২৩তম বনপর্ব- স্বর্গাদপি গরীয়সী: ভগীরথের তপস্যা ও গঙ্গাবতরণের গাথা
২৩তম বনপর্ব- স্বর্গাদপি গরীয়সী: ভগীরথের তপস্যা ও গঙ্গাবতরণের গাথা
অগস্ত্যের সমুদ্র শোষণের কাহিনী শুনতে শুনতে যুধিষ্ঠিরের মনের গভীরে এক আশ্চর্য কৌতুহল দানা বেঁধেছিল। তিনি লোমশ মুনির দিকে তাকিয়ে বিনীত স্বরে শুধালেন, "হে মহর্ষি, একজন ঋষি যদি দেবতাদের হিতার্থে এক চুমুকে অতলান্ত মহাসমুদ্রকে শূন্য করে দিতে পারেন, এখন নৃপতির উপাখ্যান শোনান , যিনি এর ঠিক বিপরীত কাজটি করেছিলেন? যিনি মৃত আর জীবিতের মধ্যবর্তী লোকে আটকে থাকা পূর্বপুরুষদের আত্মার সদগতির জন্য সেই শুষ্ক সমুদ্রে আবার জলধারা ফিরিয়ে এনেছিলেন?"
লোমশ মুনি মৃদু হাসলেন। তাঁর চোখে ভেসে উঠল এক সুদূর অতীতের ছবি। তিনি বলতে শুরু করলেন ইক্ষ্বাকু বংশের সেই পরম কীর্তিমান রাজা ভগীরথের কাহিনী।
এক লাউয়ের ষাট হাজার সন্তান: সগরের অদ্ভুত বংশলতিকা
ভগীরথের জন্মের বহু কাল আগের কথা। সূর্যবংশে সগর নামে এক পরম ধার্মিক ও প্রতাপশালী রাজা রাজত্ব করতেন। তাঁর ঐশ্বর্যের খামতি ছিল না, কিন্তু মনের কোণে ছিল এক গভীর দীর্ঘশ্বাস—তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। বহু বছর কঠোর তপস্যার পর তিনি স্বয়ং দেবাদিদেব শংকরের বর লাভ করলেন। শিব জানালেন, সগরের এক রানীর গর্ভে জন্ম নেবে ষাট হাজার পুত্র, যারা হবে অমিত বলশালী কিন্তু এক মুহূর্তের অভিশাপে একসঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাবে। আর অন্য রানীর গর্ভে জন্মাবে মাত্র একটি পুত্র, যে হবে বংশের প্রদীপ এবং দৈব গুণে গুণান্বিত।
কালক্রমে দুই রানীই অন্তঃসত্ত্বা হলেন। কিন্তু প্রসবের মূহূর্তে নেমে এল এক অভাবনীয় বিস্ময়। রানী বৈদর্ভী কোনো মানব শিশুর জন্ম দিলেন না, তাঁর গর্ভ থেকে নির্গত হলো একটিমাত্র তিতলাউ! অন্য রানী শৈব্যা জন্ম দিলেন একটি সুশ্রী, বলিষ্ঠ পুত্রসন্তানের।
বিভ্রান্ত ও লজ্জিত রাজা সগর যখন সেই লাউটিকে জলে ফেলে দেওয়ার মনস্থ করলেন, তখনই আকাশবাণী হলো: "হে রাজন, এই অধর্ম কোরো না। লাউয়ের ভেতরের বীজগুলি সযত্নে বের করে ঘৃতপূর্ণ ষাট হাজার পাত্রে সংরক্ষণ করো।" সগর তা-ই করলেন। পরিচারিকাদের কড়া পাহারায় সেই ঘৃতকুম্ভগুলি থেকে একে একে জন্ম নিল ষাট হাজার তেজস্বী পুত্র। তারা এতই বলশালী ছিল যে, মর্ত্য তো ছাই, আকাশেও অনায়াসে বিচরণ করতে পারত।
ইন্দ্রের চাতুরী ও কপিল মুনির কোপানল
নিজের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য সগর রাজা অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করলেন। নিয়ম অনুযায়ী যজ্ঞের ঘোড়াটিকে ছেড়ে দেওয়া হলো এবং তার রক্ষক হিসেবে পেছনে পেছনে চলল সগরের সেই ষাট হাজার উদ্ধত পুত্র।
কিন্তু দেবতাদের রাজা ইন্দ্র সগরের এই ক্রমবর্ধমান শক্তিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠলেন। তিনি চতুরতায় যজ্ঞের ঘোড়াটিকে হরণ করে পাতালে মহর্ষি কপিলের আশ্রমের পাশে বেঁধে রাখলেন, যেখানে মুনি তখন গভীর ধ্যানে মগ্ন।
ঘোড়া খুঁজতে খুঁজতে সগরপুত্ররা পাতালে এসে পৌঁছাল। ধ্যানস্থ কপিল মুনির পাশে যজ্ঞের ঘোড়া দেখে তাদের তপ্ত রক্ত মাথায় চড়ে গেল। ক্রোধে অন্ধ হয়ে তারা ভাবল, এই ভণ্ড সাধুই চোর! বিন্দুমাত্র বিচার-বিবেচনা না করে, অস্ত্র উঁচিয়ে তারা ঋষিকে আক্রমণ করতে উদ্যত হলো।
ক্রোধো হি শত্রুঃ প্রথমো নরাণাম্...
