চতুর্থভাগ বিরাটপর্বের (বর্ধিত অংশ) মৃত্যু যখন সৈরন্ধ্রীর ছদ্মবেশে দাঁড়িয়ে ছিল — কীচক-বধের কাহিনি


চতুর্থভাগ বিরাটপর্বের  (বর্ধিত অংশ) মৃত্যু যখন সৈরন্ধ্রীর ছদ্মবেশে দাঁড়িয়ে ছিল — কীচক-বধের কাহিনি

বি:দ্র: এর পূর্ববর্তী ভাগ-চতুর্থ ভাগ -বিরাট পর্ব-কীচকের দ্রৌপদীর প্রতি আসক্তি এবং দ্রৌপদীকে অপমান

সভাঘরের আলো তখনও নেভেনি। দ্রৌপদী ছুটে এলেন, সারা শরীর কাঁপছে, চুল এলোমেলো। কীচক পিছু নিলেন, চুলের মুঠি ধরলেন, তারপর সবার সামনে তাঁকে মাটিতে ফেলে লাথি মারলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে সূর্যদেব-নিযুক্ত এক রাক্ষস অদৃশ্য হাতে কীচককে তুলে ছুড়ে ফেলে দিল দূরে। কীচক আছড়ে পড়লেন মাটিতে, নিথর।

যুধিষ্ঠির আর ভীম তখন সভাতেই বসে ছিলেন। দুজনেই দেখলেন এই অপমান, দুজনেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন ক্ষোভে। ভীমের দাঁতে দাঁত লেগে গেল, উঠে দাঁড়াতে গেলেন কীচককে শেষ করে দেবেন বলে। যুধিষ্ঠির তাঁর হাত চেপে ধরলেন — এখনই পরিচয় ফাঁস হয়ে গেলে সব পরিশ্রম বৃথা যাবে।

দ্রৌপদী তখন রাজসভার দরজায় দাঁড়িয়ে কাঁদছেন। বলছেন — আমার স্বামীরা চাইলে এই জগৎ ধ্বংস করে দিতে পারেন, কিন্তু ধর্মের বাঁধনে বাঁধা বলে চুপ করে আছেন। আমি তাঁদের ধর্মপত্নী, তবু আজ এক সূতপুত্রের হাতে লাথি খেলাম। যাঁরা আশ্রিতদের রক্ষা করেন, আজ তাঁরাই কোথায় লুকিয়ে? আর এই রাজা বিরাট — ইনিও তো ধর্মভ্রষ্ট, চোখের সামনে এক নিরপরাধ নারীকে মার খেতে দেখেও চুপ করে বসে থাকলেন। এই সভা, এই রাজধর্ম — কোনোটাই আজ শোভা পাচ্ছে না।

সভাসদরা সবাই স্তম্ভিত। তাঁরা দ্রৌপদীর সাহসের প্রশংসা করলেন, কীচককে ধিক্কার দিলেন, বললেন — যে পুরুষ এমন স্ত্রী পেয়েছে, সে ধন্য। এ তো মানবী নয়, দেবী।

যুধিষ্ঠির নিচু গলায় বললেন — সৈরন্ধ্রী, আর দাঁড়িয়ে থেকো না, রানি সুদেষ্ণার কাছে ফিরে যাও। তোমার গন্ধর্ব স্বামীরা এখন ব্যস্ত, নয়তো নিশ্চয়ই আসতেন। তাঁরা ঠিক সময়ে বিচার করবেন।

দ্রৌপদী চোখ লাল করে, চুল খোলা অবস্থায় ফিরে গেলেন। সুদেষ্ণা তাঁকে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন কী হয়েছে। দ্রৌপদী বললেন — রাজার সামনেই কীচক আজ আমাকে মেরেছে। সুদেষ্ণা রেগে বললেন — বললেই আজ ওকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারি। দ্রৌপদী শান্ত গলায় জবাব দিলেন — যাদের কাছে ও অপরাধ করেছে, তারাই ওকে শেষ করবে। ও এবার নিশ্চয়ই যমালয়ে যাবে।

পাকশালায় ফিরে দ্রৌপদী ভীমকে হাত দেখালেন — সুদেষ্ণার জন্য চন্দন ঘষতে ঘষতে হাতে কড়া পড়ে গেছে, আগে যা কখনো হয়নি। বললেন — জানি না দেবতাদের কাছে কী পাপ করেছি, যে আমার মৃত্যুও আসছে না।

ভীম সেই হাত ধরলেন, সত্যিই কালো দাগ পড়ে গেছে চামড়ায়। তাঁর বুক ভেঙে গেল। বললেন — কৃষ্ণা, ধিক্কার আমার এই বাহুবলকে, ধিক্কার অর্জুনের গাণ্ডীবকেও। সেদিনই আমি বিরাটের সভা ধ্বংস করে দিতে পারতাম, কীচকের মাথা কেটে ফেলতে পারতাম — শুধু ধর্মরাজের নিষেধেই থেমে গেছি। দুর্যোধন, কর্ণ, শকুনি, দুঃশাসন — এদের মাথা এখনও কাটিনি বলে আজও শরীর জ্বলে যায় আমার। তবু সুন্দরী, ধৈর্য ধরো, ধর্ম ছেড়ো না। পূর্বে কত নারী স্বামীর জন্য এমন কষ্ট সয়েছেন — চ্যবন মুনির স্ত্রী সুকন্যা, সীতা, লোপামুদ্রা, সাবিত্রী। তুমিও তাঁদেরই মতো। আর মোটে দেড় মাস, তেরো বছর পূর্ণ হলেই তুমি রানি হবে।

দ্রৌপদী বললেন — স্বামী, অনেক সয়েছি, তাই চোখে জল এসেছে। কিন্তু এখন যা করার তার জন্য তৈরি হও। কীচক প্রতিদিন আমার পিছু নেয়। একদিন ওকে বলেছিলাম — আমি পাঁচ গন্ধর্বের স্ত্রী, ওরা তোমায় প্রাণে মেরে ফেলবে। ও হেসে বলেছিল — গন্ধর্ব কেন, লাখখানেক গন্ধর্ব এলেও ভয় নেই আমার।

তারপর কীচক সুদেষ্ণার সাহায্য নিল। সুদেষ্ণা ভাইয়ের অনুরোধে আমাকে পাঠালেন কীচকের ঘর থেকে পানীয় আনতে। সেখানে গেলে ও আমার সম্মতি চাইল, আমি অস্বীকার করায় জোর করতে গেল। আমি ছুটে পালালাম রাজার কাছে, কিন্তু সেখানেও রাজার সামনেই ও আমাকে মাটিতে ফেলে লাথি মারল। কীচক সেনাপতি, তাই রাজা-রানি দুজনেই ওর কথা শোনেন, প্রজাদের ধন লুট করে, ধর্মের ধার ধারে না।

দ্রৌপদী শেষে বললেন — যদি কাল সূর্যোদয়ের আগে কীচক না মরে, আমি বিষ খাব। ওর হাতে পড়ার চেয়ে তোমার সামনে মরে যাওয়াই ভালো।

এই বলে দ্রৌপদী ভীমের বুকে মাথা রেখে কাঁদলেন। ভীম চোখ মুছিয়ে বললেন — তুমি যা বলবে তাই হবে। আজই কীচককে ওর বন্ধুবান্ধব সমেত শেষ করব। কাল সন্ধ্যায় ওকে ডেকো নতুন নৃত্যশালায় — দিনে নাচ শেখানো হয়, রাতে ফাঁকা পড়ে থাকে। সেখানেই ওকে যমের ঘরে পাঠাব।

সারারাত দুজনে দুঃখে কাটালেন, মনে মনে প্রতিজ্ঞা পাকা করলেন। সকালে কীচক এসে দ্রৌপদীকে বলল — সভায় লাথি খেয়ে বুঝেছ তো আমার শক্তি? বিরাট নামেই রাজা, আসল ক্ষমতা আমার হাতে। ভালোয় ভালোয় রাজি হয়ে যাও।

দ্রৌপদী বললেন — এক শর্তে রাজি, তোমার কোনো ভাই বা বন্ধু যেন জানতে না পারে। কীচক রাজি হল। দ্রৌপদী জায়গা ঠিক করলেন — সেই নতুন নৃত্যশালা, রাতে ফাঁকা থাকে।

কীচক আনন্দে ফিরে গেল, জানতেও পারল না মৃত্যু তার জন্য সৈরন্ধ্রীর ছদ্মবেশে অপেক্ষা করছে।

পাকশালায় ফিরে দ্রৌপদী ভীমকে সব জানালেন। ভীম শপথ করলেন — ইন্দ্র যেমন বৃত্রাসুরকে বধ করেছিলেন, আমিও তেমনই কীচককে শেষ করব। বিরাটের লোকজন বাধা দিলে তাদেরও ছাড়ব না। দ্রৌপদী শুধু বললেন — আমার জন্য সত্য ভেঙো না, অজ্ঞাতবাসের নিয়ম রেখেই কাজটা সেরো। ভীম কথা দিলেন।

রাতে ভীম আগেই নৃত্যশালায় গিয়ে লুকিয়ে রইলেন, সিংহ যেমন হরিণের অপেক্ষায় থাকে। কীচক এল সেজেগুজে, অন্ধকারে দ্রৌপদী ভেবে ভীমের গায়ে হাত রাখল। ভীম রাগে জ্বলছিলেন ভেতরে ভেতরে, তবু ঠাণ্ডা গলায় বললেন — তোমার এই স্পর্শ আগে কখনো পাওনি বুঝি? তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে হাসলেন — পাপী, তুই পাহাড়ের মতো বিশাল, কিন্তু সিংহ যেমন হাতিকেও টেনে নেয়, তেমনই আজ তোকে মাটিতে পিষে ফেলব, তোর বোন সব দেখবে। তুই সরে গেলে সৈরন্ধ্রী মুক্তি পাবে, ওর স্বামীরাও নিশ্চিন্ত হবে।

চুলের মুঠি ধরে টানাটানি শুরু হল। কীচকও কম বলবান নন, ছাড়িয়ে নিয়ে ভীমের দুই হাত চেপে ধরলেন। দুই বীর জড়াজড়ি করে লড়তে লাগলেন, ঝড়ে গাছ যেমন উপড়ে যায়, তেমনই ভীম কীচককে ঘুরিয়ে ফেলছিলেন সারা ঘরে। কীচক এক পর্যায়ে হাঁটুর ঘায়ে ভীমকে ফেলে দিলেন, কিন্তু ভীম মুহূর্তে লাফিয়ে উঠলেন। শেষে চুলের মুঠি এমন শক্ত করে চেপে ধরলেন, যেন বাঁধা পশু। কীচক ছটফট করলেন, ভীম তাঁকে বারবার মাটিতে আছড়ালেন, তারপর বুকের ওপর চেপে বসলেন দুই হাঁটু দিয়ে। কীচকের চোখ ঠেলে বেরিয়ে এল, নিমেষে সব শেষ।

ভীম কীচকের হাত-পা ভেঙে শরীরের ভেতরে গুঁজে দিলেন, তারপর দ্রৌপদীকে ডেকে দেখালেন — দেখো, কেমন সাজিয়েছি একে। লাশে লাথি মেরে বললেন — যে তোমার দিকে কুনজরে তাকাবে, তার এই দশাই হবে। তারপর রাগ থামলে ফিরে গেলেন পাকশালায়।

দ্রৌপদী নৃত্যশালার রক্ষীকে গিয়ে বললেন — দেখো, কীচকের এই অবস্থা করেছে আমার গন্ধর্ব স্বামীরা। রক্ষীরা মশাল নিয়ে ছুটে এসে রক্তাক্ত লাশ দেখে শিউরে উঠল। কীচকের ভাই-বন্ধুরা এসে কান্নাকাটি জুড়ল, ভয়ে কাঁপল সবাই — শরীর এমনভাবে গোটানো যে কচ্ছপের মতো দেখাচ্ছিল।

তারপরই তাদের চোখ পড়ল দ্রৌপদীর ওপর। রেগেমেগে বলল — এই দুষ্টাকেই মেরে ফেলা উচিত, ওর জন্যই কীচকের মৃত্যু। ওকেই কীচকের সঙ্গে পুড়িয়ে দেওয়া হোক, তাতে ওর আত্মা শান্তি পাবে। তারা রাজা বিরাটের কাছে গিয়ে অনুমতি চাইল, ভয় পেয়ে রাজা রাজি হয়ে গেলেন।

কীচকের ভাইয়েরা দ্রৌপদীকে টেনে বেঁধে ফেলল লাশ-বহনকারী শকটে, রওনা হল শ্মশানের দিকে। দ্রৌপদী অসহায়ভাবে চিৎকার করে ডাকতে লাগলেন — জয়, জয়ন্ত, বিজয়, জয়ৎসেন, জয়দ্বল — যাদের ধনুকের টংকার বজ্রের মতো শোনায়, তারা শোনো, সূতপুত্ররা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে বধ্যভূমিতে।

সেই কান্না ভীমের কানে পৌঁছাল। তিনি এক মুহূর্তও দেরি না করে শয্যা ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন, বললেন — সৈরন্ধ্রী, তোমার ডাক শুনেছি, আর ভয় নেই। ছুটে গেলেন শ্মশানে, পৌঁছালেন সবার আগে। চিতার পাশে এক বিশাল গাছ, তার একটা মোটা শুকনো ডাল ভেঙে কাঁধে নিয়ে যমরাজের মতো এগিয়ে গেলেন সূতপুত্রদের দিকে।

সিংহের মতো ক্রুদ্ধ ভীমকে আসতে দেখে তারা আঁতকে উঠল — ওই দেখো, গন্ধর্ব গাছ উপড়ে আসছে, সৈরন্ধ্রীকে এক্ষুনি ছেড়ে দাও। বলেই পালাতে লাগল। ভীম গাছের ডাল দিয়ে একে একে কীচকের একশো পাঁচ ভাইকে যমালয়ে পাঠিয়ে দিলেন। তারপর দ্রৌপদীর বাঁধন খুলে সান্ত্বনা দিলেন, চোখের জল মুছিয়ে বললেন — কৃষ্ণা, যারা তোমাকে কষ্ট দেবে তাদের এই দশাই হবে। এখন ফিরে যাও নগরে, ভয় নেই আর। আমি অন্য পথে পাকশালায় ফিরছি।

নগরবাসীরা রাজা বিরাটকে গিয়ে জানাল — গন্ধর্বরা সূতপুত্রদের শেষ করে দিয়েছে, সৈরন্ধ্রী মুক্ত হয়ে রাজভবনের দিকে গেছে। ভয় পেয়ে রাজা বললেন — কীচক আর তার ভাইদের একই চিতায় দাহ করো সসম্মানে। তারপর ভয়ে ভয়ে সুদেষ্ণাকে বললেন — সৈরন্ধ্রী এলে বোলো, ও যেন যেখানে খুশি চলে যায়, আর থাকার দরকার নেই, গন্ধর্বদের ভয়ে আমি আর ঝুঁকি নিতে চাই না।

স্নান সেরে ভেজা কাপড়ে দ্রৌপদী যখন নগরে ফিরছিলেন, পথের মানুষ তাঁকে দেখে ভয়ে সরে যাচ্ছিল, কেউ চোখ বুজে নিচ্ছিল — যেন সাক্ষাৎ সিংহীর সামনে পড়েছে। পথে নৃত্যশালার কাছে দেখা হল বৃহন্নলার সঙ্গে। অর্জুন জিজ্ঞেস করলেন — সৈরন্ধ্রী, কীভাবে বাঁচলে ওদের হাত থেকে? সব শুনতে চাই তোমার মুখে। দ্রৌপদী তীক্ষ্ণ গলায় জবাব দিলেন — বৃহন্নলা, তোমার তাতে কী দরকার? তুমি তো মজায় আছ অন্তঃপুরে, আমার দুর্দশায় তোমার কী এসে যায়? ঠাট্টা করছ নাকি আমার সঙ্গে? বৃহন্নলা মৃদু গলায় বললেন — কল্যাণী, এই নপুংসক সেজে থাকার কষ্টটা কি বোঝো না? আমরা তো সবাই একসঙ্গেই আছি, তোমার দুঃখে আমরাও কি দুঃখ পাই না?

দ্রৌপদী অন্য সেবিকাদের সঙ্গে রাজভবনে গিয়ে সুদেষ্ণার সামনে দাঁড়ালেন। সুদেষ্ণা বিরাটের কথামতো বললেন — ভদ্রে, মহারাজ গন্ধর্বদের ভয়ে অস্থির। তোমার মতো রূপবতী এ জগতে দুর্লভ, পুরুষ মাত্রেই রূপে মুগ্ধ হয়, আর তোমার স্বামীরাও ভয়ানক ক্রোধী। তাই তুমি যেখানে ইচ্ছা চলে যেতে পারো।

দ্রৌপদী শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বললেন — মহারাজ যেন আর মাত্র তেরোটি দিন আমাকে সহ্য করেন। তারপর আমার স্বামীরা নিজেই এসে আমাকে নিয়ে যাবেন, আর আপনাদেরও মঙ্গল করবেন। তাঁদের সাহায্যে মহারাজ এবং তাঁর পরিবারের অনেক উপকার হবে।

বি:দ্র: এর পরবর্তী বিরাটপর্বের পঞ্চমভাগ  -বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ ও কৌরব সভায় নিঃশব্দ ষড়যন্ত্র-

Comments

Popular posts from this blog

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি-প্রথম পাতা

মহাভারতের সংক্ষিপ্ত বিষয়সূচি- দ্বিতীয় পাতা

সংক্ষিপ্ত মহাভারতের  বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)