Posts

Showing posts with the label udyog parba mahabharata

৪৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব শিখণ্ডী ও লিঙ্গান্তরের ইতিহাস

Image
৪৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-শিখণ্ডী ও লিঙ্গান্তরের ইতিহাস কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে দুর্যোধনের প্রশ্নের উত্তরে পিতামহ ভীষ্ম শোনাচ্ছিলেন এক অদ্ভুত এবং রহস্যময় কাহিনী। কীভাবে পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কন্যা শিখণ্ডী শেষপর্যন্ত পুরুষে রূপান্তরিত হলেন—তার এক চিরন্তন ও রোমাঞ্চকর উপাখ্যান। রাজা দ্রুপদ ছিলেন পুত্রহীন। সন্তানলাভের আশায় তিনি কঠোর তপস্যায় শিবকে প্রসন্ন করলেন। মহাদেব বর দিলেন, "তোমার এমন এক সন্তান জন্মাবে, যে জন্মাবে নারী হয়ে, কিন্তু পরবর্তীতে রূপান্তরিত হবে পুরুষে।" শিবের বাক্যে আস্থা রেখে দ্রুপদ রাজ্যে ফিরে এলেন। যথাসময়ে রানি এক পরমা সুন্দরী কন্যা সন্তানের জন্ম দিলেন। কিন্তু শিবের বচনে অবিচল দ্রুপদ ও রানি বাইরের জগৎ থেকে সত্য গোপন রাখলেন। নগরজুড়ে ঘোষণা করা হলো, পাঞ্চালরাজের পুত্র সন্তান হয়েছে। তার নাম রাখা হলো শিখণ্ডী। শিখণ্ডী বড় হতে লাগলেন রাজপুত্রের মতোই। দ্রোণাচার্যের কাছে অস্ত্রশিক্ষায় তিনি পারদর্শী হয়ে উঠলেন। যথাসময়ে দশার্ণরাজ হিরণ্যবর্মার কন্যা দেবতিলকার সাথে শিখণ্ডীর বিবাহ সম্পন্ন হলো। কিন্তু বাসর ঘরেই উদঘাটিত হলো চরম সত্য—শিখণ্ডী পুরুষ নন, নারী! অপমানিতা ...

৪৪তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অম্বার রক্ত শপথ ও কুরুক্ষেত্রের ছায়া

Image
৪৪তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অম্বার রক্ত শপথ ও কুরুক্ষেত্রের ছায়া মহাকাব্যের পাতায় কত যুদ্ধই তো লেখা আছে। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের সেই মহামানবের সমুদ্র-মন্থনের বহু আগেই, অলক্ষ্যে আর একটি যুদ্ধের বীজ বোনা হয়ে গিয়েছিল। সে যুদ্ধ অসি আর ধনুকের নয়, সে যুদ্ধ অপমান, জেদ আর এক নারীর বুকভাঙা অভিশাপের। ভীষ্ম তখন তাঁর অপরাজেয় যৌবনের চূড়ায়। ভাই বিচিত্রবীর্যের জন্য কাশীরাজের স্বয়ংবর সভা থেকে তিন রাজকন্যা—অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকাকে বলপূর্বক হরণ করে আনলেন হস্তিনাপুরে। বীরের দর্প, ক্ষাত্রধর্মের হুঙ্কার! কিন্তু অন্তপুরের দরজায় দাঁড়িয়ে জ্যেষ্ঠা কন্যা অম্বা যখন নিচু স্বরে বললেন, “ভীষ্ম, আপনি ধর্মের সূক্ষ্ম গতি জানেন। আমি মনে মনে শাল্বরাজকে বরণ করেছি। আমাকে ক্ষমা করুন।”—ভীষ্ম সেদিন তাঁকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। ধর্মের মর্যাদায় অম্বাকে যেতে দেওয়া হলো শাল্বরাজের রাজ্যে। মহাকাব্যের পাতায় কত যুদ্ধই তো লেখা আছে। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের সেই মহামানবের সমুদ্র-মন্থনের বহু আগেই, অলক্ষ্যে আর একটি যুদ্ধের বীজ বোনা হয়ে গিয়েছিল। সে যুদ্ধ অসি আর ধনুকের নয়, সে যুদ্ধ অপমান, জেদ আর এক নারীর বুকভাঙা অভিশাপের। ভীষ্ম তখন ত...

৩৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-শান্তির শেষ সুযোগ ও ধ্বংসের আবাহন: কৌরব সভার রূপরেখা

Image
৩৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-শান্তির শেষ সুযোগ ও ধ্বংসের আবাহন: কৌরব সভার রূপরেখা উপপ্লব্যের থমথমে শিবিরে যখন শ্রীকৃষ্ণ পদার্পণ করলেন, তখন সন্ধ্যার ধূসর আলো নেমে এসেছে। হস্তিনাপুরের ধূলিমলিন দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন কেবল এক রাজনৈতিক দূতের ফেরা নয়—যেন রক্তক্ষয়ী এক মহাযুদ্ধের বার্তা বহন করে আনা। পাণ্ডব শিবিরে তখন স্তব্ধতা। যুধিষ্ঠির ব্যাকুল চোখে কৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কৃষ্ণ এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "ধর্মরাজ, আমি কৌরব সভায় গিয়ে পরম সত্য, ন্যায় এবং উভয় কুলের মঙ্গলপ্রদ কথা স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছিলাম। কিন্তু অহংকারে অন্ধ দুর্যোধন কোনো কল্যাণকর উপদেশই গ্রহণ করতে চাইল না।" যুধিষ্ঠিরের কণ্ঠস্বর সামান্য কেঁপে উঠল। তিনি কৃষ্ণের হাত দুটি চেপে ধরে বললেন, "হে জনার্দন, দুর্যোধন যখন কুপথ ছাড়তে রাজি হলো না, তখন বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম তাঁকে কী বললেন? আচার্য দ্রোণ, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, মাতা গান্ধারী, ধর্মজ্ঞ বিদুর এবং সভায় উপস্থিত কুরুবৃদ্ধরা কীভাবে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন? আমাকে বিস্তারিত বলো।" কৃষ্ণ তখন কৌরব রাজসভার সেই নাটকীয় ও উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্য একে একে ত...

৩৬তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অগ্নিগর্ভা কুন্তী ও কুরুক্ষেত্রের রণভেরী

Image
৩৬তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-অগ্নিগর্ভা কুন্তী ও কুরুক্ষেত্রের রণভেরী উপপ্লব্যের আকাশে তখন বিকেলের কনে-দেখা আলোটুকু ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। কৌরব রাজসভার উত্তপ্ত জলহাওয়া পেছনে ফেলে কুন্তীর জীর্ণ কুটিরে যখন কৃষ্ণ প্রবেশ করলেন, তখন তাঁর মুখে এক গভীর প্রশান্তির আস্তরণ। কিন্তু সেই প্রশান্তির ভেতরে লুকিয়ে ছিল আগামী এক মহাযুদ্ধের স্পষ্ট পূর্বাভাস। ধীর পায়ে কৃষ্ণের আগমন দেখে কুন্তী তাঁর দিকে ফিরে তাকালেন। কৃষ্ণের চোখের ভাষাই বলে দিচ্ছিল, হস্তিনাপুরের রাজসভায় কী ঘটেছে। কৃষ্ণের মাথা নত করে কৃষ্ণের দুটি হাত কুন্তীর চরণে স্পর্শ করল। এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে কৃষ্ণ বললেন, "পিসিমা, আমি আর রাজসভার প্রবীণ ঋষিগণ অনেক চেষ্টা করেছি। যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে দুর্যোধনকে বোঝাতে চেয়েছি, শান্তির পথই যে কল্যাণের পথ—তা সুস্পষ্ট করে দিয়েছি। কিন্তু অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র অন্ধতর অহংকারে মত্ত। সে কোনো কথা শোনেনি, একবিন্দু জমিও ছাড়তে রাজি নয়। আমি এখন আপনার কাছ থেকে বিদায় নিতে এসেছি পিসিমা, আমাকে শীঘ্রই উপপ্লব্যে পাণ্ডবদের কাছে পৌঁছাতে হবে। বলুন, পাঁচ ভাইয়ের জন্য আপনার কী বার্তা নিয়ে যাব?" কুন্তীর চোখে তখন কোন...

৩৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-ঈশ্বরের চোখে জ্বলন্ত ধূপ: কৌরব সভার সেই অগ্নিঝড়

Image
৩৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-ঈশ্বরের চোখে জ্বলন্ত ধূপ: কৌরব সভার সেই অগ্নিঝড় কর্ণের কুন্ডল ও বর্মের সেই পুরনো তেজ যেন ছড়িয়ে পড়েছিল কৃষ্ণের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তাঁর কান থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছিল ভয়াল আগুনের রক্তিম শিখা, আর শরীরের প্রতিটি রোমকূপ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল হাজারটা মধ্যাহ্নসূর্যের এক অচিন আলো। হস্তিনাপুরের কৌরব সভা তখন এক থমথমে অন্ধকারের গর্ভে। দূর থেকে নেমে আসা এক অলৌকিক দাপটে থরথর করে কাঁপছিল সভাতল। সাধারণ রাজারা সেই তেজ সহ্য করতে না পেরে আতঙ্কে চোখ বুজলেন। একটা গোটা রাজসভা যেন হঠাৎ আলোহীন, নিথর। শুধু কজন মানুষ চোখের পাতা মোছার সাহসটুকু পেলেন—ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর, সঞ্জয় আর সভাসীন তপস্বী ঋষিগণ। জনার্দন কৃষ্ণ নিজেই যে তাঁদের বুনে দিয়েছিলেন এক অন্য দেখার চোখ—এক দিব্যদৃষ্টি! স্তব্ধ সভাঘরের মাথার ওপরের নীল আকাশ থেকে তখন অলক্ষ্যে নেমে এল দেবতাদের দুন্দুভির বাজনা, ঝরে পড়ল অগুনতি পারিজাত। সেই ঘোর অন্ধকারের ভেতর থেকে কাতর গলায় কেঁদে উঠলেন এক বৃদ্ধ অন্ধ পিতা। ধৃতরাষ্ট্র ব্যাকুল হয়ে দু-হাত বাড়ালেন, "কমলনয়ন! তুমিই তো বিশ্বজগতের কল্যাণময় রূপ। আজ আমার ওপর একটু করুণা করো। আমাকে শুধু একটিবার স...

৩৪তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-রাজসভার বিষ ও বাসুদেবের ক্রোধ

Image
৩৪তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-রাজসভার বিষ ও বাসুদেবের ক্রোধ কৌরব রাজসভায় যুদ্ধের ঘনঘটা। কৃষ্ণের অনুনয়-বিনয়, পৈতৃক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার শেষ প্রস্তাব—সবকিছু উড়িয়ে দিয়ে দুর্যোধনের কণ্ঠ তখন দম্ভে কাঁপছে। একবিন্দু নতিস্বীকার নয়, কোনো আপস নয়। দুর্যোধন সোজা তাকালেন কৃষ্ণের দিকে। চোখ দুটো রাগে ধকধক করে জ্বলছে। বললেন, “কেশব! মেপে কথা বলবেন। পাণ্ডবদের পিরিতি দেখাতে গিয়ে আমাকে অপরাধী সাজাচ্ছেন কেন? আমি তো নিজের মধ্যে কোনো অন্যায় দেখতে পাই না। ওরা শখ করে পাশা খেলতে এসেছিল, আমার মামা শকুনির বুদ্ধির কাছে হেরে বনবাসে গেছে। এতে আমার দোষ কোথায়? আর শুনুন, আমরা ইন্দ্রের সামনেও মাথা নোয়ানোর পাত্র নই। ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ আর কর্ণের মতো বীর যাদের পাশে, তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে কে হারাবে? আমরা লড়ব। সূচগ্র মেদিনীও পাণ্ডবদের আমি বিনা যুদ্ধে দেব না!” ঘরের নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। কৃষ্ণ হাসলেন না, তাঁর চোখের কোণে শুধুই কুঞ্চিত ক্রোধের রেখা। এক অদ্ভুত শান্ত কিন্তু বজ্রকঠিন স্বরে উত্তর দিলেন, “বীরশয্যাই যদি তোমার শেষ ইচ্ছে হয় দুর্যোধন, তবে তা-ই হবে। কিন্তু আত্মছলনা কোরো না। দ্রৌপদীকে সভায় টেনে এনে যে...

৩৩তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব অভিমানী দুর্যোধনের অন্ধ আঁধার ও এক অমোঘ পরিণতি

Image
৩৩তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব অভিমানী দুর্যোধনের অন্ধ আঁধার ও এক অমোঘ পরিণতি রাজসভার বাতাস তখন চরম উত্তেজনায় ভারাক্রান্ত। হস্তিনাপুরের রাজসভায় একে একে উপস্থিত হয়েছেন জ্ঞানবৃদ্ধ ও বয়োজ্যেষ্ঠগণ। কিন্তু সভা জুড়ে যে বিষণ্ণ স্তব্ধতা, তাকে সহজে কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছিল না। মহামতি বেদব্যাস, সর্বমান্য পিতামহ ভীষ্ম এবং স্বয়ং দেবর্ষি নারদ—সবাই চেষ্টা করেছেন। নারদের কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়েছিল গভীর জীবনসত্য। তিনি বলেছিলেন, "জগতে সহৃদয় শ্রোতা আর সুহৃদ পাওয়া বড় দুর্লভ হে কুরুনন্দন! যখন ঘোর সংকট আসে, আপনজনরাও মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন শুধু একজন খাঁটি বন্ধুই পাশে থাকে। হঠকারিতার ফল কোনোদিন শুভ হয় না, তার পরিণাম কেবলই হাহাকার।" কিন্তু যে চোখ অন্ধকারের প্রেমে পড়েছে, আলো তাকে স্পর্শ করবে কীভাবে? অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অক্ষম পিতা হিসেবে নিজের দুর্বলতাটুকু তিনি ঢাকতে পারলেন না। তিনি শ্রীকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, "কেশব! তোমার প্রতিটা কথা ধর্মের কথা, সুচিন্তিত এবং ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু আমি যে পরাধীন! এই মন্দমতি দুর্যোধন আমার কোনো কথা শোনে না, শাস্ত্র মানে না, কোনো গুরু...

৩২তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-দম্ভের বিষবৃক্ষ ও দুই সনাতন তপস্বী

Image
৩২তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-দম্ভের বিষবৃক্ষ ও দুই সনাতন তপস্বী কৃষ্ণ যখন কৌরবদের রাজসভায় দাঁড়িয়ে তাঁর গভীর, অমোঘ বাণী উচ্চারণ করলেন, তখন গোটা সভাগৃহ এক অলৌকিক নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। যেন কোনো এক বিপুল ঝড়ের পূর্বাভাসে থমকে গেছে চরাচর। ধৃতরাষ্ট্র, ভীষ্ম, দ্রোণ থেকে শুরু করে উপস্থিত রাজন্যবর্গ—কারো মুখেই কোনো শব্দ নেই। তাঁদের গা ছমছম করে উঠল, শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল রোমাঞ্চে। এক আশ্চর্য ও জটিল দোলাচলে দুলতে লাগল তাঁদের মন, কিন্তু প্রকাশ্যে সে কথা উচ্চারণ করার সাহসিকতা কারও ছিল না। সভায় তখন শ্মশানের নীরবতা। সেই অচল নীরবতা চূর্ণ করে উঠে দাঁড়ালেন মহর্ষি পরশুরাম । দুর্যোধনের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে, এক দৃঢ় ও শান্ত স্বরে তিনি বলতে শুরু করলেন, "শোনো রাজন, আজ তোমাকে এক বহু প্রাচীন সত্য শোনাই। তোমার যদি বিন্দুমাত্র হিতবোধ অবশিষ্ট থাকে, তবে এই কথা শোনো এবং সেই অনুযায়ী পথ চলো।"   পরশুরামের কন্ঠে ভেসে এলো এক প্রাচীন উপাখ্যান—"পুরাকালে দম্ভোদ্ভব নামে এক সার্বভৌম রাজা ছিলেন। বিপুল শক্তি আর পরাক্রমের অহংকারে তাঁর মেদিনী কাঁপত। প্রাতঃকালে উঠে তিনি ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয়দের সামনে ...

৩১তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-রাজসভায় মধুসূদন: কুরুক্ষেত্রের আগে শেষ চেষ্টা

Image
৩১তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-রাজসভায় মধুসূদন: কুরুক্ষেত্রের আগে শেষ চেষ্টা প্রাতঃকালের স্নান, জপ আর অগ্নিহোত্র শেষ করে শ্রীকৃষ্ণ যখন সূর্যদেবকে প্রণাম জানাচ্ছেন, তখনও চারপাশ শান্ত। শরীর ঢেকে নিলেন উজ্জ্বল পীতবস্ত্র ও আভরণে। ঠিক তখনই ঘরে এলেন দুর্যোধন, সঙ্গে মামা শকুনি। দুর্যোধনের গলায় একধরনের কৃত্রিম ব্যস্ততা, "মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, পিতামহ ভীষ্ম—কৌরবদের বড় বড় সব মাথারাই এখন রাজসভায় আপনার পথ চেয়ে বসে আছেন।" কৃষ্ণ শুধু মৃদু হাসলেন। তাঁর সেই অমলিন, মধুর অভ্যর্থনায় কোনো উত্তাপ ছিল না, ছিল না কোনো গোপন হিংসার আঁচ। বাইরে রথ প্রস্তুত। সারথি প্রণাম করে দাঁড়াল, চারটে শুভ্র ঘোড়া অধৈর্য হয়ে পা ঠুকছে। রথে উঠলেন শ্রীযদুনাথ, সঙ্গে উঠলেন ধর্মজ্ঞ বিদুর। অন্য একটা রথে পেছন পেছন চললেন দুর্যোধন আর শকুনি। রাজসভার দরজায় যখন রথ থামল, কৃষ্ণ পা রাখলেন মাটিতে। তাঁর পাশে বিদুর আর সাত্যকি। কৃষ্ণ যখন সভার ভেতর ঢুকছেন, তাঁর গায়ের সেই অদ্ভুত নীলচে জ্যোতি আর মহিমার সামনে মুহূর্তের জন্য কৌরবদের সব জাঁকজমক ম্লান হয়ে গেল। সভার ভেতরে সবার সামনে দুর্যোধন আর কর্ণ, পেছনে কৃতবর্মা আর অন্য যদুবংশীয়রা। কৃষ্ণকে দেখেই ...

২৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কৃষ্ণ পদার্পণ: হস্তিনাপুরের এক অগ্নিগর্ভ প্রভাত

Image
২৯তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কৃষ্ণ পদার্পণ: হস্তিনাপুরের এক অগ্নিগর্ভ প্রভাত প্রাতঃকালের স্নান-আহ্নিক সাঙ্গ করে বৃকস্থল থেকে যখন তিনি রথে উঠলেন, সকালের সোনাঝরা রোদে তাঁর তামাটে ত্বক চকচক করছিল। রথের চাকার ধূলো উড়িয়ে হস্তিনাপুরের দিকে যাত্রা শুরু হতেই গ্রামবাসীরা কিছু দূর সঙ্গে এল বটে, কিন্তু তাঁর মৃদু হাসির ইশারায় আবার ফিরেও গেল। হস্তিনাপুরের ঠিক সীমান্তে তখন এক রাজকীয় অভ্যর্থনার তোড়জোড়। দুর্যোধন ছাড়া ধৃতরাষ্ট্রের বাকী সব পুত্র, আর তাঁদের সঙ্গে ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপের মতো মহাধ্যানীরা দাঁড়িয়ে আছেন রাজকীয় পোশাকে। কৌতূহলী নগরবাসীর ভিড়—কেউ হেঁটে, কেউ গরুর গাড়িতে, কেউ বা ঘোড়ায় চড়ে এসেছে এই এক অলৌকিক মানুষকে চোখের দেখা দেখতে। পথজুড়ে রঙিন পতাকায় সাজানো নগরী, রাস্তায় রাস্তায় সুগন্ধি জল ছিটানো।    জনতার নতমস্তক অভিবাদন আর করতালির মধ্য দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ধীরে ধীরে এসে পৌঁছালেন ধৃতরাষ্ট্রের রাজপ্রাসাদে। তিন-তিনটি ভারী ফটক পেরিয়ে তিনি যখন প্রধান সভায় প্রবেশ করলেন, অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ ভীষ্ম—সকলেই সসম্ভ্রমে দাঁড়িয়ে উঠলেন। কৃষ্ণ হাসলেন। সেই হাসিতে এক অদ্ভুত স্থৈর্য ছিল। রাজপু...