উদ্ধত সগরপুত্ররা ভুলে গিয়েছিল যে, তপস্যার তেজ আগুনের চেয়েও ভয়ানক।
হঠাৎ এই চিৎকারে কপিল মুনির দীর্ঘ ধ্যান ভঙ্গ হলো। তিনি চোখ মেললেন। তাঁর সেই রুদ্র চাক্ষুষ দৃষ্টি থেকে নির্গত হলো এক অলৌকিক অগ্নিশিখা। মুহূর্তের মধ্যে, হ্যাঁ, মাত্র এক মূহূর্তে সগরের ষাট হাজার পুত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেল। যেহেতু তাদের কোনো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়নি, কোনো পবিত্র জলের স্পর্শ তাদের অস্থি পায়নি, তাই তাদের আত্মা স্বর্গে যেতে পারল না। তারা প্রেতযোনি হয়ে অন্তরীক্ষে হাহাকার করে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
বংশের দায় এবং কপিল মুনির ভবিষ্যদ্বাণী
নারদ মুনির মুখে এই চরম বিপর্যয় ও শোকের সংবাদ পেলেন বৃদ্ধ সগর। তিনি তাঁর একমাত্র সৎ-পুত্রের সন্তান, পৌত্র অংশুমানকে ডেকে পাঠালেন। অংশুমান ছিলেন বিনয়ী ও বীর। সগর তাকে বললেন, "বৎস, যজ্ঞের ঘোড়া উদ্ধার করে যজ্ঞ সম্পন্ন করো, আর আমার এই অভিশপ্ত পুত্রদের মুক্তির কোনো উপায় খুঁজে বের করো।"
অংশুমান পাতালে গিয়ে পৌঁছালেন। সেখানে ধ্যানমগ্ন কপিল মুনি এবং তাঁর পাশে বাঁধা ঘোড়াটি দেখতে পেয়ে তিনি অস্ত্র ধরলেন না। তিনি মুনির চরণে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে স্তব করতে লাগলেন। অংশুমানের এই বিনয় ও ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে কপিল মুনি বললেন, "বৎস, আমি তোমাকে দুটি বর দিচ্ছি। প্রথমত, এই ঘোড়া তুমি নিয়ে যাও। দ্বিতীয়ত, তোমার পূর্বপুরুষদের উদ্ধার একদিন হবে। তবে তা তোমার জীবদ্দশায় সম্ভব নয়। তোমারই বংশে ভগীরথ নামে এক মহাপ্রতাপশালী রাজা জন্ম নেবেন, যাঁর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে স্বর্গের গঙ্গা মর্ত্যে নেমে আসবেন। সেই পবিত্র গঙ্গার জলেই সগরপুত্রদের আত্মা মুক্তি পাবে।"
ঘোড়া ফিরে পেয়ে সগর রাজা যজ্ঞ শেষ করলেন। এরপর অংশুমান এবং তাঁর পুত্র দিলীপ—উভয়েই নিজ নিজ রাজত্বকালে গঙ্গাকে মর্ত্যে আনার জন্য সাধনা করেছিলেন, কিন্তু কেউই সফল হতে পারেননি। অবশেষে ইতিহাসের সেই অমোঘ দায়িত্ব এসে পৌঁছাল দিলীপের পুত্র ভগীরথের কাঁধে।
হিমালয়ের বুকে এক হাজার বছরের হাহাকার
ভগীরথ যখন জানতে পারলেন তাঁর ষাট হাজার পূর্বপুরুষের আত্মা যুগ যুগ ধরে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পাতালে ছাইয়ের গাদায় ছটফট করছে, তাঁর বুক ফেটে কান্না এল। তিনি মন্ত্রীদের হাতে রাজ্যের ভার দিয়ে চলে গেলেন হিমালয়ের নির্জন গহন অরণ্যে। শুরু হলো এক কঠোর, নির্মম তপস্যা। ফলমূল, কন্দ, কখনো শুধু জল, আবার কখনো কেবল বাতাস গ্রহণ করে কেটে গেল এক হাজার বছর।
অবশেষে স্বর্গের দেবী গঙ্গা তাঁর সামনে আবির্ভূত হয়ে বললেন, "রাজন, আমি তোমার তপস্যায় প্রীত। আমি মর্ত্যে যেতে প্রস্তুত। কিন্তু একটা সমস্যা আছে। স্বর্গ থেকে যখন আমি তীব্র বেগে মর্ত্যে আছড়ে পড়ব, সেই প্রচণ্ড আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা এই পৃথিবীর মাটির নেই। একমাত্র নীলকণ্ঠ শিবই পারেন তাঁর জটায় আমার বেগ ধারণ করতে। তুমি আগে মহাদেবকে প্রসন্ন করো।"
ভগীরথ দমে গেলেন না। তিনি এবার কৈলাশ পর্বতে গিয়ে শিবের আরাধনা শুরু করলেন। এক পায়ে দাঁড়িয়ে, পঞ্চাগ্নি জ্বালিয়ে তাঁর সেই একাগ্র সাধনা দেখে আশুতোষ শিবের মন গলল। তিনি গঙ্গাকে নিজের মূর্তিতে ধারণ করতে রাজি হলেন।
জটাজাল এবং জাহ্নবীর মর্ত্য-াভিযান
স্বর্গ ছাড়ার সময় গঙ্গার মনে হয়তো কিছুটা অহংকার জেগেছিল। তিনি ভাবলেন, তাঁর উত্তাল স্রোতে তিনি শিবকেও ভাসিয়ে নিয়ে যাবেন। কিন্তু দেবাদিদেব শিবের মহিমা বোঝা অত সহজ নয়। গঙ্গা যখন বিপুল অহংকারে আকাশ থেকে কৈলাশের মাথায় আছড়ে পড়লেন, শিব তাঁর জটাজাল বিস্তার করে দিলেন।
গঙ্গার সেই সুবিশাল জলধারা শিবের ঘন, অন্তহীন জটার গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেল। বছরের পর বছর কেটে যায়, গঙ্গা আর সেই জটা থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পান না! ভগীরথ দেখলেন, আবার সব ভেস্তে যেতে বসেছে। তিনি পুনরায় শিবের স্তব করলেন। ভক্তের আকুলতায় সন্তুষ্ট হয়ে শিব তাঁর জটার একটি বাঁধন আলগা করে দিলেন। গঙ্গা শান্ত, সৌম্য ধারায় মর্ত্যের মাটিতে নেমে এলেন।
কিন্তু যাত্রা তো এখনও শেষ হয়নি। ভগীরথ রথে চড়ে আগে আগে চললেন, আর গঙ্গা তাঁর শঙ্খধ্বনি অনুকরণ করে কলকল নাদে পেছন পেছন ধেয়ে চললেন। পথিমধ্যে গঙ্গার বন্যায় জহ্নু মুনির আশ্রম ভেসে গেল। ক্রুদ্ধ জহ্নু মুনি এক চুমুকে গঙ্গার সমস্ত জল পান করে নিলেন! ভগীরথ আবার পড়লেন বিপদে। তিনি অনুনয়-বিনয় করার পর মুনি শান্ত হলেন এবং নিজের ডান কান দিয়ে গঙ্গাকে পুনরায় মুক্ত করলেন। জহ্নু মুনির কন্যা রূপেই গঙ্গার আর এক নাম হলো 'জাহ্নবী'।
পাতালে মুক্তি এবং ভগীরথের অক্ষয় কীর্তি
অবশেষে ভগীরথ গঙ্গাকে নিয়ে গিয়ে পৌঁছালেন সেই পাতালে, যেখানে সগরের ষাট হাজার পুত্রের ভস্ম স্তূপাকার হয়ে পড়েছিল। বহু শতাব্দীর অভিশপ্ত, শুষ্ক সেই ছাইয়ের ওপর যখন গঙ্গার প্রথম শীতল, পবিত্র জলধারা স্পর্শ করল, এক অলৌকিক আলোয় চারদিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
ষাট হাজার আত্মা প্রেতযোনি থেকে মুক্ত হয়ে দিব্য রূপ ধারণ করে স্বর্গের রথে আরোহণ করল। ভগীরথের অশ্রুসজল চোখের সামনে দিয়ে পিতৃপুরুষেরা স্বর্গের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। এরপর গঙ্গা গিয়ে মিলিত হলেন মহাসমুদ্রে, যা অগস্ত্য মুনি শুকিয়ে ফেলেছিলেন। ভগীরথের আনীত জলেই সাগর আবার তার পূর্ণ রূপ ফিরে পেল। রাজর্ষির এই অসাধ্য সাধনের স্মারক হিসেবে গঙ্গার এই ধারার নাম হলো 'ভাগীরথী'।
লোমশ মুনির মুখে এই কাহিনী শেষ হলে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির বহুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। তিনি বুঝলেন, এ কেবল একটি নদীর মর্ত্যে আসার গল্প নয়; এ হলো মানুষের অপরাজেয় ইচ্ছাশক্তির জয়গান। যদি লক্ষ্য সৎ হয় এবং সংকল্প অটুট থাকে, তবে একজন সাধারণ মানুষও নিয়তিকে বদলে দিতে পারে, এমনকি স্বর্গকেও বাধ্য করতে পারে মর্ত্যে নেমে আসতে।

Comments
Post a Comment