২০তম বনপর্ব- পরশুরামের দর্পচূর্ণ: অযোধ্যাপথে এক মহাবিস্ময়ের ইতিহাস

 


২০তম বনপর্ব-পরশুরামের দর্পচূর্ণ: অযোধ্যাপথে এক মহাবিস্ময়ের ইতিহাস

অগস্ত্য আশ্রমের সেই পুণ্যতোয়া জলে স্নান সমাপন করতেই এক অলৌকিক কাণ্ড ঘটল। যুধিষ্ঠিরের আজন্মদীপ্ত অবয়ব থেকে যেন ঠিকরে বেরোতে লাগল এক নতুন, প্রখর জ্যোতি। শত্রুদমনের এক অদ্ভুত সংকল্প জেগে উঠল তাঁর অন্তরে। কৌতূহল চাপতে না পেরে তিনি মহর্ষি লোমশের দিকে তাকিয়ে বিনীত স্বরে সুধালেন, "প্রভু, আমি শুনেছি মহাতেজস্বী পরশুরাম নাকি একদা সমস্ত বীর্য ও মহিমা হারিয়ে শ্রীহীন, নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিলেন? কেমন করে তা সম্ভব হয়েছিল? আর কীভাবেই বা তিনি ফিরে পেয়েছিলেন তাঁর সেই পূর্বের দিব্য রূপ? দয়া করে আমাদের সেই কাহিনী শোনান।"

লোমশ মৃদু হাসলেন। তারপর পাণ্ডবদের সবাইকে কাছে ডেকে গভীর মমতায় বলতে শুরু করলেন সেই আশ্চর্য উপাখ্যান।

তখন অযোধ্যায় উৎসবের আলো। মিথিলারাজ জনকের রাজসভায় হরধনু ভঙ্গ করে রূপসী সীতার পাণিগ্রহণ করেছেন অযোধ্যার জ্যেষ্ঠ রাজকুমার রামচন্দ্র। যে ধনুকে জ্যা-রোপণ করা তো দূর, ত্রিভুবনের কোনো বীর হাত দেওয়ার সাহসটুকুও পায়নি, রামচন্দ্র তা হেলায় তুলে দুই টুকরো করে দিয়েছেন। এমন অলৌকিক কীর্তির পর আনন্দ-কোলাহলে সীতাকে পাশে নিয়ে অযোধ্যার পথ ধরেছে রাজকীয় শোভাযাত্রা। মহারাজ দশরথের বুক তখন গর্বে ও সুখে উদ্বেল।

কিন্তু নিয়তির লিখন ছিল অন্যরকম। হঠাৎ কোনো মেঘ ছাড়াই আকাশ অন্ধকার হয়ে গেল। পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠল এক প্রলয়ংকর কম্পনে। দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য করে কোত্থেকে এক ধূলিঝড় ধেয়ে এল, বনের পাখিরা স্তব্ধ হয়ে গেল ভয়ে। সারা শোভাযাত্রা থমকে দাঁড়াল এক অজ্ঞাত আশঙ্কায়।

ঠিক তখনই তিনি এলেন।

যেন এক জীবন্ত অগ্নিকুণ্ড হেঁটে আসছে, এইরকম মূর্তিতে আবির্ভূত হলেন পরশুরাম। তিনি ভৃগুবংশীয় জমদগ্নির পুত্র, স্বয়ং বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার। অহংকারী আর অত্যাচারী ক্ষত্রিয়দের রক্তে যিনি একুশবার এই পৃথিবীর মাটি ভিজিয়েছেন, যাঁর কাঁধে শোভা পাচ্ছে বিষ্ণুর সেই অলৌকিক ধনু 'শার্ঙ্গ', আর চোখ দুটো জ্বলছে এক শীতল, ভয়ংকর ক্রোধে।

মহাদেবের ধনু ভাঙার খবর তাঁর কানে পৌঁছেছিল, আর তাতেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন এই মহর্ষি।

ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে রাজা দশরথ করজোড়ে এগিয়ে গেলেন, কত অনুনয়-বিনয় করলেন ছেলের প্রাণভিক্ষা চেয়ে। কিন্তু পরশুরাম তাঁকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিলেন। তাঁর স্থির, ক্রূদ্ধ দৃষ্টি তখন নিবদ্ধ কেবল রামের ওপর।

মেঘমন্দ্র স্বরে গর্জে উঠলেন পরশুরাম, "তাহলে তুমিই সেই বালক? আমার গুরু মহাদেবের দিব্য ধনু ভেঙেছ তুমি? নিজেকে খুব শক্তিশালী ভাবো, তাই না? যদি ক্ষমতা থাকে, তবে এই বিষ্ণুধনুতে জ্যা-রোপণ করো, একটি বাণ সন্ধান করো এতে। যদি পারো, তবেই তোমার বীরত্ব স্বীকার করব। আর না পারলে আমার এই কুঠারের মুখোমুখি হও।"

কোনো আপসের জায়গা ছিল না সেই কথায়। ছিল না কোনো লৌকিকতা। এ ছিল এক চরম, নির্মম আহ্বান।

রামচন্দ্র বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। শান্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে তিনি পরশুরামের চরণে প্রণাম জানালেন। কারণ পরশুরাম যতই ক্রুদ্ধ হোন, তিনি পরম তপস্বী ব্রাহ্মণ, আর বিনয়ই তো বীরের আসল শক্তি। তারপর কোনো আড়ম্বর ছাড়াই, রামচন্দ্র অত্যন্ত অবহেলায় পরশুরামের হাত থেকে সেই বিশাল ধনুটি নিজের হাতে তুলে নিলেন।

পরের মুহূর্তেই যা ঘটল, তা দেখে উপস্থিত সবার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়।

কোনো ক্লান্তি নেই, মুখে কোনো কষ্টের রেখাটুকুও নেই—রামচন্দ্র অবলীলায় সেই দুর্ভেদ্য শার্ঙ্গ ধনুতে জ্যা-রোপণ করলেন। সেই টংঙ্কার ধ্বনিতে মনে হলো যেন স্বর্গ ফেটে বজ্রপাত হলো। রাম বাণটি ধনুকে যুক্ত করে সরাসরি পরশুরামের দিকে তাক করলেন।

এবার যখন রাম কথা বললেন, তাঁর কণ্ঠে ঝরে পড়ল এমন এক অলৌকিক কর্তৃত্ব, যা কোনো মরণশীল মানুষের থাকতে পারে না।

রাম শান্ত স্বরে বললেন, "হে মহর্ষি, এই বাণ একবার ধনুকে চড়ালে তা লক্ষ্যভেদ না করে ফিরে আসে না। এবার বলুন, এর লক্ষ্য কোথায় হবে? আপনার কঠোর তপস্যায় অর্জিত সেই উচ্চতর স্বর্গলোক কি এই বাণ ধ্বংস করবে? নাকি এই পৃথিবীতে আপনার অবাধ বিচরণের স্বাধীনতা কেড়ে নেবে? হে ভৃগুনন্দন, আপনি বড্ড অহংকারী হয়ে উঠেছেন। পিতামহ ঋচিকের কৃপায় ক্ষত্রিয়দের জয় করে আপনি পরম তেজ লাভ করেছিলেন, আর সেই দেমাগেই আজ আমাকে অপমান করতে এসেছেন। তবে চোখ মেলে দেখুন, আপনাকে আমি দিব্যচক্ষু দান করছি, চিনে নিন আমার আসল রূপ।"

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই পরশুরামের চোখের সামনের পর্দা সরে গেল।

দিব্যদৃষ্টি লাভ করতেই তিনি দেখতে পেলেন, অযোধ্যার এই তরুণ রাজকুমারের সামান্য শরীরের ভেতরেই আবর্তিত হচ্ছে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড! সেখানে আদিত্য, বসু, রুদ্র, সাধ্য ও মরুতগণ বিদ্যমান। নক্ষত্রমণ্ডলী, অগ্নি, গ্রহ, গন্ধর্ব, যক্ষ, পর্বত, নদী—সৃষ্টির সব উপাদান সেখানে স্পন্দিত হচ্ছে। বেদ, উপনিষদ, পবিত্র যজ্ঞ আর ধর্মের সনাতন নিয়মাবলী সব ওই এক অঙ্গে লীন। পরশুরামের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, কার সামনে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন।

এ কোনো সাধারণ রাজপুত্র নয়। এ স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান বিষ্ণু, মানবকূলে অবতীর্ণ হয়েছেন। পরশুরামের নিজের ভেতরে বিষ্ণুর যে অবিনশ্বর তেজ লুকিয়ে ছিল, তা যেন তার মূল উৎসের সামনে এসে নতজানু হয়ে গেল।

মুহূর্তের মধ্যে পরশুরামের ভেতরের সেই দাহক আগুন জল হয়ে গেল। যে অহংকার তাঁকে ক্ষত্রিয় নিধনে শক্তি জুগিয়েছিল, তা যেন এক ভাঙা পাত্রের জলের মতো কর্পূরের মতো উড়ে গেল। তিনি করজোড়ে মাথা নত করলেন।

অত্যন্ত মৃদু, ভক্তিনম্র কণ্ঠে তিনি বললেন, "হে রাম, তুমিই পরমেশ্বর। আমি তোমার চরণে আত্মসমর্পণ করলাম। আমার তপস্যার জোরে আমি যে উচ্চতর লোক অর্জন করেছি, তোমার বাণ দিয়ে তা-ই ধ্বংস করো। কিন্তু এই পৃথিবীতে আমার বিচরণের অধিকারটুকু কেড়ে নিও না।"

রাম বাণ ত্যাগ করলেন। পরশুরামের বহু বছরের কৃচ্ছ্রসাধনে অর্জিত সমস্ত পুণ্যফল এক পলকে ছাই হয়ে গেল। দর্পহারী রামের সামনে মাথা নিচু করে, ধর্মের জয়গান গেয়ে পরশুরাম শান্ত মনে মহেন্দ্র পর্বতের দিকে রওনা হলেন। পৃথিবীতে দুষ্ট রাজাদের দমনের যে ভার তাঁর ওপর ছিল, তা শেষ হয়েছে। তাঁর যুগের অবসান ঘটিয়ে কার নতুন যুগ শুরু হচ্ছে, তা তিনি নিজের চোখে দেখে গেলেন।

তবে গল্পের শেষ এখানেই নয়।

পরশুরামের এই পরিণতির কথা জানতে পারলেন তাঁর পিতৃব্যরা। তাঁরা যখন তাঁর কাছে এলেন, তখন পরশুরামের চেনা রূপ আর নেই। সেই দিগ্বিজয়ী বীর-সন্ন্যাসী এখন এক খোলসমাত্র—শরীর শ্রীহীন, তেজ বিলুপ্ত, আর মন এক গভীর অপরাধবোধে নিমজ্জিত।

পিতৃব্যরা অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে বললেন, "বৎস, তুমি মস্ত বড় ভুল করেছ। স্বয়ং বিষ্ণুর বিরুদ্ধে অহংকার প্রকাশ করারই এই শাস্তি। তবে এর থেকে মুক্তির উপায় আছে। সত্যযুগে তোমার পূর্বপুরুষ মহর্ষি ভৃগু 'দীপতোদ' নামক এক তীর্থক্ষেত্রে কঠোর তপস্যা করেছিলেন। তুমি সেখানে যাও, পুণ্যতোয়া 'বধূসরকৃতা' নদীতে স্নান করো, তবেই তোমার হারানো তেজ ফিরে পাবে।"

অনুতপ্ত পরশুরাম আর দেরি করলেন না। অহংকার ধুয়ে ফেলে তিনি সেই পবিত্র তীর্থে গেলেন এবং সেই জলে স্নান করলেন। আর অলৌকিকভাবেই, মেঘের আড়াল থেকে সূর্য ওঠার মতো, ধীরে ধীরে তাঁর শরীরের সেই দিব্য জ্যোতি ফিরে আসতে লাগল। মন হলো শান্ত, বুদ্ধি হলো নির্মল। যে অহংকার তাঁকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল, তা থেকে তিনি চিরতরে মুক্ত হলেন।

লোমশ মুনি পাণ্ডবদের দিকে তাকিয়ে গল্প শেষ করলেন। এইভাবেই মহাবীর পরশুরাম ঈশ্বরের চরণে নত হয়ে বিনম্র হতে শিখেছিলেন, আর ফিরে পেয়েছিলেন তাঁর তেজ। শিক্ষাটা খুব পরিষ্কার: চরম শক্তিশালীকেও ঈশ্বরের নিয়মের কাছে মাথা নোয়াতে হয়, আর মানুষ যদি নিজের ভুল বুঝতে পেরে বিনয়ী হয়, তবেই তার পুনরুত্থান সম্ভব।

বি: দ্র: আমি মহাভারতের আদি পর্ব সংক্ষেপে ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ২০তম  ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।


বনপর্বের ১৯তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।


মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 


মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page) 


Con


Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ

লক্ষ্যভেদের পর: কুন্তীর সেই অমোঘ বাক্য ও নিয়তির খেলা