবকের কান্তি। এই অলৌকিক ঋষির আগমনে শ্রীকৃষ্ণ ও পাণ্ডবগণ সসম্ভ্রমে গাত্রোত্থান করিলেন এবং তাঁহাকে পাদ্য-অর্ঘ্য দিয়া উচ্চ আসনে বসাইলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই দেবর্ষি নারদও সেখানে আকাশমার্গ হইতে অবতরণ করিলেন। অরণ্যের সেই কুটির তখন এক পরম আধ্যাত্মিক মিলনক্ষেত্রে পরিণত হইল।

কুশল প্রশ্নের পর, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের মনে দীর্ঘদিনের জমানো একটি গভীর সংশয় জাগিয়া উঠিল। তিনি মহর্ষির চরণে প্রণত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "হে মুনিবর, আপনি ত্রিকালের সাক্ষী। দেবতা, দৈত্য ও রাজর্ষিদের উত্থান-পতন আপনি প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। আমার মনে এক গভীর সংশয় জাগিয়াছে। আমি অধর্ম করি নাই, সর্বদা সত্যের পথ চলিয়াছি, তবুও আজ আমি গৃহহীন, বনবাসী। আর দুরাচার দুর্যোধন অধর্মের আশ্রয় লইয়াও সমস্ত ঐশ্বর্য ভোগ করিতেছে। মানুষের এই শুভ ও অশুভ কর্মের ফল কীভাবে নির্ধারিত হয়? ঈশ্বর কীভাবে এই কর্মের সুতো নাড়েন? মানুষ কেন এই সংসারে সুখ আর দুঃখের দোলায় দোলে?"

মহর্ষি মার্কণ্ডেয় মৃদু হাসিয়া কহিলেন, "রাজন, তুমি অত্যন্ত বাস্তব ও গভীর প্রশ্ন করিয়াছ। সৃষ্টির আদিতে প্রজাপতি ব্রহ্মা যখন জীবকূল সৃষ্টি করিয়াছিলেন, তখন মানুষের শরীর ছিল পবিত্র ও নির্মল। তাহাদের সংকল্প ছিল সত্য, তাহারা আকাশে বিচরণ করিত এবং দেবতাদের সহিত সরাসরি কথা বলিত। মানুষের মরণ ছিল সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছাধীন, ব্যাধি বা দুঃখের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।"

"কিন্তু কালের অমোঘ নিয়মে মানুষের সেই দিব্য ক্ষমতা লুপ্ত হইল। কাম, ক্রোধ ও লোভের বশবর্তী হইয়া মানুষ পৃথিবীর মাটিতে বন্দি হইল। ছলনা ও কপটতাই হইল তাহাদের জীবিকা। ফলে, তাহাদের আয়ু ক্ষীণ হইল এবং তাহারা জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ হইয়া পড়িল। মনে রাখিও রাজন, যমরাজের বিধান অলঙ্ঘ্য।"

মহর্ষি তাঁহার অমৃতবাণীতে কর্মের চতুর্বিধ গতির কথা ব্যাখ্যা করিয়া কহিলেন, "এই সংসারে চার ধরনের মানুষ দেখা যায়। কেহ ইহলোকে সুখ পায় কিন্তু পরলোকে দুঃখ ভোগ করে; কেহ ইহলোকে দুঃখের সাগর পার হইয়া পরলোকে অনন্ত সুখ লাভ করে। আবার যাহারা কেবল পাপাচারে মত্ত, তাহারা উভয় লোকেই দুঃখ পায়। পক্ষান্তরে, যাহারা ধর্মপথে থাকিয়া অর্থ উপার্জন করে এবং সদ্কার্যে তাহা ব্যয় করে, তাহাদের জন্য ইহলোক ও পরলোক— উভয়ই আনন্দের ধাম। কিন্তু যাহারা বিদ্যা, তপস্যা ও দান না করিয়া কেবল ইন্দ্রিয়সুখে মত্ত থাকে, তাহাদের কপালে কোথাও সুখ নাই।"

যুধিষ্ঠিরের বিষণ্ণ চোখের দিকে চাহিয়া মহর্ষি মার্কণ্ডেয় পরম আশ্বাসের সুরে শেষ বাক্যটি উচ্চারণ করিলেন, "কুন্তীনন্দন, তোমরা সাধারণ মরণশীল নও। দেবতাদের কার্যসিদ্ধির জন্যই তোমাদের এই মর্ত্যে আগমন। তোমরা বীর, তোমরা সদাচারী। এই দুঃখের দিনগুলি তোমাদের ক্ষণস্থায়ী পরীক্ষা মাত্র। এই তিতিক্ষার পরেই আসিতেছে পরম গৌরব ও সুখের দিন। অতএব, বর্তমানের এই কষ্টে ম্রিয়মাণ হইও না, ইহাই তোমাদের ভবিষ্যতের মহাসুখের সোপান।"

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের   ৪১তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বনপর্বের ৪০তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)

 সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা