৫২তম বনপর্ব-গন্ধর্বের মার: দ্বৈতবনে দুর্যোধনের দর্পচূর্ণ

 


৫২তম বনপর্ব-গন্ধর্বের মার: দ্বৈতবনে দুর্যোধনের দর্পচূর্ণ

সে এক আশ্চর্য বিষণ্ণ দুপুর। দ্বৈতবনের শান্ত সরোবরের তীরে কুটির বেঁধে দিন কাটছিল পাণ্ডবদের। রোদ, ঝড়, বৃষ্টির ঝাপটায় শরীরগুলো শীর্ণ, কিন্তু ভেতরের তেজ নেভেনি। এমন সময় হস্তিনাপুর থেকে খবর এল—পাণ্ডবদের এই বনবাসের কষ্ট চাক্ষুষ করে নিজেদের চোখ জুড়োতে আসছে কৌরব বাহিনী। উদ্দেশ্য একটাই, গোধন গণনার ছল করে পাণ্ডবদের দীনতা দেখে বুক ফুলিয়ে হাসা, আর বল্কলধারিণী দ্রৌপদীকে রত্নালঙ্কারে সেজে ব্যঙ্গ করা। বৃদ্ধ ধৃতরাষ্ট্র বারণ করেছিলেন, কিন্তু কর্ণের উস্কানি আর শকুনির কুটিল হাসির কাছে হার মেনেছিল তাঁর পিতৃস্নেহ।

হস্তিনাপুর থেকে বেরোল অক্ষৌহিণী সেনা। আট হাজার রথ, ত্রিশ হাজার হাতি, আর হাজার হাজার পদাতিকের দাপটে কেঁপে উঠল বনের মাটি। অহংকারের পারদ তখন সপ্তমে। দ্বৈতবনে পৌঁছেই দুর্যোধন আদেশ দিলেন সরোবরের তীরে এক বিলাসবহুল প্রমোদকানন বা ক্রীড়াভবন তৈরি করতে। কিন্তু নিয়তির খেলা অন্যরকম ছিল। কৌরব সেনারা জানত না, সেই সরোবরে তখন স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রের নির্দেশে জলবিহার করছিলেন গন্ধর্বরাজ চিত্রসেন।

দুর্যোধনের উদ্ধত অনুচরেরা গন্ধর্বদের এলাকা খালি করার হুকুম দিতেই জ্বলে উঠল আগুন। চিত্রসেনের গন্ধর্ব বাহিনী স্পষ্ট জানিয়ে দিল, "কারও চাকর নই আমরা, যমের বাড়ি যাওয়ার শখ না থাকলে পালা।" কৌরবরা তো আর পিছু হটার পাত্র নয়, দুর্যোধনের আদেশে কয়েক সহস্র সেনা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। শুরু হলো এক রোমহর্ষক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।

প্রথমে কর্ণের বাণে গন্ধর্বরা কিছুটা পিছু হটলেও, গন্ধর্বরাজ চিত্রসেন যখন তাঁর মায়াজাল বিস্তার করলেন, পাশা উল্টে গেল মুহূর্তেই। এক একজন কৌরব বীরকে দশজন করে গন্ধর্ব ঘিরে ফেলল। যে বীর কর্ণের দাপটে পৃথিবী কাঁপত, গন্ধর্বদের মারণাঘাতে তাঁর রথ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। প্রাণ বাঁচাতে ঢাল-তলোয়ার নিয়ে কর্ণকে চড়তে হলো বিকর্ণের রথে। দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালিয়ে গেল কৌরব সেনা, রণক্ষেত্র ছাড়লেন অন্য ভাইয়েরাও।

কিন্তু দুর্যোধন একাই লড়ে যাচ্ছিলেন। শেষরক্ষা হলো না। চারদিক থেকে ছেঁকে ধরে গন্ধর্বরা তাঁর রথ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল। আকাশ থেকে নেমে এসে চিত্রসেন জীবন্ত বন্দী করলেন দুর্যোধনকে। বেঁধে ফেলা হলো দুঃশাসন, দুর্মুখ, দুর্জয়সহ কৌরব রাজমহিষীদেরও। কৌরবদের যে মন্ত্রীরা পাণ্ডবদের ধ্বংস দেখতে এসেছিলেন, তাঁরাই এখন কুঁকড়ে গিয়ে যুধিষ্ঠিরের পায়ের কাছে এসে আছড়ে পড়লেন—"রক্ষা করুন মহারাজ! গন্ধর্বরা দুর্যোধন ও আমাদের রানিদের বন্দী করে নিয়ে যাচ্ছে!"

