Posts

Showing posts with the label Mahabharata

কুন্তীর হস্তিনাপুর প্রর্তাপন

Image
শতশৃঙ্গ পর্বতের নির্জন অরণ্যে তখন এক গভীর বিষণ্ণতা। রাজা পাণ্ডু আর নেই, নেই রূপসী মাদ্রীও। তাঁদের অন্ত্যেষ্টির পর অরণ্যচারী দেবর্ষি ও মুনিরা এক সভায় মিলিত হলেন। তাঁদের চোখেমুখে এক কঠিন কর্তব্যের ছাপ। একজন ঋষি ধীর গলায় বললেন, "পাণ্ডু তাঁর রাজ্য-ঐশ্বর্য ত্যাগ করে আমাদের আশ্রয়ে এসে কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন হয়েছিলেন। আজ তিনি স্বর্গবাসী, কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর শোকাতুর পত্নী কুন্তী আর পাঁচজন কিশোর রাজপুত্রকে। আমাদের এখন দৈব কর্তব্য—পাণ্ডু ও মাদ্রীর অস্থিভস্ম এবং এই অসহায় পরিবারটিকে কুরুবংশের রাজধানী হস্তিনাপুরে পৌঁছে দেওয়া।" হস্তিনাপুর—সেই প্রাচীন নগরী, যা আজকের উত্তরপ্রদেশের মিরাট জেলা ছাড়িয়ে গঙ্গার এক পুরোনো খাত ধরে জেগে থাকা টিলার মতো। মুনিরা পরামর্শ শেষ করে যাত্রা শুরু করলেন। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যখন তাঁরা হস্তিনাপুরের সিংহদারে উপস্থিত হলেন, তখন সারা নগরে শোরগোল পড়ে গেল। সাধারণ মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল অরণ্যচারী ঋষিদের দর্শনে। রাজপ্রাসাদের অলিন্দে খবর পৌঁছাতেই বেরিয়ে এলেন কুরুবৃদ্ধ ভীষ্ম। তাঁর সঙ্গে ধৃতরাষ্ট্র, বিদুর এবং সেই বিচিত্র চরিত্রের বাহ্লীক।  বাহ্লীক সম্পর্কে ভীষ্মের জ্যাঠামশা...

রাজসুখ থেকে তপোবন: পাণ্ডুর নির্বাসন ও একটি অভিশপ্ত মুহূর্ত

Image
রাজসুখ থেকে তপোবন: পাণ্ডুর নির্বাসন ও একটি অভিশপ্ত মুহূর্ত অরণ্যবাসের সেই ধূসর দিনগুলো সে এক অদ্ভুত দিন ছিল। ঘন অরণ্যের গভীরে শিকারের নেশায় মত্ত পাণ্ডু তখন জানতেন না, নিয়তি তাঁর জন্য কী ভয়ানক এক ফাঁদ পেতে রেখেছে। সঙ্গে দুই স্ত্রী—কুন্তী আর মাদ্রী। হঠাৎ পাণ্ডুর চোখে পড়ল এক জোড়া হরিণ আর হরিণী। কামাতুর সেই যুগল যখন মিলনে মগ্ন, ঠিক তখনই পাণ্ডুর ধনুক থেকে পাঁচটি তীক্ষ্ণ শর তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে বিঁধল তাদের শরীরে। রক্তাক্ত হরিণটি যন্ত্রণায় লুটিয়ে পড়ে মানুষের গলায় বলে উঠল, "মহারাজ, আপনি কি মানুষ? কামার্ত, ক্রূর আর মূর্খও তো এমন নৃশংস কাজ করে না! আমি কোনো সাধারণ পশূ নই, আমি ঋষি কিংদম। মানুষের শরীরে মিলনে লজ্জিত বোধ করেছিলাম বলে এই মৃগরূপ ধারণ করা। আপনি আমাকে ব্রহ্মহত্যার পাপে ফেলব না ঠিকই, কারণ আপনি জানতেন না আমার পরিচয়; কিন্তু মিলনের মুহূর্তে এই যে ব্যাঘাত ঘটালেন—তার অভিশাপ আপনাকে বইতে হবে। আজ থেকে আপনিও যখনই স্ত্রীর সান্নিধ্যে যাবেন, সেই মুহূর্তেই আপনার মৃত্যু ঘটবে।" কথা কটি বলেই ঋষি কিংদম প্রাণত্যাগ করলেন। পাণ্ডুর চারপাশের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ নিঝুম হয়ে গেল। তিনি থমকে দাঁড়ালেন। নিজে...

সত্যবতী ও ব্যাসদেব

Image
  Watch More সত্যবতী ও ব্যাসদেব বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পর হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে যে শূন্যতা নেমে এসেছিল, তা কেবল একটি সিংহাসনের শূন্যতা ছিল না। ছিল বংশের শূন্যতা, রক্তের শূন্যতা। অম্বিকা আর অম্বালিকা — দুই তরুণী রানি — বিধবার সাদা বস্ত্রে ঢেকে গেছেন। তাঁদের কোলে কোনো সন্তান নেই। কুরুবংশের প্রদীপ নিভে আসছে। সত্যবতী তখন বৃদ্ধা। কিন্তু তাঁর মন বৃদ্ধ হয়নি। রাজমাতার মনে একটাই চিন্তা — এই বংশ টিকিয়ে রাখতে হবে। সেই মুহূর্তে তিনি মনে করলেন তাঁর সেই প্রথম পুত্রের কথা। অনেক অনেক আগের কথা। তখন সত্যবতী রানি নন, কোনো প্রাসাদও তাঁর জীবনে নেই। তিনি কেবল একটি নৌকার মাঝি। যমুনার বুকে প্রতিদিন যাত্রী পারাপার করেন। তাঁর শরীর থেকে মাছের গন্ধ আসে, তাই লোকে তাঁকে বলে মৎস্যগন্ধা। একদিন এক ঋষি এলেন নৌকায়। নাম পরাশর। সত্যবতী দাঁড় বাইছেন। পরাশর তাকিয়ে আছেন। শুধু তাকিয়ে নন — তাঁর ভেতরে জ্বলে উঠছে এক অদ্ভুত অনুভূতি। এই মেয়ে সাধারণ নয়। ঋষির দৃষ্টি অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পায়। তিনি দেখলেন — এই নারীর গর্ভে জন্ম নেবে এক মহাপুরুষ, যিনি যুগযুগান্ত ধরে মানুষের পথ দেখাবেন। পরাশর বললেন তাঁর মনের কথা। ...

কুন্তিভোজের রাজ্য, কুন্তীর কথা এবং পাণ্ডুর দিগ্বিজয়

Image
কুন্তিভোজের রাজ্য, কুন্তীর কথা এবং পাণ্ডুর দিগ্বিজয় কিছু কিছু গল্প আছে যেগুলো শুনতে শুনতে মনে হয় — এটা শুধু একটা পরিবারের গল্প নয়, এটা আসলে একটা গোটা যুগের গল্প। কুন্তিভোজের রাজ্যের কথা সেই রকম। চম্বল নদীর তীরে, মালব অঞ্চলের উর্বর মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছোট্ট রাজ্যটা হয়তো মানচিত্রে বড় জায়গা নেয় না। কিন্তু মহাভারতের ইতিহাসে এই রাজ্যের অবদান অপরিসীম। কারণ এখানেই একটি মেয়ে বড় হয়েছিলেন, Watch More যাঁর পাঁচ পুত্র একদিন পুরো ভারতবর্ষ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। **এক** কুন্তিভোজ ছিলেন যদুবংশীয় শূরসেনের ভাই। শূরসেন — যাঁর নাতি ছিলেন স্বয়ং কৃষ্ণ।কুন্তিভোজের রাজ্য ছিল, সেনা ছিল, ঐশ্বর্য ছিল। শুধু ছিল না একটাই জিনিস — সন্তান। দীর্ঘদিন কেটে গেছে, কিন্তু রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে শিশুর কান্না শোনা যায়নি।এদিকে শূরসেনের প্রথম সন্তান জন্মাল — একটি মেয়ে। নাম রাখা হলো পৃথা। শূরসেন একসময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ভাইকে — প্রথম সন্তান তাঁকে দেবেন। প্রতিশ্রুতির কথা মনে রইল। পৃথাকে কোলে তুলে দিলেন কুন্তিভোজের হাতে।কুন্তিভোজ মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সেদিন থেকে পৃথা আর পৃথা রইল না। সে হয়ে গেল কু...

কুরুবংশের নবজন্ম ও গান্ধারীর মহত্যাগ

Image
  Wat Watch More ch কুরুবংশের নবজন্ম ও গান্ধারীর মহা ত্যাগ সে এক অদ্ভুত সময়। কুরুরাজ্যে তখন কেবলই বসন্তের সমীরণ। হস্তিনাপুরের প্রতিটি অলিতে-গলিতে যেন উৎসবের রোশনাই। মহারাজ বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তাকে পূর্ণ করতেই যেন মর্ত্যে এলেন ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু আর বিদুর। প্রজারা সুখে আছে, ঘরে ঘরে ধনের অভাব নেই, এমনকি রাজধানীর রাজপথে কোনো চোর-ছ্যাঁচোড়ের উপদ্রবও নেই। এক কথায়, কুরুরাজ্য তখন এক পুষ্পিত উদ্যান। ভীষ্মের কড়া শাসনে আর স্নেহের ছায়ায় বেড়ে উঠছে তিন ভাই। তিনজনেরই তিন রূপ। ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ হলেও তাঁর শরীরে যেন সহস্র হস্তীর বল। লৌহদণ্ড অবলীলায় দুমড়ে দিতে পারেন তিনি। পাণ্ডু আবার ধনুর্ধর হিসেবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, তীরের ফলায় তিনি আকাশ ছুঁতে চান। আর বিদুর? তাঁর মধ্যে বাস করেন সাক্ষাৎ ধর্ম। শান্ত, ধীর আর অসীম প্রজ্ঞার অধিকারী সেই মানুষটি। কিন্তু নিয়তির লিখন বড় অদ্ভুত। বিদুর পরম জ্ঞানী হলেও তিনি দাসীপুত্র, তাই সিংহাসনের উত্তরাধিকার তাঁর নেই। বড় ভাই ধৃতরাষ্ট্রের প্রাপ্য ছিল রাজমুকুট, কিন্তু তাঁর চোখের অন্ধকার সেই পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল। শাস্ত্র আর আচারের দোহাই দিয়ে কনিষ...

মহাভারতের আদিপর্বের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কাহিনী হলো মহাত্মা বিদুরের জন্মবৃত্তান্ত।

Image
Watch More মহাভারতের আদিপর্বের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কাহিনী হলো মহাত্মা বিদুরের জন্মবৃত্তান্ত। অত্যন্ত ধর্মনিষ্ঠ এবং জ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও কেন বিদুরকে একজন শূদ্রাণীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করতে হয়েছিল, তার নেপথ্যে রয়েছে মহর্ষি মাণ্ডব্যের এক অভিশাপ। সেই কাহিনীটি নিচে বর্ণনা করা হলো: অণিমাণ্ডব্যের উপাখ্যান ও বিদুরের জন্মকথা মহর্ষি মাণ্ডব্যের কঠোর তপস্যা প্রাচীনকালে মাণ্ডব্য নামে এক প্রখ্যাত ব্রাহ্মণ ঋষি ছিলেন। তিনি ছিলেন অসীম ধৈর্যের অধিকারী, পরম বিদ্বান এবং সত্যনিষ্ঠ। নিজের কুটিরের সামনে একটি বৃক্ষতলে ঊর্ধ্ববাহু হয়ে তিনি কঠোর মৌনব্রত পালন করছিলেন। দীর্ঘকাল ধ্যানে মগ্ন থাকার কারণে তিনি বাহ্যিক জগৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিস্মৃত ছিলেন। চৌর্যপ্রবাদ ও রাজার দণ্ড একদিন একদল দস্যু রাজকোষ লুণ্ঠন করে পালাবার সময় মাণ্ডব্যের আশ্রমের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। রক্ষীবাহিনীর তাড়া খেয়ে দস্যুরা ভীত হয়ে ঋষির কুটিরে লুণ্ঠিত দ্রব্যসহ লুকিয়ে পড়ে। রাজা সৈন্যরা আশ্রমে এসে মৌনব্রতী ঋষিকে দস্যুদের অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। কিন্তু ব্রতভঙ্গের ভয়ে ঋষি কোনো উত্তর দিলেন না। সৈন্যরা তল্লাশি চালিয়ে কুটির থেকে চারজন দস্য...

দেবব্রতর মহান ত্যাগ ও ভীষ্মের জন্ম

Image
Watch More দেবব্রতর মহান ত্যাগ ও ভীষ্মের জন্ম দেবব্রতকে ফিরে পাওয়ার পর মহারাজ শান্তনু তাঁকে হস্তিনাপুরের যুবরাজ হিসেবে ঘোষণা করেন। দেবব্রত ছিলেন অসামান্য বীর এবং প্রজাবৎসল, তাই তাঁকে উত্তরাধিকারী হিসেবে পেয়ে শান্তনু অত্যন্ত সুখী ছিলেন। সত্যবতীর সাথে শান্তনুর সাক্ষাৎ   একদিন মহারাজ শান্তনু যমুনার তীরে বনে শিকার করতে গিয়ে এক অপূর্ব সুগন্ধ অনুভব করেন। সেই সুগন্ধ অনুসরণ করে তিনি এক পরমাসুন্দরী কন্যাকে দেখতে পান। এই কন্যার নাম ছিল সত্যবতী। যদিও তিনি এক জেলের কন্যা হিসেবে বড় হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর জন্ম ছিল অলৌকিক। এক বিশাল মাছের পেট থেকে তাঁকে পাওয়া গিয়েছিল এবং দাসরাজ নামের এক ধীবর তাঁকে নিজের মেয়ের মতো লালন-পালন করেন। শান্তনু সত্যবতীর প্রেমে পড়েন এবং দাসের কাছে গিয়ে সত্যবতীকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু সত্যবতীর পিতা দাসরাজ একটি কঠিন শর্ত আরোপ করেন। তিনি বলেন:  "মহারাজ, আমি আমার কন্যাকে আপনার হাতে তুলে দিতে পারি, যদি আপনি কথা দেন যে— সত্যবতীর গর্ভজাত সন্তানই হবে হস্তিনাপুরের পরবর্তী রাজা।" শান্তনুর দ্বিধা ও দেবব্রতর সংকল্প শান্তনু দেবব্রতকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। নিজের প্রিয় পুত্...

প্রেমের জন্য যুদ্ধ — রুক্মিণীর সাহস ও কৃষ্ণের রথ

Image
  Watch More প্রেমের জন্য যুদ্ধ — রুক্মিণীর সাহস ও কৃষ্ণের রথ বিদর্ভের রাজপ্রাসাদে একটি মেয়ে বড় হচ্ছিল। নাম রুক্মিণী। রাজকন্যা, তবু তার মনে কোনো অহংকার নেই — শুধু একটা নাম, বারবার ফিরে আসে। কৃষ্ণ। দ্বারকার সেই মানুষটার কথা সে শুনেছে, কতটুকু শুনেছে তা সে নিজেও জানে না। কিন্তু যতটুকু শুনেছে, তাতেই মন দিয়ে বসেছে। এই হলো প্রেম — কোনো যুক্তি নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু দাদা রুক্মী সব জানে, সব বোঝে — শুধু বোনের মনটা বোঝে না। সে ঠিক করে দিয়েছে, রুক্মিণীর বিয়ে হবে শিশুপালের সঙ্গে। চেদির রাজা। ক্ষমতাবান, প্রতাপশালী। কিন্তু রুক্মিণীর কাছে সে শুধুই একটা অপরিচিত মুখ — যাকে সে চায় না, কোনোদিন চায়নি।মেয়েরা সেকালে কাঁদত, মেনে নিত। রুক্মিণী সেই দলে নয়। সে বসে পড়ল, ভাবল। তারপর একটা সিদ্ধান্ত নিল — এমন সিদ্ধান্ত, যা নিতে বুকের পাটা লাগে।একজন বিশ্বস্ত ব্রাহ্মণকে ডাকল। হাতে তুলে দিল একটি পত্র। বলল — এটি পৌঁছে দাও দ্বারকায়, কৃষ্ণের হাতে। সেই চিঠিতে কোনো লুকোচুরি নেই, কোনো আবেগের বাড়াবাড়ি নেই। সরাসরি কথা — "হে কৃষ্ণ, আমি আপনাকেই আমার মনের স্বামী বলে বেছে নিয়েছি। আপনি ছাড়া আর কাউ...