৫৮তম বনপর্ব-: রামায়ণের আদি কথা-পুলস্ত্যে মুনি, রাবণ-
৫৮তম বনপর্ব-: রামায়ণের আদি কথা-পুলস্ত্যে মুনি, রাবণ-
জয়দ্রথকে পরাজিত করে, তার পাশবিক কবল থেকে দ্রৌপদীকে উদ্ধার করে যুধিষ্ঠির তখন ঋষিমণ্ডলীর মাঝে উপবিষ্ট। চারদিকে মহর্ষিরা বসে আছেন থমথমে মুখে। তাঁদের চোখেমুখে পাণ্ডবদের এই অন্তহীন দুর্দশার জন্য গভীর, অনুচ্চারিত বেদনার ছাপ। পাতার পর পাতা উল্টে যাওয়া ইতিহাসের মতো বাতাস বইছে বনের গাছপালায়। বারবার তাঁরা আক্ষেপ করছেন—আহা, এমন মহাত্মা পুরুষদেরও কী নিদারুণ, অলৌকিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে! মানুষের ভাগ্য কি তবে শুধুই এক অন্ধ নিয়তির খেলা?
যুধিষ্ঠির তখন তাকালেন দীর্ঘজীবী মার্কণ্ডেয় ঋষির দিকে। যুধিষ্ঠিরের কণ্ঠে সেই পুরনো, চাপা কষ্টটুকু আবার কুয়াশার মতো ফিরে এল। তিনি একটু উদাসীন, একটু ক্লান্ত হাসলেন। তারপর বললেন, "ভগবান, আপনি তো ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান সবই জানেন, দেবর্ষিদের মধ্যেও আপনার খ্যাতি সর্বজনবিদিত। আমার বুকের ভেতর একটা প্রশ্ন অনেকদিন ধরে পাথরের মতো জমে আছে, আজ তার নিরসন করুন। দেখুন, দ্রুপদকন্যা কত সৌভাগ্যবতী—যজ্ঞবেদী থেকে তাঁর জন্ম, মাতৃগর্ভের অন্ধকার কষ্ট তাঁকে ছুঁতেও পারেনি। মহাত্মা পাণ্ডুর পুত্রবধূ হওয়ার গৌরবও তিনি পেয়েছেন। কোনোদিন কোনো পাপ কাজ তিনি করেননি, ধর্মের সূক্ষ্ম তত্ত্ব জানেন এবং তা মেনে চলেন নিষ্ঠাভরে। অথচ সেই পরম পবিত্র নারীকে পাপাচারী জয়দ্রথ পশুর মতো হরণ করল, আর সেই ভয়ানক অপমান আমাদের জ্যান্ত চোখের সামনে দেখতে হলো! স্বজন-পরিজন থেকে দূরে, এই শ্বাপদসংকুল বনে থেকে আমরা কত রকম লাঞ্ছনা সহ্য করছি। তাই আপনার কাছে জিজ্ঞেস করি—আমাদের মতো এমন হতভাগ্য, ভাগ্যাহত পুরুষ কি আপনি এই বিশাল জগতে আর কোথাও দেখেছেন?"