ভীম তো হেসেই আকুল। বললেন, "বেশ হয়েছে! যে কাজ আমাদের অস্ত্র আর হাতি-ঘোড়া নিয়ে করতে হতো, তা গন্ধর্বরাই করে দিল। কূলবধূদের অপমান করতে এসে এখন নিজেরাই খাঁচায় বন্দী!" কিন্তু ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির স্থির, অচঞ্চল। তিনি ভীমকে শান্ত করে বললেন, "ভীম, এখন কটু কথা বলার সময় নয়। নিজেদের মধ্যে বিবাদ থাকতেই পারে, কিন্তু যখন বাইরের শত্রু আক্রমণ করে, তখন কুলের সম্মান রক্ষা করা আমাদের ধর্ম। আমাদের কূলবধূরা পরের অধীনে, এটা গোটা বংশের লজ্জা। যাও অর্জুন, নকুল, সহদেব—সবাই মিলে ওদের উদ্ধার করে আনো।"

যুধিষ্ঠিরের আদেশে বুকে ক্ষোভ চেপেও গাণ্ডীব হাতে রণক্ষেত্রে নামলেন অর্জুন। প্রথমে বুঝিয়ে বললেন চিত্রসেনের অনুচরদের। কিন্তু গন্ধর্বরা যখন শুনল না, তখন আকাশ জুড়ে বাণের এক অজেয় জাল বুনলেন অর্জুন। খাঁচার পাখির মতো আটকে গেলেন গন্ধর্বরা। চিত্রসেন মায়াবলে অদৃশ্য হয়ে যুদ্ধ করতে চাইলে অর্জুন শব্দভেদী দিব্যাস্ত্র প্রয়োগ করলেন। নিরুপায় হয়ে চিত্রসেন নিজের রূপ প্রকট করে হেসে বললেন, "অর্জুন, আমি তোমার সখা চিত্রসেন!"

অস্ত্র নামিয়ে নিলেন অর্জুন। চিত্রসেন জানালেন, "ইন্দ্র স্বর্গে বসেই এই পাপিষ্ঠ দুর্যোধন আর কর্ণের কুটিল মতলব জানতে পেরেছিলেন। তোমাদের কষ্ট দেখে হাসতে এসেছিল এরা, তাই ইন্দ্রের আদেশে এদের বেঁধে নিয়ে যাচ্ছিলাম।" কিন্তু অর্জুন অনড়, "ধর্মরাজের আদেশ, দুর্যোধনকে মুক্ত করতেই হবে।"

সবাই মিলে যখন বন্দী কৌরবদের নিয়ে যুধিষ্ঠিরের সামনে এলেন, ধর্মরাজ গন্ধর্বদের ধন্যবাদ জানিয়ে কৌরবদের মুক্তি দিতে বললেন। চিত্রসেন সদলবলে স্বর্গে ফিরে গেলেন। আর মুক্ত হয়ে লজ্জায়, অপমানে মাটির সাথে মিশে গেলেন দুর্যোধন।

যুধিষ্ঠির অত্যন্ত মধুর স্বরে দুর্যোধনের মাথায় হাত রেখে বললেন, "ভাই, আর কখনো এমন দুঃসাহস কোরো না। দুঃসাহসী মানুষ কখনো সুখী হয় না। এবার সবাইকে নিয়ে রাজধানীতে ফিরে যাও, মনে কোনো ক্ষোভ রেখো না।"

যে দুর্যোধন এসেছিলেন পাণ্ডবদের অপমান করতে, তিনি ফিরলেন পাণ্ডবদেরই দয়ায় প্রাণ ভিক্ষা পেয়ে। বিষাদে, ক্ষোভে আর অপমানে তাঁর বুকটা তখন ফেটে যাচ্ছিল, আর হস্তিনাপুরের পথটা যেন তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল এক অনন্ত নরকযন্ত্রণা।

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের   ৫২তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বনপর্বের ৫১তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