৪৪তম বনপর্ব মার্কণ্ডেয় ঋষি: কলিযুগ ও আগামীর পদধ্বনি
৪৪তম বনপর্ব মার্কণ্ডেয় ঋষি: কলিযুগ ও আগামীর পদধ্বনি
মার্কণ্ডেয়ের কণ্ঠস্বর তখন নিভে আসা প্রদীপের শেষ শিখাটুকুর মতো কাঁপছে। সৃষ্টি আর প্রলয়ের সেই অলৌকিক, অতিপ্রাকৃতিক আখ্যান শুনে যুধিষ্ঠিরের চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গিয়েছিল। বুকের ভেতর একটা হিমশীতল বাতাস টের পাচ্ছিলেন তিনি। অর্জুন তাঁর ধনুকে হাত দিয়ে চুপ করে বসে আছেন, ভীমের বিশাল চোয়াল শক্ত। কাম্যবনের সেই শেষ বিকেলের আলোয়, যেখানে গাছের ছায়াগুলো ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে অজগরের মতো গ্রাস করছে চারপাশ, যুধিষ্ঠির আবার একটু এগিয়ে বসলেন। তাঁর গলায় কৌতূহল নয়, এক গভীর বিষণ্ণ আর্তি।
তিনি বললেন, "ভার্গব, জন্ম আর মৃত্যুর এই যে মহাজাগতিক খেলা, তা তো শুনলাম। কিন্তু আমার মনকে এক তীব্র আশঙ্কা গ্রাস করছে। এই যে আমাদের চারপাশের চেনা পৃথিবী, এর পর কী? যখন কলিযুগ আসবে, যখন মানুষের মনের ভেতরের অন্ধকার বাইরে নেমে আসবে, তখন ঠিক কী ঘটবে মুনিবর? মানুষের শরীর কেমন হবে? তাদের অন্ন, তাদের বস্ত্র, তাদের আয়ুর পরিমাপ—সবটাই কি বদলে যাবে? কলির সেই চরম হাহাকারের শেষে আবার কীভাবে ফিরবে সত্যের প্রথম আলো? কৃপা করে বলুন, আপনার কথা যেন এক অনন্ত তৃষ্ণা জাগায়।"
মার্কণ্ডেয় চাইলেন। তাঁর দৃষ্টি যুধিষ্ঠিরের মুখ পার হয়ে চলে গেল সুদূর কৃষ্ণবর্ণা দ্রৌপদীর দিকে, তারপর বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের সেই রহস্যময়, শান্ত ঠোঁটের কোণে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। তিনি যেন বর্তমানের দেওয়াল ফুঁড়ে বহু কোটি বছর পরের এক অন্ধকার উপত্যকা দেখতে পাচ্ছেন।
তিনি বললেন, "রাজন, শোনো। যা অবশ্যম্ভাবী, যা কালপুরুষের অমোঘ নিয়ম, তা-ই বলছি। সত্যযুগে ধর্ম ছিল এক সম্পূর্ণ শুভ্র গাভী, চার পায়ে ভর দিয়ে সে অবলীলায় হাঁটত পৃথিবীতে। ছলনা ছিল না, দম্ভ ছিল না। ত্রেতা এলো, অধর্ম তার একটা পা কেটে নিল। দ্বাপরে এসে ভাঙন ধরল মাঝখানে—ধর্ম দাঁড়াল আধখানা শরীরে। আর যখন কৃষ্ণবর্ণ কলি এসে দাঁড়াবে পৃথিবীর দোরগোড়ায়, তখন অধর্ম তাকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলবে। ধর্ম টিকে থাকবে মাত্র এক চতুর্থাংশে, একটা জীর্ণ, রুগ্ণ কাঠামোর মতো।"
একটু থামলেন ঋষি। বনের পাতায় বাতাস লেগে একটা অদ্ভুত মৰ্মর ধ্বনি উঠল। তিনি আবার বলতে লাগলেন, "যুগ যত ক্ষয় হবে, মানুষের ভেতরের তেজ, বীর্য আর বুদ্ধি ততটাই নিভে আসবে। এক অদ্ভুত ভণ্ডামি গ্রাস করবে সমাজকে। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য কি শূদ্র—কারো অন্তরে কোনো নিষ্ঠা থাকবে না। মানুষ ধর্মের একটা সুদৃশ্য জাল বুনে অপরকে ফাঁদে ফেলবে, আর নিজেকে মস্ত পণ্ডিত জাহির করে সত্যের গলা টিপে ধরবে লোকসমক্ষে। বিদ্যা অর্জনের সময় কমে যাবে, কারণ মানুষের পরমায়ু হবে অতি সংক্ষিপ্ত। আর যখনই বিদ্যা পালাবে, মানুষের জায়গাটা দখল করবে আদিম লোভ আর অন্ধ ক্রোধ। ভাই ভাইয়ের রক্তে হাত রাঙাবে, তুচ্ছ কারণে একে অপরকে হত্যা করতে দ্বিধা করবে না। জাতের সঙ্গে জাত মিশে যাবে, চেনা যাবে না কে ধার্মিক আর কে খুনি। সকলেই আচারভ্রষ্ট হয়ে একাকার হয়ে যাবে।"
মার্কণ্ডেয়ের গলার স্বর এবার আরও গম্ভীর, যেন এক অমোঘ চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছে বাতাসে। "কলির শেষলগ্নে জগতের রূপ হবে বীভৎস। মানুষ রুচিসম্মত ভালো পোশাক ছেড়ে পরবে জীর্ণ, নিকৃষ্ট বস্ত্র। অন্ন বলতে থাকবে না কিছু, মাছ আর মাংসই হবে প্রধান আহার। গোরু? না যুধিষ্ঠির, সেই পবিত্র পশুকে আর কোথাও দেখতে পাওয়া যাবে না। পুরুষেরা লালসার বশবর্তী হয়ে শুধু স্ত্রীদের ইশারায় চলবে, বন্ধুত্ব বলতে থাকবে শুধু কামনার আদান-প্রদান। মানুষ ঈশ্বরকে ভুলে যাবে, চারিদিকে শুধু নাস্তিক আর চোরদের জয়জয়কার হবে। পশুর অভাবে লাঙল টানার ক্ষমতা হারাবে মানুষ, চাষবাস বন্ধ হয়ে যাবে। ব্রাহ্মণেরা বেদের নিন্দা করবে, অর্থহীন শুকনো তর্কে মেতে উঠে যজ্ঞ-হোম সব বিসর্জন দেবে। পরমেশ্বরকে না জেনে, সাধনা না করে অবলীলায় মুখে বলবে 'অহং ব্রহ্মাস্মি'—আর সেই মিথ্যা দম্ভের প্রতিবাদ করার ক্ষমতাও কারো থাকবে না।"
যুধিষ্ঠির স্তব্ধ হয়ে শুনছিলেন। তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। মার্কণ্ডেয় বলে চললেন, "সমগ্র পৃথিবী ম্লেচ্ছাচারে ডুবে যাবে। উৎসব থাকবে না, আনন্দ থাকবে না। মানুষ এতটাই নিষ্ঠুর হবে যে, অসহায় বিধবার যৎসামান্য সম্পদ লুঠ করতেও তাদের হাত কাঁপবে না। রাজারা? তারা প্রজাদের রক্ষা করবে না, শুধু শোষকের মতো কর আদায় করবে আর চাবুক মারবে। সজ্জন মানুষেরা কোণঠাসা হয়ে পড়বে, তাদের ধন-সম্পদ আর স্ত্রীদের বলপূর্বক হরণ করবে ক্ষমতাশালীরা। নারীর কান্নায় সেদিন কারো মন গলবে না। বিবাহের পবিত্র মন্ত্র লোপ পাবে, নারী-পুরুষ কেবল পারস্পরিক শারীরিক আকর্ষণে লিভ-ইন করবে, সাময়িক সঙ্গী বেছে নেবে। ঘরের লোকই ঘরের সম্পদ চুরি করবে।"
"আয়ু কমতে কমতে এমন জায়গায় ঠেকবে যে, মানুষের পরমায়ু হবে বড়জোর ষোলো বছর! পাঁচ-ছয় বছরের কন্যাসন্তান গর্ভবতী হবে। স্বামী-স্ত্রী কেউ কারো প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে না, পরকীয়ায় মত্ত হবে সমাজ। ব্যবসায় শুধু প্রবঞ্চনা আর ঠকবাজি। অবলীলায় মানুষ বনের সবুজ গাছপালা কেটে মরুভূমি বানাবে, কারো বুকেও একটুও মায়া জাগবে না। শূদ্রেরা সিংহাসনে বসে ধর্মোপদেশ দেবে, আর পেটের দায়ে ব্রাহ্মণেরা মাথা নিচু করে সেই অধর্মকেই শাস্ত্র বলে মেনে নেবে। দেবমন্দিরগুলো অবহেলায়, শ্যাওলায় ঢেকে পড়ে থাকবে। মানুষ পুজো করবে দেওয়ালে আঁকা হাড়ের আর কঙ্কালের ছবির! যখন দেখবে চারিদিকে শুধু মাংসাশী আর মদ্যপদের উল্লাস, তখনই বুঝবে সৃষ্টির আয়ু ফুরিয়ে এসেছে।"
ঋষি মার্কণ্ডেয়ের চোখ দুটো যেন জোনাকির মতো জ্বলতে লাগল। "তারপর আসবে প্রকৃতির প্রতিশোধ। অসময়ে হড়পা বান নামবে, খরা হবে। গ্রহ-নক্ষত্র উল্টো পথে হাঁটবে, আকাশে একটা সূর্যের জায়গায় মনে হবে যেন সাত সাতটা সূর্য একসঙ্গে আগুন ঢালছে। পৃথিবী পুড়ে খাক হয়ে যাবে। উল্কাপাত হবে, বজ্রের গর্জনে কান ফেটে যাবে প্রাণীকুলের। অমাবস্যা ছাড়াই সূর্যগ্রহণ হবে, চারদিক কুয়াশায় ঢেকে যাবে। সন্তান তার নিজের পিতামাতাকে হত্যা করবে, স্ত্রী-পুত্র মিলে স্বামীর প্রাণ নেবে। পরিশ্রান্ত পথিক জল কিংবা আশ্রয়ের জন্য হাহাকার করবে, কেউ তাকে এক ফোঁটা জল দেবে না। মানুষ নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে দিকভ্রান্তের মতো ভিনদেশে পালাবে। এইভাবেই ঘটবে এক যুগান্তের মহাধ্বংস।"
কিন্তু পরক্ষণেই মার্কণ্ডেয়ের মুখে একটা মৃদু, অলৌকিক আলোর আভা ফুটে উঠল। তিনি বললেন, "কিন্তু ধ্বংসই শেষ কথা নয়, রাজন। কালের চাকা আবার ঘুরবে। অন্ধকার কেটে গিয়ে আবার আসবে প্রথম সকাল—সত্যযুগ। যখন সূর্য, চন্দ্র আর বৃহস্পতি একই রাশিতে, পুষ্য নক্ষত্রে মিলিত হবে, তখন আকাশ ভেঙে শান্তিদায়ী বৃষ্টি নামবে। পৃথিবী আবার সুজলা-সুফলা হবে। আর সেই সময়, শম্ভল নামের এক পুণ্য গ্রামে, বিষ্ণুযশা নামের এক সদাচারী ব্রাহ্মণের ঘরে জন্ম নেবে এক অলৌকিক বালক। তাঁর নাম হবে কল্কি।"
"সে হবে অসীম বলশালী, মহাবুদ্ধিমান। সে মনে করলেই আকাশ থেকে নেমে আসবে দিব্য বাহন, দৈব অস্ত্র আর অপরাজেয় সেনা। সেই কল্কি বিষ্ণুযশা নিজের ব্রাহ্মণসেনা নিয়ে পৃথিবীর বুক থেকে ম্লেচ্ছ আর অধার্মিকদের সম্পূর্ণ নির্মূল করবে। তাঁর তরবারির আলোয় কেটে যাবে কলির অন্ধকার। সে হবে এই পৃথিবীর নতুন রাজচক্রবর্তী। ধর্মকে আবার চার পায়ে দাঁড় করিয়ে সে মানুষকে ফিরিয়ে দেবে তার হারানো স্বর্গ, হারানো আনন্দ।"
মার্কণ্ডেওয়ের শেষ মন্ত্র
কল্কির এই মহিমান্বিত আখ্যান শেষ হতেই কাম্যবনের অন্ধকার যেন কিছুটা হালকা মনে হলো। যুধিষ্ঠির হাত জোড় করলেন। তাঁর ভেতরের ক্ষত্রিয় রাজা তখন এক গভীর দ্বন্দ্বে মগ্ন। তিনি বললেন, "মুনিবর, এই ঘোর সংকটের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে, একজন রাজা হিসেবে আমার ঠিক কী করা উচিত? প্রজাপালনের সময় আমার আচরণ কেমন হওয়া উচিত যাতে আমি স্বধর্ম থেকে বিচ্যুত না হই?"
মার্কণ্ডেয় অত্যন্ত স্নেহভুল চোখে যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকালেন আর বললেন, "রাজন, যুধিষ্ঠির। তুমি সব প্রাণীর প্রতি দয়ার্দ্র থেকো। কারো খুঁত খুঁজো না, সর্বদা সত্যের পক্ষে থেকো। রাজা হতে পারো, কিন্তু আচরণে রেখো অসামান্য নম্রতা আর কোমলতা। নিজের ইন্দ্রিয়গুলোকে খাঁচায় বন্দি পশুর মতো বশে রেখো। প্রজাদের নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখো। যদি কখনো মনের অজান্তে, অসতর্কতায় কাউকে আঘাত করে ফেলো, তবে অহংকার ত্যাগ করে দান-দক্ষিণা আর ক্ষমা প্রার্থনায় তার মন জয় কোরো। কখনো নিজেকে সকলের প্রভু ভেবো না, ভেবো তুমি এই প্রজামণ্ডলীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেবক।"
ঋষি একটু হেসে বললেন, "তাত, আমি যা বললাম, তা তো নতুন কিছু নয়। সৃষ্টির আদি থেকে ধর্মাত্মা মানুষেরা এই পথেই হেঁটেছেন। আর তুমি তো নিজেই ধর্মপুত্র, অতীত আর ভবিষ্যতের সবকিছুই তো তোমার অন্তরে প্রস্ফুটিত। তুমি কুরুবংশের শ্রেষ্ঠ সন্তান, যা শুনলে, তা নিজের মন, বাক্য আর কর্মে ধারণ করো।"
যুধিষ্ঠির মাথা নিচু করে ঋষির পায়ের ধুলো নিলেন। তাঁর গলায় এক আশ্চর্য প্রত্যয়, "দ্বিজবর, আপনার এই বাণী আমার কানে অমৃতের মতো বর্ষিত হলো। আমি তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। মানুষ লোভ আর ভয়ের বশে ধর্ম ত্যাগ করে। কিন্তু আমার মনে কোনো লোভ নেই, কোনো ভয় নেই, কারো প্রতি ঈর্ষাও নেই। আপনার প্রতিটি আদেশ আমার জীবনের ধ্রুবতারা হবে।"
কুটিরের বাইরে তখন রাত নেমে এসেছে। বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে মৃদু হাসছিলেন। সেই নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়, সমস্ত পাণ্ডব আর ঋষিদের মনের ভেতর এক অদ্ভুত, অলৌকিক প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ল। যুধিষ্ঠির বুঝতে পারলেন, যুগ পাল্টাবে, পৃথিবী ধ্বংস হবে, কিন্তু মানুষের ভেতরের সত্যটুকুকে মুছে ফেলার ক্ষমতা কলিযুগেরও নেই।
বি: দ্র: আমি সংক্ষিপ্ত মহাভারতের আদি পর্ব ৭১তম ভাগে এবং সভা পর্ব ১৬তম ভাগে সম্পন্ন করেছি। এখন চলছে সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বনপর্বের ৪৪তম ভাগের আলোচনা এবং এটি এগিয়ে চলবে।
বনপর্বের ৪৩তম ভাগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ভাগ এই ব্লগে পেতে নিচের লিংকগুলিতে ক্লিক করুন ।
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের প্রথম পাতা (Index of Brief Mahabharata first page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি-সূচি পত্রের দ্বিতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata second page)
সংক্ষিপ্ত মহাভারতের বিষয়সূচি- তৃতীয় পাতা (Index of Brief Mahabharata)
আপনার যদি কোনো জিজ্ঞাসা, প্রশ্ন বা পরামর্শ থাকে, তবে নিচের comment boxএ লিখুন :

Comments
Post a Comment