২৮তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কৌরবসভায় অন্ধের রাজনীতি ও এক উন্মত্ত ষড়যন্ত্র

Image
২৮তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কৌরবসভায় অন্ধের রাজনীতি ও এক উন্মত্ত ষড়যন্ত্র হস্তিনাপুরের কৌরবসভায় তখন এক থমথমে উত্তেজনা। পাণ্ডবদের শান্তিপ্রস্তাব নিয়ে স্বয়ং কৃষ্ণ আসছেন—এই এক খবরি রাজপ্রাসাদের বাতাসকে যেন ভারী করে তুলেছে। ​সংবাদটা শোনামাত্রই বৃদ্ধ ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধ দুই চোখের কোণে এক অদ্ভুত আনন্দের চমক খেলে গেল। তাঁর সারা শরীরে একটা বিদ্যুতের মতো শিহরণ বয়ে গেল। তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। পাশে বসে থাকা ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর আর পুত্র দুর্যোধনকে ডেকে বেশ রোমাঞ্চিত গলায় বললেন, "শুনছ? আমাদের সৌভাগ্য! পাণ্ডবদের কাজ নিয়ে স্বয়ং কৃষ্ণ আসছেন এখানে। তিনি সাধারণ মানুষ নন, এই নিখিল বিশ্বের বিধাতা। তিনি প্রজ্ঞা আর বীর্যের আধার। কৃষ্ণ সন্তুষ্ট হওয়া মানে আমাদের সমস্ত সংকট কেটে যাওয়া। দুর্যোধন, এখনই লোক পাঠাও! পথের মোড়ে মোড়ে পান্থশালা বানাও, সুগন্ধি জল ছড়িয়ে কৃষ্ণের স্বাগত অভ্যর্থনার আয়োজন করো। এমন কিছু করো যাতে কৃষ্ণ তোমার ওপর প্রসন্ন হন। পিতামহ, আমি কি ভুল কিছু বলছি?" ​সভায় উপস্থিত সকলেই ধৃতরাষ্ট্রের এই শুভবুদ্ধির প্রশংসা করলেন। দুর্যোধনের হুকুমে পথের ধারে গড়ে উঠতে লাগল ইন্দ্রপুরীর মতো রাজ...

২৭তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-যে চুলে আগুন জ্বলে: কৃষ্ণের হস্তিনাপুর যাত্রা

Image
২৭তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-যে চুলে আগুন জ্বলে: কৃষ্ণের হস্তিনাপুর যাত্রা- ​পাঞ্চালীর চোখে জল ছিল না, ছিল আগ্নেয়গিরির উত্তাপ। ​যুধিষ্ঠির আর ভীমের নরম সুর শুনে দ্রৌপদীর বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল। কৃষ্ণকে সামনে দেখে তাঁর চোখ থেকে যেন ঠিকরে বেরোচ্ছিল তেরো বছরের জমাট বাঁধা অপমান। বাঁ হাতে নিজের সেই দীর্ঘ, অগোছালো, রুক্ষ চুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরে দ্রৌপদী এসে দাঁড়ালেন মধুসূদনের সামনে। ​বললেন, "মধুসূদন, তুমি তো সবই জানো। কৌরবদের সেই পৈশাচিক ক্রুরতা, ধৃতরাষ্ট্রের গোপন অভিসন্ধি—কিছুই তো তোমার অজানা নয়। আজ কোন যুক্তিতে তবে সন্ধির কথা উঠছে? অবধ্যকে বধ করলে যেমন পাপ, বধ্য শত্রু পার পেয়ে গেলেও তো সেই একই পাপ হয়! আমাকে সভাতলে দাসীর মতো টেনে আনা হয়েছিল, আর আমার স্বামীরা বেঁচে থেকেও নপুংসকের মতো চেয়ে চেয়ে দেখেছিলেন। অর্জুনের ধনুর্ধারিতা আর ভীমের বাহুবলকে ধিক্কার! যদি সন্ধি করতেই হয়, তবে মনে রেখো দুঃশাসনের হাতে টানা আমার এই অভিশপ্ত চুলগুলোর কথা। পুরুষেরা না পারলে আমার বৃদ্ধ পিতা দ্রুপদ আর অভিমন্যুকে নিয়ে আমার ছেলেরা প্রতিশোধ নেবে। শত্রুর রক্তে এই চুল না ভিজলে কৃষ্ণা শান্ত হবে না!...

২৬তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কুরুসভায় কৃষ্ণ: রাজনীতির ফাঁসে বাঁধা শান্তির শেষ দান

Image
২৬তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-কুরুসভায় কৃষ্ণ: রাজনীতির ফাঁসে বাঁধা শান্তির শেষ দান উপপ্লব্য নগরে তখন দ্বিধার কুয়াশা। কৌরবদের সাথে তেরো বছরের নির্বাসন ও অজ্ঞাতবাস পর্ব শেষ হয়েছে, কিন্তু পাণ্ডবশিবিরে যুদ্ধ আর শান্তির দোলাচল মেটেনি। রাজসূয় যজ্ঞের দীপ্তি আর দ্যূতসভার অপমান—দুই স্মৃতির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে অর্জুন, ভীম, নকুল, সহদেবরা। সবার নজর এক পুরুষের ওপর—কৃষ্ণ। তিনি হস্তিনাপুরে যাচ্ছেন কৌরবদের সভায় শেষ প্রস্তাব নিয়ে। ভীম, যাঁর নাম শুনলেই এককালে রথ-গজা-পদাতিক কাঁপত, তিনি আজ যেন এক অভাবনীয় নম্রতায় স্থির। কৃষ্ণকে কাছে ডেকে বললেন, "মধুসূদন, কৌরবদের কাছে মৃদুভাষে কথা বোলো। দুর্যোধন পরম অধৈর্য, অদূরদর্শী আর হিংসুটে। ওর ক্রোধ এক দাবানল, যা আঠারো রাজার মতো গোটা ভরতবংশকে ভস্ম করে দেবে। অনর্থক রক্তের প্রয়োজন নেই। আমরা ওর বশ্যতা মেনে নিয়ে হলেও বংশরক্ষা করতে রাজি।" কৃষ্ণের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চতুর, রহস্যময় হাসি। ভীমের এই রূপ তিনি আগে দেখেননি। ভীমকে তাতাতে মৃদু হেসে বললেন, "বৃকোদর! তোমার মুখে এমন কাপুরুষের মতো বাণী? যুদ্ধক্ষেত্রে গদা উঁচিয়ে দুর্যোধনকে বধের যে শপথ তুলেছিলে...

২৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-শান্তির শেষ প্রস্তাব ও আসন্ন মহাযুদ্ধের বার্তা

Image
২৫তমভাগ মহাভারতের উদ্যোগপর্ব-শান্তির শেষ প্রস্তাব ও আসন্ন মহাযুদ্ধের বার্তা উপস্থিত রাজাদের সভার গোলমাল তখন স্তব্ধ হয়ে এসেছে। নিষ্ক্রান্ত হওয়ার পর ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে চেয়ে রইলেন যাদবশ্রেষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণের দিকে। বড় ক্লান্ত তাঁর কণ্ঠস্বর, কিন্তু সেখানে এক অদ্ভুত নির্ভরতা। তিনি বললেন, "মিত্রবৎসল শ্রীকৃষ্ণ! এই ঘোর সংকটসময়ে তুমি ছাড়া এমন আর কে আছে, যে আমাদের রক্ষা করতে পারে? তোমার উপস্থিতিতেই আমি নির্ভীক, তাই তো আজও দুর্যোধনের কাছে নিজের ন্যায্য অধিকার দাবি করার সাহস পাই।"   বাসুদেব হাসলেন। সে হাসিতে যেমন গভীর প্রজ্ঞা, তেমনই অগাধ স্নেহ। বললেন, "রাজন, আমি তো সর্বদা আপনার সেবায় প্রস্তুত। কী বলতে চান, নির্দ্বিধায় বলুন। আপনার ইচ্ছা পূরণ করাই আমার ধর্ম।" যুধিষ্ঠির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "ধৃতরাষ্ট্র আর তাঁর পুত্রদের মনোভাব তো সঞ্জয়ের মুখে শুনলেই। দূত কেবল প্রভুর বার্তা বহন করে, তার নিজের তো কোনো স্বর নেই। জনার্দন, বৃদ্ধ রাজার লোভ অপরিসীম। তিনি কৌরব আর পাণ্ডবদের সমচোখে দেখতে পারলেন না। বারো বছর বনবাস আর এক বছরের অজ্ঞাতবাসের চরম কায়িক ও মানসিক কষ্ট আমরা তো এই...