মার্কণ্ডেয় মুনি একটু স্থির হয়ে বসলেন। তাঁর দৃষ্টি চলে গেল বহু দূরে, যেন সময়ের অনন্ত গভীরে ডুব দিয়ে হারিয়ে যাওয়া কোনো সত্যকে খুঁজে আনছেন তিনি। তারপর শান্ত, গভীর স্বরে বললেন, "রাজন, মানুষের অহংকার বড় ঠুনকো। তুমি আজ যে দুঃখকে হিমালয়ের মতো ভাবছ, তার চেয়েও বড় দুঃখ এই পৃথিবী দেখেছে। স্বয়ং শ্রীরামকেও তো চৌদ্দ বছরের বনবাস আর তীব্র স্ত্রীবিয়োগের মহাদুঃখ ভোগ করতে হয়েছিল। রাক্ষসরাজ দুরাত্মা রাবণ ছদ্মবেশে, মায়াজাল বিস্তার করে নির্জন আশ্রম থেকে শ্রীরামের প্রাণাধিক পত্নী সীতাদেবীকে হরণ করেছিল। বৃদ্ধ জটায়ু তাঁকে বাধা দিতে গিয়েছিলেন বলে রাবণ তলোয়ারের এক কোপে তাঁকেও বধ করে। তারপর শ্রীরাম সুগ্রীবের সহায়তায় সমুদ্রের ওপর অভূতপূর্ব সেতু বেঁধে লঙ্কায় গিয়ে রাবণকে সপরিবারে বধ করেন এবং সীতাদেবীকে উদ্ধার করে ফিরিয়ে আনেন।"
এই সংক্ষিপ্ত উল্লেখেই যুধিষ্ঠিরের মনের ভেতর যেন একটা নতুন কৌতূহল চাবুক মারল। তিনি সোজা হয়ে বসে বললেন, "মুনিবর, পুণ্যশ্লোক শ্রীরামের কথা আর তাঁর সেই অলৌকিক চরিত্র আমি বিস্তারিতভাবে শুনতে চাই। তিনি কোন বংশের প্রদীপ ছিলেন, তাঁর বল-পরাক্রমই বা কেমন ছিল? আর এও জানতে চাই—যে রাবণকে নিয়ে এত কথা, সে কার পুত্র ছিল? শ্রীরামের মতো একজন আদর্শ মানুষের সঙ্গে তার শত্রুতার বীজটা ঠিক কোথায় পোঁতা ছিল?"
মার্কণ্ডেয় মুনি তখন শুরু করলেন সেই দীর্ঘ, মহাকাব্যিক কাহিনি।
ইক্ষাকু বংশে অজ নামে এক বিখ্যাত এবং ধার্মিক রাজা ছিলেন। তাঁর পুত্র দশরথ—অত্যন্ত পবিত্র স্বভাবের, বেদজ্ঞ এবং প্রজাবৎসল মানুষ। দশরথের চার পুত্র—রাম, লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন—প্রত্যেকেই যেন এক একটি জ্বলন্ত নক্ষত্র, ধর্মতত্ত্বে পরম পারদর্শী। কৌশল্যা ছিলেন রামের মা, ভরতের মা কৈকেয়ী, আর সুমিত্রার গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন দুই যমজ ভাই লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন। অন্যদিকে, বিদেহরাজ জনকের কন্যা সীতা—বিধাতা যেন নিজের হাতে সমস্ত সৌন্দর্য ঢেলে তাঁকে শ্রীরামের জন্যই সৃষ্টি করেছিলেন।
এবার শোনো রাবণের জন্মকথা, যার অহংকারে একদিন পৃথিবী কেঁপে উঠেছিল। জগৎস্রষ্টা স্বয়ম্ভু ব্রহ্মা ছিলেন রাবণের পিতামহ। ব্রহ্মার প্রিয় মানসপুত্র ছিলেন মহর্ষি পুলস্ত্য। পুলস্ত্যের পত্নীর নাম ছিল গৌ—তাঁদের এক পরম ধার্মিক পুত্র হলেন বৈশ্রবণ, যাকে আমরা কুবের নামে চিনি। কুবের নিজের পিতাকে ছেড়ে পিতামহ ব্রহ্মার সেবাতেই মগ্ন থাকতেন। এতে পুলস্ত্য এত ক্রুদ্ধ হলেন যে, যোগবলে নিজের অর্ধশরীর থেকে নতুন এক দেহের সৃষ্টি করলেন—আর সেই ক্রুদ্ধ রূপেই তিনি পৃথিবীতে বিখ্যাত হলেন 'বিশ্রবা' নামে।
বিশ্রবা সবসময় কুবেরের ওপর চটে থাকতেন। কিন্তু ব্রহ্মা কুবেরের ভক্তিতে এতটাই প্রসন্ন ছিলেন যে, তাঁকে অমরত্বের বর দিলেন, ধনাধিপতি ও লোকপাল করলেন, স্বয়ং মহাদেবের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব স্থাপন করিয়ে দিলেন। কুবেরের নলকুবের নামে এক পুত্রও হলো। ব্রহ্মা রাক্ষসপূর্ণ লঙ্কাপুরীকে করলেন কুবেরের রাজধানী, আকাশে বিচরণের জন্য দিলেন অলৌকিক পুষ্পক বিমান, আর যক্ষদের প্রভু করে তাঁকে 'রাজরাজ' উপাধিতে ভূষিত করলেন।
কিন্তু বিশ্রবা মুনি তখনও কুবেরকে এক কুপিত, ক্রূর দৃষ্টিতে দেখতেন। কুবের জানতেন পিতা তাঁর ওপর প্রসন্ন নন, তাই পিতার মন জয় করতে তিনি তিন অপরূপা রাক্ষসকন্যাকে পাঠালেন বিশ্রবার সেবায়—পুষ্পোৎকটা, রাকা আর মালিনী। রূপের জাদুতে এবং নাচে-গানে পটু এই তিন কন্যা একে অপরের চেয়ে চতুরতার সাথে বিশ্রবাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতে লাগলেন। মুনি তাঁদের সেবায় প্রীত হয়ে প্রত্যেককে বর দিলেন—লোকপালদের মতোই পরাক্রমশালী পুত্র হবে তাঁদের।
পুষ্পোৎকটার দুই পুত্র হলো—রাবণ আর কুম্ভকর্ণ, পৃথিবীতে যাঁদের সমতুল্য বলশালী কেউ ছিল না। মালিনীর গর্ভে জন্ম নিলেন পরম ধার্মিক বিভীষণ। আর রাকার গর্ভে জন্মাল এক ক্রূর পুত্র খর এবং এক কন্যা শূর্পণখা। এদের মধ্যে বিভীষণ ছিলেন সবচেয়ে সুদর্শন, ভাগ্যবান, ধর্মপরায়ণ ও কর্মকুশল। অন্যদিকে, জ্যেষ্ঠ রাবণের ছিল দশটি মুখ, উৎসাহ-বল-পরাক্রমে সে ছিল অতুলনীয়। কুম্ভকর্ণ শারীরিক শক্তিতে সবার শীর্ষে, যেমন মায়াবী তেমনই রণদক্ষ, চেহারাটা ছিল পর্বতের মতো ভয়ংকর। খর ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শী হলেও ছিল হিংস্র, মাংসাশী আর ব্রাহ্মণবিদ্বেষী। আর শূর্পণখা—তাঁর আকৃতিও ছিল কুৎসিত ও ভীতিপ্রদ, মুনিদের পবিত্র তপস্যায় বিঘ্ন ঘটানোই যেন ছিল তাঁর একমাত্র নেশা।
একদিন কুবের যখন মহাসমৃদ্ধি আর ঐশ্বর্য নিয়ে পিতার পাশে বসেছিলেন, তখন তাঁর সেই রাজকীয় বৈভব দেখে রাবণ আর তাঁর ভাইদের মনে তীব্র ঈর্ষার আগুন জ্বলে উঠল। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন—তপস্যা করতে হবে, কঠোর তপস্যায় ব্রহ্মাকে সন্তুষ্ট করে কুবেরের চেয়েও বড় হতে হবে। গোকর্ণ আশ্রমে গিয়ে শুরু হলো তাঁদের সেই উগ্র সাধনা। রাবণ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, পঞ্চাগ্নির মাঝে, শুধু বায়ু ভক্ষণ করে হাজার বছর একাগ্রচিত্তে তপস্যা করলেন। কুম্ভকর্ণ আহার সংযত করে রুক্ষ ভূমিশয্যায় কঠোর নিয়ম পালন করতে লাগলেন। বিভীষণ শুধু একটি শুকনো পাতা খেয়ে দিন কাটাতেন, উপবাসে আর জপেই মগ্ন থাকতেন সর্বদা। আর খর ও শূর্পণখা তাঁদের তপস্বী ভাইদের সেবা করে যেতেন প্রসন্নচিত্তে।
হাজার বছর পূর্ণ হলে এক চরম মুহূর্তে রাবণ নিজের একটি মস্তক কেটে অগ্নিতে আহুতি দিলেন। এই অদ্ভুত, ভয়ংকর কর্মে ব্রহ্মা স্বয়ং প্রসন্ন হয়ে আকাশ থেকে নেমে এলেন। বললেন, 'পুত্রগণ, তোমাদের সবার ওপরেই আমি প্রসন্ন হয়েছি। এবার বর প্রার্থনা করো, তপস্যা ছাড়ো। অমরত্ব ছাড়া যা খুশি চাও, আজ আমি পূর্ণ করব।' ব্রহ্মা রাবণকে বললেন, 'তুমি যে মস্তকগুলি আগুনে আহুতি দিয়েছ, সব পূর্বের মতোই তোমার দেহে ফিরে আসবে। তুমি ইচ্ছামতো রূপ ধারণ করতে পারবে এবং যুদ্ধে সর্বদা বিজয়ী হবে।'
রাবণ তখন দম্ভভরে বললেন, 'গন্ধর্ব, দেবতা, অসুর, যক্ষ, রাক্ষস, সর্প, কিন্নর—মহাবিশ্বের কারো কাছেই যেন আমি পরাজিত না হই।'
ব্রহ্মা হাসলেন, বললেন, 'এদের কারো থেকে তোমার ভয় নেই। তবে মনে রেখো, শুধু মানুষের থেকেই তোমার ভয় থাকতে পারে।'
শুনে রাবণ মনে মনে এক তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন—মানুষ আবার কী করবে! মানুষ তো রাক্ষসদের খাদ্য, সে তো অতি তুচ্ছ!
তারপর ব্রহ্মা কুম্ভকর্ণকে বর চাইতে বললেন। কিন্তু দেবতার মায়ায় বুদ্ধি মোহাচ্ছন্ন হওয়ায় কুম্ভকর্ণ চাইলেন দীর্ঘ নিদ্রার বর, ব্রহ্মা বললেন 'তথাস্তু'। এরপর বিভীষণের কাছে এসে ব্রহ্মা বললেন, 'পুত্র, রাক্ষসকুলে জন্মেও তোমার সাধনা পবিত্র। তুমিও বর চাও।'
বিভীষণ হাত জোড় করে বললেন, 'ভগবান, চরম সংকটেও যেন আমার মনে কখনো পাপচিন্তা না আসে, আর কোনো শিক্ষা ছাড়াই যেন ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগের পরম বিধি আমার হৃদয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জেগে ওঠে।' ব্রহ্মা মুগ্ধ হয়ে বললেন, 'রাক্ষসী-গর্ভে জন্ম নিয়েও তোমার মন অধর্মের দিকে যায়নি, তাই তোমাকে আমি অমরত্বের অতিরিক্ত বরও দিলাম।'
এইভাবে অমোঘ বর পেয়ে রাবণের অহংকার আকাশ ছুঁল। সে প্রথমেই আক্রমণ করল লঙ্কাপুরী। নিজের আপন বড় ভাই কুবেরকে পরাজিত করে লঙ্কা থেকে লাঞ্ছিত করে তাড়িয়ে দিল। কুবের নিরুপায় হয়ে গন্ধর্ব-যক্ষ-রাক্ষসদের নিয়ে গিয়ে বসতি স্থাপন করলেন দূর গন্ধমাদন পর্বতে। রাবণ জোর করে কেড়ে নিলেন কুবেরের সেই অহংকার—পুষ্পক বিমানও। ক্রুদ্ধ ও অপমানিত কুবের তখন রাবণকে অভিশাপ দিয়ে বললেন, 'এই বিমানে তুই আর কখনো চড়তে পারবি না; যে তোকে যুদ্ধে চিরতরে পরাজিত করবে, সেই একে বহন করবে। আমি তোর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, তবু তুই আমাকেই অপমান করলি! এর ফল তোকে শীঘ্রই চড়া সুদে ভোগ করতে হবে, তুই সপরিবারে বিনষ্ট হবি।'
বিভীষণ ছিলেন ধর্মাত্মা, তিনি সাধুজনের পথ ধরেই কুবেরের অনুগামী হলেন। কুবেরও প্রসন্ন হয়ে তাঁকে যক্ষ ও রাক্ষসদের সেনাপতি করে দিলেন। এদিকে নরমাংসভোজী রাক্ষস আর মহাবলশালী পিশাচরা মন্ত্রণা করে রাবণকেই নিজেদের একচ্ছত্র রাজা মনোনীত করল। দশানন রাবণ এরপর ঋষি, মানুষ ও দেবতাদের ওপর অত্যাচার শুরু করলেন, তাঁদের সমস্ত ধনরত্ন লুণ্ঠন করলেন—সমগ্র জগৎকে ক্রন্দন করিয়েই যেন তাঁর 'রাবণ' (যিনি অন্যকে কাঁদান) নামটি সার্থক হয়ে উঠল।
রাবণের এই পৈশাচিক উৎপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে ব্রহ্মর্ষি, দেবর্ষি আর সিদ্ধগণ অগ্নিদেবকে সামনে রেখে ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলেন। অগ্নি আকুল হয়ে বললেন, 'ভগবান, আপনি বিশ্রবাপুত্র রাবণকে বর দিয়ে অবধ্য করেছেন, আর সে এখন সমস্ত জগৎবাসীকে নরকযন্ত্রণা দিচ্ছে। তার হাত থেকে আমাদের রক্ষা করুন।'
ব্রহ্মা গম্ভীর হয়ে বললেন, 'দেবতা বা অসুর কেউই তাকে যুদ্ধে পরাস্ত করতে পারবে না, তা আমি জানি। কিন্তু যা করণীয়, তা আমি ইতিমধ্যেই গুছিয়ে রেখেছি—শীঘ্রই তার অহংকার চূর্ণ হবে। আমি চতুর্ভুজ ভগবান বিষ্ণুর কাছে প্রার্থনা করেছিলাম, তিনি আমার অনুরোধে মর্ত্যে অবতাররূপে আসতে সম্মত হয়েছেন। তিনিই রাবণকে বধ করবেন।' তারপর তিনি দেবরাজ ইন্দ্রকে বললেন, 'তুমিও সব দেবতাদের নিয়ে পৃথিবীতে বানররূপে জন্ম নাও, ইচ্ছামতো রূপ ধারণ করে মহাবলবান পুত্র উৎপন্ন করো, যারা বিষ্ণুর সহযোগী হবে।' আর দুন্দুভি নামে এক গন্ধর্বীকে বললেন, 'তুমিও দেবকার্য সিদ্ধির জন্য পৃথিবীতে অবতরণ করো।'
ব্রহ্মার আদেশে সেই দুন্দুভি অযোধ্যায় জন্ম নিলেন 'মন্থরা' নামে এক কুঁজি দাসী হয়ে। এভাবে ইন্দ্র প্রমুখ দেবতারাও পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়ে ভালুক ও বানরীদের গর্ভে মহাবীর পুত্রদের জন্ম দিলেন, যারা পর্বতের চূড়া ভেঙে ফেলতে পারত, বিশাল গাছ আর পাথরের খণ্ডই ছিল যাদের অস্ত্র, আর শরীর ছিল বজ্রের মতো অভেদ্য।
মার্কণ্ডেয় এখানে একটু থামতেই যুধিষ্ঠির আরও উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "মুনিবর, শ্রীরামের ভাইদের আর রাবণের জন্মকথা তো শুনলাম। এবার আমি শুনতে চাই তাঁর সেই কষ্টের বনবাসের কারণ। দশরথের অমন রাজপুত্র রাম, লক্ষ্মণ, আর যশস্বিনী সীতা—কেন তাঁদের বনে যেতে হয়েছিল? রাজপ্রাসাদ ছেড়ে কেন এই মাটির কুটিরে আসতে হলো?"
মার্কণ্ডেয় মুনি আবার বলতে শুরু করলেন—
পুত্রদের জন্মে রাজা দশরথ ছিলেন অত্যন্ত সুখী। তাঁর তেজস্বী পুত্ররা ক্রমশ বড় হয়ে উঠলেন। বেদ আর ধনুর্বেদে তাঁরা অগাধ পণ্ডিত হলেন। যথাসময়ে তাঁদের বিবাহ হলে দশরথ ভাবলেন—'এখন আমার বয়স হয়েছে, রামকে যুবরাজপদে অভিষিক্ত করা উচিত।' মন্ত্রী আর পুরোহিতদের এই প্রস্তাব জানাতেই সবাই আনন্দে সম্মতি দিলেন।
শ্রীরামের চেহারা ছিল দেখার মতো। সুন্দর চোখ দুটি ঈষৎ রক্তবর্ণ, হাঁটু পর্যন্ত দীর্ঘ বাহু, দেবতার মতো মরাল চলন, বিশাল বক্ষ, মাথায় কুঞ্চিত কালো কেশরাশি, আর দেহের দিব্য কান্তি যেন মেঘের বুকে বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠত। যুদ্ধে তাঁর পরাক্রম ছিল ইন্দ্রের সমকক্ষ। সর্বধর্মজ্ঞ, বৃহস্পতির মতো বুদ্ধিমান, সমস্ত প্রজার প্রিয় রামকে দেখে কৌশল্যার আনন্দ যেমন উপচে পড়ত, দশরথও তেমনই শান্তিতে থাকতেন।
রাজা দশরথ একদিন পুরোহিতকে ডেকে বললেন, 'ব্রাহ্মণ, আজ রাত্রে অত্যন্ত পবিত্র পুষ্য নক্ষত্র যোগ হবে। রাজ্যাভিষেকের সব আয়োজন করে রামকে খবর পাঠান।'
কিন্তু এই গোপনীয় কথাটি রাজপ্রাসাদের দেওয়ালে কান পেতে শুনে ফেলল সেই দাসী মন্থরা। সে ঠিক সময়মতো বিষাক্ত সাপের মতো ফণা তুলে গিয়ে কৈকেয়ীকে বলল, 'রানি, আজ রাজা তোমার সর্বনাশের কথাই ঘোষণা করেছেন। কৌশল্যার ভাগ্য কত ভালো, তাঁর পুত্রেরই রাজ্যাভিষেক হচ্ছে। তোমার ভাগ্যে আর কী আছে? তোমার পুত্র ভরত তো রাজ্যের এক ইঞ্চি জমিও পাবে না।'
কৈকেয়ীর সরল মনে নিখুঁতভাবে বিষ ঢুকিয়ে দিল মন্থরা। রাজা দশরথ ছিলেন অত্যন্ত সত্যবাদী—মন্থরার প্ররোচনায় সেই পরম সুন্দরী কৈকেয়ী রাজার সঙ্গে একান্তে দেখা করে এক অদ্ভুত মায়াবী হাস্যে বললেন, 'মহারাজ, আপনি একদা যুদ্ধক্ষেত্রে আমাকে দুটি বর দেবেন বলেছিলেন, আজ সেই বর দুটি আমাকে দিন।' রাজা সরল মনে বললেন, 'বলো প্রিয়া, এখনই দিচ্ছি; যা ইচ্ছা চেয়ে নাও।' কৈকেয়ী তখন রাজাকে সত্যের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে বললেন, 'রামের রাজ্যাভিষেকের জন্য যে আয়োজন করেছেন, তার বদলে ভরতকে রাজা করুন, আর রাম আজই চলে যাক চৌদ্দ বছরের বনবাসে।'
কৈকেয়ীর এই বজ্রপাতের মতো নিষ্ঠুর কথায় বৃদ্ধ রাজা মর্মাহত হলেন, তাঁর কথা হারিয়ে গেল। রাম যখন জানতে পারলেন যে পিতা কৈকেয়ীকে দেওয়া সত্যরক্ষার জন্য আজ নিরুপায়, তখন তিনি একটুও ক্ষোভ না দেখিয়ে, পিতার সত্যরক্ষার জন্য নিজেই হাসিমুখে বনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ধনুর্বাণ হাতে লক্ষ্মণও অনুগমন করলেন তাঁর বড় ভাইয়ের, আর রাজকন্যা সীতাও সমস্ত বিলাসিতা ত্যাগ করে চললেন স্বামীর ছায়ার মতো। রাম বনে চলে গেলে বৃদ্ধ রাজা দশরথ সেই পুত্রশোকে ছটফট করতে করতে প্রাণত্যাগ করলেন।
এরপর কৈকেয়ী মামাবাড়ি থেকে ভরতকে ডেকে এনে বললেন, 'পুত্র, রাজা স্বর্গে গেছেন, রাম-লক্ষ্মণ বনে গেছে। এখন এই বিশাল সাম্রাজ্য তুমি নিষ্কণ্টকে ভোগ করো।' কিন্তু ভরত ছিলেন পরম ধর্মাত্মা। মাতার এই জঘন্য ষড়যন্ত্রের কথা শুনে তিনি ক্ষোভে, ঘেন্নায় ফেটে পড়লেন—'কুলঘাতিনী! ধনলোভে তুমি কী নিদারুণ কাজ করেছ। নিজের পতিকে হত্যা করেছ, বংশের সর্বনাশ করেছ, আর আমার মাথায় এই চিরকালের কলঙ্ক লেপন করেছ!' এই বলে তিনি বিলাপ করতে লাগলেন।
প্রজাদের কাছে ভরত ঘোষণা করলেন—এই পাপকাজে তাঁর কোনো সম্মতি ছিল না। তারপর কৌশল্যা, সুমিত্রা ও শত্রুঘ্নকে সঙ্গে নিয়ে তিনি চললেন শ্রীরামকে অরণ্য থেকে ফিরিয়ে আনতে। চিত্রকূট পর্বতে গিয়ে ভরত দেখলেন রাম-লক্ষ্মণকে তপস্বীর বেশে কুটিরে বসবাস করতে। ভরত রামের পায়ে মাথা খুঁড়ে অনুনয়-বিনয় করলেন, কিন্তু রাম অযোধ্যায় ফিরতে রাজি হলেন না—পিতৃসত্য পালনে তিনি হিমালয়ের মতো অটল। অনেক কষ্টে ভরতকে বুঝিয়ে, নিজের পাদুকা জোড়া দিয়ে তিনি বিদায় করলেন। ভরতও তখন অযোধ্যার রাজপ্রাসাদে না ফিরে, নন্দীগ্রামে এক কুটিরে শ্রীরামের পাদুকা সামনে রেখে রাজ্যশাসন করতে লাগলেন।
