অষ্টমভাগ-বিরাটপর্ব- গাণ্ডীবের টঙ্কার আর সেই প্রথম কুরুক্ষেত্রের আগে প্রথম যুদ্ধ
অষ্টমভাগ-বিরাটপর্ব- গাণ্ডীবের টঙ্কার আর সেই প্রথম কুরুক্ষেত্রের আগে প্রথম যুদ্ধ
কৌরব সেনার ব্যূহ সবে তৈরি শেষ হয়েছে, অমনি দিগন্ত চিরে ধেয়ে এল এক উথালপাথাল ঘর্ঘর শব্দ— অর্জুনের রথ আসছে!
সবার আগে চমকে উঠলেন আচার্য দ্রোণ। দূর-দিগন্তে ওই রথের কপিধ্বজা আর আকাশ কাঁপানো হনুমানের গর্জন চিনে নিতে তাঁর এক মুহূর্তও দেরি হয়নি। গাঢ় স্বরে দ্রোণ বলে উঠলেন, “চোখ মেলে দেখো বীরগণ, অর্জুন আসছে! শুনছ গাণ্ডীবের ওই টঙ্কার? ঠিক যেন বাজ পড়ছে!”
কথা শেষ হতে না হতেই দু'টি বাণ এসে বসল দ্রোণের চরণে, আর দু'টি ছিটকে গেল তাঁর কানের পাশ দিয়ে। কতকালের বনবাস আর নির্বাসন সয়ে এসে প্রিয় শিষ্য আজ এইভাবেই গুরুকে প্রণাম জানাল, কুশল শুধাল। গুরুর বুকে তখন স্নেহ আর গর্বের এক তোলপাড় ঝাপটা— মুহূর্তের জন্য যেন যুদ্ধের নিষ্ঠুরতাই থমকে গেল।
কিন্তু অর্জুনের দৃষ্টি তখন জ্বলছে অন্য আগুনে। রথ একটু এগিয়ে নিতে বলে তিনি খুঁজলেন দুর্যোধনকে। না, কুরুকুলের সেই অধম কোথাও নেই! অর্জুন বুঝলেন, প্রাণের ভয়ে গোধন নিয়ে সে দক্ষিণ দিকে চম্পট দিয়েছে। উত্তরকে রথের মুখ ঘোরাতে বলেই শুরু হলো অর্জুনের প্রলয়নাচন। গাণ্ডীবের গুণ থেকে ঠিকরে বেরোতে লাগল অজস্র শাঁসে-জলে ভরা বাণ। আতঙ্কে গরুর পাল লেজ উঁচিয়ে হাম্বারবে ছিটকে পালাল দক্ষিণে, অর্জুনও ক্ষিপ্র হাতে গোধন উদ্ধার করে সোজা ধেয়ে গেলেন দুর্যোধনের দিকে।
কৌরব বীরেরা তখন দিশেহারা হয়ে পথ আগলে দাঁড়াল। অর্জুন উত্তরকে বললেন, “উত্তর, দুর্যোধনের চাটুকারিতা করে কর্ণের বড্ড দেমাক বেড়েছে। আগে ওর কাছে চলো!”
বি:দ্র: কবচধারী কর্ণের জন্ম কাহিনি ঝালিয়ে নিতে এখানে ক্লিক করুন
চিত্রসেন, সংগ্রামজিৎ থেকে শুরু করে বিকর্ণ কিংবা শত্রুন্তপ— অর্জুনের বাণবর্ষণের সামনে কেউ টিকতে পারল না। কারো রথ জ্বলল দাবানলের মতো, কেউ বা উপড়ে যাওয়া গাছের মতো ঢলে পড়ল মাটিতে। কর্ণের ভাই সংগ্রামজিৎকে এক বাণেই ধরাশায়ী করলেন অর্জুন।
বি:দ্র:কর্ণ ও তাঁর ভাই সংগ্রামজিতের এক অচেনা গাথা জানতে এখানে ক্লিক করুন
ভাইয়ের রক্ত দেখে কর্ণের ভেতরের সিংহটা জেগে উঠল। বুক চিতিয়ে তিনি সামনে এলেন— শুরু হলো মহাবলী আর ধনুর্বীর দুই মহারথীর মহারণ! দুজনেই পরাক্রান্ত, দুজনেই ক্ষিপ্র। গোটা কৌরব সেনা যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়ল সেই যুদ্ধ দেখতে। কিন্তু অর্জুনের রুদ্রমূর্তির সামনে শেষ রক্ষা হলো না কর্ণের। তীব্র বাণে ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত হয়ে আহত হাতির মতো রণক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলেন তিনি।
কর্ণ পিছু হটতেই একে একে সামনে এলেন কৃপাচার্য, আর তারপর স্বয়ং গুরু দ্রোণাচার্য। গুরু আর শিষ্যের এই সংঘাত যেন মহাকালের এক নিষ্ঠুর খেলা!
অর্জুন হাত জোড় করে গুরুকে প্রণাম জানিয়ে বললেন, “প্রভু, এতদিন বনে ঘুরেছি, আজ শত্রুর ওপর শোধ নেওয়ার দিন। আপনি নিজে আগে অস্ত্র না তুললে আমি আপনার গায়ে হাত দেব না।”
গুরুর প্রতি পরম শ্রদ্ধা আর ক্ষত্রিয় ধর্মের এই অনিবার্য যন্ত্রণা— দুইয়ের টানাপোড়েনে আকাশ-বাতাস তখন ভারাক্রান্ত। দ্রোণ একুশটা বাণ ছুঁড়লেন, অর্জুন হাওয়ায় তা কেটে ফেললেন। শুরু হলো দিব্যাস্ত্রের লড়াই— ঐন্দ্র, বায়ব্য, আগ্নেয় একের পর এক আছড়ে পড়ল, আর অর্জুনের ক্ষিপ্রতায় সব ভস্ম হয়ে গেল। আকাশে দেবতারা পর্যন্ত থমকে দাঁড়িয়ে দেখলেন গুরুর বিরুদ্ধে শিষ্যের এই অতুল্য লড়াই। দ্রোণ নিজেই বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন অর্জুনের এই অলৌকিক গতি দেখে। অর্জুনের বাণবৃষ্টিতে ঢেকে গেল দ্রোণের রথ, কেটে পড়ল ধ্বজা। অবশেষে আহত ও পরাজিত শরীরে দ্রোণও যুদ্ধের সীমানা পেরিয়ে সরে দাঁড়ালেন।
বিকেলের সূর্য তখনও পুরোপুরি মেলানি, অথচ ধুলো আর বাণের মেঘে চারপাশ এক মায়াবী, ঘোলাটে রূপ নিয়েছে। প্রকৃতি যেন নিরবে মেনে নিল— আজকের এই রক্তক্ষয়ী আঙিনায়, এই একলা রথের সামনে দাঁড়ানোর সাধ্য আর কারো নেই!
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে এবং বনপর্ব ৬৫তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিরাটপর্বের অষ্টমভাগ ভাগের আলোচনা এবং বিরাট পর্বের পরবর্তী ভাগ চলবে।
বিরাটপর্বের সপ্তমভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata )
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment