৬০তম বনপর্ব-কিষ্কিন্ধ্যায় বালীবধ থেকে লঙ্কাপুরী:-সীতার অপেক্ষা ও পবনপুত্রের মহাসংবাদ

 


৬০তম বনপর্ব-কিষ্কিন্ধ্যায় বালীবধ থেকে লঙ্কাপুরী:-সীতার অপেক্ষা ও পবনপুত্রের মহাসংবাদ

রক্তের টান, সীতার অপেক্ষা ও পবনপুত্রের মহাসংবাদ

সুগ্রীব যখন পম্পা সরোবরের তীরে বসে দিন গুনছিলেন, তখন তাঁর বুকের ভেতরটা ভয়ে আর অপমানে দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছিল। বালীর প্রচণ্ড প্রতাপ আর তাড়া করে ফেরা ত্রাসের নাম তখন কিষ্কিন্ধ্যা। ঠিক সেই মুহূর্তেই ভাগ্য দুই পুরুষকে এনে দাঁড় করাল মুখোমুখি—একজন হারানো সিংহাসনের খোঁজে, অন্যজন অপহৃত প্রেয়সীর শোকে আকুল। রাম আর সুগ্রীবের সেই হাত মেলানো যেন শুধুই দুটো মানুষের মেলবন্ধন ছিল না, ছিল দুই ভাগ্যাহত আত্মার আতুড়ঘরের আদান-প্রদান।

রক্তের দামে বন্ধুত্বের ঋণ: বালীবধ ও কিষ্কিন্ধ্যার রাজসিংহাসন

শ্রীরামের চোখ জ্বলছিল অগ্নিশিখার মতো, যখন তিনি সীতার গায়ের সেই ফেলে যাওয়া বস্ত্রখণ্ডটি দেখলেন। সংশয় মুছে গেল—লঙ্কাপতি রাবণই হরণ করেছে তাঁর প্রাণধিক সীতাকে। কিন্তু প্রতিজ্ঞার এক কঠিন দায় চেপে বসল রামের কাঁধে। বন্ধু সুগ্রীবের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।

তারপর সেই নাটকীয় সংঘাত। কিষ্কিন্ধ্যার গুহাদ্বার কেঁপে উঠল সুগ্রীবের সিংহনাদে। বালী যখন বীরদর্পে বেরোতে গেলেন, বুদ্ধিমান তারা পথ আটকে দাঁড়িয়েছিলেন। তারার অনুভূতির সূক্ষ্ম তারে বেজে উঠেছিল বিপদের সুর—দশরথপুত্র রামের ধনুর্ধর হওয়ার খবর পৌঁছেছিল তাঁর কানে। কিন্তু বালীর অহংকার তাঁকে সেই সতর্কবাণীতে কান দিতে দেয়নি।

যুদ্ধ বাঁধল দুই ভাইয়ের—গাছের ডাল, পাথর আর হাঁসফাঁস করা হিংস্রতায় শরীর ফেটে রক্ত ঝরতে লাগল দুজনের। দেখতে হুবহু এক, কোনটা বালী আর কোনটা সুগ্রীব, চেনার উপায় ছিল না। হনুমান তখন সুগ্রীবের গলায় জড়িয়ে দিলেন একটি ফুলের মালা। সেই চিন্হ দেখে, গাছের আড়াল থেকে বাণ ছুড়লেন রাম। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন বালী, চোখে রামের প্রতি একরাশ ক্ষোভ আর তিরস্কার নিয়ে। বালীকে হারিয়ে কিষ্কিন্ধ্যার রাজপদে বসলেন সুগ্রীব, তারাকে গ্রহণ করলেন নিজের স্ত্রী হিসেবে। বর্ষার চার মাস কেটে গেল মাল্যবান পর্বতে; কিন্তু মদের চষক আর নারীর নূপুরধ্বনিতে সুগ্রীব যখন ডুব দিলেন, রামের হৃদয়ে তখন আশঙ্কার কালবৈশাখী।

ক্রুদ্ধ লক্ষ্মণ যখন ধনুকে ছিলা চড়িয়ে কিষ্কিন্ধ্যায় ঢুকলেন, সুগ্রীবের ঘোর ভাঙল। বিনীত সুগ্রীব জানান, সীতার খোঁজে দশদিকে ছড়ানো হয়েছে চতুরঙ্গ বানরসেনা।

অশোকবনের আঁধার ও ত্রিজটার সুসংবাদ

ওদিকে সাগরের ওপারে, রাবণের নন্দনকানন সদৃশ অশোকবনে সীতা যেন এক জীবন্ত চিতাগ্নি। কৃশ শরীর, মলিন বস্ত্র, উপবাসে শুকিয়ে যাওয়া গাল—চারপাশে সশস্ত্র, বিভৎস রাক্ষসীদের ভয়াল গর্জন। রাক্ষসীরা যখন তাকে কেটে খাওয়ার ভয় দেখাচ্ছে, সীতা তখন শান্ত কণ্ঠে মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করতে চাইছেন।

সেই বিষাদের আঁধারে হঠাৎ আলো হয়ে এলেন ত্রিজটা। মিষ্টভাষী, ধর্মজ্ঞ এই রাক্ষসী সীতাকে বললেন:

"সখী, মন থেকে ভয় দূর করো। বৃদ্ধ অবিন্ধ্য খবর পাঠিয়েছেন—রাম ও লক্ষ্মণ কুশলে আছেন, সুগ্রীবের সঙ্গে তাঁদের মিত্রতা হয়েছে। আর রাবণ? নলকুবেরের সেই প্রাচীন অভিশাপের কথা মনে রেখো, সীতা! কোনো পরস্ত্রীকে বলপূর্বক ভোগ করতে গেলেই রাবণের মস্তক সপ্তধা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তুমি সুরক্ষিত।"

বি:দ্র:-নলকুবেরের সেই প্রাচীন অভিশাপের কথা জানতে এখানে ক্লিক করুন।

ত্রিজটা শোনালেন তাঁর স্বপ্নের কথা—সাদা পর্বতের ওপর ধবধবে সাদা পোশাকে দাঁড়িয়ে আছেন একমাত্র বিভীষণ, আর লঙ্কার আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে রামের অমলিন যশ।

ঠিক তারপরই কামাতুর রাবণ এসে দাঁড়াল সীতার সামনে। চোদ্দ কোটি পিশাচ আর চৌদ্দ ভুবনের বৈভবের প্রলোভন দেখিয়ে সীতাকে পাটরানি করার প্রস্তাব দিল। কিন্তু সীতা কেবল একগাছি তৃণ তুলে ধরে, মুখ ঘুরিয়ে সোজা জানিয়ে দিলেন—"আমি পতিব্রতা, রাক্ষসরাজ। তুমি আমাকে কোনোদিন পাবে না।"

মলয় পর্বতের অনশন ও পবনপুত্রের মহালম্ফন

দিন গড়াচ্ছিল। বানরসেনারা সবদিক থেকে হাত খালি করে ফিরে এলেও দক্ষিণ দিকের কোনো খবর ছিল না। মলয় পর্বতের চূড়ায় বসে অঙ্গদ, হনুমানরা যখন সমুদ্রের অসীম জলরাশি দেখে অনশনে প্রাণত্যাগের সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন, তখনই তাঁদের সামনে এসে দাঁড়াল এক বিশালাকার পক্ষী—জটায়ুর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সম্পাতি। ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে ব্যথিত সম্পাতি তাঁর দিব্যদৃষ্টিতে দেখে জানিয়ে দিলেন—"সীতা আছেন সাগরের ওপারে, রাবণের লঙ্কাপুরীতে।"

কিন্তু শত যোজন বিস্তৃত সমুদ্র পার হবে কে?

এগিয়ে এলেন বায়ুপুত্র হনুমান। শূন্যে লাফ দিলেন তিনি, সমুদ্রের হিংস্র রাক্ষসীদের বাধা চূর্ণ করে পৌঁছে গেলেন লঙ্কায়।

অশোকবনের গোপনে সীতার দর্শন পেলেন হনুমান। রামের দেওয়া আংটি আর সুসংবাদ পৌঁছে দিতেই বৈদেহীর চোখে নেমে এল স্বস্তির জল। বিশ্বাস সুদৃঢ় করতে সীতা দিলেন তাঁর মাথার রত্নমণি, আর মনে করিয়ে দিলেন চিত্রকূটের সেই কাকের চোখে তীর ছোঁড়ার অতি গোপন স্মৃতি।

কাজ শেষ করে পুরো লঙ্কাপুরীতে আগুন জ্বালিয়ে, ভস্মীভূত ধ্বংসস্তূপ পেছনে ফেলে হনুমান ফিরে এলেন রামের কাছে।

সংবাদ পেয়ে রামের ব্যাকুল চোখ দুটো ভেসে গেল জলে, কিন্তু সে জল আর বিষাদের নয়—তা ছিল এক অগ্নিগর্ভ আশার, যা খুব শিগগিরই সাগরের ওপর সেতু বাঁধবে আর চূর্ণ করবে লঙ্কার অহংকার।

বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম  ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে  সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের   ৬০তম ভাগের  আলোচনা  এবং এটি এগিয়ে চলবে।

বনপর্বের ৫৯তম  ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে  ক্লিক  করুন ।

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির  প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page) 

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচির- তৃতীয়  পাতা (Index of Brief Mahabharata) 

আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :



Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সত্যবতীর সন্তান ও হস্তিনাপুরের নিয়তি- বিচিত্রবীর্যের অকাল প্রয়াণ