রাম বুঝলেন, চিত্রকূটে থাকলে অযোধ্যার নগরবাসীরা বারবার তাঁর খোঁজে আসবেন। তাই তিনি আরও গভীর জঙ্গলে, শরভঙ্গ মুনির আশ্রমের কাছে চলে গেলেন। সেখান থেকে গোদাবরী নদীর তীরে দণ্ডকারণ্যে গিয়ে নিজেরা এক সুন্দর কুটির তৈরি করে বসতি স্থাপন করলেন। তার কাছেই ছিল 'জনস্থান' নামে আরেক ভয়ংকর বন, যেখানে বাস করত এক রাক্ষস সেনাপতি—নাম তার খর। শূর্পণখাকে নিয়ে সেই খরের সঙ্গেই এক রক্তক্ষয়ী বিবাদের সূত্রপাত হলো রামের।
শূর্পণখার নাক ও কান লক্ষ্মণ কর্তৃক কাটা যাওয়াকে কেন্দ্র করেই এই বিবাদের আগুন জ্বলে উঠেছিল। রাক্ষসরা যখন তপোবনের ঋষিদের ওপর অত্যাচার করতে এল, তখন তপস্বীদের রক্ষা করার জন্য শ্রীরাম একাই চৌদ্দ হাজার রাক্ষসকে যমপুরীতে পাঠালেন। মহাবলবান খরকেও দ্বিখণ্ডিত করে সেই দণ্ডকারণ্যকে তিনি এক নির্ভয়, পবিত্র তপোবনে পরিণত করলেন।
জনস্থানের সব রাক্ষস নিহত হলে অপমানে, যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে শূর্পণখা লঙ্কায় গিয়ে লঙ্কাধিপতি রাবণকে শোনাল তার এই নাক-কান কাটার করুণ কাহিনি। নিজের আপন ভগ্নীর এই ভয়াবহ দশা দেখে রাবণের চোখ দুটো ক্রোধে আগুনের গোলার মতো লাল হয়ে উঠল। সে সিংহাসন থেকে এক লাফে নেমে এল। শূর্পণখাকে নির্জনে নিয়ে গিয়ে গর্জনে ফেটে পড়ে জিজ্ঞেস করল, 'কল্যাণী, বলো তো এই ত্রিলোকের মধ্যে কে আমাকে ভয় না পেয়ে তোমার এই দশা করার দুঃসাহস করল? কার বুকের পাটা এত বড় যে তীক্ষ্ণ ত্রিশূলে বিদ্ধ হতে চায়? সিংহের গুহায় প্রবেশ করে কোন নরকীট আজ মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছে?'
কথা বলতে বলতে রাবণের দশটি মুখের নাক-মুখ-চোখ দিয়ে যেন আক্ষরিক অর্থেই আগুনের ফুলকি ঝরে পড়ছিল। লঙ্কার আকাশ তখন এক আসন্ন মহাপ্রলয়ের আশঙ্কায় কালো মেঘে ঢেকে গেল।
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৫৮তম ভাগের আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
বনপর্বের ৫৭তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচির প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচির দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচির- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment