পঞ্চমভাগ বিরাটপর্ব -বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ ও কৌরব সভায় নিঃশব্দ ষড়যন্ত্র-


পঞ্চমভাগ বিরাটপর্ব -বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ ও কৌরব সভায় নিঃশব্দ ষড়যন্ত্র-

সংবাদটা প্রথমে এল বাতাসের মতো, কেউ জানে না ঠিক কোথা থেকে তার উৎপত্তি। তারপর একজন ফিসফিস করে বলল, তারপর আরেকজন, আর দেখতে দেখতে সমস্ত হস্তিনাপুর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল একটাই অবরুদ্ধ গুঞ্জন— কীচক আর নেই। মহাবলী কীচক, যাঁর প্রতাপের নাম শুনলে ত্রিগর্তের অভিজ্ঞ সৈন্যরাও দু-পা পিছিয়ে যেত, তাঁকে তাঁর ভাইদের সমেত কারা যেন এক রাতে নিস্তব্ধে মুছে দিয়েছে পৃথিবীর বুক থেকে। বিরাট রাজার রাজসভায় যে মানুষটা এতদিন বাঘের মতো দর্পভরে হেঁটে বেড়াত, সে আজ নিথর, নিঃশ্বাসহীন। খবরটা প্রথমটা কারও বিশ্বাসই হতে চায়নি। তারপর ধীরে ধীরে, এক হিমশীতল সত্যের মতো, তা গ্রহণ করে নিতে হলো সকলকে।

কৌরবদের রাজসভায় এ নিয়ে গুজবের শেষ রইল না। কেউ কেউ চোখ কপালে তুলে আশ্চর্য হয়ে বলল, "কীচকের মতো বীরকে হত্যা করা কি সাধারণ মানুষের কাজ!" আবার কেউ বা মৃদু হেসে আড়ালে কুটিল মন্তব্য করল, "না না, এতে আশ্চর্যের কী আছে? কীচক লোকটা যত বড় বীর ছিল, ততটাই ছিল নীচ আর কামাতুর। পরের স্ত্রীর দিকে তার অনায়াস লোভ ছিল অসংযত, আচরণ ছিল পঙ্কিল। এমন মানুষকে তো একদিন না একদিন পাপের খেসারত দিতেই হতো।" লোকমুখে রটে গেল, গন্ধর্বরাই নাকি এসে তাকে হত্যা করেছে। তা সে গন্ধর্বই হোক কিংবা রক্তমাংসের মানুষ— এই চাঞ্চল্যকর মৃত্যু নিয়ে রাজ্য থেকে রাজ্যে এক আশঙ্কার আলোড়ন উঠে মিলিয়ে গেল কিছুদিন।

ঠিক এই উত্তপ্ত সময়েই দুর্যোধনের পাঠানো সেই গোপন চরেরা হস্তিনাপুরে ফিরে এল। বনে বনে, পাহাড়ে পাহাড়ে যারা ঘুরছিল পাণ্ডবদের সন্ধানে, তাদের চেহারা তখন ধুলোমাখা, চোখেমুখে চূড়ান্ত ব্যর্থতা আর শ্রান্তির ছাপ। রাজসভায় তখন ভীষ্ম বসে আছেন পরম গম্ভীর হয়ে; তাঁর পাশে দ্রোণ, কর্ণ, কৃপ এবং দুর্যোধনের অনুগত ভাইয়েরা। গোটা সভাটা যেন এক অদৃশ্য উত্তেজনার টানে শ্বাস চেপে আটকে ছিল।

গুপ্তচরেরা মাথা নত করে করুণ স্বরে বলল, "মহারাজ, আমরা পাহাড়-পর্বত ঘুরেছি, গ্রামে-গঞ্জে, নগরে-নগরে তন্ন তন্ন করে সন্ধান করেছি। কিন্তু পাণ্ডবদের কোনো চিহ্ন মিলল না। তাঁরা যেন হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেছেন। আমাদের আশঙ্কা হয়, হয়তো তাঁরা আর এই পৃথিবীতে বেঁচে নেই। তবে দুটি সংবাদ আছে। প্রথমত, ইন্দ্রসেন এবং অন্যান্য সারথিরা পাণ্ডবদের ছাড়াই দ্বারকায় ফিরে গেছে এবং তারা সেখানেই অবস্থান করছে— অর্থাৎ পাণ্ডবরা দ্বারকায় যাননি। আর দ্বিতীয়ত, রাজা বিরাটের সেই দুর্দান্ত সেনাপতি কীচক, যে একদা ত্রিগর্তদের ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল, তাকে ও তার ভাইদের গোপনে গন্ধর্বরা হত্যা করেছে।"

সংবাদটা শুনে দুর্যোধন অনেকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন শূন্যতার দিকে। তাঁর কপালে ফুটে উঠল সেই পরিচিত কুটিল চিন্তার ভাঁজ, যা সময় গণনা করার সময় প্রায়শই দেখা যায়। তারপর সভাসদদের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত বিষণ্ণ অথচ কঠোর গলায় বললেন, "পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসের তেরোটি বছর প্রায় শেষ হতে চলল। এই তেরো বছর ফুরোলেই ওরা আবার মদমত্ত হাতির মতো, বিষধর সাপের মতো আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। ওরা নিশ্চয়ই নিখুঁত হিসেব রেখে কোথাও লুকিয়ে আছে। আমাদের এমন কিছু করতে হবে যাতে ওরা রাগে উন্মত্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয় এবং আবার বারো বছরের বনবাসে ফিরে যায়। ওদের জলদি খুঁজে বের করো, তা না হলে হস্তিনাপুরের সিংহাসন কোনোদিন নিশ্চিন্ত হতে পারবে না।"

দুর্যোধনের কথা শেষ হতে না হতেই কর্ণ স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে এগিয়ে এলেন। বললেন, "ভরতনন্দন, সময় নষ্ট না করে আরও দক্ষ গুপ্তচর পাঠান। তারা ছদ্মবেশে জনবহুল নগরে, মনোরম রাজসভায়, ঋষিদের আশ্রমে, তীর্থে তীর্থে ঘুরে বেড়াক। অত্যন্ত বিনীতভাবে তারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে খবর সংগ্রহ করুক।" দুঃশাসনও সঙ্গে সঙ্গে দাদার সুরে সুর মিলিয়ে বললেন, "রাজন, যাদের ওপর আপনার সবচেয়ে বেশি আস্থা, তাদেরই পাঠান। কর্ণের প্রস্তাব একদম যথার্থ।"

এই সময়ে দ্রোণাচার্য মুখ খুললেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়ল গভীর প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা। তিনি বললেন, "পাণ্ডবরা নিছক সাধারণ যোদ্ধা নয়। তারা বীর, বিদ্যান, পরম বুদ্ধিমান, আত্মসংযমী এবং ধর্মের প্রতীক। তারা তাদের জ্যেষ্ঠ ভাই যুধিষ্ঠিরের আদর্শকে অন্ধের মতো অনুসরণ করে। এমন মহাপুরুষদের সহজে বিনাশ হয় না। আর যুধিষ্ঠির? তিনি তো অতি বিশুদ্ধ, সত্যবাদী ও তেজস্বী মানুষ। সাধারণ চোখে তাঁকে চেনা প্রায় অসম্ভব। তাই যদি খোঁজ নিতেই হয়, তবে এমন কোনো পণ্ডিত, ব্রাহ্মণ বা সিদ্ধপুরুষদের গোপনে পাঠাতে হবে, যারা পাণ্ডবদের হৃদয় থেকে চেনে।"

অবশেষে বার্তা দিলেন ভরতবংশের বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম। কাল-জ্ঞানী, ধর্মজ্ঞ এই বৃদ্ধ মহাপুরুষ শান্ত দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, "কৌরবগণ, নীতিবান মানুষের নীতিকে কোনো দুর্নীতিপরায়ণ শক্তি নষ্ট করতে পারে না। যুধিষ্ঠির যে রাজ্য বা নগরে আশ্রয় নেবেন, সেখানকার বাতাসই বদলে যাবে। সেখানকার মানুষ হবে দানশীল, নম্রভাষী, সংযমী ও হৃষ্টপুষ্ট। সেখানে হিংসা বা পরশ্রীকাতরতা থাকবে না, কেবল শোনা যাবে বেদপাঠ আর যজ্ঞের পবিত্র ধ্বনি। সময়মতো বৃষ্টি হবে, শস্যে ভরে উঠবে মাঠ, গাভী দেবে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর দুধ। যুধিষ্ঠিরের ধর্ম, ধৈর্য, ক্ষমা আর দয়া এমন এক মহামহিম প্রভাব সৃষ্টি করে যে সাধারণ মানুষ তো দূর, সূক্ষ্ম বুদ্ধি ছাড়া তাঁকে চেনা সম্ভব নয়। যেখানেই এমন অদ্ভুত সমৃদ্ধি আর শান্তি দেখবে, ধরে নেবে পাণ্ডবরা সেখানেই লুকিয়ে আছে। সেইসব অঞ্চল লক্ষ্য করে অনুসন্ধান চালাও।"

কৃপাচার্য ভীষ্মের কথায় সম্মতি জানিয়ে যোগ করলেন, "পিতামহ যুক্তিযুক্ত কথা বলেছেন। তবে মনে রেখো, অজ্ঞাতবাসের মেয়াদ শেষ হলেই পাণ্ডবদের শক্তি ও তেজ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। তাই এখন থেকেই আমাদের সৈন্যবল, রাজকোষ ও কৌশল গুছিয়ে রাখতে হবে— যাতে প্রয়োজনে যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া যায়, আবার ক্ষেত্রবিশেষে সম্মানের সঙ্গে সন্ধিও করা যায়। সৈন্যদের সন্তুষ্টিই রাজত্বের আসল শক্তি।"

এত আলোচনার মাঝে হঠাৎ ত্রিগর্তরাজ সুশর্মা কর্ণের দিকে একবার সূচক দৃষ্টিপাত করে দুর্যোধনকে বললেন, "মহারাজ, মৎস্যদেশের শাল্ববংশীয় রাজারা বারবার আমাদের পীড়ন করেছে। আর তাদের সেনাপতি কীচক আমাকে কম অপমান করেনি!  (কীচকের দাপটে সুশর্মা বহুবার লাঞ্ছিত হয়েছেন, ত্রিগর্তের সীমান্ত বারবার সংকুচিত হয়েছে মৎস্যদেশের চাপে। কিন্তু ক্ষমতার সেই অসমান ভারসাম্য সুশর্মাকে মুখ বুজে অপমান সহ্য করতে বাধ্য করেছিল।) লোকটা ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও অহংকারী। আজ যখন সেই পাপিষ্ঠ কীচক নিহত হয়েছে এবং বিরাট রাজা দুর্বল ও নিরউৎসাহ হয়ে পড়েছেন, তখন এটাই সুযোগ মৎস্যদেশ আক্রমণ করার। ওই রাজ্য জয় করে সেখানকার অপরিসীম গোধন ও ধনরত্ন আমরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে পারি।"

কথাটা কর্ণের বেশ মনে ধরল। তিনি দুর্যোধনকে উৎসাহ দিয়ে বললেন, "সুশর্মা চমৎকার প্রস্তাব দিয়েছেন! এটাই এখন সবচেয়ে উপযুক্ত কাজ। আপনি অবিলম্বে সৈন্য সাজানোর আদেশ দিন।"

দুর্যোধনের মুখে তখন এক হিংস্র তৃপ্তির হাসি। তিনি দুঃশাসনকে ডেকে আজ্ঞা দিলেন, "ভাই দুঃশাসন, অবিলম্বে আক্রমণের যাবতীয় ব্যবস্থা করো। প্রথম দিনে সুশর্মা মৎস্যদেশের সীমান্ত আক্রমণ করে তাদের গোধন হরণ করবে। আর দ্বিতীয় দিনে আমরা সেনাদলকে দু-ভাগে ভাগ করে বিরাট রাজার এক লক্ষ গোধন ছিনিয়ে নেব।"

সভা ভেঙে গেল। কিন্তু রাজসভার ধূপের ধোঁয়ায় আর বাতাসে রয়ে গেল এক ভারী, থমথমে উত্তেজনা। হস্তিনাপুরের অলিন্দে তখন সন্ধ্যার ছায়া নামছে। কেউ জানল না, ওই এক লক্ষ গোধনের লোভের আড়ালেই আজ বোনা হয়ে গেল এক মহাবিনাশী যুদ্ধের বীজ— যার পরিণাম সমস্ত আর্যাবর্তকে রক্তে ভাসিয়ে দেবে।

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে, সভা পর্ব ১৬তম ভাগে এবং বনপর্ব ৬৫তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিরাটপর্বের পঞ্চমভাগ  ভাগের  আলোচনা এবং বিরাট পর্বের পরবর্তী ভাগ চলবে।

বিরাটপর্বের চতুর্থ  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত  মহাভারতের বিষয়সূচি (Indexes of Brief Mahabharata ) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)